রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭০
সোহানা ইসলাম
খান ম্যানশন সকাল থেকেই জমজমাট। বাড়ির চারদিকে লোক চলাফেরা, রান্নাঘরে কাজের শব্দ, ড্রইং রুমে চেয়ার-টেবিল সাজানো—সব মিলিয়ে উৎসবের মতো পরিবেশ। আজ চার জুটির রিসেপশন। মিম আর রাশেদের বিয়ের পর এখনো কোনো রিসেপশন হয়নি, তাই আরমান–জারা, জাহেদ–ফিহা, রোহান আর জিনিয়াদের সঙ্গে একটা গ্র্যান্ড আয়োজন করা হয়েছে।
মিম ভোর থেকেই ফারিয়া বেগমের সঙ্গে রান্নাঘরে হাত লাগিয়েছে।যদিও ফারিয়া বেগম মিমকে বারন করেন কিন্তু মিম শুনে না । গ্যাসে একসাথে তিনটা হাঁড়ি চড়ানো, চারদিকে মসলা ছড়ানো গন্ধ, পেঁয়াজ কাটার শব্দ—সব মিলিয়ে কিচেনে যেন যুদ্ধক্ষেত্র। রান্না ঘরে কাজের লোক ফারিয়া বেগম কে এটা সেটা এগিয়ে দেয় মিমের সাথে। আর কিছু লোক ড্রইংরুম পরীক্ষা করছে।
মিম গামছা দিয়ে হাত মুছতে মুছতে বলে,
__“বড় আম্মু, এতগুলো কাজ সামলানো যাবে তো? আমি কি তরকারিটা নাড়ি?তুমি বিশরাম নাও?”
ফারিয়া বেগম মৃদু হাসেন,
__“তুই আছিস তো! সবই হয়ে যাবে।আর বিশরাম নিতে হবে না। তুই বরং যা দেখ রাশেদ উঠেছে
কি না? ”
রাশেদের কথা শুনতেই মিমের চোখ মুখ পাল্টে যায়। যেনো রেগে যাচ্ছে। এমন সময়ই হঠাৎ দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়লেন জেসমিন বেগম। মুখে রাগ, চোখে ঝড়।
__“মিম!”
এক ধমকেই মিম কেঁপে ওঠে। চামচটা হাত থেকে পড়ে যেতে যেতেও আটকায়।ফারিয়া বেগম ঘুরে তাকান,
__“কী হয়েছে ছোট?”
জেসমিন বেগম কড়া গলায় বলেন,
__“মিম তোকে মেরে লাল করে দিব কিন্তু! এতো পাকামু কেন করবি মেয়ে তুই!”
মিম থরথর করে কাঁপতে থাকে। চোখ নামিয়ে ফেলে।
ফারিয়া বেগম এগিয়ে এসে বলেন,
__“কী করেছে মেয়েটা? ”
জেসমিন বেগম চুলের স্কার্ফ ঠিক করতে করতে আরও রেগে বলেন,
__“বয়স কতো ওর? এখনই স্বামীকে সময় দেয় না?রাশেদ ওকে খুঁজছে আর মেয়ে এখানে এসে বসে আছে। এটা বাড়াবাড়ি না?”
মিম হঠাৎ শিউরে ওঠে। ফারিয়া বেগমের সামনে থেকেও ভয় পায়।ফারিয়া বেগম ঠান্ডা গলায় বলেন,
__“রাশেদ তো সারাদিন মিমকে খুঁজে বেড়ায়। আমি নিজেই দেখেছি।এটা নতুন কই?মিম তুই যা তো মা দেখ রাশেদের কী দরকার?”
মিম লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে। গলা পর্যন্ত লাল হয়ে যায়।
__“আচ্ছা বড় আম্মু…”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই জেসমিন বেগম বলেন,
__“আমাদের সময় স্বামীর আশপাশে গেলেই শাশুড়ী খেক করে উঠতো।আর বলতো তাদের ছেলেকে বশ করে ফেলবো।আর এখন কার মেয়েদের আমরা সুযোগ দিচ্ছি কিন্তু তারা স্বামীর কাছে যায় না। আজব?”
জেসমিন বেগম এর কথা শুনে ফারিয়া বেগম আর কাজের লোক গুলো হেসে উঠেন।মিম লজ্জায় লাল হয়ে যায় আরও।মনে মনে রাশেদকে গালি দেয়।
“ আপনাদের সময়ের স্বামীরা ভালো ছিলো।আর এখন কার স্বামীরা মোবাইলে হটিনটি দেখে বউদের উপর এপ্লাই করে। আর সকালে বউরা বিছানা থেকে উঠতে পারে না। এই জন্যই এখন কার বউরা স্বামীদের কাছ থেকে দূর থাকে। ” মাথা নিচু করে বিরবির করে বলে মিম।মিম কে যেতে না দেখে জেসমিন বেগম বলেন
__“এই মেয়ে যাচ্ছিস না কেনো?তোর স্বামীকে শান্ত করে আয়!” বলেই মুখ টিপে হাসেন।
মিম আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না। প্রায় দৌড়েই কিচেন থেকে বের হয়।যেতে যেতে বিড়বিড় করে,
__“সবাই আমাকে নিয়ে পড়ে থাকে,লজ্জা দেয় সবাই আমাকে, আর রাশেদ—ঐ লোকটা কে কিছু বলে না কেউ…!”
মুখ গোমড়া করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল মেয়েটা।মুখ লাল, চোখ একটু ভয়ে বড় বড়। দরজা লাগাতেই ঠিক পিছন থেকেই চেনা হাসিটা শোনা গেল
—“আমাকে ঘুমের মাঝেই রেখে পালিয়ে গেলে সোনা?”
