রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬১ (২)
সোহানা ইসলাম
অন্ধকার রাত কেটে আজ তিন দিন। এই তিন দিন ধরে জাহেদ আর ফিহার কথা হয়নি। একটা সময় সকালে ঘুম থেকে উঠেই জাহেদের মেসেজ পেত ফিহা, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ওর গুডনাইট না পেলে ঘুম আসত না। কিন্তু এখন—পুরো নীরবতা। যেন হঠাৎ একটা দেয়াল উঠে গেছে ওদের মাঝে।
ফিহা কতো চেষ্টা করেছে—মেসেজ, কল, ভয়েস—কিছুই কাজ করছে না। শেষবার যখন ওদের দেখা হয়েছিল, জাহেদের চোখে একটা অচেনা ভার ছিল এটা ওর মনের ভুল নাকি সত্যি , ফিহা তা টের পেয়েচ্ছে না। কিন্তু বুঝে উঠতে পারেনি, ঠিক কী এমন ঘটেছে যা ওর মতো মানুষকে এত দূরে ঠেলে দিয়েছে।
তিন দিন পরেও কোনো সাড়া নেই। ফিহা নিজেকে সামলাতে পারছে না। জারার কথা মনে পড়ে যায় ওর। জানে, জারার অবস্থাও এখন ভয়ানক।সেই চঞ্চল, হাসিখুশি মেয়ে—এখন নিঃশব্দ এক ছায়া। ফিহা ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে না, বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। জারা কথা বলে না, খায় না, শুধু জানালার পাশে বসে থাকে। ফোনটা বুকের কাছে চেপে ধরে রাখে, যেন একে ওর বেঁচে থাকার শেষ কারণ মনে হয়।
জারা’কে এমন দেখে ফিহার চোখ ভিজে ওঠে।
__”তুই এমন কেন করছিস রে জানু.. মানুষটা যদি একটু বুঝত তোর কষ্টটা!” ফিহা ঠোঁট কামড়ে কান্না চেপে ধরে, কিন্তু তবুও গলা ভারী হয়ে আসে।
একসময় ভাবে, সে তো মিমকেও বলতে পারে সব কিছু। মিম—ওদের সবার প্রিয়। হয়তো মিম কিছু একটা করতে পারবে। ফিহা ফোনটা হাতে নেয়, কিন্তু কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে থাকে। একটা কলই হয়তো সব কিছু পাল্টে দিতে পারে…আবার হয়তো আরও ভেঙে দিতে পারে। তবুও কল দেয়।
ওদিকে খান বাড়িতে যেন নিস্তব্ধতার ছায়া নেমে এসেছে। এক সময় যেই বাড়িটায় হাসির শব্দে গমগম করত, আজ সেখানে শুধু নিঃশব্দ।
কারণ একটাই—আরমান।
বাড়ির বড় ছেলে তিন দিন ধরে নিজের রুমে বন্দী। না খাচ্ছে, না কথা বলছে, না বাইরে আসছে। রুমের দরজা বন্ধ, ভিতর থেকে শুধু সিগারেটের গন্ধ বের হয় আর নিঃশ্বাসের ভারী শব্দ।
জাহেদের মোবাইল মিমের বাড়িতে চুরি হয়ে গিয়েছিলো।ভেবেছে ময়মনসিংহে ফিরে নতুন একটা মোবাইল কিনে নিবে।কিন্তু আরমানের অবস্থা দেখে সব ভুলে বসে আছে। মাথায় শুধু আরমানের চিন্তা গুরে।
রোহান দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল সকালে।
একবার ভেবেছিল ভেতরে ঢুকে কিছু বলবে, কিন্তু পা এগোয়নি। কারণ সে জানে, আরমান যখন চুপ হয়ে যায়, তখন ওর ভেতরে ভয়ংকর কিছু চলতে থাকে। রোহান তার ছোটবেলার বন্ধু, একসাথে স্কুল, একসাথে ঝগড়া, হাসি—সব।
কিন্তু আজ ওর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুও ওর কাছে অপরিচিত।
সবাই একই প্রশ্নে বন্দী—
__“আরমানের এমন কী হলো?”সেদিন রাতে কিছু ঘটেছিল, কিন্তু কেউ জানে না আসলে কী। শুধু আরমান জানে, আর সে মুখ বন্ধ করে বসে আছে নিজের অন্ধকারে।
খান বাড়ির বাকি সদস্যরাও ক্লান্ত। রাশেদ আর রোহান দুই জন মিলে অফিসের কাজ সামলাচ্ছে, কিন্তু মন কারও নেই। আরিফ খান আর আসিফ খান দুজনেই চিন্তায় অস্থির। রাশেদ ও মিমের রিসেপশনের প্রস্তুতি বন্ধ হয়ে গেছে। বাড়িতে কারো মুখে হাসি নেই। সবাই একটাই কথা বলছে—“আরমান আগে স্বাভাবিক হোক, তারপর দেখা যাবে।”
সময় গড়িয়ে বিকেল চারটা বাজে। আকাশে সূর্য ম্লান, বাতাসে ভারী একটা গন্ধ—অসুখের, দুঃখের। খান বাড়ির এক কোণে বসে আছে জিনিয়া আর মিম, জেরিনের রুমে।
ও বাচ্চা, কিন্তু সেদিনের কান্না, চিৎকার, আর আরমানের রাগী মুখ দেখে ভয় পেয়ে গেছে।
তিন দিন ধরে ও রুম থেকে বের হয় না।
মিম বারবার ওর পাশে বসে গল্প বলে, মিষ্টি খাওয়ায়, চুলে হাত বুলিয়ে দেয়।
জিনিয়া নিঃশব্দে বসে আছে জানালার পাশে।
চোখে চিন্তা, ঠোঁটে কোনো কথা নেই। একটা অদ্ভুত শান্ত মুখ—কিন্তু ভিতরে ঢেউ উঠছে।
ও জানে, ওর ভাই এমন করে নিজেকে বন্ধ রাখলে একদিন ভেঙে পড়বে।
ঠিক তখনই মিমের ফোন বেজে ওঠে। স্ক্রিনে নাম দেখে মুখে একটু হাসি ফুটে ওঠে—ফিহু জানু।
ওরা অনেকদিন পর কথা বলবে ভেবে মনটা একটু হালকা হয়।রিসিভ করার সাথে সাথে বলে ওঠে—“এই ফিহা! কোথায় তুই রে? তুই তো একদম আমাকে ভুলেই গেছিস।”
কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো হাসি নেই।শুধু কান্নার শব্দ।
__“ফিহা? কী হয়েছে ? তুই কাঁদছিস কেন?”
ফিহা কিছুক্ষণ কিছু বলতে পারে না। গলা ভারী, শব্দ ভেঙে আসে। তারপর এক নিঃশ্বাসে সব বলে ফেলে— “মিম… জারা… জারা একদম ভেঙে পড়েছে। আরমান ভাইয়ার সাথে ওর কথা নেই তিন দিন ধরে। আরমান ভাইয়া ওর চরিত্র নিয়ে এমন কথা বলেছে… এমন কথা, মিম! তুই বিশ্বাস করবি না। আমি জারার চোখে যেই ব্যথা দেখছি—তা আমি কাউকে কখনো কামনা করি না।”
মিমের মুখ শুকিয়ে যায়। ওর হাতে ফোন কাঁপছে। ওপাশ থেকে জিনিয়া শোনে, মুখ ঘুরিয়ে তাকায়।
__“তুই কী বলছিস, ফিহা? আরমান ভইয়া জারার চরিত্র নিয়ে কথা বলেছে?”
ফিহা হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে।
__“হ্যাঁ মিম… আরমান ভাইয়ার ফোন বন্ধ। জারা তিন দিন ধরে খায়নি, ঘুমায়নি। ও শুধু আরমান ভাইয়ার ছবি দেখে কাঁদে। তুই ওকে একবার দেখলে বুঝবি—ওর চোখে শুধু মৃত্যু আছে এখন।”
মিম আর কিছু বলতে পারে না।চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। ওর মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হয়।এমন কিছু কখনো কল্পনাও করেনি—আরমান, যে মেয়েটাকে পৃথিবীর সব ভালোবাসা দিত, সে-ই এখন ওর মর্যাদা কেড়ে নিয়েছে!
