Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ১৩

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ১৩

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ১৩
সোহানা ইসলাম

” আসতে পারি…??
নক করার পর রুমের ভিতর থেকে কেনো সাড়াশব্দ আসছে না। দরজাটা খোলা ছিলো,, তারপরও ভদ্রতা বজায় রেখে নক করে বাইরে দাড়িয়ে আছে জারা।কারো রুমে তো হুট করে পারমিশন ছাড়া ঢুকা যায় না?
অনেকক্ষণ ধরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে
চলে আসে মিমদের কাছে জারা।
‘ জারা’কে চলে আসতে দেখে জাহেদ জিজ্ঞেস করে —
___ তুমি চলে এসেছো কেনো…?? রুমে ভাইয়া নেই..??
” বড় মালিককে জাহেদ ভাইয়া ডাকতে শুনে জারা’ র কাছে এবার সব ক্লিয়ার হয়ে যায়। আসলে তাদের মাঝে সম্পর্ক কী..?? সব ভাই – বোনেরা মিলে এখানে ঘুরতে এসেছে। ”
— ফিহা বড় বড় চোখ করে জাহেদের দিকে তাকায়। এই লোকটা এখান কার মালিক পক্ষ। আর সে কি না তাকে সুযোগ পেলে অপমান করছে.? হায় আল্লাহ। –সে এখন মুখ লোকাবে কার আঁচলের নিচে?
” — জারা :- ভাইয়া দরজায় নক করেছি কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ আসেনি ভিতর থেকে। তাই চলে এসেছি আমি । ”

” জারা’র কথা শুনে রোহান ভাবছে– ভিতর থেকে সাড়াশব্দ আসছে না কেনো? ভিতরে তো আরমান আছে, তাহলে..? না-কি শাওয়ার নিতে ওয়াশরুমে ঢুকেছে ? হতেও পারে?
“–রোহান :- দরজা খোলা থাকলে ভিতরে বসে অপেক্ষা করো যাও। হয় তো ওয়াশরুমে আছে।
— রোহানের কথা মতো,, আচ্ছা ভাইয়া “” বলে চলে আসে আরমানের রুমের দিকে জারা।
— রুমে প্রবেশ করে একবার চারপাশে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে নেয় জারা। এই মাঠ দিয়ে যাতায়াত করলেও এখানে কখনো আসা হয়নি তার। তাই তার ধারণাও নেই ভিতর টা কেমন হবে। রুমের ভিতরে ঢুকে দরজা টা একটু চাপিয়ে দিয়ে এসে বিছানায় বসে। জারা বিছানায় বসে চাতক পাখির মতো চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগে পুরো রুমটা। রুমে বেশি ফার্নিচার নেই,, এটা বেড, ড্রেসিং টেবিল, বেডসাইড টেবিল,ওয়ারড্রোব আর একটা ডিভান। বে পরিপাটি করে গোছানো ঘরটা। জারা’ যখন মনোযোগ সহকারে রুম দেখতে ব্যস্থ, তখনই —
ওয়াশরুমের দরজা খট করে খুলে বেরিয়ে আসে আরমান । কোমড়ে তার সাদা তোয়ালে পেঁচানো।

দরজা খুলে বেরিয়ে আসা লোকটার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে জারা। এই কাঙ্ক্ষিত মানুষ টা কে এখানে আশাও করেনি কখনো সে। আরমানকে এমন অবস্থায় দেখে জারা একটা ঘোরের মধ্যে চলে যায়। খুব সুক্ষ
ভাবে তাকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে সে। [ সুষম মুখমন্ডল, তীন্ক্ষ চোয়াল, সুগঠিত ঠোঁট, আকর্ষণীয় শরীরের গঠন, কোমড়ে সাদা তোয়ালে পেঁচানো। শাওয়ার নেওয়ার ফলে
বেজা চুল গুলো দিয়ে টপ টপ করে পানি পরছে।
বুক বেয়ে।জারা আরমানের দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, মনে হচ্ছে চোখ দিয়ে গিলে খাবে সে।জারা সির দারা ভেয়ে চলে এক অদ্ভুত শিহরন। এই লোকটা তার সাথে এই কয়দিন যা যা করেছে সব ভুলে নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে আছে। জারা তো ফিদা হয়ে গেছে এই লোক টার উপর। জারা’র কাছে আরমান কে
” একজন আকর্ষণীয় সুদর্শন পুরুষ লাগছে ”
” আরমান শাওয়ার নিয়ে এসে সোজা চলে যায় ড্রেসিং টেবিলের সামনে। আয়নার সামনে দাড়িয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে। তার রুমে যে একজন রমণী এসে বসে আছে, তার সেদিকে কোনো খেলায়ই নেই। সে নিজের কাজ করতে ব্যস্থ। চুল থেকে টপ টপ করে পানি পরার কারণে পরনের তোয়ালে খুলে মাথা মুছতে থাকে আরমান।