মিম চমকে ঘুরে দাঁড়ায়। রাশেদ ওয়াশরুমের দরজার ফ্রেমে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে, মুখে দুষ্টু হাসি।
মিম মুখ গোমড়া করে বলে,
__“এতো ভয় দেখান কেন? আমি তো ভালো মানুষ ভাবতাম আপনাকে। কিন্তু দিন দিন লুচু হয়ে যাচ্ছেন!”
রাশেদ ভ্রু তুলে হাসে, ধীরে ধীরে ওর দিকে এগিয়ে আসে।উদাম ভেজা গায়ে, চুল এখনো পানি ঝরছে,মাএ চোখে মুখে পানি দিয়ে এসেছে—মিম আরও পিছিয়ে গিয়ে দেয়ালে ঠেকে যায়।
__“লুচু?”
রাশেদ গলায় হাসি চেপে বলে,
__“বউয়ের সাথে লুচু হওয়াটা কি দোষ?”
মিম রাগ দেখালেও মুখ লাল হয়ে গেছে।রাশেদ আর এক কদম কাছে এসে মিমকে জড়িয়ে ধরে।তার সারা শরীর গরম স্পর্শে মিম কেঁপে ওঠে।
রাশেদ নিচু গলায় ফিসফিস করে,
__“কাল রাতে ভালোবাসা কম ছিলো নাকি? বউ খুশি হয়নি?মুখটা এমন কেনো?”
মিম ওর বুকে মাথা গুঁজে বলে,
__“খুশি হবো দূরের কথা… কান্না করে কোমড় নিয়ে সোজা হতে পারছি না।”
রাশেদ হো হো করে হেসে ওঠে।
__“এটাই তো ভালোপাসা, সোনা!”
মিম হাত দিয়ে ওর বুক ধাক্কা দেয়,
__“আপনার এই ভালোবাসা একেবারে সর্বনাশ নির্লজ্জ লোক !”কিন্তু মুখে লজ্জার হাসি ফুটে ওঠে মিমের।
রাশেদ মিমের চুলে হাত বুলিয়ে শান্ত স্বরে বলে,
__“শুনো, আরমান ভাইয়া বলেছে—তোমাদের তিন জনকে এখানে ভর্তি করিয়ে দেবে। পড়াশোনা ছাড়া যাবে না।”
মিম চোখ বড় করে তাকায়।
__“সত্যি?”
__“হ্যাঁ, বউকে পড়াশোনা করাতে হবে তো!”
মিম আস্তে হাসে,
__“আচ্ছা, ঠিক আছে। আপনি বললে তাই হবে।”
রাশেদ এবার আলমারি খোলে।
__“সোনা, আমি বের হবো। কাপড়গুলো বের করে দাও।”
মিম লাজুক গলায় বলে,
__“এইসব মিষ্টি কথা বললেই আমায় দিয়ে কাজ করিয়ে নেন।”তবুও কাপড় বের করে দেয়।স্বামীর কথায় ওর এই নম্রতা রাশেদের খুবই পছন্দ।
রাশেদ কাপড় নিয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে আবার গলায় দুষ্টুমির স্বর নামায়—
__“গোসল করার আগে… আরেকবার—”
এই কথা শেষ হতেই মিম দুহাতে ঠেলে রাশেদকে বাথরুমের দিকে ঠেলে দেয়।
__“আর কথা বললে বাথরুমের বাইরে আসতে দেব না!”গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করলেও মুখে হাসি থামাতে পারে না।
রাশেদ বাথরুমের দিকে যেতে যেতে পেছনে তাকিয়ে বলে,
__“রেগে গেলে আরও সুন্দর লাগো তুমি।”দরজা বন্ধ করতেই ভেতর থেকে হাসির শব্দ আসে।
মিম লজ্জা পেয়ে চাদর মুখে চেপে ধরে বসে পড়ে বিছানায়।তার নিজের হাসিও চাপা থাকে না।
__“এই মানুষটা…”চোখে চিকচিক করে পানি,
লজ্জা, ভালোবাসা আর আদরের মিশ্র অনুভূতি।
সকালের রোদ জানালা দিয়ে ঢুকে রুমটাকে আলোয় ভরিয়ে দেয়।এই ছোট্ট রুমে—একটা নতুন সংসারের হাসিখুশি সকাল শুরু হলো।
এদিকে সকাল এগারোটা।গতকাল এত দৌড়াদৌড়ি হয়েছে যে আজ সবাই লেট উঠেছে।সবার উপর দিয়েই যড়যাপটা গেছে।এক এক করে সবাই ড্রইংরুমে এসে বসছে সকালের নাস্তা খেতে।
আরমান এসে জাহিরের পাশে বসল। তাকিয়ে দেখে জাহিরের মুখে কেমন যেন অস্থিরতা।
__“ মুখটা এমন কেন?”
জাহির মাথা নিচু করে শুধু বলে,
__“কিছু না।”
আরমান সন্দেহভরা চোখে তাকিয়ে চুপ করে থাকে।
অল্প সময়েই জাহেদ আর রাশেদও এসে বসে যায়।
রাশেদ হাসতে হাসতে আরমানের দিকে তাকায়,
__“ সবাই খুব সুখে আছো দেখি!”
আরমান কফির মগ হাতে নিয়ে বলে
__“ আমাদের থেকে তোরে বেশি খুশি লাগছে।মনে হচ্ছে মাএ মাঠে ছয় মেরে তারপর এসেছিস?”
আরমানের কথায় রাশেদ চুপ করে গেলোও জাহেদ আর জাহির হাসে। জাহিরের হাসিতে প্রাণ নেই কোনো। ফিহা, জারা, মিম দূরে বসে গল্প করছে।সাথে মারজিয়া বেগম। ফারিয়া বেগম বলে গেছেন বসে গল্প কর,আর নাস্তা করে নিজের রুমে চলে যাবি।কোনো কিছুতে হাত লাগাবি না তেরা তিনটা । তিন জন বাধ্য মেয়ের মতো বসে আছে। জারা ওর মায়ের কাঁধের মাথা দিয়ে আছে।
বাড়ির দুই কর্তা আনিছুর রহমান কে নিয়ে বাগানের দিকে যান।একটু হাঁটার জন্য। এমন সময় বাগান থেকে জোহান আর জেরিন দৌড়ে আসলো।জোহান সোজা গিয়ে আরমানের পাশে গিয়ে গা ঘেঁষে বসে পরে।জেরিন চলে যায় জারাদের কাছে ।আরমান জোহানের গাল টেনে বলে,
