Home লাভ বাই দ্যা ভিলেন লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১২

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১২

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১২
লিজা মনি

এনির জ্ঞান ফিরে প্রায় বিকেল চারটার সময়। পিট পিট করে চোখ খুলে তাকায়। মাথায় ব্যাথা অনুভব করাতে পুনরায় চোখ বন্ধ করে ফেলে। শরীরে নড়াচড়ার সামান্য শক্তি পর্যন্ত নেই। এনির বন্ধ চোখ দিয়ে বাঁধহীন অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে। শরীরে কালকে দুপুরের একটা পরিহিতা শার্ট। এখন ও শাওয়ার নেওয়া হয় নি। নিজের জীবনের এমন অবিচল অবস্থা মনে পড়তেই ভেতরটা হাহাকার করে উঠে। ওর কি আর পাঁচটা সাধারন মানুষের মত বাঁচার অধিকার নেই? আর কি কখনো বাহিরের আলো দেখতে পারবে না? প্রতিনিয়ত এইভাবে মানসিকভবে নির্যাতিত হয়ে ধুকে ধুকে মরতে হবে! আচমকা নিজের কপালে কারোর ভালোবাসার পরশ পেয়ে অশ্রুভেজা চোখ খুলে তাকায়। সামনে চিত্রাকে মুখ গুঁজে কান্না করতে দেখে এনি মুচকি হাসে।
এরপর চিত্রার হাতে স্পর্শ করে বলে,

” আপনি কেনো কাঁদছো চিত্রা মাসি?
চিত্রা এনির সরল মুখটায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
” তোমার ভাগ্য নিয়ে বড্ড আফসোস হয়। ফুলের মত মেয়েটা দিনের পর দিন এইভাবে ধুকে ধুকে মরছে ভাবতেই কলিজাটা ছিড়ে যাচ্ছে।
এনি মলিন হাসে। চারপাশে দুর্বল চোখ দুটি দৃষ্টি ফেলে ঠোঁট কামড়ে রাখে। চোখে পানি টিপ টিপ করছে। এরপর ও অধরে হাসি ফুটিয়ে বলে,
” ভাগ্য বিশ্বাস করেন মাসি?
চিত্রা যেন কথাটা বঝল না। চিত্রাকে চুপ থাকতে দেখে এনি নিশ্বাস টেনে বলে,
” আপনাদের ধর্মে ভাগ্য বিশ্বাস আছে?
— হ্যা।
— আমি সেই ভাগ্যকেই বিশ্বাস করে বেঁচে আছি। জানি না আমার শেষ পরিনতি কি হবে । তবে এখন যে পরিস্থিতিতে আছি সেটা নরক হিসেবে বিবেচিত হলেও আমার ভাগ্য। আমার চোখের পানিতে এই মুহূর্তে আপনার কলিজা ছিড়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমার কলিজায় রক্তক্ষরন হচ্ছে প্রতিটা সেকেন্ডে। আপনি তো মেয়ে মাসি। সম্মানের লড়াই বুঝেন?
চিত্রা কান্না করছে। ভাঙ্গা গলায় বলে,

” বুঝব না কেনো মা? অবশ্যই বুঝি।
— আমি সেই সম্মানের লড়াই করে গিয়েছে মাসি। পাচার কেন্দ্রে ভয়ানক পনেরোটা দিন পার করছি। এখন ও করছি ক্ষনে ক্ষনে।
— তোমাকে তো স্যার বিয়ে করেছে এনি। এখন স্পর্শ করলেও পবিত্রতা আছে। পাপ হবে না তোমার।
এনি চোখ বন্ধ করে ফেলে। বুকের বাম পাশে প্রচুর চাপ অনুভব হচ্ছে। শরীর এতটাই দুর্বল যে নড়া-চড়া করতেও খারাপ লাগে। এনি দীর্ঘ নিশ্বাস টেনে বলে,
” পবিত্রতা দিয়ে স্পর্শ অনুভব করা যায় না মাসি। এইটাকে বিয়ে নয় জুলুম বলে। এখন ও পুরো পৃথিবীর সামনে আমাকে রক্ষিতা হিসেবেই সম্মোধন করে, নিজের স্ত্রী হিসেবে নয়।
নিকের স্ত্রী কথাটা স্মরন হতেই এনির শরীর কাটা দিয়ে উঠে। ঘৃনায় গা গুলিয়ে আসে এক প্রকার। নিকের স্ত্রী ভাবতেই কেমন বমি পাচ্ছে।

এনি চোখ বন্ধ করে ফেলে। দুই দিন যাবত প্রচন্ড জ্বরে কপোকাত সে। নিদ্রহীন, চিন্তায় জর্জরিত চোখ দুটিতে কেমন এক শূন্যতা। দবদবে ফর্সা মুখটি মলিন হয়ে গিয়েছে। চোখ কোটরে বসে যাচ্ছে প্রায়। মুখের লাবন্যতা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে। চুলগুলোর উপর ঠিক কতদিন ধরে চিরনি পড়ে না তার হিসেব হয়ত এনির নেই। চিত্রা চেয়েছিলো এনির চুলগুলো তেল দিয়ে বেঁধে দেওয়ার জন্য। কিন্তু এনি না করে দেয়। চিত্রার জোড়াজোড়িতেও সে রাজি হয় না। যে সৌন্দর্য, চুলের বাহারে তার এমন পরিনতি সেই সব ক্ষয়ে যাক। এনি খুব করে চায় তার সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাক। বিধাতা তার শরীরটাকে জ্বালিয়ে দিক। যাতে কোনো পুরুষের নজর তার উপর না পড়ে। কোনো পুরুষ অধিক টাকার লাভে তাকে এক দেখাতেই পাচার কেন্দ্রে না রাখে। কোনো পুরুষ যাতে মনের খোরাক মেটাতে নিলাম কেন্দ্রে না তোলে। সর্বশেষ কোনো পুরুষ যাতে কামনা মিটাতে রক্ষিতা হিসেবে না রাখে। জোর করে নাম মাত্র বিয়ে করে দিনের পর দিন মানসিক টর্চার না করে। এইটাই তো চায় এনি। তার রুপ, লাবন্য শেষ হয়ে যাক। নিজের সৌন্দর্য নিয়ে এখন সে নিজেই বিরক্ত হয়ে পড়েছে। তার থেকেও হাজার গুন সুন্দরী নারীরা রয়েছে কিন্তু তাকেই কেনো জানোয়ারদের কবলে পড়তে হলো?

