রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৮
সোহানা ইসলাম
ভোরের আলো আস্তে আস্তে জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকছে। হালকা হাওয়া পর্দাকে দুলিয়ে দিচ্ছে, আর সেই ভোরের নীরবতায় দাঁড়িয়ে আছে দুজন মানুষ—একজন মায়ের মতো স্থির, অন্যজন ছেলের মতো দৃঢ়।
জেসমিন বেগম দাঁড়িয়ে আছেন রোহানের সামনে। কণ্ঠে এক অদ্ভুত কাঁপন নিয়ে বললেন—
— “তুমি কি জিনিয়ার অতীত জানো রোহান?”
কথাটুকু বলার সময় তার গলা যেনো শুকিয়ে এলো। চোখে ভয়ের রেখা, বুকের ভেতর চাপা কষ্ট। এ কথাগুলো তিনি কারো সামনে কোনোদিন বলতে পারেননি। নিজের মেয়েকেও বারবার আড়াল করেছেন সমাজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থেকে। অথচ আজ হঠাৎ করে রোহানের সামনে সত্যটা উঁকি দিলো কীভাবে?
রোহান সামান্য হাসলো। চোখে ঝলক দপ করে উঠলো আত্মবিশ্বাসের।
— “হ্যাঁ, আমি সব জানি।”
এই উত্তর শুনে জেসমিন বেগম যেনো জমে গেলেন। কীভাবে জানলো সে? কে বললো? তিনি তো কারো সাথে কোনোদিন শেয়ার করেননি। তাহলে কি মেয়ের অতীত কারো অজানা রইলো না? বুকের ভেতরটা ধক ধক করে উঠলো তার।
রোহান তবুও শান্ত স্বরে বললো—
— “আমার জিনিয়ার অতীত নিয়ে কোনো সমস্যা নেই, আন্টি। আমি ওকে মন থেকে চাই। আমি ওকে ভালোবাসি। ওর অতীতকে আমি ঘৃণা করি, কিন্তু ওকে নয়। আমার কাছে অতীত কোনো বাঁধা নয়।”
কথাগুলো যেনো জেসমিন বেগমের কানে আশীর্বাদের মতো শোনালো। তবুও মায়ের বুক সবসময়ই ভয় পায়। তাই একটুখানি কাঁপন জমলো তার গলায়।
ঠিক তখনই রোহান থেমে গেলো। তার চোখে গম্ভীর ছায়া নেমে এলো। কণ্ঠস্বর থেমে যাওয়ায় জেসমিন বেগমের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠলো।
— “কিন্তু…।”
শব্দটা শুনেই জেসমিন বেগম ভড়কে গেলেন। ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে বললেন—
— “কিন্তু কী রোহান?”
রোহান এবার গভীরভাবে তার চোখের দিকে তাকালো। শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললো—
— “আমার একটা অনুরোধ রাখবেন আন্টি।”
জেসমিন বেগম বিস্মিত হলেন।
— “কী অনুরোধ ?”
রোহান ধীরে ধীরে মাথা নুইয়ে বললো—
— “ আমি আপনাকে মা বলে ডাকতে চাই । দিবেন কি সেই অধিকার।”
শব্দগুলো শোনার সাথে সাথে জেসমিন বেগমের বুক কেঁপে উঠলো। এতোদিনে অনেক কথা শুনেছেন তিনি, অনেক প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন। কিন্তু এই কথা—এই আবদার—তার হৃদয়ের গভীরতম স্থানে গিয়ে আঘাত করলো।
তার চোখে জল চলে এলো। বুকের ভেতর যেনো এক ঝড় বয়ে গেলো। তিনি তাকিয়ে রইলেন রোহানের দিকে—যে ছেলেটা তার মেয়েকে বিয়ে করতে চাইছে, সেই একই ছেলেটা আজ তাকে “মা” বলে ডাকবার অনুমতি চাইছে। কত মমতায় ভরা, কত আদরে ভেজা অনুরোধ এটা!