জিনিয়া কাছে এসে ফোনটা হাতে নেয়।
শান্ত গলায় বলে
__“ফিহা, সব বলো। ঠিক কী হয়েছিল?”
ফিহা থেমে থেমে সব বলে—সেদিন রাতে ঝগড়া,আরমানের মিথ্যে দেখা, আরমানের রাগ, জারার কান্না, আর তার পরের দিন থেকে নীরবতা।
জিনিয়া পুরোটা শুনে চুপ হয়ে যায়। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। জেরিন কোণের দিক থেকে তাকিয়ে আছে—কিছু বুঝতে না পারলেও পরিবেশের ভার বুঝে গেছে।
মিম ফোন রেখে দেয়। তারপর হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়, গলা কাঁপছে।
__“এটা তো মানা যায় না! ওরা দুজন তো একে অপরকে পাগলের মতো ভালোবাসত। এমন কিভাবে সম্ভব!”
জিনিয়া মাথা নিচু করে বলে,
__“আরমান ভাইয়ার ভিতরে কিছু ভেঙে গেছে, মিম। হয়তো ও কিছু ভুল বুঝেছে। কিন্তু এই ভুল যদি জারাকে হারিয়ে দেয়, তাহলে ও নিজেকেও হারাবে।”
রোহান দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল, সব শুনে ফেলে। ভেতরে ঢুকে বলে,
__“তাহলে ব্যাপারটা এটা… আমি জানতাম, আরমান কিছু লুকাচ্ছে।”
ওর কণ্ঠে রাগ আর যন্ত্রণা মিশে আছে।
রাশেদ এসে যোগ দেয়।
__“কি হয়েছে?”
মিম চোখ মুছে বলে,
__ “আরমান ভাইয়া জারাকে ভুল বুঝেছে… ওর সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করেছে। সেদিন আমাদের বিয়ের রাতে জারার বড় ভাইয়া দেশে আসে, এসে ওর সাথে দেখে করতে যায় আমাদের বাড়িতে। জারা এতো বছর পর ভাইকে দেখে আবেগের বসে জরিয়ে ধরেছে। কিন্তু আরমান ভাইয়া তা দেখে জারাকে ভুল বোঝে কষ্ট দিয়ে চলে আসে। এক বারও ওর কথা শুনতে চায়নি।উল্টো যা-তা বলেছে।ওকে আঘাত করছে ভাইয়া।” কথা গুলো বলার সময় মিম চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরে।
রাশেদের মুখ গম্ভীর হয়ে ওঠে।
__“তাহলে স্যারের এই অবস্থা অকারণ নয়।”
সবাই নিঃশব্দ হয়ে যায়। বাড়ির বাতাসে একটা সিদ্ধান্তের গন্ধ ভেসে ওঠে—এভাবে আর রাখা যাবে না।কেউ না কেউ যেতে হবে ওদের কাছে।
রোহান দৃঢ় গলায় বলে,
__“আমি এখনই গিয়ে আরমান কে সব বলবো। ”
জিনিয়া মাথা নাড়ে।
__“ হ্যাঁ! ঠিক বলেছেন, হয়তো এই ভুল বোঝাবুঝি মিটে যেতে পারে… যদি কেউ শুধু একটু সাহস করে ভাইয়ার সাথে কথা বলে ওদের মুখোমুখি করায়।”
মিম চুপচাপ জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে।
আকাশে সন্ধ্যার আলো মিলিয়ে গেছে, অন্ধকার নেমে এসেছে চারদিকে। ওর মনে হয়, এই অন্ধকার যেন শুধু বাইরের নয়—সবাইয়ের ভেতরেও নেমে এসেছে।
রাত বেড়ে এখন সাত টা। খান বাড়ির প্রতিটি ঘরে আলো জ্বলছে, কিন্তু কারো মুখে আলো নেই। রোহান বাইরে বসে সিগারেট ধরায়, মাথার ভেতরে ঘুরছে একটাই ভাবনা
—”ওদের আবার একসাথে আনতে হবে। না হলে, এই বাড়ি টা আগের মতো হবে না।”
ফিহা জানালার পাশে বসে ফোন হাতে ধরে আছে। ওর মনে আশা—হয়তো কাল সব ঠিক হয়ে যাবে। আর জারা? সে তখনও জানালার পাশে বসে আছে,হাতের মধ্যে মোবাইল আর আরমানের একটা ছবি—আরমানের হাসি মুখ, যা একসময় ওর পৃথিবী ছিল।
ও ঠোঁটে ফিসফিস করে বলে
—“একদিন আপনি বুঝবেন, আমি কতটা আপনাকে ভালোবেসে ছিলাম…স্বামীজান!”
চাঁদের আলো এসে পড়ে ওর মুখে,চোখে অশ্রু ঝিলমিল করে,আর বাইরে নিস্তব্ধ রাতের মধ্যে,
ভালোবাসা আর ভুল বোঝাবুঝির এই যুদ্ধ নিঃশব্দে চলতে থাকে—একটা না বলা কথার মতো,যার কোনো শেষ নেই।
জারা ধীরে ধীরে মোবাইল টা আবার হাতে নেয়।এই আশায় যদি কল ঢুকে। ডায়াল করে একই নাম্বারে।কিন্তু আজও ফলাফল শূন্য। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বন্ধ মোবাইল টায় এক সংক্ষিপ্ত বার্তা পাঠায় জারা শেষ বারের মতো ।
__“ আমার মৃত্যুর খবর শুনলে একবার এসে আমার কবরে মাটি দিবেন স্বামীজান? এটা আপনার কাছে আমার শেষ আবদার। ”
পাঠিয়ে দিয়ে নিঃশব্দে এসে আলমারির সামনে দাঁড়ায় জারা। শরীর দূর্বল তাই একটু পর পর মাথা ঘুরে যায়। কিন্তু ঠোঁটে হাসির রেখা টেনে আনে জোর করে। আলমারি থেকে আরমানের দেওয়া সব কিছু বের করে এক এক করে।
রাতটা অন্য দিনের মতো ছিল না।খান বাড়ির আকাশে তখন অদ্ভুত নীরবতা। জানালার বাইরে ঝড়ের আগের সেই গুমোট হাওয়া—যেন ভিতরের অস্থিরতা ছুঁয়ে যাচ্ছে প্রতিটি মানুষকে।
আরমান তিন দিন ধরে রুমে বন্দী। দরজার ফাঁক দিয়ে শুধু সিগারেটের ধোঁয়া বের হয়, ভিতরে নীরবতা, আর মাঝে মাঝে ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ।
ওর চোখে রক্ত জমে আছে, মুখ শুকিয়ে গেছে, আর চারপাশে ছড়িয়ে আছে এলোমেলো সিগারেটের টুকরো আর ওষুধের বোতল।
সেই ছেলেটা—যে একসময় হাসলে পুরো ঘর আলোয় ভরে যেত—এখন অন্ধকারের মধ্যে বসে থাকে, নিজের তৈরি দুঃস্বপ্নে বন্দী হয়ে।
কিন্তু আজ ওর এই একাকীত্ব ভাঙবে।
রাশেদ, রোহান, জাহেদ, মিম, আর জিনিয়া—সবাই দাঁড়িয়ে আছে আরমানের দরজার সামনে।
ভেতর থেকে নিঃশব্দ।রোহান ধীরে ধীরে দরজায় নক করে।
__“আরমান… দরজা খোল দোস্ত।”
কোনো উত্তর নেই।দ্বিতীয়বার নক করলে ভেতর থেকে কাশির শব্দ আসে।জাহেদ বলে ওঠে,
__“ভাইয়া, আমাদের কিছু কথা আছে … খুব জরুরি।”
আরমানের কণ্ঠ আসে—ক্লান্ত, কর্কশ।
___“যা তোরা। আমার কিছু শোনার দরকার নেই।”
রাশেদ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, চোখে পানি জমে।
__“ভাইয়া শুনোন। আমাদের অনেক কিছু বলার আছে। আপনি যদি একবার শোনতেন, তারপর যা ইচ্ছে করবেন।”
ভেতর থেকে ভারী নিঃশ্বাস শোনা যায়। তারপর দরজার কপাট খুলে যায় ধীরে ধীরে। ভেতরে গন্ধ—সিগারেট, ঘাম, আর নষ্ট ঘুমের।রুমে আলো জ্বলে না, পর্দা টানা। আরমান কোণের চেয়ারে বসে আছে, হাতে আধখাওয়া সিগারেট।চোখের নিচে কালি, ঠোঁট শুকনো।
___“বল, কী বলতে এসেছিস?”
ওর কণ্ঠে কোনো উষ্ণতা নেই, শুধু ক্লান্তি।
জিনিয়া প্রথমে কথা বলে,
__“ভাইয়া… আমরা জানি না তুমি কী দেখেছো, কিন্তু যা দেখেছো সবটাই ভুল ছিল।”
মিমের চোখে পানি। গলা কাপছে।
__“ ভাইয়া জারা আপনা…”
আরমান মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
__“আমি বলেছি, ওই মেয়েটার নাম কেউ আমার সামনে নেবে না।”
রোহান রাগ চেপে বলে,
___“শান্ত হ ভাই, শোন… জারা কিছুই করেনি। সবটাই ভুল বোঝাবুঝি ছিল।”
আরমান চোখ তুলে তাকায়।চোখ দুটো লাল, তীব্র।
__“তোরা না যেনে কিছু বলিস না !”
জাহেদ এগিয়ে আসে।
__“আমরা জানি ভাইয়া। আমরা সব জানি। ফিহা ফোন করেছিল মিমকে। জারা ভাবি সেই রাতে যাকে….!”
আরমান হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়।
___“চুপ কর! ওই মেয়ের নাম নিবি না আমার সামনে। ওর মতো মেয়ের জন্য আমি… আমি আমার সব শেষ করে ফেলেছি!”
ওর কণ্ঠ ফেটে যায়। হাতের সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দেয় দেওয়ালে।চোখে ক্রোধ, মুখে অস্থিরতা।
জিনিয়া এক ধাপ এগিয়ে আসে।
__“ভাইয়া তুমি সেদিন জারা’কে যার সাথে দেখে ছিলে সেটা ওর বড় ভাই। বিদেশ থেকে এসেছিলো সেদিন। আর মিমদের বাড়িতে দেখা করতে গেছে সারপ্রাইজ দিতে। ”
