Home লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৪

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৪

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৪
নুসাইবা আরা নুরি

-চিন্তা নেই খারাপ কিছু বলবো না।তবে যেটুকু বলবো আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে আমার কথা।বলুন করবেন বিশ্বাস??
মেহেরাজের কথায় ভাবনায় পড়ে যায় শ্রেয়সী কি এমন বলবে লোকটা।যে তাকে বিশ্বাস করতে হবে।বেশ কিছুক্ষন ভাবে শ্রেয়সী তারপর মেহেরাজের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলে,
-জ্বী বলুন।
-বিশ্বাস করবেন তো আমার কথা??
-জ্বী।
শ্রেয়সীর কথায় ভীষণ খুশি হয় মেহেরাজ।আনন্দে ভরে উঠে মন।মেহেরাজ শুক্নো একটা কাশি দিয়ে শ্রেয়সীর মনযোগ আকর্ষন করে তারপর বলে,

-আপনি জানেন যে আমার আর আপনার বিয়েতে আমাদের দুই পরিবার এর মত থাকলেও প্রথমে আমাদের ডিভোর্স হওয়ার পর আপনার বাবা অসম্মানিত হয়।এটা স্বাভাবিক ছিলো। কিন্তু এবার আবার বিয়েতে রাজি হয়ে যাওয়া মোটেই স্বাভাবিক মনে হয়নি আমার।কারন আপনার বাবা কিভাবে আবার হুট করে সব মেনে নিলেন।যেখানে আপনার ভাই আমাদের বাড়িতে বললেন পরে জানাবেন।আশ্চর্যের বিষয় বাড়ি আসার পরেই রাজি।প্রথমে তো ভাবলাম আপনার কথা ভেবে রাজি কিন্তু আলনি তখন আমার উপর রেগে ছিলেন আর আপনার কথা ভেবে রাজি হলেও আমার মন মানতে চাইছে না বিষয় টা।আমার মনের ভিতরে কেমন জানি লাগলো। এই বিয়েতে আপনার বাবা ভাইয়ের রাজি হওয়ার ভিতরে বিশাল একটা কারন আছে।আর এই কারন টাই আমার ভয়ের বিষয়।

মেহেরাজের সম্পুর্ন কথা মনযোগ দিয়ে শ্রবন করে শ্রেয়সী।প্রথমে একটু বিরক্তি ফিল হয় বাবা ভাইয়ের নামে কথা শুনে।কিন্তু শেষ কথা গুলো শ্রেয়সীর ও মনের ভিতর তোলপাড় শুরু করে দেয়।আসলেই তো সেদিন বাড়ি থেকে যাওয়ার আগেও এই লোক্টার উপর তার বাবা ভিষন রেগে ছিলেন আর তার ভাই তো আরো বেশি।মানলাম সব শুনে শান্ত হলো কিন্তু এতাও সহজে তার ভাই মেনে নিয়েছে।আর সেদিন তাকেও জোর করেছিলো দ্বিতীয়বার বিয়ের জন্য।
শ্রেয়সীকে ভাবনায় পড়তে দেখে মেহেরাজ বলে,
-আমি জানিনা আমার ধারনা কতটা সঠিক তবে বিশ্বাস করুন আমার মনে হয় কোনো একটা কারন নিশ্চয় আছে।
মেহেরাজের কথায় চমকায় শ্রেয়সী নিজেকে সামলে নেয়।তারপর শান্ত স্বরেই বলে,

-জানিনা এর ভিতরে কারন আছে কিনা তবে আমি আপনাকে বিশ্বাস করেছি।আর কোনো কারন থেকে থাকলেও কি কারন হতে পারে তা আমার মনে প্রশ্নের দানা বাধতে শুরু করেছে??
শ্রেয়সীর কথায় মেহেরাজ তাকালো শ্রেয়সীর দিকে।চোখের নিচে কোনায় ছোট্ট একটা তিল।গোলাপি ঠোঁট জোড়া টসটসে কমলার মতো হয়ে আছে।ফর্সা মুখে দুই ভ্রু মাঝে একটা কালো টিপ খুব টাঞ্চহে মেহেরাজ কে।মেহেতাজ শুকনো ঢোক গিললো।হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিলো।মাস্ক খুলার পর থেকে আড় চোখে কতবার তাকিয়েছে তার হিসাব নেই মেহেরাজের কাছে।
মেহেরাজ নিজেকে সামলিয়ে বলে,

