রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩৫
সোহানা ইসলাম
রাত একটা। মিম বেডে শুয়ে আছে। ফোনের আলো নিভে গেছে, কিন্তু বুকের ভেতর আলো জ্বলে আছে—অভিমান আর কান্নার আগুনে। কিছুক্ষণ আগে যে কথাগুলো সে শুনেছে, সেগুলো বারবার কানে বাজছে। গালির শব্দগুলো যেন কেটে কেটে হৃদয়ে বিঁধছে।
বালিশে মুখ গুঁজে কান্না থামাতে পারছে না মিম। চোখের পানি বালিশ ভিজিয়ে দিচ্ছে। মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে তিন মাস আগের গল্প।
তিন মাস আগে…
বিকেল। মিম তার ছোট্ট রুমে বসে ফেসবুক স্ক্রল করছে। নিত্যদিনের মতোই বোরিং ফিড। হঠাৎ একটা নতুন প্রোফাইল চোখে পড়ে। একটা ছেলের আইডি। নামটা সাধারণ, কিন্তু ছবিটা অসাধারণ।
“ও মাই গড! কেমন সুন্দর দেখতে!”
মিমের চোখ আটকে গেল প্রোফাইল পিকচারেই। ছেলে চশমা পরে আছে, শার্টের কলার একটু খোলা, মুখে হালকা হাসি। ছবিটা দেখে বুকের ভেতর যেন কিছু একটার ঝড় বয়ে গেল। ক্রাশ!
কোনো কিছু না ভেবেই প্রোফাইলে ঢুকে পড়ে মিম। টাইমলাইনে যায়। ছবি কম—দুই তিনটা। কোনো পার্সোনাল পোস্ট নাই। কিন্তু ছেলেটার লুক, আভা, অ্যাটিটিউড… মিমের মনে হলো—“এই ছেলেটা স্পেশাল।”
দ্বিধা না করে রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দেয়।কয়েক সেকেন্ড পরেই কনফার্ম। হার্টবিট বেড়ে গেল।
কিছুক্ষন পরই নোটিফিকেশন এর শব্দ—“Hi”
মিমের ঠোঁটের কোণে হাসি।“Hi” রিপ্লাই দিতে দেরি করে না।
প্রথম দিনের কথোপকথন ছোট। কিন্তু মিমের উত্তেজনা আকাশছোঁয়া। কয়েকদিনের মধ্যে চ্যাট জমে ওঠে। মিম খেয়াল করে, ছেলেটা খুব ভদ্র, মিষ্টি, কেয়ারিং। ছেলেটার নাম—” রাশেদ রাজ ।”
রাশেদ কখনোই মিমের কাছে ছবি চায় না। বরং বলে,__“তোমার ভেতরের মানুষটাই তো আসল। ছবি দিয়ে কি হবে?”
এই একটা লাইনেই মিমের মন জয় করে ফেলে ছেলেটা।দিন যায়। রাত যায়। কথার ভেতর থেকে জন্ম নেয় ভালো লাগা, আর সেখান থেকে ভালোবাসা। মিম প্রতিদিন কল্পনা করে—রিহানকে একদিন সামনাসামনি দেখবে। কেমন হবে মুহূর্তটা! ফোনে কথা হয় ঘন্টার পর ঘন্টা। ভিডিও কলের প্রসঙ্গ উঠলেও রিহান এড়িয়ে যায়। মিম ভাবে—“হয়তো ছেলেটা ইন্ট্রোভার্ট।”
সব ঠিকই চলছিলো। আজকের দিনটা পর্যন্ত।
আজ ফিহা আর জারার ভালোবাসার প্রকাশ এর বিষয় টা তার মনে ও আকাঙ্খার সৃষ্টি করে। রাশেদ কে রাগানোর জন্য মিম ফেসবুকে একটা স্টোরি দেয়। স্টোরিতে “ একজন ছেলের কাঁধে মাথা দিয়ে আছে মেয়ে, যার মুখে স্টিকার লাগানো? এবং কেপশন এ লেখা — সব শেষে আমারও পূর্ণতা। ”
সাথে একটা স্যাড ইমোজি।মিমের কাছে এটা স্রেফ একটা স্যাড কিউট পোস্ট এবং মজার বিষয় ছিল। কিন্তু রাশেদের কাছে না। সে যেহেতু মিম কে কখনো দেখেনি তাই স্টোরি টা দেখে মনে করে এটা মিম। এবং তাকে সে ঠকিয়েছে।
