Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ১৭

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ১৭

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ১৭
সোহানা ইসলাম

আরমান যখন জারা’কে কথা গুলো বলে তখন ফোনের ওপারে থাকা আরিফ খান কথাগুলো অপস্ট শুনলেও ইজ্জত শব্দ টা ভালো করে শুনেছেন। ছেলেকে কথা বলতে না দেখে হ্যালো, হ্যালো করতে থাকেন তিনি। তার ছেলে কিসের ইজ্জতের কথা বলছে। মোবাইল টা কান থেকে নামিয়ে একবার দেখে নেয় লাইন কেটে গেছে কি না। আরমান এখনো লাইনে আছে, তাই আবারও মোবাইলটা কানে ধরে হ্যালো বলতে যাবেন, তখনই আরমান বলে —.
” হ্যালো আব্বু !! লাইনে আছো তুমি.?? ”
” হ্যা আছি !! তুমি কিসের ইজ্জত আর হাফ ইঞ্চির কথা বলছো আরমান..?? ”

___ এই রে আব্বু সব শুনে ফেললো না তো আবার। এখন কী হবে..? আব্বু ঠিক কতো টুকু শুনেছে আল্লাহ মালুম.?? মনে মনে কথা গুলো ভেবে, দেনামুনা করে বলে —-” কই কিসের ইজ্জত এর কথা বলছো তুমি আব্বু..?? আমি কেনো ইজ্জত,হাফ ইঞ্চি হাবিজাবি কথা বলতে যাবো..?? তুমি হয়তো ভালো শুনেছো। ”
ছেলের কথা শুনে আরিফ খান মনে করেন হয়তো তিনি ভুলই শুনেছেন?? তার ছেলে কেনো এসব বলতে যাবে.?? ভাব না রেখে আরিফ খান বলেন—” আচ্ছা এসব বাদ দাও এখন !! ওদিকে কাজ কবে থেকে শুরু করবে. ?? আমাদের হাতে কিন্তু সময় নেই বেশি মনে আছে তো?? খান ইন্ডাস্ট্রির নতুন ব্রাঞ্চ ওপেনিং এর পর কিন্তু আমাদের অনেক গুলো প্রজেক্ট হাতে আসবে। যতদ্রুত সম্ভব কাজ শুরু করে দাও। বেশি ধেরি করো না..?? ‘”
” হুমম, বোঝতে পেরেছি !! এই সপ্তাহে কাজ শুরু করে দিব ইনশাআল্লাহ। ইন্জিনিয়ারদের সাথে কথা হয়েছে আমার, তারা কাল পরশু এসে জমি দেখে নকশা তৈরি করবে। তারপর কাজ শুরু করে দিব। চিন্তা করো না তুমি । বললো আরমান ”

” আচ্ছা ঠিক আছে চিন্তা করব না আমি। আচ্ছা আর একটা কথা বলার ছিলো তোমায়.?? ”
” জ্বি বলো ”
” রাশেদ তোমায় ফোন করছে, তুমি নাকি ওর কল রিসিভ করছো না.?? ওর তো এদিকের কাজ সব কমপ্লিট, আমি রাশেদকে বললো ইসলাম পুড় গ্রামে চলে যেতে.?? ”
” না তোমায় বলতে হবে না। আমি ফোন করে কথা বলে নিবে ওর সাথে।
আচ্ছা বাড়ির সবাই কেমন আছে.?? আম্মুর শরীর ঠিক আছে তো.??”
” হ্যা…হ্যা.. সবাই ভালো আছে। তোমার আম্মু ও ঠিক আছে, চিন্তা করো না এদিক টা নিয়ে তুমি। এদিকের সব কিছু আমি আর তোমার ছোট আব্বু সামলে নিবো। ”
তুমি তোমার ভাই বোনদের দেখে রেখো শুধু তাহলেই হবে। রাখছি এখন, ভালো থেকো। আল্লাহ হাফেজ। ”
” আল্লাহ হাফেজ, বলে আরমান কলটা কেটে দিলো।
বালিশের পাশে মোবাইল টা রেখে দেয়।
একটা সিগারেট জ্বালিয়ে রুম থেকে বারান্দায় এসে ধোঁয়া উড়াতে থাকে আরমান।
মাথা শুধু তার হাফ ইঞ্চি মেয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে।
ফোন নাম্বার আছে, ফোন দিবে না কী দিবে, এই নিয়ে দোটানায় পড়ে আছে সে। মাএ-ই না গেলো এখন ফোন দিলে কেমন দেখায়। রাতে একবার ফোন দিবে ভাবে এখন আর ফোন করে না আরমান।

“সময় সন্ধা ৬ টা। মারজিয়া বেগম রোমানদের যেতে দেয়নি। তারা চলে যাবে শুনে জোর করে রেখেছেন তিনি।একেবারে ডিনার করিয়ে তার পর যেতে দিবে ওদের। তাদের ড্রইং রুমে বসিয়ে চলে আসেন তাদের জন্য নাস্তার ব্যবস্থা করতে রান্না ঘরে ।
জারা, মিম,ফিহা এখনো ফ্রেশ হয়ে তারা ড্রইং রুমে এসে নি।
মারজিয়া বেগম একা হাতে সব সামলাচ্ছেন।
এখন যেহেতু সন্ধা তাই বারি কোনো খাবার রান্না করেন নি। ঘরের কিছু শুকনো খাবার আর কিছু টুকটাক রান্না করেছেন।
ড্রইং রুমের ট্রি টেবিল এ সবগুলো খাবার এক এক করে সাজিয়ে রাখেন মারজিয়া বেগম।
ঝিনুক পিঠা,নকশি পিঠা,কাটা পিঠা, নারকেলের নারু এগুলো ঘরে তৈরি করার ছিলো আগে থেকেই। সবজি পাকোড়া, সিঙ্গারা আর চা তিনি নিজে বানিয়ে নেয়। মেহমানদের তো আর আপ্যায়ন কম জিনিস দিয়ে করা যায় না। এটা কেমন দৃষ্টিকুটু দেখায়।
নিজেদের সামনে এতো খাবার দেখে হা করে তাকিয়ে থাকে চারজনজনে। এখানে কিছু খাবার চিনতে পারলে ও পিঠার আইটেম গুলো চিনতে পারছে না তারা চার জন। আগে দেখেছে বলে মনে হচ্ছে না। মারজিয়া বেগম এর দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে রোহান বলে—” আন্টি এতোসব খাবারের আইটেম গুলো আমাদের জন্য?? ”

” হ্যা বাবা! এগুলো সব তোমাদের জন্য..!! “বললেন মারজিয়া বেগম ”
এবার জাহেদ ও প্রশ্ন ছুড়ে দিলো মারজিয়া বেগম এর দিকে —” আচ্ছা আন্টি সব কিছু তো চিনলাম
কিন্তু ঐযে ফুলের মতো দেখতে এগুলো কী.??”
জাহেদ এর প্রশ্ন শুনে তাকালেন জিনিসটার দিকে মারজিয়া বেগম। পিঠার কথার বলছে জাহেদ বোঝতে পেরে তিনি বলেন —” এগুলো নকশি পিঠা বাবা। ঘরে তৈরি করার ছিলো, শুধু একটু গুঁড় দিয়ে এনেছি। ”
” ওহহ আচ্ছা! আগে কখনো দেখিনি তো তাই আর কী..!!”বললো জাহেদ ”
” আচ্ছা সমস্যা নেই !! তোমার খাওয়া শুরু করো, ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে সব.?? ” মুচকি হাসি দিয়ে বললেন মারজিয়া বেগম ”
তাদের খেতে বলে আবারও কান্না ঘরে চলে যান রাতের খাবার এর ব্যবস্তা করতে মারজিয়া বেগম।
রোহান আর জাহেদ মাএ চা হাতে নিয়ে মুখের সামনে ধরে কাপে মুখ ডোবায় খাওয়ার জন্য। এমন সময় কেউ একজন গান গাইতে গাইতে বাড়িতে প্রবেশ করে। গান দুজনেই একসাথে বিষম খেয়ে জ্বিব পুরিয়ে ফেলে।

___টুনির মা তোমার টুনি কথা শোনে না
যার তার লগে ডেটিং মারে, আমায় চেনে না
ও টুনির মা তুমি টুনিরে বুঝাও না
দিনে-রাতে মিসকল মারে, ফোন করে না
টুনি ইসকুলে যাইবো, টুনি বারান্দায় আইবো,
টুনিরে দেইখা আমার পরান জুড়াইবো
ও টুনির মা তোমার টুনি কথা শোনে না
যার তার লগে ডেটিং মারে, আমায় চেনে না___🎶
মাএ প্রাইভেট পড়া শেষ করে বাড়িতে আসে জোহান গান গাইতে গাইতে। বাড়ির ভিতরে যে মেহমান আছে তা সে বোঝতেই পারেনি। আর বোঝতে পারলেও তার কিছু যায় আসে না এতে।
বাড়ির ভিতরে এসে দেখে চারজন অচেনা মানুষ বসে আছে। চারজনের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকায় জোহান। চোখ যায় তা জিনিয়ার দিকে। খুব সুন্দর মেয়েটা তার সাথে খুব মানাবে। দারুণ লাগবে তাদের একসাথে। জিনিয়াকে দেখে খুশিতে লাড্ডু ফুটছে মনে জোহানের। কাঁধের ব্যগটা টেবিলের উপর রেখে দৌড়ে চলে আসে জিনিয়ার কাছে।

” Who are you, pretty girl.?? ”
জিনিয়া জোহানের দিকে তাকিয়ে বলে –” I’m Jiniya khan and you.?? ”
“juhan. আমি তোমার পাশে বসতে পারি.?? ”
জোহানের কথা শুনে রোহান লাফিয়ে উঠে বলে –” এই ছেলে একদম ওর পাশে বসবে না। আর তোমার বাড়ি কোথায়.?? ”
রোহানের এমন রিয়েক্ট করতে দেখে অবাক হয় জিনিয়া। আজব ও বাচ্চা মানুষ বসতেই পারে। এতে এমন করার কি আছে ..??
জোহান অবাক হয় রোহান এর কথা। তার বাড়িতে বসে তাকেই বলে বাড়ি কোথায়..??
” আপনি কার বাড়িতে বসে আছেন আঙ্কেল..?”
বলেই জিনিয়ার পাশ ঘেঁসে বসে পরে জোহান।
জােহানের কথায় তব্দা খেয়ে যায় রোহান। এই ছেলে তাকে আঙ্কেল বলছে।সে কি বুড়ো হয়ে গেছে..? মাএ ২৭ বছর চলছে সেপ্টেম্বর এর ২ তারিখে ২৮ বছরে পা রাখবে সে। আমার মতো এতো কচি একটা ছেলেকে এই দুই ইঞ্চির ছেলে আঙ্কেল বলছে। জোহানের দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে —” এই বেটারি, আঙ্কেল বলছে কাকে তুমি ?? আর আমরা এই বাড়ির মেহমান, তুমি কে.??
জোহাম ও শার্টের কলার উঁচিয়ে বলে —” আমি হলাম এই বাড়ির ছোট ছেলে। ”
জোহান কে বোনের সাথে বসতে দেখে জেরিন জাহেদর কাছ থেকে উঠে এসে বলে –” তুমি আমার আপুর কাছ থেকে সরে বস। ”

সবাই তাকে এমন সরে বসতে বলছে দেখে আরও ঘেঁষে বসে জিনিয়ার দিকে। জোহান এবার আবদারের সুরে জিনিয়াকে বলে –” আমি যখন বড় হবো, তখন তোমায় বিয়ে করব আমি। কিউটি গার্ল। তোমার আর আমার অনেক মিল। এই দেখো তোমার নাম জিনিয়া আর আমার নাম জোহান । ”
এইটুকু ছেলের মুখে এমন কথা শুনে সবাই একদম হা হয়ে যায়। তারা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জোহানের দিকে। এই ছেলের বয়স কতো.? এখনই বিয়ের কথা বলছে।
এই ছেলের কথা শুনে মনে হচ্ছে তাকে ফরমালিন দিয়ে পাকানো হয়েছে।
রোহান এবার এগিয়ে এসে জোহান কে সরিয়ে জিনিয়ার পাশে বসে পরে। সে একবছর ধরে লাইনে দাড়িয়ে আছে তাকে বিয়ে করার জন্য। আর এই কালকে জন্ম হওয়া ছেলে এসে বলছে তাকে বিয়ে করবে? জোহানের দুবাহু ধরে রোহান বলে —” এই কিউটি একবছর ধরে বুকিং হয়ে আছে। তুমি আসতে লেট করে ফেলেছো বাবু। যাও এখনি গিয়ে ফিডার খাও। ”

