Home লাভ বাই দ্যা ভিলেন লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৬

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৬

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৬
লিজা মনি

টর্চারসেলের সেই অন্ধকার বদ্ধ কক্ষ যেন মৃত্যুর গহ্বর থেকে উঠে আসা এক অশুভ অভিশাপ। চারদিকের দেয়ালে ঝোলানো লোহার শিকল। মরিচা ধরা হুক পড়ে আছে। রক্তের দাগে কলঙ্কিত ধারালো ছুরি টেবিলের উপর রাখা। সবকিছু মিলেমিশে সৃষ্টি করেছে এক অদৃশ্য বিভীষিকা। বাতাসে ছড়িয়ে আছে ঘামে মিশ্রিত রক্তের গন্ধ। যা শ্বাসকে ভারী করে তুলছে। এখানে প্রত্যেকটি নিঃশ্বাস মৃত্যুবার্তা বহন করছে।
চেয়ারে বসে আছে গ্যাংস্টার বস। তার মুখে এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা।কিন্তু সেই নির্লিপ্ততার আড়ালে জমাট বাঁধা হিংস্রতার কালো ছায়া। ধূসর চোখদুটো অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে যেন দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা অগ্নিশিখা। আঙুলের ডগা দিয়ে সে ছুঁয়ে যাচ্ছে পাশের টেবিলে সাজানো লোহার প্লায়ার, ধারালো ছুরি আর রক্ত মাখা হাতুড়ি। তার ঠোঁটে ফুটে উঠছে এক প্রগাঢ় নিষ্ঠুর হাসি।যা নীরব রাতের বুকে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে।

নিস্তব্ধতার শ্বাসরুদ্ধ ভার যেন ছাদের সাথে ঝুলে আছে। বাইরে রাত নিঃশব্দ। কিন্তু ভেতরে সেই নীরবতা অশুভ আর্তনাদ হয়ে কানে বাজছে। মনে হচ্ছে দেয়ালগুলো পর্যন্ত যন্ত্রণার ইতিহাস ধরে রেখেছে। প্রতিটি ইট যেন আর্তনাদ করছে অতীতের অসংখ্য ছিন্নভিন্ন দেহের স্মৃতি নিয়ে।
গ্যাংস্টার বসের চোখের ভেতর এক ধরনের হিংস্র তৃষ্ণা খেলা করছে। সে যেন শিকারীর মতো অপেক্ষায়।কারো আর্তচিৎকার শুনে নিজের নৃশংসতা পূর্ণতা দিতে। তার দৃষ্টি যখন এক মুহূর্তের জন্য ঝলসে ওঠে মনে হয় সেই দৃষ্টির ভারে অন্ধকার আরও গভীর হয়ে উঠেছে। রাতের নীরবতা এখানে মৃত্যুর পূর্বাভাসের মতো।যেখানে প্রতিটি ক্ষণ ভয়ঙ্কর শীতলতার ধারালো ছুরির মতো বুক চিরে যাচ্ছে।

এ কক্ষ শুধুই চার দেয়ালের ভেতরকার স্থান নয়।এটি হলো ভয়, যন্ত্রণা ও মৃত্যুর এক অদৃশ্য মন্দির।যেখানে সময় থেমে আছে। যেখানে মানুষের কান্না আর্তনাদের প্রতিধ্বনি এখনও শোনায়।আর যেখানে গ্যাংস্টার বস নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে হিংস্রতার রক্তমাখা হিসেবে।
দুইজন গার্ড মিলে লোক টেনে হিচরে গ্যাংস্টার বসের পায়ের সামনে এনে ধ্বাক্কা মেরে ফেলে দেয়। লোকটার মাথা কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা। হত দুইটা পিছন ঘুরিয়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। অগ্নির চোখ দুইটা সিংহের মত গর্জে উঠে। ঠোঁটে খেলে যায় এক পৈশাচিক হাসি। শিকলে বাঁধা লোকটার দিকে ঘাড় কাৎ করে তাকায়। এরপর টেবিলের উপরে রাখা একটা ধারালো ছুঁরি হাতে তুলে নেয়। নিক ছুঁরির দিকে তাকিয়ে অধিরাজের উদ্দেশ্যে বলে,
” এইটা কোন গ্রুপের মালরে?
— কোনটা বস?
নিক চোখ গরম করে চোয়াল শক্ত করে তাকায় অধিরাজের দিকে। অধিরাজ নিজের জ্ঞানে ফিরে এসে আমতা আমতা করে বলে,
” সরি বস প্রথমে প্রশ্নটা বুঝি নি তাই রিপিট প্রশ্ন করেছি। এই শা**ওয়ার মাল মনে হয় ইগরের। ইগরের পার্সোনাল বডিগার্ড।

নিক বাঁকা হেসে ছুরিটার দিকে তাকায়। মুহূর্তেই চোখ – মুখ শক্ত হয়ে যায়। রাগের তীব্রতায় শরীরে উত্তেজনা বেড়ে যায়। বিকৃত এক হিংশ্র পশু সমতুল্য হয়ে পড়ে মস্তিষ্ক। ইগরের পার্সোনাল বডিগার্ড শুধু শরীর ঝাকাচ্ছে। কালো কাপড়ের ভিতরে কিছু দেখা না গেলেও গ্যাংস্টার বসের উপস্থিতি বুঝতে অসুবিধে হয় নি। লোকটা হেচড়ে নিকের পায়ের কাছে এসে পড়তেই গলা বরারবর কোঁপ পড়ে। এক বিকট শব্দে চারপাশ স্তব্দ হয়ে যায়। লোকটার তাজা রক্ত গিয়ে ছিটকে পড়ে নিকের মুখের উপর। রক্তে রঞ্জিত হয়ে পড়ে চার- পাশ। নিকের শরীরে লাল টুপটুপ রক্ত ঝড়ছে। এক কোঁ*পে শান্ত হয় নি। হৃদয়ের জ্বালা মেটাতে আর ও একটা কোপ বসায় ঠিক আগের স্থানে। চামড়া ভেদ করে কন্ঠনালী কেটে যায়। আরেকটা কো*প বসাতেই মাথাটা গিয়ে ছিটকে পড়ে একটা টেবিলের নিচে। রক্তের তাজা গন্ধ বাতাসের সাথে মিলিয়ে যায়। গ্যাংস্টার বসের মস্তিষ্কে বিকৃত নেশা চেপে বসে।