পাঁচ মিনিটের মধ্যে রিহানের কল।মিম রিসিভ করতেই শোনে রাগী গলা—
___“তুই কি পাগল নাকি, মিম? ওই পোস্ট কিসের জন্য? কার জন্য ওই লাইন লিখছিস? আর.. আর ওই ছেলেটাই বা কে? ”
___“কী? আরে, কারও জন্য না… স্রেফ ফান।”
___“ফান? তোর মায়ের গুষ্টির ফান! আগে বল ওই ছেলেটা কে?তুই কি ভাবছিস আমি বোকার মতো বসে আছি?”
মিম হতভম্ব।__“এইভাবে কথা বলছো কেন?”
রিহানের গলা আরো চড়লো—
“তোর লজ্জা নাই? অন্য কারও কাঁধের মাথা রেখে পূর্ণতা লিখে পোস্ট করছিস। আর এখন বলছি এসব ফান? আমি না তোকে ভালোবাসি, আমার সাথে তোর সম্পর্ক আছে? তুই হারামজাদি! আমি ভাবতাম তুই অন্যরকম। আসলে তুইও একটা স্লাট।”
মিমের বুক কেঁপে উঠলো।
___“কি বলছো এসব? আমি তো—”
___“চুপ কর! মাগী, মুখ বন্ধ কর। তুই না আমার সাথে প্রতারণা করে, এখন আমার সামনে নিজের নাগর নিয়ে পোস্ট করছিস ? অন্য কারও জন্য হাবি জাবি লিখছিস। তোর চো*দন*মারা*নি অ্যাটিটিউড আমি সহ্য করব না।”
মিম স্তব্ধ। কান্না চলে আসে। এইটুকু বিষয় এর জন্য এতো কিছু হয়ে যাবে সে কল্পনা ও করে নি। সে তো জাস্ট রাশেদ কে জেলাসি ফিল করানোর জন্য এই ফেক পোস্ট টা করেছে।
__“প্লিজ, গালি দিও না…”
___“গালি দিব না? তুই যা করছিস সেটা গালি খাওয়ার যোগ্য! তোর মতো মেয়েরা সবাই বেশ্যা। অন্যের সাথে চ্যাট করিস, প্রেম করিস? ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এখন অন্য নাগর নিয়ে পোস্ট করছিস। ভাগ মাগী, তোর চোদন মার।”
মিম কাঁদছে। গলা আটকে আসছে।
__“রাশেদ, আমি কসম খাই, আমি কিছু করি নাই…”
___“তোর কসম তোর গাঁড়ে ঢুকুক। আমার চোখে ধুলো দিতে আসিস না। তোর মতো মাগী রাস্তায় অনেক দেখি। ব্লক করছি তোকে। আর জীবনে কল দিবি না।”
কল কেটে গেল।
মিম ফোনটা হাতে নিয়ে বসে থাকে। হঠাৎ তার শরীর কাঁপতে শুরু করে। বুকের ভেতর একরাশ কষ্ট জমে আছে। রাশেদ, যে ছিল তার সবকিছু, সে আজ গালির বন্যায় ভাসিয়ে দিল।
___“এত ভালোবাসার পরেও, সে আমাকে বিশ্বাস করলো না…”
মিম বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। তার মনের ভেতর একটাই প্রশ্ন—
“ভালোবাসা যদি এতো নোংরা সন্দেহে ভরা হয়, তবে এর মানে কি?”
রাত বাড়তে থাকে। কান্নার শব্দ থেমে থেমে শোনা যায়। মিমের চোখের পানি ফুরোয় না।
দুপুরের রোদটা ঠিক ক্যান্টিনের জানালা দিয়ে এসে পড়েছে। টেবিলের ওপরে রাখা কোল্ড কফির গ্লাসে আলোর ঝিলিক খেলছে। কলেজের ভিড়ভাট্টার মাঝে তিন বান্ধবী—মিম, ফিহা আর জারা—সবচেয়ে কোণের টেবিলে বসে আছে।
ফিহা মুখ গম্ভীর করে মিমের দিকে তাকালো। কিছুদিন ধরে ওর মনে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। মিমের মধ্যে স্পষ্ট একটা পরিবর্তন এসেছে। একসময় হাসিখুশি মিম এখন চুপচাপ থাকে, ক্লাসে ঠিকমতো মনোযোগ দেয় না।
ফিহা ধীরে জিজ্ঞেস করলো:
