লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫০
Fatima Fariyal
ডেমো ঘরের মাঝখানে রাখা পুরোনো কাঠের টেবিলটার উপর আহাদ রাজা দুই পা তুলে হেলান দিয়ে বসে আছে। চেয়ারটা একটু কাত হয়ে আছে, কিন্তু তাতে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। মুখে চরম নির্লিপ্ত ভাব, যেন চারপাশে কী হচ্ছে, তার সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই। এক হাতে হাওয়াই মিঠাইয়ের প্যাকেট, খুব মনোযোগ দিয়ে খাচ্ছে। দেখে মনে হয় এটা কোনো গুরুতর দায়িত্ব পালন করছে। তার পাশেই বিশাল একটা হাওয়াই মিঠাইয়ের স্ট্যান্ড হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শাহীন। কতগুলো প্যাকেট যে ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে, তার হিসাব নেই। স্ট্যান্ডটা ধীরে ধীরে ফাকা হয়ে আসছে।
একটু সামনে ডেমো ঘরের মেঝেতে, বুক ডাউন দিচ্ছে নাদিম আর শাওন। কিন্তু এটা কোনো শরীরচর্চা বা যোগব্যায়াম না। এটা আহাদ রাজার দেওয়া শাস্তি। দুইশো দুই বার বুক ডাউন। একবারও থামা যাবে না। শ্বাস নিতে গিয়ে যদি এক সেকেন্ড দেরি হয়, তাহলে কাউন্ট আবার শূন্য থেকে শুরু। সবে মাত্র চল্লিশটা দিয়েছে। তাতেই দুজনের অবস্থা করুণ। বুক ধপধপ করছে, হাত কাঁপছে, কপাল ভিজে একাকার। হাঁপাতে হাঁপাতে মনে হচ্ছে এখানেই বুঝি দম বের হয়ে যাবে। বাকিটা করা যে অসম্ভব, সেটা ওরাও ভালোই বুঝে গেছে। এর মধ্যেই ডেমো ঘরের ছোটখাটো যত রকমের ডেমো আছে তার বেশিরভাগই তাদের উপর প্রয়োগ হয়ে গেছে। কত অনুনয়, কত মিনতি, কিছুই কাজে আসেনি। উল্টো বোনাস হিসেবে শাহীনের হাত থেকে দুইটা করে থাপ্পড়ও খেতে হয়েছে। কারণ খুব সোজা! শাহীনের গালে আহাদ রাজা দুইটা থাপ্পড় বসিয়েছিল, আর সেটাই সুদে-আসলে ফেরত দিয়েছে শাহীন।
দুজনের শরীর আর চলছিল না। প্রায় থেমে যাওয়ার উপক্রম। ঠিক তখনই ডেমো ঘরের নীরবতা ফাটিয়ে গর্জে উঠল আহাদের কণ্ঠ,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“থামলি কেন? এবার কিন্তু শাস্তি ডাবল করে দিবো তোদের!
নাদিম হাঁপাতে হাঁপাতে, ঘন ঘন নিশ্বাস নিয়ে কাঁপা গলায় বলল,
“ভাই… এবারের মতো আমারে মাফ কইরা দেন। সব দোষ শাওনের। আমি তো আপনারে কল করতে চাইছিলাম। এই শাওনের বাচ্চা আমার ফোন নিয়া গেছে। বিশ্বাস করেন ভাই, আমি একদম নির্দোষ, মাসুম, নাদান।”
শাহীন ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,
“হ। তুমি তো পিঠার খাও। কচি খোকা তুমি।”
পাশ থেকে শাওন ব্যঙ্গাত্মক সুরে ফোঁস করে বলে উঠল,
“একদম! দুধের শিশু। এখনো বোতল ছাড়া ঘুমায় না।”
এই কথা শুনেই নাদিমের মাথায় যেন আগুন ধরে গেল।
“শালা! তুই চুপ কর। তোর জন্যই আমার এই হালত। মন চায় তোরে একটা উষ্ঠা মাইরা নর্দমায় ফালায়া দেই।”
শাওন দাঁত বের করে হেসে পাল্টা বলল,
“তোর কি মনে হয় আমি বসে বসে তোর উষ্ঠা খামু? আমিও তোরে গোল্লাছুটের মতো এক লাথি দিয়া উগান্ডা পাঠায়া দিমু।”
“আমি তোরে আফ্রিকার জঙ্গলে নিয়া ফালামু!”
