Home লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৭

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৭

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৭
নুসাইবা আরা নুরি

হটাৎ কেও ফোন কেড়ে নেওয়ায় চমকে উঠে সামনে তাকাতেই দেখে সিয়াম তার দিকে রাগী চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে।তোহা ভয়ে কেপে উঠে।কাপা কাপা কন্ঠে কিছু বলতে যাবে তার আগেই সিয়াম ফোন টা বিছানায় ছুড়ে মেরে রাগী কন্ঠে চিল্লিয়ে বলল,
-তোমাকে না আমি হাজার বার নিষেধ করেছি।আহট দেখবে না।তাও কথা কানে যায় না তোমার।রাতে ভয়ে একা ওয়াশরুম যেতে পারো না আবার এই সব।কথা না শুনলে কিন্তু মারবো আমি তোমাকে!!
সিয়ামের রাগী কন্ঠে তোহার চোখে পানি চলে আসে।চোখ ছল ছল করে উঠে পলক ঝাপ্টাতে কয়েক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ে।তা দেখে সিয়াম একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে নিজের রাগ কমাতে চায়।যে মেয়ে কিনা রাতে ভয়ে ঘুমের ভিতর কেপে উঠে ওয়াশরুম যেতে গেলে তাকে ডেকে যায়।সে যদি কথা না শুনে এমন ভুতের নাটক দেখে রাগ তো উঠবেই।
সিয়াম নিজের রাগ ঠান্ডা করে গম্ভীর স্বরেই বলল,

-কাদছো কেন।তোমারে আমি সত্যিই এবার মারবো তুমি আমার কথা শুনছো না।কতবার বলেছি ভুতের নাটক ভুতের ছবি দেখবা না তাও তুমি একই কাজ বার বার করো।
সিয়ামের কথায় তোহা শাড়ির আচলের কোনা দিয়ে চোখের পানি মুছে ফুফিয়ে উঠে বলে,
-আপনি তো বাইরে ছিলেন।তাই ইউটিউবে তোর নাম ছবিটা দেখছিলাম।তবে হটাৎ এটা আসছে তাই কৌতুহল নিয়ে দেখতে গেছি।আমি কি ইচ্ছা করে গেছি যে আপনি আমাকে মারবেন।কথা বলবেন না আর আমার সাথে।
তোহার আদুরে কথায় সিয়ামের রাগ গলে গেলো।বুজলো তার বউ এর ভিতরেই অভিমান এর পাহাড় জমিয়ে ফেলেছে মনে।এখন সেই অভিমান না ভাঙালে আবার কথাও বলবে না।সিয়াম এগিয়ে আসে তোহার দিকে।তারপর তোহার পাশে বসে।তোহা একটু সরে যায়।তা দেখে সিয়াম হাসে।এক হাত বাড়িয়ে তোহার কাধ ধরে নিজের কাছে এনে তোহার গালে একটা চুমু খায় টুপ করে।তোহা লজ্জা পেয়ে যায়।
সিয়াম তা দেখে হেসে বলে,

-তুমি তো জানো আগের দিন ভয় পেয়ে কতটা অসুস্থ হয়েছিলা।এখন আবার ভুতের এসব দেখে যদি ভয় পাও তাই রাগ করছি জান।আমি কি তোমাকে মারতে পারি বলো।
-ছাড়েন কথা নেই আপনার সাথে।আপনি আমাকে বিনা দোষে মারবেন বলছেন।
-আচ্ছা সরি বাবা।আমি কান ধরছি আমি আমার বউকে মারবো না।আদর দিবো শুধু।
-সরেন।
সিয়াম আবারো টুপ করে চুমু খেয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়।আলনা থেকে গামছা নিয়ে ঘাড়ে ঝুলিয়ে তোহার দিকে তাকিয়ে বলে,