__“কি রে পটল শালাবাবু ? কোথায় ছিলি?”
জোহান জোরে বলে,
__“আহ! ব্যথা লাগে তো!”সবাই হেসে ওঠে।
জোহান আরমানের কোলে আরও ভালো করে আরাম করে বসে বলে
__“ দুলাভাই! আজ আমি তোমাদের আগে উঠেছি! ”
আরমান জোহানের পেটে সুরসুরি দিতে দিতে বলে
__“রাতে ইম্পর্ট্যান্ট কাজ করতে করতে লেট হয়ে যায় আমার, তাই আজ তোর আগে উঠলে পারলাম না পটল!” তার কন্ঠে কিছু টা আফসোস মেশানো।
আরমানের কথা জোহান না বোঝলেও বাকি তিনজন ঠিকই বোঝে যায়। জাহির কেশে উঠে। জাহেদ আর রাশেদ মুখে হাত দিয়ে হাসে।জোহান বাবুক ভঙ্গিতে বলে
— “ তোমরা সবাই রাতে ইম্পর্ট্যান্ট কাজ করেছো? ”
রাশেদ জোহান কে বলে
__“ হ্যাঁ তো! ”
এটা শুনে জাহির আরও অস্থির হয়ে উঠে। দৃষ্টি চঞ্চল। টেবিলের উপর থেকে পানি নিয়ে ডগডগ করে খেয়ে শান্ত হয়।আর ওদের দিকে তাকিয়ে বলে
__“মুখে লাগাম টানুন। ও বাচ্চা! ”
জাহেদ ওকে বাদা দিয়ে বলে
__“বাচ্চা তো কী হয়েছে? ভবিষ্যতের জন্য শিখতে হবে না? ”
জোহান উৎসাহিত হয়ে বলে
__“ আমিও তোমাদের মতো রাতে ইম্পর্ট্যান্ট কাজ করতে চাই! ”
এটা শুনে সবাই এক সাথে খুকখুক করে কেশে উঠে। আরমান জোহানকে কোল থেকে মানিয়ে দেয়।জাহির জোহানের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে আছে। জাহেদ মনে মনে ভাবে এই ছেলে তো আমাদের থেকে দুই কাঠি উপরে।রাশেদ জােহানের মাথায় হাত দিয়ে বলে
__“ বাঁচা তোর এখনো ওই কাজ করার বয়স হয়নি!”
__“কবে হবে আমার বয়স?” জানতে চাই জোহান।
আরমান বলে
__“তোর বিয়ের পর ওই ইম্পরট্যান্ট কাজ করার বয়স হবে। ”
জোহান ওর ফুকলা দাঁত গুলো বের করে বলে
__“তাহলে আমাকে বিয়ে করিয়ে দাও! সবাই মলি করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ! ”
এটা শুনে সবাই যেনো আকাশ ভেঙে পরে। জাহির আশেপাশে তাকায় দেখে কেউ শুলো কি না?আরমান মুখ লুকিয়ে হাসে।ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে ছায়মা। হাতে একটা বড় ব্যাগ।পিছনে ওর ভাই রিমন।
জারা চোখ পাকিয়ে বলে,
__“এই ছায়মা আপু ! কোথায় যাও?”
ফিহা বলে,
__“তুমি ব্যাগ নিয়ে নামলে কেন?”
মিম বলে,
__“কোথাও যাচ্ছো তুমি?”
ছায়মা হালকা হাসে,
__“না… মানে… আমি একটু…”
কথা শেষ করার আগে রিমন বলে ওঠে,
__“মামি, ও নাকি চলে যাবে। আমাকে বলছে দিয়ে আসতে। আম্মু ওকে কতো করে বললো আমাদের সাথে সন্ধ্যায় যেতে, কিন্তু কে শোনে কার কথা!”
জেসমিন বেগম চোখ বড় করে বলেন,
__“ছায়মা! কোথায় যাচ্ছিস তুই?”
ফারিয়া বেগমও কাছে এসে বলেন,
__“এখনই কেন চলে যাবি? আজ রিসেপশন!জিনিয়াও আসবে।”
ছায়মা মাথা নিচু করে,
__“এক্সাম শুরু হবে মামী। পড়ার চাপ অনেক।”
কথাটা সবাইকে ধাক্কা দেয়।আর সবচেয়ে বেশি ধাক্কা লাগে জাহিরকে।ওর বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দেয়।কিন্তু বাইরে থেকে সম্পূর্ণ চুপ।একবারও চোখ তুলে ছায়মার দিকে তাকায় না।
জারা ছুটে আসে,
__“থেকে যাও না ছায়মা আপু! আজকের অনুষ্ঠানটা দেখে যাও।”
ফিহা বলে,
__“একদিনে ক্ষতি হবে না।”
মিম ওকে হাত ধরে বলে,
__“আমাদের কাছে থাকো না আজ !”
ছায়মা নরম গলায় বলে,
__“সবাই বলছো… কিন্তু আমার পক্ষে সম্ভব না। যাই… পরে দেখা হবে।”
ফারিয়া বেগম বিরক্ত হয়ে বলেন,
__“এই মেয়ে! তুই আমাদের কথা শুনবি না!”
জেসমিন বেগম চেয়ারে বসে বলে,
__“ছায়মা, একটু থাকলে কি ক্ষতি?”
ছায়মা ব্যাগ কাঁধে তোলে।রিমন অসহায়ের মতো ওর দিকে তাকিয়ে।সবাই চুপ হয়ে যায়।কারণ ছায়মা গেলে সত্যিই বাড়িটা ফাঁকা ফাঁকা লাগবে।মেয়েটা যেদিন থাকে, সেদিন বাড়ি আলোয় ভরে থাকে।
আনিছুর রহমান বাইরে থেকে ভেতরে এসে বলেন,
__“থেকে যাও মা। পড়া পরে হবে। আজ এত বড় অনুষ্ঠান।কাল তো আমরাও চলে যাবো।”
আসিফ খানও বলেন,
__“ হুট করে পরীক্ষা চলে এলো তোর?”
আরিফ খান গম্ভীর স্বরে বলেন,
__“চলে যাস না ছায়মা এখন, সন্ধ্যায় যাবি।”
__“ আমাকে ক্ষমা করো মামু। আমি নির উপায়। পরীক্ষা শেষ হলে আবার আসবো।প্রমিজ করছি!”
মারজিয়া বেগম বসা থেকে উঠে এসে ছায়মার কাঁধে হাত দিয়ে বলেন
__“থেকে যাও মা আজকে।”
জোহান মন খারাপ করে বলে
__“সবাই শুধু চলে যায়! ”
জেরিন এসে ছায়মার হাতে ধরে বলে
__“ও ছায়মা আপু আজ থেকে যাও না। আপু আসবে আর তুমি চলে যাবে? ”
সবাই মিলে এত অনুরোধ করলেও ছায়মা একবারও পিছনে তাকায় না।বিশেষ করে জাহিরের দিকে একবারও নয়।যদি তাকাত—তাহলে কারোর চোখের নিজের কালছে দাগ দেখতে পেতো।ছায়মা চুপচাপ বেরিয়ে গেল।আরমান সব চুপচাপ বসে দেখে। একবদর জাহিরের দিকে তাকায় তো একবার ছায়মার দিকে।
জাহিরের গলা শুকিয়ে আসে। ও চুপচাপ মাথা নামিয়ে বসে থাকে।রাশেদ পাশে বসে ফিসফিস করে,
