Home লাভ বাই দ্যা ভিলেন লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৫

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৫

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৫
লিজা মনি

রাতের নিস্তব্ধতা সমগ্র পরিবেশকে আঁচড়ানো চাঁদের শীতল আলোয় ঢেকে রেখেছে। সমুদ্রের অনন্ত নীলতায় রাতের ছায়া জটিল জাল বোনার মতো ছড়িয়ে পড়েছে। আর প্রতিটি ঢেউ যেন গোপন কাহিনী ফিসফিস করে বাতাসের কোলজুড়ে ফেলে দিচ্ছে। উচু পাথরের ধার ধরে দাঁড়িয়ে আছে দুই যুবক। তাদের ছায়া সমুদ্রের অন্ধকার নীলের সঙ্গে মিলেমিশে এক অব্যক্ত রহস্যের রেখা এঁকেছে।
নীরবতা এত গভীর যে প্রতিটি শ্বাসের শব্দও বাতাসের সাথে মিলেমিশে এক অলৌকিক সঙ্গীতের নোটে রূপান্তরিত হচ্ছে। পাথরের খসখসে শীতল স্পর্শ যুবকদের ত্বকের সাথে মিলিত হয়ে মনকে ঝড়ের মতো শিহরণ জাগাচ্ছে। চাঁদের আলোর ধূলিকণা সমুদ্রের তরঙ্গের সঙ্গে খেলা করছে।

যুবক দুইজনের চোখ সমুদ্রের গভীর অন্ধকারে স্থির। যেখানে প্রতিটি ঢেউ অজানা বিপদের ইঙ্গিত বহন করছে। তবু সেই ভয় তাদের মনকে স্থির করতে পারে না। বাতাসে লবণাক্তি মিশে আছে। যা প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে তাদের রক্তে অদৃশ্য কম্পন জাগাচ্ছে। একজন যুবক তার ধূসর বাদামী চোখ দিয়ে সমুদ্রের ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসে। আরেকজনের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। গভীর নিস্তব্ধতায় দাঁড়িয়ে নাবিদের কণ্ঠ আচমকা গর্জে উঠে। শীতল রাতের নীরবতাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে বলে,
“আমাকে আমার ফুল ফিরিয়ে দাও, নিক। খোদার কসম, তোমার শত কোটি টাকা অবিকল ফেরত পাবে।
নিক ঠোঁট বাঁকিয়ে, গলা থেকে কর্কশ শব্দ বের করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে যেন ছায়ার মতো অদৃশ্য বিষাক্ত বিদ্রুপ ছড়িয়ে পড়ল।

“এতদিন তাকে খাইয়েছি, পড়িয়েছি, শত্রুদের হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছি। এখন আবার আমার কেনা দামে আমার কাছেই চাইছো? ভেরি ব্যাড, নাবিদ।
রক্তিম ক্রোধে নাবিদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে। বুকের ভেতর উত্তপ্ত দমকা হাওয়ার মতো জমে থাকা ক্ষোভ কণ্ঠে নিয়ে বলে,
“আমি ক্রয় করতে আসিনি, নিক জেভরান। এসেছি আমার ফুলকে ফিরিয়ে নিতে, তাকে তার সম্মান ও মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে। তুমি পুরো জাতির সামনে তাকে রক্ষিতা বানিয়ে রেখেছো। সে ছিলো পবিত্র ফুল। অথচ তুমি তাকে কলঙ্কিত করে দিলে।
নিকের কপাল কুচকে উঠল। মুহূর্তেই মুখের গম্ভীরতা রহস্যময় ব্যঙ্গের হাসিতে রূপান্তরিত করে বলে,
” কবুল বলে স্পর্শ করলে অপবিত্র হয়ে যায়? কোথা থেকে উদ্ধার করেছো এই অদ্ভুত বানী?
নাবিদ চোখ তুলে তাকাতেই নিজের সমগ্র দেহ যেন জমে গেল, রক্ত হিম হয়ে আসে। গলা কাঁপতে কাঁপতে সে বিড়বিড় করে বলে,

“ক… কবুল? কিসের কবুল?
নিক ঠান্ডা তাচ্ছিল্যে নাক ছিটকে বলে,
“উত্তর দিতে বাধ্য নই, নাবিদ। তবে মনে রেখো, তাকে ছোঁয়ার পূর্ণ অধিকার আমার। আর আমি ছাড়া অন্য কেউ যদি মেয়েটিকে রক্ষিতা বলে, তবে সেই জবান টেনে এনে রক্তে ভাসাবো।”
নাবিদ নিস্তব্ধ কণ্ঠে প্রতিউত্তর দিয়ে বলে,
“সবাই তো বলছে। ক’জনের জবান টানবে তুমি?”
নিকের দৃষ্টি তখন ঈগলের মতো তীক্ষ্ণ, ঠোঁটে নিস্তরঙ্গ হেসে বলে,
— রক্ষিতা বলবে যতজন।
নাবিদ আহত সুরে বলে,
” সত্যি কি তুমি এনিকে বিয়ে করেছো?
নিক ঠান্ডা গলায় গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে বলে,
“কবুল বললেই কি বিয়ে হয়ে যায়? যদি হয়ে থাকে, মেবি করেছি। তোমার কী মনে হয়?
সেই মুহূর্তে নাবিদের অন্তর্জগৎ দুলে উঠে। চোখ ভরে উঠল অশ্রুজলে।অথচ কান্না গোপন করতে চাইল। ফেটে পড়া কণ্ঠে নিঃশ্বাসের সঙ্গে ভাঙা শব্দ বেরিয়ে আসে,