-ফ্রেশ হয়ে আসি তারপর বাকি রাগ টুকু ভাঙাবো রাতে।
বলেই সিয়াম ওয়াশ রুমে ঢুকে গেলো।তোহা উঠে ঘরের দরজা বন্ধ করে এসে বিছানায় পায়ের উপর পা তুলে বসলো।চোখে পানি ঠোঁটে রহস্যময় হাসি।তোহার সিক্সসেন্স আগেই বুজেছিলো কেও আসছে।তাই কল হাইড করে কেটে দিয়ে ইউটিউব এ আহট চালিয়েছে।যাতে যেই আসুক রেগে যায়।কারন সবাই জানে তোহা ভুতে ভয় পায়।বুদ্ধি টা কাজেও লেগে গেছে।তোহা নিজের হাতের তালু দিয়ে চোখের কোনায় জমে থাকা অশ্রু মুছে ওয়াশরুমের দরজার দিকে তাকিয়ে বলে,
-আপনি আমাকে চিনতে ভুল করলেন সিয়াম শেখ।যে মেয়েটা দিনের পর দিন জঙ্গলে থেকেছে ট্রেনিং এর জন্য সে পাবে ভুতে ভয়।আসলেই হাস্যকর ব্যাপারটা।
তোহার ঠোঁটে কুটিল হাসি ফুটে উঠে আড়ামোড়া খেয়ে বিছানায় বালিশ ঠিক করে সুয়ে সাদের সিলিং এর দিকে তাকায়।কিঞ্চিৎ মন খারাপ হয়ে উঠে রহস্যঘেরা মুখে।তোহা আনমনে বিড়বিড়ায়,
-আপ্নি বড্ড বোকা সিয়াম শেখ।আমাকে আপনি আজো চিনতে পারেন নি অথচ আমাকে ভালোবেসে ফেলছেন সেই কত আগেই।আমি আপনাকে কোনোদিন ভালোবাসতে পারলাম না হয়তো পারবো না।জীবনে প্রথম আসা পুরুষ টা যদি একটা খুনি*র সন্তান আর মানুষ নামের পশু হয় তাহলে কি তাকে ভালোবাসা যায়।

নিজের চেম্বারে বসে আছে ফাহিম।এডভোকেট হওয়াই চেম্বারেই বেশি সময় থাকা হয়।কত রকমের মামলা কত কিছুই হাতে আসে।তবে আজ আর মন বসছে না কিছুতেই।সারারাত দু-চোখের পাতা এক হয়নি।ইরুর জন্য বড্ড মন খারাপ হয়েছে তার।ফাহিম জানে হয়তো কাল ইরুর গায়ে ওর সৎ মা হাত তুলেছে আবার বকতেও পারে।কাল ওখান থেকে চলে আসার পর নিজের কাছে নিজেকে কাপুরুষ মনে হয়েছে ফাহিমের।
কেন সে নিজের ভালোবাসার মানুষকে জোর করে নিয়ে আসতে পারলো না।নিয়ে আসলে হয়তো আজ ইরু এতক্ষন তার বক্ষে নিশ্চিন্তায় গভীর নিদ্রায় থাকতো।তবে কিভাবে আনতো ফাহিম।আইনের লোক হয়ে নিজে কিভাবে আইন ভঙ্গ করবে যেখানে ইরুর এখোনো আঠারো বছর হয়নি।
যদি ইরুর আঠারো বছর হতো তাহলে ফাহিম এক মুহূর্ত দেরি না করে ইরুকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে আসতো।এখন এক্টাই উপাই।ফাহিম পুলিশ দ্বারা হেল্প করলেও কদিন পর তাই হবে দেখা যাচ্ছে মেয়েটা আরো নির্যাতিত হচ্ছে।চাইলেই কি সব আইন নিজের মতো গড়া যায়।কাল সারা রাত ফাহিম অনেক বই ইন্টারনেট ঘেটেছে একটা উপায় খোজার তবে সে ব্যার্থ।ইরুর আঠারো বছর হতে এখোন চার মাস।এই চার মাস ফাহিমের অপেক্ষা করতে হবে শুধু।

ফাহিমের টেবিলের ওপাশে চেয়ারে বসে আছে মেহেরাজ।ক্ষনে ক্ষনে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে আর ফাহিমের উদাশ হওয়া মুখের দিকে তাকাচ্ছে।ফাহিম সামনে খূলে রাখা ল্যাপটপ বন্ধ করে কফির কাপে চুমুক দিয়ে মেহেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
-কিছু ভালো লাগছে না ভাই আমার।মনের ভিতর তীব্র ঝড় বয়ে যাচ্ছে।কি করবো আমি এখন।না পারছি গিলতে না পারছি উগরাতে।
ফাহিমের কথায় মেহেরাজ শান্ত নয়নে ফাহিম কে একবার পরখ করে বলে,
-আমি তোরে রাতেই বললাম চল তুলে নিয়ে কিন্তু তুই তা করলি না।ভাই এই যুগে সবাই কোর্ট ম্যারেজ করে তোর বোজা উচিত ছিলো।তুই তো জানিস শ্রেয়সীর ও আঠারো হয়নি।কিন্তু সব তো সম্ভব হচ্ছে।কাল আন্টি না থাকলে ওই মহিলার অসভ্যতা বের করে দিতাম।আমি চাইনি আন্টির সামনে ওই মহিলাকে পিটাতে।কারন সে এমনিতেই মহিলা তার উপর ইরুর মা।

-আপন না সৎ মা।
-হুম। এখন তোর ব্যাপার কি করবি।চাইলে কোর্ট ম্যারেজ করে রাখতে পারবি।বাকিটা আমি সামলে নিবো।
-কিন্তু ওই মহিলা যদি কোনো কেচ ফাইল করে তাহলে সেই তো আবার ওখানে চলে যাবে।কারন ইরুর আঠারো হয়নি।
ফাহিমের কথায় মেহেরাজ এবার রেগে যায়।হাত মুষ্টিবদ্ধ করে টেবিলে শব্দ করে ঘুশি মেরে রাগী গলায় বলে,
-রাখ তোর বা*লের আঠারো বছর।কিসের কে*চ করবে।তোহা তুহিন আছে।তুই কি ছি*ড়তে এতো বড় উকিল হয়েছিস।মেজাজ খারাপ করে দিচ্ছিস সকাল সকাল।
মেহেরাজের ক্কথায় ফাহিম মাথা নিচু করে নেয়।কি করবে বুজতে পারছে না।আসলেই তো তার কাছে এমন কেচ বন্ধ করা কোনো ব্যাপার।কিন্তু।এই কিন্তুর উত্তর নেই ফাহিমের।ফাহিম কে চুপ থাকতে দেখে মেহেরাজ আবারো বলে,

-যদি সত্যি ভালোবাসিস তাহলে আজকেই তুলে নিয়ে আসবি।তারপর বিয়ে হবে।আর যদি ভালো না বাসিস তাহলে মাথায় গেথে রাখ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে আমি ওই মেয়ের বিয়ে দিবো পনেরো দিনের ভিতরে অন্য ছেলের সাথে।এখন তোর ব্যাপার।আসলাম।ভাবা শেষ হলে কল দিস।
মেহেরাজ উঠে দাঁড়িয়ে চেম্বার থেকে বেরিয়ে যায়।তার নিজের ও কাল রাতে ঘুম হয়নি।যখন EM এর থেকে শুনেছিলো সকল কিছু পা*চার কাজ সমুদ্র পথেই হয়। আর এর ভিতরে তাদের নেভির একটা টিম ও জড়িত।নাহলে এতো এতো পাপা*চার কিভাবে সম্ভব নেভীদের চোখ ফাকি দিয়ে।তার ভিতরে ফাহিম কে নিয়ে চিন্তা।নিজের ইমোশন পুরোপুরি প্রকাশ ও করতে পারবে না আবার কষ্ট ও পাবে।

