লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৩৯
Fatima Fariyal
হাতে গরম ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ নিয়ে রিদিতা ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছে। মনে মনে সে ঠিক করেছে, আজ যা-ই হোক, সে আহাদ রাজার অভিমান ভাঙবেই। দরজাটা কনুই দিয়ে ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই প্রথমেই চোখে পড়ল, কালো ট্রাউজার আর কালো ম্যাগি হাতার টি-শার্ট পরে বিছানার গভীর ঘুমে বুঁদ হয়ে পড়ে আছে আহাদ রাজা। রিদি দরজার কাছে দাঁড়িয়েই একটা লম্বা শ্বাস নিল। এবার খানিকটা এগিয়ে এসে কাপটা বেডসাইড টেবিলে মৃদু শব্দ করে রেখে হাঁটু মুড়ে আহাদের মাথার কাছে বসে পড়ল। কয়েক মুহূর্ত পলকহীন তাকিয়ে রইল। আহাদের উসকোখুসকো চুলগুলো কপালে নেমে এসেছে। রিদি আজকে লক্ষ্য করল, আহাদের ডান ভ্রুর ওপরের সেই ছোট্ট চাঁদার মত কাটা দাগটা যেন তার মুখের স্থিরতা, রাগ, তার পুরুষালি নৈঃশব্দ সবকিছুকেই আরো আকর্ষণীয় করে তোলে।
গত রাতটা মনে পড়তেই বুকটা খচখচ করে উঠল। আহাদ প্রায় এক ঘন্টা শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে আসার পর, রিদি পাঁচ ছয়বার কথা বলতে চেয়েছে। কিন্তু প্রতিবার আহাদ তাকে এড়িয়েই গেছে। তাই আজ সকাল সকাল তার জন্য কফি নিয়ে হাজির হয়েছে। অভিমান ভাঙ্গানোর ক্ষুদ্র চেষ্টা। রিদি উঠে জানালার কাছে গিয়ে ভারী পর্দাটা সরিয়ে দিল। সাথে সাথে সকালের সূর্যের সোনালি আলো এসে সরাসরি পড়ল আহাদের মুখে। তাতেই আহাদ ভ্রু কুঁচকে একটু নড়েচড়ে উঠে মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। রিদি এগিয়ে এসে হালকা ঝুঁকে নরম সুরে ডাকল,
“স্বামী… স্বামী, উঠুন স্বামী! ও স্বামী, উঠুন!”
আহাদের কানে শব্দটা পৌঁছাতেই তার কপাল কুঁচকে গেল। প্রথমে মনে হলো হয়তো স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আবার একই ডাক,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“শুনছেন স্বামি, উঠুন! স্বামী, ও স্বামী উঠুন। স্বা..”
বাক্যটা শেষ হওয়ার আগেই আহাদ ধড়ফড় করে উঠে বসল। চোখ এখনো আধা বন্ধ, ঘুম জড়ানো গলায় ক্ষুব্ধ স্বরে বলে উঠল,
“এই কে রে… কার এত বড় সাহস আমাকে এভাবে স্বামী বলে ডাকে, হ্যাঁহ!”
চোখ ঠিকভাবে খুলতেই সে স্থির হয়ে গেল। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে হালকা মিষ্টি রঙের চুড়িদার পরা তার প্রেয়সী। আহাদ ভ্রু তুলল, যেন নিশ্চিত হতে চাইছে স্বপ্ন না বাস্তব। একবার মাথা ঝাঁকিয়ে আবার তাকাল। রিদি হাসিমুখে ধোয়া ওঠা কফির কাপ বাড়িয়ে দিল,
“আমি ডেকেছি স্বামী! এই নিন, আপনার গরম গরম ফ্রেশ কফি!”
কয়েক সেকেন্ড আহাদ তাকিয়ে রইল। কিন্তু কফি নিল না।
বরং পা দুটো বিছানা থেকে নামিয়ে কটমট করে উঠল,
“এই কে তোমার স্বামি হেহ? খবরদার! আরেকবার আমাকে এই টিপিক্যাল বউদের মত স্বামী স্বামী বলে ডেকেছো! খুব খারাপ হবে কিন্তু বলে দিলাম।”
“এসব আপনি কি বলছেন, স্বামি। আপনি আমার সম্পর্কে ভাই তো আর হন না। স্বামিই তো হন। আপনাকে স্বামি বলে ডাকব না তো কি বলে ডাকব স্বামি?”