“আমার ভালোবাসাকে এইভাবে ছিনিয়ে নিলে কেন? আমি কী অপরাধ করেছিলাম?
নিক তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ফিসফিস করে বলে,
“শান্তি খুঁজে পাই।
নাবিদের চোখ রক্তিম হয়ে উঠে। হঠাৎ বজ্রগর্জনের মতো চিৎকার করে বলে,
“এনিকে তুমি কী করেছো, নিক?
নিক নিষ্ঠুর ঠান্ডা হাসিতে উত্তর দেয়,
” বাসর হয়েছে, ছোঁয়া-ছুঁয়ি হয়েছে, আরও গভীর আলিঙ্গনও হয়েছে। কিন্তু সেসব তোমাকে বলার প্রয়োজন নেই। আর পরের বার যদি ‘আমার পাখি’ শব্দটা তোমার মুখে শুনি, তবে গলায় ছুরি চালিয়ে শ্বাসনালী টেনে বের করে আনব। আসলেই ‘আমার পাখি’ শব্দটা এখন সহ্য হয় না। অথচ আশ্চর্য, আঘাত করতে গেলেই হাত থেমে যায়।
সমুদ্রের ঢেউ তটভূমি ভাঙতে ভাঙতে গর্জন করছিল। সেই গর্জন যেন নাবিদের অন্তরের আর্তনাদ। তার কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে। যে ফুলকে শৈশব থেকে পাওয়ার স্বপ্ন দেখেছে।সে আজ অন্যের দখলে। তবু নিজের দুর্দশার মধ্যেও সে একটা কথায় ভাবছে ,, এনি নিককে ঘৃণা করে, তাকে নয়। সম্মানের চোখে দেখে। তাই সামান্য বিয়ে ভেঙে যাওয়া দিয়ে থেমে থাকা যাবে না। নিজেকে শক্ত করে নিয়ে, ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি টেনে নিল নাবিদ,
“যেদিন তুমি এনিকে রক্ষিতা বানালে, ভেবেছিলাম তোমার অপবিত্র ছোঁয়ায় আমার ফুলটি কলঙ্কিনী হয়ে গেছে। অথচ সেই কলঙ্কিনীকেই গ্রহণ করার জন্য আমি ইরান থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত ছুটে এসেছি। এখন তো সে হালাল ছোঁয়া পেয়েছে। কবুল বললেই স্ত্রী হয়ে যায় না, নিক? ভালোবাসা আর সম্মানের প্রয়োজন হয়। দুইজমের মনের মিল দরকার।
নিক শীতল দৃষ্টিতে বলে,

” কে বললো স্ত্রী? আমি তো তাকে স্ত্রী হিসেবে স্বীকার করিনি। We are just married, but I haven’t accepted her as my wife.
নিকের বাক্যে নাবিদ রাগে ফুঁসে উঠে। দাঁত কিড়মিড়িয়ে ক্রুদ্ধ স্বরে গর্জে বলে,
” তুমি একেবারে সাইকো! যখন স্ত্রী মানো না, তখন বিয়ে করলে কেন?”
নিক ঈগলের মতো চোখ সরু করে ঠান্ডা গলায় বলে,
” আবারও প্রশ্ন? আচ্ছা নাবিদ, যদি তোমাকে মেরে এই সমুদ্রে ভাসিয়ে দিই, কেউ কি তা দেখবে? অথবা কেউ কি কাঁদবে তোমার জন্য?”
নাবিদ বিস্মিত ক্রোধে বলে,
“মৃত্যুর হুমকি দিচ্ছো আমাকে?
নিকের ঠোঁট বাঁকা হয়ে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠে।
” সীমা অতিক্রম করলে হুমকি বাস্তব হয়ে যাবে। অকারণে হাত রক্তাক্ত করতে চাই না।
তারপর সে বিশাল পদক্ষেপে গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। পেছনে ভাঙাচোরা নীরবতা আর সমুদ্রের উন্মত্ত গর্জন রেখে। আর নাবিদ তাকিয়ে আছে নিকের যাওয়ার দিকে।চোখে ক্রোধ, মনে অগ্নি, তবুও হৃদয়ের গভীরে এনির জন্য এক অদম্য ভালোবাসা।
নিক বড় বড় পা ফেলে নিজের গাড়ির কাছে যায়। নাবিদ সেদিকে তাকিয়ে বিশ্বাস নিয়ে বলে,

” একটা কথা মনে রেখো নিক জেভরান, এনি আমাকে অসম্ভব ভালোবাসে আর আমি এনিকে। আল্লাহ যদি সহায় থাকে তাহলে হাজার পুরুষের মধ্য থেকেও আমি তাকে ফিরিয়ে আনব। এরপর আমার স্পর্শে তাকে আবার ও গড়ে তুলব। পরবর্তী খেলার অপেক্ষায় থেকো নিক জেভরান। যাকে আটকে রাখার জন্য তুমি লড়বে সেই ব্যক্তিটা আমাকে অসম্ভব ভালোবাসে।
নাবিদের কথায় নিক চোখ বন্ধ করে ফেলে। দাঁত কটমট করতে থাকে। গাড়ি সিটে আঘাত করে বড় বড় শ্বাস টানে। একটা কথায় ঘুরপাক খাচ্ছে মস্তিষ্কে,
” এনি আমাকে অসম্ভব ভালোবাসে”

রাত প্রায় বারোটার কাছা- কাছি। আফ্রিকার এক জমকালো বারে একের পর এক হুইস্কির বোতল শেষ করে যাচ্ছে নাবিদ। পাশে হাজার ও নগ্ন মেয়ের আনাগোনা। কিন্তু তার দৃষ্টি সেদিকে নেই। সে তো একটা মেয়েকেই চেয়েছিলো, কিন্তু তাকেও অন্য জন নিয়ে নিলো। কিন্তু এইটাকে তো নেওয়া বলে না। এক প্রকার ছিনিয়ে জোর করে রেখে দিয়েছে। নাবিদ ওয়াইনের বোতলটা খুলে ঢকঢক করে গিলে ফেলে। পুরুষ কাঁদতে পারে না। কাঁদলে ইতিহাস ভঙ্গ হয়ে যাবে। তাই হয়ত নাবিদ পুরো দেশ কাঁপিয়ে কাঁদতে পারছে না। নাহলে এক পাগল প্রেমিকের কান্না হয়ত সবাই দেখত। চোখ দুটি লাল হয়ে পড়ে। ইন করা শার্টটা অগুছালো হয়ে পড়ে আছে। চুলগুলোর এক বিদ্রুপ অবস্থা। নাবিদ এক বোতল ওয়াইন নিয়ে টলতে টলতে নিজের গাড়ির কাছে চলে যায়। অস্থিরতায় মাথা ফেটে যাচ্ছে। গাড়ির কাছে গিয়ে পড়ে যেতে নিলে আবার গাড়িকেই শক্ত ভাবে চেপে ধরে। মুখ থেকে বেরিয়ে আসে কিছু বিশ্রি শব্দ।
কোনোরকম গাড়ির ডোর খুলে গাড়ি স্ট্রাট দেয়। গাড়ির গতি ছিলো অন্যদিনের তুলনায় অনেক। নাবিদের মাথা ঠিক নেই, মস্তিষ্ক কাজ করছে না। বার বার মনে হচ্ছে এনি কারোর বউ হয়ে গেছে। তার ভালোবাসা, তার ফুলটা এখন আর তার নেই। কষ্টে বুকটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। নাবিদ গাড়ির গতি আরও বাড়িয়ে দেয়। রাতের অন্ধকারে নির্জন রাস্তা দিয়ে শাঁ শা করে গাড়িটা এগিয়ে যাচ্ছে। নাবিদ ঝাপসা চোখে সামনে কোনো কালো অবয়বকে দেখে কপাল কুচকে ফেলে। কেউ হাত বাড়িয়ে কিছু একটা চাইছে। কিন্তু সে ভালোভাবে দেখতে পারছে না ঝপসা চোখে। মনে হচ্ছে কেউ গাড়ির সামনে চলে আসছে। আচমকা যেন নিজের হুশ ফিরে আসে। সামনের ব্যক্তিটাকে বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। কিন্তু কিছুতেই গাড়ি থামাতে পারছে না। নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে গাড়িটাকে ঘুরিয়ে একটা খাম্বার সাথে ধ্বাক্কা লাগায়। মুহূর্তেই গাড়িটা এক বিকট শব্দ করে উঠে। সামনে থাকা ছায়াটা মুখে হাত দিয়ে বিকট শব্দে চিৎকার করে উঠে। মেয়ে হিসেবে চোখের সামনে এমন দৃশ্য দেখে আত্না শুকিয়ে আসে তার। লিফ্ট নিতে দাড়িয়েছিলো কিন্তু কে জানত এইভাবে এক্সিডেন্টের স্বাক্ষী হবে!

হায় খোদা এখন যদি কোনো পুলিশ চলে আসে তাহলে সব দোষ আমার উপর চলে আসবে। বাট আমি তো কিছু করি নি। সামান্য লিফ্ট চেয়েছিলাম ভাই, এইভাবে আমার সামনেই তর এক্সিডেন্ট করতে হলো! রিদ্ধিমা তর কি পালিয়ে যাওয়া উচিৎ? নাকি এই ব্যক্তিটাকে সাহায্য করা উচিত? রিদ্ধিমা হাজারটা ভেবে পালিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে গিয়ে ও থেমে যায়। জানা নেই মনের অজান্তেই আবার পিছনে ফিরে তাকায়। পুলিশের কেইস মাথা থেকে চলে যায়। বুকের ভিতরে সাহায্য করার মনোভাব জেগে উঠে। নিরব পায়ে এগিয়ে যেতে থাকে। চুলগুলো বাতাসের সাথে উড়ছে। এক পাশে দিয়ে রাখা উড়নাটা পিছন দিক দিয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে। কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। নিষ্পলক চোখে গাড়ির কাছে চলে আসে। গাড়ির ভিতরে থাকা আহত ব্যক্তিটাকে দেখে অধৈর্য হয়ে উঠে। নাবিদের মাথা স্টিয়ারিং এর উপর পড়ে আছে। কপাল ফেটে কেমন রক্ত বের হচ্ছে। রিদ্ধিমা দ্রুত গাড়ির ডোর খোলে নাবিদের মাথাটা তুলে সিটে হেলান দেওয়ায়। নাবিদের কপাল থেকে রক্ত পড়ছে। ওয়াইনের গন্ধ রিদ্ধিমার নাকে আসতেই চেহারা কুচকে ফেলে।
নাকে উড়নে চেপে ধরে রাগে গজগজ করতে করতে বলে,