জেসমিন বেগম হঠাৎ আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তিনি রোহানকে নিজের বুকে টেনে নিলেন। যেনো নিজেরই সন্তানকে জড়িয়ে ধরেছেন। চোখ থেকে টুপ টুপ করে জল ঝরে পড়ছে।
— “হ্যাঁ বাবা, ডাকবে তো আমাকে । কিন্তু জিনিয়া, জাহেদের মতো আম্মু বলে। তুমি আমার ছেলের মতোই।আমার আর একটা ছেলে।”
মা ‘ মরা ছেলেটা যেনো হাতে চাদঁ ধরার মতো কিছু পেয়ে গেছে। মন বরে মা বলে ডাকতে পারবে এখন থেকে। তাকে বাবা বলে আদুরে কন্ঠে ডাকবে।রোহান মৃদু হাসলো, বুকের গভীর থেকে উঠে এলো সেই শব্দ—
— “আম্মু ”
সেই এক শব্দেই ঘর ভরে গেলো আবেগে। যেনো ভোরের আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, হাওয়ায় মিশে গেলো নতুন এক সম্পর্কের সুবাস।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। রোহান হঠাৎ সিরিয়াস হয়ে গেলো। চোখে ভেসে উঠলো অন্য রকম দৃঢ়তা।
— “আম্মু, আমার আরও একটা শর্ত আছে।”
জেসমিন বেগম বিস্মিত চোখে তাকালেন। এবার কণ্ঠে হালকা হাসির ছোঁয়া নিয়ে বললেন—
— “শর্ত? আচ্ছা বলো, কী শর্ত?”
রোহান লাজুক ভঙ্গিতে মাথা চুলকালো। ঠোঁটে ছেলেমানুষি হাসি।
— “আমার বিয়েটা তাড়াতাড়ি দিয়ে দেবেন, আম্মু।”
শর্তটা শোনামাত্রই জেসমিন বেগম হেসে উঠলেন। হেসে চোখের জলও মুছে ফেললেন।
— “পাগল ছেলে! লজ্জা করে না? মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে বিয়ের কথা বলছো?”
রোহান মুখ গম্ভীর করে বললো—
— “লজ্জা কিসের, আম্মু? আমি তো আপনাকেই বলছি। কেন, মা কি দেখে না তার ছেলের বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে?”
এইবার জেসমিন বেগম হেসে ফেললেন প্রাণ খুলে। হাসির শব্দ ভোরের নীরবতাকে ভেঙে দিলো।
— “হ্যাঁ হ্যাঁ, দেখছি তো আমি। আমার ছেলে তো একেবারে বুড়ো হয়ে যাচ্ছে!”
রোহান মুখ ফোলালো শিশুর মতো।
— “আম্মু, মজা করছেন আবার। আমি সিরিয়াস বলছি। তাড়াতাড়ি দিয়ে দিন আপনার মেয়েকে। আমি নতুন করে ঘর সাজাবো, সেই ঘরের সব থেকে মূল্যবান সুঁপিস হবে আমার চাঁদ সুন্দরী। পুতুলের মতো আগলে রাখবো তাকে।”
কথাগুলো এতোটাই আন্তরিক ছিলো যে, জেসমিন বেগম মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন রোহানের দিকে। তার ভেতর থেকে নিঃশ্বাস ফেলতে হলো গভীরভাবে। তিনি জানেন, এই ছেলেটাই তার মেয়ের প্রকৃত আশ্রয়।
মায়ের বুক সবসময় সন্তান চায়—নিজের হোক বা অন্যের। রোহানের কথাগুলো যেনো মায়ের বুকের প্রতিটি তারে বাজতে লাগলো।
তিনি আবারও হাসলেন, মমতায় ভেজা চোখে বললেন—
— “আচ্ছা বাবা, তোর শর্ত মানা হবে। আমি তাড়াতাড়ি তোদের বিয়ে দেবো।”
রোহান আনন্দে হাসলো। তার চোখে ঝলমল করছে সুখের আলো। সে মায়ের হাত ধরে বললো
— “ধন্যবাদ আম্মু। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আপনার মেয়েকে চোখের পানি ফেলতে দেবো না।”
জেসমিন বেগমের চোখ আবার ভিজে উঠলো। তিনি জানেন, এই ছেলেটার হৃদয় সত্যিই নির্মল। এই ছেলেটার হাতেই তার মেয়ে নিরাপদ থাকবে।
সকাল আটটা বাজে।গ্রামের সকাল মানেই পাখির ডাকে ঘুম ভাঙা, উঠোনে গরুর বাঁধন খোলা, কারও রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া উড়ছে, কারও উঠোনে শিউলি কুড়োনো চলছে। কিন্তু জারাদের বাড়িতে আজ সেই সকালের আমেজ নেই। প্রতিটি কোণে টানটান দুশ্চিন্তার ছায়া।
মাঝঘরে কাঠের খাটে শুয়ে আছে জিনিয়া। সাদা চাদরের ওপর তার শরীর যেন একরাশ ভঙ্গুর কাগজের মতো ভেঙে পড়েছে। চোখদুটো লাল, ঠোঁট শুকিয়ে ফেটে গেছে। কপালে ভেজা চুল লেপ্টে আছে ঘামে। যেন আগুনে ঝলসে যাচ্ছে সারাটা শরীর। জ্বরের তাপ তাকে একেবারে নিস্তেজ করে দিয়েছে।
মারজিয়া বেগম মেয়ের মাথার কাছে বসে আছেন। বারবার ভেজা কাপড় ডুবিয়ে এনে কপালে চাপাচ্ছেন। ঠোঁট কামড়ে জল আটকে রাখছেন, যেন চোখের জল বের না হয়। নিজের মেয়ে না হলোও তিনি নিজের মেয়েই মনে করেন জিনিয়াকে। সব সন্তান তো মায়ের কাছে সমানই। কিন্তু তার মায়ের চোখে সেই আড়াল লুকোয় না—ভয়, উৎকণ্ঠা, বুক ভেঙে যাওয়া যন্ত্রণা।
পাশে বসে আছে জারা। ওর হাত নিজের দুই হাতের ভেতর ঢুকিয়ে রেখেছে। যেন হাতের উষ্ণতায় অসুখটাকে গলিয়ে দিতে চায়। জারা ফিসফিস করে বলল,
—” আপু, তুমি শুনতে পাচ্ছো তো?এখন কেমন লাগছে তোমার? ”
কিন্তু জিনিয়া কিছু বলল না। ঠোঁট শুধু একবার কেঁপে উঠল। চোখ বন্ধ রেখেই সে হয়তো কারও নাম মনে মনে উচ্চারণ করছে।
ঘরের এক কোণে বসে আছে ছোট ভাই জোহান। বয়সে ছোট হলেও মনের দিক থেকে সংবেদনশীল। আজ তাকে চুপচাপ থাকতে দেখা যাচ্ছে। তার গাল ভিজে আছে, চোখ দুটো লাল। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে জিনিয়ার হাত ছুঁয়ে বলল,
—” আমার কিউটি গার্লটা কেনো এভাবে শুয়ে আছে? আপু, তুমি উঠো না… আমি তোমাকে সাইকেল চালাতে নিয়ে যাবো, মেলায় ঘুরতে নিয়ে যাবো…চকলেট দিবো তোমাকে। ”
কথাগুলো শেষ করতে না করতেই ওর গলা ধরে এলো। জোহান মুখ ঘুরিয়ে নিল, যেন কান্না লুকোতে চায়।
জারা তখন বোঝে—এই জ্বর কেবল শরীরের অসুখ নয়। এটা মনের অসুখ। সারারাত কান্না করেছে জিনিয়া। বুকের ভেতরে জমা কষ্ট শরীর ভেঙে দিয়েছে। আর সেই কষ্টের নামটা জারা জানে—রোহান।
ঠিক তখন রান্নাঘর থেকে ভেসে এল হাঁড়ির শব্দ। ভাত ফোটার গন্ধ, আলু সেদ্ধ হওয়ার গন্ধ মিশে আসছে বাতাসে। সেখানে মিম আর ফিহা ব্যস্ত। তারা কলেজ বাদ দিয়ে ছুটে এসেছে। আশা করেছিল, আজকের সকালটা হাসি-ঠাট্টায় ভরবে। অথচ সকালটা নেমে এসেছে দুঃখের আবছায়া হয়ে।
মিম আলুর খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে বলল,
— “কেমন হলো, কলেজ বন্ধ করে এলাম… এখন দেখি আপুর এই অবস্থা।”