-হয়তো আপনার বাবা কিংবা ভাই আমার উপর বা আমার পরিবার এর উপর কোনো প্রকার প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছে আপনাদের সেই অসম্মানের জন্য।
মেহেরাজের কথায় শ্রেয়সী সাথে সাথে বলে,
-এটা ভুল বললেন আপনি আমার বাবা এমন না।বাবা কারোর উপর কখোনো রাগ জমিয়ে রাখে না।
মেহেরাজ একটা তপ্ত শ্বাস ছাড়ে সে জানে প্রতিটা মেয়েই তার বাবার নামে কোনো কিছু সহ্য করতে পারেনা তাই ঠান্ডা মাথায় বোঝাতে হবে।মেহেরাজ শান্ত কন্ঠে বলল,
-আমি তো বলিনি এমন টা হবে।শুধু আপনাকে এক্সাম্পেল বললাম।হতে পারে আমাদের বিয়েটাই হলোনা।
মেহেরাজের এই কথায় শ্রেয়সী আরো চমকে যায়।বিয়ে হবে না।তাদের তো বিয়ে ঠিক হয়েছে।শ্রেয়সীর কেমন খারাপ লাগা অনুভব হয়।শ্রেয়সীর মুখ দেখে মেহেরাজ বলে,
-আমার মনে হলো তাই বললাম।আসলে আমি কোনো প্রেসার নিতে চাচ্ছি না এই বিষয়ে।আপনি অবগত আপনি আমার লাইফ এর প্রথম নারী।আর আমি চাই আমার সারাজীবনের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে আপনি ই থাকেন।কিন্তু যদি আমার ধারনা ঠিক হয় তাহলে আপনার বাবা ভাই আমাদের মিল হতে দিবে না।বিয়েতে রাজি হওয়া সম্পুর্ন একটা সাজানো নাটক হতে পারে।
মেহেরাজের কথায় আতকে উঠে শ্রেয়সী।সে তো এভাবে ভেবে দেখেনি।আসলেই যদি এমন হয়।শ্রেয়সী আর চায় না কলঙ্ক মাখতে।এই মানুষটার সাথে একবার নিজেকে জড়িয়েছে অজানায় এবার জেনে শুনেই জড়িয়ে সারাজীবন বাচতে চায় একত্রে।শ্রেয়সীর ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে মেহেরাজের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিয়ে বলে,

-জানিনা আপ্নার ভাবনার সত্যতা কতটুকু।তবে সত্যি বলতে আমি চাইনা আমার জীবনে আর কলঙ্ক আসুক।আপনার নামের যে কলঙ্ক আমার গায়ে লেগেছে সেটা সাথে নিয়ে আপনার সাথে বাচতে চায় আমি।
শ্রেয়সী চুপ করে।মেহেরাজের কথায় বাবা ভাইয়ের প্রতি আলাদা মনোভাব জন্মে গেছে যদি সত্যি এমন হয়।মেহেরাজ কিছু বলবে তার আগে শ্রেয়সী আবার বলে,
-আর আপনার ধারনা ঠিক হলে।আমাদের কি আর মিল হবেনা।এই কলঙ্ক কি আমাকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে??
-উহু না।সেই সব ব্যাবস্থা আমি করে এসেছি।এখন শুধু আপনার অনুমতির অপেক্ষা।
-কি ব্যাবস্থা।
শ্রেয়সীর কথায় মেহেরাজ হাতের সেই ফাইল টা শ্রেয়সীর দিকে এগিয়ে দেয়।সেখানে তিন পৃষ্ঠার একটা দলিল।বিয়ের কথা উল্লেখ করা আছে।শ্রেয়সী আর কিছু দেখলো না মেহেরাজের দিকে তাকিয়ে বললো,
-বিয়ের চুক্তি??
-হ্যাঁ!!
শ্রেয়সী মেহেরাজের কথায় ফাইল টা বন্ধ করে দিলো।মেহেরাজের অগ্রিম ভাবনায় মুগ্ধ শ্রেয়সী।শ্রেয়সীর ভাবনার মাঝেই মেহেরাজ টেবিলের এক পাশে রাখা লাল গোলাপ টা এবার শ্রেয়সীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শান্ত স্বরে বলে,
-সারা জীবনের সঙ্গী হবেন আমার।অনেক ভালোবাসবো।আদর করবো।শাষন করবো আবার দিন শেষে বুকে টেনে নিবো।বলুন হবেন আমার দিনশেষে ঘরে ফিরে এক বুক প্রশান্তি ভরা হাসি দিয়ে ক্লান্তি মিলিয়ে দেওয়ার সঙ্গী।

মেহেরাজের নেশালো কন্ঠস্বর মাতাল করে তুললো শ্রেয়সী কে।কিভাবে মানা করবে সে।কলেজ এ প্রথম দিন দেখে যার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল আর এমনকি সে তার বিবাহিত স্বামি হওয়া যায় না তার সঙ্গি।শ্রেয়সী কাপা কাপা মেহেরাজের হাত থেকে গোলাপ টা নিলো।তারপর মেহেরাজের হাতের উপর হাত রেখে বলল,
-হুম হবো আপনার সারাজীবনের সঙ্গী।শেষ বয়সে পানের সুপারি কেটে দেওয়ার মতো সঙ্গী।হাতে হাত রেখে জীবনের সমস্ত ধূলিঝড় অতিক্রম করার মতো সঙ্গী।
শ্রেয়সী কাব্যিক কথায় মেহেরাজ ভিষন খুশি হয়।এদিকে শ্রেয়সী নিজের কথায় নিজেই লজ্জা পায়।মেহেরাজ শ্রেয়সীর হাত টা নিয়ে মুখ বাড়িয়ে হাতে চুমু দেয়।সর্বাঙ্গ কেপে উঠে শ্রেয়সীর।মেহেরাজ তা লক্ষ করে।বেলি ফুলের মালাটা নিয়ে শ্রেয়সীর হাতে বেধে দিয়ে বলে,
-আজকের পর থেকে আমি আপনার সকল সুখ দুঃখের সাথী হয়ে গেলাম হৃদয়হরনী।