আহাদ তড়াক উঠে রিদির সামনে গিয়ে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াল। রাগে চোখ দুটো জ্বলছে,
“এই আল্লাহর বান্দি এই! একবার বললে কথা কানে যায় না? আমি বলেছি না আমাকে এভাবে ডাকবে না।”
রিদির প্রচণ্ড হাসি আসল আহাদের এমন কান্ডে। তবুও ঠোঁট চেপে নিজের হাসি সংযত রেখে বলল,
“এভাবে বলবেন না স্বামি। আমি আপনার বিবাহিত বউ! আপনার জন্য কফি এনেছি। আপনি কফিটা গ্রহন করে আমাকে ধন্য করুন স্বামি।”
আহাদের রাগ এবার তুঙ্গে উঠল। গত রাতের অভিমান এখনও মাথায় ঘুরছে। এখন আবার সকাল সকাল এই ‘স্বামী স্বামী’ নাটক তাকে পুরো ভেতর থেকে পুড়িয়ে দিচ্ছে। সে এক প্রকার চেঁচিয়ে উঠল,
“রিদিইইই!”
রিদি মুখ টিপে হেসে ফেলল। আহাদ সেটা সহ্য করতে পারল না, রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ড্রেসিং রুমের দিকে চলে গেল। রিদি সেদিকে তাকিয়ে আরেক বার ডেকে উঠল,
“স্বামি..”
“রিদিইই!”
রিদি এবার হালকা শব্দ করেই হেসে ফেলল। তার হাসির শব্দ ড্রেসিং রুমে আহাদের কানেও গেল। দরজা বন্ধ করেই আহাদ নিজের অজান্তেই নৈশব্দে হেসে ফেলল।
প্রায় অনেকক্ষণ ধরে আহাদ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল ঠিক করছে। শার্টের কলার গুছিয়ে নিয়ে রিস্টওয়াচটা অ্যাডজাস্ট করছে। সোজা কথায় নিজের সৌন্দর্যচর্চায় ব্যস্ত! রিদি কয়েকবার ডাকল, কথা বলার চেষ্টাও করেছে কিন্তু আহাদ রাজা বড় ধূর্ত লোক! প্রতিবারই এমন ভান করল যেন কিছুই শোনেনি। শেষমেশ রিদি ধৈর্য হারিয়ে আহাদের পেছনে এসে তার পিঠে দু’বার তর্জনী আঙুল দিয়ে টোকা দিল। একেবারে অনুনয়ের সুরে ডাকল,
“শুনুন না!”
আহাদ শুনল ঠিকই, কিন্তু সামনে তাকিয়ে একই গতিতে চুলের গোছা সেট করতে লাগল। রিদি এবার নিচু স্বরে বলল,
“আজকে আমি একটু মিরপুর যাব।”
মিরপুর যাওয়ার কথা শুনতেই আহাদের শরীর যেন মুহূর্তে বিদ্যুতে ছুঁয়ে গেল। সে রাগ করুক, অভিমান করুক, যাই করুক! তাই বলে চলে যেতে হবে কেন? সে ধীরে ধীরে ঘুরে রিদির দিকে তাকাল। কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কেন? সেখানে কী?”
“সেখানে কি মানে? সেখানেই তো আমার সব! আমি এখানে আসার সময় কি কিছু এনেছিলাম?”
আহাদের ভ্রু কুঁচকে গেল। টোনে স্পষ্ট গুমোট,
“সব কিছু ওখানে মানে?”
“আমার বই-টই কিছুই তো আনলাম না! আর তাছাড়া জামা কাপড় সহ সব কিছুই তো ওখানে। শাওয়ার নিতেও প্রবলেম হয়। এখানে তো কোনো কিছুই নেই আমার!”
