রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬৭
মহাসিন
সময় গড়িয়ে রাত হলো। বাড়ির সব আলো নিভে গেছে। শুধু বারান্দার লাইটটা হালকা হলুদ আলো ছড়াচ্ছে।নিস্তব্ধতা ভেঙে শাপলা ধীর পায়ে এসে কবিতার রুমে ঢুকল। দরজাটা ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই কবিতা চমকে তাকাল।
কবিতা ভ্রু কুঁচকে ব্যঙ্গ করে বলল,
“ওমা! তা আজ সূর্য কোন দিকে উঠল শুনি? মহারানী যে নিজে আমার কক্ষে পায়ের ধুলো দিতে এলেন!”
শাপলা শান্ত গলায় জবাব দিল,
“তা আমার দা সী, তুমি কি ভুলে গেছো? এখন রাত।”
কথাটা শুনে কবিতার মুখের রং পাল্টে গেল। সে রাগে ফুঁসে উঠে বলল,
“শাপলা! নিজের মুখ সামলে কথা বল। বেশি বাড়াবাড়ি করিস না। নিজের সীমার মধ্যে থাক।”
শাপলা এক পা এগিয়ে এলো। চোখে মুখে কঠিন দৃঢ়তা।
“আমি আমার সীমার মধ্যেই আছি। আপনি নিজেই নিজের সীমা পেরিয়ে যাচ্ছেন। আপনাকে সাবধান করে দিলাম। আমার আর সিয়ামের মাঝে ঝামেলা তৈরি করার চেষ্টা করবেন না।”
কথাগুলো ছুঁড়ে দিয়েই শাপলা আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। ঘুরে ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল।
পেছন থেকে কবিতা বাঁকা হাসল। দরজার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বিড়বিড় করল,
“তোর পর্ব খুব তাড়াতাড়ি শে ষ হবে শাপলা। খুব তাড়াতাড়ি…”
রাতের অন্ধকারে এই ফিসফিসানি যেন একটা হুমকির মতো বাতাসে মিশে গেল।
শাপলা দরজা ঠেলে রুমে ঢুকতেই পেছন থেকে দুটো শক্ত হাত তাকে জ ড়ি য়ে ধরল।
চমকে উঠে পেছনে তাকানোর আগেই কানের কাছে গরম নিঃশ্বাস পড়ল। সিয়ামের কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে ভেসে এলো,
“চল তোকে আ দ র করি।”
শাপলার বুকের ভেতর ধুকপুক বেড়ে গেল। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
“এতে আপনার কী লাভ হবে?”
সিয়াম হালকা হেসে তার ঘাড়ে মুখ গুঁজল।
“অনেক লাভ। যে লাভ মুখে বলে বোঝানো যায় না।”
“বলতে না পারলে আ দ র করতে হবে না” শাপলা অভিমানী গলায় বলল।
উত্তরে সিয়াম শাপলার ঠোঁটে আলতো করে ছুঁ য়ে দিল।
“আমার বউ। আ দ র করার অধিকার আমার আছে।”
শাপলা লজ্জায় সিয়ামের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে বিছানায় গিয়ে বসল। বুকের ভেতর ঝড় বইছে।সিয়াম দরজাটা আলতো করে আটকে দিল। তারপর ধীর পায়ে শাপলার কাছে এসে বসল। চোখে গভীর মায়া।
“এবার শুরু ক রি?”
“আমাকে আ দ র করলে কী লাভ?”
সিয়াম আর কথা বাড়াল না। শাপলার দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে কপালে গভীর একটা চু মু দিল। তারপর একে একে ভালোবাসার স্প র্শে ভরিয়ে দিল। শাপলাও আর নিজেকে আ ট কে রাখতে পারল না। সিয়ামকে শক্ত করে জ ড়ি য়ে ধরল।এই রাতে ঘরের বাতাসে শুধু আছে ভালোবাসার উষ্ণতা। দুটো মানুষ, দুটো হৃদয় এক হয়ে গেল।
পনেরো দিন কেটে গেছে।
বিকেল। রোদটা নরম হয়ে এসেছে। ড্রয়িং রুমে হালকা আলো। সোফায় পাশাপাশি বসে আছে চারজন নীলাঞ্জনা, শাপলা, কলি আর কবিতা। সবার মুখেই একটা ক্লান্ত, গম্ভীর ছাপ।
হঠাৎ নীলাঞ্জনার ফোনটা বেজে উঠল।
ফোন হাতে নিতেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি খেলে গেল।
কবিতা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কে কল দিছে?”
নীলাঞ্জনা ফোন রিসিভ করতে করতে বলল,
“মা কল দিছে।”
ওপাশ থেকে মহুয়ার গলা ভেসে এলো,
“হ্যালো নীলাঞ্জনা।”
নীলাঞ্জনা নরম গলায় বলল,
“কেমন আছো মা?”
“ভালো আছি। তুই কেমন আছিস? বাড়ির বাকিরা সবাই ভালো আছে তো?”
“হ্যাঁ মা, সবাই ভালো আছে।”
নীলাঞ্জনা একটু থেমে জিজ্ঞেস করল,
“আমার আলো কোথায়?”
“ওর দাদুর সাথে ঘুরতে গেছে।”
একটু থেমে আবার বলতে লাগলো,
” একটা খুশির খবর আছে।”
“কী খবর?”
