রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬৪
সোহানা ইসলাম
রাত তখন প্রায় শেষের দিকে। চারিদিকে ভোরের আলো ছড়িয়ে পরছে। জানালা দিয়ে সূর্যের আলো পড়ে আছে বিছানার ওপর। হঠাৎই আরমান চমকে উঠে বসে। শরীর ঘামে ভিজে গেছে, নিঃশ্বাস ভারী। মনে হচ্ছে কিছু একটা ভুল হয়ে গেছে। কপালে হাত রাখতেই বুঝল, জ্বর যেন হঠাৎ মিলিয়ে গেছে—কিন্তু মনটা আগের চেয়েও ভারী হয়ে আছে।
সে চোখ মেলে পাশে তাকাতেই দেখতে পায়—জারা নিঃশব্দে শুয়ে আছে। চোখদুটি লাল, গাল ভিজে আছে কান্নার দাগে। আরমানের বুক কেঁপে ওঠে। বুঝে যায়—গতরাতে জ্বরের ঘোরে যা ঘটেছে, তা তাদের কারোরই পরিকল্পিত ছিল না।
আরমান ফস করে উঠে পড়ে, কিন্তু পা জড়িয়ে মেঝেতে পড়ে যায় ঠাসড করে। নিজেই নিজেকে গাল দেয়,
__“লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ…” কপালে হাত রেখে জারার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে,
__“আমি ভালো মানুষ, বউ… আমি এসব আকাম করিনি… ভুল করে সঠিক কাজ হয়ে গেছে বউ… আল্লাহ জানে আমি ইচ্ছা করে কিছু করিনি।”
জারা ঘুমায়নি। জেগে ছিলো। শরীরের অসহ্য ব্যথায় তার চোখে ঘুম ধরা দিচ্ছে না। আরমানের শব্দ পেয়েই চোখ মেলে তাকায়।আরমানের দিকে তাকিয়ে জারা ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে। মাথা নিচু করে বসে আছে, কারও দিকে তাকাতে পারছে না। তার কণ্ঠ কাঁপছে,
__ “আপনি একটা খবিশ,ইতর, লম্পট লোক! আমার সাথে …?”
আরমান এক মুহূর্তে নির্বাক হয়ে যায়। কীভাবে বোঝাবে সে নিজেকেও জানে না। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বিছানার পাশে বসে পড়ে। জারার মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝে—সে ভীষণ ভেঙে পড়েছে। মেয়েটার নড়বড়ে অবস্থা। কেমন জব্দ হয়ে বেডের সাথে বসে আছে। মেজে থেকে উঠে এসে জারা’র পাশে বসে।
__“আমার দিকে তাকাও লক্ষী বউ… ,” আরমান নিচু গলায় বলে।
জারা মুখ ফিরিয়ে নেয়। কান্না থামাতে পারে না। __“আমার ব্যথা করছে,” বলে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে।
আরমানের বুকটা যেন পাথর হয়ে যায়। এক অজানা অপরাধবোধে চোখ ভরে আসে। সে ধীরে ধীরে জারার পাশে বসে পড়ে, একটুখানি হাত বাড়িয়ে ওর মাথার চুল সরিয়ে দেয় কপাল থেকে।
__“আমি চাইনি এমন কিছু হোক বউ,” তার কণ্ঠ কাঁপছে,
জারা কাঁদতে কাঁদতে বলে
__“ তাহলে এতো ব্যথা কেন দিলেন?”
__“তুই আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। তোকে কষ্ট দিতে পারি না মানজারা। কিন্তু যা হয়ে গেছে… আমি বলবো ঠিক হয়েছে, এটা আমার হক।”
জারা আরমানের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। কেমন যেনো লাগছে তার। এই ব্যথা সহ্য করতে পারছে না। তবুও একটু শক্তি সঞ্চয় করে বলে
__“ তার মানে.. আপনি আমার সাথে এসব ইচ্ছে করে…? ”
আরমান জারাকে নিজের বুকে আগলে নিয়ে বলে
__“ আমার আল্লাহ যানে আমি এসব ইচ্ছে করে করি নি।আবার ভুল কিছুও করি নি। আমি অনুতপ্ত হচ্ছি না। বরং বংশবৃদ্ধি করার কাজ করেছি! ভালো কাজ! ”
__“ নির্লজ্জ! ” মনে মনে বলে জারা। জারা কোনো কথা বলে না। শুধু কাঁপতে কাঁপতে বসে থাকে। আরমান বুঝতে পারে, এই নীরবতাই সবচেয়ে বড় অভিযোগ।
কিছুক্ষণ পর সে আলমারি খুলে নিজের একটা কালো টি-শার্ট নিয়ে আসে। ধীরে ধীরে জারার কাঁধে সেটি পরিয়ে দেয়, যেন ঠান্ডা না লাগে।
__“ঘুমিয়ে পড়! ” বলে আস্তে করে চুলে হাত বুলিয়ে দেয়।
__ “আমি বাইরে যাচ্ছি একটু।”
জারা আরমানের দিকে না তাকিয়ে বলে
__“ আমাকে আমার রুমে দিয়ে আসুন! না হলে আম্মুকে ডাক দিন।”
আরমান জারাকে ধমক দিতে গিয়ও দেয় না।
__“ শুয়ে থাকো বউ, আমি এসে ফ্রেশ করিয়ে তারপর দিয়ে আসব! ”
__“ না আমি যাবো!”
__“ মানজারা! ” এবার আরমান কড়া চোখে তাকিয়ে ধমক দেয়।
জারা আর কিছু বলে না। আরমানের এই মিষ্টি কথা গুলো শুনে গায়ে আগুন ধরে যাচ্ছে। এই লোকটার সাথে আর কথা বলবে না সে মনে মনে পণ করে।জ্বরে পুরে গেলে ঠিক হতো, কেনো এসেছিলো কাল? নিজের কপালে এখন দিতে ইচ্ছে করছে, কে বলছিলো এতো দরত দেখাতে?
জারার চোখ ভারী হয়ে আসে। শরীরটা ক্লান্ত, মনটা আরও বেশি। কোনো কথা না বলেই চোখ বুজে ফেলে।
আরমান অনেকক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখে একধরনের অপরাধবোধ আর ভালোবাসা একসাথে মিশে আছে। তারপর খুব ধীরে উঠে দাঁড়ায়। দরজার কাছে এসে শেষবারের মতো পেছনে তাকায়—জারা ঘুমিয়ে পড়েছে, মুখের পাশে এখনও শুকায়নি কান্নার দাগ।মনে মনে ভাবে “ আমি তো ভুল কিছু করি নি তাহলে বউ আমার এতো সিরিয়াস মুডে আছে কেন? ” দূর আর ভালো লাগে না বা*ল।
নিচে নেমে আসে নিঃশব্দে। রান্নাঘরে ফারিয়া বেগম এক কাপ দুধ গরম করছেন। আরিফ খান এর শরীর ঠিক লাগছে তাই তিনি এসেছেন দুধ গরম করতে। ছেলেকে দেখে অবাক হন।
__“এই সময় কোথায় যাচ্ছিস, বাবা?”
আরমান মৃদু হাসে—একটা ক্লান্ত, ব্যথা ভরা হাসি।
__“বাইরে একটু যাচ্ছি, আম্মু। মাথাটা ভার লাগছে।”
ফারিয়া বেগম কিছু বলতে যায়, কিন্তু ওর মুখ দেখে থেমে যান। আরমান দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে যায়। ঠান্ডা বাতাসে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর ধীরে ধীরে গেটের বাইরে চলে যায়।
সূর্যের আলোয় ওর মুখে ভেসে ওঠে একটাই কথা—“ভালো মানুষ হওয়া কত কঠিন, বউ একটু সুস্থ হলে আমার মতো ভালো মানুষ কে নাচিয়ে ছাড়বে!”