বিছানায় বসে এক হাত দিয়ে নিজের মাথা অনবরত টিপে যাচ্ছে তোহা।মাথা যন্ত্রনা শুরু হয়েছে তার।সিয়াম দোকানে।আলতাফ শেখ দুপুরে খাওয়ার পর আজ আর দোকানে যায়নি।ঘুমিয়ে আছে এখন।তোহা ঘরের দরজা লাগিয়ে তুহিনের দেওয়া ম্যাসেজ গুলো চেক করছে।আগামীকাল সন্ধাই তিন যায়গায় আগুন লেগেছে হুট করে।তবে একটা যায়গা খালের ধারে।তোহা অনেক্ষন ভেবে সেটার ডিটেইলস চাইলে তুহিন পরপর সব দিয়ে দেই যে ওই বাড়িতে চার জন্য সদস্য ছিলো কাল রাতে আগুনে পুড়ে সবাই মারা গেছে।আর একই এলাকার একজন পুলিশ ও নিখোঁজ।
তোহা দুই দুই এ চার মিলিয়ে নেয়।যদিও শিওর না তবে সন্দেহের পাতায় সিয়ামের নাম আরো দৃড় হয়ে উঠলো।তোহা তুহিনের সাথে আরো বেশ কিছুক্ষন কথা বলে ফোন রেখে দেয় মাথা যন্ত্রনায় তাকাতে পারছে না মেয়েটা।বিছানায় সুয়ে পড়ে একপাশ ফিরে।
আজ থেকে পনেরো বছর আগে যখন তোহা ছোট।তখন তার বাবাকে হারায় তোহা।প্রথমে সব সাভাবিক হলেও পরে তার মা তাদের বলেছিলো তার বাবাকে খুন করা হয়েছে।আর খুন এই আলতাফ শেখ ই করেছে জমির লোভে।আর সেই জমির উপরের বাড়িতেই তোহা এখন সুয়ে আছে।

প্রথমে কিছু না বুজলেও কিছুদিন পর তোহার মাও নিখোঁজ হয়ে যায়।এমনকি তার বড় ভাই ও।রাস্তার পাশের ঝোপের ভিতরে ঠিক দুদিন পর মা ভাইয়ের লাশ পেয়েছিলো সবাই।তোহা এমন পরিস্থিতিতে খুব ভেঙে পড়েছিলো তখন তার সব সময়ের সাথী তার ভাই তার মাথার উপর ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।চাচীর কাছে মানুষ হয়েছে তারা।তবে মাথায় জন্মেছিলো বাবা মা হত্যার প্রতিশোধ এর নেশা।কারন তখন একটা পুলিশ কেচ ও হয়নি যে তিন তিন টে মানুষ এমন মারা গেলো তাও। দিনে দিনে সবাই তার বাবা মাকে ভুলে গেলেও তোহা ভুলে যেতে পারেনি।তাইতো পুলিশ এ চাকরি নেওয়ার পর সিক্রেট এজেন্ট হিসেবে কাজ করে গেছে।আর সেই প্রতিশোধ এর সুত্র ধরেই সিয়ামের সাথে বিয়ে তোহার।তোহা সিয়াম কে কখোনো ভালোবাসতে পারেনি।বরাবর একজন খুনির সন্তান হিসেবেই দেখেছে।তবে সিয়ামের ব্যাবহার তাকে তার মায়ায় আটকে রেখেছে তোহাকে।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৩

এ বাড়িতে আসার আগেই তোহা অন্য একটা মিশন সামলাচ্ছিলো তবে মাঝপথে কোনো প্রকার কোনো প্রমান না পাওয়াই বন্ধ করে এই বাড়িতে ঢুকেছিলো নিজের প্রতিশোধ নিতে।তবে তোহার সন্দেহ যায়নি।ওইজে কথায় বলে না পুলিশের মন মানুষের মুখ দেখলে বুজে যায় অন্তরে কি খেলছে।তোহা সব সময় খেয়াল করেছে এত এত পুলিশ নিখোঁজ হলেও তার শশুর এর মনে কোনো অনুশুচনা নেই।এমনকি এত বাচ্চা এতো নারী নিখোঁজ হয় সংবাদপত্রে প্রতিদিন প্রকাশিত হয় তাও কোনো খারাপ লাগা কাজ করেনা।এমনকি সিয়াম ও এসব পাত্তা দেই না।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here