“আগামীকাল আমরা দেশে ফিরব, কিছুদিনের জন্য।”
“সত্যি?”
“হুম সত্যি।”
এরপর তারা আরও কিছুক্ষণ গল্প করল।
তারপর কল কেটে কথা শেষ করলো।
ফোন রাখতেই কবিতা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এবার কী হবে?”
নীলাঞ্জনা স্বাভাবিক গলায় বলল,
“কী আবার হবে?”
কবিতা বিরক্ত হয়ে বলল,
“এই যে সিয়াম বিরাজ যে কাণ্ড করে বিয়ে করল।”
নীলাঞ্জনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ধ্যাত। একদিন না একদিন ঠিকই মেনে নেবে।”
পাশ থেকে শাপলা উঠে দাঁড়াল।
“আমি একটু বাইরে যাব।”
কবিতা সাথে বলল,
“কেন? তুই এখন বাইরে গিয়ে কী করবি, হ্যাঁ?”
শাপলা কিছু বলতে যাবে, এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠল। কলি ধীর পায়ে এসে দরজা খুলে দিলো। দরজার ওপাশে পলাশ দাঁড়িয়ে আছে। চোখে মুখে ক্লান্তি।
কলি জিজ্ঞেস করল,
“কিছু বলবেন?”
পলাশ আমতা আমতা করে বলল,
“একটু পানি খাব। তাই এসেছি।”
“ভিতরে আসেন।”
সাথে সাথে কবিতা সোফা থেকে লাফ দিয়ে উঠল।
“না না! ওর ভিতরে আসতে হবে না। এই, তুই ভিতরে আসবি না।”
নীলাঞ্জনা অবাক হয়ে বলল,
“এমন করছো কেন?”
কবিতা শক্ত গলায় বলল,
“তোমরা যাকে তাকে বিশ্বাস করতে পারো, আমি পারি না।”
কথা শেষ করেই সে টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে দরজার কাছে এলো। পলাশের হাতে গ্লাসটা ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“এই নে পানি। খেয়ে বিদায় হ।”
পলাশ কিছু না বলে পানিটা এক নিঃশ্বাসে খেল। তারপর মাথা নিচু করে চলে গেল।
সময় গড়িয়ে এখন রাত আটটা।
ঘরের ভেতর হালকা হলুদ আলো। জানালার বাইরে অন্ধকার জমাট বেঁধেছে।
দীপা চুপচাপ সিরাজের সামনে বসে আছে। কপালে চিন্তার ভাঁজ। চোখে মুখে ক্লান্তি আর বিরক্তি।
কত দিন ধরে এই বদমেজাজি লোকটার সাথে থাকতে হচ্ছে তাকে। এক মুহূর্তও এখানে থাকতে ইচ্ছে করে না।
কিন্তু কী আর করবে? নিজের মামাতো বোন শাপলাকে সাহায্য করতে হবে। সেই শুরু থেকেই সে শাপলার পাশে আছে।
কেন থাকবে না? ছোটবেলা থেকে মামা মামী তাকে নিজের মেয়ের মতো করে দেখেছে। দুই মা মেয়ে কে তাদের সাথে রেখেছিলেন।
কিন্তু রিদি বেগম… শিখাকে বাঁ চা তে গিয়ে কো’মা’য় চলে গিয়েছিলেন। তারপর আর কোমা থেকে ফে’রা হয়নি। চিরদিনের জন্য চ’লে গেছেন।
মৃ ত মা, মামী, মামা… কাউকে শেষবারের মতো দেখতে পারেনি দীপা। কারণ তখন শাপলাকে সাহায্য করাটাই সবচেয়ে জরুরি ছিলো।
সিরাজ অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছে দীপাকে। মেয়েটা আজকাল বড্ড চুপচাপ হয়ে গেছে। আগে সারাক্ষণ প্রশ্ন করত, খোঁচাতো, ঝগড়া করত। এখন কয়েকদিন ধরে একদম চুপ।
সিরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কী হইছে তোমার? এভাবে চুপচাপ বসে আছো কেন?”
দীপা চোখ রাঙিয়ে তাকাল।
“তা কি আপনাকে বলতে হবে? আপনি সবকিছু বললেই তো হয়।”
“আমি সত্যি বলছি দীপা। তোমরা আমাকে যা যা জিজ্ঞেস করো, ওসবের কিছুই আমি জানি না।”
দীপা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
“আপনি সব জানেন। সব।”
একটু থেমে আবার বলল,
“আচ্ছা ওই মুখোশ পরা লোকটা আপনিই, তাই না?”
সিরাজ বিরক্ত হয়ে বলল,
“আমি আগেও বলেছি, আমি ওই মুখোশ পরা লোকটা না।”
“তাহলে কে সে?” দীপার গলা কাঁপছে রাগে।
সিরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“তোমাদের এত শত্রু কেন, হ্যাঁ?”
দীপা শক্ত গলায় জবাব দিল, কেউ যদি গায়ে পড়ে শত্রুতা করতে আসে, তাহলে আমরা কী করব? চুপ করে সহ্য করব?”
রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬৬
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে গেল। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
তারপর সিরাজ বলল,
“আমার খুব খিদে লেগেছে। খেতে দাও।”
দীপা অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,
“আগে খাবার আসুক, তারপর।”