সূর্যের আলো এখন মাথার উপর , নিঃশব্দে অন্ধকারে ডুবে যায় খান ম্যানশন। কিন্তু আফসোস হচ্ছে কেনো সজ্ঞানে ছিলো না। কি একটা মুসিবত তার। আরও নানা কথা ভাবতে ভাবতে ঔষধের দোকানে যায়।
সকাল প্রায় নয়টা। খান ম্যানশনের উঠোন জুড়ে নরম রোদ ঝলমল করছে। ফারিয়ার লাগানো বেলি ফুলের গন্ধে চারপাশ ভরে আছে। ড্রইং রুমের ভেতরে বসে আছেন পরিবারের বড়রা — আরিফ খান, আসিফ খান আর আনিছুর রহমান। টেবিলে চায়ের কাপ, খবরের কাগজ আর হালকা হাস্যরসের আড্ডা।
আরিফ খান বললেন,
__“আজকালকার তরুণেরা সকাল সকাল উঠে না আর! অফিস থাকলেও বেলা দশটা না বাজলে কেউ দেখা দেয় না।”
আসিফ খান হেসে বলেন,
__“ভাই, আমরা আগের যোগের মানুষ। এখনকার প্রজন্ম তো রাতে কাজ করে, সকালে ঘুমায়। আসচ্ছে একজন !”
এ কথার মাঝেই রোহান গাড়ির চাবি ঘুরাতে ঘুরাতে দরজার ভেতর ঢোকে। মুখে পরিচিত হাসি। বলল,
__“শুভ সকাল সবাইকে! আজ আবার আমার নামে মামলা?”
আসিফ খান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলেন,
__“এই যে চলে এসেছে নিকর্মা। ঘুম থেকে উঠে তার মুখ দেখতে হয়, ঘুমাতে গেলেও তার মুখ দেখতে হয়। আল্লাহ জানে, আমি কি পাপ করেছিলাম।”
রোহান হেসেই ফেলে।
__“শশুর আব্বা, গতকালই আপনার সাথে অফিসের কাজে মিটিং করলাম। তারপরও যদি নিকর্মা বলেই ডাকেন, তাহলে আমি তো সম্মানিতই!”
আসিফ খান গম্ভীর মুখে বলেন,
__“তুমি কথায় কথায় পাল্টা দাও, এটাই তোমার সমস্যা রোহান।”
রোহান এবার শান্ত কণ্ঠে উত্তর দেয়,
__“সবাই যে চুপ করে অপমান হজম করতে পারে না, শশুড় আব্বা। আমি শুধু নিজের সম্মানটুকু রাখতে জানি।”
ঘরে হালকা চাপা নীরবতা নেমে আসে। জিনিয়া নিচে নামছে, হাতে ছোট্ট জেরিনের স্কুলব্যাগ। বাবার আর রোহানের কথোপকথন শুনে থমকে দাঁড়ায়। জেরিন কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে বলে,
__“আপু বাবা ভাইয়ার সাথে ঝগড়া করছে?”
জিনিয়া কোনো উত্তর দেয় না। মুখে শুধু একফোঁটা বিষণ্ণতা। জেসমিন বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলেন,
__“ছেলেটাকে সবার সামনে এইভাবে কথা বলো না জাহেদের আব্বু। রোহান এই বাড়ির হবু জামাই ।”
কিন্তু আসিফ খান রাগের চোটে বলেই ফেলেন,
__“আমি সত্য বলেছি। যেই ছেলেটা আমার মেয়ের পেছনে সারাক্ষণ ঘোরে,দায়িত্ব নিয়ে কোনো কাজ করে না, সে আবার মেয়ের জামাই?”
রোহানের মুখ লাল হয়ে ওঠে। তবুও কোনো উত্তর দেয় না। শুধু চা টেবিলের একপাশে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে নিচের দিকে। আরিফ খান এবার বিরক্ত স্বরে বলেন,
__“আহা!আসিফ, থাম। তুই সীমা ছাড়াচ্ছিস।”
কিন্তু আসিফ খান থামেন না।
__“না ভাই, আমি সত্যি কথা বলছি!”
রোহান এবার ধীরে বলে,
__“আমি কাজ করি, দায়িত্ব পালন করি। আপনি হয়তো দেখেন না, শুধু না দেখে বিচার করেন।”
এর পরও আসিফ খান থামেন না।
__“তুমি আমার সামনে তর্ক করবে না? আমার কথা শেষ না হতেই পাল্টা দেবে না?”
__“ আপনার কথা পছন্দ না হলে অবশ্যই পাল্টা দিব।”
__“কেমন অসভ্য ছেলে! আর এই ছেলের কাছে মেয়ে দেওয়ার জন্য বসে আছো তুমি জেসমিন? ”
জিনিয়া দাঁড়িয়ে আছে নিঃশব্দে। তার চোখ চিকচিক করছে। একদিকে বাবার অপমান, অন্যদিকে রোহানের সম্মান। কোনো কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না।
রোহান এবার ধীরে মাথা নিচু করে বলে,
__“আমি কিছু বলব না, শশুড় আব্বা। আপনি ঠিক। আমি ভুল।”
এ কথা বলেই সে ঘুরে দাঁড়ায়। দরজার দিকে হাঁটতে থাকে। জিনিয়া ডাকতে যায়,
__“রোহান ভাই শোনুন…”
কিন্তু রোহান ফিরে তাকায় না। শুধু বলে,
__“আমি একটু বের হচ্ছি।”
দরজা বন্ধ হতেই ঘরে ভারি নিস্তব্ধতা নেমে আসে। সবাই আসিফ খানের দিকে তাকিয়ে থাকে। আনিছুর রহমান শান্ত গলায় বলেন,
__“ভাইসাহেব, আপনি হয়তো রাগের মাথায় বেশি বলে ফেললেন। ও তো আপনার ছোট ছেলের মতোই। জামাই বলে নয়, মানুষ হিসেবেও এমন কথা সহ্য করা কঠিন।”
ফারিয়া বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলেন,
__“আমি এতক্ষণ শুনছিলাম। আপনি কেন এমন কথা বললেন? রোহান ভদ্র ছেলে। কখনো অসন্মান করে না কাউকে।”
জেসমিন বেগমও যোগ দেন,
__“একটা কথা খেয়াল করুন—সে একবারও আপনাকে উত্তর দেয়নি, শুধু চুপ ছিল।
আপনাকে সম্মান করে বলেই আপনার কথা গায়ে মাখে না। ”
আসিফ খান এবার কিছুটা থেমে যান। মুখে আগের মতো দৃঢ়তা নেই।
__“আমি শুধু ওকে একটু শাসন করছিলাম। কিন্তু তোমরা সবাই আমার কথার বিপক্ষে।”
আরিফ খান বলেন,
__“শাসন নয়, অপমান করেছিস। যার মনের ভেতর সম্মান আছে, সে এমন ভাষায় কথা বলে না।আর রোহান কয়দিন পর তোর মেয়ের জামাই হবে।”
সবাই একের পর এক কথা বলতে থাকে। আসিফ খান চুপ হয়ে যান। তার চোখে একধরনের ক্লান্তি আর অপরাধবোধ। রোহান ফিরছে না দেখে তার মনটা অস্থির হয়ে ওঠে। মনে মনে ভাবে— “আমি কি সত্যিই বেশি করে ফেলেছি? ছেলেটা তো কোনো খারাপ কাজ করে না। শুধু একটু হাসিখুশি স্বভাবের।”
কিছুক্ষণ পর সদর দরজায় শব্দ হয়। সবাই চুপ করে যায়। দরজার ফাঁক দিয়ে রোহান প্রবেশ করে—হাত ভর্তি শপিং ব্যাগ। মুখে হাসি, যেন কিছুই হয়নি।
__“এই যে সবাই একসাথে বসে আছেন, দারুন! এখনো আমার কুটনা শশুড় যায় নি এখান থেকে? ”—রোহান হালকা গলায় বলে।
সবাই অবাক হয়ে ওর দিকে তাকায়। জেসমিন বেগম প্রথম এগিয়ে এসে বলে,
__“বাবা, কিছু মনে করো না। তোমার শশুর একটু রাগী মানুষ।”
রোহান হাসে,
__“না না, আমি কস্মিনকালেও তার কথাগুলো মনে রাখিনি। আজই বা কেন ধরব? আমি গাড়ি থেকে এগুলো আনতে গিয়েছিলাম আম্মু।”
সবাই অবাক। তাহলে এই ছেলে এগুলো আনার জন্য বাইরে গেছে।
__“এগুলো তোমার শশুর আব্বুর পাঠানো। তার ছেলের বউয়ের জন্য উপহার।” বলে ব্যাগগুলো জিনিয়ার দিকে এগিয়ে দেয়।
জিনিয়া চোখে জল নিয়ে ব্যাগ নেয়। ওর ঠোঁটে হাসি ফোটে—দীর্ঘক্ষণ ধরে চেপে রাখা আবেগের মুক্তি। আসিফ খান স্থির হয়ে তাকিয়ে আছেন। কিছু বলতে পারছেন না। রোহানের সেই নির্লজ্জ মার্কা হাসি আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তবে তার ভেতরে লুকিয়ে আছে একটুকরো ব্যথা।
__“আপনি ভাবলেন আমি রাগ করেছি?”রোহান হেসে বলে, “না, আমি যানি! আমি রাগ করলে আপনাকে রাগাতে পারব না কুটনা শশুড় ।”
আসিফ খান বিস্তৃত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এই ছেলের জন্য তাকে কতো কথা শুনতে হলো। আর এ নির্লজ্জের মতো হাসছে। খাবার ব্যবহার করেছিলো বলে অনুতপ্ত হচ্ছিল,আর এই ছেলে। তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন
__“ হতচ্ছাড়া তোমার জন্য আমাকে কতো কথা শুনতে হলো?”
__“ আপনার কান আছে, তাই শুনেছেন! এখানে আমি কি করব?” বলল রোহান। আসিফ খান আরও রেগে যায়।
আরিফ খান মাথা নিচু করে ফেলেন। কিছুটা কাঁপা কণ্ঠে বলেন,
__“ওর কথায় কিছু মনে করো না তুমি বাবা?”
রোহান উত্তর দেয়,
__“আমি ওনার কথায় যদি কিছু মনে করতাম তাহলে আজ আমি এক বাচ্চার বাপ হয়ে যেতাম?”
আসিফ খান রাগে গজগজ করতে করতে বললেন
__“ সবগুলো নির্লজ্জ হয়ে গেয়ে। অসহ্য কর! আমার মেয়ে দিব না এই নির্লজ্জ ছেলের কাছে! ”
এই সময় আনিছুর রহমান পাশে বসে বিড়বিড় করে বলেন,
__“এসব কিছু না ভাই সাহেব, শুধু নির্লজ্জতার বাতাস ছড়িয়েছে ওদের গায়ে।”
ঠিক তখনই দরজার দিক থেকে দৃঢ় কণ্ঠ শোনা যায়—
__“এই কথাটা কি আমায় বললেন
শশুড় আব্বা? ”
সবাই ঘুরে তাকায়। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে আরমান। সাদা শার্ট, গম্ভীর মুখ। চোখে যেন সারারাত না ঘুমানোর ছাপ।
__“ বলছিলাম আর কী! ” বলেই চলে গেলেন এক পাশে আনিছুর রহমান।
__“ তাহলে ঠিক বলেছেন, বাসাত গুলো আপনাদের কাছ থেকেই এসেছে! ”
__“ মানে? কি বলতে চাইছো তুমি? ”
__“ এই যে, আপনারা নির্লজ্জ বলেই তো আমাদের জন্ম দিলেন! না হলে আমার পৃথিবীতে আসতাম?” আরমানের কথায় আর কোনো জবাব দিলেন না তিনি। ফারিয়া বেগম মারজিয়া বেগম দাড়িয়ে হাসছেন। এই ছেলেগুলোর সাথে কথা বলে জিতাই যায় না।
আরমান সবার দিকে তাকিয়ে বলে
__“কি হয়েছে?”—আরমান প্রশ্ন করে চারদিকে তাকায়।
কেউ উত্তর দেয় না। ফারিয়া বেগম বলেন,
__“তুই আসছিস ঠিক সময়েই, বাবা।”
রোহান তখন হাসতে হাসতে বলে,
__“কিছু না ভাই, ছোট একটা ড্রামা হচ্ছিল, তুই এসে শেষ দৃশ্যটা ধরতে পারিস নি।”
আরমানের চোখ যায় আসিফ খানের দিকে।
__“তোমার মুখ এমন লাল হয়ে আছে কেন ছোট আব্বু? ”
রোহান হাসতে হাসতে বলে
__“তোর ছোট আব্বু আমাকে অপমান করে জিততে পারেনি বলে এমন ভাবে ফুঁসসে!”
আসিফ খান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,
__“এই ছেলের কখনো লজ্জা হবে না ।”
আরমান এগিয়ে এসে রোহানের কাঁধে হাত রাখে।
__“লজ্জা থাকলে কখনো তোমাকে নানা ডাক শুনাতে পারবে না ।”
রোহান একচিলতে হাসে।
__“একদম ঠিক বলছিস, এই কথাটাই কেউ বোঝে না ।”
ঠিক তখনই তাদের পিছন থেকে আনিছুর রহমান বলে উঠেন
__“ কি বলে ছিলাম ভাই সাহেব? এগুলোর গায়ে নির্লজ্জতার বাতাস লেগেছে! ”
__“ নির্লজ্জ হওয়াই স্বাভাবিক নয় কি আব্বু? ”জাহির মাএ ড্রইং রুমে এসে বাবার কথা শুনে। তারপর জবাব দেয়।
আরিফ খান এবার হুহা করেই হেসেই ফেলেন।
__“ আপনার ছেলের গায়েও লেগেছে মনে হয়? ”
__“ তা আর বলতে?” তিনি আর দাঁড়ালেন না। চলে যায় রুমের দিকে। মারজিয়া বেগম ও যান স্বামীর পিছনে পিছনে। এখানে ছোট ছেলে থাকলে ঝড় তুলে দিতো! ভাগ্যিস ঘুমিয়ে আছে।
ঘরে তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসে। কেউ কিছু বলে না, শুধু একে অপরের মুখে তাকিয়ে হাসে। ফারিয়া বেগম আস্তে বলেন,
__“চলো সবাই, নাস্তা ঠান্ডা হয়ে যাবে।”
সবাই ধীরে ধীরে ডাইনিংয়ের দিকে এগিয়ে যায়। রোহান জিনিয়ার পাশে বসে। তাদের চোখাচোখি হয়, একটুকরো নরম ভালোবাসার হাসি বিনিময় হয়। বাইরে তখন সূর্যটা একটু উঁচুতে উঠেছে। খান ম্যানশনের সকালের আলো যেন নতুন করে উষ্ণ হয়ে উঠেছে।
আরমান মাএ পা বারায় উপরে যাওয়ার জন্য। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় দরজায় তালা দিয়ে গিয়ে ছিলো। এমনিতে ওর রুমে কেউ যায় না। কিন্তু বলা ও যায় না কখন ঢুকে পরে। আর জারা’র জন্যও মনটা খচখচ করছে। সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত এখন, কিন্তু কোথাও যেনো একটা অজানা অস্বস্তি ভাসছে বাতাসে।
আরমান রুমের দিকে যাচ্ছিল, চোখে ক্লান্তি, মুখে চাপা ভাব। দরজার সিঁড়ি পা ধরতেই পেছন থেকে ফারিয়া বেগমের গলা ভেসে আসে
—“ আরমান! তোর রুমে তালা দেওয়া কেন?”
