Home লাভ বাই দ্যা ভিলেন লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৭

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৭

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৭
লিজা মনি

গভীর রজনীর অন্তহীন অন্ধকারে। যখন নিশুতি নীরবতা সমগ্র পরিবেশকে আবৃত করেছে।কেবলমাত্র দূর থেকে ভেসে আসা হুতুম পেঁচার কর্কশ ডাকই যেন শূন্যতাকে বিদীর্ণ করছে। এই নিস্তব্ধতার মর্মান্তিক স্তর ভেদ করে এনি মৃত্যুভয়ে উন্মত্ত দৌড়েরত। খালি পায়ে বিরামহীনভাবে দৌঁড়াচ্ছে। শরীর কাঁপছে তার অসম্ভববে। তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে এসেছে কিন্তু থামার নাম নেই।
তার মস্তিষ্কের প্রতিটি স্নায়ু যেন একটিই সংকেত দিচ্ছে,
” বাঁচতে হলে পালাতে হবে, আর পালাতে হলে গন্তব্য অজানা হলেও অগ্রসর হতে হবে।
এনি জানে না সে কোথায় যাচ্ছে, কোন প্রান্তে তার মুক্তির আলোকবর্তিকা জ্বলছে। দিনের হিসাব, মাসের অস্তিত্ব, সময়ের সমস্ত রেখাচিত্র তার অন্তর থেকে মুছে গেছে। কেবল একটিই সত্য রয়ে গেছে। অমানবিক বন্দিদশা থেকে অস্থায়ী মুক্তি ঘটেছে।কিন্তু স্থায়ী পরিত্রাণ এখনও তার নাগালের বাইরে। গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানের ছায়া যেন প্রতিটি অন্ধকার গলির সাথে মিশে তার শ্বাসপ্রশ্বাসকেও গ্রাস করতে উদ্যত। একবার ধরা পড়লে পুনরায় বাঁচার আসঙ্খা নেই।

জুতোহীন ছোট্ট পদযুগল অসংখ্যবার ধাক্কা খেয়ে থেতলে গেছে। কতবার পড়েছে তার কোনো হিসেব নেই। রক্ত আর কাদার স্তর মিলেমিশে একাকার হয়ে উঠেছে। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ ক্লান্তির অগ্নিপরীক্ষায় ভেঙে পড়ছে, অথচ প্রাণ রক্ষার ব্যাকুলতা তাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এসেছে, চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে, তবুও বসার অবকাশ নেই। রাতের ভয়ংকর নীরবতায় সামান্য বিরতিও মৃত্যু ডেকে আনতে পারে।এই জ্ঞানই তাকে চলতে বাধ্য করছে।
হঠাৎই অন্ধকারের বুকে একটি শক্ত বস্তুর সাথে সংঘর্ষে এনি মাটিতে আছড়ে পড়ে। কপাল ফেটে রক্তধারা গড়িয়ে নামছে।কেঁপে ওঠা আঙুল দিয়ে ক্ষত চেপে ধরে সে অস্ফুট স্বরে বিলাপ করে উঠে,

“আল্লাহ, তুমি আমাকে বাঁচাও। নরকের গহ্বর থেকে মুক্তির দুয়ার উন্মুক্ত করলে, তবে এখনই আমাকে আশ্রয় দাও। আমি বিভ্রান্তির চৌরাস্তার মাঝখানে, সঠিক দিশা খুঁজে পাচ্ছি না।
অশ্রুসিক্ত মুখে দৃঢ়তার আভাস এনে এনি দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।এমন সময় রাতের নীরবতা বিদীর্ণ করে ভেসে আসে কুকুরের ভয়ানক গর্জন। সেই শব্দে তার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। অচেনা পায়ের ধ্বনি ক্রমে ঘনিয়ে আসে। আর হৃদপিণ্ডের প্রতিটি স্পন্দন যেন মৃত্যুঘণ্টার সাথে তাল মেলায়।
তার কাঁপা দৃষ্টির সামনে অন্ধকারের আবরণ ছিন্ন করে প্রকাশ পায় এক অবয়ব। কালো লম্বা হুডে আচ্ছাদিত সেই রহস্যময় পুরুষের হাতে রয়েছে এক বিভীষিকাময় কালো কুকুর, যার চোখদ্বয় নরকের আগুনের মতো ঝলসে উঠছে। যুবকের নিজস্ব দৃষ্টি রক্তাভ, তীক্ষ্ণ, শিকারি চাহনিতে এনি শিউরে ওঠে। সেই চোখ যেন যেকোনো মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার অস্তিত্ব চূর্ণ করে ফেলবে।
আতঙ্কে শুকনো ঢোক গিলে এনি অচেতন স্বরে উচ্চারণ করে ফেলে,

“নি…নিক জেভরান!
ঠিক সেই মুহূর্তেই বজ্রপাতের মতো ভেদ করে আসে এক প্রচণ্ড শব্দ।গুলি এসে লাগে তার পায়ের অদূরে। শীতল মাটিতে ধুলো উড়তে থাকে। কিন্তু সে পিছনে তাকাতে সাহস করে না। এনির আত্না পর্যন্ত কাঁপছে। সামনে যদি জমরাজ থাকে , তবে পিছনে কে ওঁত পেতে আছে?
এই বিভ্রমের মাঝেই বায়ুকে কাঁপিয়ে ওঠে নিক জেভরানের গর্জন,
“ডোন্ট! একটা টাচ লাগলে দুনিয়া জ্বালিয়ে দিব কায়াত।
রাতের বুকে সেই ভয়ংকর কণ্ঠ যেন বজ্রনির্ঘোষের ন্যায় প্রতিধ্বনিত হয়।এবং চারদিকের অন্ধকার আরও ঘন। আরও ভীতিপ্রদ হয়ে ওঠে।

কায়াতের এক বিশ্রি হাসির শব্দে এনি ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায়। কায়াত সহ আর ও চারজনকে দেখে এক জায়গাতেই জমে যায়। এক জমরাজ থেকে পালিয়ে এসে এখন চার জমরাজের মুখে পড়ছে সে! কায়াত কে চিনতে সে মোটেও ভুল করে নি। সে এই লোকটাকে চিনে। ইরানে তাকে অনেক বার দেখেছে, কথা ও হয়েছে। তাকে সিডিউস করেছে অনেকবার। পাচার কেন্দ্র, নিলাম কেন্দ্র সব জায়গাতে সে এই লোকটাকে দেখেছে। কায়াতের বিশ্রি হাসির শব্দে পুরোটা জায়গা আত্নাপুরী হয়ে উঠে। এনির দুর্বল শরীরটায় সাহস জুগিয়ে রাখাটাও কঠিন হয়ে পড়েছে। মৃত্যুর দোয়ারে এসে শুধু আল্লাহকে স্মরন করে যাচ্ছে।
কায়াত হাসি থামিয়ে বলে,

