লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১৫
নুসাইবা আরা নুরি
সকাল সকাল মির্জা বাড়ির পরিবেশ বেশ খুশি খুশি ভাব।আলতাফ শেখ একটু আগেই ফোন করে জানিয়েছেন এই মাসের শেষ শুক্রবার তারা তাদের মেয়েকে আবারো মেহেরাজের হাতে নতুন করে তুলে দিবে নতুন ভাবে বিয়ে দিয়ে।সাথে পুরোনো সকল কিছু ভুলে নতুন করে সব সম্পর্ক জোড়া লাগিয়ে নিবে।
নাহিদা খাতুনের মুখ থেকে হাসি সরছে না।শ্রেয়সী কে তার বরাবরই পছন্দ মেয়ে হিসেবে।আর তার রাজপুত্র ছেলের সাথে তো পারফেক্ট মানিয়েছিলো।যেনো আল্লাহ নিজ হাতে জুটি বানিয়েছে ওদের দুজনের।খাবার টেবিলে বসে আছে বাড়ির সকলে।হাসান সাহেব নাহিদা খাতুনের দিকে তাকিয়ে বলে,
-বউমা মেহেরাজ এখোনো উঠে নাই।ওকে ডাকো??
-জি বাবা ডেকেছি।কাল বৃষ্টি তে ভেজার কারনে নাকি সারা রাত মাথা ব্যাথা করেছে তাই এখন ঘুমাচ্ছে আমি ওষুধ দিতে চাইলাম তবে খালি পেটে দেওয়া যাবে না পরে উঠে খাবে।
নাহিদা খাতুনের কথা শুনে নিলয় মির্জা খাওয়া থামিয়ে বলে,
-ওকে আগে কিছু খাইয়ে দিয়ে ওষুধ খাইয়ে দাও।আর কাল রাতে বলেনি কেন মাথা ব্যাথা করছে আর ওষুধ খাইনি কেন??
-তুমি তো জানো ছোট থেকেই ও ওষুধ খেতে চাইনা তাই খাইনি।তবে এখন ঘুমাচ্ছে ঘুমাক উঠলে খাইয়ে ওষুধ খাইয়ে দিবো।
-আচ্ছা।
নিলয় মির্জা আর কিছু বলে না খাওয়ায় মধ্যে নযোগ দেয়।তার এখন ভিষন ভালো লাগছে।হয়তো ছোট হতে হয়েছে তবে ছেলের মুখে হাসি আর পুরোনো বন্ধুকে আবার ফিরে পাওয়ার আনন্দটা উপভোগ্য।নাহিদা খাতুন সবার খাবার এগিয়ে দিচ্ছেন।শারমিন খাতুন আর নাহিদা খাতুন এক সাথে বসবে।সে বউমাকে রেখে খায় না।তাই বাধ্য হয়ে একটা নিয়ম হয়ে গেছে বাড়িতে পুরুষ রা আগে খাবে আর পরে নারীরা খাবে।সেভাবে চলছে গত কয়েক বছর ধরে।
নীলাভো আলোয় আচ্ছন্ন বিশাল ঘর।তারপর ছোট একটা বারান্দা যেখানে বিশাল বিশাল কয়েকটা ডিভ ফ্রিজ রাখা আছে সযত্নে।সেগুলো চলার ঝি ঝি শব্দ ভেসে আসছে গুমোট বাতাসে।তারপর বিশাল আর একটা ঘর।ঘরটির দরজা আধুনিক ফিংগার প্রিন্ট দ্বারা খোলে।দরজার উপরে স্পষ্ট ইংরেজি তে লেখা ❝ল্যাব❞।
ল্যাবের ভিতরে চলছে আজ বিশাল আয়োজন।এক পাশে কয়েকটা শেল্ফ। যেখানে ভর্তি কাচের জার যার ভিতরে নীল সবুজ লিকুইড এ ভরা।অন্য পাশে কম্পিউটার টেবিল।এবং ঘরের এক কোনে বিশাল এক টা টেবিল। টেবিলের উপর ছোট থেকে শুরু করে বড় অব্দি কত রকমের কাচের জার সাজানো।টেবিলের নিচে কয়েকটা সাদা ড্রাম।যেগুলোর উপরে স্টিলার লাগানো❝ডেঞ্জার❞।
টেবিলের পাশ ঘেসেই একটা ছোট কাচের রুম তার ভিতরে ভিন্ন সব যন্ত্রপাতি।এখানে মানুষের বডি পার্স গুলো ক্লিন করে কাট সাট করে রেডি করা হয় সেল করার জন্য। ল্যাবের মাঝখানে রকিং চেয়ারে বসে আছে আনাম মিয়া।সাদা পাঞ্জাবি আজকেও পরনে।তবে আজ গালে পান নেই।বরং চুইংগাম চিবুচ্ছে আজ।
তার সামনেই দুজন ডাক্তার।সেল্ফ থেকে নতুন নতুন কাচের জার গুলো নামিয়ে রাখছে তার সামনে ট্রলিতে।আনাম শুধু দেখে যাচ্ছে।সব নামানো শেষ এ একজন ডাক্তার বলল,
-ভাই সব হয়ে গেছে।
ডাক্তারের কথা শুনে আনাম মিয়া একটু সোজা হয়ে বসে।তারপর ভালো করে তাকায় কাচের জার গুলোর দিকে।ভিতরে মানুষের তাজা হৃতপিন্ড।আনাম মিয়া ডাক্তার কে জিজ্ঞাসা করে,
-কয় পিস??