“নেই মানে? এখানে কিছু নেই মানে কী? এদিকে এসো..”
রিদি বুঝে উঠতে পারল না সে কী বলতে চাইছে। আহাদ কোনো কথা না বলে রিদির হাত ধরে টেনে সরাসরি ওয়াশরুমের দিকে নিয়ে গেল। ওয়াশরুমে ঢুকে এক এক করে সব কাবার্ড শব্দ করে খুলতে লাগল। প্রতিটা কাবার্ড খোলার শব্দ যেন তার রাগের প্রতিধ্বনি। সে প্রশ্ন করল,
“এসব কি? এগুলো কি হেহ? এগুলো চোখো পড়ে না?”
রিদি হতবাক হয়ে দেখল। সব কাবার্ড ভর্তি। সারিবদ্ধ, নিখুঁতভাবে সাজানো। কিন্তু সেগুলো তো একটাও তার জন্য না। সে চোখ পিটপিট করে বলল,
“এগুলো তো সব আপনার!”
“যাহা আমার, তাহাই তোমার।”
রিদি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। এই কথার কি কোনো মানে আছে? সে ‘চ’ সূচক শব্দ করে বলল,
“সেটা কিভাবে হয়? এসব তো ছেলেদের জিনিস। জেন্টস! এগুলো আমি কিভাবে ইউস করব?”
এই কথা শুনে আহাদ কপাল গুছিয়ে নিল। ঠোঁট চেপে ধরে, অদ্ভুত বিরক্তিকর ভঙ্গিতে বলল,
“ওতো লেডিস জেন্টস বুঝি না। আমি যেই ক্রিম, শ্যাম্পু, ফেসওয়াশ ইউস করব, তুমিও সেটা ইউস করবা। কালা হইলে একসাথে কালা হবো, ধলা হইলে একসাথে ধলা হবো। আন্ডারস্ট্যান্ড?”
শেষ লাইনটা সে এমন ভঙ্গিতে বলল। যেন এটা কোনো নিয়ম। রিদির চোখ আরো বড় হয়ে গেল। এটা কী ধরনের লজিক? আহাদ কোনো কথা না বলে ফোনটা হাতে নিয়ে গম্ভীর মুখে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তার পায়ের গটগট শব্দ এখনও শোনা যাচ্ছে। রিদি ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। আহাদ রাজার মতো মানুষ এতটা ছেলেমানুষি করতে পারে, তা রিদির কল্পনায়ও ছিল না!
বেলা তখন বেশ খানিকটা গড়িয়ে গেছে। সূর্যটা তখন ঠিক মাথার উপর। কিন্তু আকাশ একটু মেঘলা মেঘলা থাকায় সূর্যের আলোটা মলিন লাগছে। আহাদ রাজা আজ বহুদিন পর কাজে ফিরেছে। নতুন পদ এখন তার কাঁধে রাষ্ট্রের ভারী বোঝা চাপিয়েছে। তবে আশ্চর্যের বিষয়, কাজ বুঝে নিতে তাকে তেমন একটা খেসরত পোহাতে হচ্ছে না। মন্ত্রনালয়ের বিশাল কনফারেন্স কক্ষে মিটিং চলছিল। যেখানে আমজাদ মীরও উপস্তিত। যদিও তিনি এখন সাবেক, কিন্তু দায়িত্ব থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নন। এখনো তাকে অনেক কিছু কনফারেন্স করতে হয়। মিটিং প্রায় শেষ। এখন আর অফিসিয়াল বক্তব্য নেই। সিনিয়রদের মধ্যে কিছু ব্যক্তিগত কথাবার্তা চলছে। এমন সময় সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি, আহাদ রাজাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আপনাকে অনেক অনেক শুভকামনা মন্ত্রী সাহেব। একসাথে নতুন দুটো যাত্রা শুরু হয়েছে আপনার। তবে কিছুটা সাবধানে থাকবেন। দেশ সামালানোর চেয়ে বউ সামলাতে বেশি খেসারত দিতে হয়।”