” ফা**ক অফ নিক জেভরান! দুনিয়া আগুন জ্বালালেও লাভ নেই। কিন্তু আমার তো এই সেক্সি রমনীকে চাই। এমন অর্ধনগ্ন অবস্থায় মেয়েটাকে কিন্তু আর ও উন্মাদ লাগছে। ফর্সা উন্মুক্ত পা, আকর্ষনীয় গঠন। আর সবচেয়ে নজর কারা তার সৌন্দর্য আর নীল চোখের গভীরতা।
নিজের শারীরিক গঠনের এমন বিশ্রি ইঙ্গিত শুনে এনির শরীর জ্বালা দিয়ে উঠে। ইচ্ছে করছে কায়াতের মুখে থুঁ – থুঁ ফেলে দিয়ে আসতে। হুডির আড়ালে নিকের রিয়্যাকশন বুঝা গেলো না। চোখ দুইটার গভীর দৃষ্টি এনির পোশাকের দিকে। নিজের দৃষ্টি সরিয়ে কায়াতের দিকে তাকিয়ে বলে,
” ব্যাশ্যারা সবসময় সুন্দর থাকে মি, কায়াত। তাদের কাজ একটাই, রাস্তায় অর্ধনগ্ন হয়ে পুরুষ সিডিউস করা। তাদেরকে উত্তেজিত করে নিজের দিকে টেনে নেওয়া।
ব্যাঁশ্যা শব্দটা এনির কানে যেন তীঁরের ফলার মত গিয়ে আঘাত করেছে। চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে।
কায়াত নিকের কথাটাকে হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলে,

” মোটেও এই মেয়ে ব্যশ্যা নয় নিক জেভরান। যেদিন প্রথম দেখেছি সেদিন পাগল হয়েছে। একদম বেপোরোয়া পাগল। পছন্দ করলাম আমি আর মাঝখানে ছক্কা মারলে তুমি। ভেরি বেড গ্যাংস্টার বস।
নিক পা- টাকে আরেকটু সামনে এগিয়ে নিয়ে এসে বলে,
” ছক্কা মারতে আমি বরাবর এই ভালোবাসি। এইবারের চান্স কেনো মিস দিব। বাট তুমি এখানে কেনো এসেছো? যদি এই মেয়েকে নিয়ে যেতে চাও তাহলে নিয়ে যেতে পারো আটকাব না আমি। তবে তোমরা কয়জন মিলে মেয়েটাকে ভাগ করবে শুনি?
নিকের কথা শেষ হতেই কায়াত গম্ভীর হয়ে উঠে। মুহূর্তেই খুশিতে আত্নহারা হয়ে বলে,।
” এত সহজে দিয়ে দিচ্ছো? এর পিছনে কোনো রহস্য নেই তো?
— একদম নয়। আর এমন দুর্বল জিনিস এতদিন রেখে কি করব? দিয়ে দিলাম তোমাদেরকে। বাট কয়জন মিলে ভাগ করে নিবে শুনি?
কায়াত হেসে বলে,

” আমি একবার পেয়ে গেলে কাউকে ছুঁতে ও দিব না।
— কিন্তু তোমরা আঠারো জন তো আমার বিরুদ্ধে হাত মিলিয়েছো এই মেয়েকে নেওয়ার জন্য।
কায়াত থমথমে খেয়ে যায়। গোপন খবর নিক জেভরান জানলো কিভাবে?
–মেয়েটাকে দিয়ে দিলে সব বাতিল করে দিব।
— এই মেয়ের কিন্তু কিছুই নেই। আমি সব নিয়ে নিয়েছি। এমন মুল্যহীন জিনিস দিয়ে তুমি কি করবে কায়াত?
কায়াত বিশ্রি হেসে বলে,
” স্বর্ন সবসময় স্বর্ন’ই থাকে নিক জেভরান। স্বর্নের উপর হাজার লোকের স্পর্শ লাগলেও কিছু হয় না। আর এই মেয়ে তো পুরোটাই হীরা। একবার আমার কাছে আসুক। ভালোবাসার চাঁদরে মুড়িয়ে রাখব।
নিক একদম এনির কাছা- কাছি চলে আসে। নিজের নামে এমন কথাগুলো সহ্য করতে না পেরে এনি কান চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে আছে। নিকের উপস্থিতি এইসব নিয়ে তার কোনো খেয়াল নেই। পালাতে পারছে না। চারদিকে নিক আর কায়াতের দেহরক্ষী দাঁড়িয়ে আছে। যেদিকে দৌঁড় দিবে সেদিকেই ধরে ফেলবে। নিক কায়াতের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলে,

” হ্যা নিয়ে যাও তবে নিজের ছেলেকে বলি দিয়ে।
নিকের কথা শেষ হতেই কায়াতের হুঁশ ফিরে। তাকে কথার জালে এতক্ষন সম্মমোহিত করে এনির কাছে এসেছে। কায়াতের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। রাগে রি রি করে উঠে পুরো শরীর। নিকের দিকে বন্ধুক তাক করে বলে,
” শুয়রের বাচ্চা! এতক্ষন আমার সাথে ছলনা করছিলি। আমার ছেলে কোথায়?
নিক গম্ভীর হয়ে বলে,
” ফিরে যা এখান থেকে। তুই যদি এই মুহূর্তে এখান থেকে না যাস তাহলে ট্রাস্ট মি কায়াত তর ছেলের মাথা ছাড়া দেহ পাবি।
কায়াত রাগে উত্তেজিত হয়ে পা বাড়াতে যাবে এমন সময় নিকের আরেক সতর্কবানী,
” এক পা বাড়ালেও দেহটা পাবি। কোনো রক্তাপাত ছাড়া নিজের গন্তব্যে চলে যায়। নিজের ছেলেকে ও অক্ষত অবস্থায় পেয়ে যাবি।
কায়াত নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে যায়। এরপর রিভলভারটা নামিয়ে বলে,
” আমার ছেলেকে কেনো জিন্মি করেছিস।
— শুধু তর ছেলেকে নয়। তরা আঠারোজন যে কয়টা পয়দা করেছিস অশালীন বির্যপাতে সব কায়টাকেই জিন্মি করেছি।
কায়াতের শরীর জ্বলে উঠে,

‘ কেনো করেছিস?
— তর কি মনে হয় নিক জেভরান ঘাস কাটে বসে বসে। এই মেয়ে পালানোর খবর যখন আমার কানে এসেছে তখন এই বুঝেছি তরা পিছু নিবি। তদের দুর্বলতা একটাই তদের ছেলেরা। ব্যাস বন্ধী করে ফেললাম ওদের। একবার যদি স্পর্শ করার জন্য আসত তাহলে তদের ভবিষ্যতের মাথা আলাদা করতাম আমি। বাট আফসোস তুই ছাড়া কেউ আসে নি। হয়ত খবর পায় নি নাহালে কুকুরের মত ছুটে আসত । সবচেয়ে বড় কুকুর তো তুই। কাটা বিছানোর আগেই বায়ান্না হাত জিহ্বা বের করে চলে আসলি শালা মাদার্ফা*ক!
কায়াত রাগে চিবিয়ে উঠছে। রাগ মিটাতে না পেরে পাশে থাকা একজন গার্ডের কপালে রিভালভার ডুকিয়ে দেয়। রিভালভারে চাপ দিবে এমন সময় নিকের হুংকার,
” রক্তাপাত নিজের আন্ডারে গিয়ে কর। তর এই গুলির শব্দে এই মেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু জ্ঞান হারানো এর জন্য মঙ্গলজনক নয়। দুই মিনিটের মধ্যে বিদায় না হলে ছেলের কাটা মাথা যাবে তার প্যালেসে।
কায়াত কিছু করতে গিয়ে ও থেমে যায়। এত বড় সুযোগ পেয়ে ও হাতছাড়া হয়ে গেলো। নাহলে আজ রক্তাপাত ঘটিয়ে হলেও মেয়েটাকে সে ছিনিয়ে নিত। কিন্তু তার আগেই সে অন্য কিছুর কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে। কায়াত রাগে কিডমিড় করে যেতে যেতে বলে,

” আজ যাচ্ছি কিন্তু পরের বার আর খালি হাতে ফিরব না।
কায়াত চলে যায় নিযের দেহরক্ষীদের নিয়ে। এনি পালানোর জন্য রাস্তা খুঁজছে। নিজেকে প্রস্তুত করার জন্য দাড়াতেই হিংস্র এক থাপ্পরের দাবানলে সে সম্মুখীন হয়। এত বড় থাপ্পর খেয়ে এনির দুনিয়া ঘুরে আসে। থাপ্পরে টাল সামলাতে না পেরে মাটির উপর গিয়ে পড়ে। শক্ত মাটিতে পড়ে গিয়ে যেন হাড় ভাঙ্গার উপক্রম। পুরো শরীর ফেঁচফেঁচ করে উঠে। কিন্তু এই মুহূর্ত তার কাছে সবচেয়ে ভয়ানক ব্যক্তিটা হচ্ছে নিক। নিক হাত থেকে কুকুরটাকে ছেড়ে দেয়। এরপর শান্ত চোখে কোনো এক ইশারা করে। কুকুরটা নিকের ইশারা পেয়ে বাম দিক দিয়ে গর্জন করতে করতে দৌড়াতে থাকে। জানা নেই কুকুরটা ঠিক কোথায় গিয়েছে আর কেনো গিয়েছে। নিক এনির বাহুতে খামচে ধরে টেনে – হিচরে নিজের গাড়ির ফ্রন্ট সিটে নিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। এনি গিয়ে একদম গাড়ির কাউচের সাথে ধাক্কা খায়। ধাক্কা খাওয়ার পর মুহূর্তেই ব্যাথায় গোঙ্গিয়ে উঠে। নিক ড্রাইভিং সিটে বসতেই এনি বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ছটফট করে উঠে

” জানোয়ারের বাচ্চা ছাড় আমাকে। যেতে চাই না আমি আর সেই নরকে।
নিক এনির হাত দুইটা খামচে ধরে। মুহূর্তেই গিয়ে এনির নরম মাংসে তার নখ ডেবে যায়। গরগর করে তরল রক্ত পড়তে থাকে। এনি ছুটার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। নিক শক্ত করে চেপে ধরে বলে,
” কে বললো বেবিগার্ল আমি তোমাকে আগের নরকে নিয়ে যাব? বর্তমানে তোমাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাব যেটা তুমি কোনোদিন কল্পনাও করতে পারো না।
এনি নিকের ভয়ানক চোখ দুটির দিকে তাকিয়ে বলে,
” ক.. কোথায় নেওয়ার ধান্ধা করছেন?
নিক সামান্য ঠোঁট বাকিয়ে নিচের ঠেঁট কামড়ে রাখে। এনির চোখের পাতা নড়ার আগেই এনির দুই হাত বাঁধা পড়ে যায় একটা শক্ত কিছুর সাথে। এনি কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। দুই ঠোঁটের উপর কোনো এক ধারালো জিনিস লাগিয়ে দেওয়া হয়। ঠোঁট এদিক- সেদিক করলেই কেঁটে যাওয়ার উপক্রম। কিছু সেকেন্ডের ভিতরে এনি একদম বন্ধী হয়ে যায়। কথা বলতে পারছে না, শরীর নড়া- চড়া করতে পারছে না। সামনে তার জন্য কি অপেক্ষা করছে ভাবতে গা হিম হয়ে উঠে। গাড়িটা ছেড়ে দেওয়া হয় দ্রুত গতিতে। নিকের চোখ থেকে যেন আগুনের লাভা বের হচ্ছে।

কায়াত পাগলের মত নিজের প্যালেসে ফিরে যায়। গাড়ি থেকে নেমে এক ভয়ানক হুংকার ছাড়ে,
” আমার ছেলে কই?
কায়াতের গলা পেয়ে তাড়াহুড়া করে দুইজন দেহরক্ষী মিলে পনেরো বছরের ছেলেটাকে নিয়ে আসে। ছেলেটা নিজের বাবাকে দেখে এগিয়ে যায়। কায়াত ছেলেকে অক্ষত অবস্থায় দেখে শান্তির নিশ্বাস ছাড়ে। এরপর গালে দুইটা চাপর দিয়ে বলে,
” ওই শুয়রের বাচ্চা তকে আঘাত করেছে?
— না করে নি। আমার সাথে আরও অনেকে ছিলো?
– কোথায় রেখেছে?
— একটা রুমের ভিতরে।
— রুমটা কি নোংরা ছিলো?
— অনেক নোংরা। টর্চার সেলের অংশ মনে হয়েছিলো। কারন পচনশীল রক্ত আর মাংসের গন্ধ আসছিলো বার বার।
কায়াতের চোখ দুটি আবার ও জ্বলে উঠে। নিজের আলিশান চেয়ারে বসে বলে,
” আঘাত করেছে তর উপর?
কায়াতের ছেলে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,