” ওওওও…. আল্লাহহ….গো….
ঠাস করে অজ্ঞান হয়ে পরে যায় জারা ”
” কারো চিৎকার শুনে হকচকিয়ে উঠে আরমান। হাতে থাকা তোয়ালে টা কোমড়ে ভালো ভাবে পেঁচিয়ে নেয় তাড়াতাড়ি। পিছন ঘুরে দেখে সাদা কলেজ ড্রেস পরা এক রমণী জ্ঞান হারিয়ে পরে আছে মেজেতে। রমণীর দিকে আর একটু এগিয়ে এসে দেখে এটা তার ‘ হাফ ইঞ্চি মেয়ে। অবাক হয়ে অনেক আরমান। সে জানতো তার হাফ ইঞ্চি মেয়ে এখানে আসবে কিন্তু এখানে এসে তার রুমে বসে থাকবে একটা কস্মিনকালে ও আশা করে নি সে।

” কিন্তু ভাবার বিষয় হলো এ মেয়ে জ্ঞান হারালো কেনো..??
___ এক তো এখানে এই লোকটা কে সে আশা করে নি। তার উপর এতে হ্যান্ডসাম এই লোক আগে লক্ষ করেনি, যখন ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে তখন ফিদা হয়ে যায়। আবার আরমানের বেআক্কেলে কাজ দেখে নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারলো না জারা। অজ্ঞান হয়ে পরে যায় সে।
যদিও আরমান তোয়ালের নিচে অন্তর্বাস পরা ছিলো। তারপর ও সে তো আর এসব দেখে
অভস্থ্য নয়। তাই ছোট মস্তিষ্কের হাই বোল্ডের চাপ নিতে পারেনি সে।
___ আরমানের রুম থেকে জারা’র চিৎকার শুনে ফিহা আর মিমের আত্মা কেঁপে ওঠে। এই তো মেয়েটা সুস্থ- স্বাভাবিক ভাবে এখান থেকে গেলো। তাহলে হটাৎ করে এমন চিৎকার করলো কেনো। কোনো বিপদ হয়নি তো আবার জারা’র। ভাবতে হাত, পা ঠান্ডা হয়ে আসে দুইজনের।
দৌড় লাগায় তারা দু’জন জারা যে রুমটায় আছে। রোহান আর জাহেদ ও ভয় পেয়ে যায় এমন ঘটনায়। তাই তারা দু’জন ও মিম আর ফিহার পিছন পিছন যায়। —
___ মিম আর ফিহা রুমের ভিতরে ঢুকে যা দেখলো তাতে তাদের কলিজার পানি শুখিয়ে যাওয়ার উপক্রম প্রায়। —-
দু’জনে দৌড়ে এসে জারা’কে তাদের কাছে আগলে নেয় । জারা’র এমন অবস্থা দেখে দুইজনেই কান্না করে দেয়। জারা’ গালে হালকা করে চাপড় দিয়ে বার বার করে ডাকছে জারা’কে