____“মিম, কিছু বলবি? এতদিন ধরে তোকে দেখছি… তুই আগের মতো নেই।”
জারা পাশ থেকে ঠোঁট কামড়ে তাকালো মিমের দিকে।
____“সত্যি বল মিম, তোর কিছু হয়েছে? আমাদের কাছে কিছু লুকাচ্ছিস?”
মিম চুপ। হাতের কফি গ্লাসটা নাড়াচাড়া করতে লাগলো। চোখের দৃষ্টি নামানো।
ফিহা___“দেখ মিম, আমরা তোকে এতদিনের বন্ধু। যদি কিছু থাকে, শেয়ার কর। তুই চুপ করে থাকলে আমাদের আরও চিন্তা হয়।”
জারা এবার একটু রাগী সুরে বললো—
___“তোর চুপ থাকার মানে কী? কিছু না হলে তুই এমন পাল্টে গেলি কিভাবে? একসময় তুই ছিলি ক্লাসের সবচেয়ে হাসিখুশি মেয়ে। এখন তোকে দেখে মনে হয় সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।”
এই কথাগুলো শুনে মিমের বুকের ভেতর হঠাৎ চাপা কান্নার ঢেউ ওঠে। গলা শুকিয়ে গেছে। কীভাবে শুরু করবে বুঝতে পারছে না।
মিম ধীরে ফিসফিস করে বললো:
___“আমি… আমি একজনকে ভালোবেসেছিলাম।”
ফিহা আর জারা একসাথে অবাক হয়ে বললো:
___“কি?”
জারার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
___“তুই আমাদের না বলে প্রেম করছিলি?”
মিম চোখ নামিয়ে নিল। মুখে কোনো জবাব নেই। শুধু বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠছে।
ফিহা___“আরে, মিম! সিরিয়াসলি? আমাদের বললি না? কার সাথে?”
মিমের চোখের কোণে পানি চলে এসেছে। গলা কাঁপছে। অবশেষে সব বেরিয়ে এলো।
“তিন মাস আগে… ফেসবুকে এক ছেলেকে চিনেছিলাম। রাশেদ রাজ নাম। খুব ভালো লাগত আমার। প্রতিদিন কথা হতো… দিন রাত ফোনে কথা। আমি ভেবেছিলাম ও-ই আমার সব।”
কথা বলতে বলতে মিমের চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি ঝরছে। টেবিলে হাত মুঠো করে রেখেছে।
ফিহা__“তারপর?”
মিম___“তারপর হঠাৎ একদিন আমি একটা পোস্ট দিলাম। স্রেফ ফান করেছিলাম। ফেক ছবি দিয়ে পূর্ণতা লিখেছিলাম জেলাস করানোর জন্য । কিন্তু ও সেটা দেখে পাগল হয়ে গেল। বলল আমি নাকি অন্য কারকে পেয়ে গেছি, তাকে ঠকিয়েছি। তারপর গালি দিল… খারাপ খারাপ কথা। আর বলল ব্লক করে দেবে।”
মিম আর ধরে রাখতে পারলো না। মুখে হাত দিয়ে কাঁদতে লাগলো।
ফিহা আর জারা একে অপরের দিকে তাকালো। জারার মুখ গরম হয়ে উঠেছে রাগে।
জারা টেবিলে হাত চাপড় দিয়ে বললো:
___“কি সাহস ওই ছেলের! তোকে গালি দিল? তোকে সন্দেহ করল? আর তুই কাঁদছিস?”
মিম কান্নার ফাঁকে বললো__“আমি তো ওকে সত্যি ভালোবাসতাম, জারা… আমি কিছু ভুল করিনি।”
ফিহা এবার একটু শান্ত গলায় বললো—” শোন মিম, যে ছেলে তোকে বিশ্বাস করতে পারে না, যে তোর চরিত্র নিয়ে বাজে কথা বলে, সে কোনোদিন তোর সুখের কারণ হতে পারে না। তুই কি ভাবছিস, এই ছেলেকে ছাড়া তোর জীবন থেমে যাবে?”