“আর আমি তোরে আফ্রিকার গরুর খামারের গোবরের ডোবায়!”
“শাওন! তোরে কিন্তু আমি সত্যি সত্যি লাথি মারমু!”
“সেম টু ইউ!”
ঠিক তখনই আহাদ পা নামিয়ে সোজা হয়ে বসল। চোখে ভয়ংকর আগুন।
“থাপ্পড়ায়া চেহারার নকশা পাল্টায়া দিব একেকটার। তোদের সাহস দেখে আমি অবাক হইতেছি। আমার খেয়ে, আমার পড়ে, আমার পিছনে ছুড়ি মারলি! দুধ-কলা দিয়ে কাল সাপ পুষছি এতদিন। নিমকহারাম কতগুলো!”
আহাদের গর্জনে দুজনেই থমকে গেল। বুঝে গেল, এবার সত্যিই সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আহাদ এমনিতেই ভয়ানক মেজাজে আছে। তার উপর বউ তাকে বাড়িতে ঢুকতে দিচ্ছে না। আবেগের বসে কসম খেয়ে এখন নিজেই গেরাকলে আটকে গেছে। আগে জানলে জীবনেও এমন কসম দিত না।
“শাহীন!” আহাদ কঠিন স্বর।
“এই দুইটারে নিয়া বরফ থেরাপি দে। ডেমো যেন একটাও বাকি না থাকে। না হইলে কিন্তু তোর জায়গাও ওদের পাশে হবে।”
শাহীনের চোখ চকচক করে উঠল। যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। না, বরং মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। অনেকদিনের শখ ছিল এই দুই গর্দভকে নিজের মতো করে ডেমো দেওয়ার। আজ সেই স্বপ্ন পূরণ। সে লাফিয়ে উঠল।
“ঠিক আছে ভাই। নো টেনশন। ডু ফুর্তি। আজ দেখাবো ওদের কুকীর্তি। আপনি যান, হাওয়াই মিঠাই খান আর ভাবির রাগ ভাঙ্গান।”
আহাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“তোর ভাবি অনেক রেগে আছে। এত সহজে আল্লাহর বান্দির রাগ ভাঙ্গবে না।”
শাহীন হালকা হেসে বলল,
“কি যে বলেন ভাই! আপনার মন তো হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো। এই হাওয়াই মিঠাই আর আপনাকে দেখলে ভাবির রাগও গলে যাবে হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো।”
“বলছিস?”
ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল আহাদ।
“হ ভাই। আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর।”
এই কথায় কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে আহাদ হাওয়াই মিঠাইয়ের লম্বা স্ট্যান্ড কাঁধে তুলে ডেমো ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
পিছনে থেকে শাহীন বাঁকা হাসি হেসে তাকাল নাদিম আর শাওনের দিকে। কিছু বোঝার আগেই দুজন একসাথে তেড়ে এসে চেঁচিয়ে উঠল,
“শাহীনের বাচ্চা! তোর একদিন আমাদের যতদিন লাগে!”