সকাল এগারোটা পেরিয়েছে।আজ শ্রেয়সীর কলেজ ছিলো তবে ঘুম ভাঙেনি বলে আর জাওয়া হয়নি।যদিও খাদিজা খাতুন এই নিয়ে দুবার কথা শুনিয়েছেন।নতুন নতুন কলেজ এ ভর্তি হতে না হতেই ফাকি দেওয়া শুরু।শ্রেয়সী মা কে বোঝাতেই পারেনি যে সে ইচ্ছা করে ফাকি দেয়নি।ঘুম ভাঙলে অবশ্যই যেতো।ঠিক সময় ভাবি বাচিয়ে দিয়েছে তাকে।এটা নিত্ত্যদিনের ঘটনা শ্রেয়সী কারোর কাছে বকা শুনলেই তোহা এসে শ্রেয়সীকে উদ্ধার করে।
শ্রেয়সী নিজের ঘরের বারান্দায় দোলনায় বাংলা ২য় পত্র বইটা নিয়ে বসে আছে।পাশে টুল এর উপর রাখা মোবাইল টা দিকে বার বার চোখ যাচ্ছে শ্রেয়সীর।নাহ আর মন মানছে না।কি এক খারাপ অবস্থা।যেই লোকটাকে কিছুদিন আগেই সহ্য করতে পারতো না সেই লোকটা এগারোটা বেজে যাওয়ার পরেও কল কেন দিচ্ছে না সেটা নিয়ে চিন্তা হচ্ছে শ্রেয়সীর।ইরুর ও খোজ নেই থাকবে কি করে ওর তো মোবাইল ই নেই।
শ্রেয়সীর খারাপ লাগে ইরুর জন্য তবে কি করবে সে।বিকালে কোচিং এ যাবে তখন কথা হবে।শ্রেয়সী আর থাকতে পারলো না।এক বুক লজ্জা নিয়ে মেহেরাজের নাম্বার এর কল দিলো।মেহেরাজ তখন বাইক চালাচ্ছে।পকেটে ফোন বেজে উঠায় আর একটু তাড়া থাকায় কানে ব্লুতুথ দিয়ে কল রিসিভ করলো নাম্বার না দেখেই তারপর বাইল স্টার্ট দিয়ে চালাতে চালাতে বলল,

-কে বলছেন??
-আমি!!
-আমি কে???
মেহেরাজের কথায় কথায় শ্রেয়সীর ভ্রু জোড়া কুচকে গেলো।লোকটা কি তার নাম্বার দেখেনি নাকি ইচ্ছা করেই মজা করছে।শ্রেয়সীর রাগ হলো সে চিন্তা করছিলো আর এই লোক মজা করছে।শ্রেয়সী কিছুটা রাগ নিয়ে বলল,
-কেও না।রাখি আসসালামু আলাইকুম।

শ্রেয়সীর কন্ঠ এবার স্পষ্ট বুজতে পারলো মেহেরাজ সাথে সাথে রাস্তার ধারে বাইক ব্রেক কষলো।নাম্বার না দেখে রিসিভ করায় জিভ এ কামড় দিলো এ করলো সে।মেয়েটা কি আবার রাগ করলো হবে হয়তো।সকাল থেকে ব্যাস্ততায় কল দিতেই ভুলে গিয়েছিলো মেহেরাজ।মেহেরাজ এবার নিজেকে শান্ত করে শ্রেয়সীর রাগ ভাঙানোর জন্য রশিকতার সুরে বলল,

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৬

-কি ব্যাপার মিসেস আজ সুর্য কোন দিক দিয়ে উঠলো যে আমার শশুরের একমাত্র রাগী মেয়ে নিজ থেকেই এই অধম কে কল দিয়েছে।মিস করছিলেন নাকি ম্যাডাম।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here