Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ১৮

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ১৮

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ১৮
সোহানা ইসলাম

তোমার এই ভাইয়া বিয়ে বাড়ি মনে করে খাবার চুরি করছিলো। কিন্তু পলিথিন আনতে ভুল গেছে।
শেষ সব মানসম্মান শেষ তার আজকে। ভুল করে কে যে বলেছিলো পিঠা পকেটে নেওয়ার জন্য।
রোহান জাহেদকে ফেঁসে গেছে দেখে ভালো মানুষের মতো বসে আছে। তার থেকে ভালো, ভদ্রলোক আর একটা ও নেই এমন ভাব।

ফিহার কথা মতো জোহান পলিথিন নিয়ে এসে জাহেদ কে দিয়ে বলে —” নাও ভাইয়া তোমার পলিথিন ”
লজ্জায় এখন কচু গাছে গিয়ে গলায় দরি দিতে মন চাচ্ছে জাহেদের। শেষ পর্যন্ত কিনা পিঠা চুরি করতে গিয়ে ধরা খেয়ে। এই জন্যই অভিজ্ঞতা না থাকলে চুরি করতে হয় না। এই রোহান ভাইয়া ও তাকে বাঁচানো চেষ্টা করছে না।এমন একটা সিচুয়েশনে পরতে হবে তা জাহেদ কল্পনা ও করে নি । সব স্বার্থপর। আর এই হয়েছে একটা কটকটি মেয়ে। তুই দেখেছি ভালো কথা চুপ করে থাক না, আমার মানসম্মান ডুবানোর জন্য উঠে পরে লেগেছে। এখন কিছু বলতেও পারবে না সে। বলতে গেলেই চুরের মায়ের বর গলা হয়ে যাবে !!
অসহায় ফেইস নিয়ে একবার সবার দিকে তাকায় জাহেদ। তার দিকে কেমন করে যেনো তাকিয়ে আছে সবাই। কিন্তু জেরিনের দিকে তাকিয়ে দেখে সে পিঠে খাওয়ায় খুব ব্যস্ত। তার ভাই যে এমন একটা পরিস্থিতিতে পরেছে তার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। মনের সুখে পিঠে খাচ্ছে জেরিন। রাগ হচ্ছে এখন তার, তাই জেরিন পিঠেতে কামড় দিতে যাবে এমন জাহেদ তা কেঁড়ে নেয়। সব রাগ এখন জেরিন কে দেখাবে সে।
জেরিন বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে জাহেদের দিকে। সে কতো আয়েশ করে খাচ্ছিলো আর তার ভাই কেঁড়ে নিয়েছে??

” ভাইয়া তুমি আমার পিঠে কেনো নিলে??”
” এমনিতেই তো তোর সামনের দুই দাঁত নেই। আবার পিঠে খাচ্ছিস, পরে সব দাঁত পরে যাবে। ” বললো জাহেদ ”
” আমার দাঁত পরবে না। ”
” পরবে ”
” পরবে না ”
___ এই জাহেদ খান! ওর পিঠে নিচ্ছেন কেনো?? ওরটা ওকে ফিরিয়ে দিন। নিজে চুরি করতে গিয়ে ধরা পরে গেছে এখন অন্য কে খেতে দিবে না??
বললো ফিহা। ”
এমন জোরে জোরে চুর, চুর বলায় আরও লজ্জা পেলো জাহেদ। জীবনে ও এমন লজ্জায় পরে নি সে। ফিহার উচ্চ সুরে চুর বলা শুনে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে আসে জারা আর মারজিয়া বেগম।
” কী হয়েছে? কিসের চুর এর কথা বলছিস ফিহা ” বললেন মারজিয়া বেগম।
জাহেদ এবার ফিহার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টি যেনো বলে দিচ্ছে আমাকে আর লজ্জায় ফেল না। ফিহার ও এখন জাহেদের এমন চাহনি দেখে মায়া হলো। কি সুন্দর বাচ্চাদের মতো করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে যেনো তার চাহনি দিয়ে বলছে, কিছু বলো না। আমাকে এবারের মতো বাঁচা ও।
“কিছু না আন্টি। আমার তো এমনই কথা বলছি লাম। কথা বলার সময় তো কতো কথায় হয় তাই জাহেদ খান। জানতে চাই ফিহা”

জাহেদ ও সাথে সাথে বলে –“” হ্যাঁ…হ্যাঁ! ওই আর কি,, আমার তো এমনিই কথা বলছিলাম আন্টি। ”
” ওহ তাই বলো। আমি তো কি-না, কি ভেবেছিলাম। আচ্ছা তোমার গল্প করো, আমার রান্না করা প্রায় শেষ। একেবারে ডিনার করে তার পর যাবে। ” বললেন মারজিয়া বেগম। —
জিনিয়া এবার তাড়া দিয়ে বলে –“” না… না আন্টি ডিনার করতে পারব না এখন। বড় ভাইয়া একা আছে, চিন্তা করবে আমাদের জন্য। অন্য একদিন এসে ডিনার করো। ”
উমম ওর বড় ভাইয়া যেনো ছোট খোকা। একা একা থাকতে ভয় পাবে। আস্ত শয়তান একটা লোক। আমকে কী নির্লজ্জ বলছে শয়তান লোকটা। আমাকে বখাটে ছেলেদের মতো বিরক্ত করছে। আবার উল্টো পাল্টা নাম ধরে ও ডাকতে শয়তান লোকটা। আমি নাকি হাফ ইঞ্চি মেয়ে?? মেরে নাক ফাটিয়ে দিতে ইচ্ছে করে লোকটার।যতসব শয়তান লোক। মনে মনে কথা গুলো ভাবে জারা।
” আন্টি যখন বলছো তাহলে এই আন্টির আবদার টা রাখবে না তোমরা বাবা ?? ” মন খারাপ করে বলে মারজিয়া বেগম ;
মারজিয়া বেগম এর এমন মাতৃতুল্য আবদার ফেলে দেওয়ার মতো না। কি সুন্দর করে বলছেন তিনি ‘ আমার আবদার টা রাখবে না তোমরা বাবা?? ” মারজিয়া বেগম এর মন রক্ষা করতে রোহান বলে —” আচ্ছা আন্টি মন করবেন না। আমার সবাই ডিনার করেই যাব। ”
মারজিয়া বেগম এবার যেনো মহাখুশি হলেন।

আনন্দে আত্মহা হয়ে বলেন —” তোমার বসে গল্প করো বাবা। আমি তোমাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করছি এখুনি। ” বলেই আবার রান্নাঘরে চলে যান।
জাহেদ একবার ফিহার দিকে তাকায়। ফিহাও জাহেদ এর দিকে তাকিয়ে ছিলো তাই দুজন চোখাচোখি হয়ে যায়। ফিহা তাকিয়ে থাকলেও জাহেদ লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে মুচকি একটা হাসি দেয়। কটকটি মেয়ে তাকে আজ লজ্জায় পরার হাত থেকে বাঁচিয়েছে। কটকটি মেয়ে সবসময় কটকট করলেও মনটা খুব ভালো। তা না হলে আজ তো সে লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতো দি ফিহা বলে দিতো সব।
সবাই একসাথে আড্ডায় মেতে উঠে। এমন ভাবে আড্ডা দিচ্ছে যেনো তাদের কতো দিনের পরিচয়। সবাই ফ্রেন্ডলি আচরণ করছে। হাসাহাসি করছে।
কিন্তু একজনের চোখ বার বার শুধু ফিহার দিকে চলে যাচ্ছে। জাহেদ! জাহেদ ফিহার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে ফিহা কেমন লজ্জা আর অস্থিরতা কাজ করছে। সে ঠিক মতো মনোযোগ দিতে পারছে আড্ডা দিতে। তাই মিম আর জারার সাথে লেপ্টে বসে থাকে। মাঝে মাঝে শুধু হুমম,হ্যাঁ,তাই বলে সায় জানায় সবার কথায়।
তাদের আড্ডার মাঝে রোহানের ফোন বেজে ওঠে। পেন্টের পকেট থেকে মোবাইল টা বের করে দেখে আরমান ফোল করছে। তাই সবাই মাঝখান থেকে একটু সাইডে দাড়িয়ে কল টা রিসিভ করে রোহান।
” হ্যালো দোস্ত বল! ”