আরমান স্থির হয়ে যায়।ওর বুকের ভেতর ধকধক শব্দ।
___“কী…কী বললি তুই… তুই কী বললি?”
মিম বলে
__“ হ্যাঁ জিনিয়া আপু ঠিক বলেছে। ওটা ওর বড় ভাই ছিলো।জাহির ভাইয়া। ”
রোহান শান্ত গলায় বলে,
__“ওর ভুল ছিল শুধু তোর ওপর বিশ্বাস করা। তুই ওকে না শুনেই রায় দিয়ে দিলি। তুই জানিস, জারা তিন দিন ধরে কিছু খায়নি। শুধু তোর নাম ধরে কাঁদছে।ওকে ওই দিন সেখানে একা ফেলে রেখে এসেছি।ফিহা ওকে রক্তমাখা অবস্থায় পেয়েছে সেদিন।”
ঘরে নিস্তব্ধতা।কয়েক সেকেন্ডের জন্য সময় থেমে যায়।আরমানের চোখ কাঁপে। ঠোঁট কাঁপে। ওর হাত ধীরে ধীরে মাথার দিকে যায়, তারপর টান মারে চুলে।
__“না… না… এটা সত্যি না।”ও ফিসফিস করে।
__“ এটাই সত্যি! ” বললো জাহেদ
__“আমি ওকে এতটা… ভুল বুঝলাম?”
ওর নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে।গলা দিয়ে শব্দ বের হয় না।হাত কাঁপছে।রাশেদ তাড়াতাড়ি এগিয়ে আসে,
__“ভাই, শান্ত হন। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কিন্তু ওর চোখে এখন ভয়।
__“না… না রাশেদ… আমি আমার নিস্পাপ ফুলকে হাড়িয়ে দিয়েছি। আমি… আমি ওর চোখের জল দেখিনি। আমি তো ভালোবাসতাম ওকে…”
ওর কণ্ঠ কেঁপে যায়, চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। রোহান সামনে এগিয়ে আসে, ওর কাঁধ ধরে।
__“ভাই, শান্ত হ।”
কিন্তু আরমান পাগলের মতো মাথা নাড়ে।
__“না! আমি শান্ত হতে পারব না!”
ও হঠাৎ বুকের ওপর হাত রাখে, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
__“দোস্ত!”
রোহান চিৎকার করে ওঠে,
__“ইনহেলার, তাড়াতাড়ি!”
জাহেদ ছুটে গিয়ে টেবিল থেকে ইনহেলারটা আনে। রোহান ওর হাতে ধরিয়ে দেয়, কিন্তু আরমান হাত থেকে ফেলে দেয় মেঝেতে।
___“না… আমার শাস্তি দরকার। আমি বাঁচব না…”
ওর গলা থেকে শব্দ বের হয় না, শ্বাস কাঁপে।
সবাই চিৎকার করছে,
__ “ইনহেলার ধর ভাই!”
রাশেদ ওর কাঁধ ধরে।
__“ভাই, তুই এখনই কিছু করবি না, শোন!”
কিন্তু আরমান ওদের ঠেলে দিয়ে দাঁড়ায়।চোখে পাগলামি।
__“আমাকে যেতে হবে… আমাকে যেতে হবে ওর কাছে…”
ও দরজার দিকে ছুটে যায়।রোহান, রাশেদ, জাহেদ সবাই ওর পিছু নেয়।
নীচে তখন অন্য দৃশ্য। আরিফ খান আর আসিফ খান অফিস থেকে ফিরেছেন, মুখে ক্লান্তি।
ফারিয়া বেগম চুপচাপ চা ঢালছেন, মন ভার।
বাড়ির নিস্তব্ধতায় হঠাৎ ওপর থেকে পায়ের শব্দ।
টুপটাপ… দৌড়ের মতো শব্দ, আর সাথে চিৎকার—“আরমান! ভাই থাম!”
ফারিয়া বেগম বিস্ময়ে তাকান,তারপর দেখেন, ছেলেটা দৌড়ে নিচে নামছে, মুখ ফ্যাকাশে, চোখে আগুন।
__“কি হয়েছে বাবা?”তিনি ছুটে গিয়ে বুকে আগলে ধরেন।
আরমান থরথর করছে, নিঃশ্বাস কাঁপছে।
__“আম্মু… আমাকে যেতে হবে। ওর কাছে… আমাকে যেতে হবে।”
__“কোথায় যাবি বাবা, এমন অবস্থায়?”
কিন্তু ও শোনে না।৷ চোখে একটাই জেদ—ওকে দেখতে হবে, ওর মুখের সামনে দাঁড়াতে হবে, ক্ষমা চাইতে হবে।আরমান আম্মুর হাত ছাড়িয়ে দরজার দিকে দৌড়ায়।
__“বাবা, ইনহেলারটা নিয়ে যা!”ফারিয়া বেগম চিৎকার করে কাঁদেন।
__“ওর ইনহেলারটা কেউ নিয়ে যা বাপ আমার!”
রাশেদ দৌড়ে গিয়ে টেবিল থেকে ইনহেলারটা তুলে নেয়,আর পেছনে ছুটে যায় রোহানদের সাথে।
বাইরে তখন অন্ধকার রাতের গুটি গুটি আলো নেমেছে। আকাশে মেঘ, বাতাসে ধুলো।রাস্তায় আলো কম, কিন্তু আরমান দৌড়াচ্ছে—পাগলের মতো। চুল উড়ছে, চোখে অশ্রু, নিঃশ্বাস ভারী। দৌড়ে চলে যায় গ্যারেজে।
গাড়ির অবস্থা বেহাল। আরমান গাড়ির দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতে চোখে পরে ওর মোবাইল টা। যা অবহেলায় বাড়ির সিটে পরে আছে। আরমান তাড়াতাড়ি করে মোবাইল টা হাতে নেয়। মোবাইল অন করতে নেয় দেখে বন্ধ হয়ে আছে।
আরমানের শ্বাস উঠা নামা করছে। আরমান কাঁপা কাঁপা হাতে মোবাইল চালো করে। নেট ওপেন হতেই একটার পর একটা নোটিফিকেশন আসচ্ছে। কল, মেসেজ। সবগুলো তার লক্ষী বউয়ের। শেষ মেসেজ টা দেখে আরমানের প্রায় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। মোবাইল টা ওর হাত থেকে পরে যায়। ওর পুরো শরীরের কাঁপুনি দিয়ে উঠে। পরে যেতে নেয় কিন্তু রোহান এসে তাড়াতাড়ি ধরে নেয়।
তাদের পিছনে সবাই এসে দাঁড়ায়। রাশেদ ইনহেলার টা দেয়। জাহেদ আরমানের মোবাইল হাতে নিয়ে জারা’র মেসেজে টা দেখে। ওর ও গলা শুকিয়ে যায়। জিনিয়া ভাইয়ের কাঁধে ঝাকিয়ে বলে
__“ কি দেখছো তুমি? ”
জাহেদ বলে
__“ জারা ভাবির মেসেজ ছিলো?”
মিম ভয় পেয়ে বলে
__“ কি..কি বলেছে জা..জারা?”
__“ বলেছে ওর কবরে মাটি দিয়ে আসতে!”
এটা শুনার পর সবাই স্তম্ভ হয়ে যায়। ভয়ে গলা শুকিয়ে আসে। জারা যদি উল্টা পাল্টা কিছু করে ফেলে?না..না এমন কিছু হবে না।
জিনিয়া কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে
__“ ক..কখন পাঠিয়েছে?”
জাহেদ সময় দেখে
__“ ৩১ মিনিট আগে! ” এখন বাজে রাত নয় টা একচল্লিশ। সবার শরীর ঝাঁকি দিয়ে উঠে।
আরমান এখন একটু নিজেকে স্বাভাবিক করে। সে ওর বাইক টা নিয়ে বের হয়ে পরে। সময় নষ্ট করা যাবে না। আরমানের পিছনে রোহান রাও গাড়ি নিয়ে বের হয়। আরমানকে একা ছাড়া যাবে না।
__“আমাকে আমার লক্ষী বউয়ের কাছে যেতে হবে …”ও ফিসফিস করে।
“ওকে বলতে হবে আমি ভুল করেছি… আমি ভালোবাসি ওকে..ক্ষমা চাইবো আমি.”
পেছনে রোহান, রাশেদ, আর জাহেদ চিৎকার করছে—
___“আরমান থাম! তোর শ্বাস বেরে যাবে।বাইক নিয়ে যাস না!”
কিন্তু ও থামে না। প্রতিটি পদক্ষেপে বুকের ভেতর ধকধক শব্দ বাড়ে। আরমানের পিছনে রোহান রাও গাড়ি নিয়ে বের হয়। আরমানকে একা ছাড়া যাবে না।
আরমানের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে প্রায় । কিন্তু বাইক থামায় না। আকাশের দিকে তাকায়।
চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
___“আমাকে ক্ষমা করবি তো বউ?…”
রাতটা ছিল নিস্তব্ধ—নিশ্বাস নেয়ারও যেন সাহস নেই বাতাসের। জানালার পর্দা নরমভাবে দুলছে, চাঁদের আলো এসে পড়েছে ঘরের ভেতর। জারা বিছানায় বসে আছে, সামনে আলমারি খোলা। চোখে অশ্রু, ঠোঁটে কাঁপুনি। একে একে আরমানের দেওয়া সব কিছু আলমারি থেকে বের করে রাখছে বিছানায়—শাড়ি, চুড়ি, নূপুর, ডায়মন্ডের রিং, গোল্ডের ব্রেসলেট , আর শুকিয়ে যাওয়া গোলাপ যেটা একদিন ওর হাতে তুলে দিয়েছিল।
আজ জারা হাত রাখে সেই লাল শাড়িটার ওপর। ওর বুকটা কেঁপে ওঠে। মনে পড়ে যায়—এক ভোররাতে আরমান বলেছিল, “তুমি একদিন এই শাড়ি পরবে, যেদিন আমার আব্বু আম্মুকে নিয়ে তোমাদের বাড়িতে যাবো।”
সেই কথাটা যেন কানে বাজতে থাকে। শাড়িটা বুকের কাছে টেনে নেয় জারা। ধীরে ধীরে গায়ে জড়িয়ে ফেলে। শাড়ি পরতে জানে না, কিন্তু আজ শিখে ফেলেছে শুধু এক কারণেই—আরমানের জন্য।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে। শাড়িটা ঠিক করে, খোঁপা খুলে চুলগুলো ছেড়ে দেয়। মুখে এক তাচ্ছিল্য হাসি ফুটে ওঠে।
– “দেখুন স্বামীজান,”
সে আয়নার দিকে তাকিয়ে বলে,
__“আমি আপনার দেওয়া লাল শাড়িটা পরেছি। কিন্তু দেখার জন্য আপনি তো নেই।”
চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। জারা হাত বাড়িয়ে মোবাইল তুলে নেয়, গ্যালারি খুলে আরমানের ছবি বের করে। ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলে —
– “স্বামীজান, আমাদের সংসারটা কেন হলো না বলুন তো? আপনার সাথে হাতে হাত ধরে একটিবার হাঁটতেও পারলাম না। আপনার চুলে হাত ভুলিয়ে দিয়ে পারলাম না, আপনি চলে গেলেন ভুল বুঝে, একবারও আমার কথা ভাবলেন না।”
জারা নরম কণ্ঠে বলে চলে —
– “তবুও জানেন, আমি এখনো আপনাকেই ভালোবাসি। সেই প্রথম দিনের মতো, যখন আপনি বলেছিলেন,এই পাগলের হাত টা সারাজীবনের মতো ধরবে হাফ ইঞ্চি মেয়ে? সেই হাফ ইঞ্চি মেয়ের শান্তিটা আপনি কেড়ে নিয়েছেন, কিন্তু ভালোবাসাটা নিতে পারেননি।”
বিছানায় বসে জারা গলার হারটা পরে নেয়, চুড়ি পরে,পায়ে নূপুর পরে, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক লাগায়। আকাশে তখন একটা তারা টিমটিম করে জ্বলছে। রাত প্রায় একটার ঘরে। জানালার বাইরে কুয়াশার আস্তর পড়ছে, ভেতরে যেন ঘন হয়ে উঠছে এক নিস্তব্ধ বেদনা। আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায় জারা।নিজেকে আয়নায় দেখে তাচ্ছিল্য হাসে। একটা বিষাক্ত হাসি দিয়ে গায়…
~~~তোমার দেওয়া লাল শাড়িটা
পইরা আমি বিদায় নিলাম”
একবারও দেখলানা আমারে”
তোমার নামের আলতা পরে বসেছিলাম অপেক্ষাতে”
তবু দোষী বানাইলা আমারে~~
চোখ দিয়ে গরিয়ে পরে নোনা জল। জারা ধীরে ধীরে মাথায় ঘোমটা টেনে নেয়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাসে, অশ্রু মুছে বলে —
– “দেখুন তো স্বামীজান, আপনার লক্ষ্মী বউয়ের মতো লাগছে কিনা?”
মুহূর্তে সেই হাসিটা তাচ্ছিল্যে রূপ নেয়। কণ্ঠ কেঁপে ওঠে, চোখে এক অচেনা দৃঢ়তা —
– “চলে যাব আমি। অনেক দূরে। আর এই পৃথিবীতে আপনাকে খুঁজে বেড়াতে পারব না। ক্লান্ত আমি। আর কষ্ট না হোক, কান্না না হোক। এবার শেষ।”
বিছানার পাশে রাখা কাচের গ্লাসটা হাতে তুলে নেয় জারা। তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর হঠাৎ সেটি মাটিতে ছুড়ে ফেলে। গ্লাসটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়, শব্দটা নিস্তব্ধ রাতকে চিরে দেয়।
শব্দ শুনে জাহির দৌড়ে আসে। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে
— “বুড়ি! দরজা খোল!” ভেতর থেকে কোনো উত্তর নেই।
মারজিয়া বেগম আর আনিছুর রহমানও ছুটে আসেন। মেয়ের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বুক ধড়ফড় করে ওঠে দু’জনের। দরজার ভেতর থেকে একটাও শব্দ আসছে না।
ভেতরে meanwhile, জারা ধীরে ধীরে মাটিতে বসে পড়ে। একটা কাচের টুকরো হাতে তুলে নেয়। কাঁপতে থাকা আঙুলে কাচটা আঁকড়ে ধরে। তারপর এক নিঃশ্বাসে নিজের হাতে আঘাত করে। গলগল করে রক্ত বেরিয়ে আসে। ব্যথায় মুখ বিকৃত হয়, কিন্তু সে চিৎকার করে না।
চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে, ঠোঁট নড়ে —
– “বিদায় স্বামীজান… আপনাকে মুক্তি দিয়ে দিলাম।”
আরেকবার আঘাত করে হাতের ওপর, তারপর নিথর হয়ে যায়। হাত থেকে কাচটা পড়ে যায় মাটিতে, রক্তে ভেসে যায় চারদিক।
বাইরে তখন দরজায় ধাক্কা পড়ছে একের পর এক। জাহির চিৎকার করছে,
__“বুড়ি! খুল দরজা!”
মারজিয়া বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন,
__“ দরজা খোল না মা!”
ভেতরে কোনো সাড়া নেই।
শেষমেশ জাহির লাথি মেরে দরজা খুলে ফেলে। সবাই ভেতরে ঢোকে, আর দেখে—জারা মাটিতে পড়ে আছে, গায়ের লাল শাড়িটা রক্তে ভিজে গেছে, হাতের কাছে ভাঙা কাচের টুকরো।
মারজিয়া বেগম ছুটে গিয়ে মেয়েকে কোলে তোলে।
___“জারা! আমার মা, চোখ খোল!”
জাহির চিৎকার করে বলে
__“ বুড়ি!”
আনিছুর রহমান হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, মুখে কথা নেই। জাহির ফ্রিজ থেকে বরফ এনে জারা’র হাতে চাপ দেয়, রক্ত থামাতে চায়।
রাত প্রায় দুইটার মতো হবে। পুরো গ্রাম নিস্তব্ধ, শুধু বাতাসের হালকা শব্দ। হঠাৎ দূর থেকে একটা বাইকের ব্রেকের শব্দ ভেসে আসে। সদর দরজার সামনে এক আসামি । দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক ভগ্নপ্রায় মানুষ — আরমান। চোখে ঘুম নেই তিন দিন ধরে, মুখে দাড়ি, কণ্ঠে আতঙ্ক।
আরমান হন্তদন্ত হয়ে দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে।
— “মানজারা! মানজারা!”
তার কণ্ঠ ভেঙে যায় চিৎকারে। হাতের আঘাতে দরজার কাঠে রক্ত লেগে যায়, কিন্তু সে থামে না।
— “মানজারা, দরজা খোল! আমি এসেছি… তোমার স্বামীজান এসেছে!”
রোহান, রাশেদ, আর জাহেদ পেছন থেকে দৌড়ে আসে। সবার মুখে একটাই আতঙ্ক।জিনিয়া বলে
__ “বড় ভাইকে থামাও!” কিন্তু কে থামায় তাকে এখন!
এমন সময় দরজা খুলে যায়। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে ছোট্ট জোহান — কাঁপা কণ্ঠে, চোখে অশ্রু, মুখে অস্পষ্ট শব্দ,
— “দু..দুলা..ভাই…”
আরমান এগিয়ে আসে, দু’হাতে জোহানের কাঁধ ধরে ঝাঁকায়,
— “আমার বউ কই? পটল, আমার বউ কই?”
জোহানের গলা আটকে যায়, চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে পড়ে।
— “র… রক্ত দু..লা..ভাই…”
ভাঙা ভাঙা কথাগুলো যেন বজ্রপাতের মতো বাজে আরমানের কানে। রক্ত! এই শব্দটাই যেন ওর মস্তিষ্কে আগুন ধরিয়ে দেয়। দৌড়ে যায় জারার রুমের দিকে। দরজা ঠেলে ঢোকার পর যে দৃশ্যটা দেখে—ওর বুকের ভেতর থেকে এক চিৎকার বের হয়, কিন্তু শব্দটা আটকে যায় গলায়।
বিছানার ওপর নিথর হয়ে পড়ে আছে জারা।
পরনে সেই লাল শাড়ি—যেটা আরমান নিজের হাতে কিনেছিল, ভালোবেসে গিফট দিয়েছিল একদিন। এখন সেই শাড়ি রক্তে ভিজে গেছে। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা চাঁদের আলো পড়ে আছে জারার মুখে—ফ্যাকাশে, ঠান্ডা, কিন্তু শান্ত।
আরমানের মাথা ঘুরে যায়। কয়েক সেকেন্ড স্থির থাকে, তারপর হঠাৎ ছুটে গিয়ে জারাকে কোলে তুলে নেয়।
— “বউ! চোখ খোল… বউ!”