এক মুহূর্তে আরমান থেমে যায়। মুখের রঙ পাল্টে যায় যেনো চুরি করে ধরা পড়েছে।কি বলবে এখন?এখন যদি জানতে জারা ওর সাথে ছিলো কাল তাহলে কুরুক্ষেত্র বাদিয়ে ফেলবে তার মা। চোখের পলক ফেলতে ফেলতে বলে,
__“না মানে… আম্মু, রুমে একটু কাজ ছিল, তাই…”
ফারিয়া বেগম কপালে ভাঁজ ফেলে বলেন,
__“তোর রুমে কখন থেকে তালা দিতে হয় রে?”
আরমান হেসে ফেলে কেমন করে যেনো,
__ “এইতো আম্মু, কিছু না, ভুল করে দিয়েছিলাম। এখন খুলে দিচ্ছি।”
বেশি কিছু না শুনিয়ে ফারিয়া বেগম মাথা নাড়েন, __“ঠিক আছে, যা। কিন্তু আর যেনো দরজায় তালা না থাকে, জারা কেও দেখছি না সকাল থেকে , কোথায় গেলো মেয়েটা?”
আরমান চমকে উঠে। এখন কী বলবে?
__“ আমি কি বলব?আমি বাড়িতে ছিলাম নাকি? দেখো তোমার মেয়ে কোথায়? ”
ফারিয়া বেগম ছেলের কড়া একটা ধমক দেয়।
__“ তুই এমন করছিস কেনো?তোকে জিজ্ঞেস করছি? ”
আরমান চুপ করে, মাথা নিচু করে রুমে ঢুকে যায়। দরজা বন্ধ করতেই মুখটা নিস্তেজ হয়ে যায়। চোখে একটা চাপা অনুশোচনা, নিজের ভেতরের ঝড়টা যেনো লুকিয়ে রাখতে চায়।
এদিকে নিচতলায় নাস্তার টেবিলে সবাই বসে। টেবিল ভর্তি গরম পরোটা, ডিম ভাজি, চা—সবকিছু সাজানো। আরিফ খান, আসিফ খান, আনিছুর রহমান আর রোহান গল্প করতে করতে চা খাচ্ছেন।
তখনই তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে রাশেদ। অফিস ব্যাগ হাতে, মুখে তাড়া তাড়া ভাব।
__“ বড় আব্বু, আমি অফিসে যাচ্ছি।”
আরিফ খান চা নামিয়ে রেখে গম্ভীর স্বরে বলেন
__“অফিসে যেতে হবে না। আজ ছুটি নে। মিমকে নিয়ে কোথাও ঘুরে আয়।”
রাশেদের পা থেমে যায়। চোখে বিস্ময়।
__“মানে? এখন?”
__“হ্যাঁ, এখনই। সারাক্ষণ অফিস অফিস করিস, বউয়ের সাথে সময় কাটাস না। আজ একটু বাইরে যা, সময় কাটা দরকার।”
ফারিয়া বেগমও পাশে থেকে সমর্থন করেন,
__“হ্যাঁ রে, নিয়ে যা মেয়েটাকে। বেচারী সারাদিন ঘরে বসে থাকে।”
জেসমিন বেগম হেসে বলে ওঠেন,
__“মিমের মুখটা দেখ, লজ্জায় কেমন লাল হয়ে গেছে!”
রাশেদ চুপ করে, একটু ভেবে নেয়, তারপর ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে বলে,
__“ঠিক আছে, তাহলে ঘুরে আসি।”
মিম সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। ওর গাল লাল হয়ে গেছে লজ্জায়। কিছু না বলে শুধু চোখ নামিয়ে নেয়। সবাই হেসে ফেলে।
রোহান আর বসে না বের হয় অফিসে যাওয়ার জন্য। এখন রোহান ওর বাবার সবকিছু নিজেই সামলাচ্ছে। খুব চাপ পরে যায় ছেলেটার উপর। জেরিনও স্কুলে যাবে তাই রোহান জেরিন কে বলে
__“ জেরি চলো তোমায় স্কুলে ড্রপ করে দেই!”
জেরিন রোহানের সাথে চলে যায়।
বাগানে তখন অন্য রকম দৃশ্য। ছায়মা, জিনিয়া আর জোহান মিলে খরগোশগুলোর সাথে খেলছে। ঘাসে বসে খরগোশগুলো একে একে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে, আর ওরা হাসতে হাসতে দৌড়াচ্ছে।
__“এই দ্যাখো, ওটা আমার!” জোহান একটা খরগোশের দিকে ইশারা করে দৌড় দেয়।
ছায়মা হেসে বলে,
__“তোর সবই তো, আমি তাহলে দেখব কী!”
__“ যাবো ছামু আপু আমি আর বোনু অনেক আগে থেকেই খরগোশ পছন্দ করি। আমরা পালনও করতাম! ”
__“ তাই? ” হাসি মুখে বলে ছায়মা
__“ বিশ্বাস না হলে কিউট গার্লকে জিজ্ঞেস করো!”
দুজনের দৌড়ঝাঁপে বাগানটা যেনো হাসিতে ভরে যায়। ঠিক তখনই দূর থেকে জাহির আর জাহেদ এগিয়ে আসে। দুজনের পোশাক পরিপাটি, হাতে মোবাইল। আলাদা এক বাহল্য।
জাহেদ এসে জোহানের পাশে বসে পড়ে,
__“এই নাদুসনুদুস খরগোশগুলোর মালকিন কোথায়?”
জোহান গর্ ভঙ্গিতে বলে,
__“বোনুকে দেখি নি আমি ঘুম থেকে উঠে ।”
ছায়মা একটু অপ্রস্তুত হয়। চোখে পড়েছে জাহিরের উপস্থিতি। মাথা নিচু করে খরগোশের গায়ে হাত বুলিয়ে হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়।
জাহিরের চোখ একবার ছুঁয়ে যায় ছায়মার মুখে, তারপর ইচ্ছে করেও না দেখার ভান করে অন্য দিকে তাকায়। ছায়মা কিছু না বলে ধীরে ধীরে বাগান থেকে বেরিয়ে যেতে থাকে।
__“ ছামু আপু তুমি চলে যাচ্ছো কেন?” বলল জোহান
জিনিয়া হয়তো বোঝলো ছায়মা কেন চলে যাচ্ছে। কি করবে কি বলবে বোঝতে পারে না।
ছাময়া একটুখানি হেসে বলে
__“ একটু দরকার পরেছে জোহান! আমি আবার আসব তুমি খেলো!” এই বলে চলে যায় ছায়মা।
জাহির নিঃশব্দে ওর চলে যাওয়া দেখে। ভেতরে কেমন জানি একটা টান অনুভব করে, কিন্তু মুখে কিছু প্রকাশ পায় না। জাহেদ তখন খরগোশের মাথায় হাত বুলিয়ে হেসে বলে,
__“এই খরগোশটার চেয়ে তো আমি বেশি কিউট!”
জোহান সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে,
__ “চুপ কর ভাইয়া, নিজেকে এতো হ্যান্ডসাম আর কিউট ভেবো না !”
জোহান ভ্রু কুঁচকে বলে
__“ কেন? ”
__“ কারণ তুমি তা নও! ”
সবাই হেসে ফেলে, কিন্তু জাহিরের মুখে একটাও হাসি নেই। সে চুপচাপ উঠে দাঁড়ায়, বাগানের গাছের পাতাগুলোতে চোখ রেখে ভাবনায় ডুবে যায়। মনের ভেতরে কেমন যেনো একটা ঝড়। নিজের সাথে লড়ছে সে—ছায়মা ভালো মেয়ে, কিন্তু… আমি কি ওকে এই জীবনে আনতে পারব?
সে নিজেই উত্তর দেয়, না।
ওদের আর আমাদের মধ্যে পার্থক্য অনেক। আমি বিদেশে ছিলাম, ব্যবসা করব, মধ্যবিদ্য পরিবেশে বড় হয়েছি। নির্দিষ্ট কোনো ভবিষ্যত নেই আমার। ছায়মা এসব মানিয়ে নিতে পারবে না। এই জন্যই দূরে থাকাই ভালো।
বুকে ভারী একটা বোঝা জমে যায়। মুখে শুধু কঠোরতা রেখে সে হাঁটতে শুরু করে, যেনো নিজের আবেগের কাছে হারতে চায় না।
বাড়ির ভেতরে আবারও হাসি ঠাট্টার শব্দ। রান্নাঘর থেকে খাবারের গন্ধ আসছে। বিয়ের আমেজ লেগে গেছে খান ম্যানশনে।এখনোও আত্মীয়জন আসা শুরু করে নি। বাকি আছে বলার।
আরমান রুমে ঢুকে। দেখে জারা বিছানার কোণে বসে আছে। মুখে অভিমান জমে আছে, চোখের নিচে হালকা কালচে ছাপ, হয়তো রাতভর ঘুম হয়নি তার মিষ্টি যন্ত্রণায়। আরমান কিছুক্ষণ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। যেন জানে, সামনে এক ঝড় অপেক্ষা করছে। তবু পা থামে না — ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় জারা’র দিকে।
জারা এবার তাকায়, কিন্তু এক মুহূর্তেই চোখ সরিয়ে নেয়। তার চোখে রাগ, কষ্ট আর লজ্জা একসাথে মিশে আছে। আরমান নিঃশব্দে এসে বসে পাশে। হাত বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু জারা হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়ে। কাঁদতে কাঁদতে কিল ঘুষি মারতে থাকে।
__“একদম আমাকে ছুবেন না অসভ্য লোক ?”
আরমান হতভম্ব হয়ে যায়। কিছু বলে না। জারার প্রতিটি আঘাত যেন নিজের অপরাধবোধের উপর আঘাত হয়ে ফিরে আসে। সে ধীরে সরে গিয়ে দাঁড়ায় দূরে। কিন্তু জারা থামে না। হাতের কাছে থাকা একটা কাপড় তুলে ছুঁড়ে মারে। জিনিসটা গিয়ে সরাসরি আরমানের মুখে লাগে।
আরমান কিছুটা হতবাক হয়ে কাপটা মুখ থেকে সরিয়ে নেয়। চোখের সামনে ধরে এক দৃষ্টিতে তাকায়, তারপর জারার দিকে চেয়ে অবাক হয়ে বলে,
__“ওহ! লাল পরেছিলে?”
জারা থমকে যায়। তারপর মুহূর্তেই রাগে, লজ্জায় গাল লাল হয়ে ওঠে। এই টাই হাতে ওঠতে হলো তার? এখন আরও লজ্জায় পরে গেলো। এই ইনারই হাতে পরতে হলো তার?
__“আপনি একটা…!” কথাটা শেষ করতে না করতেই মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
__“ বউ তুমি এটা মুখের উপর দিয়ে কি ইঙ্গিত করতে চাইছো?”
জারা রাগে ফায়ার হয়ে বলে
__“ নির্লজ্জ পুরুষ মানুষ! এসব কথা বলতে লজ্জা করছে না? ”
__“ তুই তো মুখের উপর দিলে, আর আমি বললেই দোষ!”
আরমান ইনারটা ফেলে দেয় বিছানার পাশে, তারপর ধীরে এসে জারার হাত ধরে। এবার জারা আর কিল ঘুষি দেয় না। কাঁদতে কাঁদতে বলে, __“আমি তোমার সাথে কথা বলব না। একদম না।”
আরমান নরম কণ্ঠে বলে,
__“স্বামী-স্ত্রীর মাঝে এমন হয় বউ। রাগ করিস না। মাফ করে দে, ঘুরতে নিয়ে যাব!”
তার কণ্ঠে এমন এক স্নেহ, যা জারার বুকের ভেতর গলে যেতে থাকে। কিন্তু মুখে কঠিন রাগের ভঙ্গি রেখে জারা বলে,
__“না, আমি মাফ করব না। আপনার জন্য ব্যথা হচ্ছে এখনও।”
আরমান নিঃশ্বাস ফেলে।
__“ঠিক আছে, তুই মাফ করিস না, চল আগে শাওয়ার নিবি।”
সে ওর হাত ধরে ওয়াশরুমের দিকে নিয়ে যায়। জারা চিৎকার করে বলে,
__ “আমি পারব নিজে!”
__“জানি তুই পারবি, কিন্তু আজ একটু আমি করাতে চাই,” — বলে আরমান ধীরে জারার চুলে হাত বুলিয়ে দেয়।
জারা আরমানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বলে
__ “ এক পাও এগোলে দেখো কি করি!”
আরমান প্রথমে থেমে যায়। কিন্তু ধীরে ধীরে জারার দিকে এগিয়ে আসে। জারা নিজেকে আরও ঘুটিয়ে নেয়। আরমান হাসি ধরে খারতে পারে না। হঠাৎ এসে আরমান জারাকে জড়িয়ে ধরে। জারা বোঝতেই পারে না এতো তাড়াতাড়ি হয়ে গেছে। আরমান জারা’র কানে ফিসফিস করে বলে
__“ আমি না হয় সজ্ঞানে ছিলাম না, কিন্তু তুই তো ছিলি…তাহলে….!”
জারা আরমানের কথার মাঝেই বলে উঠে
__“ থাকতে দিলেন কই অসভ্য লোক? ”
আরমান এবার উচ্চ সুরে হেসেই ফেলে। জারা’র গালে টপাটপ কয় একটা চুমু খেয়ে বলে
__“আফসোস হচ্ছে বউ!কেনো যে জ্বরের ঘোরে ছিলাম?”
জারা লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নেয়, কিন্তু কোনো কথা বলে না। আরমান আর লজ্জা দেয় না বউকে। ওয়াশরুমে নিয়ে যায় কোলে করে। গোসল শেষে জারা’র মুখে স্নিগ্ধতা ফিরে আসে, আরমান ওর জন্য নিজের আলমারি খুলে জারা’র একটা মেরুন রঙের ট্রি শার্ট এনে পরিয়ে দেয়। তারপর ওকে বেডে বসিয়ে দিয়ে যায়। আর নিজেও শাওয়ার নেয়।
শাওয়ার নিয়ে আরমান চুল মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসে। এসে দেখে সে জারাকে যেই ভাবে বসিয়ে রেখে গেছে সেই ভাবেই বসে আছে। আরমান এসে জারা’র চুল গুলো হেয়ার ডায়ার দিয়ে শুকিয়ে দেয় যন্ত্র করে। জারা শুধু ওর স্বামীজানের দিকে তাকিয়ে আছে।
জারা’র চুলগুলো শুকানাে হলে আরমান জারাকে নিয়ে আলমারির সামনে এনে দাঁড় করায়। এটা নতুন একেবারে। জারা যেদিন এই বাড়িতে এসেছিলো সেইদিন আরমান এটা আনায়।,কি জন্য এনেছে কেউ যানে না। আরমান জারাকে বলে
__“ খুলো!”
__“ মানে?”
জারা’র অবাক হওয়া দেখে আরমান নিজেই আলমারি খুলে। জারা অবাক হয়ে দেখে, সেখানে একটার পর একটা জামাকাপড় —থ্রি-পিস, চুড়িদার, শাড়ি, টপস, বোরকা,হিজাব, ব্যাগ, জুতা, পারফিউম — সাজানো আছে পরিপাটি করে।
__“এগুলো সব কী?” জারা বিস্ময়ে বলে।
আরমান পেছন থেকে এসে জারা কোমড় জড়ায় আলতো করে।
__ “সব তোর জন্য। আমার লক্ষ্মী বউয়ের জন্য।”
জারা বলে,
__“এতো কিছু?”
__“ আরও বাকি আছে! একদিন সাথে করে নিয়ে যাবো তোমায় শপিং করতে! ”
__“ আমার রুমেও তো কতো জামাকাপড় সাজসজ্জার জিনিস রয়েছে। আম্মু দিয়েছে, ছোট আব্বু, আম্মু দিয়েছে।আবার আপনি? আমাকে এতো জিনিসের নিচে মাটি চাপা দিবে নাকি?”
