Home লাল শাড়িতে প্রেয়সী লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪৬

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪৬

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪৬
Fatima Fariyal

রিদিতার শরীরের অদ্ভুত মেয়েলি সুগন্ধ আহাদের মস্তিষ্কে এক অচেনা ঝড় তুলে দিল। তার সমস্ত যুক্তিবোধ এলোমেলো হয়ে গেল। অজান্তেই সে রিদিতাকে আরও শক্ত করে নিজের বুকে চেপে ধরল। তার বাহুর বাঁধন শক্ত হলো। এতে রিদিতার নড়াচড়াও থেমে গেল। আশ্চর্য! কেউ এতো শক্তকরে জড়িয়ে ধরে? রিদিতার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।বাধ্য হয়ে মৃদু, কাঁপা কণ্ঠে বলল,

“আপনি কী সত্যি সত্যিই আমাকে মেরে ফেলবেন নাকি?”
আহাদ নির্দয় স্বরে বলল, “সন্দেহ আছে কোন?”
“আমি মরে গেলে,আপনি খুশি হবেন?”
আহাদের গলার স্বরটা ছিল ভয়ংকর রকমের স্থির,
“যদি বলি হ্যাঁ।”
রিদিতা ধীরে মাথা নাড়ল, “বিশ্বাস করি না।”
“কেন?”
“আপনি বলেছেন… আপনি আমাকে ভালোবাসেন।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“শুধু কী আমিই বাসি? তুমি বাসো না? অবশ্য.. এটাও ঠিক। ভালোবাসলে তো আর আমাকে ছেড়ে যেতে না।”
রিদিতা তার বুকের ওপর ভারী করে নিশ্বাস ছাড়ল। অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে কাঁপা গলায় বলল,
“সরি.. ভুল হয়ে গেছে। মৃ’ত্যু ছাড়া আর কখনো ছেড়ে যাব না।”
আহাদ হঠাৎ করেই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“ভুল যখন করেছো, তখন শাস্তি তো পেতেই হবে। কান ধরো। তেরো ঘণ্টা আমাকে হয়রানি করেছো, তেরোবার কান ধরে উঠবস করো।”
রিদিতা অবাক হয়ে ফট করে মাথাটা তুলে তাকাল তার দিকে।
“এইভাবে তাকিয়ে কী দেখছো? আমি কী বলেছি শুনতে পাওনি?”
ভ্রু উঁচিয়ে বলল আহাদ। রিদিতা ঠোঁট ফুলিয়ে শিশুসুলভ ভঙ্গিতে বলল, “পেয়েছি তো।”
“তাহলে দাঁড়িয়ে আছো কেন?”

একটা শুকনো ঢোক গিলল রিদিতা। অতঃপর বলল,
“ভুল তো আমি একা করিনি। আপনিও করেছেন। আমার সাথে রুডলি কথা বলেছেন। কান তো আপনার ধরা উচিত। তাছাড়া…. বিয়ের সময়ের শর্তটা মনে আছে তো? বাহাত্তরবার ধরতে হবে কিন্তু!”
আহাদ রাজার ভ্রু কুচঁকে তাকাল তার প্রেয়সীর দিকে। স্পষ্ট মনে পরে গেল সেই শর্তটা। রিদিতা সুযোগ বুঝে আবার বলল,
“আপনার কষ্ট হলে একবারে করার দরকার নাই। প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে দশবার উঠবস করলেই হবে।”
আহাদ রাজা এক ধাপ এগোতেই রিদিতা স্বাভাবিকভাবেই এক পা পিছিয়ে গেল। আহাদ ব্যঙ্গাত্মক হাসি হেসে নিজের বুকে তর্জনী ঠেকিয়ে বলল,

“তোমার সাহস তো কম না। আহাদ রাজাকে কান ধরতে বলছো? আহাদ রাজাকে?”
রিদিতা জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ইতস্তত করল,
“না… আমি তো আমার বিবাহিত স্বামীকেই বলেছি।”
“আচ্ছা?”
ভ্রু তুলে জিজ্ঞেস করল আহাদ। রিদিতা উপর নিচ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। আহাদ ধীরে ধীরে তার এগোতে লাগল দিকে,

