Home লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১৭

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১৭

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১৭
নুসাইবা আরা নুরি

ঘরের এক কোনে হাটুতে মুখ গুজে বসে আছে ইরু।ক্ষনে ক্ষনে ফুফিয়ে উঠছে মেয়েটা সমস্ত শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে ওর।সামনেই ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে পড়ে আছে ইরুর মোবাইল টা।কাল সন্ধাই যখন এক আকাশ মন খারাপ নিয়ে ভিজে ফিরলো তখন দিরজার সামনে সৎ মাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পায়।ইরু ভয় পায়।কাছে যেতেই ইরুর সৎ মা রোকেয়া রাগী কন্ঠে বলে,,
-তোর মোবাইল কই??কতবার কল দিয়েছি তোকে??
রোকেয়ার কথায় ইরুর ফোনের কথা মাথায় আসে।তাড়াতাড়ি ব্যাগ খুলে দেখে ফোন ভিজে বন্ধ হয়ে গেছে।ইরু ভয় মন খারাপ নিয়ে রোকেয়ার দিকে তাকাতেই রোকেয়া রাগী কন্ঠে বলে,
-কি হয়েছে দেখি??

ইরুর গাত থেকে মোবাইল টা কেড়ে নিয়ে দেখে টপ টপ করে পানি পড়ছে।মুহুর্তেই রেগে যায় রোকেয়া।ইরুর হিজাবের উপর দিয়ে চুল খামচে ধরে বাড়ির ভিতরে টেনে আনে।দরজা লাগিয়ে ঠাশ করে চড় মারে।সোফায় বসে বসে খাচ্ছে ইরুর সৎ ভাই বোন।তবে ইরুর দিকে ফিরেও তাকালো না তারা।
রোকেয়া রাগী কন্ঠে বলে,
-কুত্তা*র বা*চ্চা হুশ কোথায় থাকে আমার ভাইয়ের দেওয়া ফোনটা দিলি তো নষ্ট করে।কত বছর যত্ন করে রেখেছি।ওমনি নষ্ট করে দিলি।
রোকেয়ার কথায় ফুফিয়ে উঠে ইরু।রোকেয়া ইরুকে টানতে টানতে ইরুর ঘরের নিয়ে এসে বলে,
-বল তোর হুশ কোথায় ছিলো।
ইরু কিছু বলে না।ফলে রোকেয়া কয়েকটা চড় বসায়।তখন ইরু ছোট্ট করে বলে,
-আব্বুর দেওয়া নতুন মোবাইল টা আছে তো।ইব্রাহিম এর থেকে ওটা নাও।
আর কিছু বলার আগেই রোকেয়া রাগে বেধড়ক পিটাই ইরুকে।ইরু মুখ বুজে সহ্য করে নেই।কতদিন ধরে মার খায়।আর আজ সব কষ্ট এক সাথে।রোকেয়া রেগে মোবাইল টা আচাড় দিয়ে টুকরোরো করে ফেলে।তারপর ইরুর দিকে তাকিয়ে বলে,

-অলক্ষনী তুই আমার ছেলের মোবাইল এর ফিকে নজর দিয়েছিস তোর চোখ তুলে নিবো।কালসাপ কোথাকার।তোর জন্য আমার সংসারে ঝামেলা হয়।মরে যেতে পারিস না তোর মা যেভাবে গলায় দ*ড়ি দিছিলো তুই ও দিয়ে মর।
কথাটা বলেই বেরিয়ে যায় রোকেয়া যাওয়ার আগে বলে যায়,
-মোবাইল নষ্ট করেছিস না।আজ থেকে তোর খাওয়া বন্ধ। খিদেই যখন মরবি তখন খেতে দিবো।
বলেই বাইরে থেকে দরজা লাগিয়ে বেরিয়ে যায় রোকেয়া।আজ যখন শুনেছে বাড়িটা ইরুর নামে তখন থেকেই তিনি রেগে আছেন।অনেক তাবিজ করে স্বামিকে ইরুর থেকে সরিয়েছেন।এখন ভুলেও খোজ নেই না ইরুর বাবা ইরুর।তবে আজ যখন সে বললো এই বাড়ি ইরুর নামে তখন রেগে গেছে।এখন এই বাড়ি হাতানোর এক মাত্র উপাই ইরুকে সরানো।

তার জন্য রোকেয়া সব করবে।তিনি জানেন ইরু কখোনো চিল্লায় না কোনো প্রতিবাদ করে না সব সময় চুপচাপ।তাই ই তো বাড়ির পুছনের দিকের ছোট ঘর টা ইরুকে দিয়েছে।আর ইরুর মায়ের ঘর টা নিজে নিয়েছে।আর বাড়ির পিছনে জঙ্গল হওয়াই ইরু কাওকে ডাকলেও পাবেনা।
ইরুর চোখ দুটো ঘোলা হয়ে আসছে ক্রমেই।কাল সন্ধ্যা থেকেই একই ভাবে বসে আছে সে।তার কেও নেই কেও না।আসলেই সে এতিম।তার দু:খ দেখার কেও নেই।ইরু জ্বরে কাতরাই।মাথা যন্ত্রনা করছে।ভিজা কাপড় গায়ে শুকিয়ে গেছে।ইরু আর সহ্য করতে পারে না।প্রচন্ড পানির পিপাসা আর জ্বরের তান্ডবে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে।ধপাশ করে একটা শব্দ হয় তারপর শুধু কয়েক বার জোরে নিশ্বাস ফেলার শব্দ ভেসে উঠে বাতাসে।তারপর নিস্তব্ধতা ভয়ানক নিস্তব্ধতা।