আরমান হাসে,
__ “না, এগুলো দিয়ে সাজাবো তোকে, আমার রানী সাহেবা বানিয়ে রাখবো।”
জারা এবার একটু হাসে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই আবার মুখ গম্ভীর করে নেয়।
__ “আমি এখনও রাগ করে আছি।”
__“জানি।”
__“আপনাকে শাস্তি দিব আমি ।”
আরমান অবাক হয়ে বলে,
__ “কি শাস্তি?”
জারা মুখ শক্ত করে বলে,
__ “কান ধরে উঠবস করো!”
আরমান হেসে ফেলে,
___ “এইটাও আবার শাস্তি হলো?”
___“হ্যাঁ! আমি বলেছি তো, উঠবস করুন!”
আরমানের চোখে দুষ্টুমি ভরা হাসি। তবু কিছু বলে না। একদম চুপচাপ, বিনা প্রতিবাদে কান ধরে উঠবস করতে শুরু করে।জারা হেসে গড়িয়ে পড়ে।
__ “এইভাবে শাস্তি দিব অপরাধ করলে!”
আরমান বলে,
__ “বউ যা বলবে,আমি তোমার স্বামী তা মাথা পেতে নিব নিরদ্বিধায়।”
জারা আরও হাসে, কিন্তু চোখে জল চিকচিক করে ওঠে।
__“আপনি জানেন আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম।”
আরমান থেমে যায়। তারপর নরম গলায় বলে, __“আমি জানি বউ। আমি সরি ।”
জারা ধীরে ধীরে কাছে এসে ওর গলা জরিয়ে ধরে।
__“আমি রাগ দেখাচ্ছিলাম, কিন্তু আপনার চেহারা দেখে আমার মন কাঁদে গো স্বামীজান ।”
আরমানের ঠোঁটে মৃদু হাসি। জারা’র কপালে চুমু দিয়ে বলে
___“তোর এই রাগই তো আমার প্রিয়।”
দুজনের চোখে চোখ পড়ে। সেই চোখে লুকিয়ে থাকে ক্ষমা, লজ্জা, মায়া—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত শান্তি। জারা হঠাৎ বলে,
__ “ কয়টা বাজে?আম্মু নিশ্চয় আমাকে খুঁজচ্ছে?”
__“ দশটা বাজে ।”
এবার জারা মুখে কৃত্রিম রাগের ভঙ্গি ধরে রাখে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই আরমান ধীরে ধীরে ওর কাঁধে মাথা রাখে। জারা চুপ করে থাকে, না ঠেলে দেয়, না কিছু বলে। কিছু সময় পর আরমান নরম গলায় বলে
__“ তুমি আমার রক্তে মিশে গেছো বউ!”
একটা দীর্ঘ নীরবতা। কেবল বাইরে পাখির কিচিরমিচির শব্দ, ঘরের বাতাসে হালকা পারফিউমের গন্ধ, আর দুটো মানুষের মধ্যেকার নীরব বোঝাপড়া। কিছুক্ষণ পর জারা বলে, __“চলুন নিচে যাই, সবাই হয়তো আমাদের খুঁজছে।”
আরমান জারাকে ছেড়ে দিয়ে বেড সাইড টেবিলের ডয়ার খুলে দুইটা ঔষধ আর পানি এনে জারা’র হাতে দিয়ে বলে
__“আগে এটা খাও, তারপর যাব।”
__“একসাথে দুইটা?”
__“ হ্যাঁ! তাড়াতাড়ি খাও কোনো তালবাহানা করবে না! ”
জারা ওর মুখের দিকে তাকায়। একসময় হাসে।
__“আপনার মতো একগুঁয়ে মানুষ দেখিনি।”
আরমান বলে,
__ “আর আমি তোর মতো অভিমানী রাজকন্যা দেখিনি।”
দুজনেই হেসে ফেলে। তারপর একসাথে নিচে নামে তারা। জারা হালকা গোলাপি চুড়িদার পরে এসেছে — যেটা আরমান বেছে দিয়েছিলো। জারা এসে বসে বসে চেয়ারে। আরমান ও বসে ওর পাশে। ফারিয়া বেগম দূর থেকে দেখে মুচকি হাসেন। বোঝে যায় দুজন একসাথেই ছিলো এতক্ষণ।
তিনি কিছু বললেন না। খাবার টেবিলে এসে প্লেটে খাবার বেরে জারাকেই খাইয়ে দেয়। আরমান একেবারে অফিসের জন্য রেডি হয়ে চিনে নামে। আরমান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
__“আম্মু, আমাকে চোখে দেখছো না ? এখন তো সব মনোযোগ ওর দিকেই!”
ফারিয়া বেগম হাসতে হাসতে বললেন,
__“ তুই তোর বউকে হিংসে করছিস পাজি ছেলে ? এই নে, খা।”
বলে একটা লুচি হাতে তুলে দিয়ে জোর করে আরমানের মুখে ঢুকিয়ে দিলেন।জারা হেসে ফেলল। আরমান একটু ভান করে রাগ দেখাল
__“ আমি দেখছি দিন দিন আমার প্রতি তোমাদের ভালোবাসা কমে যাচ্ছে!”
ফারিয়া বেগম বললেন,
__“২৮ বছর ধরে একা একা আদর খেয়েছিস এখন ওকেও সুযোগ দে?”
সবাই হেসে ওঠে।ফারিয়া বেগম দুইজনকেই খাইয়ে দেন। আরমান ও জারার চোখাচোখি হয় — মুহূর্তটায় মিষ্টি এক ভালোবাসা জমে ওঠে।
খাওয়া শেষ করে আরমান উঠে দাঁড়ায়। গম্ভীর মুখ করে বলে,
__“আম্মু, আমি একটু আব্বুর রুমে যাচ্ছি।”
ফারিয়া বেগম হেসে বলেন,
__“যা, তোর আব্বু রুমে আছে।”
আরমান জারার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বলে,
__“ আম্মু দেখো তো আজ তোমার ছেলের বউকে একটু বেশি সুন্দর লাগছে না? ”
ফারিয়া বেগম তাকায় জারার দিকে। সত্যি আজ অন্য রকম লাগছে।
__“ হ্যাঁ! সত্যি তো!”
__“ নতুন নাইট ক্রিম দিয়েছি কাল! ” বলেই আবার চোখ টিপ দিয়ে আরমান। তারপর চলে যায় সেখান থেকে।
ফারিয়া বেগম জারা’র মুখের দিকে তাকিয়ে বলে
__“ আমার ছেলে যে ক্রিম এনে দিয়েছে, সেটা প্রতিদিন লাগাবি!”
জারা লজ্জায় মাথা নুইয়ে যায়। আরমানের কথা যদি ওনি বোঝতো তাহলে কখনো বলতো না। এই লোকটাও হাড়ে বজ্জাত।