এইটাই হলো ভাগ্য! হয়ত দুর্ভাগ্য ও বলা যেতে পারে।
এনি নিজেকে ইদানিং অনেক সাহসী দাবি করে। যখন তাকে পাচার কেন্দ্রে রাখা হয়েছিলো তখন সে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ঠিক কতবার অজ্ঞান হয়েছে তার কোনো হিসেব নেই। কোনো পুরুষ কাছে ঘেষে নি তার তবুও ভয়ে আতঙ্কে জমে যেত। খুবই ভিতু প্রকৃতির সে। সামান্য রক্ত দেখলেই মাথা ঘুরে উঠত। সামান্য হাত কেটে গেলে কান্না করতে করতে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে ফেলত। কিন্তু আজ তার পুরো শরীরে অসংখ্য ক্ষতের দাগ। ডান পা পুড়ে গিয়েছে। শরীরে কাঁচ গেঁথে গিয়েছে। প্রচন্ড জ্বরে কাঁপছে তিনটা দিন ধরে। অথচ আজ সে কান্না কাটি করে পুরো বাড়ি মাথায় তুলছে না। কাউকে অভিযোগ করছে না, তার ভেতরে প্রচুর কষ্ট হচ্ছে। তার আপা তার পাশে নেই। যে নিকের সামন্য চাহনিতে সে ভয়ে কাঁপত। আজ সেই গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানের চোখে চোখ রেখে সে কথা বলে। অনেক সাহসী আর বড় অনুভব করছে এনি নিজেকে। হঠাৎ করেই এনির চোখ জ্বলজ্বল করে উঠে।
প্রশ্নের উত্তর যাচাই করতে নিজের ভাবনার মধ্যেই চিত্রার উদ্দেশ্যে বলে,

” মাসি উনার স্ত্রী কোথায় ? তারা কি উনার সাথে থাকে না?
চিত্রা অবাক হয় প্রচুর। এনির প্রশ্নটা বুঝতে না পেরে অবুঝের মত বলে,
‘ কার স্ত্রী মা?
– নিক জেভরানের স্ত্রী? উনার পরিবার কোথায়?
— তার স্ত্রী তো তুমি। আর কার কথা বলছো?
চিত্রার মুখে নিকের স্ত্রী সম্মোধনটা যেন সহ্য হলো না। শরীর জ্বলে উঠলো কিছুক্ষনের মধ্যে। প্রচন্ড ক্ষোভ আর ঘৃনায় জর্জরিত হয়ে বলে,
” আজ বলেছেন, দ্বিতীয়বার আমাকে উনার স্ত্রী হিসেবে সম্মোধন করবেন না মাসি। কোনো জালেমের স্ত্রীর সম্মোধন শুনলে শরীরে বিষক্রিয় ব্যাথা অনুভব করি। আমি উনার পরিবার সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি।
চিত্রা তপ্ত শ্বাস ছাড়লো। এরপর নিজেকে ধাতস্ত করে বলে,
” স্যারের তো পরিবার নেই।
এনি অবাক গলায় বলে,
‘ উনার বাবা – মা কোথায়?

— আমার জানামতে বাবা- মা কেউ বেঁচে নেই। আর উনি মায়ের কথা শুনলে প্রচন্ড রেগে যায়। আর সেই রাগ নিভানোর ক্ষমতা আমাদের কারোর নেই। একবার সেই রাগ আমি নিজ চোখে দেখেছি। কি ভয়ংকর দেখায় তখন। সেদিনকার কথা মনে পড়লে আজ ও বুক কেঁপে উঠে। তবে সেদিন আরিশ স্যার ঠিকমত যদি না পৌছাত তাহলে অনেক গার্ডের জীবন যেত সেদিন। এই ভাইপার মেনশনে এক তান্ডব লীলা লেগে যেত।
এনি প্রয়োজনের তুলনায় প্রচুর অবাক হয়। কোনো সন্তান তার মায়ের নাম শুনলে এতটা রেগে কেনো যাবে? হয়ত লোকটা খারাপ, নিকৃষ্ট, কিন্তু নিজের মায়ের প্রতি এত রাগ! সন্তান যত খারাপ হোক, নিজের মাকে সর্বদা মর্যাদা দিয়ে থাকে। মায়ের সঙ্গ পায় নি বলেই আজ এতটা নরপিশাচ! এনির মনে পড়ে বিয়ের দিন রাতের ঘটনা। সেদিন নিকের মায়ের কথা তুলাতে প্রচুর রেগে গিয়েছে। এর আগেও একবার তাকে আঘাত করেছে।
— আমি এক বার বলেছিলাম। সেদিন ও প্রচুর রিয়্যাক্ট করেছিলো।
চিত্রা ভয়ে চট করে তাকায় এনির দিকে। এনি চিত্রার ভয়টাকে অনুমান করতে পেরে বলে,

