লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৩
অহনা রহমান
হিয়া নিজের চুলগুলো এলোমেলো করে ফেললো। এমনিতে তো সব ঠিকই ছিলো। এলোমেলো করলো কারন, ওকে যেন দেখে বোঝা যায় যে ও ঘুমাচ্ছিলো। কি হয়েছে না হয়েছে ও কিছুই জানে না। এরপর হিয়া ধীরেধীরে গিয়ে দরজা খুললো। হিয়া এমন ভাব করলো, যেন ও ঘুমের কারনে চোখ খুলতেই পারছে না। দরজা খুলে নিজের বড় চাচা কামরুল হাসান কে দেখে হিয়া ভাঙা গলায় বলল,
“চাচ্চু তুমি এখানে? এতো রাতে? কিছু হয়েছে নাকি?”
কামরুল হাসান চিন্তিত গলায় বললেন,
“তোমার ঘর থেকে কিসের যেন আওয়াজ এলো। কিছু হয়েছে?”
হিয়া অবাক হলো। চোখদুটো বড় বড় করে বলল,
“কি বলছো চাচ্চু, আমার ঘর থেকে শব্দ? আমি তো লিছু শুনিইনি। হয়তো-বা বিড়াল কিছু ফেলে দিয়েছে।!
কামরুল হাসান মেনে নিলেন হিয়ার কথা। তিনি হিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“আচ্ছা ঠিক আছে আম্মু। যাও গিয়ে শুয়ে পরো। সাবধানে থেকো।”
কামরুল হাসান চলে গেলেন। তাতে হিয়া যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। বাবাহ ধরা পরলে আজ খবর ছিলো। একশোটা প্রশ্ন করতো নাহলেও। কেন জেগে আছো? কিভাবে ওটা ভাঙলো? কি হয়েছে? কেন হয়েছে? কখন হয়েছে? ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি…..
ও মাই গড! হিয়া এমনিতেই চিন্তায় চিন্তায় আধ-পাগলা হয়ে আছে। আর এতো প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে দেখা গেল কালই ওকে পাবনাতে ভর্তি করতে হলো। হিয়া দরজা আঁটকে দিয়ে, ধপ নিজের বিছানায় বসলো আবার। মনে মনে ইচ্ছে মতো গালি দিলো নাফিকে। সব দোষ ওই ব্যাটার। এসবের মাঝে হুট করে হিয়ার হুট করে মনে পরলো আরেকটি কথা। আচ্ছা, সে তো নাফিকে ভালোবাসার কথা বললো। কিন্তু সত্যি তো এটাই, সে নাফিকে ভালোবাসেনা। সে প্রতিশোধ নিতে নাফিকে ব্যবহার করছে। এটা করলে, রাজের সাথে আর তার সাথে তফাৎ থাকলো কই? সে ও তো প্রতিশোধের জন্য, আরেকটি মানুষকে ব্যবহার করবে।
একমুহূর্তে হিয়ার মাথা ব্লাঙ্ক হয়ে গেল। সে আবারও ধপাস করে শুয়ে পরলো বিছানায়। দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“হিয়ার বাচ্চা তুই এতো বলদ কেন? কুকুর কামড় দিলে তোকেও কি কুকুর কে কামড়াতে হবে?”
হিয়া দু’হাতে মাথা চেপে ধরলো। নাহ, কালই গিয়ে তার নাফিকে বলতে হবে___সে যা বলেছে সব একটা ডেয়ারের অংশ ছিলো। নাহলে সেও প্রতারকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। আর হিয়া কখনোই তা করবে না। তা হতে দেবে না। রাজকে শায়েস্তা করার অন্য কোনো উপায় সে ঠিক বের করবে। তবুও নাফিকে সে ঠকাতে পারবে না। হিয়া আর বিছানা ছেড়ে উঠলো না। গড়াগড়ি খেতে খেতে ঘুমিয়ে গেল একটা সময়।
হেলেনা জা দের সাথে সকালের নাস্তা তৈরি করছেন। সবার বড় হলেন_হামিদা, মেঝো_লাবনী, আর সবার ছোট_হেলেনা। তিন জা মিলে কাজ করছেন ও গল্প করছেন। কথার মাঝখানে হেলেনা বললেন,
“নতুন বেয়াইনকে দাওয়াত করবেন না?”
লাবনী ও হেলেনার কথার সাথে তাল মিলিয়ে বলল,
“আমিও এটা বলতে চাইছিলাম। রুহির শশুরবাড়িতে তো আর কেউ নেই। ওর শাশুড়ী আর ভাসুর ছাড়া। ওনাদেরকে একদিন দাওয়াত করলে ভালো হয় না?”