ফিহা নিঃশ্বাস ফেলে চুপ করে যায়। শুধু মৃদু কণ্ঠে দোয়া পড়তে থাকে।জারা মায়ের কাছ থেকে উঠে এসে মিম আর ফিহার সাথে হাতে হাতে কাজ করতে থাকে। গ্রামের মেয়ে তো সব কাজই পারে।
আরমান ফ্রেশ হয়ে বেরিয়েছে ওয়াশরুম থেকে। চুল থেকে এখনো জল গড়িয়ে পড়ছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে আছে সে। তার চোখেমুখে সেই আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি।
কিছুক্ষণ পর ফোনে রিং বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল—“লক্ষী বউ”। ঠোঁটে মিষ্টি হাসি ফুটল আরমানের। কল রিসিভ করে মজা করে বলল,
— ” কী বউ, আমায় মিস করছো নাকি?”
কিন্তু ওপাশের কণ্ঠ শুনেই হাসিটা মিলিয়ে গেল। জারার গলা কাঁপছে, আতঙ্কে ভরা।
—” আ..আপনি কোথায়? ”
আরমানের কপালে বাজ পড়ে জারার কন্ঠ শুনে।
__” আমি তো বলেছি তোমায়, আমি আর রোহান ময়মনসিংহে এসেছি কাজে।”
জারা কান্না করতে করতে বলে
__”আপনারা তাড়াতাড়ি আসেন। জিনিয়া আপুর জ্বর এসেছে। সারারাত কেঁদেছে… এখন খুব খারাপ অবস্থা। রোহান ভাইয়ার জন্য কাঁদতে কাঁদতেই অসুস্থ হয়ে গেছে।আমার খুব ভয় করছে।”
__”তুমি ভয় পেয়েও না লক্ষী বউ! আমরা আসছি !”
কিছুক্ষন আগে।
ড্রইংরুমে ঢুকতেই জেসমিন বেগম তাকে অভ্যর্থনা জানালেন। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর আলোচনার মোড় ঘুরল বিয়ের প্রসঙ্গে। আসিফ খান সেখানে বসে ছিলেন, গম্ভীর মুখে। আরেকবার, খুব দৃঢ়ভাবে তিনি বিয়ের বিষয়ে না করে দিলেন।
রোহান চুপচাপ সব শুনছিল। হঠাৎ মুখ বাঁকিয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। কোনো উত্তর না দিয়েই পাছা ঘুরিয়ে বের হয়ে গেল ঘর থেকে। তার ভঙ্গিতে একরকম উপহাস মিশে ছিল।
কেউ কিছু মনে করল না। বরং সবাই একপ্রকার মজা পেল। রোহানকে সবাই এই বাড়ির ছেলের মতোই ভাবে—ওর রাগ, ওর অভিমান, সবকিছু যেন আপনজনের মতোই মনে হয়।
আরমান কোনো কিছু না বলে রোহানকে নিয়ে নিজের রুমে চলে এল। রোহান ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল, ফ্রেশ হওয়ারও সময় নিল না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘুমে ঢলে পড়ল।
________বর্তমান _______
কথাটা শুনে আরমান আর দেরি করল না। তৎক্ষণাৎ রোহানকে ঘুম থেকে জাগাল। খবর শোনামাত্র রোহানের চোখ লাল হয়ে গেল। বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। নিজের জন্য মেয়েটা সারারাত কেঁদে অসুস্থ হয়ে গেছে—এই ভাবনা তাকে ছিন্নভিন্ন করে দিল।
এই কথাগুলো যেন বজ্রপাত হয়ে পড়ল রোহানের কানে। সে তখন অর্ধেক ঘুমে, কিন্তু প্রতিটি শব্দে যেন তার বুক বিদীর্ণ হয়ে গেল। মুহূর্তেই চোখ ছলছল করে উঠল।
সে বিছানা থেকে ধপাস করে উঠে বসল। হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরল। ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে বলল,
— ” আমার জন্য? আমার জন্য জিনিয়া সারারাত কেঁদেছে?”
