রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬৮
সোহানা ইসলাম
খান ম্যানশনে আজ ভোর থেকেই যেন অন্যরকম এক হাওয়া বইছে। পুরো বাড়িটাই আলোকসজ্জা আর ফুলের গন্ধে ভরে গেছে। যেন প্রতিটা দেয়াল, প্রতিটা জানালা আজ উৎসবের রঙে রাঙা।কারণ আজ তিন তিনটা হলুদ কন্যা—জারা, ফিহা আর জিনিয়া।
আরমান ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই নিজের রুমের দরজা খুলে বাইরে তাকালো। চারপাশে শুধু ব্যস্ততা। একদল লোক লাইট লাগাচ্ছে, আরেক দল স্টেজ বানাচ্ছে বড় ড্রইং রুমে।
কিন্তু তার চোখ খুঁজছে একমাত্র মানুষটাকে—
মানজারা। তার লক্ষী বউকে সে সকাল থেকে দেখতেই পায়নি। পার্লার থেকে লোক এসে মেয়েদের পুরো বাড়ির এক পাশ দখল করে নিয়েছে। আরমানের সেখানে ঢোকার প্রশ্নই উঠে না।
মনে মনে সে রাগ করল,
__“আজকে বউকে একবার দেখতেও দেবে না? কী জীবন!”
রোহান, জাহেদ আর আরমান তিনজন মিলে তাদের বউদের জন্য শপিং করে গতকাল রাত পর্যন্ত। তারা তাদের বউদের নিজের পছন্দ দিয়ে সাজাবে। আর সবাই যে যার মতো করে শপিং করে নিয়েছে। আরমানই জারার হলুদের শপিং করেছে।কারণ সে তার বউকে নিজের পছন্দ মতো সাজাবে। রঙিন গয়না, হলুদ-কমলা মেহেদি শাড়ি, চুলের ফুল—একটা জিনিসও জারা নিজের হাতে নিতে পায়নি।
জেসমিন বেগম হাসি মুখে বলেছিলেন
—“বৌমা আজ বাড়ি থেকে বের হবে না। তুই যা কিনেছিস, সেটাই পরে সাজবে। বউকে আদর করতে হলে বিয়ের পর করবি।”
আরমান শুধু হেসেছিল,কিন্তু ভিতরে ভিতরে তোশামোদ করে বলে
—“আমার বউকে সবচেয়ে সুন্দর লাগবে আজ।”
বাড়ির ড্রইংরুমে ছোট্ট জোহান দৌড়ে বেড়াচ্ছে, কখনো লাইট টেনে ধরে, কখনো ফুলে হাত দেয়।সব কিছু নিয়ে তার মাতব্বরি। তার বোনুর বিয়ে তার একটা দায়িত্ব আছে না। সে আরমানের সাথে ওই দিনের পর থেকে ঠিক মতো কথা বলে না। খুব রাগ করছে সে।কতো মানুষের সামনে তার ইজ্জতের রফাদফা করে দিয়েছে।আরমান জোহান কে একটু পর পর ডাকে কিন্তু জোহান আরমানকে পাওা দেয় না। সে যাবে না, কথাও বলবে না। তার এই ছোটাছুটির জন্য তার পাশেই ছায়মা আর জেরিন তাকে সামলাতে ব্যস্ত।
ছায়মা বলল,
__“জোহান, এদিকে আয়! এগুলো ভাঙলে আন্টি মারে দিবে কিন্তু!”
জোহান দুষ্টু হাসি দিল,
__“না না, আমি তো সাজাচ্ছি ছামু আপু!”
সবাই হাসলো।মারজিয়া বেগম আর পারেন না এই ছেলেকে সামলাতে। খুব পাজি ছেলে। আনিছুর রহমান কতো করে বললো ওনার সাথে বাগানে যেতে কিন্তু কে শুনে কার কথা।
দুপুরের দিকে রোহান তার বাবা আর কয়েকজন আত্মীয় নিয়ে বাড়িতে চলে আসে। মুখটা একটু গম্ভীর। ভিতরে ভিতরে সে মানতেই পারছে না—
জাহেদ আর ফিহার বিয়েও ওর সাথে হচ্ছে। আর সে এখনো জিনিয়াকে বিয়ে করতে পারেনি। যদিও কাল সব অপেক্ষার অবশান শেষ করে তার চাঁদ সুন্দরী তার হতে যাচ্ছে। তবুও রোহান আজকের উৎসবটা পুরোপুরি উপভোগ করতে পারছে না।
রোহান এসে সাদে বসেছে আরমান, জাহেদ, রাশেদ, জাহিরের সাথে। সাদটা তাদের মতো এতিম দের জন্য ঠিক আছে। বিয়েটা ঘরোয়া ভাবে হবে তাই ড্রইংরুমে সব কাজ চলছে। ফারিয়া বেগম আজ খুব ব্যস্ত। বাড়িতে এতো কাজের লোক থাকতেও তার হাতের কাজ শেষ হচ্ছে না।ছেলের বিয়ে মেয়ের বিয়ে তার কতো দায়িত্ব। তাই তিনি মিম আর ছাময়া কে দিয়ে আরমানদের জন্য কিছু খাবার আর শরবত পাঠান। মিম ও ছায়মা হাসিমুখে শরবত এনে দিল।
জাহিরের চোখ ছায়মার দিকে আটকে গেল। সেই মুহূর্তেই জাহেদের মামার ছেলে এসে ছায়মার পাশে দাঁড়াল, কথা বলা শুরু করল।জাহিরের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।সে চুপচাপ মুখ ফেরালো, কিন্তু তার চোখের অভিমানটা জাহেদ ঠিকই ধরে ফেলল।
জাহেদের মামাতো ভাই সানি।ছায়মা আর সানি আগে থেকেই পরিচিত। তাই তাদের কথাবার্তা ও একটু স্বাভাবিক। জাহির খেয়াল করে সানি ছায়মার দিকে কেমন করে যেনো তাকায়। সহ্য হচ্ছে না তার। রাগ উঠে যায়। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলে।
একবার ছায়মার দিকে তাকায় তো আবার সানির দিকে। দৃষ্টি তার এমন যে সানি কে একা পেলে খেয়ে ফেলবে। সানি একেবারে ছায়মার কাছে এসে বলে
__“ ছায়মা তুমি নিচে যাও আন্টি খুঁজছে।
ছায়মা একবার জাহিরের দিকে তাকায়। লোকটার দৃষ্টি দেখে আত্মা কেঁপে ওঠে। কেমন করে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ তার সাথে এমন করছে কেনো লোকটা এটাই ভাবছে। কিন্তু দৃষ্টি দীর্ঘ স্থায়ী করে না। সানির দিকে তাকিয়ে হাসি দিয়ে বলে
__“আচ্ছা ভাইয়া! ” বলে মিমের হাত ধরে নিচে চলে যায়। সানিও তাদের পিছনে পিছনে চলে যায়।
তারা চলে যেতেই রোহান একটু আয়েসি ভঙ্গিতে বসে।তার পর আরমান কে বলে
__“ দোস্ত! আমার মনে হয় সানি ছায়মাকে পছন্দ করে! ”
এটা শুনে যেনো জাহিরের মাথা আগুন ধরে যায়।জাহেদ রাশেদ একটু ঠিক হয়ে বসে। খুব আগ্রহ তাদের এই বিষয় নিয়ে। তারাও লক্ষ্য করছে কাল থেকে। সানি আসার পর থেকে ছায়মার পিছনে পরে আছে। আরমান আগের মতোই বসে আছে। তার কোনো ভাবনায় নেই। আরমান একবার আড় চোখে তাকায় জাহিরের দিকে। জাহিরের হাতের দিকে তাকিয়ে যা বোঝার বোঝে গেছে।
__“ করতেই পারে। ভাবছি ফুপ্পি আর ফুফাকে বিষয় টা জানিয়ে ওদের বিয়ে ঠিক করে রাখবো, আমি বড় ভাই দায়িত্ব আছে না একটা। ”
ব্যাস! আর সহ্য করতে না পেরে ঠাসস করে উঠে দাঁড়ায় জাহির।কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা নিচে চলে যায়। রোহান, রাশেদ আর জাহেদ তাকে পিছন থেকে ডাকছে। কিন্তু জাহির না শুনে চলে যায়। আরমান বাঁকা হাসে।
পার্লারের টিম বাড়ির উপরের একটি বড় রুম পুরোটা দখল করে সাজগোজ করছে। জারা, ফিহা আর জিনিয়া—তিনজনই আলাদা আলাদা জায়গায় বসেছে। চারপাশে রঙিন ফুল, হলুদ গয়না, মেহেদির গন্ধ, আর মেয়েদের খিলখিল হাসি।
আরমান ওর মাকে পই পই করে বলেছে ওর বউকে শাড়ি পরানোর সময় যেনো শরীরের একটু না দেখা যায়। আর মাথায় যেনো হিজাব পরে। এতো ভারি মেকাপ করতে হবেনা।আরমান জারাকে বলার সুযোগ পাচ্ছে না বলে মাকে বলে মাথা খারাপ করছে। ছেলের এতো এতো উপদেশ শুনে তিনি দৌড়ে জারা র কাছে যান। আরমানের বলা সব উক্তি জারাকে বলে তিনি।
জারাও লক্ষী বউয়ের মতো স্বামীর কথা মেনে নেয়। হালকা মেকআপ মাথায় সুন্দর করে গুছিয়ে হিজাব বাঁধা।হাতে ফুল জড়ানো হচ্ছে। ফিহার গালে হলুদের হালকা রঙ লেগে আছে যা মিম একটু আগে মজা করে লাগিয়েছে। জিনিয়া আয়নায় নিজের ঠোঁটে গ্লস লাগাচ্ছে।
মাঝে মাঝে তিনজনের চোখে চোখ পড়ে—তারা হাসে, লজ্জা পায়, আবার সাজগোজে মন দেয়। ছায়মা ওর ভাইয়ার সাথে বাড়িতে গেছে সন্ধ্যার আগে। ওর মায়ের ঔষধ ফেলে এসেছে আর ছায়মার কিছু জিনিস প্রয়োজন ছিলো। ছায়মার বাবা বিয়েতে উপস্থিত থাকতে পারবে না। মাএ অন্য জায়গায় রিটায়ার হয়েছে, ছুটি পাবেন না, আর রাশেদের বিয়ের সময় ছুটি কাটিয়ে ছিলেন।
আরমান বসার ঘরে দাঁড়িয়ে বারবার ঘড়ি দেখছে।
সকালে একবারও সে তার বউকে দেখেনি।তার মেজাজ ধীরে ধীরে গরম হয়ে উঠছে। রাশেদ হেসে বলল,
__“ভাইয়া, ভাবিকে দেখতে না পেয়ে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে নাকি?”
আরমান তাকালো,
__“চুপ কর। এটা তোর বুঝবে না।”
রাশেদ হেসে উঠল। আরমান আর কোনো উপায় না পেয়ে ওর মায়ের কাছে যায়, রান্না ঘরে। সে এখনো রেডি হয়নি। কিন্তু উপরে জাহেদ আর রোহান কি পরবে এটা নিয়ে মাথা নষ্ট করে ফেলছে।তার তাদের দুজনের নাটক দেখছে রাশেদ আর জাহির বসে বসে।
আরমান এসে ওর মায়ের পিছনে দাঁড়ায়। মায়ের আঁচল ধরে আঙুলে পেঁচাচ্ছে বাচ্চাদের মতো। ফারিয়া বেগম ছেলের এমন গাইগুই করতে দেখে বলেন
__“এখানে কি করছিস? আর রেডি হসনি কেন?”
__“হলুদ তো মেয়েদের অনুষ্ঠান, আমি রেডি হয়ে কি করব?”
ফারিয়া বেগম তপ্ত শ্বাস ফেলে বলেন
__“তোকে আর কিছু বলার নেই আমার? ”
__“কিন্তু আমার বলার আছে..!”
__“যা বলার তাড়াতাড়ি বলে বিদায় হ বাপ..!”
__“ ওদের ঠিক মতো বলেছিলে তো? ’
__“হ্যাঁ বলেছি!”
__“ সব বোঝিয়ে দিয়েছো তো? ”
__“হ্যাঁ!
__“ সত্যি বলছো?”
এবার ফারিয়া বেগম বজায় চটে যান। এই ছেলে তখন থেকে কথা গুটাচ্ছে। হাতের খুনতি থামিয়ে ছেলের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন
__“ আমার কথা বিশ্বাস না হলে নিজেই বলে আয়। তোর বউকে কীভাবে সাজাবে? আমার মাথা
খাস না! ”
আরমান তো এটাই চেয়ে ছিলো। তার বউটাকে একবার দেখতে। মনে মনে খুব খুশি হয়।
__“ সত্যি বলছো?”
__“হ্যাঁ বলছি ‘ এখন দূর হ চোখের সামনে থেকে। ”
বলে আবার চুলার দিকে মুখ করে খুন্তি হাতে নেয়।
আরমান বোঝে ওর প্রাণের আম্মু রেগে গেছে। তাই আরও রাগীয়ে দেওয়ার জন্য বলে
__“ কিন্তু আমি তো তোমার পিছনে দাড়িয়ে আছি। চোখে দিন দিন কম দেখছো। আব্বু কে বলতে হবে তোমায় ডাক্তার দেখাতে।”
ফারিয়া বেগম ছেলের কথা শুনে খুন্তি হাতে নিয়ে দৌড়ানি দেন। আরমান এক দৌড়ে এসে জারা’র রুমের সামনে দাড়ায়।ভিতরে শুধু মেয়েদের গুনজন।আরমান গিয়ে দরজায় টুকা দেয়।
__“ টুং..টুং…!
ভিতর থেকে আওয়াজ আসে
__“কে? ”
আরমান কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে
__“আমি..! ”
আরমানের কন্ঠ পেয়ে জারা’র মুখে হাসি ফুটে উঠে। আরমান, জাহেদের কাজিন একটা অ হু হু বলে চিল্লাতে থাকে। জারা লজ্জা পেয়ে যায়। সে অনেক আগেই রেডি হয়ে বসে আছে। আরমান যেভাবে বলছে ঠিক সে ভাবে। জিনিয়া দের কাজিন রা এখন রেডি হচ্ছে। একজন এসে দরজা খুলে দেয়। কিন্তু অল্প। আরমান সেই ফাঁক দিয়ে চোখ ভুলায়। চেয়ারে একজন মেয়ে বসে আছে। এটা জারা না বোঝে যায়।
__“মানজারা কোথায়? ”
মেয়েটা মজা করে বলে
__“ শাড়ি পরানোর শেষ এখন চুলগুলো বাঁধার পালা।
চুল বাঁধার কথা শুনে আরমান চটে যায়।সে তো বলেছে হিজাব পরতে।
__“মানজারা তুমি হিজাব পরোনি কেন? ”
আরমান এমন রিয়েক্ট দেখে সবাই ঘাবড়ে যায়। জিনিয়া ছুটে এসে বলে
__“ভাইয়া হাইপার হইও না।মজা করে বলেছে। ও তোমার বলা নির্দেশ অনুযায়ী সব পরেছে।”
আরমান শান্ত হয়। জিনিয়ার দিকে তাকায়। মুখে হাসি দিয়ে জিনিয়ার মাথায় হাত ভুলিয়ে দেয়। কাল ঘর ফাঁকা করে বোনটা চলে যাবে। কেউ আর বায়না করবে না। কতো মজার সৃতি জড়িয়ে আছে বোনটার সাথে। এখন আর তাকে কেউ এসে যখন তখন বিরক্ত করবে না। নিজেকে সামলে নেয়। এখন এতো ভেঙে পরা যাবে না।