__“কি হয়েছে আপনার ?”
জাহির ধীরে বলে,
__“কি কিছু না।”
জারার চোখে পানি চলে আসে,
__“যেও না আপু? একটু থাকলে কী হতো।”
মিম গম্ভীর গলায় বলে,
__“কথা না বলে চলে গেল। এটা ভালো হল না।”
ফিহা মুখ গোমড়া করে বলে
__“ ছায়মা আপুর সাথে আর কথা বলবো না!”
সবাই কেমন চিন্তায় পড়ে গেল।মনে হলো পুরো বাড়ির আনন্দ এক মুহূর্তে কমে গেছে। রিমন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মতো বলল,
__“তাহলে যাই… ওকে পৌঁছে দিই।”
আরিফ খান মাথা নেড়ে বললেন,
__“যাও। কিন্তু ফোন করে জানিও ঠিকমতো পৌঁছেছো।”
রিমন মাথা নেড়ে চলে গেল।ছায়মা না থাকায় পুরো বাড়ির হাসিটা যেন কোথাও হারিয়ে গেল। হলের বাতিগুলো জ্বললেও যেন আলো ঠিকমতো ছড়ায় না।
জাহির জায়গা ছেড়ে উঠেই নিজের রুমে চলে গেল।
আরমান রা কেউ ডাকলো না। কারণ ওরা বুঝতে পারলো—মেয়েটির চলে যাওয়া ওর মনে দাগ কাটছে।হয় তো কিছু একটা হয়েছে তাদের মাঝে যা ওদের সবার অজানা।
ড্রইংরুমে সবাই চুপচাপ বসে আছে।ফারিয়া বেগম বলেন,
__“এমন সময় কেউ বাড়ি ছাড়ে? মেয়েটা বড্ড জেদি।”
মারজিয়া বেগমও এসে বসেন,
__“আমি দেখলাম, মুখটা নিচু করে গেল। নিশ্চয়ই কিছু কষ্টে আছে।”
জাহেদ তখন রুটি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে,
__“আচ্ছা, সবাই মন খারাপ করলে চলবে? আজ রিসেপশন। কাজে মন দাও।”
আরমান ফ্রেশ হয়ে এসে বলল,
__“হ্যাঁ, সবাই রেডি হও। জাহির রুমে গেছে—ওকে নেবো। জিনিয়া কে আনতে যেতে হবে। ”
অল্প সময়েই বাড়ির চাপা পরিবেশ বদলে যায়।এক এক করে সবাই কাজ শুরু করলো।আগুনে হাঁড়ি চড়লো, সজ্জা লাগানো হলো, আলো জ্বলে উঠলো।
কিন্তু তবুও—জাহিরের দিকের রুমটা নিস্তব্ধ।
জাহির বিছানায় বসে মাথা ঝুঁকিয়ে রেখেছে।ছায়মা চলে যাওয়া ওর বুকের ওপর ভারের মতো চেপে আছে।সে ধীরে ধীরে বলে,
__“একবারও তাকালো না…? আমি কী অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি?কিন্তু কী আর করার আমার হাত পা বাধা। দোয়া করি আমার কথা আর তোমার মনে না পরুক।”
তার কণ্ঠ ভাঙা।কিন্তু বাইরে থেকে কেউ শুনতে পায় না।
জারা, মিম,ফিহা, জেরিন সবাই মিলে গল্প করছে।যদিও সবার মন খারাপ ছায়মা চলে যাওয়ায়।কিন্তু জিনিয়া আসবে ভেবে মন ভালো হবে যায় সবার।এখন আর কোনো কাজ নেই। মারজিয়া বেগম, জেসমিন বেগম, ফারিয়া বেগম আর ছায়মার আম্মু বসে গল্প করছেন। আরমান দেখে জাহেদ আর রাশেদ একেবারে রেডি হয়ে আছে। তাকেও রেডি হতে হবে। বসা থেকে উঠে সিড়ির দিকে যেতে যেতে আরমান জারাকে ডাক দেয়।
__“মানজারা!”
কিন্তু জারা আরমানের ডাক শুনতে পায় না। সে গল্প করতে ব্যস্ত। হাসতে হাসতে মিমের গায়ের উপর গিয়ে পরছে। আরমান সিড়ির কয়েক ধাপ উঠে আবার ডাক দেয়।
__“মানজারা রুমে এসো! ”
আরমান যে ডাকছে তাকে মেয়ে তা শুনতে পারছে না। আরমান উপরে উঠে সিঁড়ির রেলিংয়ে হাত বাজ করে বাকা হয়ে দাঁড়ায়।দৃষ্টি তার বউয়ের দিকে। যে এখন দীনদুনিয়ার সব ভুলে গল্প করতে বসেছে। আরমানের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠে। দৃষ্টি জারা’র দিকে রেখে বলে
__“এই যে আমার সুন্দরী লক্ষী বউ, এত হাসলে আমার হার্টবিট বেড়ে যায়! সবাইকে একটু বিরতি দিয়ে একটু এদিকে আসবেন?ঘরে এসে আপনার স্বামীজানের সাথে জরুরি প্রেম মিটিং করুন এসে রানী সাহেবা। আসতে পারবেন নাকি কোলে করে নিয়ে আসবো এক অদম স্বামীজান?”