ঘরের বাতাস যেন থমকে গেল। রোহানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে উঠল। সে নিজেই নিজের বুকে আঘাত করল মুঠো দিয়ে।
—” আমি কী করলাম! ওকে হাসাতে চেয়েছিলাম, অথচ আজ আমি ওর কান্নার কারণ!”
চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। মনের ভেতর এক অদ্ভুত অপরাধবোধ দানা বাঁধল। মনে হতে লাগল, এই পৃথিবীর সবচেয়ে অপরাধী মানুষ সে-ই।সে ফিসফিস করে বলল,
—” জিনিয়া, তুমি কেনো এভাবে ভেঙে পড়লে? আমি তোমাকে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম হাসাবো, একসাথে বাঁচাবো, সুখ দুঃখ একসাথে ভাগ করে নিব।… অথচ আমার জন্য তুমি আজ জ্বরে পুড়ছো।”
আরমান পাশে এসে তার কাঁধে হাত রাখল। শান্ত গলায় বলল,
—” ভাই, নিজেকে দোষারোপ করিস না। এখন যা দরকার, সেটা হলো ওর কাছে যাওয়া। ওকে দেখানো যে তুই আছিস, তুই ওর পাশে আছিস।”
রোহান মাথা তুলে তাকাল। চোখে তখনও ভেজা জল। গলা কেঁপে উঠল।
—” আজ যদি আমি দেরি করি, হয়তো আর কখনো ওকে হাসতে দেখব না। আমি যাবো… আমি ওর হাত ধরব… আমি ওকে বলব, আমি কখনো ছেড়ে যাব না কোথায়ও। বিয়ে করব আমি ওকে ।”
সে যেন নিজের সাথেই প্রতিজ্ঞা করল। বুকের ভেতর হাজার ঝড় বয়ে গেলেও একটা সিদ্ধান্তে দাঁড়িয়ে গেল—জিনিয়ার পাশে দাঁড়াতে হবে, যেভাবেই হোক।
তারা দুজন তাড়াহুড়ো করে সামান্য কিছু খেয়ে বেরিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিল।
নিচে বসে ছিলেন জেসমিন বেগম আর ফারিয়া বেগম। তারা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— ” কই যাচ্ছো এতো তাড়াহুড়ো করে? কয়েক ঘণ্টা হলো আসছো, আবার কই যাও?”
রোহান কোনো জবাব দিল না। আরমান শান্ত গলায় বলল,
— ” ইসলামপুর গ্রামে যাচ্ছি।”
শব্দটা শোনামাত্রই আসিফ খানের শরীর কেঁপে উঠল। যেন কেউ তার বুকের ভেতর পাথর ছুঁড়ে মারল। বসা থেকে দাঁড়িয়ে গিয়ে তর্জনী তুলে বললেন,
—” ওই হতচ্ছাড়া যেন আমার মেয়ের আশেপাশেও না যায়, আরমান! শুনলে?”
বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল।
রোহান দাঁত চেপে হাসল। চোখে উপহাসের ঝিলিক নিয়ে বলল,
— ” আশেপাশে না গেলে আপনাকে নাতিনাতনি গিফট করবো কীভাবে, শশুড় আব্বা?”