লোকটার মাথা হীন দেহটার দিকে সামান্য ঠোঁট বাঁকায়। এরপর একটা সূচ দিয়ে ধীরে ধীরে চামড়া খুলতে থাকে। লোকটার প্রান নেই, আর্তনাদ নেই। শুধু নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। নিক গলার চামড়া আলাদা করে পেটের কাছে চলে আসে। বুকের চামড়ায় ধারালো সূচটা ডুকাতেই টগবগ রক্ত গড়িয়ে পড়তে থাকে। নিক নিচের ঠোঁট কামড়ে ধীরে ধীরে সব চামড়া আলগা করে নেয়। এরপর একটা রহস্যময় হাসি দিয়ে বডিটাকে স্টিলের উপর রাখে। রক্তে রঞ্জিত হয়ে আছে তার পুরো দেহ। মুলত সে লাল রংটা প্রচুর পছন্দ করে। লোকটার চামড়াহীন রক্তাক্ত শরীরটার দিকে এক পলক তাকিয়ে নিশ্বব্দে হাসে। এনির কথা কানে বাজছে, নাবিদের কথা মনে হতেই আবার ও রক্ত টগবগিয়ে উঠে। এক নির্ধয় পশুর মত মৃত লাশটার উপর তান্ডবলীলা চালাতে থাকে।

প্রথমে দুইটা হাত কেটে মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দেয়। বুকের উপর অজস্র আঘাত বসায়। শরীরের উপর চামড়া না থাকার কারনে খুব সহজেই নরম মাংস ভেদ করে বুক চিরে যাচ্ছে। পেটের উপরে অংশ ফলা ফলা হয়ে যায়। নাড়ুভুড়ি বেরিয়ে আসার উপক্রম।পেটের ভেতরের সব জিনিস দৃশ্যমান হয়ে উঠে। নিক এক পৈশাচিক অট্টহাসি দিয়ে কলিজাটা হাতড়িয়ে বের করে আনে। এরপর সেই রক্তাক্ত কলিজার উপর হাজারটা কো*প বসায়। চোখ দুটি লাল হয়ে আছে। ঘুমন্ত সিংহ জেগে উঠলে যেমন হৃদয়ীন হয়ে উঠে। নিক জেভরান সেই ভয়ানক সিংহের এই কোনো এক বহপরুপী। অধিরাজ চেয়ারে বসে বসে নিকের সব হিংস্রতা দেখছে। মুলত সেই সবার মাংশকে কেটে টুকরো টুকরো করে। বাট যখন নিক বা আরিশ নিজে করে তখন সে এক জায়গায় বসে দেখে। যাস্ট অপেক্ষা করে কখন আদেশ আসবে, টুকরো অংশগুলোকে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়ে আসার। অধিরাজ নিজের ভাবনার মাঝেই শুনতে পায় নিকের গম্ভীর আওয়াজ,
” সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়ে আয় প্রতিটা মাংস পিন্ডকে। বাকি অস্তিত্বগুলোকে কুকুর দিয়ে খাওয়া।

রাত তখন তিনটার কাছাকাছি। চারপাশে নিস্তব্ধতার এক অদৃশ্য আবরণ। শুধু দূরে সমুদ্রের গর্জন যেন আকাশ ফুঁড়ে উঠে আসছিলো। রিসোর্টের ঘরটি ম্লান আলোয় ডুবে ছিল। সময় থেমে আছে শ্বাসরুদ্ধ আর অচলভাবে । ডিভানের কিনারায় বসে নাজলী দৃষ্টি রেখেছিল খোলা জানালার বাইরে। আকাশে ছড়িয়ে থাকা নক্ষত্রদের দিকে তাকিয়ে হাহাকার ভরা এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক থেকে। এই নির্জন রাতও তার দুঃখকে ধারণ করতে অক্ষম।
ঠিক সেই মুহূর্তে, পিছনে ভেসে এলো এক ভাঙাচোরা কণ্ঠস্বর,
“নাজলী…

চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়ালো সে। নাবিদ মাথায় হাত দিয়ে কষ্টভরা মুখে উঠে বসার চেষ্টা করছে। তার চোখ লাল, দৃষ্টি ভারী, শরীরের প্রতিটি শিরা যেন অসহায় যন্ত্রণার ভারে নত। নাজলী জানালার কাছে থেকে দ্রুত সরে এসে তার পাশে বসে পড়ে। কাঁপা হাতে লেবু মিশ্রিত পানির গ্লাস বাড়িয়ে দেয়। কণ্ঠ ভিজে ওঠে উদ্বেগে,
“খেয়ে নাও এইটা… ভালো লাগবে।
নাবিদ গ্লাসটা নিজের হাতে নিয়ে ঢকঢক করে শেষ করে ফেলে।যেন ওই কটুস্বাদই তার ভেতরের যন্ত্রণাকে কিছুটা নিস্তেজ করবে। নাজলী গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রেখে চেপে ধরা স্বরে প্রশ্ন করে,
“প্রথমবার তো মদ খেলে না তুমি। আজ এমন বেহাল দশার কারণ কী?
নাবিদের চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। দৃষ্টি ভারী হয়ে থেমে যায় নাজলীর মুখে। এক দীর্ঘশ্বাস টেনে কণ্ঠ ভেঙে বলে,
‘কে এনেছে আমাকে এখানে?
“একটা মেয়ে… তোমাকে এখানে দিয়ে গেছে।
নাবিদের ভ্রূ কুঁচকে ওঠে.চোখে জ্বলন্ত প্রশ্নের ছায়া,