” নো। শুধু নিয়ে গিয়েছে। এরপর টেনে – হিচড়ে একটা রুমের ভিতরে নিয়ে যায়।
— টেনে – হিচড়ে নিয়ে গিয়েছিলো?
— হ্যা।
— কখন নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো?
— সন্ধ্যার সময় বাহিরে বের হয়েছিলাম। তখন পিছন থেকে এসে মুখ চেপে ধরে। আওয়াজ করতে চেয়েছিলাম কিন্তু করতে পারি নি।
কায়াত আবার ও চোয়াল শক্ত করে ফেলে। ছেলের পিঠে হাত রেখে বলে,
” এর প্রতিশোধ ও আমি নিব। সবগুলোর হিসেব তুলব একসাথে।
কি আশ্চর্য ব্যাপার তাই না? যে নরপশুর দলেরা দিনের পর দিন অন্য মায়ের সন্তানদের বলি দিচ্ছে। চোখ – কান তুলে নিয়ে পাচার করছে, বাচ্চাদের পন্য হিসেবে বিক্রি করছে। অথচ তার ছেলেকে সামান্য টেনে – হিচড়ে নিয়েছে বলে রাগে জ্ঞান হারা হয়ে যাচ্ছে।
কায়াত চোখ বন্ধ করে রাগে গজগজ করছিলো। কায়াতের ছেলে বেপোরোয়া ভাবে বলে,
” আমাকে তোমার টর্চার সেলে কবে নিয়ে যাবে?

— সময় আসুক।
— কিন্তু আমি এখন যেতে চাই।
— এখন কেনো? বলেছিনা সময় আসলে নিয়ে যাওয়া হবে।
— সেই সময়টার আর অপেক্ষা করতে পারছি না ডেড। আমি নারী উল্লাস করতে চাই।
কায়াত ছেলের কথায় চোখ ছোট ছোট করে ফেলে। এরপর উট্টহাসি দিয়ে বলে,
” নারী উল্লাস করতে চাস?
— হ্যা।
— বয়স কত হয়েছে তর?
— যতই হোক। বয়স নিয়ে আই ডোন্ট কেয়ার। আমার যাস্ট মেয়ে চাই।
কায়াত ছেলের দিকে এক পলক তাকিয়ে অন্যদের উদ্দেশ্যে বলে,
” এইটার মাথায় এইসব ডুকিয়েছে কেরে? আমাকে মারা খাওয়াতে পোলা উঠে- পড়ে লেগেছে। পনেরো বছরের পোলা আসছে নারী উল্লাস করতে।
সবাই মাথা নিচু করে রাখে । কায়াতের ছেলে বাঁকা হেসে বলে,
” আমার কারোর শিক্ষার প্রয়োজন নেই ডেড। আমি একাই যথেষ্ট। এতটাও ছোট ভাবার দরকার নেই। নরপশুর ছেলে তো ছোট থেকেই নরপশুতে পরিনত হবে তাই না? তোমাকে অনেকবার দেখেছি। তাই আমার মনেও ইচ্ছে জাগলো। ভুল তো কিছু বলি নি।
কায়াত চোয়াল শক্ত করে বলে,
” সময় হোক আগে। বাপের মত আগে নিজেকে তৈরি কর। এরপর টর্চার সেলের মালিক তুই নিজেই।
— তখন কি আমিও তোমার মত খুন করতে পারব?
— পারবি।
— গুড ডেড। অপেক্ষায় রইলাম। রক্ত নিয়ে তাহলে একদিম আমিও উল্লাস করব।
কায়াত ছেলের মুখের হিংস্রতা দেখে পৈশাচিক হাসে। এমন ছেলেই তো সে চেয়েছিলো।

রাতের নিস্তব্ধতা যেন এক অব্যক্ত মৃত্যুর শাসন। সমস্ত আকাশমণ্ডলী নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুয়ে আছে কালো অন্ধকারের চাদরে মোড়ানো। বাতাসের সামান্যতম সঞ্চালনও এখানে দুঃসাহসী হয়ে ওঠার আগেই মূর্ছিত হয়ে পড়ে।পাতার হালকা খসখস শব্দ পর্যন্ত যেন অদৃশ্য আতঙ্কে স্থবির। দূর থেকে আসা ক্ষীণ প্রাণী-ডাকও এই নৈঃশব্দ্যের বুকে বিদীর্ণ ক্ষত তৈরি করে আবার নিস্তব্ধতার গর্ভে গ্রাসিত হয়।

প্রতিটি ছায়া নিজের অস্তিত্বকে বহুগুণ প্রসারিত করে ভীতিকর আবরণ রচনা করেছে।যেন অদৃশ্য কোনো শিকারি অন্ধকারের গহ্বরে ওঁত পেতে আছে। নক্ষত্রবিহীন আকাশ যেন গভীর গহ্বর।যেখানে আলো প্রবেশ করার সাহস হারিয়ে ফেলে। এ এক এমন নিস্তব্ধতা।যার ভারে মানব-অস্তিত্বের ক্ষুদ্রতম স্পন্দনও ভেঙে পড়ে।।আর প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস মৃত্যুর প্রতিধ্বনি হয়ে প্রতিফলিত হয়। অন্ধকারের প্রাচীরগুলো এক ভয়ানক মুহূর্তের স্বাক্ষী হবে বলে মরিয়া হয়ে উঠেছে। নিক এনির বাহু চেপে ধরে একটা বদ্ধ রুমে এনি ছিটকে ফেলে দেয়। এনির হাত এখন ও বাঁধা, চোখ বাঁধা। কোথায় এসেছে তার জানা নেই। নিকের ধ্বাক্কাতে পড়ে যেতে নিলেও নিজেকে সামলে নেয়। নিক ধীর পেয়ে এনির সামনে এসে দাঁড়ায়। নিকের শরীরের গন্ধ নাকে আসতেই ভিতরটা কেঁপে উঠে। নিক নিজের সমস্ত ক্রোধের সাথে এক টানে চোখের উপরে রাখা বস্তুটাকে খুলে ফেলে। হ্যান্ডকাফ খুলে এনির দিকে হিংস্র নজরে তাকায়। এনি চোখ খুলে সামনে তাকাতেই আৎকে উঠে। দুইজন ব্যক্তিকে লোহার সাথে বেঁধে রখা হয়েছে। লোক দুইটাকে চিনতে এনির একটুও অসুবিধে হয় নি। যে গার্ডগুলোকে ছোট ড্রেস পড়ে সিডিউস করে সে পালিয়েছে সেই দুইটা গার্ডকে এইভাবে বাঁধা অবস্থায় দেখে শিউরে উঠে। লোক দুইটা এনির দিকে তাকায় না। যেন তাকালেই তাদের ভয়ানক কিছুর সম্মুখীন হতে হবে। এনি নিকের দিকে তাকিয়ে বলে,