বাক্যটা বিদ্যুতের মতো কেটে গেল আসিফ খানের বুকের ভেতর। তিনি লাল হয়ে গেলেন রাগে। কিন্তু রোহান তার কথায় পাত্তা দিল না। মাথা উঁচু করে দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেল।
আরমান তার পেছন পেছন হাঁটল। দুজনেই তড়িঘড়ি করে গাড়িতে বসে বাড়ি ছাড়ল ইসলামপুর গ্রামের উদ্দেশ্যে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেলের রোদ। ঘড়িতে তখন দুইটা। ইসলামপুর গ্রামের মাটির রাস্তা ধরে এগোচ্ছে দুই তরুণ—আরমান আর রোহান। যাত্রাটা লম্বা হয়ে গেছে। রোদে ঘেমে নেয়ে গেলেও রোহানের চোখেমুখে যেন আলাদা এক উচ্ছ্বাস।
হঠাৎ মাঝপথেই রোহান থেমে গেল।
— ” দাঁড়া, আমি একটু মিষ্টি নিয়ে আসি!”
সে সোজা হেঁটে ঢুকে পড়ল গ্রামের এক দোকানে। মুহূর্তেই ১৫ কেজি মিষ্টি অর্ডার দিয়ে দাঁত কেলিয়ে দোকানদারকে বলল,
— ” আমার জন্য extra ভালো করে বেঁধে দিও।”
আরমান কপাল বাজ করে বলে।
— ” এতো মিষ্টি দিয়ে কী করবি তুই ?”
রোহান চোখ টিপে বলল,
— ” আরে ভাই, জীবনে প্রথম বিয়ে করব আমি। এতো মিষ্টি না কিনলে হবে।”
___” সবাই তো জীবনের প্রথম বিয়েই করে! তুই আবার নতুন কী?”
__” আরে তোর বোনের জন্য ভালোবেসে মিষ্টি নিয়ে যাচ্ছি।”
___” মিষ্টি খেলে আমার বোনের ডায়াবেটিস হবে।
__” ডায়াবেটিস মিষ্টি খেলে না… আমার ওই…ওই…টা খেলে….”
আরমান বোঝলো রোহান কী বলতে চায়। চোখ গরম করে বলে
__” চুপ যা শা*লা। ও আমার বোন হয়! ”
__”আর সবার আগে তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। ”
আরমানও চুপ করে থাকল । তার মন অন্যদিকে ব্যস্ত। দোকানের পাশেই ছোটখাটো গিফট শপ দেখে ভেতরে ঢুকে গেল। জারার জন্য কিছু গিফট কিনল—একটা নীল রঙের শাড়ি, কিছু প্রসাধনী,কয়েক মুঠ কাঁচের চুরি, আর সঙ্গে আরও পাঁচ-ছয় রকমের চকলেট। তাজা একগুচ্ছ লাল গোলাপও নেয়। সে গোলাপগুলো হাতে নিয়ে মুচকি হেসে ভাবল, “এইগুলো আমার লক্ষী বউয়ের জন্য।”
রোহান তখন নিজের জন্যও জিনিয়ার কিছু কিনল। চাঁদ সুন্দরী জিনিয়ার জন্য ছোট্ট গিফট— ওর প্রিয় রঙের শিফন শাড়ি । আর একগুচ্ছ শুভ্র লাল গোলাপ নিয়ে নেয়। আরমানের দেখা দেখি।ময়মনসিংহ থেকে আসার সময় জুয়েলারি শপ থেকে একটা ডায়মন্ডের রিং কিনে ছিলো সে জিনিয়ার জন্য। সে এগুলো হাতে নিয়ে মনে মনে বলল,” আজ আমার চাঁদ সুন্দরীকে সারপ্রাইজ দেবো।”
মনের ভেতর আনন্দ থাকলেও চিন্তাও কম নয়। জিনিয়ার অসুস্থতার কথা শুনে বুকটা কেমন খচখচ করছে।
অবশেষে তারা জারাদের বাড়িতে পৌঁছাল। উঠোনে পা দিতেই আরমান থমকে গেল। তার বুক ধড়ফড় করছে। যেন ভিতরে ঢুকতে তার ইচ্ছা করছে না। কেমন এক অসুস্থতা গ্রাস করেছে তাকে।