” শালা মাতালের ছাও। মদ খেয়ে মাতলামো করে গাড়ি চালালে তো এক্সিডেন্ট ঘটবেই। দেখে তো ভালো বংশের ছেলে মনে হচ্ছে। তবুও বখাটে মার্কা চলাচল! জানি না কোন বাপের কপাল পুড়ছে এই ব্যাটা। ইচ্ছে তো করছে এখানে রেখেই চলে যেতে। নেহাৎ আমি মহৎ মনের মেয়ে। তাই সাহায্য করছি। নাহলে এই মাতালটাকে আমি আরও রক্তাক্ত করে দিয়ে যেতাম।
রিদ্ধিমা রাগে ফুঁশ ফুঁশ করতে করতে নাবিদের শরীরটা টেনে ফন্ট সিটে বসিয়ে বড় করে নিশ্বাস নিয়ে বলে,
” আরে বাবা, এইটা মানুষ নাকি হাতি! এত ওজন কেনো এই ব্যাটা। জিম করে আর খেয়ে খেয়ে এমন শক্তি বানিয়েছে যে সামান্য সরাতেই আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আল্লাহ লোকটার ওজন কমিয়ে দিও। জানা নেই কোন মেয়ের কপাল পুড়বে।
রিদ্ধিমা ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ির স্ট্রিয়ারিং ঘুরিয়ে পিছনে সরিয়ে আনে। এরপর কপাল কুচকে বলে,

” কোথায় নিয়ে যাব এইটাকে? বাড়ি কোন অট্টালিকায় কে জানে?
রিদ্ধিমা নিচের ঠোঁট কামড়ে নাবিদের প্যান্টের দিকে তাকায়। ফোলা ফোলা অংশ গুলোর দিকে তাকিয়ে কিছু একটা খুঁজার চেষ্টা করে। ডান পাশের পকেটে হাত দিতে ও আবার হাত সরিয়ে ফেলে। সামান্য ইতস্তবোধ জাগ্রত হলে পুনরায় বিরোধ করে বলে,
” উনার এইত সাহায্য করছিস রিদ্ধি। তুই তো আর চুরি করছিস না। পকেট – মকেট খুঁজে দেখ কোনো কার্ড বা ঠিকানা পাস কি না।
রিদ্ধিমা কোনোরকম দ্বিধা ছাড়ায় ডান পকেটে হাত রাখে। নরম জিনিস হাতে লাগতেই রুমাল ভেবে হাত সরিয়ে নিয়ে আসে।
এরপর অন্য পকেট খুজার জন্য চোখ সরাতেই বিয়াদব দৃষ্টি গিয়ে পড়ে নাবিদের সামনের দিকে। রিদ্ধিমা সাথে সাথে চোখ বড় ফেলে। সেদিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে চোখের পাতা ঝাপটে অবাদ্ধ চোখ সরিয়ে নেয়।
নিজের প্রতি নিজে বিরক্ত হয়ে বলে,

” সব ফোলা জায়গায় চোখ দিতে হয় না রিদ্ধি। কার না কার ভবিষ্যত দেখে ফেলেছিস তুই। ছিহহহ! চোখ সামলা মাইয়া। চোখ গুলো তর চরিত্রহীন হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। কোন বেডির ভবিষ্যতকে তুই চোখ দিয়ে ধর্ষন করে দিচ্ছিলি। যায় হোক দ্রুত পবিত্র রুপ ধারন কর। ভুলে ও সেদিকে যাবি না। একা একটা অসহায় ছেলের সম্মান খাইছ না রিদ্ধি জানু।
রিদ্ধিমা বিরবির করতে করতে অবশেষে একটা কার্ড খুজে পায়। একটা রিসোর্টের নাম, তারিখ আর ব্যক্তির নাম দেওয়া। ব্যক্তির নাম “নাবিদ দারিউশ ”
রিদ্ধিমা কিছুক্ষন পুরো কার্ডে নজর রাখে। রিসোর্টটা তার পরিচিত। এর পাশেই সে থাকে। পরিচিত ভেবে একটা স্বস্থির নিশ্বাস ছাড়ে। এরপর কার্ডটাকে এক পাশে রেখে গাড়ির স্ট্রিয়ারিং ঘুরিয়ে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যায়। গাড়ির কাউচ সামনে ফেটে গেলে ও চালানোর অবস্থাতেই আছে। তবুও রিদ্ধিমা প্রচুর ভয়ে ভয়ে ড্রাইভ করে। প্রায় আধা ঘন্টা পর রিসোর্টের কাছে এসে হতাশ হয়ে দাঁড়ায়।

– এত বড় হাতিকে কিভাবে নিয়ে যাব আমি?
রিদ্ধিমা গাড়ি থেকে নেমে এদিকে – সেদিকে পায়চারী করছে। নিচের ঠোঁট কামড়ে আবার ও গাড়ির ভিতর উকি দেয়। নাবিদের মোবাইলটা হাতড়ে বের করে। স্ক্রিনে লক লাগানো দেখে বিড়বিড় করে উঠে,
” মদ খেয়ে মাতাল হয়ে যেখানে – ইচ্ছে সেখানে পড়ে থাকে, তার ফোনে নাকি আবার লক থাকা প্রয়োজন। শালা আনলক থাকলে অন্তত কাউকে ফোন দিতে পারতাম। এখন কি করব আমি? সাহায্য করতে গিয়ে এখন আমি নিজেই অন্যের থেকে সাহায্য চাইতে হবে।
রিদ্ধিমা লোকের খুঁজে সামনে এগিয়ে যায়। এরপর দুইটা ব্যক্তির সন্ধান পেলে মুচকি হেসে বলে,