‘ ক.. কেনো বেঁধে রেখেছেন এখানে ওদের?
নিক ঈগল চোখে তাকায় এনির দিকে। নিকের চাহনি দেখে এনি নিজের চোখ সরিয়ে নেয়। নিক চোয়াল শক্ত করে রেখেছে। গ্যাংস্টার বসের ক্রোধ যেন এক অদম্য দহনশিখা। যা তার সমগ্র দেহগঠনকে রক্তাভ অগ্নিতে রূপান্তরিত করেছে। প্রশস্ত কাঁধ দু’টি উত্তেজনায় টানটান হয়ে উঠেছে। বাহুগুলো যেন লৌহখণ্ডের মতো স্ফীত, রগগুলো অগ্নিস্রোতের ন্যায় ফুলে উঠে ধমনীগাত্রে স্পন্দিত হচ্ছে। চোয়াল শক্ত করে আঁকড়ে ধরা। দাঁতের ঘর্ষণ থেকে নিঃসৃত শব্দ পরিবেশের নৈঃশব্দ্যকে চূর্ণ করে দিতে উদ্যত। দাঁতে ঘর্ষন করে বলে,
” লোক দুইটাকে পরিচিত লাগছে?
এনি ভয়াতুর দৃষ্টি রেখে বলে,
” কেনো এনেছেন এদের?
— বলি দিতে।
এনি অধৈর্য হয়ে উঠে,

” বিশ্বাস করুন এদের কোনো অপরাধ ছিলো না। যা করেছি আমি নিজে করেছি। শাস্তি দিলে আমাকে দিন। ওদেরকে ছেড়ে দিন। ওদের কোনো অপরাধ নেই।
নিক এনির কাঁপা ঠোঁট দুইটাকে ধরে স্লাইড করতে থাকে একদম নরমভাবে। তার দৃষ্টি অমানবিক হিংস্রতার প্রতিমূর্তি। রক্তাভ চোখদ্বয় এমনভাবে প্রসারিত যেন সেগুলো শিকারির ক্ষুধায় দীপ্ত দুটি অগ্নিগোলক। যা মুহূর্তেই শিকারকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে প্রস্তুত। সেই চোখের গভীরে এমন এক অসীম শূন্যতা বিরাজমান। যেখানে ভয়, দয়া কিংবা করুণার অস্তিত্ব নেই।আছে কেবল দমন, ধ্বংস আর আধিপত্যের নির্দয় আকাঙ্ক্ষা। নিক গ্রিবাদেশে ঠোঁট নাড়িয়ে বলে,
” এই ঠোঁট দুইটা দিয়ে উড়ন্ত চুমু দিয়েছিলে, তাই না বেবিগার্ল! তোমার ব্যবস্থা তো পরে করব মাই ফা*কিং ডার্ক এঞ্জেল। আগে এদের ব্যবস্থা করি। বাধ্য মেয়ের মত এদেরকে মেরে ফেলো।

— ম..মানে?
— মানে ওদেরকে তুমি নিজের হাতে মারবে। আর কিভাবে মারবে সেটা আমি বসে বসে দেখিয়ে দিব।
এনি চোখের পাতা ঝাপটে তাকায় নিকের দিকে। এমন ভয়ানক কাজের অফার পেয়ে যেন হৃদস্পন্দন কেঁপে উঠতে চাইছে। দুই – পাশে মাথা নাড়িয়ে বলে,
” আ.. আমি পারব না। এমন জঘন্য কাজ আমি করতে পারব না।
– করতে হবে।
— আমি করব না।
— জানতে চাই নি আদেশ করেছি বেবিগার্ল।
— আদেশ মানতে বাধ্য নয়। ওরা নিরপরাধ। ওদেরকে মারলে আপনি ধ্বংস হয়ে যাবেন।
নিক সামান্য ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে,
” বাচ্চাদের মেরে ফেলতে পারি আর সেখানে এদের মারার কথা বলাতে ধ্বংসের ভয় দেখাচ্ছো? অহহহ মাই ফাকিং বেবিগার্ল, নিক জেভরানের ধ্বংসের মাপকাঠি মাপতে যেও না। নিজেই ধ্বংসের গহ্বরে হারিয়ে যাবে। তোমাকে যা বলেছি ঠিক তাই করবে।
— জানোয়ার আপনি বাট আমি নয়।
— পালানোর আগে ভাবা উচিত ছিলো।
এনি তীব্র ক্রোধে ফেটে পড়ে,
” কি করতাম? আপনার নরকে পচে মরতাম?
নিক আচমকা এনির দিকে তাকায়। গ্যংস্টার বসের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রতিটি নড়াচড়া যেন ঝড়ের পূর্বাভাস। তার দেহের প্রতিটি শিরা-উপশিরা ক্রোধের বিষাক্ত ছন্দে কম্পমান। মুখমণ্ডলের কঠিন রেখাচিত্র আরও ধারালো হয়ে উঠেছে। যেন শিকারি পশুর মুখোশ। সেই হিংস্র দৃষ্টি নায়িকার দিক থেকে এক মুহূর্তও সরে না। নিককে দেখে এনির মনে এমন অনুভূতি দিচ্ছে যেন অদৃশ্য শিকল দিয়ে তাকে বেঁধে ফেলা হয়েছে। আর শ্বাস-প্রশ্বাস পর্যন্ত নিকের ক্রোধের অনুমতির অপেক্ষায় আছে।

নিক কিছু না বলে সামনের দিকে এগিয়ে যায়।
টর্চার সেলের নিম্দেশিত অন্ধকার শীতল, রাবণীয় এবং নিরপরাধতার গন্ধে দূষিত।
গ্যাংস্টার বসের অভিব্যক্তি একটি কল্পনাতীত অচলাচল। তার পা দু’টি মাটি-উপরে স্থির।কাঁধ প্রশস্ত হয়ে আছে। সমস্ত পেশীর আঁচড়িত দৃশ্য যেন ধাতুর উপর খোদিত ক্ষুদ্রতম ফাটলের মতো স্পষ্ট। মুখমণ্ডলের ভাঁজগুলি কঠোর। ঠোঁটের রেখা ধারালো হয়ে আছে। যেন কোনো অনাবিল অগ্নিপাথর কল্পিত হাসির চেয়ে বেশি কিছু লুকিয়ে রেখেছে। তার দৃষ্টি অপরিহার্য, তীক্ষ্ণ, নির্মম নৌকা-মুখী শিকারির মতো। চোখদ্বয় রক্তাভ জ্বলন্ত অগ্নিগোলকের ন্যায়।সে দৃষ্টি একবিন্দুতে স্থির হলে সময়টা কথা বলতে শিখে এবং সেই কথাই হলো হিংসার শাসন। তার শ্বাসপ্রশ্বাস দীর্ঘ-বাহুল্যে নয়। বরং প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন ক্রোধের একটি অনুচ্ছেদ।আর প্রতিটি শ্বাস বের হলে অচেতনভাবে কক্ষটি আরও ঘন আওয়াজে ভরে ওঠে।
নিক একট স্টিলের উপর থেকে ঝনঝন শব্দে তুলে। এনি কেঁপে উঠে। নিক অস্ত্রসমূহ চাবুক, ছোট ছুরি, লোহার কাঁটা, কঠিন দড়ি নিয়ে আসে। এরপর পিশাচের পর এক এনির সামনে একটি নির্বিকার রীতি মেনে ঠেলে দেয়। নিক ধীরে ধীরে প্রতিটি যন্ত্রণার উপস্থাপন করল।যেমন এক উপস্থাপক নিজের নাট্যকুশলতা দেখায়।
নিক এনির হাতে ছোট ছুঁরিটা দিয়ে বলে,

” দুইজনের চোখ তুলে আনবে এইটা দিয়ে।
এনি নিশ্বাস টানছে বড় বড়। এইটা কেমন পরিস্থিতিতে পড়লো সে।
প্রতিটি জিনিস তখনই গৃহীত প্রশস্ততরীর মতো নানা প্রতিশ্রুতির বোঝা হয়ে উঠে । প্রত্যেকটি অনুশোচনার বিকল্প হয়ে কন্ঠে নামিয়ে আনল। যেন শব্দগুলোই ছিল মৃত্যুর চুক্তিপত্র। দুই যুবকের চোখ কিন্তু বদলায়নি। তারা জানে তাদের বিরক্তিকর অক্ষমতা কেবল সাক্ষ্য। কর্তৃত্বের সামনে নিষ্প্রভ।
এনি দুই পা পিছিয়ে বলে,
” খবরদার এমন ভুল করবেন না। আমার জীবন চলে যাবে তবুও কাউকে সামান্য আঘাত পর্যন্ত করব না।
নিক শান্ত ভঙ্গিমায় বলে,
” তুমি করবে। আর এখন চারটা চোখে আমার সামনে এনে রাখবে।
— ব.. বললাম না। নিজের জীবন দিয়ে দিব তবুও করব না। কিন্তু যদি বলেন আপনাকে মারার কথা তাহলে এক সেকেন্ড ও অপচয় করব না। কারন আপনার মৃত্যু আমার হাতেই লিখা।

— অহহ রিয়েলি?
— ইয়েস গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান।
এক নিঝুম অমঙ্গলকালীন স্থিরতায় নিক কণ্ঠ খুলল।শব্দগুলি কালের নিমন্ত্রণে স্থির নয়। বরং হিংস্রতার একটি গণনীয় সুর। কণ্ঠটি যেমনি জরাজীর্ণ, তেমনি অদম্য,
” সময় আসুক। বর্তমানে তুমি যদি ওদের না মারো, তাহলে সামনে রাখা সাত জন নির্দোষকে আমি নিজ হাতে নির্বিঘ্নে ধ্বংস করব।
এই বাক্যটি কক্ষের সমস্ত শিকড়কে কাঁপার মতো করে তুলে। এনির হৃদয়ের ভেতর শ্বাস যেন স্তব্ধ হয়ে যায় । বাক্যটির মধ্যে নিহিত নৃশংস নির্ধারিততা।এক ধাক্কা যার প্রতিধ্বনি সব মুক্তির দ্বারকে স্থবির করে দেয়। এটা আর কোনো কল্পনা নয়।এটি একটি অনিবার্য সিদ্ধান্তের ঘোষণা। যেখানে এনি অমানবিক সিদ্ধান্তই এই মুহূর্তের নৈতিক ভারসাম্যভঙ্গের একমাত্র কারিগর। সামনে নিয়ে আসা আরও সাতজন গার্ডের দিকে তাকায়। তাদের হাত ও একইভাবে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। এনি সেদিকে তাকিয়ে বলে,

‘ ওদেরকে কেনো মারবেন?
নিক একটা ডার্ক বাকানো স্টিলে গিয়ে বসে। পায়ের উপর পা রেখে নিচের ঠোঁট কামড়ে বলে,
” তুমি যদি এই দুজনকে না মারো তাহলে আমি এই সাতজনকে মারবো। দ্য রেস্ট ইজ আপ টু ইউ নাউ। আই হোপ ইউ’ল টেক দ্য রাইট কোর্স অব অ্যাকশন। উইল ইউ কিল সেভেন পিপল অর টু?
এনি আহত দৃষ্টিতে তাকায় নিকের দিকে। নিক বিকৃত হেসে চোখ সরিয়ে নেয়।
— অমানুষ আপনি।
— মানুষ ভেবেছিলে?
— এদেরকে মেরে আপনার কি লাভ? ওরা তো আপনার সম্রাজ্যে কোনো ক্ষতি করে নি।
– তকে পালাতে সাহায্য করেছে।
— এতে আমার অপরাধ ছিলো। আমি ওদের মোহিত করেছিলাম।
— আর তারা মোহিত হয়েছে।
— এইটাই অপরাধ? কিন্তু কেনো? আমার প্রতি মোহিত হলে আপনার কি?
নিকের মুখের ভঙ্গিমা বদলাতে থাকে। আবার ও লাল হতে থাকে চোখ দুটি। চেয়ার থেকে উঠে এনির বাহু চেপে ধরে ওয়ার্ন করে বলে,

” কথা শুনতে এখানে আনিনি। দ্রুত কাজ করো। আর নাহলে সাত জন প্রান হারাবে। তবে মনে রেখো সাত জনের পরিবার আছে। বাট এই দুজনের নেই।
এনি ঠোঁট চেপে কান্না করে উঠে। নিক বাঁকা হেসে এনির চোখের উপর একটা লাল কাঁপড় বেঁধে দেয়। এনি লোক দুইটার সামনে দাড় করিয়ে বলে,
” চারটা চোখ তুলে আমার কাছে নিয়ে আসবে।
নিক এনির হাতে ছুঁরিটা দিয়ে পুনরায় আগের জায়গায় বসে পড়ে। এনি চাপা আর্তনাদ করে উঠে। কাদের বাঁচাবে সে? দুইজন নাকি সাতজনকে। সাথে তার পরিবারকে? আজ ওর কারনে এতগুলো লোকের জীবন বিপদের পথে। এনি লোক দুইটার অস্তিত্ব অনুভব করে বলে,
” ক্ষমা করে দিন আমাকে। আপনাদের না মারলে সাতজনের জীবন বিপন্ন।
লোক দুইটা যেন এইটা শুনে খুশি । এনিকে সাহস জুগিয়ে বলে,

” আপনার হাতে মরলে হয়ত কষ্টটা কম হবে। অন্তত নরক যন্ত্রনা অনুভব করে বিকৃতভাবে মরব না।
এনি ছুঁরিটা তুলে নেয়। কাঁপা হাতে এগিয়ে নিয়ে যায় লোক দুইটার মুখের দিকে। ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকাচ্ছে। শরীর কাঁপছে। হাত দুইটা দিয়ে আচমকা তাদের চোখের ভিতরে ডুকিয়ে দেয়। লোক দুইটার চিৎকারে চারপাশের পাখিগুলোও আকাশে উড়তে থাকে। এনি মুখে হাত দিয়ে দুই কদম পিছিয়ে যায়। এক চিৎকার দিয়ে ফ্লোরে বসে পড়ে। চোখের পট্টি খুলে নিজেএ হাতে রক্ত দেখে অশান্ত হয়ে যায়। কাঁপা কাঁপা চোখে সামনে তাকাতেই পিছিয়ে যায়। লোক দুইটার চোখ থেকে তরল রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। এনির রক্তে এক ধরনের ফোবিয়া আছে। এমন চোখ হীন বিকৃত অবস্থা দেখে নিজেকে আটকাতে পারে নি।
ঢলে পড়ে নোংরা মেঝের উপর।
নিক শান্ত চোখে তাকায় এনির দিকে। অজ্ঞানরত এনিকে দেখে চোখ মুখ শক্ত করে ফেলে,

” এবার তোমার শাস্তির পালা বেবিগার্ল।
নিক হিংস্রতা নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। এরপর অধিরাজকে আদেশ করে কক্ষে প্রবেশ করার জন্য। অধিরাজ আসতেই নিক সেদিকে তাকিয়ে বলে,
” এই দুইটকে টর্চার সেলের বড় রুমটাতে নিয়ে যা। পরবর্তী শাস্তি আমি দিচ্ছি।
অধিরাজ সম্মতি জানিয়ে সেদিকে চলে যায়। এনিকে এইভাবে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে প্রচুর খারাপ লাগে। নিকের এমন ভয়ানক মুখ দেখে কোনো কিছু জিজ্ঞাসার সাহস পায় না। নিজের সাথে যুদ্ধ করে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে,

” বস ম্যাডামকে কি সেই শিকল দিয়ে রাখা বদ্ধ রুমটাতে নিয়ে যাবেন?
— এইটাই শাস্তি।
অধিরাজ ঠোঁট ভেজায়। কলিজা কেঁপে উঠে। কিন্তু তার প্রফেশনে মায়া নামক কোনো শব্দ নেই।

অন্ধকার ঘরের মধ্যভাগে লোহার শিকলে বাঁধা এনির শরীর।একটানা কাঁপুনি, শ্বাসপ্রশ্বাস হাফালাফি।
দু’হাত দু’পা কাঁশি-দেওয়ালের সঙ্গে বাঁধা। টানটান তণু মাংসপেশি গেঁথে আছে এক রক্তশূন্য সমতলে।
শিকলটির ঠান্ডা স্পর্শ তার কবজিতে গুড়িয়ে আছে। লোহার সে কদর্য কবজি প্রতিটি নড়াচড়ায় ক্ষতচিহ্ন রেখে যায়। সামান্য নাড়ালেই শিকলটা আর ও মযবুত ভাবে শরীরের সাথে আটকে যায়। এনি নড়তে পর্যন্ত পারছে না।
রুমটি বদ্ধ। বাতাসের সঞ্চার নেই। শুধুই নিশ্বাসের শব্দ।ধীরে ধীরে মৃত্যুর আগমনকে জানানোর মতো।
দেয়ালে ঝোলানো বন্দুকগুলোর মরুবাতাসের মতো উপস্থিতি ঘরের নিঃশব্দতাকে আরও ভীষণ করে তোলে।
সামনে গ্যাংস্টার বস দাড়িয়ে আছে এনির সম্মুখে। চোখ দুটো আগুনে লালচে কণ্ঠে ক্ষুরের মতো নিষ্ঠুরতা।
নিক আচমকা চাবুক হাতে ধরে এনির চারদিকে ধীরে ধীরে ঘোরে। ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে ক্রোধও ঘনিয়ে উঠে। চাবুকের টোকা ঘরের বাতাস কেটে দেয়। কটুকট শব্দ যেন কানের কোলজুড়ে ছুরি বসাচ্ছে।
নিকের নড়াচড়া, কণ্ঠস্বর, নিশ্বাস কেমন হংস্র হিয়ে আছে
এনির চোখে রক্তমাখা নয়। বরং অদ্ভুত এক অদ্দুর চাহনি।ভয়ের সঙ্গে বিক্ষোভের অদ্ভুত মিলন।
ঠোঁট কঠিন। অচল প্রত্যাশার স্পন্দনে ঠোঁট দুইটা অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে। নিককে কেমন পিশাচের মত লাগছে তার কাছে। জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে শিকলে বাঁধা অবস্থায় দেখে একটুও অবাক হয় নি। আগে থেকেই জানা ছিলো এমন কিছুর এই স্বীকার হবে।