“মেয়ে?
নাজলীর কণ্ঠে অস্থিরতা জমে ওঠে,
” হ্যা মেয়ে। কিন্তু আগে বলো, আজ নিক জেভরানের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলে—সে কী বলেছে?
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে নাবিদ। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে।ঠোঁট কেঁপে ওঠে। পুরুষের চোখের পানি লুকানো নিয়ম।কিন্তু ব্যথার পাহাড়ে সেই নিয়ম ভেঙে যায়। অসহায় কণ্ঠে বলে ওঠে,
“আমি হেরে গেলাম, নাজলী। ভালোবাসার এক অমূল্য পরীক্ষায় আমি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়লাম।
নাজলী স্থির হয়ে যায়। বুকের ভেতর যেন কেউ পাথর চেপে বসায়। এনি হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে সাহসের একমাত্র ভরসা ছিল নাবিদ। শৈশব থেকে এনিকে আগলে রেখেছে।তার প্রতিটি হাসি-আনন্দ, প্রতিটি কষ্টে পাশে থেকেছে। নাজলী জানে এনির প্রতি নাবিদের ভালোবাসা কতটা শুদ্ধ। কতটা গভীর। অথচ আজ সেই নাবিদ নিজেকে ভাঙা মানুষ বলে স্বীকার করছে।
নাজলীর ঠোঁট শুকিয়ে যায়।বুক ভারী হয়ে আসে। সে শুকনো ঢোক গিলে কষ্টভরা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
“কিসের এত হেরে যাওয়া, নাবিদ?
নাবিদ চোখ বন্ধ করে ফেলে। অন্ধকারের ভেতর থেকে শব্দ উঠে আসে, যেন বিষাক্ত তীর ছুঁড়ে দেয়,
“নিক… এনিকে বিয়ে করেছে, নাজলী। আমার এনিকে সেই জানোয়ারটা বিয়ে করেছে।
শব্দগুলো বজ্রপাতের মতো আঘাত করে নাজলীর অন্তরে। তার দুই পা হঠাৎ পিছিয়ে যায়।শরীর কেঁপে ওঠে প্রবল ঝাঁকুনিতে। চারপাশ ঘুরপাক খেতে থাকে। চোখে অন্ধকার নেমে আসে। দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে কোনোভাবে নিজেকে সামলায়। ঠোঁট কাঁপতে থাকে।কণ্ঠ ভেঙে বেরিয়ে আসে,
“না… এটা হতে পারে না। তুমি… তুমি কি নিশ্চিত?
নাবিদের চোখের কোণে জমে ওঠে ব্যথার জলোচ্ছ্বাস। চোয়াল শক্ত করেও আর আটকে রাখতে পারে না। কণ্ঠ ভারী হয়ে গড়িয়ে পড়ে,

“নিক নিজে এসে বলেছে। আর নিক জেভরান মিথ্যে বলে না, নাজলী। ওর প্রতিটি কথা মৃত্যুর মত সত্য।
নাজলী চোখ বন্ধ করে পাগলের মতো নিজের চুল আঁকড়ে ধরে। বুক থেকে এক দমবন্ধ আর্তনাদ বের হয়ে আসে,
“এটা অসম্ভব! আমি আমার এনিকে চাই… মেরে ফেলবে ওকে ওই জানোয়ারটা। নাবিদ, ফিরিয়ে দাও এনিকে… আমি মানতে পারি না এই বিয়ে! ভুলে যেও না—তোমার সাথে এনির বিয়ের কথা ছিল। গ্যাংস্টারের সাথে নয়! আমি মানি না এই নির্মম সত্য। নাবিদ কিছু করো।
এই বলে নাজলী ভেঙে পড়ে কান্নায়। আর তার বুক থেকে নিরব কান্না গড়িয়ে পড়ে রাতের নিস্তব্ধতায়। যা আকাশকেও যেন বিদীর্ণ করে তুলেছে। নাবিদ নাজলীকে শান্তনা দিয়ে বলে,
” কান্না করার সময় এখন নয় নাজলী। এখন আমাদের বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ করার সময়। নিক এনিকে বিয়ে করলেও এই বিয়ের কোনো মানে নেই। আমরা এখন সবচেয়ে বড় পদক্ষেপে এগিয়ে যাব। আর অপেক্ষা করতে পারব না। অন্যের স্ত্রী রুপে আর সহ্য করব না।
এনি চোখ তুলে বলে,

” সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ মানে? কি করবে তুমি?
নাবিদের চোখের মনিতে খেলে যায় এক রহস্যময় পরিকল্পনা। অধরে হাসি ফুটিয়ে বলে,
” এনিকে নিজ হাতে তুলে নিয়ে আসব। নিক জেভরানের চোখ ফাকি দিয়ে ছলনার আশ্রয় নিব। এরপর এনিকে নিয়ে আসবে সেই ব্লেক ভাইপার মেনশন থেকে।
নাজলীর অন্তর কেঁপে উঠে। অবাকতার চরম পর্যায়ে গিয়ে বলে,
” মাথা ঠিক আছে তোমার? এক্সিডেন্টের সাথে সাথে কি জ্ঞান শক্তি হারিয়ে ফেলেছো? তুমি কার মেনশনে যাওয়ার কথা বলছো আইডিয়া আছে? একটা পোকা ডুকলে ও নিক জেনে যায়। আর সেখানে তুমি প্রবেশ করতে চাইছো। একবার বেঁচে এসেছো নাবিদ পরের বার প্রান হারাতে পারো। তাই এমন ভুল করো না।
নাবিদ সামান্য শব্দ করে হেসে বলে,
” কিন্তু আমি তো নিকের মেনশনে যাব না।

— তাহলে?
– এনি নিজে আসবে আমাদের কাছে। আমরা বাহিরে অপেক্ষা করব। এনি সবার চোখ ফা*কি দিয়ে মেনশন পেরিয়ে আমাদের কাছে আসবে।
নাজলী নাবিদের কথায় চোয়াল শক্ত করে বলে,
” পাগল হয়ে গিয়েছো তুমি? হাজার হাজার গার্ড বাড়ির চার- পাশে। আর এনি সবার চোখ ফাকি দিয়ে আসবে? আর ইউ ক্রেজি নাবিদ?
নাবিদ নিশ্বাস টেনে বলে,
” দিনের আলোতে চারপাশে অসংখ্য গার্ডের চোখ ফাকি দেওয়া না গেলেও রাতের নিস্তব্দতায় দেওয়া যায় নাজলী। এনির মত এমন ছোট – খাটো মেয়ে যেকোনো উপায়ে আসতে পারবে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন সাহস। আর এনির সাহস সম্পর্কে আমি তুমি পূর্ব পরিচিত। অতীত ভুলে যাও নি নিশ্চয়?
নাজলী আহত সুরে বলে,
” যদি পালাতে গিয়ে ধরা খেয়ে যায়। তাহলে নিক একদম এনিকে মেরে ফেলবে নাবিদ।
– ভবিষ্যত চিন্তা করলে বর্তমান চলা কষ্টকর হয়ে যাবে নাজলী। আমাদের বর্তমানে একটাই টার্গেট। এনিকে যে কোনো মুল্যে নিকের মেনশন থেকে পালাতে সাহায্য করা।