— “আমি এসেছি, আমি… তোমার স্বামীজান!”
__“ দেখ আমি তো এসেছি। ক্ষমা করবি না? ”
ওর কণ্ঠ ভেঙে যায়, চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে জারার গালে।
— “দেখো তো, আমি তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম… কিন্তু আমি ফিরে এসেছি, দেখো!”
জারার ঠোঁট স্থির। কোনো সাড়া নেই।
__“ আমার সোনা বউ, লক্ষী বউ চোখ খুল! ”
আরমানের বুকের ভেতর যেন আগুন জ্বলে ওঠে।
ও মাথায় হাত দেয়, নিজের চুল ছিঁড়ে ফেলে, দেয়ালে মাথা ঠুকে কাঁদতে থাকে।
— “কেন করলি তুই এটা, মানজারা! আমি ভুল করেছি, কিন্তু তুই তো আমার কথা একবারও ভাবলি না!”
রোহান আর রাশেদ দৌড়ে ভেতরে আসে, মিমও এসে পড়ে। মিম তার প্রিয় বান্ধবীকে দেখে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে মেঝেতে, মুখ ঢেকে কাঁদতে থাকে।
— “জারা, তুই এমন করতে পারিস না… তুই কি করলি এটা !”
মারজিয়া বেগম তখন জারার পায়ের পাশে বসে , বুক চাপড়াচ্ছে—
— “মা আমার! ওরে কেউ পানি দে, কেউ ডাক আমার মেয়েকে!”
আনিছুর রহমান নিঃশব্দে কাঁদছেন, চোখে ভয়, মুখে হতাশা। জোহান আজ যেনো শান্ত হয়ে গেছে। শুধু চোখ দিয়ে পানি পরছে। জিনিয়া গিয়ে জোহানকে নিজের সাথে আগলে নেয়।
এর মাঝে আরমান জারার নিথর হাত দু’টো নিজের বুকে চেপে ধরে বলে,
— “তুই আমাকে শাস্তি দিলি না বউ, তুই নিজেকে দিলি! আমি এমন চাইনি…”
জাহির শুধু আরমানের দিকে তাকিয়ে আছে অবাক হয়ে। এরা সবাই কারা? ওর বোন কে এই লোকটা বউ বলছে কেনো? মারজিয়া বেগম রোহানদের দেখে বেস অবাক হন। তার থেকে বেশি আরমান জারাকে বউ বলে ডাকছে শুনে।
কিন্তু প্রশ্ন করতে পারলেন না তিনি। গলায় কথা আটকে যায়।
আরমানের মুখে কোনো ভাষা নেই, শুধু পাগলের মতো আর্তনাদ।
— “চোখ খোল বউ… আমি তোরে ভালোবাসি! শপথ তোরে ছাড়া বাঁচব না!”
রোহান এগিয়ে আসে, কাঁধে হাত রাখে, কিন্তু আরমান সেই হাত ঝাঁকিয়ে ফেলে দেয়।
— “আমারে ছাড়! কেউ আমারে ধরিস না! আমি ওর ছাড়া বাঁচব না!”
এমন সময় আরমানের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। রাশের হাতের ইনহেলার মাটিতে পড়ে যায়। রোহান ভয় পেয়ে চিৎকার করে
— “রাশেদ, ইনহেলার দে জলদি !”
রাশেদ তাড়াতাড়ি করে তুলে দেয় হাতে, কিন্তু আরমান সেটাও ছুড়ে ফেলে দেয়।
— “আমারে মরতে দে রোহান! আমার লক্ষী বউ নাই,তাহলে আমার শ্বাসের দরকার নাই!”
চোখের সামনে ধীরে ধীরে অন্ধকার নামে। আরমানের শরীর কাঁপতে থাকে, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। জাহেদ আরমানকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে ওঠে,
— “ ভাইয়া ! কেউ পানি আনো!”
মিম, জিনিয়া, সবাই দৌড়ে আসে। মিম কাঁদতে কাঁদতে বলে — “দুইজনকেই হাসপাতালে নিতে হবে এখনই!”
তাড়াহুড়ো করে দু’জনকে গাড়িতে তোলা হয়। রোহান চালকের সিটে বসে, চোখে পানি, মুখে শুধু একটাই কথা,
— “দোস্ত! প্লিজ চোখ বন্ধ করবি না।”
শ্বাস বন্ধ হয়ে আসচ্ছে কিন্তু গাড়ির ভেতর পাগলের মতো আচরণ করছে আরমান। কখনও জারার হাত ধরে বলছে
__ “চোখ খোল”, কখনও নিজেকে আঘাত করছে। ওর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যায়—
— “তুই যাস না, মানজারা… আমি তো এসেছি!”
হাসপাতালের সামনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত তিনটা পেরিয়ে যায়। নার্স আর ডাক্তার দৌড়ে আসে, দু’জনকে একসাথে নিয়ে যায় ভেতরে।
আর মাঝে খান বাড়িতে খবর দেওয়া হয়। আরমানের কথা শুনে সবাই ততক্ষণে রওনা হয় হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।
হাসপাতালের করিডরে বসে রোহান, মিম, রাশেদ—সবাই নিঃশব্দ। শুধু করিডোরে মিমের কান্নার শব্দ গুঞ্জরিত হচ্ছে। রোহানের মাথা নিচু, ঠোঁটে কাঁপা শব্দ—
— “যদি একটু আগে পৌঁছাতে পারতাম…”
ভেতর থেকে ডাক্তার বের হয়। সবার চোখে একটাই প্রশ্ন—“বাঁচবে তো?”
ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,
— “দু’জনেরই অবস্থা সংকটজনক… দেরি হয়ে গেছে।”
এর মধ্যে আরমানের পরিবারের সবাই এসে উপস্থিত হয় হাসপাতালে। ছায়মাও খান বাড়িতে ছিলো। তাই সেও এসেছে। ফারিয়া বেগম, জেসমিন বেগম তখন হাসপাতালে পৌঁছে যান। মায়ের কণ্ঠে আর্তনাদ,
— “আমার ছেলেকে বাঁচান! ”
ডাক্তার বলে,
__ “আমরা চেষ্টা করছি।”
ভেতরে শুয়ে আছে দুইজন মানুষ — একসময় যাদের ভালোবাসা ছিল আগুনের মতো, এখন তা নিভে যাওয়া ছাই। একজনের মুখে অক্সিজেন মাস্ক, আরেকজনের হাতে স্যালাইন।
চাঁদের আলো হাসপাতালের কাঁচের জানালায় এসে পড়ে। বাইরে অন্ধকার, কিন্তু ভেতরে কেবল যন্ত্রের শব্দ আর চোখের পানি।
এতো কিছু হয়ে গেছে কিন্তু একজন যানতেই পারলো না এসবের কিছু। ফিহা। যে কি না সন্ধ্যায় ও জারার সাথে ছিলো। এখন সে কিছুই যানে না এসবের।
রোহান দূর থেকে তাকিয়ে থাকে—আরমানের বুক ধীরে ধীরে উঠছে-নামছে, পাশে জারা নিথর।
মিম হাত জোড় করে চুপচাপ বলে,
— “হে আল্লাহ, এবার ওদের একসাথে রাখো… আলাদা কইরো না।”
রাতটা শেষ হয় না সেদিন। শুধু হাসপাতালের করিডোরে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে ফারিয়া বেগম কণ্ঠ—“আমার ছেলেকে বাচিয়ে দাও আল্লাহ …”
একটা কণ্ঠ, যা এখনো বাতাসে ভাসে—ভালোবাসা, অনুতাপ আর ভাঙা স্বপ্নের সাক্ষী হয়ে।
জাহির হাসপাতালের করিডরে এক কোণে বসে আছে। চোখে পানি। মুখে কোনো কথা নেই। আনিছুর রহমানের বুকে ক্লান্ত হয়ে পরে আছে মারজিয়া বেগম। আরিফ খান আর আসিফ খান একটু পর পর ডাক্তারের কাছে গিয়ে আরমান আর জারা’র কথা জিজ্ঞেস করে।
মিমকে নিয়ে বসে আছে রাশেদ। মেয়েটা অনেক কান্না করছে। চোখ দুটু ফুলে গেছে। তার পাশে চুপচাপ বসে আছে রোহান আর জাহেদ। জিনিয়া গেছে জোহান কে নিয়ে ওয়াশরুমে। ছায়মা জিনিয়া কে খুঁজতে খুঁজতে একসময় করিডরে শেষ প্রান্তে চলে আসে। কিন্তু জিনিয়াকে পায় না। ছায়মার চোখে পরে মেজেতে বসে থাকা ক্লান্ত এক পুরুষের দিকে। যার চোখে এখন পানি। কিন্তু সে লোক টাকে চিনে না। মায়া হচ্ছে ছায়মার লোকটাকে দেখে।
ছায়মা লোকটার দিকে এগিয়ে এসে কাঁধে হাত রাখে। মৃদু কন্ঠে বলে
__“ আপনি এখানে বসে আছেন কেনো? কি হইছে? ”
জাহির মাথা তুলে তাড়াতাড়ি করে। বিচলিত কন্ঠে বলে
__“ আমার বুড়ির জ্ঞান ফিরেছে?”
ছায়মা লোকটার কথা বোঝতে পারে না।
__“ কি বললেন,বুড়ি কে?”
জাহির চোখের পানি মুছে নেয়।
__“ আমার বোন। জারা, ওর জ্ঞান ফিরেছে?”
ছায়মা এখন বোঝতে পারে এটা জারা’র বড় ভাই।
__“ ও…আপনি তাহলে জারা ভাবির ভাই?”
জারা ভাবি ডাক টা যেনো জাহিরের কানে গিয়ে লাগে। এই মেয়ে তার বোনকে ভাবি ডাকে কেনো?