শাহীন সেটা দেখেই উল্টো ঘুরে দৌড় দিল। আর নাদিম-শাওন প্রাণপণে তার পিছু নিল। ডেমো ঘর ভরে উঠল দৌড়ঝাঁপ আর চেঁচামেচিতে।
ভর দুপুর। সূর্যটা ঠিক মাথার উপরেই আছে, অথচ তার তাপটা আজ অদ্ভুতভাবে নিস্তেজ। আকাশজুড়ে মলিন, ধোঁয়াটে মেঘের পাতলা আচ্ছাদন। না কালো, না সাদা। ঠিক যেমন নীলার ভেতরের আবেগগুলোর মতো। তীব্র নয়, আবার হালকাও নয়। চাপা পড়ে আছে এক অদ্ভুত ভারী স্তব্ধতায়। নীলা ধীরে ধীরে বাসার ভেতরে ঢোকে। প্রতিটা পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়, ভাঙা কাঁচের উপর হাঁটছে। বুকের ভেতরটা ফাঁকা, অথচ সেই ফাঁকাটাই অসহনীয়ভাবে ভারী। তাকে দেখেই ছুটে এলো পরিচারিকা রেশমা। চোখে-মুখে স্বাভাবিক চিন্তার ছাঁপ।
“কি হইছে নীলা মা? তুমি এতো তাড়াতাড়ি চইলা আইছো? তোমার শরীর কি খারাপ?”
রেশমার কণ্ঠে দুশ্চিন্তা। নীলা কোনো উত্তর দিল না। একবার চারপাশে তাকাল। এই বিশাল বাড়ি, চকচকে আসবাব, দামি সাজসজ্জা সব আছে, শুধু মানুষ নেই। গলা পরিষ্কার করে বলল,
“না খালা… এমনিই ক্লাস ছিল না। তাই চলে আসছি। পাপা আসে নাই?”
প্রশ্নটা শুনেই রেশমার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। প্রতিদিনের একই প্রশ্ন, আর প্রতিদিনের একই উত্তর। তার বুকের ভেতরটা কেমন খচখচ করে ওঠে। জীবনে কত রকম মানুষ দেখেছে সে। টাকার পাহাড় গড়ে, কিন্তু সন্তানের দিকে তাকানোর সময় নেই। সেই সন্তানরা হয় অবাধ্য, উগ্র, নয়তো নিষ্ঠুর। অথচ নীলা… নীলা সম্পূর্ণ আলাদা। ভদ্র, সুশীল, নীরব। একাকীত্ব তাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে। যেন সে অদৃশ্য কোনো অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে। রেশমা দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে বলল,
“না মা, আসে নাই। তবে আজ সাহেব কল দিছিলো। তোমারেও নাকি কল দিছিলো, কিন্তু পাই নাই। তাই বাসার লাইনে ফোন দিয়া তোমার কথা জিগাইছে।”
নীলা ক্ষীণ করে হাসল। হাসিটা হাসির মতো নয়, ভাঙা কাচের ওপর আঁচড়ের মতো।
“আর মাম্মা?”
রেশমা একটু থেমে বলল,
“ম্যাম সাহেব কইছে, হের আইতে আরো ছয়-সাত দিন লাগবো। মেলা ব্যস্ত। কোনো ফ্যাশনের শো আছে নাকি এইসব কইল।”
“ঠিক আছে খালা।” নীলার কণ্ঠে কোনো অভিমান নেই, শুধু ক্লান্তি।
“আমি উপরে গেলাম। কিছু লাগলে ডাকবেন।”
“আইচ্ছা মা।”
নীলা সিঁড়ি ভেঙে নিজের রুমে চলে গেল। দরজা বন্ধ করতেই যেন চারপাশটা আরও নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ব্যাগটা বিছানার উপর ছুড়ে দিয়ে সে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। সাদা ছাদটা কেমন যেন চেপে ধরছে তাকে। বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুকনা আর ধরে রাখতে পারল না। কাঁপা হাতে ফোন তুলে ডায়াল করল। রিং হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই কল রিসিভ হলো।
“পা… পাপা…”
কথাটা শেষ করতে পারল না নীলা। ওপাশ থেকে ভেসে এলো খাইরুল বাসারের গম্ভীর অথচ চিন্তিত কণ্ঠ,
“কি হয়েছে মা? কোথায় ছিলে? আমি তোমাকে কল দিয়ে পেলাম না। রেশমা বলল তুমি নাকি আজকাল ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছো না। কি হয়েছে বাবু?”
