Home লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৮

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৮

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৮
নুসাইবা আরা নুরি

সোফায় বসে মোবাইল স্ক্রল করছে মেহেরাজ।তার সামনের সোফায় বসে আছে ফাহিম।ফাহিমের চোখ মুখ গম্ভীর আজ।সাহিদা খাতুন এসে সন্ধার চা নাস্তা দিয়ে গেছেন ড্রয়িং রুমে।মেহেরাজ একটা বিস্কুট নিয়ে কামড় দিতেই ফাহিম বলে উঠে,
-তুই ডিভোর্স পেপারে ছিড়লি কেন??
-এমনি!
-এমনি মানে কত তাড়া দেখিয়ে কয়েক ঘন্টায় রেডি করিয়েছিস আমাকে দিয়ে যেখানে বাইরে উকিল দিয়ে করালে ডেট এর পর ডেট ফেলে।তুই আমার কষ্টে পানি ঢেলে দিলি??
-তো ডিভোর্স দিলে খুশি হতি??
-তা নয় কিন্তু কেন ছিড়লি সেটা তো বলবি??
মেহেরাজ টি টেবিলের উপর থেকে চায়ের কাপ টা হাতে নিয়ে চায়ে চুমুক বসালো তারপর বলল,

-আন্টির হাতের চায়ের স্বাদ এখোনো আগের মতোই আছে।
-কিন্তু আমি তোকে অন্য কথা জিজ্ঞাসা করছি।কেন ছিড়লি বল??
-ইচ্ছা হয়েছে তাই।
ফাহিম বেশ কিছুক্ষন চুপ রইলো।সে জেনেই ছাড়বে কেন ছিড়লো মেহেরাজ এই পেপার।কি এমন হলো যে মত বদলে ফেললো।ফাহিম গলা খাকারি দিয়ে আবারো কিছু বলতে যাবে তার আগেই মেহেরাজ বলল,
-দয়া করে তোর রেডিও বন্ধ কর।আমার বউ আমি ডিভোর্স দিবো কি দিবোনা আমার ব্যাপার তাই ছিড়েছি।তোর পারিশ্রমিক লাগলে বলিস দিয়ে দিবো।
-তুই আমাকে টাকার গরম দেখাচ্ছিস।আমি ফ্যান চালিয়ে কম্বল গায়ে দিয়ে ঘুমাই।
মেহেরাজ বিরক্ত হয়।এই ছেলে শুধরাবে না।মেহেরাজ চা শেষ করে ফাহিম কে বলে,
-দলিল রেডি কর।যে শ্রেয়সী শেখ যদি আমার থেকে বিচ্ছেদ চাই তাহলে কাবিন নামার টাকার সাথে আমার সাথে আরো একশ বছর এক সাথে সংসার করা লাগবে আর পুরো একটা ফুটবল টিম বানানো লাগবে।যার সব কয়টার ডি এন এ হবে আমার। আর তোর পারিশ্রমিক দিয়ে দিবো ফ্রী কাজ আমি করিয়ে নেই না।
কথাটা বলেই মেহেরাজ নিজের ঘরে চলে যায়।এদিকে মেহেরাজ চলে যেতেই ফাহিম মাথাই হাত দিয়ে বিড়বিড় করে,
-গিরগিটি ও তোরে দেখে লজ্জা পাবে ভাই।একবার বলিস ডিভোর্স দিবো একবার বলিস ফুটবল টিম বানাবো।নেভিতে চাকরি করলে কি সব পাগল হয়ে যায়।নাকি বউ এর শোকে তুই একা পাগল হয়েছিস বলে আমাকেও বানাবি।

পুর্ব দিখন্তে আলোর রেখা দেখা দিয়েছে।হলদেটে আলোয় পুরো আকাশ চকচক করছে।পাখিরা কিচিরমিচির করছে বাগানের ফুল গুলো ফোটা শুরু হয়ে গেছে।সাদের কিনারায় বুকে হাত গুজে দাঁড়িয়ে আছে শ্রেয়সী। চোখ গুলো ফুলে লাল হয়ে গেছে।সারা রাত ঘুম হয়নি ওর।খুব কেদেছে।
মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো অতীতে বলা সবার কথা গুলো।নিশ্চয় মেয়েটা দেখতে খারাপ।হয়তো মেয়েটার চরিত্র খারাপ।হয়তো মেয়েটার কোনো প্রাক্তন ঝামেলা করছে।হয়তো বাড়ির লোক খারাপ।আরো কত কি।যে কথা গুলো কখোনো কল্পনা করেনি সেই কথা গুলো ও শুনেছে শ্রেয়সী।
শ্রেয়সী কোনোদিন বিয়েতে রাজি ছিলনা একদিন স্কুল থেকে বাড়ি এসে শুনলো তার বিয়ে। ছেলে পক্ষ দেখতে এসেছে।তখন তার মা বলেছিলো দেখতে এলেই কি বিয়ে ঠিক হয়।পরে বুজতে পারে ছেলে পক্ষ তার বাবার পুরোনো বন্ধু।অনেকবার দেখেছে।আর সেই বন্ধুই তার ছেলের জন্য তাকে চেয়েছে।কিন্তু শ্রেয়সী যেটা কল্পনায় ও ভাবেনি সেটা ছিলো সেদিন রাতেই তার বাবা বলে আগামীকাল তার বিয়ে।
শ্রেয়সী সেদিন অনেক কেদেছিলো।যদিও আলতাফ শেখ এর তার একমাত্র মেয়েকে এতো ছোট বয়সে বিয়ে দেবার বিন্দু মাত্র ইচ্ছা ছিলো না তবুও বন্ধুর প্রস্তাব এ প্রত্যাখ্যান করতে পারেনি।কিভাবে করবে ছেলে যে নেভির একজন অফিসার।এমন ছেলে কি কোনো বাবা হাত ছাড়া করতে চাইবে।তাই নিজের বন্ধুর উপর ভরসা করে তুলে দেয় নিজের মেয়ের হাত বন্ধুর ছেলের হাতে।