“স্বামী বলে যখন আবদার করছেন… তখন আমার আচরনটাও তো তেমনই করা উচিত! কী বলেন, রি দি রানি?”
রিদিতার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। এক ছুট লাগাল বারান্দার দিকে। সে আহাদ রাজার মনোভাব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে। পালানোই একমাত্র উপায়! কথায় আছে না! নিজে বাঁচলে বাপের নাম। কিন্তু বেশি একটা লাভ হলো না। আহাদ রাজা পিছন থেকে গিয়ে তার কোমর জড়িয়ে ধরেছে। তার শক্ত বাহুতে আটকে গেল রিদিতা। থুঁতনি এসে ঠেকল তার ঘাড়ে। বাইরে তখনও ঝুম বৃষ্টি। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। প্রকৃতিতে ঠাণ্ডা শীতলতা বইছে। অথচ আহাদের তপ্ত নিশ্বাস আর রিদিতার উন্মুক্ত উদরে তার হাতের স্পর্শে শরীরের ভেতর আগুন জ্বলে উঠছে।
আহাদ এবার তার ঘাড়ে নাক ঘঁষে হেস্কি স্বরে ডাকল,

“রিদি!”
রিদিতা কন্ঠ কাঁপিয়ে জবাব দিল, “হুম।”
“আমার ঠাণ্ডা লাগছে। চলো, ভিতরে যাই।”
“আমি.. যাব না। আপনি খারাপ।”
“বেশি খারাপ?”
সেদিনের কথা মনে পড়তেই রিদিতার চোখ বড় হয়ে গেল। কথা ঘুড়িয়ে নিয়ে বলল,
“ন.. না। ভালো।”
আহাদ রাজা মৃদু হাসল, “বেশি ভালো?”
রিদিতা মাথা নেড়ে জানাল, “হ্যাঁ।”
আহাদর তার প্রেয়সীর বন্ধ চোখের পাতায় দুটো নরম চুমু রেখে, নেশাগ্রস্ত কণ্ঠে বলল,

“আমার যে এত ভালো পোষায় না জানু! আমি খারাপ হতে চাই। অনেক বেশি খারাপ হতে চাই।”
আজ আর কোনো ভনিতা করল না রিদিতা। নিঃশব্দে আত্মসমর্পণ করল তার মন্ত্রী মশাইয়ের কাছে। অবচেতনে শরীর হেলে পড়ল আহাদের দিকে। আহাদ দু’হাতে তার প্রেয়সীকে সামলে নিল। তারপর অনায়াসে কোলে তুলে নিল। পাঁজাকোল করেই ভেতরের ঘরের দিকে পা বাড়াল।
বাইরে তখন বৃষ্টির মাত্রা আরও বেড়ে গেছে। বাতাস আর বৃষ্টির মধ্যে অদ্ভুত এক রেশারেশি চলছে। ঠিক যেমনটা চলছে, ঘরের ভিতরের দু’টি হৃদয়ের মাঝখানে।

সকাল সকাল সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে কারোর সাথে ধাক্কা লেগে ভারসাম্য হারিয়ে ছিটকে পড়ল আদিল। চোখ-মুখ কুঁচকে এল তীব্র ব্যথায়। রাগে দাঁত কামড়ে চোখ বন্ধ করে রইল কয়েক সেকেন্ড। মনে মনে গজগজ করতে করতে চোখ খুলল সে। চোখ খুলেই যা দেখল, তাতে ব্যথার থেকেও রাগটা বেশি জ্বলে উঠল। তার সামনে দাঁড়িয়ে একটা মেয়ে হাসছে। আদিল তখনও জেরিনকে চিনেনা। তাই তার জন্য জেরিন অচেনা একটা মেয়ে। আদিল একেবারে রেগে মেগে আগুন। একে তো তাকে ফেলে দিয়েছে তার উপর আবার দাঁত কেলিয়ে হাসছে। ভারি বেয়াদপ মেয়ে তো!
আদিল উঠার চেষ্টা করল, আচমকা আবারও মেঝেতে পা পিছলে ধপাস করে পরল। এবার তো মেয়েটার হাসির শব্দ আরো দিগুন বেড়ে গেল, সাথে যোগ হল আহিয়া আর আদিবা। আদিল নিজেকে সামলে অবশেষে উঠে দাঁড়াল। জামা ঝাড়তে ঝাড়তেই দাঁত কিঁড়মিঁড় করে চেঁচিয়ে উঠল,