__“ ভাবি মানে? আমার বোনের বিয়ে হয়নি!”
__“ আরমান ভাইয়ার বউ তো জারা ভাবি। আমরা সবাই যানি সে টা! ”
ছায়মার কথা শুনে জাহির যেনো আকাশ থেকে পরে। এসব সে কি শুনছে ওর বোনের নামে। তাহলে কি সব সত্যি । আর এই জন্যই লোক টা জারা জন্য এতো পাগলামি করছিলো?
ভোর ছ’টা। হাসপাতালের করিডোরে হালকা আলো ঢুকেছে জানালা দিয়ে। একটার পর একটা রাত পেরিয়ে আজ অবশেষে নতুন সকাল। কিন্তু এই সকালটা খান পরিবারের কারোর কাছে আলো হয়ে আসে না, আসে এক দীর্ঘশ্বাসের মতো।
আরমানের চোখ ধীরে ধীরে খুলে । সাদা সিলিং, স্যালাইনের নরম টুপটাপ শব্দ, অক্সিজেন মাস্কের ঠান্ডা বাতাস — এগুলো যেন এক অচেনা জগৎ। প্রথমে কিছুই মনে করতে পারে না সে। কিন্তু এক মুহূর্ত পরই সব কিছু ঝড়ের মতো ফিরে আসে — জারা, রক্ত, কান্না, চিৎকার।
হঠাৎ বুকের ভেতর আগুনের মতো জ্বালা ওঠে, আরমান উঠে বসতে চায়।
— “বউ! আমার বউ কই? মানজারা! আমার বউ কই?”
নড়াচড়া করতেই বুকের ব্যথা ফিরে আসে। ইনহেলারের প্রয়োজন পড়ে, কিন্তু সে কিছুই ভাবে না। হাত থেকে স্যালাইনের সূচ খুলে ফেলতে যায়। ডাক্তার ও নার্সরা দৌড়ে আসে, আরিফ খানও ছেলের পাশে পৌঁছে যান।
— “বাবা, শান্ত হো। জারা মামুনি ভালো আছে। তুমি এখন ঘুমাও।”
আরমানের কণ্ঠ ভেঙে যায়, চোখে জল গড়িয়ে পড়ে,
— “আব্বু, ওকে দেখতে হবে আমার… এখনই।”
কেউ থামাতে পারে না। নার্সরা জোরে ধরে। ডাক্তার বলেন,
— “ওর মানসিক অবস্থা স্থিতিশীল না। ঘুমের ইনজেকশন দিন।”
আরমান চিৎকার করে ওঠে,
— “না! আমার বউয়ের কাছে যাব আমি , আমি ওকে দেখব! ছাড় আমাকে। ”
ইনজেকশনের সূচ ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে শরীরটা ঢিলে হয়ে আসে, চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে।
আরিফ খান ছেলের মাথায় হাত রাখেন। তাঁর চোখের কোণেও জল জমে যায়। ফারিয়া বেগম দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে, বুক চেপে কাঁদছেন।
দূরে, আইসিইউর অন্য প্রান্তে নিথর পড়ে আছে জারা। এখনো জ্ঞান ফেরেনি।
হাসপাতালের বাতাস ভারী হয়ে আছে কান্না, অপরাধবোধ আর নিঃশব্দ প্রার্থনায়। সময় গড়িয়ে যায় ধীরে ধীরে। সূর্যের আলো জানালায় এসে পড়ে। আরমান তখনও ঘুমে অচেতন।
জারা আইসিইউতে, তার হাতের ব্যান্ডেজে রক্তের ছোপ শুকিয়ে গেছে। মেশিনের শব্দে মাঝে মাঝে হালকা ‘বিপ’ বাজে — জীবনের ক্ষীণ সংকেত।
এই সময়েই খান পরিবার ও জারাদের পরিবার পরস্পরের মুখোমুখি হয় হাসপাতালের লবিতে।
দুই পরিবারের মধ্যে দূরত্বটা যেন চোখে দেখা যায়। কারো চোখে কারো দিকে তাকানোর সাহস নেই।
মারজিয়া বেগম একপাশে বসে চুপচাপ কাঁদছেন, বারবার তসবিহ গুনছেন আঙুলের সাহাস্যে। ফারিয়া বেগম ও জেসমিন বেগম ওনার পাশে গিয়ে বসেন। ফারিয়া ধীরে বলেন,
— “আমার ছেলেটা ভুল করেছে, বোন। কিন্তু সে এখন নিজের ভুলের আগুনে পুড়ছে।”
মারজিয়া বেগম চোখ মুছে উত্তর দেন,
— “আমার মেয়েটাও ভুল করেছে বোন, কিন্তু তার সাজাটা অনেক বড় হয়ে গেলো।”
এমন সময় আনিছুর রহমান আর আরিফ খানও একে অপরের পাশে এসে দাঁড়ান। দু’জনের চোখে ক্লান্তি, মুখে ক্লেশ, তবু ভেতরে এক অদ্ভুত শান্তি — যেন সময় তাদের একত্র করে দিয়েছে।
আরিফ খান ধীরে বলেন,
— “রাশেদ-মিমের বিয়ের দিন আমি কথা বলেছিলাম, মনে আছে? তখনও বলতে চেয়েছিলাম সব। কিন্তু ভয় পেয়েছিলাম, যদি সব কিছু ভেঙে যায়…”
আনিছুর রহমান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
— “আজ সব ভেঙেই গেছে ভাই। এখন বাঁচুক শুধু ওরা।”
তাদের এই কথোপকথনের সময় পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো জাহির আর ছায়মা। দু’জনের চোখে অজানা ক্লান্তি। পরিচয় মাএ কয়েক ঘন্টার , কিন্তু আজ কথা না বলেও দু’জন একে অপরের ব্যথা বুঝে নেয়।ছায়মা নিচু গলায় বলে,
— “সব ঠিক হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।”
জাহির মাথা নাড়ে,
— “ঠিক হবে… কিন্তু দেরি হয়ে গেছে।”
জোহান তখনও চুপচাপ বসে আছে জিনিয়ার পাশে। ওর ছোট্ট মুখে ভয় আর প্রশ্ন
—“বোনু উঠবে তো?”
জিনিয়া ওর মাথায় হাত রাখে, চুপচাপ বলে,
— “উঠবেই।”
সকাল গড়িয়ে বিকেল। আরমানের ঘুম ভাঙে।
চোখ খুলতেই চারপাশে সাদা আলো, কিন্তু প্রথম প্রশ্নটা একই —
— “ মানজারা কেমন আছে?”