তার কণ্ঠের টান এতটাই গভীর, এতটাই আদরভরা যে ঘরের সবাই প্রথমেই হেসে ওঠে। আর জারা যে বসে ছিলো, তার মুখে সাথে সাথে লজ্জার লালচে আভা ছড়িয়ে যায়। ও মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে আরমানের দিকে তাকাতেই আবার ডাক আসে—
__“এই যে… আমার ছোট্ট রানীটা কি শুনতে পারছে না তার স্বামীজান যে ডাকছে? এবার না এলে কিন্তু আমি নিজে গিয়ে নিয়ে আসব?”
সবাই আরো জোরে হাসে আরমানের কথায়। ফারিয়া বেগম মাথা নেড়ে বলে—
__“যা মা, গিয়ে দেখ তোর পাগল স্বামী আবার কেনো ডাকে। একটু শান্ত করে আয়!”
জেসমিন বেগম বলেন
__“এই বাড়ির প্রতি টা ছেলেই খাঁটি বউ পাগল। বউ ছাড়া তারা এক ঘন্টাও চোখে দেখে না। ”
জারা আর লজ্জা সামলাতে পারে না। হালকা রাগী মুখ করে তাড়াতাড়ি দৌড়ে উপরে উঠে যায়। পেছন থেকে হাসির শব্দ ভেসে আসে।রুমে ঢুকেই দরজা ঠাস করে বন্ধ করে জারা ফিসফিস করে বলে—
__“নির্লজ্জ লোক, অসভ্য লোক… এভাবে কারও সামনে ডাকতে হয় নাকি?”
আরমান দুই পা এগিয়ে এসে দেয়ালে হেলান দেয়। চোখে দুষ্টু হাসি।
__“আহা, আমি তো আমার লক্ষী বউকে ডাকলাম। তাতেই তুমি এমন লজ্জা পাচ্ছো কেন ?”
__“আমাকেই তো ডাকলেন? ”
জারা তাকায় না। মুখে লালচে ভাব নিয়ে কেবল গজগজ করছে।আরমান আরও এগিয়ে এসে ওকে কোমলভাবে জড়িয়ে ধরে।
__“ এখন রাগ করে না সোনা … শোনো, জিনিয়াকে আনতে যাবো। আর শপিংও করবো। তোমার কিছু লাগবে?”
জারা ভ্রু কুঁচকে বলে—
__“আমার তো সব কিছুই আছে। আর কী লাগবে?”
আরমান তখন ওর ঠোঁটে আলতো করে আঙুল ছুঁইয়ে হেসে বলে—
__“লাগবে সোনা… তুমি জানো না কেবল। আলমারিতে একটা ব্লক কালার শাড়ি রাখা আছে। সেটা পরে রেডি হবে বিকেলে। আমি ফিরে এসে যেন আমার লক্ষ্মী বউকে দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।”
জারা এবার সত্যিই তাকায়—
__“এত নাটক করবেন না তো? আমাকে দেখে আপনি জ্ঞান হারাবেন?”
আরমান কাছে এসে আলতো চুমু দিয়ে বলে—
__“আমি তো সবসময়ই তোমাকে দেখে ফিদা হয়ে যাই। তোমাকে দেখলেই মন চায়… এই রূপ দেখে দুনিয়া ভুলে যাই। তুমি আমার আগুন… আমার সোনা বউ…”
জারা শুনে এক রকম গলে যায়। ধীরে ধীরে আরমানকে জড়িয়ে ধরে। দু’জনের মাঝে নরম, শান্ত একটা মুহূর্ত তৈরি হয়। যেন পুরো পৃথিবী শুধুই তাদের দু’জনকে ঘিরে রেখেছে।
কিছুক্ষণ পর তারা আলাদা হয়। জারা একটু গুছিয়ে নেয়, আরমান রেডি হয়ে নিচে নামতে থাকে।
নিচে এসে আরমান দেখে রাশেদ আর জাহেদ ইতিমধ্যে অপেক্ষা করছে। তিনজন মিলে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জাহিরকেও ডাক দেয় আরমান—
__“চলো জাহির।”
জাহির মাথা নেড়ে হাসে
__“আমি যাচ্ছি না ভাইয়া, আপনারা যান।”
আরমান আর চাপ দেয় না। রাশেদ-জাহেদকে নিয়ে দরজা পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। বাড়ির দরজা থেকে বের হতে হতে আরমানের মুখে সেই আগের দুষ্টু হাসি। যেন মনে মনে বলছে—“ফিরে এসে আমার রানীকে দেখবো… ব্লক কালারের শাড়িতে… আর আবার নতুন করে প্রেমে পড়বো।”
আর ভিতরে রুমে দাঁড়িয়ে জারা আয়নার সামনে নিজের মুখ দেখে হালকা হেসে ফেলে—“এই মানুষটাকে আমি সামলায় কীভাবে খোদা?”
কিন্তু তার চোখের গভীরে লুকোনো ভালোবাসাটা স্পষ্ট আরমান ডাকলেই, যতই লজ্জা পাক, সে দৌড়ে তার কাছেই ফিরে যাবে।
খান ম্যানশনে আজ যেন উৎসবের হাওয়া। রিসেপশনের দিন বলে ঘরজুড়ে ব্যস্ততা, হাসিঠাট্টা আর সাজগোজের ধুম। উপরে বড় রুমে তিন মা—ফারিয়া বেগম, জেসমিন বেগম আর মারজিয়া বেগম—তিন বউকে নিয়ে সাজাতে বসেছেন।
জারা আলমারির থেকে ব্ল্যাক কালারের শাড়িটা বের করতেই ফারিয়া বেগম চোখ কুঁচকে তাকালেন।
— “এই মেয়ে কালো শাড়ি বের করিস কেনো ?”
জারা ঠোঁট কামড়ে বলল,
— “তোমার ছেলেই তো বলে গেছে। এটা পরতে।”
ফারিয়া বেগম বিরক্ত গলায় বললেন,
— “ওর কথা একটু কম শুনবি । আয়, আয় আমার সাথে।”
বলেই তিনি আলমারি খুলে একটা গাঢ় লাল শাড়ি বের করলেন।
— “এইটা পর। আজ তোদের রিসেপশন। লালেই রানি লাগবি তুই, আর আমার পাগল ছেলে তোকে দেখে ফিদা ।”
জারা শাড়িটা হাতে নিয়ে একটু লজ্জায় মাথা নুয়াল।
— “আচ্ছা আম্মু…”
অন্যদিকে জেসমিন বেগম ফিহাকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে চুল ঠিক করছেন। মাঝে মাঝে বকছেন, আবার মুহূর্তেই মায়া দেখাচ্ছেন।ফিহার খুব ভালোই লাগছে। মায়ের অভাব টা আর মনে দাগ কটছে না তার। জেসমিন বেগম বলেন
— “ফিহা, দাঁড়া তো ভালো করে। চুলটা ঠিক করে দেই। কেমন এলোমেলো অবস্থা।”
ফিহা নরম গলায় বলল,
— “আম্মু আমি তো ঠিক করে দাড়িয়েছি…”
— “চুপ কর। আমি দেখছি তো কেমন করে দাঁড়িয়েছিস। বউ এভাবে সাজে?”
ফিহা মুচকি হেসে চুপ হয়ে যায়। তার চোখে লাজুক আনন্দের ঝিলিক। মিমের সামনে সাজসজ্জার পাহাড়। রাশেদ সকালে বের হওয়ার আগে একটি শাড়ি বিছিয়ে রেখে গেছে। মারজিয়া বেগম শাড়িটা তুলে দেখলেন।
— “মিম, এটা পরবি?”
মিম লাজুক কণ্ঠে বলল,
— “হুম… ও-ই বলেছে এটা পরতে।”
সেই কথা বলতেই গাল লাল হয়ে ওঠে তার। তিন জনকে সাজানোর একসময় শুরু হয় চুল, গয়না সাজের আসল কাজ। ফারিয়া বেগম জারার চুলে ফুল গুঁজতে গিয়ে বলেন,
— “এই মেয়ে, চুলে এতো জট হয়েছে? ঘুম থেকে উঠে লাফ দিয়ে নেমেছিস? ”
জারা লজ্জায় হাসল,
— “না আম্মু, সকালে একটু দেরি…”
— “বুঝছি বুঝছি, থাম! আর বলিস না মা ?”
এই কথা শুনে জারা থমকে ফেলে—তারপরে হঠাৎ করেই পুরো ঘর হেসে ওঠে। ফিহা হাসতে হাসতে বলে,
— “ আরমান ভাইয়া আমার জানুকে একটু বেশিই ভালোবাসে কি না ।?”
জারা চোখ বড় করে,
— “এই ফিহা! তুইও না…”তার কথা শেষ হওয়ার আগেই তিন মা আর তিন বউ সমানভাবে হেসে গড়িয়ে পড়ে।
জারা শাড়ি পরে জুতা খুঁজছে। অবশেষে ব্ল্যাক হাই হিল জুতা পরে ফারিয়া বেগমের সামনে দাঁড়াতেই তিনি আবার অবাক।
— “এই জারা! তুই হাই হিল পরছিস কেনো?”
জারা মাথা চুলকে বলল,
— “কারণ… আপনার ছেলে আমার থেকে অনেক লম্বা শাশুড়ী আম্মা। আমারও তো একটু মান-সম্মান আছে। তাই হাই হিল পরছি।”
ফারিয়া বেগম চোখ পিটপিট করলেন,
— “ওরে বাপরে! আবার সম্মানও আসে!” ফিহা আর মিম হাসতে হাসতে কাত।
মিম বলল,
— “জারা ঠিকই বলছে। না হলে ভাইয়ার পাশে দাঁড়ালে মনে হয় ও ক্লাস ফোরের ছাত্রী।”
জারা অভিযোগের ভঙ্গিতে বলল,
— “এই তোমরা তিনজন মিলে আমাকে নিয়েই জমা করছো?”
জেসমিন বেগম বলেন
__“এই সাবধান! জারা কিন্তু ওর স্বামীজানের কাছে নালিশ করবে!”
জারা ঠোঁট উল্টে বলে
__“ছোট আম্মু তুমি ও?”
মারজিয়া বেগম হাসলেন,
— “জারা মা রাগ করে না। মজা করছে সবাই।”
এমন হাসি-আনন্দের মধ্যেই তিনজন পুরো সাজগোজ শেষ করে আয়নার সামনে দাঁড়ায়।জারা—লাল শাড়িতে রাজকন্যা। ফিহা—নরম কটন রঙের শাড়িতে শান্ত, মিষ্টি। মিম—চকচকে নীল শাড়িতে খিলখিল হাসি।
তিন মা একসাথে বললেন—
— “মাশাআল্লাহ! চোখ জুড়িয়ে গেল।”
নীচে ঠিক তখনই হলঘর সরগরম। পুরুষেরা রেডি হয়ে নিচে জড়ো হচ্ছেন—আরিফ খান, আসিফ খান, আনিছুর রহমান—সবাই আজ মেয়ে-ছেলেদের রিসেপশন নিয়ে ব্যস্ত।
ফারিয়া বেগম বললেন,
— “চল মা,চিনে যাই। সবাই অপেক্ষা করছে।”
জারা শাড়ির আঁচল সামলে বলল,
— “ আম্মু… তোমার ছেলের পছন্দ হবে তো?”
— “তুই শুধু ধৈর্য ধর! দেখবি আমার ছেলে তোকে দেখে জ্ঞান হারাবে।”
জারা ‘রা সবাই নিচে নেমে আসে। তাদের মনে আলাদা অনুভূতি কাজ করছে। তাদের বর’রা তাদের দেখে কী
আরমান, জাহেদ এবং রাশেদ দুপুরের রোদ খানিকটা কমতেই শপিংয়ের জন্য বের হয়। তিনজনেরই হাতে লিস্ট, আরমান সবকিছু আবার মিলিয়ে দেখে নেয়। আজ যে কাজগুলো করতে হবে সেগুলোর গুরুত্ব অনেক, তাই কোনো কিছুই যেন বাদ না পড়ে।তার বোনের জন্য এক একটা জিনিস বাছাই করা। তারা মার্কেটের ভিড়ে তীব্র ব্যস্ততা, কিন্তু তাদের হাঁটা স্থির ও শান্ত। প্রতিটি দোকানে ঢুকে তারা মনোযোগ দিয়ে কেনাকাটা করতে থাকে।
জাহেদ সবসময়ই একটু উচ্ছ্বসিত, তাই নতুন কিছু দেখলেই থেমে যায়।জাহেদ মনে করে ফিহার জন্য একটা ফোন কিনে নেয়। আর কখনও কাপড়, কখনও সাজসজ্জার জিনিস—কোনো কিছুই তার চোখ এড়িয়ে যায় না। রাশেদ বরাবরের মতো হিসেবি। দাম, মান, প্রয়োজন—সবকিছুর খুঁটিনাটি দেখে তারপর সিদ্ধান্ত নেয়। আরমান দুজনের মাঝখানে ভারসাম্য ধরে রাখে। কারোর বাড়তি তাড়াহুড়া নেই, আবার ধীরগতিও নেই।
শপিং ব্যাগ ধীরে ধীরে ভরে ওঠে। বিভিন্ন দোকানের ব্যাগে তাদের হাত ভর্তি হয়ে যায়। প্রয়োজনীয় জামাকাপড়, কয়েকটি উপহার, ঘরের ব্যবহার্য কিছু জিনিস—সবই একে একে যোগ হয় তালিকায়। এরপর তারা ফলের দোকানে যায়। তাজা ফলের গন্ধ বাতাসে মিলেমিশে থাকে। রঙিন ফলের সারি চোখে পড়তেই তিনজন আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। আরমান সাবধানে সব বাছাই করে, জাহেদ কখনও আঙুর তুলে দেখে, কখনও আপেলের লাল রঙ দেখে উৎসাহিত হয়। রাশেদ দাম ঠিক করে বিল পরিশোধ করে।