“এই মেয়ে এই! কে তুমি হে? আমার বাড়িতে এসে আমাকে ফেলে দিয়ে আবার পেত্নীর মতো দাঁত কেলিয়ে হাসছো? সাহস তো কম না তোমার?”
এই কথার সাথে সাথেই জেরিনের হাসি মিলিয়ে গেল। চোখের দুষ্টুমি সরে গিয়ে জায়গা নিল খাঁটি রাগ। গাল দুটো লাল হয়ে উঠল। সে একদম আদিলেী সামনে এসে দাঁড়াল, চোখে চোখ রেখে বলল,
“আমি পেত্নী?”
এক সেকেন্ড থেমে ঠোঁট বাঁকিয়ে যোগ করল,
“নিজেকে আয়নায় দেখেছো? দেখতে তো একদম রাম ছাগলের মতো, আবার বড় বড় কথা বলতে এসেছে!”
আদিলের চোখ কপালে উঠল

“আমি রাম ছাগল?”
“হ্যাঁ, অবশ্যই। তার থেকে কোনো অংশ কম না।”
ব্যঙ্গাত্মক হাসি টেনে বলল আদিল,
“তা রাম ছাগলের বাড়িতে আপনার কী কাজ? কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন?”
“জার্মান থেকে উড়ে এসেছি। তবে এটা রাম ছাগলের আরদখানা জানলে কখনই আসতাম না।”
“কি বললে তুমি..”
আদিল রেগে এক পা এগিয়ে যেতেই, তাদের মাঝখানে বাঁধ সেজে দাঁড়াল আহিয়া।
“আদি! কী সমস্যা তোর? জেরিন আদনান ভাইয়ের মামাত বোন, বেড়াতে এসেছে। আমার সাথে যা করার কর, ওর সাথে অত্যন্ত সুন্দর করে কথা বল।”
এই কথাটা আদিলের কানে গেল, কিন্তু মাথায় ঢুকল না।
সে বাঁকা হেসে ব্যাঙ্গ করে বলল,
“কি? জেরি? ওই টম আর জেরির, সেই জেরি? এই জন্যই বলি, চেহারার এত মিল কেন? ইঁদুর ইঁদুর একটা ভাব আছে।”

আহিয়া বিরক্ত হয়ে চোখ উল্টে বলল, “ও যদি জেরি হয়, তুইও টমের থেকে কম না।”
তাদের এই তর্কাতর্কি মাঝখানে হঠাৎ আমজাদ মীরের কড়া কন্ঠ ফেটে পরল,
“সকাল সকাল এসব তামাশা না করলে কী তোমাদের হয় না? চুপচাপ খাবার টেবিলে এসে বস।”

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪৫

এক মূহুর্তেই তিনজন চুপসে যায়। আহিয়া দ্রুত এসে নিজের চেয়ারে বসে পড়ে। জেরিন যাওয়ার আগে আদিলের দিকে তাকিয়ে একটা দারুণ ভেংচি কাটল,। তারপর এসে আহিয়ার পাশে বসল। আদিল জায়গাতেই দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভেতর রাগ গুমরে উঠছে। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল,
“এই জেরির জীবন যদি আমি তামা তামা না করি। তাহলে আমার নামও আদিল মীর না।”

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪৭