লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪৯
নুসাইবা আরা নুরি
আলতাফ শেখ এর কথায় সিয়াম কোনো উত্তর দেই না।মাথায় তড়তড় করে রক্ত উঠে গেছে সিয়ামের।তার বিবেক বলছে আনাম মিয়া এই কাজ করেনি তবে মন বলছে আনাম মিয়া করেছে।আর যদি তার বউ আর বোনের কোনো ক্ষতি হয় জ্যান্ত কুপিয়ে মারবে ওই আনাম মিয়াকে সিয়াম।।
মাথা কাজ করছে না একদিকে নিলয় মির্জার হুমকি।পাড়া প্রতিবেশীদের ছি ছি আর নিজেদের জালে নিজেরা আটকিয়ে দুজন জলজ্যান্ত মানুষ নিখোজ।কি থেকে কি করবে সিয়াম।এতো টাকা যাদের জন্য ইনকাম করলো যাদের সুখের জন্য এই পথ বেছে নিলো আজ তাদেরই খুজে পাচ্ছে না।কেমন পাগল পাগল লাগছে ওর।
আর বসে থাকতে পারছে না হাত পা গুটিয়ে।তোহাকে ভিষন ভালোবাসে সিয়াম তার চেয়েও বেশি ভালোবাসে শ্রেয়সীকে।খুব আদরের বোন তার।নিজের মনে নিজেকেই গালি দিচ্ছে।কেন প্রতিশোধ নিতে চাইলো। না নিলেই তো হতো তাহলে তার বোন বউ টা আজ তার আয়ত্তে থাকতো।আর কেনই বা কাল রাতে আনাম মিয়াকে সব বলতে গেলো।
সিয়ামের ভাবনার মাঝে আলতাফ শেখ সিয়ামের কাধে হাত রেখে বলল,
-কি হয়েছে।এমন অস্থির হয়ে আছিস কেন।চিন্তা না নিয়ে কোথায় গিয়েছে খুজতে হবে।লোক লাগা।টাকা খরচ কর।ওদের খুজে পেতে হবে।আমার মেয়ে আমার খারাপ লাগছে না।
আলতাফ শেখ এর কথায় সিয়াম রাগে ফুশে উঠে তারপর বলে,
-খোজ আমি পেয়ে গেছি।এখন শুধু তোমার অনুমতির অপেক্ষা।আমার কলিজায় হাত দিয়েছে আমি কি ছেড়ে দিবো।কখোনোই না।যারা করেছে তারাই বলেছে।
সিয়ামের কথায় আলতাফ শেখ অবাক হয়ে বলে,
-মানে খুজে পেয়েছিস তাহলে বসে আছিস কেন।চল যাবো এক্ষুনি যাবো।আর কে কলিজায় হাত দিয়েছে।
-তোমার যাওয়া লাগবে না।শুধু অনুমতি দাও।ওদের উদ্ধার করতে যদি আমার কাওকে উপরে পাঠাতে হয় তাহলে আমি তাই পাঠাবো।আমার কলিজায় হাত দেওয়া।
কথাটা বলে সিয়াম উঠে দাঁড়ায়।বাইরে এখোনো রাত।ডাইনিং থেকে বেরিয়ে বাইরে আসে।পিছন পিছন আলতাফ শেখ ও আসে।তখন সিয়াম একজনের থেকে শুনেছে খুব বিশ্বাসযোগ্য হওয়াই বলে দিয়েছে যে আনাম মিয়া কিডন্যাপ করতে চেয়েছিলো।তবে আর কিছু জানেমা।সিয়াম বেরিয়ে বাড়ির সামনে রাখা নিজের মটর সাইকেল টায় উঠে বসে আলতাফ শেখ এর মুখের দিকে তাকাতেই তিনি হ্যা সুচক মাথা নাড়ায়।সিয়াম বাইক স্টার্ট দেওয়ার পর হটাৎ আলতাফ শেখ বলে উঠে,
-লোক্টা কে বলে তো যা।আমার চিন্তা হচ্ছে।
সিয়াম বাইক স্টার্ট দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
-তোমার পাপের রাজত্বের অর্ধেক ভাগিদার।
আর দাঁড়ায় না সিয়াম। বাইক এর স্পীড বাড়িয়ে অন্ধকারে হারিয়ে যায় কিছুক্ষনের ভিতরেই।সিয়ামের কথা শুনে বুকে ব্যাথা করে উঠে যায় আলতাফ শেখ এর। সিয়াম কে থামানোর জন্য বাড়ির মেন গেট পর্যন্ত আসলেও কাজ হয় না।সিয়াম কি বলে গেলো সে কি জানে।আনাম মিয়া জিবনেও এই কাজ করতে পারে না।আর সিয়াম একা আনাম মিয়া যদি ওর কোনো ক্ষতি করে দেয়।তার বউমা মেয়ে ঠিক আছে তো।হটাৎ ঘোর চিন্তায় মাথার ভিতর চক্কর দিয়ে বুকের বাম পাশে ডান হাত চেপে মৃদু চিৎকার করে মাটিতে ধপাশ করে পড়ে যায় আলতাফ শেখ।চোখে পরা হাই পাওয়ারের চশমা টা ছিটকে অন্ধকারে পড়ে যায়।
সকাল সাড়ে সাত টা।ফ্লাট টা তোহা আর শ্রেয়সীর ভিষন পছন্দ হয়েছে।যদিও সব কিছু গোপন রাখতে চেয়েছিলো তবে তোহার কথায় মেহেরাজ হুট করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইভান,,তুহিন আর মিলি কে নিয়ে আসবে এখানে।যেই ভাবা সেই কাজ ইভান কে খুব সতর্কতার সাথে ম্যাসেজ করে বলে দিয়েছে সে কোথায়।শুধু মাত্র তুহিন আর মিলিকে নিয়ে যেকোনো বাহানা বানিয়ে চলে আসতে।তাও ফোনের সিম অফ করে দিয়ে ইভানের নতুন সিম চালু করে।যাতে আপাতত ফাহিম ও কোনো খোজ না পায়।
মেহেরাজের কথা মতো সকাল সকাল ট্যুর এর নাম করে ইভান তুহিন আর মিলি বেরিয়ে পড়ে থেকে।যদিও এমন পরিস্থিতি তে ট্যুর এর কথা শুনে নিলয় মির্জা রেগে গেছিলো তবে নাহিদা খাতুনের জন্য সব শেষ এ ইভান রা আসতে পেরেছে।মেহেরাজের কথা মতো তুহিন তার ফ্লাট থেকে তোহার ল্যাপটপ রিভলবার সব গুছিয়ে নিয়েছে।সাথে জামাকাপড় ও।
তবে এখোনো বলেনি যে তোহা আর মিলিকে মেহেরাজ নিয়ে গেছে শুধু বলেছে গুরুত্বপূর্ণ মিশন কম্পিলিট করতে হবে কয়েক দিনের ভিতরেই।তাই সব কিছুই যত দ্রুত সম্ভব করতে হবে সময় অপচয় করা যাবে না।তবে এবারের মিশন সম্পর্কে একটা কাক পক্ষি ও জানবে না ওরা পাচ জন বাদে।তঅবে কিসের মিশন তা তোহা মেহেরাজ কে বললেও মেহেরাজ ইভানদের বলেনি।
মেহেরাজ সকালে তোহা আর শ্রেয়সীকে নিয়ে শপিং এ গেছিলো অনেক কিছুই কিনেছে।তারা।তোহা আর শ্রেয়সী শাড়ি নিয়েছে কয়েকটা।সবই পরায় মেহেরাজের পছন্দ মতো।তঅবে আজ যেনো মেহেরাজের কোনো কিছুতেই মন ছিলো না।পুরোটা সময় চিন্তায় নিমগ্ন ছিলো।শ্রেয়সী একবার জিজ্ঞাসা করেছিলো তবে মেহেরাজ কোনো উত্তর দেই নি।
দুপুর আড়াই টাই তুহিন রা মেহেরাজদের ফ্লাটে এসে পৌছায়।প্রথমে সকলেই অবাক হয়ে গেছিলো তোহা আর শ্রেয়সীকে দেখে।তারপর তোহা মেহেরাজের বলা কথা গুলোই তুহিন দের শুনিয়ে দেয় ওরাও বিশ্বাস করে নেয়।তোহা মুলত সবাইকে আসতে বলেছে কিছু প্রমান সংগ্রহ করার জন্য এতো দূরে যেহেতু আছে সেহেতু ফাও বসে না নিজেদের মিশন কম্পিলিট করবে এখানে থেকেই।
সবাই কথা বার্তা বললেও মেহেরাজ চুপ চাপ।বরাবর চুপ থাকে বলে ওর মনের অবস্থা কেও বুজতে পারেনি।দুপুরে তোহা রান্না করেছিলো তাই সবাইকে খেতে দিয়েছে।মেহেতাজ ও কোনো রকমে খেয়ে ঘরে চলে গিয়েছে।তারপর ভিতর থেকে দরজা লাগিয়ে দিয়েছে।মেহেরাজের এমন আচরন কারোর কাছেই পরিচিত না তাই সবাই চিন্তিত।
মেহেরাজ ঘরে গিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে ফাহিমের নাম্বারে ফোন লাগায়।সাথে সাথে রিসিভ হয় ফোন।মেহেরাজ কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে ফাহিম উত্তেজিত কন্ঠে বলে,
-কন্ডিশন ভালো না।আই সি ইউ তে রয়েছে।তুই ঠিক সময় ফোন না দিলে জানতাম ও না।যাক ওনার কপাল ভালো যে ওই রাতে ছেলে দুটো যাচ্ছিলো ওই রাস্তা দিয়ে ভাজ্ঞিস চকিদার কএ বলেছিলো নয়তো বাচানো যেতো না লোকটাকে।
ফাহিমের এক্সট্রা কথা মেহেরাজ বিরক্তির দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে তারপর বলে,
-সিয়াম কোথাই। আর কন্ডিশন কেমন খারাপ??