— হ্যা সম্মতি দিলাম তোমার কথাকে। কিন্ত আমরা এনিকে বার্তা কিভাবে পাঠাব?
নাবিদ বাঁকা হেসে বলে,
” চিঠির মাধ্যমে।
নাজলীর চোয়াল ঝুলে আসে,
” মানে?
নাবিদ নাজলীর অবাকতা বুঝতে পেরে বলে,
” প্রযুক্তি আজ অনেক এগিয়ে গিয়েছে নাজলী। আমরা অনেকটা দুরে থেকে ও কাউকে চিঠি দিতে পারি। আর সেটা কেউ বুঝতে ও পারবে না।
— কিভাবে?
– সূর্যদয় হলেই দেখতে পাবে। এখন আপাযত এইটা নিয়ে আরও গভীর ভাবে ভাবো । এইবার এনিকে নিয়ে আসতে কেউ আটকাতে পারবে না। স্বয়ং গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান ও না। এনির যাতে কোনোরুপ ক্ষতি করতে না পারে তাই শান্তির মাধ্যমে কাজ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন আর এইটা হবে না। তুমি যদি উন্মাদ হও তাহলে আমিও এক প্রেমিক পুরুষ। আর নিজের ভালোবাসাকে রক্ষা করার জন্য সর্বোচ্চ বর্বর কাজ করতে পারি নিক জেভরান!

সকালের আবহাওয়া যেন প্রকৃতির নিজস্ব এক মহাকাব্যিক রূপমালা।যেখানে প্রতিটি কণা, প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি দিগন্ত জুড়ে অদ্ভুত এক শুদ্ধতা ছড়িয়ে থাকে। আকাশের প্রভাতী আভা স্বচ্ছ কাঁচের মত স্বচ্ছন্দ।তবু তার ভেতরে মিশে থাকে গভীর এক অপার্থিব শান্তি, যা মানবহৃদয়ের অতল গহ্বরেও আলোড়ন জাগায়। নির্মল বাতাসের প্রতিটি ঝাপটা যেনো সুপ্ত চেতনাকে জাগ্রত করে অদৃশ্য স্পর্শে। মনে হয় যেন স্বর্গীয় শ্বাস-প্রশ্বাসে সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড স্নিগ্ধ হয়ে উঠেছে। গাছের পাতায় লেগে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো এমন নিখুঁত নৈপুণ্যে ঝলমল করে যে মনে হয় রৌদ্রকণা যেনো হীরকের অন্তর্লোক থেকে ভেসে এসে সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মহীরুহের ছায়া ভেদ করে পাখিদের কূজন প্রতিধ্বনিত হয়। যা নীরবতার বুকে সূক্ষ্ম অথচ গম্ভীর সংগীতের মতো ভেসে বেড়ায়। এ সময়টা যেনো এক সৃষ্টির পুনর্জন্ম, যেখানে মানুষ, প্রকৃতি ও সময় একত্রে মিলিত হয়ে চিরন্তনতার স্বাক্ষর বহন করে। কালো পর্দাগুলো উড়াউড়ি করছে। এনি ঘুমের মধ্যে এক পাশ থেক অপর পাশে ফিরতে যাবে এমন সময় ওর লম্বা চুলে টান পড়ে। সাথে সাথে ব্যাথায় চোখ মেলে তাকায় সে। ব্যাথায় মুখ দিয়ে মৃদু শিৎকার বেরিয়ে আসে। চুলের ব্যাথা কমানোর জন্য উঠে বসার চেষ্টা করে। কিন্তু মনে হচ্ছে একটা পাহাড় তার শরীরের উপর রাখা হয়েছে। সামানহ তিল পরিমান নড়ার ক্ষমতা ও তার নেই। এনি বিরক্তি নিয়ে ভালোভাবে তাকাতেই শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে। নিজের শরীরের উপর নিকের শরীরের ভড় অনুভব করতেই রাগে চোয়াল শক্ত করে ফেলে। নিক এনিকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে আছে। এনি নিকের বাঁধন থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ছটফট শুরু করে দেয়। ঘুমন্ত নিককে দেখে এনি তাচ্ছিল্য হাসে। দেখে মনে হচ্ছে কোনো নিষ্পাপ বাচ্চা। কিন্তু এইটা জালেমের সর্দার! এনি বিরক্তির নিশ্বাস ছেড়ে নিকের ঘাড় পর্যন্ত লম্বা চুল গুলোতে ধরে সর্বশক্তি দিয়ে টেনে ধরে। নিজের চুলে টান অনুভব হতেই নিক কপাল কুচকে তাকায় এনির দিকে। নিককে তাকাতে দেখে এনি ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,

” উঠুন আমার উপর থেকে।
নিক ভ্রুঁ নাচিয়ে নিজের অবস্থান পরখ করে। শান্তির ঘুমটা নষ্ট করার জন্য মাথায় রাগ চেপে বসে। এনির দুই হাত চেপে ধরে চোয়াল শক্ত করে বলে,
” জাগালি কেনো আমায়? দেখতে পাস নি ঘুমাচ্ছিলাম।
এনি হাত ছুটানোর জন্য ব্যার্থ চেষ্টা করে বলে,
” বিছানায় কি জায়গার অভাব পড়েছে? আপনার মত চারশত কেজির বস্তু যদি আমার মত চল্লিশ কেজির উপর রাখা হয়। বাঁচব মনে করেন?
নিক এনির উপর থেকে উঠতে উঠতে তিরিক্ষে মেজাজে বলে,
” বাঁচতে বলেছে কে? মরে যা।
এনি ছলছল চোখে বলে,
” আপনি নিজেই তো দিচ্ছেন না। ইচ্ছে তো করে নিজে মরার আগে আপনাকে মেরে রক্তাক্ত করে দিয়ে যেতে।
নিক চোখ রাঙ্গিয়ে দাঁত কটমট করে বলে,

” সাহস বেশি হয়ে যাচ্ছে না? এত মাইর খেয়ে ও মুখ বন্ধ হয় না তর? এইসব ফাকি* সাহস দেখিয়ে নিজের বিপদ কেনো টেনে আনিস বার বার? ইফ আই স্ট্রাইক ইউ, দেন এগেইন ইউ উইল লুজ কনশাসনেস। মাদার্ফাক!
এনি সামান্য চুপ থেকে তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
” ইংরেজী গালি দিতে ভালোই পারদর্শী। আমার বাংলা গালি শুনলে টিকতে পারবেন তো?
নিক ভ্রুঁ নাচায়। ঠোঁট বাকিয়ে বাঁকা হেসে বলে,
” তোমার বাংলা গালি গুলো একটু শুনি বেবিগার্ল! দেখি টিকতে পারি কি না?
— চুপ থাক খান**কির পোলা।
এনি নিকের দিকে আড়চোখে তাকায়। নিক এইটার অর্থ বুঝতে পারে নি ভেবেই বাঁকা হাসে। নিক গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে বলে,

” এর অর্থ?
এনি নিশ্বাস টেনে বলে,
” এর অর্থ হলো পবিত্রতা। পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো ব্যক্তিদের এই গালিটা দেওয়া হয়। বাট আমি আপনাকে দিয়েছি ভালোবেসে।
নিক সামান্য শব্দ করে হেসে উঠে। নিকের হাসি দেখে এনি কপাল কুচকে তাকায়। নিক এনির কাছে এসে গাল চেপে ধরে বলে,
” ভালোবাসা! অহহ। মাই ফাকিং ডার্ক এঞ্জেল। তবে এই শব্দের অর্থ আমি জেনে নিব চিন্তা করো না। মিথ্যে বলাটা তোমার মত মেয়ের মুখে শোভা পায় না।
এনি ঘৃনায় মুখ ঘুরিয়ে ফেলে। নিক তীক্ষ্ণ নজর দিয়ে এনিকে ছেড়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গিয়ে ও দাড়িয়ে যায় এনির প্রশ্নে,
” কতদিন আটকে রাখবেন আমাকে এই শিকল দিয়ে? জাহান্নামে ও শাস্তি পুরন হওয়ার পর জান্নাত দান করা হবে। আপনার নরক থেকে সেই জান্নাত আমি কবে পাব নিক জেভরান?
নিক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় এনির দিকে । এনি ভেজা চোখে তাকিয়ে আছে নিকের দিকে। নিক গলার খাদ নামিয়ে গম্ভীর হয়ে বলে,
” আমার পুরোটাই তো জাহান্নাম। এখন তোমাকে আমি জান্নাত দান করব কোথা থেকে বেবিগার্ল?
এনি নিশ্চুপ হয়ে যায়। পুরো শরীর ব্যাথায় টনটন করছে। শরীরে অসংখ্য কালসিটে দাগ পড়ে গিয়েছে নির্মম আঘাতের কারনে। জানা নেই এই কালসিটে দাগ আরও কত পড়বে এই কোমল শরীরে।

হাত পা চারপাশে মেলে দিয়ে শান্তির ঘুম ঘুমাচ্ছে মেহের। বালিশের পাশেই নিকের ছবি। নিকের একটা টি-শার্ট। আরিশ অনেক দিন পর বোনের সাথে দেখা করতে এসেছে। মেহেরের খুজে তার রুমে গিয়ে ডুকে। মেহেরকে ঘুমাতে দেখে গলে হালকা স্পর্শ করে বলে,
” মেহু.. উঠ।
আরিশের গলা বার বার কানে যেতেই মেহের তরিৎ গতিতে তাকায়। ঝাপসা চোখে আরিশকে দেখতে পেয়ে অধরে হাসি ফুটে উঠে। দ্রুত শুয়া থেকে উঠে জড়িয়ে ধরে বলে,
” কেমন আছো ভাইয়া?
আরিশ বোনের মাথায় হাত রেখে মুচকি হেসে বলে,
” পড়াশুনার কি অবস্থা?
— তানভী আপু আমাকে সাহায্য করে ভাইয়া, পড়াশুনা খারাপ হওয়ার চান্স এই নেই।
আরিশ হেসে কিছু বলতে যাবে তার আগেই চোখ আটকে যায় নিকের ছবিতে। পাশের টি-শার্ট টা চিনতেও তার অসুবিধে হয় নি। নিক একবার জ্বরে আক্রান্ত ছিলো। তখন মেহের পুরো শরীর মুছে দেয়। আর এই সুযোগেই সেখান থেকে টি- শার্ট -টা নেওয়া। আরিশ গম্ভীর হয়ে বলে,

” নিককে কাছে নিয়ে ঘুমাস কেনো? আর এই আর্ট কে করেছে?
মেহের লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে। এরপর মিনমিন সুরে বলে,
” আমি আর্ট করেছিলাম ভাইয়া। এইটা অনেক আগে। আর ও একটা ছবি আর্ট করছি। এইটা কোনো এক বিশেষ দিনে নিক ভাইয়াকে উপহার দিব।
আরিশ চোখ বন্ধ করে নিশ্বাস টেনে বলে,
” পাগলামো বন্ধ কর মেহের।
— পাগলামো কোথায় করছি ভাইয়া?
— নিককে নিজের করে চাওয়াটা এক প্রকার পাগলামো। নিক আর তুই আলাদা মেরুর। বুঝার চেষ্টা কর আমার কথা।
মেহের হালকা হেসে বলে,
” তুমি ও তো আমার থেকে আলাদা ভাইয়া। আমি আর তুমি ওত আলাদা মেরুর। তাহলে আমরা ভাই – বোন হলাম কিভাবে? ক্রিমিনাল লিডারের আরিশের এক মাত্র বোন আমি। সত্যিকার অর্থে তোমার রক্ত যদি আমার শরীরে থাকে তাহলে গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানকে সামলামোর ক্ষমতা ও আমার আছে। ভালোবাসা দিয়ে সব করা যায় ভাইয়া।

— সব ভালোবাসা মধুর হয় না। কিছু ভালোবাসা তিক্ত হয়। আর এইসব জিনিস থেকে বেরিয়ে আয়।
— ভালোবাসা কি পাপ ভাইয়া?
— পাপ নয়। বাট ভুল মানুষকে ভালোবাসা পাপ। তুই নিককে কোনোদিন পাবি পাবি না। আর তার গ্যারান্টি আমি তকে দিচ্ছি।
— তাহলে আমার জন্য কাফনের কাপড়ের ব্যাবস্থা করো।
আরিশ চমকে তাকায় মেহেরের দিকে,
” মেহের!
মেহেরের চোখ দিয়ে পড়তে থাকে। অশ্রু সিক্ত নয়নে তাকিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে বলে,
” নিক যদি আমার না হয়, এই ভালোবাসা যদি পাপ হয়। তাহলে আমার জন্য কাফনের ব্যবস্থা করে রেখো ভাইয়া। ও আমার ভালোবাসা নয়, নিক জেভরান আমার জীবন ভাইয়া। শিশু মন থেকে যাকে নিজের মন – প্রান দিয়ে এসেছি। কিশোরি মনে ওকে কাছে পাওয়ার এক তীব্র বাসনা জেগে উঠেছে। হ্যা নিক জেভরান ভয়ানক। উনি মেয়ে, জাত, ধর্ম কিছু মানে না। এক প্রকার বর্বর জীবন ওনার। কিন্তু এরপর ও ভালোবাসি। নিজের ভাইকে যদি ভাই স্বীকার করতে পারি তাহলে উনাকে ভালো কেনো ভালোবাসতে পারব না?
আরিশ হতাশার নিশ্বাস ফেলে ঘন ঘন। মেহের দিকে তাকিয়ে বলে,
, আর যদি নিক অন্য কাউকে বিয়ে করে ফেলে?
মেহের আৎকে উঠে। যেন থমকে যায় তার চারপাশের পরিস্থিতি। বিছানার চাদর খামছে ধরে ফুঁপিয়ে উঠে,
” এমন কথা আর কোনকদিন বলো না ভাইয়া। আমি সহ্য করতে পারি না। যদি কোনকদিন মনে হয় নিক জেভরান কোনোদিন আমার হবে না , সেদিন তুমি তোমার মেহেরকে হারিয়ে ফেলবে ভাইয়া। কাউকে অভিযোগ করব না। নিজ দায়িত্বে সরে যাব নিষ্ঠুর পৃথিবী থেকে। যাকে ভালোবাসি তার সাথে অন্য নারীর ছায়া দেখার ক্ষমতা আমার নেই।

আরিশ আচমকা মেহেরকে নিজের সাথে জাপ্টে ধরে। মেহের সামান্য শব্দ করে কেঁদে উঠে। আরিশ ঘন ঘন নিশ্বাস টানছে। মেহেরের ভালোবাসা নামক আসক্তির হিসেব মিলাতে পারছে না সে? যদি কখনো এনির কথা জানতে পারে তখন! আরিশের আত্না কেঁপে উঠে। কি হবে চারদিকে ভালোবাসার এই সমাপ্তি? কার জীবন কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে?
অধিরাজ দাদামশাইয়ের সাথে কথা বলছে। মুলত সে এখানে আরিশের সাথে এসেছে। নিক বর্তমানে তার গ্লাস মিনারে কোনো এক কাজে গিয়েছে। আর সেটা ও খুব গোপন কক্ষে। রাত ছাড়া আজ আর বের হবে না। দাদামশাই অধিরাজের দিকে তাকিয়ে বলে,
” মেয়েটা এখন কি অবস্থায় আছে?
অধিরাজ ঠোঁট কামড়ে বলে,
” বিয়ের দিন দেখার পর আর দেখতে পারি নি। তাকে একটা বদ্ধ রুমে বন্ধী করে রাখা হয়েছে। চারদিকে সিসিক্যামেরা, গার্ড, নজরবন্ধী। একটা পাখি ডুকার ও সাহস নেই।
দাদামশাই গম্ভীর নিশ্বাস ফেলে বলে,
” এইভাবে আটকে রাখার কারন খুজেঁ পাচ্ছি না। যদি শারিরীক বাসনার জন্য হত তাহলে হয়ত মানা যেত। কিন্তু তদের কথা অনুযায়ী নিক এখন ও মেয়েটার সাথে কিছু করে নি। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো মেয়েটার সাথে কিছু করে নি বুঝলি কিভাবে?
অধিরাজ অধরে হাসি ফুটিয়ে বলে,

” সিংহের থাবায় পড়লে সে কি আর সুস্থ থাকবে দাদামশাই? কোনো ডাক্তার আনার হলে তো আমি জানতাম। বাট কোনো ডক্টর আসে নি। সেই থেকেই সন্দেহ, বস এনির সাথে তেমন কিছু করে নি।
দাদামশাই চিন্তিত হয়ে বলে,
” এর মধ্যে প্রচুর রহস্য অধিরাজ। নিকের হুট করে নিলাম কেন্দ্র থেকে এত কোটি টাকার বিনিময়ে ক্রয় করা। আঠারো জন গ্যাংস্টারকে নিজের শত্রুতে পরিনত করা, মেয়েটাকে এত গার্ডের মধ্যে রাখা সব কিছুর মধ্যে এক ধরনের রহস্য আছে।
— রহস্য যায় হোক। কোনোভাবে যদি মেয়েটার সাথে প্রেম হয়ে যায় তাহলেই হবে।
দাদামশাই কপাল কুচকে তাকায়। অধিরাজ আমতা আমতা করে বলে,
” এইভাবে তাকানোর কি আছে দাদামশাই? হয়ে গেলে সমস্যা কোথায়? এনি এখন বসের বউ। বাট একটাই সমস্যা, বস হচ্ছে সবচেয়ে নিষ্ঠুর আর এনি বসকে এতটাই ঘৃনা করে যে, বসের উপস্থিতি অনুভব করলেই মুখ ঘুরিয়ে ফেলে।
দাদামশাই সামান্য হেসে বলে,

” এত জটিলটার ভিতরে ভালোবাসার কথা বলছিস? মেয়েটা প্রচুর সাহসী। একদিন দেখা করতে হবে।
— শুধু সাহসী নয় অপরুপ সুন্দরী দাদামশাই। একবার তাকালে তুমি চোখ ফেরাতে পারবে না। বাট এখন জানি না কি অবস্থায় আছে।
– সৌন্দর্য আর কোমলাতার জন্য মেয়েটার জীবন আজ নরকে পরিনত হয়েছে। তবে তদের সাবধানতা একটাই, এখন প্রতিটা মাফিয়া চুপ থেকে চাল চালছে নিককে হারানোর। তারা যে কোনো সময় হামলে পড়বে। ভবিষ্যতে প্রচুর সতর্ক থাকতে হবে তদের। কাল রাতে ইগর আর কায়াত এসেছিলো আমার কাছে। অনেক হিংস্র হায়েনার মত হয়ে আছে।
অধিরাজ বাঁকা হেসে বলে,
” ওরা চুপ তাই আমরাও চুপ। ওরা জাগ্রত হলে আমরা ও ভালোবাসার কমতি রাখব না দাদামশাই।
— একটু অপেক্ষা কর আমি কিছু একটা নিয়ে আসছি। আমাদের সময়কার মাফিয়া ম্যাপ।
অধিরাজ সম্মতি জানায়। দাদামশাই উঠে যায় । দাদামশাই চলে যেতেই একটা মেয়েলী কন্ঠে বিরক্তিতে কপাল কুচকে ফেলে,

” হাই জাম্বুবান!
অধিরাজ সামনে তাকিয়ে তানভীকে আসতে দেখে নিশ্বাস ছাড়ে। তানভী কাছে এসে মিষ্টি হেসে বলে,
” কেমন আছো জাম্বুবান? জানো অনেক মিস করেছিলাম তোমাকে? যাক অবশেষে দেখা পেলাম।
অধিরাজ ভ্রুঁ খানা কিঞ্চিত কুচকে বলে,
” তোমাকে বলেছিলাম আমার জন্য অপেক্ষা করতে?
— ভালোবাসার মানুষের জন্য অপেক্ষা না করলে আর কার জন্য করব? আচ্ছা বাদ দাও, মিস করো নি তুমি আমাকে?
— একদম নয়?
— কেনো মিস করো নি?
— কারন মিস করার কোনো কারন নেই।
— হ্যা রাইট। মিস তো তাদের করে যারা অনেক দুরে থাকে। বাট আমি তো সবসময় তোমার বুকে থাকি তাই না?
অধিরাজ চোয়াল শক্ত করে তাকায় তানভীর দিকে। তানভী অধিরাজের চোখ দেখে ভয় পেলেও সাহস জুগিয়ে বলে,
” চলো বিয়ে করে ফেলি। এরপর সংসার করে একটা ক্রিকেট টিম গঠন করে ফেলব। আইডিয়াটা খুব সুন্দর তাই না?
অধিরাজ নিজের ধৈর্যের খেই হারায়। চোখ দুইটা জ্বলে উঠে রাগে। আচমকা তানভীর হাত শক্ত করে চেপে ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,

” এত ইগ্নোর করার পরও পিছনে কেনো পড়ে আছিস এইভাবে? বেশি বাড়াবাড়ি করলে শরীরটাকে কেটে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়ে আসব। রক্ত দেখলে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যায়, সে সপ্ন দেখছে আমাকে বিয়ে করে ক্রিকেট টিম বানাবে। পরের বার আর এইসব বললে মাথাটা কেটে দুইভাগ করে ফেলব।
অধিরাজের স্পর্শ করা জায়গা এতটা ব্যাথা পাচ্ছিলো যে, চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়া শুরে করে। সে কান্না মিশ্রিত চোখে, ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলে,
‘ আমাকে আপনার কাছে একধরনের ছেঁচরা মনে হয় তাই না জাম্বুবান?
অধিরাজ ছোট ছোট চোখে তাকায়। তানভী শব্দ করে হেসে বলে,
” তবে ছেঁচরা ভাবলেও সমস্যা নেই। আপনার কাছে আমি হাজারবার ছেঁচরা হতে রাজি আছি। বিশ্বাস করুন আপনি যদি আমাকে ভালো না বাসতেন তাহলে আমি কোনোদিন ও আপনার পিছু নিতাম না। আপনি আমাকে ভালোবাসেন বাট স্বীকার করতে চাননা। আপনার প্রফেশনের কারনে আমাকে কাছে ঘেষতে দেন না, যাতে আমার কোনো ক্ষতি না হয়। আমাকে অবহেলা করেন বাট আপনার চোখে রাগের আড়ালেও আমার জন্য ভালোবাসা দেখতে পায়।
অধিরাজ তানভীর হাত ছিটকে সরিয়ে দিয়ে বলে,

” অতিরিক্ত ভাবা বোকামি। আমার লাইফে ভালোবাসার স্থান নেই। প্রতিনিয়ত দেহ টুকরো টুকরো করি। রক্ত দিয়ে গোসল করি। তাই আমার থেকে ভালোবাসা আদায় করা বোকামি। পরের বার কাছে আসতে দেখলে বস্তার মধ্যে বন্ধী করে সোজা সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়ে আসব।
অধিরাজ কথাটা বলে আর দেরি করে নি । রাগে বড় বড় পা ফেলে বেরিয়ে যায় । আরিশ আর দাদামশাই আসার ও অপেক্ষা করে নি।
তানভী অধিরাজের যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকে। এরপর নিজের হাতের দিকে তাকায়। হাতে আঙ্গুলের ছাপ বসে গিয়েছে। তানভী মুচকি হেসে সেখানে চুমু খেয়ে বলে।,
” আপনার চোখের উপর থেকে রাগের পর্দা সরিয়ে ভালোবাসার পর্দাটা উন্মুক্ত করব’ই। আমাকে ভালোবাসেন সেটা স্বীকার করতে বাধ্য আপনি মি জাম্বুবান।

রাতের নিশুতি নিস্তব্ধতা এমন এক গভীর অথচ অনির্ণেয় প্রপঞ্চ। যেখানে ধ্বনির অস্তিত্ব সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়।আর প্রতিটি সত্তা এক অদৃশ্য জড়তার আচ্ছাদনে নিমজ্জিত হয়। আকাশ তার অমলিন অন্ধকারে সমগ্র বিশ্বকে গ্রাস করে রাখে। যেনো অনন্ত শূন্যতার এক সুগভীর গহ্বর থেকে নিস্তব্ধতার অবর্ণনীয় প্রতিধ্বনি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। বাতাসের অদৃশ্য স্পন্দনও এখানে স্থির হয়ে থাকে, ফলে প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম আন্দোলন পর্যন্ত থমকে গিয়ে এক অচল চিত্রকল্পে পরিণত হয়। দূরে ছায়ার ভেতর থেকে ভেসে আসা আলোও নিস্তব্ধতার কঠোর শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, যেনো সময় নিজেও অনন্ত বিস্মৃতির কোলে আশ্রয় নিয়েছে। এই মুহূর্তে নিস্তব্ধতা আর অন্ধকার মিলেমিশে এমন এক গূঢ় আবহ সৃষ্টি করে।।যা মানবচেতনার গভীরতম স্তর পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিয়ে শূন্যতার কাছে নতিস্বীকারে বাধ্য করে। ব্লেক ভাইপার মেনশনের চারদিকে হাজার ও গার্ডদের আনাগোনা। কালো রঙ্গের গ্লাস দিয়ে মোড়ানো বিলাশবহুল মেনশনটা অন্ধকারে চিকচিক করছে। আর সেখানের কোনো এক বলকনির কাছে দাড়িয়ে আছে এনি। চারপাশে চোখ বুলিয়ে বড় করে নিশ্বাস টানে। এনি নিজের বেলকনি ছেড়ে অন্য আরেক বেলকনিতে চলে যায়। কলিজা ধরপফর করছে। পালানোর জন্য তার হৃদয় ছটপফট করছে। চিত্রা মাসির থেকে শুনেছে আজ নিক জেভরান আসবে। না। এনির ভিতরে পালানোর সাহস সঞ্চয় হয়। আজকের রাতের মত এমন রাত হয়ত সে আর পাবে না। আর এমন সুযোগ হাতছাড়া করার মত বোকা সে নয়।