” হ্যালো ব্রাদার।
লোক দুইটা রিদ্ধিমার মুচকি হাসি দেখে তার ও দাঁত বের করে হাসে।
” হাই।
রিদ্ধিমা এগিয়ে এসে ভ্রুঁ নাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করে,
” হাউ আর ইউ অল?
হোয়াট আর ইউ ডুয়িং হিয়ার সো লেট অ্যাট নাইট?”
একটা লোক হেসে বলে,
” ঝ্যু রিগার্দ ল’অঁভিরোন্মঁ, স্যর।
লোকের কথায় রিদ্ধিমা থতমত খেয়ে যায়। চুপসে যায় ওর মুখটা। লোকটা কি বলেছে তার এক ইঞ্ছি ও বুঝে নি। তবে এইটা বুঝেছে তারা ফরাসি ভাষায় কথা বলছে। ফ্রান্সের নাগরিক বুঝতে বাকি নেই। রিদ্ধিমা কপাল কুচকে বলে,
‘ ইংলিশে কথা বুঝেন না?
লোক দুইটা বোকার মত তাকায় রিদ্ধিমার দিকে। রিদ্ধিমা নিজের বাঙ্গালি কথায় নিজেই হতভাগ। অন্ধের কাছে আয়না বিক্রি করতে এসেছে ভেবেই হাসি পাচ্ছে তার। লোক গুলো কেমন হাভলার মত তাকিয়ে আছে। রিদ্ধিমা ভ্রুঁ নাচিয়ে বলে,

‘ প্লিজ স্পিক ইন ইংলিশ, আই ডোন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড ফ্রেঞ্চ। ক্যান ইউ হেল্প মি?
একজন লোক রিদ্ধিমার কথায় সম্মতি জানিয়ে বলে,
” অফ কোর্স, আই উইল। হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?
রিদ্ধিমা প্রচন্ড খুশি হয়। বিদেশীরা কতটা সরল হয়। আর বাঙ্গালি হলে এতক্ষনে প্রশ্ন করতে করতে মেরে ফেলত। রিদ্ধিমা লোক দুইটাকে গাড়ির কাছে নিয়ে যায়। লোকটা আহত নাবিদকে দেখে চিন্তিত হয়ে বলে,
” আই নো হিম। উই হ্যাভ টকড বিফোর ইন দিস রিসোর্ট। হাউ ডিড হি গেট হার্ট লাইক দিস?
রিদ্ধিমা অবাক হয়ে বলে,
” চিনেন উনাকে? মানে সামওয়ান ইউ নো?
— ইয়াহহহ।
রিদ্ধিমা খুশি হয়ে ধন্যবাদ জানায়। এরপর লোক দুইটার সাহায্যে নাবিদের রুমে নিয়ে যায়। নাজলী এতক্ষন সংবাদের জন্য নাবিদের অপেক্ষা করছিলো।
নাবিদকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে চিন্তিত হয়ে বলে,

” কি হয়েছে ওর? কে মেরেছে?
রিদ্ধিমা নাজলীর দিকে তাকায় । কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলে।,
” জানি না আপনি উনার কি হন। তবে এইটুকুই বলব ড্রিংক্স করে গাড়ি চালাতে নিষেধ করবেন। আজ গুরুতর আহত হতে পারত। তবে যতটুকু হয়েছে তাও কম নয়।
নাজলী রিদ্ধিমাকে বসতে বলে। লোক দুইটা হেসে চলে যায়। নাজলী নাবিদের দিকে এক পলক তাকিয়ে হতাশার নিশ্বাস ফেলে বলে।,
” আমি ওর বোন হয়। একটা কাজে এসেছি এখানে। তবে তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। কি হিয়েছে, একটু খুলে বলো আমাকে। বসো এখানে।
রিদ্ধিমা হাসি দিয়ে বলে,
” আপু এখন বসার সময় নেই। দ্রুত বাসায় যেতে হবে। ঘটনাটা আমি অন্যদিন আপনাকে জানাচ্ছি। আর না হলে উনার জ্ঞান ফিরলে জেনে নিবেন। আজ আমি আসছি আপু।
রিদ্ধিমা দরজা পেরিয়ে যেতেই নাজলী ডেকে বলে,

” নামটা তো বলে যাও?
রিদ্ধিমা হাটার মধ্যেই উচ্চস্বরে বলে,
” সবাই রিদ্ধিমা বলে আপু । পরের বার দেখা হলে আপনি রিদ্ধি বলে ডাকতে পারেন। আমি আপনার দুই এক বছরের ছোট’ই হবে।
রিদ্ধিমা কথাটা বলে নাজলীর দৃষ্টিসীমানার বাহিরে চলে যায়। নাজলী নাবিদের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। চোখ থেকে পানি ঝরতে থাকে।
— শান্তশিষ্ট ছেলেটার এই কি ভয়ানক রুপ। কিছু তো একটা হয়েছে। আর সেটা জানার জন্য নাবিদের জ্ঞান ফিরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