” ঘাবড়ে যাবেন না। রাগ করেছে, আঘাত করেছে তবে অল্প। ভয় পাওয়ার মত কিছু করে নি। বাই দ্যা ওয়ে উনার স্ত্রী – সন্তান নেই?
— আমার জানা মতে নেই। স্যার মেয়েদের দেখলে প্রচুর নাক ছিটকায়। তাই তো বাড়িতে আমি বাদে কোনো মেইড নেই। সব ছেলে কাজ করে।
এনি অবাক হয়ে ভ্রুঁ নাচিয়ে বলে,
” নাক ছিটকায়?
— হ্যা।
— তাহলে কি আমি মেয়ে নয়। আমাকে কেনো এইভাবে আবদ্ধ করে রেখেছে?
— সে প্রশ্নের উত্তর আমরা প্রতিটি মানুষ’ই খুজছি। যখন প্রথম তোমার কথা শুনেছি স্টাফ থেকে শুরু করে সবাই বাক রুদ্ধ হয়ে ছিলাম। স্যারকে মেয়েলি জিনিসে কখনো জড়াতে দেখে নি। হ্যা উনি ভয়ানক, হৃদয় নেই, ভালোবাসা কিছুই নেই। কিন্তু মেয়ে বাজ নয়।
চিত্রার কথায় এনি তাচ্ছিল্য হেসে বলে,

” সব মুখোশ পড়ে থাকে। বদ্ধ সাউন্ড প্রুফ রুমের ভিতরের কাহিনী আপনারা কিভাবে জানবেন?
চিত্রা থমথমে খেয়ে যায়। সত্যি’ত তারা কিভাবে জানবে? আর নিক বাড়িতেই বা থাকে কতক্ষন। কখন আসে, কখন যায় তার কোনো ঠিক নেই।
এনি গম্ভীর হয়ে বলে,
“একদম পরিবার হীন কিভাবে থাকে মানুষ?
” স্যারের একদম কাছে বলতে আরিশ স্যার আছে। তবে উনাদের একজন দাদামশাই আছে। আর তোমার বয়সী একটা মেয়ে আছে হয়ত আরিশ স্যারের বোন।
এনি চমকায় প্রচন্ড। আরিশের বোন আছে ভাবতেই সে অবাক হয়।
— মি. আরিশের ছোট বোন আছে?
— তাই তো শুনেছিলাম। একবার এসেছিলো এখানে। আর তখন’ই দেখেছিলাম। প্রচুর মিশুক আর চঞ্চল প্রকৃতির। পুরো বাড়ি মাথায় তুলে রেখেছে। নিক স্যার কে এই একটা মেয়ের সাথেই কথা বলতে দেখেছি।
এনি গম্ভীর নিশ্বাস ছাড়ে। নরপশুদের ঝোঁপেও তাহলে কোমল মেয়ের বসবাস আছে। এনিকে চুপ থাকতে দেখে চিত্রা বলে,

” আমার মন একটা জিনিস কিছুতেই মানতে চাচ্ছে না। হ্যা নিক স্যার প্রচুর রাগী আর ভয়ানক বাট মেয়ে বাজ না।
চিত্রার আত্ন বিশ্বাস দেখে এনি পুনরায় তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
— উনি কত সুন্দর ভালো মানুষের মুখোশ পড়ে থাকে। যদি উনি সাধু পুরুষ হয় তাহলে শরীরের কামনা মিটায় কার কাছে? পাচার কেন্দ্রে প্রতি রাতে মেয়েরদের যে বুক ফাটা আর্তনাদ গুলো শুনে এসেছি সেগুলো কি? তাদের সাথে এমন অবিচার কারা করে তাহলে? উনার মত জঘন্য লোক এখন ও বসে আছে মাসি? উনি পরিবারের আদর্শে বেড়ে উঠা সেই শুদ্ধ পুরুষ নয় যে সম্মানের ভয়ে মেয়ে বাজি করবে না। উনার কাছে টাকা, গাড়ি, বাড়ি সব আছে। প্রতি রাতে নারী পরিবর্তন করলেই বা কি মাসি? কে দেখবে, কে অভিযোগ দিবে? ক্ষমতা আছে কারোর?
চিত্রা সামনে তাকিয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে। পুরো শরীর জমে অবশ হয়ে আসে। রক্তের প্রবাহ গতি ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে। থরথর করে কাঁপতে থাকা শরীরটা নিয়ে কোনো রকম উঠে দাঁড়ায়। চিত্রার সরে যাওয়া অনুভব করে এনি ঘাড় কাৎ করে চিত্রার দিকে তাকায়। চিত্রাকে ভয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে কাঁপতে দেখে অবাক হয়ে প্রচুর। কপাল কুচকে সামনে তাকাতেই বসা থাকা অবস্থায় কিছুটা পিছিয়ে যায়। নিককে এমন ভাবে সামনে এগিয়ে আসতে দেখে এনি ভয়ে শুষ্ক গলা ভিজিয়ে নেয়। ঘন ঘন নিশ্বাস ছাড়ছে। নিকের ধূসর রাঙ্গা চোখ দুটির কার্নিশ প্রচন্ড লাল হয়ে আছে। ফর্সা মুখমন্ডলটা রক্তিম আকার ধারন করেছে। চোয়াল শক্ত করে একদম বিছানার পাশে এসে দাঁড়ায়। নিকের বড় সড় দেহটা এনির চোখের সামনে ভেসে উঠে। কালো শার্ট পরিহিতা সুদর্শন যুবক অত্যন্ত ক্ষোভ নিয়ে তার দিকে হিংস্র নজর ফেলে তাকিয়ে আছে। এনি নিজেকে গুটিয়ে নেয়। অজানা আতঙ্কে বিছানার নরম চাদর খামছে ধরে। শরীর প্রচুর দুর্বল এখন। যদি এই দুর্বল শরীরের উপর পুনরায় কোনো আঘাত পরে তাহলে মৃত্যু নিশ্চিত। এনি ও চায় মরে যেতে। কিন্তু মরে যাওয়ার বিষয়টা অনুভব করলেও ভয় কাজ করে। ছোট্ট শরীরটা কিছুক্ষনের মধ্যে বরফের ন্যায় জমে যায়। শুধু অনুভব করছে চিত্রা ধীর পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
বিষয়টা এনির খেয়ালে আসতেই অধৈর্য হয়ে ছটফটিয়ে উঠে,