এনি রেলিং ধরে সামনে উকি দেয়। এখানে থেকে বাহিরের অংশ একদম স্পষ্ট দেখা যায়। গেইডের সামনে দুইজন বিশাল দেহীর ব্যক্তিকে দেখে কপাল কুচকে ফেলে। এদের সীমানা অতিরক্রম করে যাওয়া অসম্ভব! মুহূর্তেই এনির অধরে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠে। কোনো রকম অপেক্ষা না করে নিজের কাবার্ড খুলে। কাবার্ড থেকে অনেক খুঁজা খুজির পর একটা শর্ট ড্রেস বের করে। ড্রেসটা হাতে নিয়ে বাঁকা হেসে লাইট অফ করে দেয়। এরপর কিছুক্ষনের মধ্যেই চেইঞ্জ করে লাইট অন করে। ড্রেসটা হাটু পর্যন্ত। ফলে এনির ফর্সা পা দুটি উন্মুক্ত। এনি নিজের চুল গুলো ছেড়ে দেয়। লম্বা চুলগুলো হাটু অব্দি এসে ঠেকে। এনি রহস্যময় হাসি দিয়ে পুনরায় রেলিং এর কাছে চলে যায়। পিছনের বারান্দায় সিঁড়ি দিয়ে একদম নিশ্বঃব্দে বেরিয়ে যায়। পায়ে কোনোরকম জুতাও পরিধান করে নি, শব্দ হবে বলে। এনি মুখ চেপে ধরে অন্ধকার জায়গাগুলো দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। নিশুতি এই রাতে এমন ভয়ানক পদক্ষেপে এনির আত্না পর্যন্ত কাঁপছে। হাটু কাঁপছে তার। তবুও নিজের সাহসীকতায় সে অটল। অন্ধকার পথ ধরে একদম গেইডের সামনে চলে আসে। গার্ড দুইজন কারোর উপস্থিতি টের পেয়ে বন্ধুক তাক করে গর্জে উঠে,
” ক.. কে ওখানে?

এনি কেঁপে উঠে লোক দুইটার গর্জনে। কিন্তু নিজের সাহসটাকে প্রাধান্য দিয়ে মুচকি হেসে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। গার্ড দুটি এনিকে দেখে বন্ধুক নামিয়ে দেয়। এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন চোখ নড়ালেই মেয়েটা হারিয়ে যাবে। চাঁদের আলোতে চিকচিক করছে এনির দবদবে ফর্সা শরীর। নীল চোখের গভীরতায় হারিয়ে যায় নিষ্ঠুর দুই গার্ড। এনি লাজুক হেসে বলে একজন গার্ডের বুকে হাত রেখে। এরপর আরেকজন গার্ডের দিকে উড়িন্ত চুমু ছুঁড়ে দেয়। লোক দুইটা মোহিত হয়ে তাকিয়ে আছে এনির দিকে। এনি ঠোঁট কামড়ে হেসে তদের সামনে দিয়ে কোমড় নাচাতে নাচাতে বেরিয়ে যায়। রাতের অন্ধকারের সাথে মিলিয়ে যায় কিছুক্ষনের মধ্যে। এনি চলে যেতেই গার্ড দুইটা নিজের জ্ঞানে আসে। একদজন হেসে বলে,
” আজকার রাতের বেলাতেও সপ্নে পরীরা এসে লোভ দেখায়।
আরেকজন মলিন মুখে বলে,
” এতক্ষন সপ্ন দেখেছিলাম ভেবেই কষ্ট লাগছে। এত অপরুপ পরী কখনো দেখি নি। মনে হচ্ছে এইটা সপ্ন নয় বাস্তব। আমার বুকে স্পর্শ করেছে ওর নরম হাত দিয়ে।

— আমার দিকে তাকিয়ে চুমু দিচ্ছিলো। উফফ কলিজাটা বেরিয়ে যাচ্ছিলো একদম
হঠাৎ একজন গার্ডের মস্তিষ্ক নড়ে উঠে। আচমকা কপাল কুচকে বলে,
” তুই আর আমি একই সপ্ন একসাথে দেখলাম কিভাবে? এইটা সপ্ন নয় বাস্তব ছিলো।
লোকটা তরিৎ গতিতে তাকায়। কন্ঠ কেঁপে উঠে অসম্ভভাবে। গলা শুকিয়ে আসে এক মুহূর্তের জন্য। দুইজনের হাটু কাঁপছে। কোনোরকম অস্ফুর্ত ভাষায় বলে,

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৫

” বস যে মেয়েটাকে কিনে এনেছিলো, সেই মেয়েটা নয়তো? একই রকম নীল চোখের গভীরতা, গাটু পর্যন্ত ঢেউ খেলানো চুল, দবদবে ফর্সা গায়ের রং, মুখের কোমলতা এতটাই গভীর যে, যে কেউ নিজেকে হারিয়ে ফেলতে বাধ্য। বর্ননা তো এমন এই শুনেছিলাম।
লোক দুইটা পাগলের মত শ্বাস নিতে থাকে। এত বড় ভুল তারা কিভাবে করতে পারলো। তাদের জঘন্য মৃত্যু থেকে কেউ আটকাতে পারবে না।

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৭