রোহান পাশে বসে ছিলো, মুখে ক্লান্ত হাসি।
— “জ্ঞান ফিরেছে ওর।”
এই একটা কথাতেই আরমানের বুকের ভেতর কেমন যেন আলো জ্বলে ওঠে। সে তড়িঘড়ি করে উঠে বসে। স্যালাইন খুলে ফেলে।রোহান থামাতে চায়,
— “দোস্ত, ধীরে যা।”
কিন্তু কে শোনে এখন! আরমান পাগলের মতো উঠে পড়ে, হোঁচট খেতে খেতে কেবিন থেকে বের হয়। ওর শরীর দুর্বল, কিন্তু মন যেন আর থেমে থাকতে চায় না।কেবিনের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়
— “জারা কেবিন – ৭” লেখা নামপ্লেটের সামনে।
ভেতর থেকে ভেসে আসছে মানুষের গলার শব্দ, কান্না, প্রার্থনা। রুমের ভেতরে জারা আধশোয়া হয়ে আছে, পাশে মারজিয়া বেগম তার মাথায় হাত রেখে কান্না করছেন । ফারিয়া বেগমও বসে আছেন একপাশে। জিনিয়া, মিম, ছায়মা — সবাই চোখে পানি নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে আরমান। ওর গলা শুকিয়ে গেছে, চোখে জল, কিন্তু পা এগোয় না।
রোহান এসে কাঁধে হাত রাখে।
— “ভিতরে যাবি না । ওর জন্যই তো বেঁচে আছিস।”
__“ সে কি আমায় ক্ষমা করবে?” কথা বলতে গিয়ে আরমানের গলা জরিয়ে আসে।
আরিফ খান দূর থেকে সব দেখছেন। তিনি জানেন, ছেলে যত বড় ভুলই করুক, এখন তার ভেতরে শুধু একটাই ইচ্ছা — ক্ষমা পাওয়া।তিনি ধীরে বলেন,
— “আসতে বলো ওকে।”
একজন একজন করে সবাই রুম থেকে বেরিয়ে আসে। জাহির বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বের হওয়ার সময় একবার তাকায় আরমানের দিকে।
চোখে রাগ নেই, আছে শুধু ক্লান্তি আর একবিন্দু মানবতা।
— “ভেতরে যান, আমার বোন অপেক্ষা করছে।”
আরমান মাথা নিচু করে রুমে ঢোকে।দরজা বন্ধ হয় আস্তে করে।রুমের ভেতর নিস্তব্ধতা। জারা হালকা চোখ খুলে তাকায়, আরমানকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। তার মুখ ফ্যাকাশে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, হাতের ব্যান্ডেজে নতুন ড্রেসিং।
জারাকে মুখ ফিরিয়ে নিতে দেখে আরমানের বুকটা মুচড়ে উঠে। আরমান ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়।চোখে জল টলমল করছে। বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়, হাত বাড়িয়ে কিছু বলতে চায়, কিন্তু শব্দ বের হয় না।
ওর চোখে শুধু অপরাধবোধ।ওর বুক কেঁপে ওঠে, ঠোঁট কাঁপে, কিন্তু কিছু বলতে পারে না।
জারা চুপচাপ মুখ ফিরিয়ে নেয় জানালার দিকে।
ওর চোখে জমে থাকা জল ঝরে পড়ে চুপিচুপি।
আরমান ওর পাশে বসে পড়ে। মাথা নিচু করে বলে না কিছুই—শুধু হাতের কাটা দাগগুলো তাকিয়ে দেখে। নিজে সেই হাতই তো একদিন জারার চুলে হাত বুলিয়েছিলো, এখন সেই হাতই নিজের কষ্টের সাক্ষী।
ঘরে এক অদ্ভুত নিঃশব্দ কান্না ছড়িয়ে পড়ে।
জারা বলে না কিছুই।আরমানও শুধু তাকিয়ে থাকে।
মেশিনের হালকা শব্দ, জানালার ফাঁক দিয়ে ঢোকা সকালের আলো, আর দুই ভাঙা হৃদয়ের নিস্তব্ধতা—সব মিশে যায় একসাথে।
দু’জনের মাঝখানে যেন এক সমুদ্রের দূরত্ব, তবু বাতাসে একটাই অনুভূতি ভাসে—ভালোবাসা, অনুতাপ, আর একটুকরো আশা।
এই নীরবতার ভেতরেই শেষ হয় আরমানের কান্না জড়িত কন্ঠ দিয়ে
__“ লক্ষী বউ! ”
শব্দটা শুনেই জারা যেন ভিতর থেকে ভেঙে পড়ে। ঠোঁট কাঁপে, চোখ বেয়ে অশ্রু নামে। মুখে কোনো কথা নেই, শুধু নীরব কান্না।
আরমান নিচু হয়ে জারার পায়ের কাছে বসে পড়ে। দুটো পা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, কণ্ঠ কেঁপে ওঠে
—“আমাকে ক্ষমা করে দে বউ… আমি জানি আমি দোষী। আমি তোর বিশ্বাস ভেঙেছি, তোর ভালোবাসাকে অপমান করেছি। কিন্তু আমি তোকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। নিশ্বাস থাকতে আর কোনোদিন তোকে সন্দেহ করব না। শুধু একবার চোখে তাকা…”
জারা মুখ ফিরিয়ে রাখে, কিন্তু চোখের জল বালিশ ভিজিয়ে দেয়। আরমান মাথা নিচু করে ওর পায়ের কাছে চেপে ধরে আছে।
হাসপাতালের সাদা মেঝেতে পড়ে থাকা মানুষটা যেন তার নিজের সব অহংকার, সব রাগ ফেলে দিয়েছে আজ।
কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে আরমান উঠে এসে বিছানায় জারার মাথার পাশে বসে। ওর হাতে জারার হাত ধরে বলে
—“দেখ বউ, আমার হাতেও দাগ আছে। শারীরিক না, মনের দাগ। যেদিন তোকে কষ্ট দিয়েছি, আমি নিজের বুক চিরে ফেলেছিলাম। তুই কষ্টে ছিলি, আমি পাগল হয়ে গেছিলাম।”
জারা কোনো সাড়া দেয় না।চোখ খুলে না, মুখও ঘোরায় না। শুধু ঠোঁট কাঁপে একটু — যেন বুকের ভেতর কিছু চেপে রেখেছে। আরমান আবার বলে,
___“একবার আমার দিকে তাকা, প্লিজ…”
জারা এবার ধীরে মুখ ঘোরায়, কিন্তু চোখে তাকায় না। ঠোঁটের কোণে ব্যথা জমে থাকা একরকম হাসি।
___“আমার দিকে তাকাতে চান? আমি তো নোংরা মেয়ে। আমার মুখ দেখলে কি ভালো লাগবে?”
আরমানের বুকটা ধক করে ওঠে।
__“এমন কথা বলিস না, মানজারা… তুই…”
জারা থামিয়ে দেয়, কণ্ঠ কাঁপছে কিন্তু কথা কেটে যাচ্ছে না,
___“আমি কী? ভালো মেয়ে? না আমি আপনার বিশ্বাসে ধোঁকা দেওয়া কেউ? আপনার চোখে আমি সেই নোংরা মেয়েই তো!”
আরমান এক পা এগিয়ে এসে বলে,
__“মানজারা, থাম… আমি ভুল করেছি। তুই কখনো নোংরা না। নোংরা ছিল আমার ভাবনা, আমার সন্দেহ। আমি…”
জারা মুখ ফিরিয়ে নেয় আবার।
__“আর কিছু বলেন না। আপনারর বলা প্রতিটা কথা আজও কানে বাজে। আপনি বলেছিলেন আমি অন্য ছেলের সঙ্গে মিশি, আমার চরিত্র খারাপ, আমি অভিনয় করি। এখন কেন এই কান্না? আমার জন্য কান্না করছেন কেন?”
আরমান চোখ নামিয়ে ফেলে। চোখে জল চিকচিক করছে।
__“কারণ আমি তোর কাছে হেরে গেছি, বউ। আমি তোকে ভালোবেসে তোরে কষ্ট দিয়েছি। আমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি—কিন্তু তুই …”
জারা হঠাৎ বলে ওঠে,
__“ আপনি তখন কোথায় ছিলেন যখন আপনার দেওয়া আঘাতে আমি রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলাম। আপনি তখন কোথায় ছিলে? যখন আমার চোখে ঘুম আসতো না, আমি ফোন করতাম—আপনার ফোন বন্ধ থাকত । আমি আপনাকে ভালোবেসে ছিলাম আর ভাবছিলেন আমি খারাপ মেয়ে!”
আরমান কাঁপা গলায় বলে,
__“আমি জানি, আমি হারিয়ে গেছিলাম নিজের অহংকারে। আমি ভেবেছিলাম তুই আমায় ঠকিয়েছিস। আমি তো যানতাম না ওই টা তোর ভাই। কিন্তু যখন শুনলাম তুই মরে যেতে চেয়েছিস, তখন আমার বুকটা ফেটে গেছিল। বিশ্বাস কর, বউ, আমি ওই মুহূর্তে নিজের জীবনটা শেষ করতে চেয়েছিলাম…”
জারা এবার মুখ ঘুরিয়ে তাকায়। চোখে কান্না জমে আছে, কিন্তু মুখে কঠিন এক অভিব্যক্তি।
__“কেন করেন নি তাহলে?”
আরমান স্তব্ধ।একটু থেমে নিচু গলায় বলে,
__“কারণ তুই এখনো বেঁচে ছিলি। আমি জানতাম, তুই বেঁচে থাকলে আমি সুযোগ পাব—তোর সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষমা চাইতে।”
জারা ঠোঁটে হালকা হাসি এনে বলে,
“ক্ষমা! আপনার ক্ষমা এখন কী কাজে আসবে? আমি তো নিজের ভিতর মরে গেছি।”
আরমান ওর পাশে বসে পড়ে ধীরে।
__“না, তুই মরিসনি। আমি জানি তুই বেঁচে আছিস—এই চোখের জলে, এই মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায়। তুই এখনো আমায় ভালোবাসিস, তাই এত রাগ।”
জারা চুপ করে থাকে।শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায়। একটা ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পরে ওর গাল বেয়ে।