” যাবেন না মাসি! প্লিজ যাবেন না।
চিত্রা কিছুক্ষনের জন্য দাঁড়ায়। তবে পিছু ফিরে না আর। চোখ পানি নিয়ে নিকের ভয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
চিত্রা চলে যেতেই নিক শব্দ করে দরজাটা লাগিয়ে দেয়। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এখন ও এনির মুখের দিকে। এনি ভয়ে কুঁকরে যায়। নিক নিচের ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। রাগ কমানোর জন্য অযথা প্রয়াস চালাচ্ছে। নিককে চুপ থাকতে দেখে এনি মাথা তুলে তাকায়। নিক এনির দিকেই তাকিয়ে ছিলো। নিকের লাল হয়ে যাওয়া হিংস্র চোখ জোড়া এনির চোখ এড়ায় না। সকল নিরবতা ভেঙ্গে নিকের গভীর গর্জন বেরিয়ে আসে,
‘” আমার কামনা- বাসনা নিয়ে ঠিক কতটুকু ধারনা আছে তোমার ?
এনি থম মেরে বসে থাকে। কোনো সারা – শব্দ নেই। শুধু ঘন ঘন নিশ্বাসের শব্দ শুনা যাচ্ছে।
নিক নিরবতার মধ্যে দাঁত কটমট করতে থাকে। এনির দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে আছে যেন কোনো শিকার। নিক আচমকা ছোট ধারালো একটা ছুঁরি বের করে প্যান্টের পকেট থেকে। এরপর খুব রুক্ষ ভাবে এনির ঠোঁটের উপর চেপে ধরে। এনি ভয়ে শিউরে উঠে। আতঙ্ক চোখে নিকের দিকে তাকায়। কিন্ত নিক এনির চোখের দিকে ভুলে ও তাকায়। এনি একটা জিনিস খুব ভালোভাবে খেয়াল করেছে, নিক কখনো তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে না। এনির ভাবনার মধ্যেই নিকের শান্ত গম্ভীর হুমকি ভেসে আসে,

‘” আমার ভিতরে মেয়ে নিয়ে ঠিক কতটা কামনা আছে তার হিসেব দিবে। আর যদি দিতে না পারো তাহলে…
নিক বাকা হেসে ছুঁরিটা আরও ভালোভাবে চেপে ধরে। নিকের অসমাপ্ত কথার রেশ ধরে এনি পুনরায় প্রশ্ন করে,
” কি করবেন?
নিক নিচের ঠোঁট কামরে সামান্য হেসে বলে,
‘ এই ঠোঁট আর ঠোঁট থাকবে না। ছুঁরির আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে যাবে এক্ষনি। রক্তে রাঙ্গা হবে তোমার ওষ্ঠ। দ্রুত হিসেব দাও।
নিকের অত্যন্ত ঠান্ডা হুমকিতে এনির ছোটখাটো কোমল দেহটা পুনরায় কেঁপে উঠলো। এখনও শক্তভাবে তার উপরের ঠোঁটে ছুঁরি চেপে ধরে আছে। ফলে এনি ব্যাথা অনুভব করছে, কষ্ট ও হচ্ছে প্রচুর। সামান্য ভাঙ্গা গলায় বলে,
” আমি কিভাবে হিসেব দিব?
— কিন্তু তোমাকে তো দিতেই হবে বেবিগার্ল।
— আমার কাছে আপনার সম্পর্ক ধারনা নেই নিক জেভরান। যেখানে আপনাকেই চিনি না তখন আপনার কামনার হিসেব কিভাবে করব?

আচমকা নিক এনির কাঁধ শক্তভাবে চেপে ধরে। নিকের শক্ত হাতের চাপে এনি ব্যাথায় শিৎকার করে উঠে। নিক এনির ঠোঁটের উপর থেকে ছুঁরিটা অত্যন্ত ক্ষোভে সরিয়ে ফেলে। ধাঁরালো ছুঁরির সামান্য আচর এনির ঠোঁটের উপর লেগে যায়। সাথে সাথে তরল রক্ত গড়িয়ে পড়তে থাকে গোলাপি ঠোঁটগুলো থেকে। এনি ব্যাথা অনুভব করছে, বুঝতে পারছে তার ঠোঁটে ছুঁরির আঘাত লেগেছে। আর সে জায়গা থেকে রক্ত ও গড়িয়ে পড়ছে। সামান্য জ্বালা করে উঠে। এনির নিচের ঠোঁটের ভেতরের মাংশ শক্ত করে কামড়ে ধরে ব্যাথা সহ্য করতে থাকে। এনির হাত দুটি নিকের কবলে।
নিক এনির রক্তাক্ত ঠোঁটের দিকে এক পলক তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড়িয়ে উঠে,
” যখন আমার সম্পর্কে জানো না তখন সামান্য রক্ষিতা হয়ে নিক জেভরানের চরিত্রের উপর প্রশ্ন তুলো কোন সাহসে?
নিকের ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলা অপমান মিশ্রিত কথাটা এনির হৃদয়ে তুলপাড় করে উঠে। রক্ষিতা শব্দটা তার কাছে সব চেয়ে ঘৃনিত। কিন্তু আজ সে বার বার সেই কথার ওই সম্মুখীন হচ্ছে। এনি নিজেকে আটকাতে পারে নি। সব ভয়কে ভুলে গিয়ে নিকের দিকে ক্ষিপ্ত চোখে তাকিয়ে বলে,