আহাদ রাজা মাথা নিচু করে সামান্য ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। তার চোখে আত্মবিশ্বাসের একটা ঠান্ডা দ্যুতি। সে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“আপনার ভুল ধারনা নাসিমুল সাহেব! যে রাজা রাজ্য সামলাতে পারে। সে নিজের রানিকেও সামলাতে পারে।
আর যারা পারে না… তারা পুরুষ না, কাপুরুষ।”
পুরো রুম হালকা নড়ে গেল কথাটায়। নাসিমুল গনি দু’বার কেঁশে উঠলেন। কারণ কথাটা যেন সরাসরি তার উপর এসে পড়েছে। তিনি একসময় বউ নিয়ে নানান সমস্যায় পড়েছিলেন বলে মন্ত্রনালয়জুড়ে কাহিনি ছড়িয়েছিল। ঠিক সেটাকেই যেন আহাদ ইচ্ছে করে খুঁচিয়ে দিল। পরিস্থিতিটা অস্বস্তিকর হয়ে যাচ্ছিল। তখন পাশের সিট থেকে মধ্যবয়সী উপসচিব শেমলি আফসানা পরিস্থিতি হালকা করতে বললেন,
“শুনেছি আপনি নাকি সেই মেয়েটাকেই বিয়ে করেছেন। যে কয়েকদিন আগে আপনার প্রাণ বাঁচিয়েছিল?”
আহাদ সামান্য মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। তখনই নাসিমুল গনি সুযোগ পেলেন আবার বিদ্রুপ ছুড়তে। চশমার কাঁচ মুছে তিনি বললেন,
“অচেনা একটা মেয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছে বলেই তাকে বিয়ে করে নিলেন? মেয়েটা তো সত্যিই ভাগ্যবতী! একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা তার ভাগ্য খুলে দিল।”
কথাটা হালকা হলেও বিষাক্ত ছিল। যাতে রিদিকে ঠুনকো, সুযোগসন্ধানী হিসেবে ইঙ্গিত করা হয়েছিল। আহাদের চোখ সরু হয়ে গেল। তার মুখের পেশী শক্ত হয়ে উঠল। সেটা আমজাদ মীরের বুঝতে সেকেন্ডও লাগল না। নিজের ছেলের চোখে সেই পরিচিত র’ক্তচক্ষু চাহনি দেখেই তিনি দ্রুত কথা ধরে ফেললেন,
“নাসিমুল সাহেব, আজকাল কার জন্য কে জীবন বাজি রাখে বলুন তো? সেখানে আমার ছেলের বউ, আমার ছেলেকে ভালোবেসে নিজের জীবন বাজি রেখে তাকে বাঁচিয়েছে। তাহলে ভেবে দেখুন, ভাগ্য কার খুলেছে?”
আহাদ নিজের বাবার দিকে তাকাল। তার দৃষ্টি শীতল, এই মূহুর্তে আর তার বাবার প্রতি তার ঈর্ষা কাজ করছে না। কারন তার বাবা প্রকাশ্যে, ভরা সভায় তার প্রেয়সীকে সম্মান দিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলেন। শেমলি আফসানা হাসিমুখে বললেন,
“আসলেই, মন্ত্রী সাহেব। আপনি অনেক লাকি। আপনাদের দুজনের জীবনের পথটা সুন্দর হোক। আমাদের দোয়া রইল।”
আহাদ রাজা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পরল। কাঁচের টেবিলে দু’হাতে ভর দিয়ে একটু ঝুঁকে বলল,
“দোয়া করবেন অবশ্যই। সাথে একটু মন্ত্র টন্ত্র পড়েও ফুঁ টু দিয়ে দিবেন। কারন আসেপাশে তো আর বদনজড়ের অভাব নেই।”
শেষ কথাটা বলে নাসিমুল গণির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। টেবিল থেকে ফোনটা তুলে সে ঝড়ের বেগে কনফারেন্স রুম থেকে বেরিয়ে গেল। শাহীনও দ্রুত তার পিছু নিল।