শ্রেয়সীর মাথায় ঘোমটা থাকায় সেদিন ছেলের মুখ দেখতে পাইনি।তবে আশে পাশের কিছু মানুষের কথা শুনেছিলো ছেলে নাকি চাদের মতো সুন্দর।শ্রেয়সীর মনে কল্পলোকে আকিয়ে ফেলেছিলো ছেলেটিকে।তবে শ্রেয়সী ভাবেনি।শশুর বাড়ি গিয়ে তার ঘরে পা রাখা মাত্রই তার স্বামি তাকে ছেটে চলে যাবে।
এই ট্রমা থেকে বের হতে শ্রেয়সীর সময় লাগলেও শ্রেয়সী প্রতিটা মানুষের যন্ত্রনা দায়ক কথা গুলো মনে রেখেছে।বিয়ের দুদিন পর যখ শ্রেয়সী ডিভোর্স পেপারে সামির সিগনেচার দেখেছিলো তখন বুজেছিলো।ওই পুরুষ আসলেই বাবা মায়ের মন রাখতে বিয়ে করেছে।তার কাছে বিয়ে মানে ছেলে খেলা।তবে শ্রেয়সীর কাছে তো ছিলনা।তবুও সেদিন সিগনেচার করেছিলো সেই অদেখা পুরুষটাকে তার ঘৃনার পাত্রে প্রথম স্থান দিয়ে।
আর সেদিন তাকেই কিনা কলেজে দেখে প্রথম দেখায় শ্রেয়সী ক্রাশ খেয়েছিলো।মনের মাঝে তুফান উঠেছিলো।শ্রেয়সীর চোখ ভিজে আসে টপ টপ করে পানি পড়ে।উত্তর মিলে না।কেন দেখা হলো তার সাথে আবার তার।অদেখা মানুষটা অদেখাই থাকতো।এই মেহেরাজ মির্জা কেন ওই কাপুরষ লোকটা হলো।কেন এসেছে সে।তাকে আবার কষ্ট দিতে।তার জীবনে কি কলঙ্ক কম পড়ে গেছে।আবারো কলঙ্কিত করতে এসেছে।
হাতের তালু দিয়ে চোখ মুছে নেয় শ্রেয়সী।কাল রাতে ইরুকে মেহেরাজের আসল সত্য বলার পর ইরু ও অবাক হয়েছিলো।ইরু শ্রেয়সী কে শান্তনা দিয়েছে অনেক।তবে শ্রেয়সী কি সেই শান্তনা শুনেছে।শ্রেয়সী তো ওই ঘৃনিত কাপুরষ টাকে ভুলে গেছিলো প্রায়।ভুলেছিলো সেই ডিভোর্সি মেয়ে নামক কলঙ্কের কথা।তাহলে কেন আল্লাহ তাকে আবার ওই মানুষটার সামনে দাড় করালো।

শ্রেয়সী জানে না।বুক ভাঙা কান্না আসছে শুধুই।নিচ থেকে মায়ের ডাকে শ্রেয়সী চোখ মুছে নিচে চলে আসে।সেই ফজরের নামাজ পড়ে সাদে এসেছে এখন হয়তো সাতটা বেজে গেছে।শ্রেয়সী ডাইনিং টেবিলে এলো।এতোদিনের খোপা করে রাখা চুল গুলো আজ ছেড়ে দেওয়া হাটুর উপর সমান চুল গুলো আজ এলোমেলো।মুখ টা শুকনো।মাথায় বড় করে কাপড় দেওয়ায় শ্রেয়সী চোখ জোড়া হটাৎ দেখা যাচ্ছে না।
প্রতিদিনের মতো বাবা ভাইয়ের সাথে খেতে বসে শ্রেয়সী।আজ টেবিল টা নিশ্চুপ।খেতে খেতে হটাৎ সিয়াম বলে,