রাতের নিস্তব্ধতা যেন এক অদৃশ্য পর্দা যা সমগ্র পৃথিবীকে আচ্ছাদিত করে গভীর রহস্যময়তায় নিমজ্জিত করে রাখে। বাতাসে শব্দহীনতার এক কঠোর শৃঙ্খলা বিরাজমান। যেখানে প্রতিটি গাছের পত্রপল্লব, প্রতিটি প্রাচীরের ছায়া, এমনকি অচলিত আকাশও নীরবতার গম্ভীরতাকে ধারণ করে। এই নীরবতা এতই ঘন যে মনে হয় শ্বাসপ্রশ্বাসের ক্ষুদ্রতম শব্দও তাকে ভেদ করতে ব্যর্থ হয়। চাঁদের স্নিগ্ধ আলো ও অন্ধকারের গাঢ় আবরণ যেন একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। অথচ সেই প্রতিযোগিতাও নীরবতার অন্তরালে ঢাকা পড়ে থাকে। প্রকৃতির প্রতিটি সত্তা পাখির নীরব বাসা থেকে শুরু করে মাটির অচলিত স্তব্ধতা পর্যন্ত সবকিছু যেন অনন্ত শূন্যতার গর্ভে আবদ্ধ হয়ে আছে।যেখানে সময় নিজেও থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হয়। রাত যত গভীর হয় চারপাশ তত নিরব হয়ে উঠে। এই রাতের নিরবতায় শুধু শুনা যাচ্ছে গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানের পদ ধ্বনির আওয়াজ। এই রাতের নিঃশব্দতায় কেবল প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে নিক জেভরানের পদচারণার গর্জন। দেয়ালের প্রতিটি রফার মধ্য দিয়ে প্রবেশ করছে। ক্রোধে তার চোয়াল অচঞ্চল। চোখে আগুনের শিখা জ্বলছে। দ্রত সিঁড়ি অতিক্রম করে সে উপরে উঠে এনি’র রুমে ঢুকে পড়ে। ঘুমন্ত এনি’কে হেচকা টেনে সোজা দাঁড় করায়। এমন প্রগাঢ় ক্ষুব্ধতায় এনি ভয়ে হালকা চেঁচিয়ে ওঠে। কাচা ঘুম ভেঙে যাওয়ায় শরীর কাঁপছে। হৃদয় থেমে গেছে মনে হচ্ছে। শরীর ঝাকিয়ে উঠে।
নিকের হাতের থাবা এত শক্তি নিয়ে চেপে ধরেছে, যে মনে হচ্ছে মাংস ভেদ করে আঙ্গুলগুলো হাড়ের স্পর্শে ঘষছে। এনি’র চোখ দিয়ে আচমকা পানি গড়িয়ে পড়ে। রাগে নিকের স্পর্শে তার আত্মা চেঁচাচ্ছে।
নিক এনির চিবুক আচমকা আর ও জোরে চেপে ধরে বলে,

“নাবিদকে তুই ভালোবাসিস? এই বান্দির বাচ্চা, বল ভালোবাসিস তুই নাবিদকে?
এনি হকচকিয়ে উঠে। অশ্রুশিক্ত নয়ন জোড়া তুলে সে তাকিয়ে আছে নিকের ধূসর চোখের দিকে। এতে একপ্রকার ধ্বংসের আগুন জ্বালাচ্ছে। নিকের শক্ত হাত এখন এনি’র চিবুক চেপে ধরে আছে। দাঁতের সংস্পর্শে নরম গাল কেটে যাওয়ার মতো অনুভূতি। এনি তা সর্বশক্তি দিয়ে ছিটকে ফেলে দেয় নিকের হাত। গালের ব্যথা টনটন করে উঠে। এরপর নিজের রাগটাকে সামলাতে না পেরে নিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
“আমি কাকে ভালোবাসি, সেটা জানা কী আপনার অধিকার? মাঝরাতে এমন অসভ্য প্রশ্ন করার সাহস কিভাবে হয়? আমি কাকে ভালোবাসি সেটা জেনে আপনার কী দরকার?”
এনি’র প্রতিটি ত্যারা বাক্য নিকের রাগকে দ্বিগুণ করে। হায়েনার মতো সে দুই কাঁধে শক্ত করে চাপিয়ে দেয়, দেয়ালের সঙ্গে ঠাস করে, গর্জন করে উঠে বলে,

“আমার রাজ্যে দাঁড়িয়ে আমার সাহসের মাপকাঠি মাপতে বলছিস? কেন ভালোবাসিস নাবিদকে? বল, নাবিদকে কেন ভালোবাসিস?”
নিকের প্রতিটি হুংকারে এনি’র আত্মা কেঁপে ওঠে। সাউন্ড প্রুফ রুমের দেয়ালও কম্পমান। দেয়ালে ধাক্কায় তার নরম শরীর প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করছে। কিন্তু তা তুচ্ছ। নিকের পুরো শরীর কাঁপছে। হিংস্র আর নিয়ন্ত্রণহীন এক হায়েনার মতো।
এনি বারবার নাবিদকে প্রেমিক বানানো নিয়ে বিরক্ত। এনির ইচ্ছে করছে নিককে ইচ্ছেমত কয়েক ঘন্টা পেটাতে। কিন্তু সেই ক্ষমতা তো তার নেই। আমার জীবন, আমি যাকে চাই তাকে জড়াব। তাতে উনার এত প্রশ্ন কেনো? এনি নিজের ভবনাকে প্রাধান্য দিয়ে বলে,