ইরুকে অনেকবার কল দেয় ফাহিম তবে ইরু অফলাইন তাই আর কল না দিয়ে শ্রেয়সীর নাম্বার আই আইডি শেয়ার করে দেয় মেহেরাজ কে।সেদিন ইরু দিয়েছিলো ফাহিম কে।ফাহিম চেয়েছিলো বলে।
ফাহিমের থেকে নাম্বার নিয়ে মেহেরাজ ভাবতে থাকে কল দিবে কি দিবে না।ভাবতে ভাবতে কফির কাপ নিয়ে সাদে এসে দাঁড়ায়।সকাল থেকে বৃষ্টি হওয়ার দরুন সাদ ভেজা।সাদের চারিপাশে বিভিন্ন ফুলের গাছ গুলে ভরে আছে।এগুলো সব নাহিদা খাতুন দেখাশুনা করেন।ফুল গাছ তার পছন্দের।
মেহেরাজ দোলনায় বসে কফির কাপে চুমুক দিয়ে কল দেয় শ্রেয়সীর নাম্বারে।প্রথম দুইবার রিসিভ হয় না।মেহেরাজ বিরক্ত হয় এটা আসলেই শ্রেয়সীর নাম্বার তো।মেহেরাজের ভাবনার মাঝেই ওপাশ থেকে একটা স্নিগ্ধ মিষ্টি কন্ঠ ভেষে আসে,

– আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন??
কন্ঠ টা শুনে মেহেরাজের হৃদস্পন্দনের গতি বেড়ে যায়।মেহেরাজ নিজের গম্ভীরতা বজায় রেখেই বলে,
-শ্রেয়সী বলছেন??
-জ্বী আপনি কে??
মেহেরাজ কি বলবে ভেবে পেলো না।যদি মেয়েটা আবার রেগে যায় তার নাম শুনে।যদি নতুন কোনো ঝামেলা তৈরি হয়।যদিও বিয়ে হবে তাদের আবার সমস্যা হবে না।কিন্তু।নেহেরাজ আর আর ভাবে না।গম্ভীরতা বজায় রেখেই বলে,

-এই মাসের শেষ শুক্রবার যার সাথে আবারো তিন কবুলের হালাল বন্ধনে আবদ্ধ হবেন আমি সেই মানব।
মেহেরাজ শান্ত গম্ভীর কন্ঠে কথাটা বলে।ওদিকে তোহার সাথে বসে ছিলো শ্রেয়সী।তোহা গালে তুলে জোর করে খাইয়ে দিয়েছে শ্রেয়সীকে।তারপর বসে বসে গল্প করছিলো হটাৎ কল আসায় রিসিব করেছে।যেহেতু অচেনা নাম্বার তাই তোহার কথা আর কৌতুহল নিয়েই শ্রেয়সী রিসিভ করেছিলো।মেহেরাজের কথা শুনে।শ্রেয়সী এবার রাগ করতে চেয়েও রাগ করতে পারে না।কারন সে যত টুকু বুজেছে এতে মেহেরাজের কোনো দোষ নেই।মেহেরাজ তো কোনো কিছুই করেনি।তাহলে তার উপর কেন রাগবে শ্রেয়সী।
শ্রেয়সী কে চুপ থাকতে দেখে মেহেরাজ এবার কন্ঠ কিছুটা নরম করে বলে,

-চিনেছেন??
-জ জ্বী!!
শ্রেয়সীর কন্ঠ শুনে মেহেরাজের ভ্রু কুচকে যায়।মেয়েটা রেগে গেলো না কেন।মেয়েটার তো তার উপর রেগে যাওয়ার কথা।তাহলে রাগ করলো না কেন।মেহেরাজের ভাবনার মাঝেই ওপাশ থেকে শ্রেয়শীর নরম কন্ঠ ভেসে আসে,
-কি কিছু বলবেন??
-হ্যাঁ আসলে!!
-জ্বী বলেন।
মেহেরাজ খুজে পাইনা কি বলবে।তাই হুট করে কিছু একটা মাথায় আসতেই বলে,
-আপনি যদি রাজি থাকেন তাহলে আজ একটা কফি শপে বসতে পারি।কিছু দরকার আছে।আর আমার বিষয়ে আপনার কিছু ভুল ধারনা ধরিয়ে দেওয়ার আছে।
মেহেরাজের কথা শ্রেয়সীর ফোন লাউড স্পিকারে থাকায় শ্রেয়সী সহ তোহা ও শোনে।শ্রেয়সী যদিও মানা করতে যাচ্ছিলো কিন্তু তার আগে তোহা ইশারায় হ্যা বলতে বলে।তোহার উপর ভরসা করে শ্রেয়সী শান্ত স্বরে বলে,

-জ্বী আচ্ছা।
শ্রেয়সীর কথা শুনে মেহেরাজ বেশ খুশি হয়।কথাটা এখন ফাহিম বলা দরকার।কিছু একটা ভেবে তারপর মেহেরাজ আবারো বলে,
-তাহলে বিকাল চার টায় রেডি থাকবেন।আমি গাড়ি নিয়ে আসবো।এখন রাখি।
-জ্বী আচ্ছা।
মেহেরাজ কল কেটে দেয়।তারপর ফাহিমের নাম্বারে কল করে।ওদিকে কল কাটার শব্দ পেতেই শ্রেয়সীর ফোনের দিকে তাকায় লাস্ট ডিজিট ৯৯ নাম্বার টা তাহলে এই লোকটার।শ্রেয়সী এবার তোহার দিকে তাকায়।শ্রেয়সী কে নিজের দিকে তাকাতে দেখে তোহা শ্রেয়সীর হাতের উপর হাত রেখে ভরসা দিয়ে বলে,
-যেহেতু বিয়েটা হবে আর ছেলেটাকে যেমন ভেবেছো তেমন নয়।তাই তোমার উচিত তার সাথে দেখা করা।মাথা ঠান্ডা রাখবে।লোকটা তো বললো যে তোমার সব সব ভুল ধারনা ধরিয়ে দিবে।তাই তোমার দেখা করা উচিত।আর আইনত সে এখোনো তোমার হাসবেন্ড বুজলে ননদিনী।
-কিন্তু ভাইয়া জানলে ভিষন রেগে যাবে ভাবি??
শ্রেয়সীর কথায় তোহা হেসে বলে,

-আজ তো আব্বু দোকানে থাকবে আর তোমার ভাই শহরের বাইরে গেছে।কি একটা জরুরি কাজ আছে।তাই কোনো চিন্তা করা লাগবে না।আর আম্মুকে বললে আমি কিছু বলবে না।
তোহার কথায় শ্রেয়সী কিছুটা ভরসা পায়।কিন্তু শ্রেয়সী কেমন গিলটি ফিল হচ্ছে।একদিন আগে যে লোকটাকে পাবলিক প্লেস এ চরিত্রহীন বলে অপমান করে আসলো।আর আজ তার সাথে দেখা করতে যাবে।শ্রেয়সী মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেই।লোক্টার সাথে কথা বলে আসার সময় ইরুর সাথে দেখা করে আসবে ওর রাগ ভাঙাবে আর ফোন বন্ধ রাখার জন্য অনেক বকবে।কেন বন্ধ রেখেছে ফোন।
শ্রেয়সী কে গভীর ভাবে কিছু ভাবতে দেখে তোহা শ্রেয়সীর কে লজ্জা দিতে বলে,
-কি বেপার ননদিনী আমার ননদাই কে নিয়ে ভাবনায় পড়ে গেলে নাকি।বিয়ের পর তো সারাদিন দেখবে এখন নাহয় কি পরে যাবে সেইটা ডিসাইড করো।
ভাবির কথায় শ্রেয়সী লজ্জা পায় কিছুটা।তারপর বলে,
-কি যে বলোনা।
-হুম হইছে এখন নাও কি পরে যাবে ডিসাইড করো।আমার ননদিনীকে আজ সুন্দর করে সাজিয়ে দিবো।যাতে আমার ননদাই বাছাধন আমার ননদিনী কে দেখে ক্রাশ খায়।

দুপুর আড়াই টা।সুর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে।মৃদু বাতাস বয়ে চলেছে।মেহেরাজ দুপুরে খাওয়ার পর পরই রেডি হয়ে নিয়েছে।কালো প্যান্ট এর সাথে মেরুন রঙের শার্ট। চুল গুকো জেল দুতে সেট করা।হাতে রোলেক্স এর ঘড়ি।পায়ে কালো বুট।আজ আর গাড়ি নিবেনা মেহেরাজ।তাই পার্কিং থেকে নিজের কালো রঙের R15 নতুন মডেলের গাড়িটা বের করলো।কালো রঙের প্রতি আলাদায় একটা টান মেহেরাজে।মাথায় হেলমেট দিয়ে বাইক স্টার্ট দিয়ে বেরিহে গেলো বাড়ি থেকে।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১৬

যাওয়ার আগে নাহিদা খাতুনকে বলেছেন যে শ্রেয়সীর সাথে দেখা করবে আজ।তবে কখন তা বলেনি।এখন আপাততো মেহেরাজের ফাহিমের সাথে জরুরি একটা দরকার তাই মেহেরাজ একটু তাড়াতাড়ি ই বের হয়েছে বাড়ি থেকে।উদ্দেশ্য ফাহিম দের বাসা।মেহেরাজ বাইকের স্পীড বাড়াই।ফাকা রাস্তায় ছুটে চলে কালো রঙের বাইক টা।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here