মিম মাথা নাড়লো। চোখের পানি এখনো গড়িয়ে পড়ছে।
জারা এবার চেয়ারে হেলান দিয়ে গভীর শ্বাস নিল। তারপর মিমের কাঁধে হাত রেখে বললো—
“দেখ মিম, আমি রাগ করছি কারণ তুই আমাদের বলিস নাই। আমরা তোকে কখনো জাজ করতাম না। তোর দুঃখের সময় পাশে থাকতাম। তুই একা কষ্ট পেয়েছিস… এটা আমাকে কষ্ট দিচ্ছে।”
মিম ফিসফিস করে বললো—“আমি ভয় পেয়েছিলাম… তোরা হয়তো আমাকে বুঝবি তাই ।”
ফিহা হেসে মাথা নাড়লো—“আমরা তোর বেস্ট ফ্রেন্ড। তুই ভুল করলে বকবো, আবার তোকে আগলে রাখবোও। কিন্তু ওই ছেলেটার মতো তোকে গালি দিব না।”
জারা এবার গলা শক্ত করে বললো—“ওই ছেলের নাম আবার কখনো মুখে আনবি না। তোকে ওর মতো কাউকে মানায় না। তুই অনেক ভালো মেয়ে মিম।”
মিম হালকা একটা হাসি দিল, কান্নার মাঝে। সেই হাসিটা অনেক কষ্টের।
“তোরা আছিস , এটাই বড় জিনিস।”
ফিহা মিমের হাত ধরে বললো—“আমরা থাকবো সবসময়। প্রেম ভেঙেছে তো কি হয়েছে? জীবন তো এখানেই শেষ না। সামনে তোকে আরও সুন্দর কিছু অপেক্ষা করছে।”
জারা মুচকি হেসে বললো—“আর হ্যাঁ, পরেরবার যদি প্রেম করিস, আগে আমাদের ইনফরমেশন দিবি। আমরা দেখে নেবো ছেলেটা ঠিক আছে কিনা।”
তিনজন একসাথে হেসে উঠলো। হাসিটা হয়তো অল্প, কিন্তু সেই হাসিতেই অনেক শান্তি লুকিয়ে আছে।
ক্যান্টিনের ভিড় ধীরে ধীরে কমে আসছে। বিকেলের আলো মিলিয়ে যাচ্ছে। তিন বান্ধবী চুপচাপ বসে থাকে কিছুক্ষণ, একে অপরের হাত ধরে। তাদের এই বন্ধুত্বই এখন মিমের শক্তি।
দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। কলেজ গেটের বাইরে ভিড় কমে এসেছে। জারা’রা ধীরে ধীরে গেটের দিকে হেঁটে আসছে। হাওয়ায় মাথায় থাকা হিজাব টা বাতাসে উড়ছে, রোদ হালকা নরম হয়ে গেছে। তার চোখে একটু ক্লান্তি, কিন্তু মুখে সেই চিরচেনা শান্তভাব।
ঘাট পার হয়ে এসে হঠাৎ থেমে গেল সে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরমান। শার্টের হাতা গুটানো, সানগ্লাস চোখে, ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি। হাতে হেলমেট। যেন এই মুহূর্তটার জন্যই অপেক্ষা করছিল।
জারার বুকের ভেতর ধক করে উঠলো। “ওনি এখানে কেন?”গাল গরম হয়ে গেল লজ্জায়। মাথা নিচু করে হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু ঠিক তখনই শোনলো সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর—
আরমান ধীরে বলে__“ মানজারা।”
শব্দটা যেন বুকের ভেতর ঢেউ তুললো। জারা থেমে গেল। গলা শুকিয়ে গেছে।
__“জি…?”
আরমান ঠোঁটের কোণে হাসি রেখে এগিয়ে এল।
__“আমাকে এখনও এতো লজ্জা পাচ্ছেন আপনি? কাল রাতে কি যেন বলেছিলেন? ”
জারা লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেললো। মিম আর ফিহা পেছন থেকে এসে দাঁড়ালো। তারা চোখে চোখ মিলিয়ে এক অদ্ভুত দৃষ্টি বিনিময় করলো—আরমান ভাইয়া এখানে?