রিদিতা এই মূহুর্তে বসে আছে আফরোজা শেখের বিশালকায় বেডরুমের মাঝ বরাবর রাখা কিং সাইজের বিছানার এক কোনে। বিছানা জুড়ে ছড়িয়ে রাখা নানা ডিজাইনের গহনার বাক্স। রিদিতা গয়নার এই আলোকময় বিশৃঙ্খলার দিকে তাকিয়েও পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পারছে না। তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছে পাশে বসা আহিয়ার দিকে। গতকাল সন্ধ্যার পর আহিয়ার সাথে তার ঠিকমতো দেখাও হয়নি, কথা হয়নি। এখন আহিয়াকে দেখে মনে হচ্ছে, সে এখানে বসে আছে ঠিকই তবে কেমন আনমনষ্ক হয়ে আছে। রিদিতা চুপিচুপি আনিকা আর নীলাকে আসার জন্য অনুরোধ করেছে। আহিয়ার হঠাৎ এই অদ্ভুত অবসন্নতা রিদির মনে একটা সন্দেহ তৈরি হয়েছে। সে ভিতরে ভিতরে যেটা ভাবছে সেটা সত্যি কিনা তা জানতেই হবে। না জানা পর্যন্ত সে শান্ত হতে পারবে না। রিদির চিন্তার ঘোর কাটে আফরোজা শেখের গম্ভীর মাতৃসুলভ কণ্ঠস্বরে। তিনি বিছানা থেকে একটা নেভি ব্লু মখমলের বক্স তুলে রিদির দিকে বাড়িয়ে দিলেন,
“রিদিতা, তোমাকে এটা দেখাতে চাচ্ছিলাম। পছন্দ হয় কি না দেখো তো! গতমাসে জার্মানি থেকে আনিয়েছি। ডিজাইনটা সিলেক্ট করতে আমাকে যে কতখানি খাটতে হয়েছে, বলোই না।”
রিদিতা ধীরে বক্সটা হাতে নিয়ে খুলতেই লাইটের আলো চিকচিক করে উঠল। এক সেকেন্ড চোখ বন্ধ রেখে আবার খুলে দেখল। একটা ডায়মন্ডের লকেট। ঝিনুকের আকারে তৈরি, দুই পাশই খোলা। উপরে সাদা ছোট ছোট স্টোনের কাজ আর সেই ঝিনুকের ভেতরে বসানো আছে A লেটার, তার উপরও ছোট ছোট স্টন বসানো। আর নিচে দুলছে একখানি নিখুঁত সাদা পার্ল। রিদিতা লকেটটায় আঙুল ছুঁইয়ে বলে ওঠে,
“অনেক সুন্দর!”
আফরোজা শেখ একটু কড়া গলায় বললেন,
“শুধু সুন্দর বলে দেখলেই হবে? যার এনেছি তার গলায় সুন্দর লাগছে কি না দেখতে হবে না? দেখি হালিমা ওকে এটা পরিয়ে দাও তো! থাক আমিই দিচ্ছি।”
তিনি নিজেই রিদির ঘাড়ের চুলগুলো সরিয়ে আলতো করে তার গলায় পড়িয়ে দিলেন। রিদিতার ফর্সা ত্বকে যেনো লকেটটা আরো উজ্জলভাবে চিকচিক করে উঠল। আফরোজা শেখ রিদিতার চিবুক তুলে মৃদু স্বরে বললেন,
“মাশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ! খুব মানিয়েছে তাইনা হালিমা? আমার কষ্ট তাহলে সার্থক হলো।”
“হ্যাঁ, আপা। ঠিকই বলেছো, কি সুন্দর লাগছে তোমার ছেলের বউকে। আহিয়া দেখ। এই আহি!”
হালিমা বেগমের ডাকে আহিয়ার ধ্যান ভাঙ্গল। সে মাথা তুলে তাকিয়ে ক্ষীণ কিন্তু আন্তরিক হাসি দিয়ে বলে,
“বাহ! তোকে খুব সুন্দর লাগছে রিদি। তুই জানিস, এটা আম্মু নিজে ডিজাইন এঁকে বড় আব্বুর কাছে পাঠিয়েছিল। এখন মনে হচ্ছে আম্মুর পুরো পরিশ্রমটাই সার্থক।”
“এটা আম্মা নিজে ডিজাইন করেছে?”
