আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৬
ইসরাত জাহান দ্যুতি
লোমের গোড়ায় গোড়ায় শীতল হাওয়া এমনভাবে প্রবেশ করছে যে কাটা জেগে ওঠা শরীরে আর্দ্রতা পাওয়ার জন্য ইয়াসিফ ঘুমের মধ্যেই কম্বল খুঁজতে থাকে তড়িঘড়ি করে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে খোঁজাখুঁজির পর শেষে ব্যর্থ হয়ে’ধ্যাত্তেরি’ বলে চোখ মেলে৷ পায়ের কাছে মাথা উঁচিয়ে কোনো গায়ে দেওয়ারই আবরণ না খুঁজে পেয়ে যখন উঠে বসল, মাথাটা তখন বেজায় ভার… শরীরে বল যেন ক্ষীণ৷ মনে হচ্ছিল ওর, এক ঝুড়ি ইটের ভার মাথায় করে রেখেছে যেন আর খায় না বহুদিন৷ যার জন্য শরীরে কোনো শক্তি নেই। চোখ বরাবর হঠাৎ ফকফকা সাদা দেওয়াল দেখে হুঁশ এলো, এ ঘর তো ওর অচেনা! মোটেও নিজের শয়নকক্ষ নয় এটা! আর হঠাৎ করে খেয়াল করল, পা দুটো বাঁধা ওর। এবং পরনে কেবল একটা লিনেন কাপড়ের খয়েরী রঙা লুঙ্গি । তাও সেটা উরুর উপর উঠে আছে৷ এমন ধরনের বাঙালি পোশাক সে রাতের কাপড় হিসেবে একমাত্র বাড়ি ছাড়া কখনই ব্যবহার করে না। তাও মাঝেমধ্যে খুব বেশি গরম পড়লে। ওর নিজের কাপড়চোপড় গেল কই? বুকে, পেটে হাত বুলাতে বুলাতে ভাবনায় পড়ল যখন, তখনই বুকের মাঝামাঝিতে একটা লম্বা আঁচড়ের দাগে আঙুল পড়ল। দ চকিতে সেখানে চোখ নামিয়ে দাগটা আবিষ্কার করতেই হঠাৎ দরজা খোলার আওয়াজ হলো ঘরের ভেতর থেকেই।
কালো রঙা স্লিভলেস টি-শার্ট আর শর্ট প্যান্ট পরনে শেতাঙ্গ এক মেয়ে তখন ভেজা চুল তোয়ালেতে মুছতে মুছতে বাথরুম থেকে বেরিয়েছে। ইয়াসিফ অবিশ্বাস নিয়ে হতবাক দৃষ্টিতে তাকে হাঁ করে দেখে কতক্ষণ। তারপর নিজের বুকের সেই আঁচড়ের দাগটাতে একবার বিস্ময় চোখে লক্ষ করেই ‘য়্যু সেনচুয়াল গার্ল! য়্যু রেপড্ ইন মাই স্লিপ!’ বলেই চেঁচিয়ে ওঠে।
ফ্লোরেন্স ইয়াসিফের অমন অভিযোগে একটু সময়ের জন্য থতমত খেলো৷ তা অবশ্য তার চেহারাতে প্রকাশ পেলো না৷ স্বভাবজাত শান্ত চেহারা ধরে হেঁটে এলো ওর কাছে। ‘তোমার ঘুম খুব মারাত্মক। কীভাবে ঘুমালে? অত নড়াচড়াতেও হুঁশ ফিরল না!’
-‘আমাকে তোমরা দুই বোন কী দিয়ে ঘুম পাড়িয়েছিলে তা তোমরাই জানো। তাই বলে কি ঘুমের মধ্যে এভাবে বেঁধেবুধে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে? তোমরা সাদা চামড়া কি সভ্য হবে না জীবনেও?’ উত্তেজিত গলায় বলতে থাকল ইয়াসিফ।
-‘শাট আপ! কী বলছ তুমি এসব?’ বিরক্ত স্বর ফ্লোরেন্সের।
এবার ভীষণ আহত গলাতে বলল ইয়াসিফ, ‘আরে ঘুমটা ভাঙিয়েই নিতে আমার। আমি কি বাধা দিতাম? বরং তোমাদেরই ঘুমানোর সুযোগ দিতাম না।’ কিছুটা বিরক্ত হয়েও বলল, ‘আর আমাকে কিডন্যাপ করার কী প্রয়োজন ছিল? চাইলে আমি তোমাদের গাড়িতেই বা আমার বাংলোও তো ছিল৷ টেনেটুনে তোমাদের বাড়ি নিয়ে আসার কী দরকার ছিল, বুঝলাম না।’
হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে থাকে ফ্লোরেন্স। বলার মতো সঠিক শব্দই খুঁজে পায় না সে, ইয়াসিফের কল্পনা আর অনুমানের ধরন দেখে৷ এই ছেলেকে তুলে এনে শেষমেশ সে আর মাভিশা বিপদে পড়ল না তো? কেমন লম্পট চোখে তাকে আপাদমস্তক দেখছে! বারবার বুকের দিকেই নজর দিচ্ছে শয়তানটা। আত্মরক্ষার কৌশলে তারা পারদর্শী হলেও শুনেছে, এই পুলিশ অফিসারটা যে মিশনেই ঢোকে তার সাফল্য নিশ্চিত করেই ফেরে। আর ওর অপারেশনগুলোর গল্পও কম শোনা হয়নি৷ এটাকে কতদিন আটকে রাখতে পারবে কে জানে! তবে আত্মবিশ্বাস হারালে চলবে না। রুক্ষস্বরে ওকে হুমকি দিলো, ‘আজগুবি কথাবার্তা বন্ধ করো নয়তো মেরে মুখ ফাটিয়ে দেবো। আর পালানোর চেষ্টা ভুল করেও কোরো না৷’
-‘মানে কী? তোমরা আমাকে সেক্সুয়াল রিল্যাক্সেশনের জন্য ধরে আনোনি?’ চোখে-মুখে চরম বিস্ময় ইয়াসিফের।
ফ্লোরেন্স অসহ্য হয়ে ঘর ছাড়তে পা বাড়াতেই ওকে জিজ্ঞেস করল ইয়াসিফ, ‘ওই কই যাও আমাকে একা ফেলে? মেরিনা কোথায়? তোমরা আমাকে কেন তুলে এনেছ? একজন পুলিশ অফিসারকে কিডন্যাপ করলে? আইনের ভয় নেই তোমাদের?’
মনে মনে মাভিশাকে গালাগালি করে উঠল ফ্লোরেন্স৷ এই অসহ্য প্রাণীটাকে কেন তাদের ঘরেই রাখতে হলো? মাভিশা ফিরলে এটাকে ছুঁড়ে ফেলে আসবে পাশের স্টোররুমে। ছেলেটার চেহারাটা দেখলেই গা জ্বালা করছে এখন। ওর কথাবার্তা তাহলে কেমন করে হজম করবে সে? ফিরে এসে ওর বিছানার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলল, ‘নির্বোধের মতো কথা বলছ কেন? আইনের ভয় থাকলে তোমাকে কিডন্যাপ করতাম? কেন কিডন্যাপ করেছি তা আরেকটু রাত হলেই বুঝবে। মাভিশাকে ফিরতে দাও।’
-‘কী হবে রাতে? তোমরা দু’জন কে বলো তো? কী চাও আমার কাছে?’ চিন্তিত সুর ইয়াসিফের।
ফ্লোরেন্স কোনো জবাব না দিয়ে চলে যেতে উদ্যত হতেই ইয়াসিফ আবার ডাকল, ‘এই সাদা চামড়া! তোমাদের উদ্দেশ্যটা বলো।’
অভদ্রের মতো ডাকাডাকি ফ্লোরেন্সকে চটিয়ে দিলেও সে শান্ত ধারার মেয়ে৷ রাগারাগি, চেঁচামেচি, মারামারি, এসব সে অনেক সাংঘাতিক কিছু না ঘটলে করতে দেখা যায়নি। এগিয়ে এলো ইয়াসিফের কাছে আবারও। বলল, ‘এত অধৈর্য কেন হচ্ছ? বললাম না মাভিশা ফিরলেই সব জানতে পারবে।’
-‘কখন ফিরবে মালটা? আগে যদি জানতাম আমাকে এভাবে গোরুর মতো ধরে বেঁধে কিডন্যাপ করে আনবে, তাহলে আমার কিচেনে দাঁড়িয়ে বাম উঁচু করে কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে নাচতে দিতাম না স্বাধীনভাবে। আর যেন দাঁড়াতে না পারত সে ব্যবস্থাই করতাম প্রতিদিন।’
কথা শেষ হতে না হতেই নাকটা চেপে ধরল ইয়াসিফ আর্তনাদ করে। ফ্লোরেন্সের মুষ্টিঘ্যাত পড়েছে ওর নাকে। বাঁ নাক থেকে নিমেষেই রক্ত গড়িয়ে এলো৷ তার মধ্যেই ঝট করে ওর গলা চেপে ধরে ফ্লোরেন্স ওর মুখের কাছে এসে শক্ত গলায় বলতে থাকল, ‘মায়া করে খুবই সামান্য ড্রাগস দিয়েছে মাভিশা। তখন বলেছিলাম পুরো অর্ধেকটা শরীরে ঢুকিয়ে দিতে। হাদাটা কথা শুনল না আমার। তবে আজকে রাতে তোমার সঙ্গে যা হবে তা সম্পূর্ণ আমার কথামতো হবে৷ তাই জিহ্বা সংযত রাখো। নয়তো আমার অসন্তুষ্টি আরও বাড়বে।’
ঘুম ভাঙার পর থেকে মাথাটা শুধু ভার না, সত্যিই কেমন ঝিমঝিমও করছে বেশ। কিন্তু দুর্বলতাটা জোর করেই কাটিয়ে উঠতে চাইছিল ইয়াসিফ৷ কিন্তু বুঝতে পারেনি শরীরে ড্রাগস ঢুকেছে ওর। মেয়েদুটো আসলেই খুব বিপজ্জনক! কত বড়ো বিপদে পড়ল সে কে জানে! কী আছে কপালে? ঘুষিটা খেয়ে অবস্থা তো আরও শোচনীয় হয়েছেই, উপরন্তু মেয়েটার বলশালী হাতের চাপটা গলাতে ভালোই পড়েছে। হাঁসফাঁস আরম্ভ করল সে শ্বাস নেওয়ার জন্য৷ তা দেখে ফ্লোরেন্স ছেড়ে দিতেই সে গলা ধরে কেশে উঠে নাজেহাল অবস্থা হলো৷ ‘পানি দাও প্লিজ!’ বারবার করে বলতে থাকল৷ কিন্তু তা মোটেও দেওয়ার ইচ্ছা ছিল না ফ্লোরেন্সের৷ নেহাৎ রাতের বেলা আরও বড়ো ঝক্কি যাবে বদমাশ ছেলেটার উপর! ওকে একটু সুস্থ রাখা প্রয়োজন তাই।
পাশে টি-টেবিলের উপর রাখা জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে ওর সামনে ধরল সে। কম্পিত হাতে গ্লাসটা হাতে তুলে নাওফিলের করে দেওয়া অভ্যাসবশত তিন চুমুকে পানিটা শেষ করে চুপচাপ গ্লাসটা এগিয়ে দিলো ইয়াসিফ ফ্লোরেন্সকে৷ হাতটা বাড়িয়ে নিতে গিয়েই অকস্মাৎ ইয়াসিফ সেই হাতটা ধরে এক ঝটকায় কোলের উপর ফেলল ফ্লোরেন্সকে। দুর্বল শরীরে খুব শক্ত করে না আটকে ধরতে পারলেও যতটা শক্ত করে ধরল ফ্লোরেন্সকে, তাতেই ছুট পাওয়া একটু পরিশ্রমের হবে তার জন্য৷ শীতল গলায় তাকে বলল ইয়াসিফ, ‘আমার যে অবস্থা করে রেখেছ তোমরা, তাতে হয়ত পালাতে পারব না। কিন্তু আমার গায়ে আমার বিনা অনুমতিতে একেকটা আঘাতের জন্য কিন্তু খুব বড়ো মূল্য চুকাতে হবে৷ পুরুষ হলে আমার সর্বোচ্চ পর্যায়ের গালিতে কান চেপে ধরে রাখতে হতো তোমাকে৷ আর কাওয়ার্ডের মতো আমার জেগে ওঠার আগেই নিস্তেজ করে না রাখলে আমার কোলে বসারও সুযোগ দিতাম না। সরাসরি… ‘
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৫
কথাটা শেষ করে না ইয়াসিফ৷ শক্ত চোয়াল করে রাখা ফ্লোরেন্সের মুখটা গাঢ় চাউনিতে দেখতে দেখতে হঠাৎ মৃদুস্বরে বলে উঠল, ‘তোমাকে মনে হয় আমি চিনি, মেয়ে।’
-‘আমিও তোমাকে চিনি, গ্র্যান্ডচিল্ড অফ মাহতাব শেখ।’ কটমট করে জবাব দিলো ফ্লোরেন্স।