— “আমি ভেতরে যাচ্ছি না “— ধীর গলায় বলল আরমান।
___” কেন যাবি না? ওহ…বোঝেছি শশুড় বাড়ি বলে লজ্জা পাচ্ছিস?”
আরমান ওর হাতে থাকা জারা’র আনা গিফট গুলো রোহানকে এগিয়ে দিয়ে বলে
___” মানজারাকে এগুলো দিয়ে দিস। ”
রোহান কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
— “এখন ফাজলামি করার টাইম না ভাই। চল, আমার সঙ্গে।”
জোর করে সে আরমানকে টেনে ভেতরে নিয়ে যায় রোহান।
ঘরে ঢুকেই তারা দেখল—ছোট্ট ড্রইং রুমটা আড্ডায় জমে আছে। সোফা আর মেঝেতে বসে আছে সবাই। রাশেদ, জাহেদও এসেছে। ফিহা হালকা হাসিতে গল্প করছিল। যখন থেকে জিনিয়ার অসুস্থতার কথা জাহেদ শুনেছে, তখন থেকেই সে বোনকে দেখতে চলে এসেছে।
জিনিয়া বসে আছে জারা আর মারজিয়া বেগমের মাঝখানে । কপালে এখনও ক্লান্তির ছাপ, তবে জ্বর কিছুটা কমেছে। তবুও চোখেমুখে দুর্বলতার ছায়া।
ঠিক তখনই দরজায় রোহান দাঁত কেলিয়ে ঢুকে পড়ল। হাতে বড় বড় প্যাকেট, তাতে মিষ্টি ভরা।
— আসসালামু আলাইকুম!
তার ভঙ্গি দেখে সবাই অবাক হয়ে তাকাল।
আরমান ঢুকল পিছন থেকে। তার হাত ভরতি গিফটের কেপেট।রোহান জিনিয়ার জন্য যা কিনেছে তাও আরমানের হাতে।আরমানের দুই হাত ভর্তি জিনিসপত্রে। এক হাতে গোলাপ ফুল এর গুচ্ছ। আর অন্য গিফটের প্যাকেট । আরমানের মাথা নিচু, কেমন যেন অস্বস্তি লুকোচ্ছে। চোখ একবার ঘুরে গেল জারার দিকে। জারাও তার দিকে তাকাল একবার, চোখে কেমন অদৃশ্য প্রশ্ন।যেনো কতো দিন ধরে এই মুখটা দেখা হয় না তার। তৃষ্ণা গেলে আছে আরমানের চোখে। নিজেকে সংযত রাখে।
সবাই উঠে দাঁড়াল মিষ্টির প্যাকেট দেখে। জাহেদ হাসতে হাসতে বলল,
— ” রোহান ভাইয়া, এত মিষ্টি কেনো?”
রোহান দাঁত কেলিয়ে উত্তর দিল,
— “আরে, এটা তো আমার বিয়ের মিষ্টি। ”
কথাটা শুনে ঘর হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। জিনিয়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তার মনে হলো, মাথার ওপরে যেন হঠাৎ আকাশ ভেঙে পড়ল। বুকের ভেতর দম বন্ধ হয়ে আসছে। শব্দগুলো কানে বাজল—“আমার বিয়ের মিষ্টি…”
হঠাৎ তার চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল। মাথা ঘুরে গেল। আর কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে জারা আর মারজিয়া বেগমের পাশে বসা জায়গা থেকে ধপাস করে পড়ে গেল মেঝেতে।
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৭ (২)
— ” জিনিয়া আপু! “— জারা চিৎকার করে উঠল।
—” ও আল্লাহ! “— মারজিয়া বেগম ছুটে গেলেন মেয়ের দিকে।
সবাই দৌড়ে গেলো জিনিয়ার কাছে। রোহানের চোখ ছলছল করে উঠল, হাতে থাকা মিষ্টির প্যাকেট কাঁপতে লাগল।