“___ এই জানু..!! কী হয়েছে তোর, এ অবস্থা কী করে হলো তোর..??
” ফিহা :- জানু উঠ না। খুব ভয় করছে তো আমাদের তোকে এই অবস্থায় দেখে। ”
__ ” তাদের হাউমাউ কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় জিনিয়ার। বড় ভাইয়ের রুম থেকে কান্নার শব্দ আসছে শুনে তাড়াতাড়ি শুয়া থেকে উঠে দৌড় লাগায় সেই রুমে। বড় ভাইয়ের রুমের দরজায় এসে দেখে কতো মানুষ। ভিতরে ঢুকে দেখে মেজেতে একটা মেয়ে জ্ঞান হারিয়ে পরে আছে।
জিনিয়া তাদের দিকে এগিয়ে এসে বলে…
” এই তোমার ওকে ধরে তাড়াতাড়ি বেডে শুয়ে দাও। ও তো জ্ঞান হারিয়েছে,, ওর জ্ঞান ফিরাতে হবে দূরত।”
— জিনিয়ার কথা মতো জারা’কে ধরে বেডে শুয়ে দেয় দুইজন মিলে।জারা’র মাথার হিজাব খুলে চুল গুলো আগলা করে দেয়।চুলগুলো বড় হওয়ায় প্রায় অনেকটা জায়গায় ছড়িয়ে দেয়। জিনিয়া বেডসাইড টেবিল থেকে পানির গ্লাস হাতে নিয়ে জারা’র চোখে -মুখে পানির দিতে থাকে। জারা’র এ অবস্থা দেখে জেরিন ও কান্না করে দেয়। কান্না করতে করতে বড় বোনের গাঁ ঘেঁসে দাঁড়ায়। কান্নারত অবস্থায় বলতে থাকে জেরিন….
“—- আপু সাদা পরীর কী হয়েছে ? সাদা পরী ঠিক হয়ে যাবে তো ?
ছোট বোনের কথা শুনে জিনিয়া জেরিনের দিকে তাকায়। এই মেয়েকে তার বোন চিনে কীভাবে..?? তারা তো এখানে নতুন। পরিচিত কেউ নেই এখানে তাদের। —
” জিনিয়া :- জেরি তুই চিনিস এই আপুকে..??
জেরিন বোনের কথায় স্বাভাবিক ভাবে উওর দেয়–” হ্যাঁ !! চিনি তো আমি সাদা পরীকে। তার সাথে আমার এখানে আসার প্রথম দিন দেখা হয়েছিলো গেটে। ”

রোহান আর জাহেদ ফিহা আর মিমের মুখ দেখলেও জারা’র মুখ দেখায় সুযোগ হয়ে উঠে’নি তাদের, কারণ জারা সবসময় মুখে মাক্স পরে থাকে। কিন্তু আজ জারা’কে দেখে তাদের চোক্ষ চড়কগাছ হয়ে যায়। মেয়ে টা হাইটে ছোট দেখতে হলেও এমনিতেই পরীর মতো সুন্দর। কি মায়াবী মুখমণ্ডল তার। রোহান তো প্রায় ক্রাস খেয়ে ফেলেছে।
— আর এদিকে জাহেদ জারার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে ‘ হা ‘ করে। চোখের সামনে সে যেনো কোনো আকাশের পরী দেখছে। জাহেদ রোহানের কানে কানে এসে বলে —ভাইয়া এই মেয়ে তো পরীর মতো সুন্দর দেখতে। আরমান ভাইয়ার পছন্দ আছে বলতে হবে কিন্তু..??
” রোহান :- তা একদম ঠিক ঠিক বলেছিস তুই। আমার বন্ধুর চয়েস আছে।
— কিন্তু আরমান’কে তোয়ালে পেঁচানো অবস্থায় দেখে রোহানের কপালে বাজ পড়ে। তার বন্ধুর এই অবস্থা আবার মেয়েটাও অজ্ঞান হয়ে পরে আছে। বিষয় টা তার কাছে খটকা লাগলো বেশ। তাই রোহান আরমানের কানে কানে ফিসফিস করে বলে….