প্রতিটি ব্যাগ গোছানো হয়ে গাড়িতে রাখার পর মনে হয়, দিনের অর্ধেক কাজ যেন সফলভাবে শেষ হলো। ব্যস্ত কেনাকাটার পর সামান্য ক্লান্তি এলেও তাদের মুখে তৃপ্তি স্পষ্ট। কারণ এরপর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি—রোহানদের বাড়িতে যাওয়া। সেখান থেকেই পরবর্তী পরিকল্পনা শুরু হবে।
গাড়ি শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে ধীরে ধীরে শান্ত এলাকায় পৌঁছে। রোহানদের বাড়ির সামনে গিয়ে গাড়ি থামাতেই পরিবেশ বদলে যায়। ঘরের সামনে সাজানো বাগান, লতানো গাছের নিচে ছায়া, আর বিকেলের নরম আলো—সবকিছু মিলিয়ে চারপাশে একধরনের স্বস্তির অনুভূতি তৈরি হয়।
তারা তিনজন একে একে ব্যাগগুলো গুছিয়ে নেয়। তারপর বাড়ির ভেতরে ঢোকে। ভেতরের আবহটা পরিচিত, আরামদায়ক। লিভিং রুমে বসতেই যেন দিনের ক্লান্তি খানিকটা নেমে আসে। এখানে তারা অতিথি হলেও সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ যে পরিবেশে কোনো আনুষ্ঠানিকতা থাকে না।
জিনিয়া এবং রোহান তখন তাদের জন্যই বসে অপেক্ষা করছিলো। তারা তিনজনকে দেখে ঘরের ভেতরে একটা প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়। জিনিয়া স্বভাবসুলভ আন্তরিকতায় সবাইকে অভ্যর্থনা জানায়। আরমানদের হাতে এতগুলো ব্যাগ দেখে অবাক হলেও বুঝে নেয় যে অনেক প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে বোনের শশুড় বাড়িতে। রোহান বাড়ির বাইরে বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল ওদের আসতে লেট হচ্ছে বলে, তাই সবাই একসঙ্গে থাকা মাত্রই পরিবেশ আরও হালকা হয়ে ওঠে।
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হতে থাকে। ঘরের ভেতরে সবাই তাদের নিজস্ব ছন্দে ব্যস্ত হয়ে পড়ে—কেউ ব্যাগ গুছাচ্ছে, কেউ পরের গন্তব্যের কথা ভাবছে, কেউ আবার যাচাই করছে কিছু বাদ পড়েছে কি না। সবশেষে জিনিয়া নিশ্চিত হয় যে সবকিছু ঠিক আছে, তারপর সবাই প্রস্তুত হয় বের হওয়ার জন্য।
আরমান, জাহেদ ও রাশেদ শপিংয়ের ভার কমলেও পরবর্তী পরিকল্পনার দায়িত্ব আরও বড় হয়ে ওঠে। তাদের মুখে ব্যস্ততার ছাপ থাকলেও তৃপ্তি ঝরে পড়ে। কারণ আজকের প্রতিটি কাজই পরিবারকে কেন্দ্র করে। প্রতিটি সিদ্ধান্তে যত্ন আর ভালোবাসার স্পর্শ।
সবাই যখন বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন আকাশে সন্ধ্যার হালকা রঙ খেলা করছে। গাড়িতে উঠে দরজা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে দিনের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে এক নতুন গন্তব্যের দিকে যাত্রা শুরু হয়। তাদের সামনে অপেক্ষা করছে খান ম্যানশনের পরিবেশ, আরও কিছু পরিকল্পনা, আর অনেকগুলো মিলিত মুহূর্ত—যা সবার দিনটাকে আরও সুন্দর করে তুলবে।
খান ম্যানশনের গেট খুলতেই তিন দুলহা—আরমান, রাশেদ আর জাহেদ—হাতে শপিং ব্যাগ নিয়ে ভেতরে ঢুকল। রোহান আর জিনিয়া তাদের সাথেই। গেট পর্যন্ত যেন সব ঠিকই ছিল। কিন্তু ভিতরে পা দিতেই দৃশ্যটা এমন যে—তিনজনেরই নিঃশ্বাস থমকে যায়।
সামনের দিকে দাঁড়িয়ে আছে তিন রানি—জারা, লাল শাড়িতে আগুনের মতো সুন্দর। ফিহা, সোনালি রঙে মিষ্টি-শান্ত। মিম, চকচকে নীল শাড়িতে চোখ ঝলসে দেওয়া হাসি।তাদের সবার মুখে লাজুক আলো।
আরমানের চোখ ঠিক জারায় থেমে গেল।মন যেন একঝটকায় ভেঙে পড়ল বুকের ভেতর। রাশেদ তাকিয়ে রইল মিমের দিকে—মুখটা আস্তে আস্তে লাল হয়ে যাচ্ছে।জাহেদের দৃষ্টি আটকে গেল ফিহার চোখে।
তিনজনেরই মনে একই চিন্তা—“এদের দেখে কেউ বাঁচতে পারে?”
জিনিয়া ঘরে ঢুকতেই জোহান আর জেরিন দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। জেসমিন বেগম আর ফারিয়া বেগম এগিয়ে এসে বললেন,
— “কেমন আছিস মা? রাস্তায় কষ্ট হলো না তো?”
জিনিয়া ওর মা, কাকি মার সাথে গল্পে মেতেছে।
কিন্তু তিন ছেলের দৃষ্টি সেদিকে নেই।তারা বাড়ির ভেতর ঢুকলে পুরো ঘরেই ফিসফাস ছড়িয়ে পড়ে।
জারা একটু লাজুক হাসি দিয়ে আরমানের দিকে তাকাল। ফিহা চেয়ে থাকে জাহেদের চোখে চোখ রেখে। মিম তো লজ্জায় মাথা নিচু করে রাশেদের কথা ভাবতেই গাল লাল করে। ঠিক তখনই রোহান অবাক হয়ে তিন বন্ধুকে দেখে বলে উঠল—
— “এই তোরা থেমে থেমে তাকাচ্ছিস কেনো? কী হলো?”