__“মানজারা কই?”
জিনিয়া খিলখিল করে হেসে বলে
__“বড় আম্মু বলেছে ওর সাথে দেখা করতে আসলে যেনো না করে দেই। তাই দেখা করা যাবে না। ”
আরমানের মুখ ছোট হয়ে যায়।
__“ ওর সাথে দেখা করতে আসিনি। ওর কাছে আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আছে। বল দিয়ে যেতে। ”
জারা দরজার দিকে তাকায় বিছানায় বসে। তার কাছে আবার কি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস এই লোকটার। সে তো কিছু যানে না। এর মাঝে আবার বলে
__“মানজারা! আমার জিনিস টা দিয়ে যাও..!
মিম মাএ ফিহাদের কাছে আসে। এসে দেখে আরমান দাঁড়িয়ে আছে রুমের সামনে। আরমান মিমকে দেখে শক্তি পেলে মনে হয়। একটু রাগী সুরে বলে
__“তোমার বান্ধবী কে বলো আমার প্রয়োজনীয় জিনিস বের করে দিয়ে যেতে। ”
আরমান কথাটা জোরে বলে।জারা শুনতে পায়। কিন্তু বোঝাতে পারে না। মিম রুমে এসে। জারা কে বলে। জিনিয়ার কাজিন রা মজা করছে তাকে নিয়ে। ফিহা তো একচুল পরিমাণ ছাড় দিচ্ছে না। জারা বাধ্য হয়ে বিছানা থেকে মেনে শাড়ি ঠিক করে এসে দরজার সামনে দাড়ায়। আরমানের দৃষ্টি তার লক্ষী বউয়ের দিকে। আরমানের এমন চাওয়া দেখে জারা মাথা নিচু করে ফেলে। ঠোঁটের কোনে একচিলতে হাসি। আরমান গলা খাকিয়ে বলে
__“ চলো তাড়াতাড়ি, আমার রেডি হতে লেট হয়ে যাচ্ছে! ” বলে জারা হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় জারা’কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে।পিছন থেকে হাসির শব্দ আসচ্ছে। আরমান জারাকে নিয়ে জোসা নিজের রুমে চলে আসে। দরজা লক করে সন্থির নিঃশ্বাস ফেলে।
কিন্তু তার আশা দীর্ঘ স্থায়ী হয় না। ফারিয়া বেগম এসে জারা’কে সাথে করে নিয়ে যান। আর যাওয়ার আগে ছেলে নির্লজ্জ উপাধি দিতে ভুলেন না। রাগে গজগজ করছে আরমান। কতো কৌশল করে বউটাকে আনলো সে। আর মা এসে নিয়ে গেলো। বউটা কে মন বরে দেখতে পারে নি।
হলুদ ময়দানের চারপাশে রঙিন আলপনা শেষ হয়েছে। মেহেদির কনিক আঁকা রঙিন পাত্র রাখা হয়েছে চারপাশে। হলুদ-সোনালি পর্দা বাতাসে উড়ছে।
সোনালি আলোয় খান ম্যানশন যেন উৎসবের রাজপ্রাসাদ। জেসমিন বেগম, ফারিয়া বেগম, মারজিয়া বেগম— সবাই মিলে হলুদের পসরা সাজাচ্ছেন।
আরিফ খান, আসিফ খান দায়িত্বে ব্যস্ত। তাদের চোখেমুখেও উত্তেজনা— কারণ আজ তাদের ঘর হাসছে, দুই বউ আসছে। আর মেয়েকে পরের ঘরে চলে যাবে এই কষ্ট বুকে চেপে রেখে সব করছে।
সন্ধ্যার একটু আগে তিনজনই পুরোপুরি রেডি।
জারা শাড়ি পরে দাঁড়ালে পার্লারের আপুরা থমকে যায়। তার গায়ে যেন হলুদের আলো জ্বলছে। তার হাসিটা পুরো ঘর আলোকিত করে। ফিহা লাজুক—কিন্তু আজ মুখে গভীর একটা মিষ্টতা। জিনিয়া আত্মবিশ্বাসী—কিন্তু ভিতরে ভিতরে লজ্জায় লাল।
মিম আর জেরিন এসে বলল,
__“এবার নামো। সবাই অপেক্ষা করছে।”
বাইরে আরমান দাঁড়িয়ে আছে।হাঁটতে পারছে না ঠিকমতো।মনে হচ্ছে হৃদপিণ্ডটা বুকে নেই—জারার রুমে গিয়ে লুকিয়ে আছে। রোহান আর রাশেদ হেসে বলল,
__“চেহারা দেখ! মনে হয় কনে পালিয়ে গেছে।”
আরমান রাগ দেখালেও ভয়টা সত্যিই আছে—যদি জারা তাকে আজ রাগ করে না দেখে?
দরজা খুলতেই প্রথম বের হলো জিনিয়া।তারপর ফিহা।সবাই তালি দেয়।কিন্তু যখন জারা বের হলো—
সেই মুহূর্তে পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ।সবার চোখ তার ওপর আটকে গেলো, আরমানের নিঃশ্বাস থেমে গেল।
সে স্থির দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল।জারা লাজুক চোখে তাকালো, তারপর ধীরে ধীরে নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে লাগল। তার চলায় এক ধরনের নরম সৌন্দর্য,
যা আরমানের বুকে ঢেউ তোলে।
জারা স্টেজে পৌঁছতেই আরমান এগিয়ে গেল।
চোখে তাকিয়ে শুধু বলল
—“সকাল থেকে ভাবছিলাম… আমার বউকে কি আদৌ দেখতে পাবো? আর আমার পাষাণ বউও একবার এলো দেখা দিতে? ”
জারা লজ্জায় মাথা নামিয়ে ফেলল। হাসি চাপতে না পেরে বলল
—“এতো মানুষ… দেখানোর সময়ই পাইনি।আর আম্মু করা আদেশ ছিলো দেখা না করতে! ”
আরমান খুব আস্তে বলে
—“তোমাকে ছাড়া আজ পুরো আমি পুরো টা ফাঁকা ফাঁকা লাগছিলাম।”
জারার বুক ধুকধুক করে উঠল।জারা, ফিহা আর জিনিয়া স্টেজে বসলে—পরিবারের সবাই এসে হলুদ দিতে শুরু করলো। মেহেদির গন্ধে চারপাশ ভরে গেল।জেরিন আর মিম এসে জারার গালে হলুদ লাগিয়ে হেসে বলল
—“আজ ভাইয়ের সামনে বেশি হাসিও না। নাহলে উনি জ্ঞান হারিয়ে পরে যাবে ।”
জারা লজ্জায় চোখ নামিয়ে রাখল।আরমান চলে আসে জারা’র কাছ থেকে, ওর মা দেখলে খবর করে ছাড়বে। জাহির চুপচাপ তার বুড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। তার ছোট্ট বুড়ি আজ কত বড় হয়ে গেছে।সে জারাু দিকে তাকিয়ে ছিল।তার চোখে স্পষ্ট মায়া।
আরিফ খান আর আসিফ খান বারবার যাচাই করছেন—সব ঠিক আছে কিনা।এই হাসিখুশি, ব্যস্ততা, কোলাহল—এই ছিলো খান ম্যানশনের সৌন্দর্য।
অন্যদিকে ছেলেরা—আরমান, জাহেদ, রোহান, জাহির, রাশেদ আর জোহান—এরা সবাই নিজেদের মতো ব্যস্ত। কারো হাতেই রেহাই নেই।
ড্রইং রুমেের এক পাশে রোহান আর জাহেদ বসে আছে, তাদের দিকে কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না। সবাই কনে নিয়ে ব্যস্থ। তাদের সঙ্গে রাশেদ, জাহির, আরমান ও জোহান। ছয়জনের মধ্যে যেন লুকিয়ে থাকা উত্তেজনার আগুন মাথা তুলে ওঠে আজকের অনুষ্ঠান নিয়েই।
জোহান তখনো ছোট, কিন্তু সে যেন উৎসবের হাওয়া সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে। এক দৌড়ে গিয়ে রোহানের পাশে বসে বলল
—“ হিংসুটে ভাইয়া! তুমি আমার কিউটি গার্লকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছো!”
এ কথায় সবাই হেসে ওঠে।রোহান বলে
—“কেড়ে নেই নি।সে আগে থেকে আমার ছিলো।”
জাহির আবার সবার দিকে তাকিয়ে সিরিয়াস গলায় বলল—“আমার এসব ভালো লাগছে না ।”
এই কথায় জাহেদ মাথা ঝাকায়
—“কেন ভালো লাগছে না? ”
জাহির জবাব দেয় না। আরমান যদিও সবচেয়ে চুপ। তার মন শুধু একটাই জায়গায়—জারা। সকাল থেকে বউটাকে ঠিকভাবে দেখতেই পারেনি। এত ব্যস্ততা, এত মানুষ, এত সাজ–গোজ—সময়ে সময়েই জারাকে যেন চোখের সামনে থেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সবাই।
ওদের আড্ডায় হাসি, টিপ্পনী, ঠাট্টা–মশকরা চলতেই থাকে। মিম আর জেরিন ওই সময় বড় জগ ভর্তি শরবত নিয়ে আসে।ছেলেরা একসাথে
—“এই তো আমাদের রক্ষাকর্ত্রী!”
মিম লজ্জায় মাথা নিচু করে যখন শরবত ধরিয়ে দিচ্ছিল, ঠিক তখন জাহিরের চোখের দৃষ্টি থেমে যায় তাদের উপর। সে ছায়মা কে খুজছে। বিকেল থেকে দেখা নেই।সেটা আরমান টের পেয়েই তাড়াতাড়ি মিমকে বলে
__“মিম ছায়মা কই? ”
জেরিন বলে
__“ছায়মা আপু মাএ এসেছে, এখন মনে হয় রেডি হচ্ছে। ”
__“ওহহহ..! ” বললো আরমান
তারপর মিম আর জেরিন কে নিয়ে চলে গেল। জাহির বসে থাকে মুখে হাসি নেই।
__“হবে আজ কিছু একটা…” রোহান মজা করে বলে।
তারপর আবার সবাই হেসে ওঠে।
এখন শুরু হলো আসল উৎসব। প্রথমে মেয়েদের পালা–চেনা আত্মীয়রা এসে তিন কনেকে হলুদ লাগানো শুরু করে।হাসি–ঠাট্টা শুরু।মিম এসে বলল—“জানু ভাইয়া তোর দিকে একনজরে তাকিয়ে আছে !”
সবার হাসি থামতেই চায় না।ফিহা চিৎকার করে বলে—“আমার গায়ে বেশি লাগিয়ো না, ম্যারুন লেহেঙ্গা নষ্ট হয়ে যাবে!”