রিদিতা কৌতহলে জানতে চায়। হালিমা বেগম মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ জানায়। রিদিতা একবার তাকায় আফরোজা শেখের দিকে। এই নারীকে সে যতবার দেখছে ততবারই তার মনে প্রশ্ন জাগছে। একজন মানুষের মধ্যে এত গুণ, এত রুচি, এত নিখুঁততা কেমন করে জমে থাকে? এমন সময় সেখানে এসে হাজির হয় আনিকা আর নীলা। তাদের দেখেই রিদি আবেগ আপ্লুত হয়ে পরে। কতদিন তার বান্ধবিদের সাথে দেখা হয়নি! বিশেষ করে নীলার সাথে অনেকদিন দেখা হয়নি। রিদিতা ছুটে যেতেই নীলা আর আনিকা একসাথে তাকে জড়িয়ে ধরল। আহিয়াও এবার উঠে এসে যোগ দিল। যদিও তার মন ভালো নেই, কিন্তু এই মূহুর্তটা থেকে সে বঞ্চিত হতে চায় না। আফরোজা শেখ নিজের ব্যাগ, কোর্ট, ফাইলপত্র গুছিয়ে নিতে নিতে বললেন,
“হালিমা, আমি বেরোচ্ছি। জরুরি কেস পড়েছে। ফিরতে দেরি হতে পারে। তুমি গয়নাগুলো সব গুছিয়ে রিদির রুমে লকারে রেখে দিও। ও ছোট এখনো, সব বুঝবে না।”
“আচ্ছা আপা। তুমি চিন্তা করো না।”
আফরোজা শেখে মেয়েদের মাথায় হাত বুলিয়ে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে যায়। হালিমা বেগমও রিতুকে সাথে নিয়ে বিছানার উপর ছড়িয়ে থাকা গয়নাগুলো গুছোতে শুরু করেন। এখন সেই রুমের ভেতর কেবল তারা চার বান্ধবী। রিদিতা গলায় ঝুলন্ত ঝিনুকের লকেটটা সামান্য ছুঁয়ে দেখল, তারপর চোখের ইশারায় আনিকা আর নীলাকে ডাক দিল। ইশারা দেখেই দুজন বুঝে গেল কথাটা সিরিয়াস। নীলা এক ঝলক তাকায় আহিয়ার দিকে। আহিয়া বসে বসে নিজের জামার চুমকি খুঁটছে। নীলা ধীরে ধীরে তার বাহুতে হাত রাখল।কণ্ঠটা কোমল করে বলল,
“এই আহি… কি হয়েছে তোর?”
আহিয়া মৃদু মাথা নাড়িয়ে সেই একই উওর দিল, “কিছু না।”
“কিছুনা বললেই হলো। তুই তো কখন এমন ছিলি না! তাহলে হঠাৎ করে কি হয়েছে বল না?”
“বললাম তো কিছু না। তোরা কেন বারবার একই কথা জিজ্ঞেস করিস? রিদিকেও কতবার বলেছি আমি! তবুও তোরা… আমার ভালো লাগে না নীলা। কিছুই ভালো লাগে না।”
আহিয়ার এক নাগাড়ে বলা কথাগুলোর মধ্যে অনেক কিছু ছিল। যা আহিয়া প্রকাশ করতে ব্যার্থ। আনিকা শান্তনা দিতে বলল,
“ঠিক আছে। চল, আমরা কোথাও থেকে ঘুড়ে আসি ওই দিনের মত। তাহলে নীলার মত তোরও সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“উহুম। যাব না, শরীর ভালো লাগছে না।”
নীলা এবার একটু ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
“তাহলে চল কোন গেম খেলি। খেলতে খেলতে মনটা রিফ্রেশ হয়ে যেতে পারে।”
“কি গেম?”
রিদতা জিজ্ঞেস করতেই, আনিকা বলল,
“চল, প্রথম দিনের মতো ট্রুথ অর ডেয়ার খেলি।”
রিদিতা আর নীলা দুজনেই একসাথে চেঁচিয়ে উঠল,
“মোটেও না!”