“গম্ভীর কন্ঠে আরমান বলে –” কোথায় তোরা?? কয়টা বাজে সে খেলায় আছে তোদের ?? ৮ টা বাজে এখন আর তোরা সেই পাঁচটা দিকে গিয়েছিস। এতক্ষণ কি করছি গাধার দলেরা অচেনা জায়গায় ?? তাড়াতাড়ি ফিরবি আমার বোনদের নিয়ে তোরা দুই গাধা।”
আরমানের কথা শুনে মনে হচ্ছে খুব চিন্তা করছে। চিন্তা করারই বিষয় তারা তো এখানকার স্থানীয় না। এই গ্রামের কিছু চিনে না, যদি কোনো বিপদে পড়ে। বড় ভাই হিসেবে চিন্তা করাটা স্বাভাবিক। কিন্তু রোহান আরমান এর কথা পাওা দেয় না। উল্টো আরমান কে খেপানোর জন্য বলে —” তোর শশুড় বাড়িতে জামাই আদর খাচ্ছি। ”
রোহান এর কথা ঠিক বোঝল না আরমান। তাই আবারও জিজ্ঞেস করে –” মানে…কী বলছিস বোঝতে পারছি না আমি??”
___” মানে এই যে আমার এখন তোর না হওয়া শশুড় বাড়িতে আছি। তোর শাশুড়ী তো ডিনার না করিয়ে ছাড়বে না বলে দিয়েছে। তোর হাফ ইঞ্চি মেয়ে রান্না করছে। পুরোই জামাই আদর করছে তোর শাশুড়ী আমাদের। ”

রোহান এর কথা শুনে তার চিন্তা হওয়ার বদলে রাগ হচ্ছে। তারা এখনো মানজারা ‘ দের বাড়িতে। আবার বলছে তার হাফ ইঞ্চি তাদের জন্য রান্না ও করছে?? রাগে দাঁত হির হির করে বলে–” তুই মানজারার হাতের রান্না খাবি না, তোদের কাউকে খেতে হবে না। এক্ষুনি ফিরে আয় সবাই। ”
আরমান সত্যি রেগে যাচ্ছে দেখে রোহান তাকে শান্ত করার জন্য বলে –” দোস্ত রাগ করিস না প্লিজ। আমরা চলে আসতাম আটও আগেই কিন্তু আন্টি জোর করে বসিয়ে রেখেছে আমাদের। ডিনার করিয়ে তার পর ছাড়বে। সত্যি বলতে তো শাশুড়ী খুব ভালো মনের মানুষ।”
সব কথা বাদ দিয়ে আরমান আগে জিনিস করে –” মানজারা কী সত্যিই রান্না করছে?? ”
সে তাকে বলছে কী আর আরমান তাকে জিজ্ঞেস করছে কী ? ” যানি না ঠিক ! দেখলাম আন্টির সাথে রান্নাঘরে ছিলো অনেকক্ষণ। ”
” ওহহহ! আচ্ছা তাহলে সাবধানে আয় তোরা। বাই ”
আরমান কলটা কেটে দিবে এমন সময় কি মনে করে রোহান বলে —“দোস্ত শুন ! একটা কথা বলি তোকে। ”