জিনিয়া আবার সিরিয়াস গলায় বলে
—“আমার সামনে ক্যামেরা থাকুক, আমি ক্যান্ডিড চাই।”
এদিকে জোহান দৌড়ে এসে পুরো এক মুঠো হলুদ নিয়ে জিনিয়া হাত ধরে—“এইটা তোমার জন্য কিউটি গার্ল।”
সবচেয়ে বড় হাসি হয় তখনই। ছেলেরা তখনো দূরে বসে, কিন্তু চোখ সবসময় মেয়েদের দিকে।ফারিয়া বেগম বলেন
__“এই তিন বাদর এদিকে আসুন। আপনাদের ও হলুদ লাগানো হবে।
পাঁচজন উঠে দাঁড়ায়। তাদের আসা মানে পুরো উৎসবের গতি পাল্টে যাওয়া। রোহান প্রথমে আসে জিনিয়ার সামনে। কোনো কথা না বলে তার কপালে আলতো একটা হলুদের ছোঁয়া দিয়ে বলে
—“আজ তুমি একদম আমার চাঁদ সুন্দরীর মতো লাগছো।”
জিনিয়া লজ্জায় মুখ নিচু করে ফেলে। জাহিদ আসে জারার সামনে। দুজনের চোখেই একই কোমলতা।
একটু দায়িত্ব, একটু ভালোবাসা।জাহির আসতেই সবাই হেসে ওঠে।
—“আমার ছোট্ট বুড়িটা বড় হয়ে গেছে ?”
মারজিয়া বেগম পাশেই দাঁড়িয়ে হাসছিল।জাহির ওকে না দেখে থাকতে পারে না।কিন্তু নিয়ম মানতেই হয়।
জাহেদ ফিহার পাশে বসে। ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। ফিহা মাথা নিচু করে বসে আছে। এতো মানুষের সামনে এই লোক তার দিকে তাকিয়ে আছে। জাহেদ হলুদ নিয়ে ফিহার গালে লাগিয়ে দেয়
__“আজ আমার কটকটি টা কে একদম পেত্নীর মতো লাগছে!”
বলেই হেসে ফেলে। তার সাথে সবাই। ফিহা কটমট দৃষ্টিতে তাকায় জাহেদ দিকে। জাহেদ হেসে বলে
__“রাগ করো না মজা করছি। তুমি তো আমার
পরি। ”
শেষে আসে আরমান।জারা আরমানকে দেখেই গা শিউরে ওঠে লজ্জায়। একটা আগেই না এখান থেকে গেলো, তাহলে আবার কেন আসলো।লোকটাকে দেখলেই লজ্জা করছে তার। তবুও মন খারাপ সকাল থেকে দেখা হয়নি, কথা হয়নি—আজকের হলুদ আলোয় আরমানকে যেন আরও গভীর, আরও পরিণত দেখায়।
আরমান ধীরে ধীরে প্রতিটি ধাপ নামল।সবাই যেন নিঃশব্দ হয়ে গেল। জারা গাল নিচু করে রেখেছিল।
আরমান কাছে এসে আলতো করে সামান্য হলুদ তুলে তার কপালের কাছে স্পর্শ করল।হাতে ছোঁয়া লাগতেই জারা অনুভব করল—হৃদস্পন্দন বেড়ে উঠছে।শরীর কেঁপে উঠছে আলতো উষ্ণতায়।আরমান খুব নরম গলায় শুধু বলল
—“আরও সুন্দর লাগছে আজ আমার লক্ষী
বউ কে ।”
যে কথা কেউ শোনেনি, কিন্তু জারা শুনেছে।আর তার চোখের কোণে নরম জল চিকচিক করে উঠল আনন্দের, ভালোবাসার। দুজনের চোখে চোখ আটকে থাকে কয়েক সেকেন্ড। হলুদ আলোয় সেই মুহূর্ত যেন শুভ্র ভালোবাসায় মোড়া।
ছায়মা ঠিক মেঝে পর্যন্ত নেমে আসা হলুদ-টোনের শাড়িটা পরেই রুম থেকে বের হলো। শাড়ি পরবে না—সকাল থেকে জেদ করে রেখেছিল। কিন্তু রিমন একেবারে জোর করেই ওকে শাড়ি পরিয়েছে।
__“তুই আজ শাড়িতেই সবচেয়ে সুন্দর দেখাবি,” রিমনের কথায় ছায়মা আর না করতে পারেনি।ভাই তার সব দিকে নজর রাখে।
রুমের দরজা খুলতেই সানির সাথে দেখা। সানি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ছায়মার দিকে—এমনভাবে, যেন প্রথমবার দেখছে। চোখের কোণে মিষ্টি হাসি, গলায় অকারণ নরম সুর।
__“ছায়মা, তুমি… আজ অসাধারণ লাগছে তোমায়!,”
সে পথে দাঁড়িয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলতে শুরু করল।
ছায়মা ভদ্রভাবে এড়িয়ে যেতে চাইল
—“আমি যাচ্ছি, পরে কথা হবে।”
কিন্তু সানি যেন ছাড়ার পাত্র নয়।প্রতিবারই তার পথ আটকাচ্ছে, আবার কথা শুরু করছে।ছায়মার বিরক্ত লাগছিল, কিন্তু কিছু বলতেও পারছিল না।
দূর থেকে সবটা দেখছিল জাহির।সানির ছায়মার সামনে দাঁড়ানো, হাসাহাসি, ছায়মার অস্বস্তি—সব তার চোখে পড়ে।আর হঠাৎই তার বুকের ভেতর কেমন গরম গরম একটা রাগ উঠে আসে।চোখে লালচে ঝিলিক, গলায় শক্ত ভাব।
এক মুহূর্ত দেরি না করে বড় বড় পা ফেলে গিয়ে সে ওদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেল।ছায়মা থমকে গেল।
সানি মুহূর্তেই বিরক্ত
—“এই কি? মাঝখানে কেন দাঁড়ালেন?”