এইটুকুতেই বাঁধ ভেঙে গেল। নীলার জমে থাকা আবেগ একসাথে আছড়ে পড়ল।
“পাপা…” হু হু করে কেঁদে উঠল।
“আমি আর পারছি না পাপা.. পারছি না। এতটা অসহায় কেন করছো তোমরা আমাকে? আমার জীবনের যদি কোনো মূল্যই না থাকে তোমাদের কাছে, তাহলে কেন আমাকে পৃথিবীতে আনলে? আমি তো আসতে চাইনি… আমি… আমি আর থাকতে চাই না এই পৃথিবীতে।।এই অসীম আকাশের নিচে আমার কেউ নেই পাপা… কেউ নেই। আমার কষ্ট হয়, খুব কষ্ট হয়। ঠিকমতো নিশ্বাস নিতে পারি না। চারদিকে শুধু অন্ধকার লাগে… সব বিষাদময়। আমাকে আশ্বাস দেওয়ার কেউ নেই। কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে বলে না ‘মা, শান্ত হও, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
নীলা কাঁদেই যাচ্ছে। তার কণ্ঠ ভেঙে ভেঙে আসছে।
“ঘড়ির কাঁটা গুনে গুনে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করি পাপা। কিন্তু দিন শেষে তোমরা কেউ আসো না। না মাম্মা, না তুমি। আমি ক্লান্ত পাপা… এই একাকীত্ব আমি আর বহন করতে পারছি না। আমি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি। একটু শান্তি চাই… মাম্মা আর তোমার কোলে মাথা রাখতে চাই। একটু শান্তনা চাই…”
মেয়ের কান্না শুনে খাইরুল বাসারের বুক কেঁপে উঠল। মনে হলো, কেউ তার কণ্ঠনালী চেপে ধরেছে। কথা বেরোচ্ছে না। এতদিনের অপরাধবোধ এক মুহূর্তে আছড়ে পড়ল তার উপর। তিনি মেয়েকে ভালোবাসেন। ভীষণ ভালোবাসেন।
সময় দিতে চান। কিন্তু কাজ, পরিস্থিতি, আর জীবনের জটিল হিসাব তাকে সেই সময়টা দিতে দেয় না। স্ত্রী নিলুফার সঙ্গে বিচ্ছেদের তিন মাস হয়ে গেছে। বিষয়টা নীলার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছেন। কেনই বা বিচ্ছেদ হবে না? টাকা-পয়সার অভাব নেই, কিন্তু নিলুফার কাছে কাজ, সাফল্য, দাপট সবকিছুই মেয়ের আগে। এই নিয়ে ঝগড়া, তর্ক, অবশেষে বিচ্ছেদ। শুধু একটাই শর্ত ছিল, নীলাকে কিছু জানানো যাবে না। কম্পমান গলায় খাইরুল বাসার বললেন,
“নীলা… সোনা মা আমার… তুমি শান্ত হও। একটু শান্ত হও কেমন? আমি… আমি আজ রাতের ফ্লাইটেই চলে আসবো। এখন থেকে তোমাকে আর একা রাখব না। নীলা… আমার ছোট্ট বাবু…”
“নীলা… নীলা মা…”
তিনি বারবার ডাকছেন। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো শব্দ নেই। কান্নার শব্দটাও নেই। না শ্বাসের শব্দ। এইবার খাইরুল বাসারের কণ্ঠে আতঙ্ক,
“নীলা?”
“বাবু, তুমি কি পাপার কথা শুনতে পাচ্ছো?”
কোনো উত্তর এল না। হাত কাঁপতে লাগল তার। দ্রুত কল কেটে বাসার ল্যান্ডলাইনে ফোন করলেন। রেশমা ধরতেই তিনি প্রায় চিৎকার করে বললেন,
লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪৯
“রেশমা, তাড়াতাড়ি উপরে যাও। এখনই। দেখ নীলার কি হয়েছে। ও কথা বলছে না। ওকে দেখে রাখ রেশমা, আমি আসছি। যত দ্রুত সম্ভব, আমি আসছি।”
ফোন রেখে রেশমা ঝড়ের বেগে সিঁড়ি ভাঙল। এই তো একটু আগেও নীলা ঠিক ছিল। তাহলে হঠাৎ করে…
কি এমন হয়ে গেল?