হামিদা বললেন,
“হ্যাঁ তোদের ভাইজানের সাথে কাল রাতেই কথা হলো আমার। আগামী সপ্তাহেই দাওয়াত দিবে।”
“তাই? তাহলে তো ভালোই হলো। শুনেছি রুহির শাশুড়ীটা নাকি অনেক ভালো।”
লাবনীর কথার উত্তরে হেলেনা বললেন,
“আমিও সেটাই শুনেছি। আসলে শিক্ষিত মানুষ তো! একটা কলেজে পড়ান ভাবা যায়?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ! একা হাতে ছেলে দুটোকে মানুষ করেছে। বড় ছেলেটা নাকি আবার মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকুরী করে।”
“আর আমাদের জামাই বাবাও তো হিয়ার ভার্সিটিতে পড়ে। কত বড় ভার্সিটি ওটা।”
মেয়ের শশুরবাড়ি নিয়ে দুই জা’য়ের গসিপ ভালোই লাগছে হামিদার। তিনিও কিছু বলতে নিচ্ছিলেন। কিন্তু তার আগেই ফোনটা বেজে উঠলো স্ব শব্দে। হামিদার ফোন ওনার পাশেই রাখা ছিলো। মধ্যবয়সী ভদ্রমহিলা হাতের রুটিটা কড়াইতে দিয়ে ফোনটা ধরলেন। রুহি কল করেছে। তিনি আপ্লূত হয়ে বললেন,
“কেমন আছো আম্মু? নতুন মাকে পেয়ে তো আমার কথা ভুলেই গেছো মনেহয়।”
ওপাশ থেকে কি বলা হলো, তা শোনা গেল না। হামিদা আরও কিছুক্ষণ কথা বললো। একপর্যায়ে বলে উঠলো,
“হিয়া? ও তো এই দু’দিন ভার্সিটিতেও যাচ্ছে না। কি হয়েছে কি জানি? আচ্ছা আমি তোমার ছোট মায়ের সাথে কথা বলে জানাচ্ছি।”
কল কেটে গেল। হামিদা হাস্যোজ্জ্বল মুখে লাবনী ও হেলেনাকে বললেন,
“আমার মেয়েটার ভাগ্য ভালো বুঝলি? কালকে রুহির ভাসুর, জামাই ও রুহিকে হানিমুনের জন্য সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে জানিস? ওরা শুক্রবার রওনা হবে।”
হামিদার কথা শুনে লাবনী ও হেলেনাও খুশি হলেন। বিয়ের পর মেয়েরা শশুর বাড়িতে ভালো থাকলে ভালোই লাগে। কিন্তু যদি শোনা হয়, একটা মেয়ে বিয়ের পর অশান্তিতে আছে তার চেয়ে কষ্টের বোধহয় আর কিছুই নেই। হামিদা আবারও বললেন,
“শোননা ছোটো। রুহি বলছিলো যে, হিয়া যদি ওর ওখানে থাকতো গিয়ে। রুহির তো অনেক গোছগাছ আছে, হিয়া যদি একটু হেল্প করতো।”
হেলেনা বললেন,
“হিয়া যেতে চাইলে আমার কোনো আপত্তি নেই। এমনিতেই মেয়েটা ঘরকুনো হয়ে থাকে সারাদিন। গেলে যাক, গিয়ে ঘুরে আসুক।”
বিকেল বেলা। রাজের গাড়িতে বসে আছে হিয়া। রাজ ড্রাইভিং করছে আর হিয়া ব্যাক সিটে। সবাইকে বিদায় জানিয়ে হিয়াকে নিয়ে মাত্রই রওনা হয়েছে রাজ। হিয়া তো কিছুতেই রাজের সাথে যেতে রাজি ছিলো না। কিন্তু সবার জোড়াজুড়িতে মেয়েটা আর না করতে পারেনি। ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও তাকে যেতে হচ্ছে। হিয়া সবসময়ই নিজের পরিবারের কথা মেনে চলে। সবার হ্যাঁ তে হ্যাঁ মেলায় সবার না তে না মেলায়। এই জন্যই তো ওকে সকলে এতো পছন্দ করে।
রাজ বারবার হিয়ার মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করলো। একবার গলা খাঁকারি দিয়ে, তো একবার গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে। কিন্তু হিয়া এসবে পাত্তা দিলো না। ও আপন মনে মোবাইল স্ক্রল করতে লাগলো।
“তোমার দেমাগ দেখে আমি অবাক হই হিয়া। স্টিল হচ্ছি। তুমি এখনো এতটা শক্ত আছো কিভাবে?”