জাহিরের কণ্ঠ ঠান্ডা, কিন্তু ভিতরে আগুন
—“এখানে কী করছো?”
সানি তাকে ঠেলে সরাতে চাইল
—“ও আমার সাথে কথা বলছে।”
জাহির আবার ছায়মার সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়াল।
__“ছায়মা, তুমি যাও। জেরিন তোমাকে খুঁজছে।”
ছায়মা এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল জাহিরের দিকে—
তার চোখে যে আগুন, যে জেদ… সেটা নতুন না, কিন্তু আজ অন্যরকম।আজ সেটা নিজের মানুষকে রক্ষা করার রাগ। কিন্তু ছায়মা ভাবল—জাহির তো বলে ও আমাকে ভালোবাসে না।সেদিন তো বলে ছিলো তার মনে ওর জন্য কোনো জায়গা নেই তাহলে এই রাগটা কেন?
তার ভেতরে একটু অভিমান জন্মায়।তাই জেদী গলায় বলে উঠল
—“আমি সানি ভাইয়ার সাথে কথা বলছি। আপনি যান ভাইয়া।”
এই “ভাইয়া” শব্দটা জাহিরের বুকে যেন ছুরি হয়ে বিঁধল।রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। কথা না বাড়িয়ে সে ছায়মার হাত ধরে জোর করে অনুষ্ঠানমুখী ভিড়ের দিকে নিয়ে এল। সানিও হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
__“ওই ছেলের সাথে আর যেনো না দেখি..! বললো জাহির।
ছায়মা হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বলে
__“আমি ওর সাথে কথা বললে আপনার কী?”
জাহির ছায়মার হাত আর একটু শক্ত করে ধরে বলে
__“কিছু না! কিন্তু তুমি ওর সাথে কথা বলবে না, ব্যাস! ”
__“ আমি আপনার কথা কেনো শুনতে যাবো? আপনি তো আর আমাকে…!”
ছায়মার কথার মাঝের জাহির ওর হাত ছেড়ে দেয়।লাল চোক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে
__“ ছেলেদের সাথে ঘেঁষে দাড়িয়ে কথা বলা আমার পছন্দ না। ” বলে হনহনিয়ে চলে যায় বাড়ির বাহিরে।
ছায়মা বুঝে গেল—এই মানুষটা তাকে ভালোবাসে। খুব। শুধু মুখে বলতে পারে না। জাহিরের পেছনে হাঁটতে হাঁটতে তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে বাঁকা, বিজয়ী একটা হাসি ফুটল।আজ থেকে সে ঠিক করল—
এই লোকটাকে আরেকটু জেলাস করিয়েই ছাড়বে। আজ সন্ধ্যায় ছায়মা তার মনের ভেতর প্রথমবারের মতো অনুভব করল— ভালোবাসা ঠিক এমনই হয়… বলা যায় না, কিন্তু চোখে লুকিয়ে থাকে।
ছায়মা গিয়ে জারাদের হলুদ লাগিয়ে দেয়। হাসি মজা করে। ওদিকে তখন ডিজে লাইট জ্বলে ওঠে।
গান বাজতে শুরু করে—“হলুদের বর্ণে রাঙা হলো মন…”
ছোটরা নাচ শুরু করে। তারপর মেয়েরা একসাথে উঠে নাচতে থাকে। রোহান আর জাহেদও যোগ দেয়।
মিম–ছায়মা–ফিহা–জিনিয়া সবাই দারুণ মুডে।
জাহির এসে আবার হাসি মেরে বলল
—“রাশেদ ভাই আপনি নাচ করছেন না কেনো!”
রাশেদ হেসে দৌড় দেয় সবার মাঝে। সবার হাসিতে উঠোন গরম হয়ে ওঠে। আরমানও হাসছিল দূর থেকে। কিন্তু তার চোখ বারবার ঘুরে ঘুরে জারার দিকেই যায়। জারা নাচছিল না, শুধু বসে ছিল।
আরমান যেতে পারল না— ভিড়ের মাঝে চুপিচুপি চলে গেল তার পাশে।
__“ বসে আছ কেনো?”
জারা খুব আস্তে বলল
—“আপনি তাকিয়ে আছেন … তাই।”
আরমান মৃদু হাসল।
__“তোমাকে না দেখে থাকা যায় বউ?”
এই নরম কথায় জারা আবার লজ্জায় গা শিউরে উঠল। হলুদ অনুষ্ঠান শেষের দিকে। তিন কনের দু’হাত বর্তি মেহেদী রাঙানো।হাতের তালুতে তাদের প্রিয় মানুষের নাম লিখে দেয়।
রাত গভীর হতে থাকে।গান, নাচ, হাসি—সব কমে আসে। জারা বসে ছিল ছায়মাদের পাশে। এখনো মেহেদী দেওয়া বাকি অনেকে।বসে গল্প করছে সবাই।জাহেদ ফিহাকে নিয়ে সাদে গেছে। রোহান সুযোগ খুঁজছে জিনিয়ার সাথে কথা বলার জন্য। কিন্তু আসিফ খান রোহানকে কড়া চোখে রাখেন।
রাতের অনুষ্ঠান শেষে সবাই যখন ব্যস্ত,আরমান খুব আস্তে জারার হাত ধরে বলল
—“এক মিনিট… আমার সাথে চলো।”
জারা অবাক হয়ে তাকাল।
__“এই পোশাকে? এখন?”
__“হ্যাঁ।”
জারা কিছু বলতে গেল, কিন্তু আরমানের কণ্ঠটা এত নেশালো, এত গভীর,তার ভাষা থেমে গেল। আরমান তাকে নিয়ে এল নিজের রুমের বেলকনিতে। চাঁদের আলো পড়ে জারার গায়ে। হলুদের সাজে জারা যেন আলোয় ভেজা ফুল।আরমান বেলকনিতে রাখা চেয়ারে বসে জারাকে নিজের কোলে বসায়। জারা’র শরীর কাঁপছে। আরমান ওর পাঞ্জাবির পকেট থেকে নূপুর বের করে। জারা তাকিয়ে থাকে। আরমান জারাকে বলে
__“কেমন? ”
__“খুব সুন্দর! ”
আরমান জারাকে চেয়ারে বসিয়ে সে মেজেতে জারা’র পায়ের কাছে বসে। জারা এমন কান্ডে লাফিয়ে উঠে।
__“একি স্বামীজান এখানে বসছেন কেনো? উঠুন.. উঠুন..!”
আরমান উঠে বরং জারা’র ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলে
__“চুপ.! ”
তারপর জারা’র পায়ে থাকা আগের নূপুর গুলো খুলে ফেলে। এগুলোও আরমান দিয়েছে। জারা বলে
__“পায়ে তো আছেই, আবার কেনো?”
__“ আমি এনেছি, তুমি পরবে, হয়েছে?”
জারা চুপ করে বসে থাকে। আরমান নূপুর খুলে জারা’র পায়ে আলতু করে চুমু খায়। সাথে সাথে কেঁপে ওঠে জারা। হৃদপিণ্ড ধরফরিয়ে উঠে। আরমান যত্ন সহকারে নূপুর জোরা পিরিয়ে দেয়। আরমান খুব ধীরে জারা’র মুখটা নিজের দুহাতে নিয়ে বলল
—“মানজারা… তুমি আমার কাছে শুধু বউ না।
তুমি আমার শান্তি। আমার অপেক্ষার শেষ। আমার শরীরের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ।যা না থাকলে বাঁচা মুশকিল হয়ে যায় আমার।”
জারার চোখ ভিজে উঠল।হালকা কাঁপা গলায় বলল—“স্বামীজান… আজ আপনাকে খুব মিস করেছি।”
আরমান তাকে বুকের কাছে টেনে নিল।তার গলার গভীর উষ্ণতা—জারার হৃদয় কাঁপিয়ে দিল।সে জারার কপালে চুমু রাখল। তারপর গাল ছুঁয়ে বলল
—“আজ রাত আমাকে আর বঞ্চিত করো না।”
জারা লজ্জায় চোখ বন্ধ করল, আরমান আরও কাছে টেনে নিল তাকে— যেন পুরো পৃথিবীটা সে তার বুকে সাজিয়ে রাখছে। এই খোলা বেলকনিতে দুটি মনের মিলন হচ্ছে।
জারা কাঁধে মাথা রাখতেই আরমান তার দু’হাতের মাঝে আরও টেনে নিল।জারার গালে খুব আস্তে আঙুল ছুঁইয়ে রাখল—স্নিগ্ধ, গভীর স্পর্শ।জারার নিঃশ্বাস থমকে গেল; হৃদয় ঢুপঢুপ করছে।
আরমান তার কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল—একটা দীর্ঘ, উষ্ণ চুমু।তারপর আরেকটু নিচে—গালে, চোয়ালে… মিষ্টি, আবেশী স্পর্শে জারার পুরো শরীর কেঁপে উঠল।
জারা লাজুক গলায় বলল,
__“কাল বিয়ে! প্লিজ আজ না ?”
আরমান ধীরে ফিসফিস করে
—“বিয়ে তো কি হইছে? এখন আমার বউ দরকার। ভুলে গেলে আমার ছয় দফা দাবি।”
__“ তা তাই বলে বে..বেলকনিতে..?”
আরমান জারা’র ঠোঁটের কোনে মুখ রেখে বলে
__“সো হোয়াট সোনা ? ”
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬৭
জারা চোখ নামিয়ে ফেলে, কিন্তু হাত দুটো আরমানের বুকে জড়িয়ে ধরে।বারান্দায় তারা দুজন একটু দূরের পৃথিবী থেকে আলাদা হয়ে, শুধু একে অপরের উষ্ণতায় হারিয়ে থাকে।আরমানের স্পর্শে কাতর হয়ে যাচ্ছে জারা। আরমানের নিশ্বাস, হাতের বিচরণ সব তাকে মাতাল করে তুলছে। চোখ বন্ধ করে তার স্বামীজানের দুষ্টু মিষ্টি ছুঁয়া সাদরে গ্রহণ করে নিচ্ছে।