-সাত টা ভাই!!
-আচ্ছা।
আনাম মিয়া আর কিছু বলে না এগুলো আজই সরকারি হাসপাতালে চলে যাবে ফ্রি চিকিৎসার জন্য।ফলে তার নাম ডাক আরো বাড়বে।হালিশহর এর নতুন এমপি সে।বেশ নাম ডাক তার এখন।সেজন্যই তো তাজা সাত টা প্রান নিয়ে সাত জনকে আবার বাচাবে।একদিক থেকে নাম ডাক ও হবে আবার শত্রুর বিনাশ ও হবে।
আনাম মিয়া হাসে।ল্যাব থেকে বের হওয়ার সময় একজন ডাক্তার এর দিকে তাকিয়ে বলে,
– রুম নাম্বার ১৩ এর পুলিশ দুটোর কিডনি চোখ খুলে নাও।খবদদার মরে না যেনো।মানুষ মরে গেলে আমার ভিষন কষ্ট লাগে।আজ রাতে ব্লাক মার্কেটে সেল করে দিবো।
কথাটা বলেই আনাম মিয়া বের হয়ে যায়।বাইরে এসে টমি আর নমির দিকে তাকায় একবার।নতুন মেয়ে পুলিশ দুটোকে ছিড়ে খেয়ে এখন বেশ শান্তিতেই ঘুমাচ্ছে ওরা।আনাম মিয়া বাইরে সব সময় কাজ করা ছেলেটার কাছে এগিয়ে এসে বলে,
-রকি??
-জ্বী ভাই??
রকি মাত্র চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজেছিলো।আর সেই আনাম মিয়া ডাক দেই।রকি ধড়ফড়িয়ে উঠে।উত্তর নেয়।আনাম মিয়া ট্রলি টার দিকে ইশারা করে বলে,
-১৫ মিনিট পর রাস্তার ধারে এম্বুলেন্স আসবে।টমিকে দিয়ে পাঠিয়ে দিবি।প্যাকেজিং ভালো হয় যেনো।
-ওকে ভাই।
আনাম মিয়া কিছু না বলে উপরে উঠে আসে।নতুন নতুন এমপির পদ পেয়েছে এখন কিছু ফ্রিতে কাজ না করলে জনগনের মন পাওয়া যাবে না।এক বার মন পেয়ে গেলে।বুকে বসে চোখে ঠোকর দিবে।বিচারপতির বিচার কেও করেনা তেমন তার কোনো ভুল কখোনো সামনে এলেও তার বিচার হবে না কারন এলাকার বিচার পতি হবে সে।
আনাম মিয়ার মুখে বিদঘুটে হাসি ফুটে উঠে।জঙ্গলের আশে পাশে তার লোক ভরা।একটা কাক পোক্ষি ও জানতে পারবে না তার আস্তানার কথা।আনাম মিয়া পুড়ে যাওয়া কুড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গায়ের ময়লা ঝেড়ে পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোন বের করে নির্দিষ্ট একটা নাম্বারে ফোন লাগায়।পর মুহুর্তে একবার রিং বাজতেই ওপাশ থেকে একটা শীতল কন্ঠে সালাম ভেসে আসে আনাম মিয়া সালামের উত্তর দিয়ে বলে,
-আলতাফ ভাইরে কইয়া দাও কাম তামাম করা শেষ।
আনাম মিয়ার কথায় ওপাশের লোকটা খুশি হয়।কিছু বলতে যাবে তার আগেই আনাম মিয়া বলে,
-আলতাফ ভাই কখন আসবে??
-আটটার পর দোকান বন্ধ করবে ভাই??