তিনজনেরই নিঃশ্বাস ভারী।গলা শুকিয়ে গেছে। হঠাৎ তারা তিনজনই কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল—
— “আমাকে… কেউ ধর…রে…!”
এরপর ধপ… ধপ… ধপ—তিনজন একসাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। ঘরজুড়ে চিৎকার ছড়িয়ে পরে ।জারা সবার আগে ছুটে আসে।
— “স্বামীজান! স্বামীজান! উঠুন! শুনছেন?”তার চোখ ভিজে ওঠে মুহূর্তেই।
ফিহা জাহেদের নাম ধরে কাঁদছে।
__“জাহেদ খান! জাহেদ খান! উঠুন । কি হইছে আপনার?”
মিম কাঁপা গলায় রাশেদকে নাড়িয়ে বলছে,
— “এভাবে শুইয়ে থাকবেন না! রাশেদ আমার কথা শুনছেন?”
জেসমিন বেগম দৌড়ে এসে জোরে বলে ওঠেন,
— “ও আল্লাহ ! এই কী হলো তিনজনের?”
ফারিয়া বেগম তো ভয়েই থরথর।
— “এইভাবে একসাথে জ্ঞান হারায় কিভাবে?”
ঘরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।আরিফ খানও ছুটে আসেন দ্রুত পায়ে।
— “কী হয়েছে? কী হলো ওদের?”
জাহির ইতোমধ্যে পানি এনে ফেলেছে।রোহান বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছে, কী করবে বুঝতে পারছে না।
রিমন ছেলের মতো দায়িত্ব নিয়ে বলে,
— “ভাইয়া উঠান তুলন। এক এক করে রুমে নিয়ে যাই।”
রোহান আর জাহির মিলে প্রথমে আরমানকে তুলে ধরে তার রুমে নেয়। মিম আর ফিহা কান্না থামাতে পারছে না।
মারজিয়া বেগম আর জিনিয়া জারাদের সামলাতে ব্যস্ত। জারা কাঁদতে কাঁদতে বলছে,
— “আমার স্বামীজানের কিছু হবে না তো? আম্মু… বলুন না…”
ফারিয়া বেগম তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন,
— “কিছু হবে না মা। নাটকবাজ ছেলে… একটু বেশি হাইপার হয়ে গেছে তোকে দেখে বোঝতে পেরেছি ।”
কিন্তু তার নিজের গলাও কাঁপছে।
৩ জনকে আলাদা রুমে নেওয়া হলো।সবাই দৌড়া দৌড়ি, পানি ছিটানো, হাত-পা টিপে দেখা—একটা অদ্ভুত বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে বাড়িতে।
রাশেদের রুমে গিয়ে মিম ফুঁপিয়ে বলে,
— “আপনি কেনো এভাবে পড়ে গেলেন? আমি কী আপনার চোখে ভয়ানক লাগলাম?”
ফিহা আতঙ্কে হাত কাঁপিয়ে জাহেদের কপালে পানি দিতে দিতে বলে,
— “একটু চোখ খুলোন না, আমি ভয় পাচ্ছি।”
জারা তো কাউকে দাঁড়াতে পর্যন্ত দিচ্ছে না।সে আরমানের হাত জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।
— “স্বামীজান! আপনি কথা বলুন…”
ঘরজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে গেল।এখন অনুষ্ঠান? রিসেপশন?সব ভুলে গেছে সবাই। আনিছুর রহমান নার্ভাস কণ্ঠে বলেন,
— “ডাক্তার ডাকুন কেউ?”
আসিফ খান মাথা চুলকায়,
— “একসাথে তিনজন! এটা আবার কী রোগ?”
এদিকে তিনজন বউ-ই আতঙ্কে ভেঙে পড়েছে।
মারজিয়া বেগম তাদের শান্ত করতে করতে বলেন,
— “তোরা ভয় পাস না। হয়তো কিছু খাবারে গোলমাল হয়েছে।”
আনিছুর রহমান বলেন
__“তাই বলে তিনজনের একসাথে? ”
কিন্তু এরপরেই ফারিয়া বেগম ফিসফিস করে বলেন,
— “খাবার না! ওরা ওদের বউগুলোকে দেখে তো জ্ঞানই হারিয়েছে!”
জেসমিন বেগম মাথায় চাপড় মারেন,
— “ধুর শয়তানের বাঁদরগুলো… শান্তি দেয় না আমাদের।”
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬৯ (২)
কিছুক্ষন পর ডাক্তার দ্রুত এসে তিনজনকে পর্যবেক্ষণ করলেন—রক্তচাপ, পালস, চোখের নড়াচড়া সবই পরীক্ষা করলেন। চারদিকে নীরবতা, শুধু জারা–ফিহা–মিমের কান্নার চাপা শব্দ। ডাক্তার ভ্রু কুঁচকে বললেন, পরিস্থিতি স্থিতিশীল। আপাতত ভয় পাওয়ার কিছু নেই বলে সবাইকে শান্ত করলেন। এরপর প্রয়োজনীয় প্রেসক্রিপশন লিখে পরিবারের লোকজনকে কিছু নির্দেশনা দিয়ে বলেন আবার কোনো সমস্যা হলে তাকে জানাতে তিনি সাথে সাথে চলে আসবেন। ডাক্তার বের হতেই ঘরে আবার হতভম্ব নীরবতা নেমে আসে।
বাড়ির ভিতরে উদভ্রান্ত দৌড়াদৌড়ি সব মিলিয়ে খান ম্যানশন হঠাৎ করে রাতের অন্ধকার মেনে এলো।এদিকে তিনজন শক্তপোক্ত, নির্লিপ্ত, অচেতন দেহে পরে আছে তিনজন।
ফারিয়া বেগম জারাকে বলেন
__“আমি কী বলেছিলাম? আমার ছেলে তোকে দেখে জ্ঞান হারাবেই! কথা মিললো তো!”
বলেই তিনি হাসেন। আরিফ খান কে নিয়ে বের হয়ে যান। জারা বসে থাকে আরমানের কাছে।