” সামান্য রক্ষিতাকে বিয়ে কেনো করেছেন? আপনার ব্যক্তিত্যে আঘাত করলো না তাকে বিয়ে করাতে।
নিক এনির হাত মুচড়ে ধরে। এনি মাথা নিচু করে চোখ- মুখ খিচে ফেলে। নিক এনির চিবুক ধরে বলে,
” বেশি কথা বলে ফেলছো না? গলা উচিয়ে কথা বললে জবান বন্ধ করে দিব। নো ওয়ান শুড এভার ফল ভিকটিম টু মাই র‌্যাথ ইট উইল ব্রিং টোটাল ডিস্ট্রাকশন। মাথায় রাখবে বেবিগার্ল।
— প্রশ্নের উত্তরটা দিয়ে দিন । বিয়ে কেনো করেছেন? বিয়ে না করলেও তো আপনি দিব্যি চলতে পারতেন।
— মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে গলা টিপে শ্বাস রোধ করে মেরে ফেলি। আবার মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় করুনা করে বাঁচিয়ে রাখি। আমার সম্মুখে দাঁড়িয়ে কেউ সামান্য আওয়াজে কথা বলতে পারে না। নিজের রক্ষিতকেই বিয়ে করেছি। অন্য জনের জিনিস হলে ফিরে ও তাকাতাম না।
নিক এনির হাত ছেড়ে দেয়। নিকের শক্ত স্পর্শে আঙ্গুলের দাগ বসে গিয়েছে। এনি নিজের হাতে সামান্য স্পর্শ করে চোখের পানি ফেলে দেয়। নিক ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে প্রবেশ করতে যাবে এমন সময় এনির প্রশ্নে আবার ও থেমে যায়।

— আমার অশালীন ভিডিও গুলো ডিলিট করে দিবেন প্লিজ!
নিক সামান্য ভ্রু কুচকে এনির দিকে তাকায়। এনির কাতর চোখ গুলোর দিকে তাকিয়ে তরিৎ গতিতে সরিয়ে নেয়। এই মুখটার দিকে সে তাকাতে পারে না। জানা নেই তার কি হয়ে যায়। এনির কথাটা বুঝতে তার কিছুক্ষন সময় লাগে। পর মুহূর্তে যখন বুঝতে পারে তখন বাঁকা হেসে বিনা শব্দে ওয়াশরুমে ডুকে পড়ে।
এনি ক্রোধে ফেটে পড়ে। ইচ্ছে করছে একটা তলোয়ার দিয়ে রাক্ষসটাকে ক্ষত – বিক্ষত করে দিতে। জীবনে নরখাদক দেখে নি কিন্তু মানুষরুপী নিক জেভরানকে নরখাদক হিসেবে দেখেছে। এনি বিরবির করে উঠে,
” কখনো যদি সুযোগ হয় তাহলে আমার হাতে আপনি খুন হবেন গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান! আপনাকে খুন করে হলেও আপনার রাজ্য থেকে পালাব। বাঁচলে গর্বের সাথে মাথা উচু করে বাঁচব। এমন মাথা নিচু করে অসম্মানের সাথে বাঁচার কোনো অধিকার নেই। রক্ষিতার দায়িত্ব পালন না করলেও রক্ষিতা কলঙ্ক নিয়ে বাঁচতে পারব না। প্রয়োজন আপনাকে খুন করব নাহলে নিজে খুন হব। শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা।

এনির ভাবনার মধ্যেই নিক ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। এনি তাকায় না। অন্য পাশে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। আচমকা চোখটা না চাইতেও নিকের দিকে চলে যায়। স্তব্দ হয়ে যায় কিছুক্ষনের মত। সামনের মানুষটা কে? দিন দুনিয়া, পরিস্থিতি, সময় সব ভুলে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নিকের উন্মুক্ত শরীরের দিকে। চোখে আটকে যায় বুকের অসংখ্য ক্ষত চিহ্নগুলোর দিকে। দবদবে ফর্সা শরীরে ক্ষতগুলো বড্ড বেমানান লাগছে। পিঠে সাপের পেচিয়ে রাখা ট্যাটু দেখে ঝাপসা হয়ে আসে। লোকের রুচির দুর্ভিক্ষ হলেই এইসব ট্যাটু করে। ডান হাতে দুইটা পাখির ট্যাটু দেখে মুচকি হাসে।

এনি অজান্তেই অপলক ভাবে তাকিয়ে আছে তখনো নিকের ভেজা শরীর ভিজে চকচক করছে। জিমে গড়া বাহুর শক্ত মাংসপেশি যেন খোদাই করা ভাস্কর্যের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠল। প্রতিটি শিরা তার পুরুষোচিত দৃঢ়তাকে ঘোষণা দিচ্ছে। কপাল বেয়ে, ভেজা চুলের ফাঁক গলে ফোঁটা ফোঁটা জল গড়িয়ে নামছিল গালের রেখা বেয়ে। প্রশস্ত বুক আর গলার নিচের আঁকাবাঁকা ড্রাগনের ট্যাটুতে ভেজা পানির ঝিলিক জড়িয়ে, তাকে করে তুলেছে আরও ভয়ঙ্কর অথচ অদম্য আকর্ষণীয়। পিঠজুড়ে সাপের আঁকাবাঁকা ছায়াচিত্র নায়িকার নিঃশ্বাসকে থমকে দিয়েছে। আর ডান হাতে খোদাই করা উড্ডীয়মান দুই পাখি ও ইতালীয় অক্ষরের রহস্যময় দাগ তাকে এক অনন্য মহিমায় মোড়িয়ে আছে । নিকের ডান ভ্রুঁর উপরে একটা কাটা দাগ, ঠোঁটের নিচে একটা কুচকুচে কালো তিল। ঘাড় ছুঁই ছুঁই চুলগুলো কপালে কিছুটা ল্যাপ্টে আছে। সব মিলিয়ে, ভেজা শরীরে এই মুহূর্তে নিক এক সাথে শক্তি, সৌন্দর্য আর বিপদের প্রতিমূর্তি হয়ে এনির দৃষ্টি পুরোপুরি বন্দি করে রাখে। এনি ধীরে ধীরে নিকের সৌন্দর্য অনুভব করতে থাকে। এত সুন্দর কোনো পুরুষ হতে পারে? এনি গভীরভাবে নিক কে পর্যক্ষন করছে। হঠাৎ তার চোখ আটকে যায় টাওয়েলের দিকে।যেটা কিছুটা নাভি বরাবর রাখা হয়েছে। এনি চোখ বড় বড় করে চট করে চোখ সরিয়ে নেয়। বড় বড় শ্বাস টেনে চোখ – মুখ খিঁচে ফেলে। বিরক্তি আর রাগ নিয়ে নিজেকে নিজে ধিক্কার জানায়।

– তর রুচির এতটা অধঃপতন এনি? সামান্য বাহ্যিক রুপ দেখে এইভাবে নির্লজ্জের মত তাকিয়ে ছিলি। লোকটা বাহ্যিকভাবে যতটা চকচকে ভিতরে তার থেকেও বেশি কুৎসিত আর অন্ধকার। নির্লজ্জ পুরুষ , একটা মেয়ের সামনে সামান্য টাওয়েল পেচিয়ে চলে এসেছে। ইজ্জত – হায়া বলতে কিছু নেই।
এনি মনে মনে বকবক করে চোখ বন্ধ করে রাখে।হাতে আর ঠোঁটে এখন ও জ্বালা করছে। তবুও কষ্ট করে সহ্য করে নেয়। কাপুরুষটা বেরিয়ে গেলেই মেডেসিন লাগিয়ে নিবে। এনি প্রায় বিশ মিনিট পর নিজের চোখ খুলে। এনি ভেবেছে হয়ত নিক চলে গিয়েছে। শুক্রিয়ার নিশ্বাস ছেড়ে বিছানা থেকে নামতে যাবে এমন সময় আবার ও বিরক্তিতে থমকে যায়। নিক বেলকনি থেকে আসছে। এখন ও টাওয়েল পেচিয়ে রাখা শরীরে। হয়ত এতক্ষন কারোর সাথে ফোনে কথা বলেছে। এনি এইবার আর সহ্য করতে না পেরে নিকের উদ্দেশ্যে বলে,

” সামান্য টাওয়েল পড়ে বেহায়াদের মত ঘুর – ঘুর করছেন কেনো? নাকি পুশুত্বের সাথে সাথে লজ্জাটাকেও বিসর্জন দিয়েছেন?
নিক ভ্রুঁ নাচিয়ে তাকায় এনির দিকে। নিকের গম্ভীর তীক্ষ্ম চাহনির দিকে না তাকিয়েই এনি পুনরায় বলে,
” এইভাবে একটা মেয়ের সামনে অর্ধনগ্ন হয়ে আসতে লজ্জা লাগছে না। বাকিটা কেনো রেখেছেন, সেটা ও খুলে ফেলুন।
— ফরজ শাওয়ার নেওয়ার এত উতলা হয়ে উঠলে বেবিগার্ল।
এনি কথা বলে আবার নিজেই ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। যদি সাইকোটা রেগে গিয়ে তাকে আবার চেপে ধরে আঘাত করে? কিন্তু এনির ভাবনাটাকে ভুল প্রমান করে নিকের এমন কথায় গায়ে কাটা দিয়ে উঠে। নির্লজ্জ বুঝাতে এইটা বলেছিলো কিন্তু উত্তর এমন আসবে আশা করে নি।
— অমানুষ তো বটে তবে নির্লজ্জ ও।
নিক গম্ভীর হয়ে বলে,

” তোমার লজ্জা করে নি কিছুক্ষন আগে আমার দিকে এইভাবে তাকিয়ে থাকতে?.
এনি চমকে উঠে। সে তাকিয়ে ছিলো বুঝলো কিভাবে?
— মিথ্যে কেনো সাজাচ্ছেন? কি প্রমান আছে আমি তাকিয়ে ছিলাম?
নিক ঠোঁট চেপে মুখের গম্ভীরতা আগের ন্যায় নিয়ে এসে বলে,
” পুরো সম্রাজ্য আমি চালায়। আমার চোখ ফাকি দিয়ে কাজ করাটা তো বোকামি বেবিগার্ল।
এনি নিজেকে সামলে নেয়।
” হুম দেখছিলাম। তবে এইটাও ভাবছিলাম আল্লাহর লীলাখেলা ঠিক কতটা সুন্দর। আবার ঠিক কতটা ভয়ানকও। এই আপনাকে দেখলে মনেই হবে না আপনি ঠিক কতটা খারাপ। অথচ উপর দিয়ে চকচক করছেন। এইটা ভেবেই ভেতরটা দেখার খুব ইচ্ছে জাগছে।
— অন্ধকার তো আমি নিজেই সৃষ্টি করেছি। নিজেই লালন- পালন করে বড় করেছি। সেখানে তোমার বর্ননা চাই নি।
এনি চোখ মুখ কুচকে বলে,
” ক্ষমতা থাকলে আপনার ভেতরটা পরিষ্কারনাশক পাউডার দিয়ে খচে – ধুয়ে দেখতাম ঠিক কতটা ময়লা বের হয়। যদি সেই ময়লার ভার বহন করার সামর্থ্য না থাকে তাহলে নর্দমায় ফেলে দিয়ে আসতাম।।এতে অন্তত আমি তো মুক্তি পেতাম।
নিকের চোখ মুখ রক্তবর্ন ধারন করতে থাকে। এতক্ষনে ঠান্ডা হয়ে থাকা নিক কিছুক্ষনের মধ্যেই আগের রুপে ফিরতে থাকে। নিকের রাগান্বিত চোখ আর শক্ত চোয়াল দেখে এনি চুপ হয়ে যায়। তন্ডবের সম্মুখীন হওয়ার ক্ষমতা তার নেই। এমনিতেই তার শরীর অর্ধেক যখম হয়ে আছে।

আরিশ একটা গুরুত্বপূর্ন কাজে ব্যস্ত ছিলো। নিকের ইমার্জেন্সি ফোন পেয়ে মুহূর্তের মধ্যেই শাওয়ার নেওয়ার জন্য রুমে ডুকে পড়ে। রেডি হয়ে কিছুক্ষনের মধ্যেই রুম থেকে বেরিয়ে আসে। মেইন করিডর পেরিয়ে পার্কিং এড়িয়াতে আসতেই তার এসিস্টেন্ট এড্রিয়ান এসে বলে,
” বস একটা মেয়ে বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে আপনার সাথে দেখা করার জন্য।
আরিশ সামান্য কপাল কুচকে ফেলে। কপালের ভাঁজ অনেকটা প্রখঢ় হয়ে উঠে।অনেক মেয়ে তাকে পছন্দ করে সেটা তার অজানা নয়। কিন্তু কোনোদিন তার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস কারোর নেই। এত বড় স্পর্ধা কেউ কোনোদিন ও দেখাবে না। কিন্তু হঠাৎ কোনো মেয়ে আসার কারন? আরিশ বিরক্ত হয় প্রচুর। গাড়িতে উঠতে উঠতে বলে,
” এড!
আরিশের রুক্ষ্ণ মেজাজে এড্রিয়ান প্রচন্ড ভয় পেয়ে যায়। সামান্যা কাঁপা গলায় বলে,

” জ.. জি বস।
— মেয়েটাকে চলে যেতে বল। এইসব বালের সংবাদ এসে আমাকে দেওয়ার সাহস কিভাবে হয়?
— সরি বস।
— নেক্স টাইম যাতে এমন না হয়।
— জি বস। এখন ও দিতাম না। বাট মেয়েটা দুইদিন বিষন্ন মুখে আপনার জন্য অপেক্ষা করে গিয়েছে। আপনি না আসাতে দেখা করতে পারে নি। আমাকে অনুরোধ করছিলো তাই এসে জানিয়েছি।
আরিশ পাত্তা দিলো না কোনো কথাকে। স্বভাবসুলভ গম্ভীরতা টেনে ভালোভাবে বসে পড়ে। এড্রিওন ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্ট্রাট দিয়ে দেয়। বাহির সম্মুখে আসতেই এড্রিওনের চোখ যায় মেয়েটার দিকে। বুকে হাত গুজে দাঁড়িয়ে আছে। আরিশ গাড়ির সামনে কোনো মেয়েকে দেখে বিরক্তিতে চোয়াল শক্ত করে ফেলে। এইভাবে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকাটা আরিশের মোটেও পছন্দ হলো না। রাগে গর্জন করে বলে,
” পিষে ফেল গাড়ির নিচে।
এড্রিওন শুকনো ঢোক গিলে বলে,

” স.. স্যার এই মেয়েটাই অপেক্ষা করছিলো আপনার জন্য।
আরিশ সানগ্লাসের আড়ালে মেয়েটার মুখ দেখলো কিছুক্ষনের জন্য। পুরো মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই সাথে সাথে চোখ থেকে চশমা খুলে ফেলে। সামান্য ভ্রুঁ কুচকে তাকিয়ে স্ক্যান করে। মেয়েটাকে তার খুব পরিচিত লাগছে। ধীরে ধীরে এনির কথা মনে পড়তে থাকে। এনির বড় বোন! এনির সব বায়োডাটা সংগ্রহ করতে গিয়ে নাজলীর ছবি দেখেছে আরিশ। তাই তাকে চিনতে মোটেও ভুল হয় নি। আরিশ গম্ভীর শ্বাস টেনে গাড়ি থেকে নামে। এড অবিশ্বাস নজরে আরিশের দিকে তাকায়। আরিশ ব্লেজার ঠিক করে গম্ভীর পেয়ে নাজলীর দিকে এগিয়ে যায়। নাজলী কোনো পুরুষকে নিজের কাছে আসতে দেখে ধারনা করে নেয় এইটাই তাহলে সেই ব্যক্তি। নাজলীর অধরে হাসি ফুটে উঠে। আরিশ দুরত্ব বজায় রেখে নাজলীর সম্মুখে দাঁড়ায়।
নাজলী আরিশের দিকে তাকিয়ে বলে,

” মুসলমান হলে সালাম গ্রহন করবেন। অবশ্য সালাম সব ধর্মেই দেওয়া যায়। আপনি তাহলে গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানের বন্ধু ক্রিমিনাল গ্যাং এর লিডার আরিশ?
আরিশ ঠেঁট বাকিয়ে বলে,
” তাই তো মনে হচ্ছে মিস. নাজলী।
নিজের নাম আরিশের মুখে শুনে নাজলী বেশ চমকায়। অবাক হয়ে বলে,
” আমার নাম কিভাবে জানলেন? আমি তো পরিচয় দেয় নি।
আরিশ বাঁকা হেসে বলে,
” ঘরের কোণায় বসে থেকে লিডার হয়ে যায় নি। নিশ্চয় কিছু গুন ছিলো তাই হয়েছি। সেই গুন থেকেই আপনাকে চিনা।
নাজলী ছোট ছোট চোখ করে তাকায় আরিশের দিকে। নাজলী তপ্ত শ্বাস ছাড়ে। এদের সাথে কথা বলে সে কোনোদিন পারবে না এইটা তার অজানা নয়।

— আপনার কাছে প্রয়োজনে এসেছি মি. আরিশ।
— প্রয়োজনটাও মেবি আমার জানা।
— জানাটাই স্বাভাবিক। আমার জীবনের সবচেয়ে অমূল্য রতন তো আপনাদের কাছে।
নাজলীর চোখে পানি ভীর করতে থাকে। কিন্তু নিজেকে শক্ত করে ঠোঁট কামড়ে রাখে । এখন কান্না করে দুর্বল সাজার সময় নয়। আরিশ অন্যদিকে তাকিয়ে হেসে বলে,
” অমুল্য রতন কে ভুলে যেতে শিখুন মিস, নাজলী। কারন তার দেখা আর কোনোদিন পাবেন না।
– সে বেঁচে আছে তো? আমার বোনটা ঠিক আছে তো?
কি সেই করুন কন্ঠ! কি সেই মায়াভরা স্বর। যে কেউ গলে যেতে বাধ্য। আরিশের বুকটাও ধক করে উঠে। বন্ধুত্ব সব কিছুর জন্য নিজের অনুভুতিটাকে বিসর্জন দিয়েছে। মাথায় শুধু এখন একটা কথায় ঘুরপাক খাচ্ছে এনি এখন একা নয় যে সে অনুভুতির সাগরে ভাসবে। সে এখন নিক জেভরানের বিবাহিতা স্ত্রী। জানা নেই নিক কেনো বিয়ে করেছে। তবুও স্ত্রী! স্ত্রীর অধিকার না দিক, ভালোবাসা না দিক তবুও ইসলামী শরীয়তে তার স্ত্রী। আর নিজের ভাইয়ের বউয়ের দিকে নজর দেওয়ার মত খারাপ আরিশ নয়। সরিয়ে নিচ্ছে নিজেকে এনির অনুভুতি থেকে। রাতে নিরবে যখন এনির মায়াবী চাহনী গুলো চোখে ভেসে উঠে তখন একটা জিনিস ওই মস্তিষ্কে উচ্চারিত হয় এনি নিকের স্ত্রী।
নাজলী অশ্রু ভেজা চোখে তাকিয়ে আছে আরিশের দিকে।
আরিশ নিজেকে ঠিক করে আগের ভঙ্গিমায় বলে,

” মেরে ফেলার কথা ছিলো মিস নাজলী?
— রক্ষিতা হয়ে বাঁচা যায় মি, আরিশ?
— না বাঁচার কি আছে?
নাজলী বিরক্ত হলো প্রচুর। এরা দেখতেই সুন্দর কিন্তু ভেতরে একদম অন্ধকার। নাজলীর রাগ হলেও নিয়ন্ত্রনে এনে বলে,
” কেনো কিনেছে নিক জেভরান আমার বোনকে?
ওর বয়স মাত্র সতেরো। এখন ও আঠারো স্পর্শ করে নি। তার আগেই হতে হলো এক শক্ত- পোক্ত ব্যক্তির দৈনন্দিন ভোগ- বস্তু। আমার বোন বেঁচে আছে সেই আশা আমি কিভাবে করি মি. আরিশ? নিক জেভরানকে শুধু আপনি নয় আমরা পুরো জাতি চিনি। উনার মত ভয়ংকর ব্যক্তির স্পর্শ পেয়ে ও আমার বোনটা এখন ও বেঁচে আছে ভাবতে বলছেন।

আরিশ কপাল কুচকে তাকায় নাজলীর দিকে। অনেক কিছুই ভেবে ফেলেছে তাহলে। অথচ কিছুই হয় নি। আরিশ নিজেও জানে না নিক কেনো এনির দিকে নিজের অধিকার ফলায় না। তবে বাজেভাবে টর্চার করে তার অজানা নয়। আর করাটাই স্বাভাবিক। এইটা তো আর অন্য কেউ নয় যে ভালোবেসে খাবার খাইয়ে দিবে। এইটা হলো নিক জেভরান যার কোনো হার্ট নেই। আরিশ গম্ভীর নিশ্বাস ফেলে বলে,
” এই কারনেই কি আমার সাথে কথা বলতে চাইছিলেন?
— না। আমি আমার বোনকে ফিরত চাইতে এসেছি।
— বিলাসিতা ছাড়া কিছুই নয়। কখনো আর দেখা করতে পারবেন কি না সন্দেহ আর নিয়ে যাওয়া তো অনেকটা পথ বাকি।
— বোন হয় ও আমার। কিভাবে বাঁচব ওকে ছাড়া। হয়ে যাক সে অপবিত্র। হাজারটা কলঙ্কের ছাপ লাগুক। কিন্তু সর্বশেষে ও আমার বোন। আমি আবার নিজের ভালোবাসা দিয়ে পুষ্পিত করে ফেলব। এই কয়দিনে তো নিক জেভরান অনেক বাসনা মিটিয়েছে । এখন অন্তত মুক্তি দিয়ে দিক। মেয়েটা নাহলে মরে যাবে।
আরিশ বাঁকা হেসে বলে,

” মিস নাজলী কথাগুলো আমার সামনে বলছেন বাট নিকের সামনে ভুলেও বলবেন না। সাথে সাথে নিজের জবান হারাতে পারেন।
— হলেই ক্ষতি কি। যেখানে নিজের কলিজাকে হারিয়েছি সেখানে জবান হারালে কি এমন ক্ষতি হবে।
— খুব ভালোবাসেন নিজের বোনকে?
— সেটার গভীরতা বুঝার ক্ষমতা আপনাদের নেই। তবে জানিয়ে দিয়ে যাচ্ছি অতি দ্রুত আমি আমার বোনকে এখান থেকে নিয়ে যাব।
— নিজের প্রান হারাতে না চাইলে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা ও করবেন না।

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১১

— মৃত্যু আল্লাহ লিখে। সেখানে আপনারা নির্ধারন করার কে? মরন যদি থাকে তাহলে কবুল। তবুও আমি আমার বোনকে এখান থেকে নিয়ে যাব।
নাজলী আর দাঁড়ায় না। চোখের পানি মুছে বেরিয়ে যায় আরিশের এখান থেকে। আরিশ গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে আছে সেদিকে। মেয়েটা এনির মত সরল নয়। সামান্য তেজস্বী একটা ভাব আছে। আরিশ সামান্য ঠোঁট চেপে ধরে গাড়িতে গিয়ে বসে পড়ে যায়। অজানা এক কারনে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে যায়। সামনে কি আসতে চলেছে?

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৩