-তাহলে নয়টায় দেখা করো বিশাল ডিল আছে একটা।
-আচ্ছা।
আনাম মিয়া আর কিছু না বলেই কল কেটে দিয়ে সোজা হাটতে শুরু করে।জঙ্গল থেকে বের হওয়ার উদ্দেশ্য বাইরেই তার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।ওদিকে সিয়ামের চোখ চকচক করে উঠে লোভে।এতক্ষন আনাম মিয়ার সাথে সে কথা বলছিলো।।কল কাটার পর আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দোকানের ক্যাশে বসে থাকা আলতাফ শেখ এর কানের কাছে ফিশফিশ করে কথা গুলো উগরে দেয়।আলতাফ শেখ ও মনে মনে ভীশন খুশি হয় সিয়ামের কথা শুনে।যাক তাদের শত্রু দমনের পাশাপাশি কাচা টাকাও ঘরে আসছে।
প্রায় কয়েক বছর ধরে আলতাফ শেখ এই কাজের সাথে জড়িয়ে রয়েছে আর তার দেখা দেখি সিয়াম ও জড়িয়েছে।প্রথমে একটু অর্থের আশায় জড়ালেও পরে তা লোভে পরিনত হয়।যদিও অর্ধেক কাজ আনাম মিয়া করে।কারন গত পাচ বছর সে চেয়ারম্যান ছিলো এবার সে এম্পি তাই ক্ষমতা বেশি সন্দেহ কম।আর সব তার্গেট সিয়াম করে।শুধু নাম মাত্র তাদের দোকানের ব্যবসা।যেখানে একটা দোকান চলতো না সেখানে এখন চারটা দোকান।এক তলা বাড়িটা এখন দোতলা।
কারোর জেনো সন্দেহ না হয় তাই ব্যাংক এ টাকা না রেখে পুরান ঢাকায় নিজের বাড়ি তৈরি করেছে। উপরে সৎ হলেও অন্তরে অন্ধকার এর চেয়েও কালো তাদের অধ্যায়।নারি পাচার,,শিশু পাচার,,সোনা পাচার,,জাল টাকা সব কাজ ই করে।জার ৪০% রেফারেন্স পায় আলতাফ শেখ আর সিয়াম বাকি গুলো আনাম।তবে তাদের এই বিষয়ে আজ পর্যন্ত কেও সন্দেহ তো দূর কল্পনায় ও করতে পারেনি।
মেহেরাজের ঘুম ভাঙে বেলা এগারোটার দিকে।চোখ গুলো এখোনো কিছুটা লাল।মাথার চুল উশকো খুশকো।মেহেরাজ ফ্রেশ হয়ে নিচে চলে আসে।ড্রয়িং রুমে সোফায় বসে টিভিতে খবর দেখছে হাসান সাহেব।মুখে চিন্তার ছাপ।গত পাচ দিনে সাত টার বেশি পুলিশ অফিসার নিখোঁজ।একজন আর্মি অফিসার নিখোঁজ। এই নিয়ে তোলপাড় চট্রগ্রাম। তবে কোনো হদিশ নেই কিছুর।কারোর লাস্ট লোকেশন এক জায়গায় না সবার ভিন্ন ভিন্ন যায়গায় তাই আরো বেশি সমস্যা হচ্ছে তাদের খুজতে।
নিলয় মির্জা আর্মির জেনারেল হওয়াই তার কাধে ভিষন৷ চাপ এখন।তার উপর একজন আর্মি সদস্য নিখোঁজ যাকে কিনা সে নিজেই একটা বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছিলো।তাই সকাল সকাল খেয়ে তিনিও বেরিয়ে গেছেন বাড়ি থেকে।
মেহেরাজ সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসতেই দেখে শারমিন খাতুন চেয়ারে বসে ফল কাটছে।আর নাহিদা খাতুন রান্না ঘরে।শারমিন খাতুন মেহেরাজকে দেখে বলে,
-কখন উঠলি দাদু ভাই।মাথা ব্যাথা কমেছে??
মেহেরাজ স্মীত হেসে দাদির পাশের চেয়ার টেনে বসে বলল,
-হুম দাদু কমেছে।
শারমিন খাতুন সস্থির নিঃশ্বাস ফেলে রান্না ঘরে নাহিদা খাতুনের উদ্দেশ্যে বলে,
-বউমা নাতি কে খেতে দাও।
শারমিন খাতুনের কথায় নাহিদা খাতুন শাড়ির আচলে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে দেখে মেহেরাজ সগারমিন খাতুনের পাশে বসে আছে।তা দেখে তিনি বলেন,
-মাথা ব্যাথা কেমন আছে বাবু??
-এখন কমে গেছে আম্মু।
-আচ্ছা নে খেয়ে নে।
নাহিদা খাতুন খাবার বেড়ে দিতে দিতে মেহেরাজের দিকে তাকিয়ে বলে,
-বাবু শ্রেয়সীদের বাড়ি থেকে কল দিয়েছিলো সকালে!
মায়ের কথায় মেহেরাজ মায়ের দিকে তাকায়।মুখের ভাব মুর্তি সাভাবিক রেখেই বলে,
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১৪
-কি বলেছে??
-এই মাসের শেষ শুক্রবার অনুষ্ঠান করে বিয়ে হবে তোদের আবার।
মায়ের কথায় ভ্রু জোড়া কুচকে যায় মেহেরাজের। মেহেরাজ যেটুকু বুজেছে তাতে মেয়ে তো রাজি হবে না আর সিয়াম ও তো রাজি হবে না।তাহলে নিশ্চয় কিছু একটা ঘাপলা আছে।ওদের মুখ দেখে তো মনে হয়নি ওরা এতো সহজে সব মেনে নিবে।মেহেরাজকে ভাবতে দেখে নাহিদা খাতুন খাবার প্লেট এগিয়ে দিয়ে বলে,
-কি হলো বাবু কি ভাবছিস এতো মন দিয়ে??