ঘরের কোণে পড়ে থাকা ছায়াগুলো যেন ভাঙা আশাব্যর্থার গল্প ফিসফিস করছে।
পানিতে ভাসমান নৌকার মতো এনির অচঞ্চল অবস্থা। লক্ষ্যহীন ভাবে তাকিয়ে আছে কিন্তু অচল।
চারদিকে অস্ত্রের নীরব উপস্থিতি।ছায়ার মতো কটু আর কড়া। মৃত্যুর সম্ভাবনা ঘন হয়ে আসছে।
প্রতিটি লোহার রেখা ঝুরঝুরে শব্দ করছে।
ঘরের আলো অস্বচ্। গলানো কাঁচের মতো।
নিকের ক্রোধ একদিক থেকে আগুনের মতো ছড়াচ্ছে। অন্যদিকে এনির ভাঙা শরীর নিরব এক গ্রন্থি। নিক চাবুকটা ঘুরিয়ে এনির দিকে এক পলক তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বলে,
” শর্ট ড্রেস! কয়জন দেখেছে এই শরীর?
এনির চোখ ঘৃনায় ফুটে উঠে,
” আপনি ছাড়া আমার শরীরের দিকে কেউ তাকায় নি। আপনার মত বিকৃত আর কেউ হয় না।
নিক ঠোঁট কামড়ে বলে,
” মি, কায়াত ও নিশ্চয় তোমাকে ভালোবাসার নজরে দেখেছিলো। উন্মুক্ত পা দুইটাতে ভালোবাসার নজর বুলাচ্ছিলো।

— সব একই সমুদ্ররের মাছ। আমার শরীর আমি দেখিয়ে হাটব তাতে আপনার কি?
নিক ঘন ঘন নিশ্বাস ছাড়ে। রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে চাবুকটা দিয়ে নিজের শরীরে আঘাত করে বলে,
” রাইট। শরীর দেখানোর জিনিস। তাই বস্ত্রহীন থাকাটাই উত্তম।
— মানে?
নিক দাঁত ঘর্ষন করে একটা চাকু তুলে নেয় হাতে। এরপর এনির কাধে ধরে কাঁপড়টা এক টানে কেটে ফেলে। এনি হতভম্ভ লজ্জায় আরষ্ট হয়ে পড়ে। নিকের কাছে আর্তনাদ করে উঠে,
” এমন করবেন না। প্লিজ… প্লিজ না।
এনির কথা শেষ হওয়ার আগেই নিক নিজের কাজ করে ফেলে। জামার এক অংশ টান দিতেই পুরোটা উন্মুক্ত হয়ে যায়। এনি চিৎকার করে নিজের চোখ বন্ধ করে ফেলে। নিক কাপড়টা দুরে ছুড়ে ফেলে দেয়। এনির বিবস্ত্র শরীরের দিকে তাকিয়ে বলে,
” তুমি বিবস্ত্র থাকবে তবে সেটা শুধু আমার সামনে। অন্য কোনো পুরুষ সামান্য চোখ তুলে তাকালেও তার চোখ তুলে নিয়ে আসব।
এনি কোনো কথা শুনছে না। নিজের নগ্ন শরীরটা ঢাকার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। চোখ বন্ধ করে রেখেই চাপা কান্না করে বলে,

” প্লিজ আমাকে আমার কাপড় ফিরিয়ে দিন। প্লিজ…
— উহুম বেবিগার্ল। তোমাকে আর ও শাস্তি পেতে হবে। শাস্তি তো এখন ও শেষ হয় নি। উড়ন্ত চুমু খেয়েছিলে, অন্যের বুকে স্পর্শ করে মুচকি হেসেছো। এইসব শাস্তি তো পাবে। আচ্ছা তুমি যে পালিয়েছো, কোথায় যেতে বলো তো?
এনি কথা বলার মত অবস্থাতে নেয়। লজ্জায় চোখ খুলতে পারছে না। শরীর ঘেমে আসছে। কোনোরকম উচ্চারন করে বলে,
‘ আমি আমার আপনজনদের কাছে যেতাম।
— কে?
— আমার বোন।
— আর?
— নাবিদ ভাই।

ব্যাস নিকের রাগ বাড়ানোর জন্য এনির এই কথাটাই যথেষ্ট ছিলো। গর্জে উঠে চাবুক নিয়ে এনির উন্মুক্ত পায়ে আঘাত করে। এনির জীবন বেরিয়ে আসার উপক্রম। দাঁত দাঁত চেপে শক্ত করে নেয় নিজেকে। কোনোরকম চিৎকার ও দেয় না। নিকের চোখে হিংস্রতা ফুটে উঠে। একটা জানোয়ারের মত আবার ও গর্জন করে বলে,
” বান্দির বাচ্চা নাবিদের কাছে কি তর?
এনি শরীর নেতিয়ে পড়ছে। চাবুকের আঘাতে পা ব্যাথায় টনটন করছে। কোনোরকম নিশ্বাস টেনে বলে,
” উত্তর দিতে বাধ্য নয়। চাবুক দিয়ে আঘাত করছেন। সেই আঘাতেই রক্তাক্ত করে মেরে ফেলুন।
— আর যদি নাবিদকেই মেরে ফেলি?
এনি আৎকে উঠে। চোখ খোলার সাহস ও তার নেই। নিজের নগ্ন শরীর দেখার মত শক্তি নেই তার কাছে। এক জানোয়ার তার শরীরের সব ভাঁজ দেখছে ভাবতেই নাড়ি- ভুড়ি উল্টে আসার উপক্রম। কোনোরকম নিজেকে সামলে বলে,

” কাপুরুষ আপনি। শুধু লোকের প্রান নিতেই জানেন। আমার নাবিদ ভাইয়ের দিকে চোখ তুলে তাকালে সম্মুখে আমাকে দেখতে পাবেন নিক জেভরান।
আমার নাবিদ কথাটা যেন নিকের কানে বজ্রের মত গিয়ে ঠেকে। নিক সহ্য করতে না পেরে চাবুক দিয়ে এনির শরীরে দুইবার আঘাত বসায়। একটা আঘাত একদম পেট বরাবর। আরেকটা আঘাত ডান হাতের উপর। এনি এইবার নিজেকে শক্ত করে রাখতে পারে নি। সামান্য আর্তনাদ করে উঠে। চাবুকের আঘাতে কেটে রক্ত বের হচ্ছে অনেক জায়গা থেকে।

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৬

এনির চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। ব্যাথায় এক পাশে হেলে পড়ে। নিক বড় বড় শ্বাস টেনে চাবুকটা দুরে ছিটকে ফেলে দেয়। এনির দিকে তাকাতেই আৎকে উঠে। রক্তাক্ত নগ্ন শরীরটা দেখে হিংস্রতা ধপ করে নিভে যায়। এনির মায়াবী মুখটা একদম মলিন হয়ে গিয়েছে। নিকের নিশ্বাস ঘন হয়ে আসে। এনি নিস্তেজ হয়ে নিজের শরীর ছেড়ে দেয়। নিকের জানা নেই তার কি হয়েছে। আচমকা এনিকে নিজের বুকের সাথে জাপ্টে নিয়ে বলে,
” ওয়াইফি! একটু বেশি’ই আঘাত করে ফেলেছি।

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ১৮