আনিকার সাথে সাথে আহিয়াও ওদের দিকে তাকাল। রিদিতার যথেষ্ট কারন আছে এই গেম না খেলার পিছনে। কিন্তু নীলা নাকোচ করল কেন বুঝতে পারল না। উল্টে আর কেউ কিছু জিজ্ঞেসও করেনি। আনিকা আবার বলল,
“তাহলে কি খেলা যায়?”
নীলা ভ্রু নাচিয়ে বলল, “লুডু খেলবি?”
এতে তিনজনই রাজি হয়ে গেল। চারজন মিলে হলঘরে চলে আসে। ছোট্ট টি-টেবিলের ওপর লুডুর বোর্ড রাখা হলো। চারদিকে বালিশ ফেলে সবাই বসে গেল মেঝেতে গোল হয়ে। এরপর বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলল তাদের খেলা। মাঝে মাঝে হালিমা বেগম আর বানি এসে ওদের এটা সেটা দিয়ে যায়। প্রথমে জুস, এরপর চিপস, ফ্রান্সফ্রাই, পপকর্ন। সব মিলেয়ে বেশ জমেছে তাদের খেলা!
সময় গড়িয়েছে অনেকটা। তখনই তানভীর আর আদিল আসে বাহিরে থেকে। দুজনের মধ্যে ভালই জমেছে। সকাল সকাল তানভীর আদিলের সাথে রাইডে গিয়েছিল। এরপর বন্ধুদের সাথে আড্ডাবাজি শেষ করে কেবল ফিরেছে। এসেই দুজনে হলঘরের সোফায় ধপাস করে বসল। সোফায় বসতেই আদিল আহিয়ার মাথায় স্বভাবসুলভ একটা টোকা দিল। অন্যদিন হলে আহিয়া অবশ্যই চেঁচিয়ে উঠত, কিন্তু আজ আর আগের মত প্রতিক্রিয়া দেখাল না। কারনটা সহজ, তানভীর! তানভীরকে দেখে আহিয়া নিজের মধ্যে গুটিয়ে গেছে। গতকাল আদনানের বিস্ফারন তো তানভীরকে ঘিরেই হয়েছে। তাই আজকে সে তানভীরকে এড়িয়ে গেল। তানভীর এতক্ষণ নীলাকে খেয়ল করেনি। এখানে সবাই চেনা হলেও নীলা তার কাছে অচেনা। সে হুড়মুড়িয়ে রিদির পাশে বসে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“এই ডানা-কাটা পরিডা কেডা রে? আগে তো দেখি নাই!”
“নীলা। আমার বান্ধবি।”
“ওয়াও! তার মানে নীল পরি! আমার সাথে সেটিং করায়া দেনা। জোড়া লেগে যাই। আর কতকাল একা একা থাকব।”
রিদি চোখ রাঙিয়ে তাকাল। কাল আহিয়াকে দেখেই যার মন গেছিল আজ সে নীলার পেছনে! রিদি জানত এই বাদরটা এখানে থাকলে কিছু কিছু না কিছু করবেই। রিদি তানভীরের দিকে ঝুঁকে দাঁত কামড়ে ফিসফিস করল,
“তোর মতো লেজকাটা বান্দরের সাথে নীলা কখনো কথাও বলবে না। সেটিং তো দূরের কথা।”
তানভীর বুক ফুলিয়ে গর্বের সাথে উত্তর দিল,
“দেখ, আমারে অপমান করবি না। লেজকাটা বান্দর আমি-ই এক পিস। এই গ্রহে তানভীর আহমেদ একটাই আছে! ঠিক আছে, তোর কিছু করতে হবে না। আমি নিজেই নিজের ব্যাবস্থা করে নিব!”
এই বলে সে নিজের শার্টের কলার ঠিক করে গিয়ে নীলার পাশেই বসে পড়ল। এতে নীলা একটু অস্বস্তিতে আহিয়ার দিকে চেপে বসল। রিদি একটু ধমকে উঠল,
“সমস্যা কী তোর? কোলে উঠে বসবি নাকি?”