ওদের কথার মাঝে এসে হাজির হয় ফিহা’রা।
জারা দেখে জোহান চলে এসেছে। কখন এসেছে কে যানে। কথা বলে কাথা খারাপ করে দিলো না তো আবার সবার?? জোহান এ-র দিকে তাকিয়ে বলে —” কী রে মীরজাফর কখন এসেছিস তুই??”
“জারা তুমি ওকে মীরজাফর বলে ডাকো?? ”
জিজ্ঞেস করলো রোহান ”
“ডাকি, ওর কাজই মীরজাফর এর মতো তাই??
ও কী আপনাদের অনেক বিরক্ত করছে ভাইয়া?? তাহলে কিছু মনে করবেন না ও এরকমই। অনেক চঞ্চল আর একগুঁয়ে। ” বলল জারা।
“রোহান :- একদম ঠিক কথা বলেছো তুমি। এই বেটারি এসে মীরজাফর এর মতো আচরণ করছে আমার সাথে। ”

রোহানের কথায় জারা জোহানের দিকে চোখ গরম করে তাকায়। বোনের এমন চোখ রাঙ্গানো দেখে ভদ্র ছেলের মতো রুমে চলে আসে ব্যাগ নিয়ে।
জারা টেবিলের দিকে তাকিয়ে দেখে তারা এখনো কিচ্ছু ধরেনি। সব এক কী ভাবে আছে । তাই
জারা জিনিয়া কে বলে –” একি আপু তুমি তো কিছু খাওনি। ভাইয়া আপনারা ও তো কিছুই খান’নি এখনো। ”
জাহেদ :- এতো উত্তেজিত হতে হবে না। আমার খাচ্ছি ধীরে ধীরে! ”
জারা___ মিম আর ফিহার দিকে তাকিয়ে বলে –” তোরা থাক এখানে আমি আম্মুর কাছে যাচ্ছি। তাদের কিছু লাগলে এগিয়ে দিস সবকিছু । ”
বালেই চলে যায় রান্না ঘরের দিকে জারা।

উমমম কী দারুণ খেতে পিঠাগুলো। একেবারে তুলোর মতো নরম, মুখে দিলেই মোমের মতো গলে যাচ্ছে রোহান ভাইয়া তা-ই না?? আমি এমন মজার পিঠা কখনো খায়নি। আচ্ছা রোহান ভাইয়া একটা কথা বলার ছিলো তোমার সাথে।একটু তোমার কানটা আমার দিকে আনো তো।
জাহেদ কথা শুনে রোহান ও তার কথা এগিয়ে দিয়ে বলে –” হুমম বল এবার ”
” আচ্ছা রোহান ভাইয়া আমি যদি এখান থেকে একটা পিঠা নিয়ে যাই পকেটে করে তাহলে কী পাপ হবে আমার..?? ”
জাহেদের কথায় রোহানও তাল মিলিয়ে
বলে –” আমারও একই কথা !! পাপ হবে..?? “”
“একটা নিলে বেশি পাপ হবে না। তুমি একটা নাও আমি একটা নেই। বোনের জামাই আর সুম্বন্ধি
মিলে পাপ ভাগ করে নিবো ঠিক আছে.?? ” বললো জাহেদ ”

” আচ্ছা ডিল ফাইনাল ! আগে তুই নেহ পরে আমি নিচ্ছি!! ” বললো রোহান __
জাহেদ যখন পিঠা পকেটে বরে নিবে, তখনই ফিহা দেখে ফেলো। তাই জোহান কে ডাক দিয়ে বলে —“” এই জোহান একটা পলিথিন নিয়া তো ”
ফিহার কথায় জাহেদের হাত কেঁপে ওঠে। যেনো চুরি করতে গিয়ে ধরা পরে গেছে তার এমন অবস্থা। সেতো চুরিই করছি তখন। কিন্তু হটাৎ এই কটকটি পলিথিন আনতে বলছে কেনো??
একটু পর জোহান পলিথিন নিয়ে এসে ফিহার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে ::–” পলিথিন দিয়ে কী করবে আপু তুমি?? ”

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ১৬

” আমি কিছু করব না, তোমার ওই ভাইয়ার লাগবে পলিথিন । জাহেদ কে দেখিয়ে দিয়ে বলে ফিহা। ”
” কেনো? ভাইয়া পলিথিন দিয়ে কী করবে ? ”
” তোমার ভাইয়া বিয়ে বাড়ি মনে করে খাবার চুরি করছিলো। কিন্তু পলিথিন আনতে ভুলে গেছে। ”

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ১৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here