মেহেরাজের কথায় ফাহিম বলে,
-সিয়াম আই সি ইউ রুমের বাইরে চেয়ারে বসে আছে।আর শ্রেয়সী মায়ের সেন্স নেই।আরেক কেবিনে ভর্তি।আর..
-আর কি??
-আলতাফ শেখ মানে তোর শশুর এর ব্রেন স্ট্রোক হয়েছে।মুখ কিছুটা বেকে গেছে সাথে শরীরের ডান সাইড পুরোটা প্যারালাইসড হয়ে গেছে।যত টুকু শুনলাম।কন্ডিশন খুব একটা ভালো না।আবারো যদি এমন কিছু হয় তাহলে ফুল প্যারালাইসড বা মৃত্যু ও হতে পারে।
-ওহ।
-শ্রেয়সী দের এখোনো খোজ পাওয়া যায়নি।সেই চিন্তাতেই এমন হয়েছে।তুই ও চিন্তা করিস না খুব তাড়াতাড়ি খুজে পাবো।তুহিন কে বলেছি পুলিশ লাগাতে।
-আচ্ছা।রাখছি মন মেজাজ খুব খারাপ লাগছে।সময় মতো একটু আপডেট দিস।আর এই খবর আপাতত কাওকেই জানানোর দরকার নেই।
-আচ্ছা চিন্তা নিস না। আল্লাহ হাফেজ।
ফাহিম ফোন কেটে দিতেই মেহেরাজ ফোন টা বিছানায় ছুড়ে দিলো।তার লোকজন সব সময় শেখ বাড়ির উপরে নজর রাখছে।কাল রাতে অমন হওয়ার পরেই সে জানতে পেরেছিলো আর তার হুকুমেই আলতাফ শেখ এর হসপিটালে জাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো।নয়তো কবরে যেতেন এতক্ষন কারন খাদিজা খাতুন ভিতরের ঘরে ঘুমাচ্ছিলেন।
আর সেই কারনেই মেহেরাজ এর মাথায় চিন্তা।এখন শ্রেয়সী কে বললে কেদে কুটে মাথা খারাপ করে ফেলবে।বাড়িতে ফিরতে চাইবে।কিন্তু সেটা এখন সম্ভব না।এখন বাড়িতে ফিরলে শিকার খাচার ভিতরে এসেও খোলা দরজা দিয়ে পালাবে।তা মেহেরাজ হতে দিবে না।
সন্ধাই নাস্তা করার পর মিলিকে সকালে কিনে আনা শাড়ি গুলো দেখাচ্ছে শ্রেয়সী আর তোহা।সব কয়টা শাড়ি ই সুন্দর।বিশেষ করে রুপালি পাড়ের একটা গোলাপি রঙের সুতি শাড়ি।এক দেখায় সবার চোখে লাগার মতো।বেশ নরম।মেহেরাজ পছন্দ করে কিনে দিয়েছে ওটা।শ্রেয়সী দাম জিজ্ঞাসা করলেও বলেনি।শুধু বলেছে পছন্দ হলে নাও।আর নয়তো বাদ।শ্রেয়সী কিভাবে মেহেরাজের পছন্দ কে খারাপ বলবে তাই নিয়েছিলো।তবে এখন শাড়ির গায়ের স্টিকারে প্রাইচ দেখে অবাক।একটা শাড়ি দাম পচিশ হাজার টাকা।
শ্রেয়সীকে হা হয়ে যেতে দেখে সোফায় বসা মেহেরাজ চোখ ছোট ছোট করে বলল,
-অবাক হওয়ার কি আছে।আমার বউ এর পছন্দ হয়েছে কিনেছি।দাম দেখার প্রয়োজন মনে করিনা।
মেহেরাজের কথা শুনে মিলি একটু রশিকতার সুরে কেশে বলে,
-হুম হুম শ্রেয়সী শাড়িটা পরে আমার বউ পাগল বন্ধুটাকে একটু পাগল করে দিও।একদম আঁচলে গিট্টু দিয়ে বেধে রেখো আমাদের মেহুকে।
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪৮
মিলির কথায় শ্রেয়সী লজ্জা লায় ভিষন।মেহেরাজ শ্রেয়সীকে লজ্জা পেতে দেখে মুখ বাকিয়ে শ্রেয়সী কে রাগাতে ঠোঁট টিপে মুচকি হেসে ঠাট্টা করে বলে,
-শাড়িই পরতে জানে না।সে নাকি আবার আঁচলে বেধে রাখবে।দিবাসপ্ন দেখতে হবে রে তুহিন্নার লিলিপুট।