আরমান মিম আর ফিহার দিকে তাকিয়ে বললো:
“তোমরা বাড়ি চলে যাও?আমি ওকে নিয়ে যাচ্ছি।”
দুজন কিছু বলার আগেই আরমান আবার জারার দিকে তাকালো।
__“তুমি আমার সাথে যাবে? কোনো বাহানাবাজি করবে না? ।”
জারা হকচকিয়ে গেল।
__“কেন?”
আরমান হালকা হাসি দিয়ে বলে
___“জরুরি কথা আছে। যা বড়া ঘাটের
সামনে বলা যায় না।”
মিম ফিহার মুখে কৌতূহলের ঝিলিক।
ফিহা ফিসফিস করে বলে
“জানু , যা- না… আমরা চলে যাচ্ছি।”
জারা লজ্জায় কাঁপছে। মাথা নিচু করে ধীরে বললো—“ঠিক আছে। ”
দুপুরের আলো নদীর জলে ঝিলমিল করছে। বাতাসে ঠান্ডা ছোঁয়া, দূরে পাখির ডাক। চারপাশে নিস্তব্ধতা। শুধু দুজন মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ।
আরমান ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে বলে
___“তুমি জানো, এই মুহূর্তটার জন্য আমি কতদিন ধরে অপেক্ষা করেছি?”
জারা অবাক হয়ে তাকালো।
__“কেন?”
আরমান চুপচাপ কয়েক সেকেন্ড ওর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলে
___“কারণ তোমার চোখে তাকানোর ইচ্ছে আমার প্রতিদিন ছিল। কিন্তু স্ক্রিনের ও পারে থেকে সেটা সম্ভব ছিল না।”
জারার গাল গরম হয়ে গেল। মাথা নামিয়ে ফিসফিস করে বলে—“এভাবে বলবেন না…”
আরমান হেসে বলে
“কেন? লজ্জা পাচ্ছো পাখি?”
জারা চুপ করে নদীর দিকে তাকালো। বাতাসে চুল উড়ছে। আরমান ধীরে ওর কাছে এসলে উড়ে যাওয়া হিজাব টা এসে ওর মুখে বারি খায়।জারার বুক ধক করে উঠলো। চোখে চোখ পড়তেই শ্বাস আটকে গেল।
আরমান ফিসফিস করে বলে
___”আমি যদি বলি আজ তোমাকে দেখে আমার মনে হচ্ছে, তোমাকে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ?”
জারা কিছু বললো না। শুধু ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি খেলে গেল। কিন্তু আরমান তা দেখতে পেল না। কারণ জারা’র মুখে মাক্স লাগানো।
আরমান হঠাৎ গম্ভীর গলায় বলে
___“তুমি আমার সামনে আসলে এই বা*লের মাক্স পরে থকবে না ? এটার জন্য তোমায় মন বরে দেখতে পারি না। ”
বলেই এক টান দিয়ে জারা’র মুখের মাক্স টা খোলে ফেলে আরমান। আরমান ঘোর লাগানোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জারা’র দিকে।
জারা মুখ ফিরিয়ে নিচু গলায় বলে
___“এভাবে তাকাবেন না…”
আরমান ফিসফিস করে বলে
___“তুমি না বললেও আমি তাকাবো। কারণ তোমার চোখে যে গল্প আছে, সেটা আমি প্রতিদিন পড়তে চাই।”
জারা এবার ধীরে বলে
___“আপনি.. আপনি.. একটা শয়তান লোক ।”
আরমান হেসে জবাব দিল
__“আমি শয়তান লোক? হ্যাঁ ঠিক, কিন্তু তোমার।আর এটা নতুন ফিলিংস। যেটা আমি শুধু তোমার জন্যই অনুভব করছি।”
একটু নীরবতা। নদীর ঢেউয়ের শব্দ কানে বাজছে। হঠাৎ আরমান ওর হাতের দিকে তাকিয়ে বললো—“তোমার হাতের আঙুলগুলো এত ছোট্ট কেন? ধরে রাখতে ইচ্ছে করছে।”
জারার বুক ধক করে উঠলো। সে তাড়াতাড়ি হাত গুটিয়ে নিল।
___“না… এভাবে বলবেন না।”
আরমান মুচকি হেসে ধীরে বলে
—“আমি বলবো, কারণ আমি চাই তুমি জানো, তোমাকে ছাড়া আমি এক মুহূর্তও ভাবতে পারি না।”
জারার চোখ ভিজে উঠলো অজানা আবেগে। গলার স্বর কাঁপলো—
“এত তাড়াতাড়ি এসব বলবেন না।”
আরমান ওর দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললো
___“রিলেশনশিপ নতুন হতে পারে, কিন্তু ফিলিংস পুরনো। যেদিন তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম, সেদিন থেকেই আমি তোমার।”
জারার ঠোঁট কাঁপলো। মুখে কোনো শব্দ নেই। শুধু বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