আরমান বাবার রুমে ঢোকে। আরিফ খান টেবিলের ওপর কাগজপত্র ছড়িয়ে বসে আছেন।
তিনি চোখ তুলে ছেলেকে দেখে বলেন,
__“ ভিতরে এসো, কী খবর?”
আরমান একটু চুপ থেকে বসে যায়।তারপর বলে,
__“আব্বু, একটা কথা বলব?”
আরিফ খান মুচকি হাসলেন,
__“বলো, শুনছি।”
আরমান গম্ভীর স্বরে বলল,
__“আমার মনে হয়, বিয়ের অনুষ্ঠানটা ছোট করাই ভালো হবে। এতো মানুষের দরকার নেই।”
__“ কেন?”
__“ আমি চাই না আমার স্ত্রীকে শত শত লোক দেখুক, মন্তব্য করুক। আমি শুধু আমাদের পরিবারের মধ্যে রাখতে চাই।”
আরিফ খান অবাক হয়ে তাকালেন।
__“তুই কেনো এমন ভাবছিস?”
আরমান শান্ত স্বরে উত্তর দেয়,
__“ওর এখনও মানিয়ে নিতে সময় লাগবে। আমি চাই না ওর অস্বস্তি হোক। ভালোবাসা মানে শুধু নিজের নয়, অপরজনের স্বাচ্ছন্দ্যটাও রক্ষা করা।”
আরিফ খান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন,
___“তুই একদম তোর মায়ের মতো কথা বলছিস। ঠিক আছে, তাহলে শুধু নিজেদের লোক, নানাবাড়ির কয়েকজন, আর রাশেদের শ্বশুরবাড়ি—এই পর্যন্তই।”
আরমান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে,
__“ধন্যবাদ, আব্বু।”
বাবা-ছেলের মাঝে এক ধরনের বোঝাপড়ার নীরব হাসি বিনিময় হয়। রুম থেকে বেরিয়ে আরমান আবার জারার খোঁজে যায়। জারা তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ফুলে পানি দিচ্ছে। সূর্যের আলোয় ওর মুখটা ঝলমল করছে।
আরমান এসে পাশে দাঁড়ায়।
__“ফুলে পানি দিচ্ছো, কিন্তু স্বামীকে এক ফোঁটা সময় দিচ্ছো না ?”
জারা ভ্রু কুঁচকে বলে,
__“আপনাকে সময় দিতে হয়।”
__“তোমাকে রাগাতে ভালো লাগে, বউ।”
__“আপনার আর কাজ নাই।”
__“আছে, একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ।”
__“কি সেটা?”
আরমান মুচকি হেসে বলে,
__“একটা চুমু খাবো ।”
জারা কিছু বলতে যায়, কিন্তু মুখে লজ্জার ছাপ।
আরমান সামনে এগিয়ে এসে জারাকে কোমড় জরিয়ে ধরে বলে,
__“একদিনের মধ্যেই তোমাকে এত সুন্দর লাগছে যে মনে হয়, এই বাড়ির আলো তোমার থেকেই ছড়ায়।”
জারা এবার রাগ দেখানোর ভান করে,
__“চুপ করুন! শুধু বেশি বেশি ?”
__“বেশি না, সবাই জানুক আমার বউ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর।”
জারা মুখে কৃত্রিম রাগ এনে বলে,
__“আপনি যাবেন?”
আরমান মৃদু হাসে,
__“রাগ কোরো না লক্ষী বউ, রাগ করলে আরও সুন্দর লাগে। এখন একটা এনার্জি ট্যাবলেট দাও অফিসে যাব।”
জারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, কিন্তু গালের কোণে টুকরো হাসি খেলে যায়। আরমান আর অপেক্ষা করে না জারা’র দুগালে হাত দিয়ে নিজের দিকে এগিয়ে এনে জারা’র ঠোঁট দুটো দখল করে ফেলে। জারা আরমানকে সরাতে ওর বুকে কিল ঘুষি মারে। আরমান ছাড়ার পাএ নয়। সে মিনিট পাঁচ এক পর ছেড়ে দেয় জারাকে। ঠোঁটে আঙুল ঘসে জারা’র দিকে মাদকতা নিয়ে বলে
__“ মিষ্টি! ”
__“ নির্লজ্জ পুরুষ! ”
__“ তোমার গো ! ”
জারাকে ছেড়ে দিয়ে কলার ঠিক করে। দরজার কাছে এসে জারার দিকে তাকিয়ে বলে,
__“দুপুরে খাওয়া শেষ হলে আমার ফোনে একটা ‘মিস কল’ দিও।”
জারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
__“কেন?”
আরমান হেসে বলে,
__“শুধু জানব, আমার লক্ষী বউটা ঠিক আছে কি না।”
জারা তাকিয়ে থাকে ওর দিকে—চোখে অজস্র ভালোবাসা, মুখে লজ্জার ছাপ। আরমান দরজার বাইরে পা রাখতেই জারা বলে ওঠে,
__“শুনোন, তাড়াতাড়ি আসবেন।”
__“এখনই মিস করছো বউ?”
জারা মৃদু হেসে বলে,
__“আপনাকে মিস করতে বয়ে গেছে ।”
আরমান একপলক তাকিয়ে থেকে বলে,
__“সত্যি?”
__“ একদম! তিন সত্যি! ”
__“ মন থেকে বলছো বউ?”
__“ হ্যাঁ মন থেকে বলছি!”
__“ আচ্ছা! তাহলে আর কল করতে হবে না। বায়! ”
বলে দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে যায়। জারা হা করে আরমানের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটা কি রাগ করলো না কি?
ময়মনসিংহের রাস্তায় তখন হালকা গরমের দুপুর। আকাশে রোদের ঝিলিক, মাঝেমধ্যে মেঘ ভেসে যাচ্ছে অলসভাবে। গাড়ির জানালা খুলে বাইরে তাকিয়ে ছিলো মিম। গরম বাতাসে চুল উড়ছিলো, তবুও ওর চোখে ক্লান্তি নয়—ছিলো একরাশ উচ্ছ্বাস। রাশেদ নিঃশব্দে গাড়ি চালাচ্ছিলো, মাঝে মাঝে পাশে তাকিয়ে হালকা হাসছিলো।
গাড়ি থামল শম্ভুগঞ্জ ব্রহ্মপুত্র নদীর ঘাটে। সূর্যের আলো নদীর জলে পড়ছে সোনালি ঝিকিমিকিতে। চারপাশে নিস্তব্ধতা, শুধু বাতাসে গরমের মৃদু হাওয়া আর পানির গন্ধ। মিম পায়ের স্যান্ডেল খুলে নদীর ধারে হাঁটল। গরমে মুখে ঘাম, তবুও মনটা ছিলো ঠান্ডা।
রাশেদ দূর থেকে তাকিয়ে দেখছিলো, মিম পানিতে পা ডুবিয়ে ছোট ঢেউ তুলছে। নদীর জল চকচক করছে রোদে, যেন ওর হাসির প্রতিচ্ছবি। কোনো কথা ছিলো না, তবুও সেই নীরবতায় কত কথা জমে ছিলো দুজনের মাঝে।
কিছুক্ষণ পর তারা হাঁটতে হাঁটতে চা-বাগানের পাশে চলে গেল। দুপুরের রোদে পাতাগুলো ঝিলমিল করছে, গাছের ফাঁক দিয়ে আলো ছড়িয়ে পড়ছে পথ জুড়ে। মিম ঘামে ভিজে গেলেও থামেনি; চারপাশের সবুজে ওর চোখ হারিয়ে যাচ্ছিলো। রাশেদ ওর পেছনেই হাঁটছিলো ধীরে ধীরে। মাঝে মাঝে ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে মিমকে দেয়, মিম চুপচাপ এক চুমুক খায়, চোখে কৃতজ্ঞতা।
দুপুরের পর তারা একটুখানি ছায়াময় জায়গায় বসে পড়ল। পাশেই ছিলো এক দোকান, সেখানে পাওয়া যাচ্ছিলো ঠান্ডা নারকেল পানি আর ঝাল মুড়ি। রাশেদ দুটো নারকেল আনল, মিম একটু হাসলো—ছোট ছোট আনন্দ যেন সারাটা দিন ভরিয়ে তুলেছে।
গরম বাতাসে মিমের চুল এলোমেলো, মুখে ঘামের ছাপ, কিন্তু রাশেদের চোখে সে আগের চেয়েও সুন্দর লাগছিলো। কোনো শব্দ না করে দুজনেই বসে রইল কিছুক্ষণ, শুধু নদীর শব্দ আর বাতাসের সোঁদা গন্ধে ভরে গেল মুহূর্তটা।
তারপর তারা কাছের ছোট রেস্তোরাঁয় ঢুকে খেতে বসল। ঘরটা বাঁশের, জানালা খোলা, ভেতরে আলো নরমভাবে ঢুকছে। প্লেটে গরম ভাত, ডাল, রুই মাছের ভুনা আর ঠান্ডা লেবুর শরবত। মিম ধীরে ধীরে খাচ্ছিলো, মাঝে মাঝে চামচ থামিয়ে বাইরে তাকাচ্ছিলো—দুপুরের রোদ এখন হালকা হয়ে গেছে, আকাশে মেঘের ছায়া পড়ছে।
খাওয়া শেষে তারা আবার নদীর ধারে ফিরে এল। এবার গরমটা কিছুটা কমে এসেছে। বাতাসে আর্দ্রতা আর শান্ত ছোঁয়া। মিম নদীর দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকল, পাশে রাশেদ। সূর্য পশ্চিমে হেলছে, আলো ফিকে হচ্ছে, নদীর ঢেউয়ে সেই আলোর ছায়া নাচছে। মিম রাশেদ কে বলে
__“ আজ সত্যি অনেক ভালো লাগছে! ”
__“হুমম! ”
আবার দুজনের মাঝে নিরবতা। মিম গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। নিরবতা ভেঙ্গে মিম বলে
__“ শুনুন? ‘
__“ হুম বলো! ”
__“ আমার না ভালো লাগছে না! মাথা ব্যথা করছে! ”
রাশেদ এ কথা শুনা মাএ মিমকে নিজের কাছে আগলে নেয়। ওর মাথায় হাত ভুলিয়ে দেয়। গাড়িতে ফেরার সময় মিম ক্লান্ত ছিলো, কিন্তু মুখে তৃপ্তির হাসি। রাশেদ গাড়ি চালাতে চালাতে একবার তাকাল ওর দিকে। জানালার বাইরে রোদ পড়েছে, আর মিমের চোখে শান্ত দুপুরের প্রতিফলন—যেন একদিনের ভ্রমণ নয়, ছিলো এক মুহূর্তের শান্ত সুখ।
বিকেল চারটা। অফিসের জানালার বাইরে রোদের শেষ আলোটা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক শব্দ করছে, কিন্তু ঘরে যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।
আরমান ডেস্কে বসে কিছু ফাইল দেখছিলো। চোখে ক্লান্তি, মুখে গম্ভীরতা। চায়ের কাপের পাশে পড়ে আছে ফোন— সারাদিন ধরেই চুপ।
সকালে হালকা কথা কাটাকাটির পর জারার সাথে ওর কথা হয়নি। রাগ করে ভেবেছিল, “আমি আগে কল করব না, সে-ই বুঝুক ভুল করেছে।”কিন্তু সারাদিন কেটে গেছে, জারা একটা কল পর্যন্ত করে নি।
এই ভেবে ওর বুকের ভেতরটা গরম হয়ে ওঠে। চশমা খুলে চোখে হাত বুলায়।— “পাষাণ মেয়ে একটা, সারাদিনে একবারও মনে পড়ল না আমায়!”নিজের মনেই বিড়বিড় করে।
ঠিক তখন দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে রোহান। মুখে চিরচেনা হাসি, হাতে ফোন।
— “এই ভাই, তুই আজ বেশ গম্ভীর হয়ে আছিস।”
আরমান তেমন সাড়া দেয় না।
— “কাজ করছি, দরকার থাকলে বল,না থাকলে যা এখন ।”
রোহান চেয়ার টেনে বসে পড়ে।
— “এখন কাজ না, একটা বিপদ হয়েছে। চাঁদ সুন্দরী ফোন ধরছে না। তিনবার কল দিয়েছি, একবারও না!”
আরমান চশমাটা টেবিলে রাখে, বিরক্ত গলায় বলে,
— “তাহলে আমি করি করব?”
রোহান হেসে বলে,
— “ভাবিকে একবার কল দে না, উনি তো জিনিয়াকে বলতে পারেন। একটু দরকার ছিল ওর সাথে।”
আরমানের মুখের গাম্ভীর্য আরও গভীর হয়।
— “পারব না।”
রোহান একটু থামে, তারপর অনুনয় করে বলে,
— “এই ভাই, রাগ করছিস কেন । একবার কল করে বল না, প্লিজ একবার দে না।”
আরমান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে।
তারপর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ফোনটা তুলে নেয়। স্ক্রিনে “লক্ষী বউ💙” নামটা দেখা যায়।
একটু তাকিয়ে থাকে, যেন নামটার ভেতরেই রাগ জমে আছে। তারপর কল দেয়।ফোন বেজে ওঠে— একবার, দু’বার, তিনবার। কেউ রিসিভ করে না।
রোহান বলে,
— “ভাই, হয়তো ব্যস্ত আছে।”
আরমানের কণ্ঠ কঠিন হয়ে ওঠে,
— “না, সে জানে আমি কল দিচ্ছি।”
আবার কল দেয়। এইবারও না। চোখে হালকা দুশ্চিন্তা। পাঁচ মিনিটের মধ্যে পর পর চারবার কল দেয়— তবুও নীরবতা।
রোহানের মুখের হাসিটা মিলিয়ে যায়।
— “কিছু হয়েছে তোদের মাঝে ?এই জন্য কল তুলছে না?”
আরমান কিছু বলে না, কেবল ফোনটা টেবিলে রাখে। তারপর আবার তুলে নেয়।তার বুকের ভেতরটা কেমন হালকা কাঁপছে।রাগটা এখন চিন্তায় মিশে গেছে।
— “হাফ ইঞ্চির বাচ্চা কল টা ধর।” বলে ওঠে নিচু গলায়।
রোহান এবার সিরিয়াস হয়ে যায়,
— “চল ভাই, একবার বাড়ি গিয়ে দেখি।”
আরমান চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায়। মুখে কোনো কথা নেই। চোখে ঝড়ের ছায়া। কেবিনের দরজা খুলে পা বাড়ায় দ্রুত।
রোহান পিছু নেয়। করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আরমান শুধু বলে,
— “বাড়ি গিয়ে যদি দেখি ইচ্ছে করে কল তুলছে না, তাহলে মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলবো।”
রোহান কিছু বলতে পারে না। লিফটে উঠেই আরমান বারবার কল দেয়। প্রতিবারই শুধু একই শব্দ— রিং…রিং…রিং… তারপর নিস্তব্ধতা। লিফটের আয়নায় নিজের মুখটা দেখে আরমান।
রাগ, চিন্তা, অপরাধবোধ— সব একসাথে ফুটে আছে। গাড়িতে উঠেই ও দ্রুত ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়।
রোহান বলে,
— “ধীরে ভাই, এমন করে গাড়ি চালাস না।”
আরমান কেবল বলে,
— “আমার বউ ফোন ধরছে না, আর আমি শান্ত থাকব?”
রোহান থমকে যায়। জানে, এই মুহূর্তে আরমানকে কিছু বলা যাবে না। রাস্তায় হালকা যানজট। হর্ণের শব্দ, মানুষের ভিড়। আরমানের মাথায় একটাই চিন্তা— “মানজারা ঠিক আছে তো?”
প্রতিটা সিগন্যালে দাঁড়ালে আবার ফোন দেয়।
এবারও কোনো সাড়া নেই। রোহান ধীরে বলে,
— “চিন্তা করিস না ভাই, ও হয়তো রুমে নেই বা চার্জ শেষ।”
আরমান নিচু স্বরে বলে,
— “আমার মন বলছে কিছু একটা ঠিক নেই।”
তার কণ্ঠে এমন এক ব্যাকুলতা, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে আপন মানুষটিকে হারানোর ভয়। গাড়ি যখন তাদের বাসার রাস্তার মোড়ে পৌঁছায়, তখন সূর্য ডুবে যাচ্ছে। আকাশ লালচে হয়ে গেছে, হালকা বাতাস বইছে।
আরমান ব্রেক কষে গাড়ি থামায়, দরজা খুলে নামতেই হঠাৎ ফোনে একটা মেসেজ আসে।
রোহান বলে,
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬৩
— “দেখ, ভাবির মেসেজ না?”
আরমান তড়িঘড়ি করে ফোন তুলে স্ক্রিনে তাকায়—মেসেজটা জারা’র নয়, অফিসের কোনো নোটিফিকেশন। ওর মুখের ক্লান্তি আরও বাড়ে।
রোহান চুপ করে থাকে। আরমান এবার গভীর নিঃশ্বাস নেয়, হাত দুটো স্টিয়ারিং-এ রাখে।