” হুম বল ”
___” তুই আজকে আমাকে অনেক বড় একটা উপহার দিলি। সত্যি আমি আজকে অনেক খুশি। তুই জানিস আমার কতো দিনের ইচ্ছে চাঁদ সুন্দরীর সাথে একসাথে হাতে ধরে পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটব। যদিও হাত ধরা হয়নি কিন্তু একসাথে হাঁটতে পেরেছি। দুইজন পাশাপাশি ভাবে। মন টা তখন কি যে শান্তি লাগছিলো তোকে বলে বোঝাতে পারব না আমি। আমি সত্যি চাঁদ সুন্দরী কে অনেক ভালোবাসি দোস্ত। ওকে না পেলে এই জীবনের সব চাওয়া আমার কাছে বৃথা বলে মনে হবে। ”
রোহান এর কথা শুনে আরমান গলা একটা ঝেড়ে বলে –” বড় ভাই হই আমি ভুলে যাস না কিন্তু ”
” হুম যানি। আর এটাও যানি তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড এবং ভাই দুটোই। আচ্ছা আর একটা কথা বলি..?? ”
” হুম বল ”

“জীবনে অনেক মানুষ আসে, যায়… কিন্তু যে কাঁধে চোখ রেখে নির্ভয়ে কান্না করা যায়, সেই মানুষটা হচ্ছে “বন্ধু”। এমন এক সম্পর্ক, যেখানে রক্তের বাঁধন নেই, কিন্তু আত্মার বন্ধন সবচেয়ে গভীর!”
যেমন তোর সাথে আমার সম্পর্কটা। ”
__ রোহান এর এমন হটাৎ করে আবেগি হয়ে কথা বলা টা বিরক্ত কর লাগছে আরমানে কাছে।
মেয়ে মানুষের মতো করে আবেগ নিয়ে কথা বলছে। তাই আরমান বলে –” শা*লা তর আবেগের কথা শোনার টাইম নাই আমার। বে*ডি মানুষের মতো আবেগ মায়ী হয়ে যাচ্ছিস। রাখ শা*লা ফোন। ”
বলে নিজেই ফোন টা কেটে দিলো। রোহান কি বলল তা না শুনেই।
আমার এমন সুন্দর আবেগি প্রসংশা কে শা*লা বলে বিদায় দিয়ে দিলো। এজন্যই কারো প্রশংসা করতে নেই।

ডিনার করা শেষ রোমানদের। এখন তারা বিদায় নিয়ে চলে আসবে নিজেদের গন্তব্যে। আজকের দিনটা ভালোই কেটেছে এখানে আসার পর। জাহেদ অনেক বার চেষ্টা করছে ফিহার সাথে কথা বলে তার ফোন নাম্বার নেওয়ার জন্য। কিন্তু ফিহা জাহেদের সাথে কথা বলার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। এমনটা নয় যে সে জাহেদের সাথে কথা বলতে চায় না কিন্তু ওর কেনো যানি আজ লজ্জা করছে খুব জাহেদের সাথে কথা বলতে।
রোহান ও আজ পাঁচ দিন পর তার চাঁদ সুন্দরীর সাথে টুকটাক কথা বলছে। জিনিয়ার খুব ভালো গেলেছে রোহান তার সাথে কথা বলায় কিন্তু তা প্রকাশ করেনি। রোহানের ছোট ছোট কেয়ার গুলো যেনো আর ও তাকে ভালোবাসাতে বাদ্য করছে। কিন্তু ঐযে অতীত, ভালোবাসা কে আপন করতে দিচ্ছে না। সে কীভাবে ভালোবাসি বলবে রোহান কে? তার শরীরে তো কলঙ্ক গেলে আছে। যা তারা কেউ যানে না শুধু সে আর তার মা ছাড়া।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ১৭

” আচ্ছা আন্টি আসছি তাহলে আজ। আবার অন্য একদিন এসে কিন্তু আপনাকে বিরক্ত করব আপনার হাতের রান্না খাওয়ার জন্য। বললো রোহান ”
“একি বলছো বাবা? বিরক্ত করবে কেনো? তোমাদের যখন ইচ্ছে হয় চলে আসবে এখানে। আমার ও ভালো লাগবে। “বললেন মারজিয়া বেগম ”
” আচ্ছা তাহলে এখন আমার আসি আন্টি” “বললো জিনিয়া”
কি ভাবে যেনো আবার তাদের পিছো ডাকলেন মারজিয়া বেগম।
” তোমার একটু বসো, আমি এক্ষুনি আসছি। ”

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ১৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here