রাজের এমন নরম স্বরে হিয়া অবাক না হয়ে পারলো না। যেই মানুষটা দুইদিন আগেও ওর সাথে তুই-তোকারি করছিলো আজ কিনা সে তুমি তুমি করে বলছে? ইন্টারেস্টিং তোহ! হিয়া বুঝতে পারছে, এর পিছনে নিশ্চয়ই কোনো কারন আছে। কিন্তু হিয়াকে টুপি পড়ানো তো অত সোজা নয়। হিয়া রাজের দিকে না ফিরেই, ভিষন আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,
“কারন আমি জানি, শকুনের দোয়াতে কখনো গরু মরে না। আপনাদের যা খুশি করে নিন, আমারও কিছু হবে না।”
রাজ ডিরেক্ট কেশে উঠলো। তার সাথে সম্পর্ক থাকাকালীন তো হিয়া এমন ছিলো না। বিয়ের পর থেকেই রাজ হিয়াকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করছে। মেয়েটা এতো চতুর তো ছিলো না। থাকলে সে বুঝতে পারতো, রাজ তার সাথে নাটক করছে। কিন্তু না সে বোঝেনি। আর এখন? এখন হিয়া রাজের থেকেও এক ধাপ এগিয়ে। বাহ ভাই বাহ!
“এতো ত্যাড়া কথা কেন বলছো তুমি? ভালো ভাবে বললেও তো হয় এটা।”
“না হয় না। সবার সাথে ভালো ব্যবহার করতে নেই। একটা কথা আছে জানেন তো, যেমন কুকুর তেমন মুগুর! তো কুকুর যদি আমার সাথে বেয়াদবি করে তাকে তো আর আদর করে খাওয়ানো যাবে না তাই না?”
রাজ দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। মনে মনে তার রাগও হলো। কিন্তু সেটা বাইরে দেখালো না সে। মুখের ভাব অপরিবর্তিত রাখলো। এখন সবকিছু সহ্য করছে, কিন্তু ট্যুর থেকে আসার পরই খেলা জমবে। হিয়ার সমস্ত অহংকার সব নিজে হাতে চূর্ণ করবে সে। ছাড়বে না হিয়াকে। কিছুতেই না! কিন্তু তা করতে গেলে যে, এখন ভালো ব্যবহার করে হিয়ার বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। নাহলে তো সেই পরিকল্পনা পূরন করা সম্ভব হবে না।
হিয়াদের পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। হিয়ার মাথা ধরেছে ভিষন। রাতে একবার ঠিকঠাক ঘুম হয়নি। আর সারাদিন তো এই বাড়িতে আসতে হবে সেই চক্করে আর বিছানাতেই যেতে পারেনি। এইজন্য নাফিদের বাড়িতে পৌঁছানোর পর, কিছুক্ষণ নাসিমার সাথে কথাবার্তা বলে সে গেস্টরুমে চলে গেল। এখন একটা লম্বা ঘুম দিবে সে। নাহলে যে আর চলা যাচ্ছে না।
তবে একটা বিষয় ভাবলেই হিয়ার দুচোখের ঘুম সব হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। তা হলো, নাফির মুখোমুখি সে কিভাবে হবে? হিয়াকে তো ওই লোক ডিরেক্ট রিজেক্ট করে দিয়েছে। এই মুখ নিয়ে আর ওনার সামনে যাওয়া যাবে? ইসসসস! হিয়া যতই এই বিষয়টা ভুলতে চাচ্ছে, কিন্তু কিছুতেই পারছে না। জীবনে প্রথমবার প্রপোজ করে কি’না হিয়া রিজেক্ট হলো? তার বন্ধুমহলেও এমন রেকর্ড কারো নেই। আর না তো কাজিন মহলে।
দরজার খটখট শব্দে হিয়ার ঘুম ভাঙলো। নড়েচড়ে আরেকটু সজাগ হলেই বুঝতে পারলো নাসিমা ডাকছে তাকে।
“হিয়া খাবে না? রাত অনেক হয়েছে তো। সবাই বসে আছে।”
লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১২
হিয়া উঠে বসলো। ঘড়ির কাঁটায় চোখ বুলিয়ে দেখলো রাত এগারোটা বাজে। এতো কখন বাজলো? হিয়া উঠে ফ্রেশ হয়ে নিলো। দরজা খুলে বাইরে গেলো সে। ডাইনিং টেবিলে তাকাতেই চোখ পরলো নাফির দিকে। নাফিও ওর দিকেই তাকানো ছিলো। মুহুর্তেই চোখাচোখি হলো দুজনের। হিয়া মনে মনে বলল,
“যেখানে গেলে বাঘের ভয়, সেখানে গেলেই সন্ধ্যা হয়।”