” নাবিদকে বার বার প্রেমিক হিসেবে দাড় করিয়ে দিয়ে কি প্রমান করতে চাইছেন? আর নাবিদ আমার প্রেমিক হলেই বা কি? নাবিদ ভদ্র, ভালো, শিক্ষিত ছেলে। যে অন্যকে সাহায্য করতে চিনে। ভালোবাসার জন্য তার একটা হৃদয় আছে। মায়া, মমতা সব আছে। ওর মধ্যে পৃথিবীর সব ভালো গুন আছে। নিশ্বঃন্দেহে নাবিদকে ভালোবাসা যায়। কিন্তু আপনার মত লোককে কোনোদিন ভালোবাসা যায় না নিক জেভরান। আপনি খুনী, অসভ্য, নরপিশাচ। নারীদের নিলামে তুলেন। আপনি হলো সেই অন্ধকার যার সান্নিধ্যে আসলে যে কেউ ধ্বংস হয়ে যাবে। যেমন আমি ক্ষনে ক্ষনে রক্তাক্ত হচ্ছি। আপনি এমন এমন এক জানোয়ার যে নারীদের পন্য করে পাচার করে। নিষ্পাপ বাচ্চাগুলোকে মায়ের বুক থেকে ছিনিয়ে এনে বিক্রি করে টাকার পাহাড় জমায়। এইসব পাপ করেই তো হয়েছেন আজকের গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান। পুরো আফ্রিকার রাজা হয়ে উঠেছেন। তবে কি জানেন, নাবিদ ও কিন্তু ইরানের রাজা। পার্থক্য হচ্ছে আপনি পাপ আর নাবিদ পবিত্র। মানুষ ওকে দেখলে সালাম জানায় আর আপনাকে দেখলে ভয়ে মাথা নত করে। ফেরাউনের মত নিজের ক্ষমতা দেখিয়ে সম্রাজ্য শাষন করছেন। আর নাবিদ ভাই সততার সাথে ইরানের বাদশাহ, শিল্পপতি হয়েছে। একজন ভালো, ভদ্র সুপুরুষকে শুধু আমি নয় পুরো জাতি ভালোবাসতে বাধ্য। আর আমিও উনাকে ভালোবাসি। উনি আমাকে ছোট থেকে ছায়ার মত আগলে রেখেছে। ভালোবাসা….
এনি আর বলতে পারে নি। হঠাৎ নরম গালে পর পর দুইটা শক্ত হাতের থাপ্পর পড়তেই টেবিলে কাছে ছিটকে পড়ে। একটুর জন্য টেবিলের কর্ণার লাগে নি কপালে। রক্ত বের না হলেও চামড়া থেথলে গিয়েছে। এনির পুরো পৃথিবী ঘুরে উঠে। দুইটা থাপ্পরে যেন মনে হচ্ছে কোনো পাহাড় তার মাথার উপরে রেখে দিয়েছে। শরীরটা ঠিক এমন নিস্তেজ হয়ে আসে। নিজেকে সামলে ভালোভাবে দাড়াতে যাবে নিকের শক্ত হাতের স্পর্শে শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে। নিক হায়েনার মত রাগে ফুঁশ ফুঁশ করছে। একটা ধারালো ছুঁড়ি এনির গলায় শক্তভাবে চেপে রাগে নিয়ন্ত্রনহারা হয়ে গর্জে উঠে,

” আবার বল কাকে ভালোবাসিস?
এনি ঝাপসা চোখে দেখে নিককে। লোকটা খারাপ জানা ছিলো। কিন্তু রেগে গেলে এতটা ভয়ংকর দেখায় জানা ছিলো না। এনি দুই গালে ধরে বলে,
” ভালোবাসলে আপনার সমস্যা কোথায়?
আবার ও বাম গালে থাপ্পর পড়ে। এইবার এনি পড়ে যেতে নিলে নিক চুলোর মুঠোয় চেপে ধরে,
“শালী ধান্দাবাজ! আমার সাথে এক বিছানায় থেকে আরেক পুরুষের ভাবনা। খুন করে ফেলব। একশত কোটি টাকার জিনিস তুই আমার। এই মুখে অন্য কারোর নাম উচ্চারন করলে ঠোঁট কেটে ফেলব। আমি ঠিক কতটা বর্বর হতে পারি ধারনা ও নেই। জানে ভয় কাজ করে না?
এত নির্যাতনে এনির শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। নিকের চোখে চোখ রেখে বলে,

” মৃত্যুর ভয় ততক্ষন যতক্ষন একটা লোকের জানের ভয় থাকে। কিন্তু মরার ভয় চলে গেলে সে সব সীমা অতিক্রম করতে পারে। কারন সে জানে একদিন সে মরবে। আর আমি ও হয়ত বেশিদিন বাঁচব না। আপনি নিজেই মেরে ফেলবেন আমাকে সেটা আমার অজানা নয় নিক জেভরান। তাহলে কিসের এত জানের ভয় করব আমি? যদি বলেন ভালোবাসার কথা তাহলে নাবিদকে ভালোবাসি আমি। এখন মেরে ফেলতে চাইলে মেরে ফেলুন।
নিক শক্তভাবে এনির চুল পেচিয়ে নেয় নিজের হাতের সাথে। নিজেকে নিয়ন্ত্ররন করতে না পেরে এক ধাক্কায় ওয়াশরুমের ভিতরে নিয়ে ফেলে দেয়। এনি মেঝেতে গিয়ে ছিটকে পড়ে। মার্বেল মেঝেতে ছিলে না গেলেও ব্যাথায় শরীর ঝাকুনি দিয়ে উঠে।নিক নিজেকে হারিয়ে ফেলে মানুষের বৈশিষ্ট্য থেকে। রুপ নেয় এক হিংস্র মাফিয়াতে। এনির লং হেয়ারে ধরে চোয়াল শক্ত করে বাথটপের ভিতরে মুখ ডুবিয়ে দেয়। নিকের এমন জঘন্য বর্বরতায় কিছু বলার ও সুযোগ হয় না। এনি পানির মধ্যে শ্বাস নিতে না পেরে হাত – পা ছুটাছুটি শুরু করে। নিকের দুই চোখ আগুনের লাভার মত ঝলঝল করছে। এনির মাথাটা আর ও ভালোভাবে চেপে ধরে বলে,