” কী ব্যাপার দোস্ত..?? তোর এই
অবস্থা আবার মেয়েটাও অজ্ঞান হয়ে গেছে। কি করেছিস তুই মেয়েটার সাথে?? যাই বলিস তোর কিন্তু পছন্দ আছে বলতে হবে। ছোট হলেও একদম পরী পছন্দ করেছিস তুই। আমার কিন্তু বেশ পছন্দ হয়েছে। ”
আরমান একদেনে তাকিয়ে ছিলো জারা’র দিকে। জারা’ মুখ শুধু একবার দেখেছে সে। কিন্তু তার চুল দেখায় হয়ে উঠে’নি তার। সে তো ভাবতো হয়তো মেয়েটার চুল ছোট তাই হিজাব পরে থাকে সবসময়। কিন্তু আজ তার ভাব না কে ভুল প্রমাণ হয়। যখন দেখে জিনিয়া জারা’র হিজাব খুলে ঘন বাদামী, লম্বা চুল গুলো মেলে দেয় তখন। তার হাফ ইঞ্চি মেয়ের এতো বড় চুল হতে পারে তা সে কখনো ভাবতে পারেনি।
— কিন্তু রোহানের মুখে বার বার মেয়েটা,মেয়েটা শুনে চোখ গরম করে তাকায় তার দিকে আরমান। আবার তার না হওয়া বউ কে তারই সামনে বলছে পছন্দ হয়েছে রোহানের। মাথায় আগুন জ্বালে উঠে আরমানের। এতো মানুষ এখানে না থাকলে হয়তো আজকে তার মে’ই’ন জিনিস ফা’টি’য়ে ফেলতো আরমান । রাগ নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে—
“– তোকে আর কতো বার বলতে হবে এই মেয়ে না ডাকতে মানজারা’কে..?? ভাবি বলে ডাকবি শা*লা। আবার বলছিস পছন্দ হয়েছে তোর..?? ওর দিকে তাকালে চোখ তুলে এনে ডাস্টবিন এ ফেলে দিবো আমি..!! মাইন ইট –”

আরমানের থ্রে*ট শুনে শুকনো ঢোক গিলে রোহান। সঠিক মানুষের সামনে ভুল কথা বলে ফেলেছে সে। আরমানের ভয়ে মিনমিন সুরে বলে..
” আমি ভুল করে বলে ফেলেছি।সরি দোস্ত । আমি কেনো ওর দিকে’ না, মানে ভাবির দিকে নজর দিতে যাব বল..? আমার জন্য তো তোর বোন আছেই তাই না..?
” –আরমান :- ” ফা*কি** সরি তোর কাছে রাখ শা*লা .!! এবারই লাস্ট, পরের বার আর সুযোগ দিব না আমি । ”
— মিম আর ফিহা জারা’ কে নিয়ে এতোই ব্যাস্থ
হয়ে পরে যে রুমে কে আছে তা খেয়াল করে না তারা । ফিহার হটাৎ করে চোখ পরে আরমানের উপর। এই লোকটা কে এখানে দেখে বেশ অবাক হয়। তারা মানে তার জানু’র এই অবস্থার জন্য এই লোকটা দায়ী..?? আরমান কে এবার ফিহা শাসিয়ে হবে….
” এই শয়তান লোক টা এখানে কী করছে…?? এই লোক টার জন্য আমার জানু’র এই অবস্থা। এই লোক’টার নামেই তো আমরা নালিশ করতে এসেছি। “উনাকে এক্ষুনি এই ঘর থেকে বের করে দিন। ”
ফিহার কথায় জিনিয়া কিছুই বোঝতে পারছে না।সব কথা তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। এই মেয়ে টার এমন অবস্থার জন্য তার ভাই দায়ী। এটা কীভাবে সম্ভব?? তারা তো তাদের চিনেই না,, কখনো দেখে বলেও তো মনে হচ্ছে না..??

” জিনিয়া— ” এই মেয়ে এসব কি বলছো তুমি,?? মাথা ঠিক আছে..?? ওর এমন অবস্থার জন্য আমার ভাইয়া কেনো দায়ী হতে যাবে, আজিব..?? ”
জিনিয়ার মুখ থেকে ভাইয়া ডাক শুনে টাস্কি খেয়ে যায় ফিহা আর মিম। আজকে মনে হয় তারা টাস্কি দিবস পালন করছে !! একের পর এক টাস্কি খেয়ে যাচ্ছে এখানে এসে। অবাক হয়ে মিম বলে —” কী বললে আপু তুমি..?? এই লোকটা তোমার ভাই..??

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ১২

‘ জিনিয়া— ” হ্যাঁ !! উনি আমার বড় ভাইয়া। আরমান খান। ”
এই তিনজনের এক এক করে টাস্কি খেতে দেখছে তিনজন মানব নীরব দর্শকের মতো। আরমান এখনো তোয়ালে পেঁচানো অবস্থায় দাড়িয়ে আছে। তার সাথে রোহান আর জাহেদ ও।তাদের সংশয় দূর করতে জাহেদ এগিয়ে এসে বলে…
” যাকে খারাপ লোক ভেবে, তোমরা যার কাছে নালিশ করতে এসেছো, তারা দুইজনই এক। ”

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here