তানভীর নীলার দিকে ইশারা করে বলল,
“উনি কোলে নিলে আমি উইঠা বসমু। আমার সমস্যা নাই।”
“তানভীর!”
তানভীর চোখ পিটপিট করে তাকাল। রিদি কিছুটা বিরক্ত হলো বটে। কিন্তু আর কিছু বলতে পারল না। আহিয়ার বদলে এখন তাদের সাথে খেলায় যোগ দিল তানভীর। এবার তারা সাপ লুডু খেলছে। প্রতকেবার চাল চালার আগে তানভীরের সাথে ঠোকনা ঠুকনি হচ্ছে। এবারও তার ব্যাতিক্রম হলো না। রিদি গুটি উপরে তোলার সাথে সাথে তানভীর চেঁচিয়ে উঠল,
“এইটা উপরে উঠল কেমনে? এইটা এখানেই থাকবে!”
“আজব! এটা মই বেয়ে উপরে উঠছে।”
“মই দিয়া উপরে কেমনে উঠে? এইটার কি হাত-পা আছে?”
“এইটার নাই তো কি হয়েছে? আমার তো আছে।”
“তাইলে তুই উঠ। গুটি উঠবে না।”
রিদি বিরক্ত হয়ে বলল, “খেলব না আমি!”
এই বলে রিদিও উঠে গিয়ে আহিয়ার পাশে বসল। সেই সময় হঠাৎ প্রধান ফটকের বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আহাদ রাজা বাহিরে থেকে হলঘরের মাঝমাঝি এসে দাঁড়াল। চোখে পড়ল হলঘরের পরিবেশটা কেমন রমরমা। সে আরেকটু এগিয়ে যেতেই অপ্রতাসিতভাবে চোখ পড়ল নীলার উপর। আহাদকে দেখেই নীলার মন কেঁপে উঠল। দীর্ঘদিনের চাপা ব্যথা, অনুভূতি, সব আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। এতকরে সব ভুলতে চাইছে, অথচ পারছে না! সে আড় চোখে আহাদকে দেখতে লাগল। যদিও এটা অন্যায়, তবে মন কি আর ন্যায় অন্যায় মানে?
আহাদ টের পেল নীলার দৃষ্টির গভীরতা। সে বিরক্তিতে কপাল গুছিয়ে নিল। দু’বাহু ঘুড়িয়ে পেশী টানটান করে তাকাল রিদির দিকে। তার কণ্ঠ কঠোর, গম্ভীর,
“রিদি উপরে আসো।”
এই বলে সে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। কিন্তু টের পেল রিদি একই জায়গায় বসে আছে। সে পা বাড়াতে বাড়াতে আবার ডেকে উঠল। আগের চেয়ে বেশি কড়া স্বরে,
“রিদিইই! উপরে আসো! দ্বিতীয়বার যেনো বলতে না হয়।”
রিদি সবার দিকে একবার তাকাল। নীলা নিজের বুকের ব্যথা লুকিয়ে ছোট্ট হাসি দিল,
“আমরা এখনি চলে যাব। তুই যা, না হলে আহাদ ভাই আবার রেগে যাবে।”
আনিকা নাটুকে ভঙ্গিতে বলল,
“যা যা, স্বামির সেবা কর! আফসোস! আমাদের স্বামী নাই, সেবাও নাই!”
“আমি আছি তো!”
লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৩৮
তানভীর চট করে দাঁড়িয়ে পরল আনিকার সামনে। রিদিতা চোখ গরম করে তাকাল। একটু আগেই না এই বান্দর নীলার সাথে সেটিং হতে চেয়েছে! এখন আবার আনিকা!
এমন সময় আবারও উপরে থেকে বজ্রপাতের মতো গর্জে উঠল আহাদের কণ্ঠ,
“রিদিইইই!”
আহাদ রাজার কন্ঠে রাগের ঝলক ছিল। রিদিতা চমকে উঠল। অস্থির, ছন্নছাড়া হয়ে দৌঁড়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। প্রতিটি ধাপ উঠতে উঠতে তার মাথায় শুধু একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে,
“আজ আবার কী নিয়ে রেগে আছে আমার মন্ত্রী মশাই?”