আরমান নরম গলায় বলে
__“তুমি এমন চুপ করে আছো কেন?”
জারা হালকা চমকে উঠলো।
__“কিছু না…”
আরমান মুচকি হেসে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। জারার চোখে চোখ রাখলো কয়েক সেকেন্ড। হঠাৎ ওর হাতটা নিজের হাতে নিয়ে নিলো।
জারা চমকে উঠে ফিসফিস করে বলে—
___“আপনি… আপনি কী করছেন? হাত ছাড়ুন।”
আরমান শান্ত গলায় বলে—
___“কেন ছাড়বো? আমি কি অপরিচিত কেউ?”
জারা লজ্জায় কাঁপছে। চারপাশে কেউ নেই, কিন্তু তার বুক ধুকপুক করছে।
___“দেখুন… এভাবে ঠিক না।”
আরমানের চোখ গাঢ় হয়ে উঠলো। গলায় গম্ভীর স্বর—“ঠিক না মানে? তুমি আমার… আর আমি তোমার। তোমার হাত আমি ধরবে না?”
জারা ভয় আর লজ্জায় কেঁপে উঠলো।
___“আপনি রাগ করবেন না…”
আরমান এগিয়ে এসে জারার কাঁধ নিজের কাছে টেনে নিলো। তার বুকের সাথে জারার গা ছুঁই ছুঁই। শ্বাসের উষ্ণতা জারার গালে লাগছে। সে চোখ বন্ধ করে ফেললো।
আরমান ফিসফিস করে বলে—
___“তুমি যদি আমার থেকে দূরে যাওয়ার চেষ্টা করো, আমি সহ্য করবো না। আমি তোমাকে চেয়েছি… আর এখন পেয়েছি। বুঝেছো?”
জারার ঠোঁট কাঁপছে।
____“আপনি না… এভাবে বলবেন না।”
আরমান হালকা হেসে জারার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে—
___“তাহলে কীভাবে বলবো? আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না—এটা সত্যি কথা।”
জারা চোখ মেললো না। বুকের ভেতর ঝড়। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।
___“দেখুন… কেউ দেখে ফেলবে।”
আরমান ধীরে বলে___“দেখুক। আমি ভয় পাই না। আমি শুধু চাই তুমি আমাকে ভয় পেও না।”
হঠাৎ বাতাসে জারার হিজাব উড়ে গিয়ে আরমানের গায়ে এসে লাগে । আরমান সেটা হাতে নিয়ে হাসলো।
___“দেখলে? বাতাসও চায় তুমি আমার কাছে থাকো।”
জারা কিছু বললো না। শুধু চোখের কোণে হালকা জল জমে উঠলো।
আরমান এবার নরম গলায় বললো:
“রাগ দেখানোর জন্য না… আমি তোমাকে কাছে টানছি কারণ আমি চাই তুমি জানো, তোমার ওপর আমার অধিকার আছে। তেমায় আমার ঘরনী বানাতে চাই? ”
জারা মাথা নিচু করে খুব আস্তে বললো—“কিন্তু… আমি তো আপনারই ।”
আরমান হঠাৎ থেমে গেল। তার চোখ নরম হয়ে এলো। ধীরে ধীরে ওর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো।
___“কী বললে? কথাটা আবার বলো।”
জারা লজ্জায় চোখ বন্ধ করলো। তার ঠোঁটে কাঁপুনি।
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩৪
___“আমি… আমি শুধু আপনার।”
আরমান হেসে ফিসফিস করে বলে
___“এটাই শুনতে চেয়েছিলাম জান। খুব ভালোবাসি তোমায় ।” বলেই জারা’র কপালে ঠোঁটের স্পর্শ এঁকে দেয় আরমান।
চারপাশে তখন শুধু নদীর ঢেউয়ের শব্দ… আর দুটো হৃদয়ের ধকধকানি।