আরমান হাত বাড়িয়ে সেই জলটা মুছে দিতে যায়, কিন্তু মাঝপথে থেমে যায়।
__“ছুঁয়ে দেখার অধিকারও হারিয়ে ফেলেছি, তাই না?”
জারা ধীরে বলে,
__“আপনি আমার শরীর ছুঁয়েছো অনেকবার, কিন্তু কখনো আমার মনের ভেতর ছোঁয়নি।”
এই এক কথায় আরমানের বুক ভেঙে পড়ে।
চোখ নামিয়ে বলে,
__“তুই ঠিকই বলেছিস বউ। আমি শুধু চাই তুই আমাকে শেষবারের মতো ক্ষমা কর। না হলে এই অপরাধবোধ নিয়ে আমি বাঁচব না।”
জারা নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করে।মুখ ফিরিয়ে নেয় আবার।
__“আপনি যা করতে চান করোন, কিন্তু আমার দিকে তাকাবেন না। আমি আপনার জীবনে দাগ হয়ে থাকতে চাই না।”
আরমান কেঁদে ফেলে এবার, হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে বিছানার পাশে।
__“বউ, তুই যদি না থাকিস, আমি বাঁচব না। আমি তোকে নোংরা বলেছিলাম, কিন্তু আসলে নোংরা ছিলাম আমি। তুই আজও আমার নিশ্বাস…ও লক্ষী বউ। একবার আমার চোখে তাকা, প্লিজ…”
জারা চোখ খুলে তাকায় অবশেষে।আরমানের মুখ ভিজে গেছে কান্নায়। চোখের দৃষ্টি এত অসহায়, এত সত্যি—যে দৃষ্টি দেখে জারা আর মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে না।
ওর ঠোঁট কাঁপে, কণ্ঠ নরম হয়।
__“আপনি জানেন, আমি আপনাকে ঘৃণা করতে চেয়েছিলাম। পারিনি। আমি আজও আপনাকে ভালোবাসি, কিন্তু এই ভালোবাসা এখন শুধু ব্যথা।”
আরমান ধীরে জারার পাশে বসে।ওর হাত ধরে মাথা নিচু করে রাখে। দুজনেই চুপচাপ—একটা শব্দ নেই, শুধু একে অপরের নিঃশ্বাস মিশে যাচ্ছে বাতাসে।
বাইরে জানালার পর্দা দুলছে, সূর্যের আলো দুজনের মুখে এসে পড়ছে। জারা মুখ ফিরিয়ে না নিলেও চোখ নামিয়ে রাখে। আরমানের হাত এখনও ওর হাতে। অজান্তেই দুজনের আঙুল জড়িয়ে গেছে—অসীম কষ্টের মধ্যেও ভালোবাসা বেঁচে আছে নিঃশব্দে। আরমানের চোখের পানি আর সহ্য হচ্ছে না জারা’র কাছে।
জারা কাঁপতে থাকা ঠোঁটে বলে,
__“কেন করলেন এমন? কেন বিশ্বাস করেন নি?”
আরমান মুখ নিচু করে বলে,
__“কারণ আমি তোর ভালোবাসাকে নিজের সম্পত্তি ভেবে ফেলেছিলাম। তোর হাসি অন্য কারও সঙ্গে দেখলেই আমার ভিতর আগুন জ্বলে উঠত। আমি ভেবেছিলাম তুই আমাকে ভালোবাসিস না বউ , ওই দৃশ্যটা দেখে মাথা ঠিক ছিলো, আমি তোকে কষ্ট দিয়ে ছিলাম। ”
জারা হাতটা টেনে নিতে যায়, কিন্তু পারেনা। আরমানের চোখে শিশুর মতো কান্না, চোখের কোনায় জমে থাকা জল ধীরে ধীরে গড়িয়ে পরে জারার হাতে।
জারা কাঁপা গলায় বলে,
__“আপনি জানেন , আমি মরে যাচ্ছিলাম শুধু আপনার সাথে কথা বলতে পারছিলাম না বলে। ফোনটা বন্ধ ছিল আপনার । আমি ভাবতাম, আপনি হয়তো চিরতরে চলে গেছেন।”
আরমান মুখ তুলে বলে,
__“আমি তোকে ছেড়ে যাইনি, আমি নিজের মধ্যেই মরে গেছিলাম, বউ…”
এই বলে আরমান জারার হাত নিজের বুকে রেখে দেয়।
___“এখানে এখনো তোর জায়গা আছে, একফোঁটা নাড়াচাড়া হয়নি।”
জারা তাকিয়ে দেখে আরমানের বুক কাঁপছে।
সে নিঃশব্দে উঠে বসে, চোখে জল।
__“আপনি জানেন, আমি আপনার দেওয়া লাল শাড়িটা পরে ছিলাম? কারণ ওটার সঙ্গে আপনার ছোঁয়া আছে। আমি ভাবতাম, হয়তো আপনি ফিরে আসবেন।”
আরমান কাঁপা হাসিতে বলে,
__“আমি ফিরেছি, লক্ষী বউ… তুই ডাকনি, কিন্তু আমি শুনেছি।”
জারা এবার মুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করে।
আরমান ওর পাশে এসে বসে, আস্তে করে মাথাটা নিজের কাঁধে রাখে।
__“চুপ কর, বউ… আর কাঁদিস না। আমি আছি তো।”
জারা হঠাৎ ওর বুকে মুখ লুকিয়ে দেয়। আরমান শক্ত করে ওকে জড়িয়ে ধরে। দুজনেই কাঁদছে—যেন বহু বছরের জমে থাকা কষ্টগুলো গলে বের হয়ে যাচ্ছে।
আরমানের পিঠে জারার আঙুলের নখ খামচে ধরে আছে। যেন সেই ব্যথাটুকুই আজ জীবনের প্রমাণ। আরমানের কণ্ঠে একটাই শব্দ—
__“ক্ষমা কর, বউ… আর কখনো তোকে কষ্ট দেব না। তুই আমার নিশ্বাস, আমার বেঁচে থাকার কারণ।”
জারা মাথা তুলে তাকায়—চোখে ভেসে থাকা জলরেখায় একটুখানি হাসি।
__“আমাকে আর ছেড়ে যাবেন না! আমি আপনাকে হারানোর ভয় পাই।”
আরমান জারা’র মুখে হাত রাখে
—“তুই আর হারবি না, এই জীবনটাকেই তোর নামে লিখে দিলাম।”
বাইরে সূর্যের আলোটা তখন জানালার ফাঁক গলে তাদের গায়ে এসে পড়েছে। সাদা হাসপাতালের দেয়ালে আলো যেন একটুখানি নতুন ভোরের প্রতিচ্ছবি। নিশ্চুপ ঘরে একমাত্র শব্দ—তাদের নিঃশ্বাসের। জারা চোখ বন্ধ করে আরমানের বুকে মাথা রাখে। আরমান ওর চুলে হাত রাখে, আলতো করে বলে
—“এইবার চোখ বন্ধ কর, বউ। আমি আছি তো। তোর ঘুম ভাঙলে আবার শুরু করব—নতুন করে, শান্তভাবে।”
জারা মৃদু স্বরে ফিসফিস করে,
__“ভালোবাসি…”
আরমান চুপ করে থাকে।
__“ স্বামীজান বলে ডাকবে না আমায়
লক্ষী বউ? ”
আরমানের বুকে মাথা রেখেই জারা বলে
__“ আমাকে তো কেউ না করেছিলো স্বামীজান বলে ডাকতে!”
আরমান জারাকে শব্দ করে চুমু খায়।
__“ আর বললো না লক্ষী বউ। শুধু একবার স্বামীজান বলে ডাকো!”
জারা আবার ফুপিয়ে কেঁদে উঠে। আরমানের বুকে আরও লেপ্টে যায়। কাঁদতে কাঁদতে বলে
__“ স্বামীজান!”
আরমান যেনো শান্তি পেলো একটু। যেনো হাজার বছরের তৃষ্না মিটাচ্ছে। শুধু ওর বুকের ধকধক শব্দে সেই ভালোবাসার উত্তর বাজতে থাকে—ধীরে, গভীরভাবে, চিরস্থায়ী হয়ে।
অনেকক্ষণ ধরে আরমান আর জারা’র কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে কেবিনের বাইরে দাড়িয়ে থাকা সবাই ভয় পেয়ে যায়। কেবিনের দরজা আস্তে খুলে গেলে ভিতরে নেমে আসে নিঃশব্দ বিস্ময়। সবাই থমকে দাঁড়ায়—আরমান জারাকে বুকের মাঝে আগলে গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। দুজনের মুখে শান্তির ছায়া, যেন ঝড় পেরিয়ে অবশেষে আশ্রয় পেয়েছে।
ফারিয়া বেগমের চোখে পানি জমে, কাঁপা গলায় বলেন,
__ “আল্লাহ্, এ যেন অন্য আরমান… সেই ছেলেটা, যাকে আমি হারিয়ে ফেলে ছিলাম।তিন দিন আগে।”
মারজিয়া বেগম মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করেন,
_°“আমার মেয়েটা শান্তি পাক আল্লাহ্, আর যেন কোনো কষ্ট না পায়।”
আনিছুর রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেলেন,
__ “কত ভুল বোঝাবুঝি, কত কষ্টের দাম দিতে হলো এই দুই প্রাণকে।”
আরিফ খান নিঃশব্দে ছেলের মাথায় হাত রাখেন, চোখে অনুশোচনা—“ছেলের চোখে এখন যে শান্তি, তার জন্য কতটা যন্ত্রণা পেরোতে হলো।”
রোহান, রাশেদ, জাহেদ পাশে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে—তাদের চোখে ভয় মিশ্রিত স্বস্তি।
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬১
জিনিয়া মিমের কাঁধে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলে, “শেষমেশ ভালোবাসাই জিতলো, তাই না?”
কেবিনে স্যালাইনের টপটপ শব্দ, জানালার ফাঁক দিয়ে রাতের অন্ধকার আলো এসে পড়ে জারা আরমানের মুখে। সবাই চুপচাপ তাকিয়ে থাকে—প্রার্থনা করে যেন এই ঘুম শুধু বিশ্রামের হয়, নতুন এক শুরুর জন্য।