” মাই ক্রিমসন ডিজিয়ার এত সহজে তো তকে মারব না। তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে নিজের কাছে এই চার দেয়ালের ভিতরে বন্ধী করে রাখব। যাতে রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারি। যাস্ট ঘুমানোর জন্য তকে রাখব। নিক জেভরানের শয্যাসঙ্গী হয়ে পর পুরুষের নাম তো সহ্য করব না। প্রয়োজনে জিহ্বা কেটে কথা বলার অধিকার ছিনিয়ে নিব। মাই ফাকিং ডার্ক লেডি!
এনির শ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে আসছে। নিক এনিকে হেচকা টানে তুলে। এক সেকেন্ড শ্বাস না নিতেই আবার ও বাথটপের পানিতে চেপে ধরে। এত এত ধকল এক সঙ্গে নিতে না পেরে পানিতে ডুবে থাকা অবস্থায় জ্ঞান হারায়। নিস্তেজ হয়ে হাত দুইটা দুই পাশে ছেড়ে দেয়। শরীরের ভার ছেড়ে দেয় বাথটপের এক কর্ণারে। এনির নিস্তেজ শরীরটা অনুভব করতেই নিকের হুশ হাসে। রাগে ঝলঝল করা চোখ দুইটা শান্ত হয়ে আসে। বড় বড় নিশ্বাস টেনে এনিকে পাজা কোলে তোলে নেয়। এরপর সাদা বেড সিটের উপর শুইয়ে দিয়ে পুরো শরীর স্ক্যান করে। পানির কারনে টি-শার্ট পুরোটা ভিজে গিয়েছে। সাদা টি-শার্টের ভিতরে লাল জিনিস নজরে পড়তেই শুকনো ঢোক গিলে। ছন্নছাড়া হয়ে পড়ে কিছুক্ষনের মধ্যেই। এনির দিকে এক পলক তাকাতেই নিশ্বাসের ঘনত্ব বেড়ে যায়। অবাধ্য পুরুষটা গর্জে উঠতে চাইছে। নিক বিরক্তি নিয়ে বির বির করে আওড়ায়,

” রেড এন্ড হুয়াইট একদম ম্যাচ তবে আমার কাছে ভালো লাগছে না। অসহ্য সব! সব লাল রং তুলে দিব যাস্ট ক্ষমতা আসুক একবার। বাল – ছালের কালার কে বানিয়েছে এইসব! কালার ঠিক করতে পারে না আসছে কাপড় বানাতে। সব কয়টাকে টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া উচিত।
নিক বিরবির করে কাবার্ড থেকে এনির জন্য একটা ঢিলেঢিলা টি-শার্ট নেয়। এরপর বেডের কাছে গিয়ে এনির শিউরে বসে পড়ে। এনির হাতটাকে দুই পাশে রেখে এনির শরীর থেকে টি-শার্টটা খুলে ফেলে। পাপ নেই, বাঁধা নেই, অনুশুচনা নেই। তবে নিকের দৃষ্টি ছিলো কাউচের কালো পর্দাগুলোর দিকে। ভেজা টি-শার্ট বিছানার এক পাশে রেখে কাবার্ড থেকে নিয়ে আসা টি -শার্টটা পড়িয়ে দেয়। হুট করে তার হাত গিয়ে টাচ লাগে এনির মেদহীন পেটে। নিক নিশ্বাস নিয়ে এনির পাশ থেকে উঠে যায়। এরপর বারান্দায় গিয়ে ডিভানে বসে পড়ে। ওয়াইনের বোতলটা খুলে ঢক ঢক করে পুরোটা গিলে ফেলে। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। রাগ, জেদ সব মিলিয়ে ওয়াইনে বোতলটা মেঝেতে সর্ব শক্তি দিয়ে আছাড় মারে। চুল টেনে চিৎকার দিয়ে উঠে। নিজেকে শান্ত করে চোখে শান্ত ভাব ফুটিয়ে তুলে বলে,

” আজ বাথটবে চুবিয়েছি। অন্যদিন গলা চেপে ধরব। সব সহ্য করব কিন্ত এইসব নিয়ে গলা বাজি করলে তিলে তিলে শেষ করব।
বারান্দার নিঃশব্দ প্রান্তে ডিভানের গাঢ় আসনে নিক বসে আছে। হাতে ধরা আছে স্বচ্ছ কাচের গ্লাস। যার ভেতরে ঢেউ খেলছিল রক্তিম তরল। একের পর এক চুমুক দিচ্ছে সে। আর প্রতিটি গ্লাস নিঃশেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতরের শূন্যতাও যেন আরও গভীরতর হয়ে উঠছে । রাতের নীরবতা চারপাশে গাঢ় অন্ধকারে বিস্তৃত। এখানে কেবল দূর আকাশের মৃদু নক্ষত্রজ্যোতি জ্বলজ্বল করছিল নিঃশব্দ সাক্ষীর মতো।
সমস্ত পরিবেশ এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় নিমজ্জিত হয়ে আছে। চারদিকের বাতাসে ঠান্ডা। নিকের গ্লাসের লাল তরলে প্রতিফলিত হয়ে ঝিলমিল করছিল। প্রতিটি ঢোক গিলে নেবার পর তার চোখের দৃষ্টি হয়ে উঠছিল আরও শূন্য। গ্লাসের ভেতরের অন্ধকার তরলই তার রাগটাকে পরখ করছে।
ডিভানের নরম গদি তাকে আরাম দিলেও তার মনের অসহনীয় ভার কমাতে পারছিল না। চারদিকের নিস্তব্ধতা তার কানে বার দুইটা বাক্য ঝংকার তুলছে,

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৪

” সে আমাকে অসম্ভব ভালোবাসে! হ্যা নিজের থেকে ও বেশি ভালোবাসি।
নিকের চোখ আর ও ঝলঝল করে উঠে। রক্তের নেশা চেপে উঠে মাথায়। কাউকে আঘাত করতে না পারলে ভিতরে অজ্ঞান হয়ে থাকা ব্যক্তিটার লাস্ট রাত হয়ে যেতে পারে। নিক বড় বড় শ্বাস টেনে বারান্দার সিড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে। এরপর গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যায় টর্চার সেলের উদ্দেশ্যে। যেখানে শুরু হবে এক রক্তের ক্ষত – বিক্ষত খেলা।

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৬