-এই মাথা নিচু করে খাচ্ছিস কেন।আর তোর চুল খোলা মাথায় কাপড় দেয়া কেন মুখ ঢেকে।বলেছি না খাওয়ার সময় চুল বেধে রাখবি।
শ্রেয়সি শুধু মাথা নাড়ায়। সিয়ামের খটকা লাগে।তাই পাশের উঠে গিয়ে শ্রেয়সীর পাশের চেয়ার টেনে বসে।শ্রেয়সী কিছুটা কেপে উঠে।সিয়াম বাবার দিকে একবার তাকিয়ে শ্রেয়সীর মাথার কাপড় টান দিতেই সবার চোখে পড়ে ফর্সা মুখে ফুটে উঠা লাল চোখ জোড়া।এখোনো লাল।
সিয়ামের আর বুজতে বাকি থাকে না এর কারন কি।সিয়াম খাবার প্লেট সরিয়ে হুংকার দিয়ে বলে,
-তুই ও কু*ত্তার বাচ্চার জন্য কেদে চোখ ফুলিয়েছিস।তোকে বলেছি না পুরোনো কথা ভুলে যেতে।কোন সাহসে কেদেছিস তুই।
শ্রেয়সী কেপে উঠে।খাদিজা খাতুন ও ভয় পাই ছেলের এমন রাগ দেখে।তিনি এগিয়ে এসে কিছু বলতে যাবেন তার আগেই সিয়াম আলতাফ শেখকে বলে,

-আব্বু তুমি দোকানে যেয়ো।আমি মির্জা বাড়িতে যাবো।আমার বোনকে কাদিয়ে শান্তি হয়নি একবার ডিভোর্স দিয়ে।আবার কি কারনে এসেছে।সব হিসাব ক্লিয়ার করেই আসবো।
সিয়াম এবার শ্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে কড়্ব কন্ঠে বলে,
-তোকে না বলেছি তোর কোনো অতীত ছিল না।আমি আব্বুকে বার বার বলেছিলাম বিয়ে না দিতে।তখন একবার শুনলে আমার কথা তোর আজ আর কাদা লাগতো না।তবে তোর ভাই বেচে থাকতে তোর চোখের পানি পড়তে দিবে না।
কথাটা বলে সিয়াম আর দাঁড়ায় না।না খেয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।এদিকে সিয়াম যেতেই ঠোঁট কামড়ে কেদে উঠে শ্রেয়সী।তার তো মেহেরাজের কথা মনে হয়না হয়তো আশ পাশের মানুষের বলা তিক্ত কথা গুলোর কথা।যা শ্রেয়সীকে ভীষন যন্ত্রনা দেয়।

ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠে গেছে মেহেরাজ।ফোনের রিংটোন এর শব্দে ঘুম ছুটে গেছে তার।তাই ঘরের বেলকোনিতে হাটাহাটি করছে।বাড়ি থেকে একবার দাদা নয়তো মা কল দিচ্ছে।মেহেরাজ বিরক্ত হয়ে ফোনে এরোপ্লেন মুড চালু করে রেখে দেয়।বাড়ির সকলেই জানে মেহেরাজ প্রচন্ড জেদি।আর এই জেদ এর কারনেই মেহেরাজ আর্মির ট্রেনিং ছেড়ে নৌবাহিনীতে গেছে।
ছোট বেলা থেকে মেহেরাজ গম্ভীর প্রকৃতির আর প্রচন্ড জেদি।যেটা তার পছন্দ হবে সেটা সে নিয়েই ছেড়েছে ছোট থেকে।সেই জিনিস একান্তই তার।কেও হাত দিলে তার হাত কামড়িয়ে মেরে ধরে লাল করে দিতো।সেজন্য মেহেরাজের ছোট বেলায় বন্ধুর সংখ্যা ছিলো কম।মেহেতাজ যেমন কারোর জিনিসে হাত দিবে না তেমন তার জিনিসেও কেও হাত দিতে পারবে না এটাই তার রুলস।আর এই রুলস আজ ও আছে।ছোট থেকেই মেহেরাজের জেদ এর পাশাপাশি ছিল রাগ।একবার রেগে গেলে শারমিন খাতুন বাদে মেহেরাজ কে ঠান্ডা করা মুশকিল হয়ে যেত।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৭

মেহেরাজ বরাবর দাদির কাছে শান্ত।তাইতো দাদি ওকে এতো ভালোবাসেন।মেহেরাজ বারান্দা থেকে ঘরে চলে আসে।নিজের ব্যাগ থেকে ল্যাপটপ টা বের করতে যেতেই হাতে পড়ে শ্রেয়সীর সেই নুপুর টা।সকাল সকাল মেহেরাজের মুড ভালো হয়ে যায়।বিরক্তি কেটে গিয়ে গম্ভীর মুখে হাসি ফুটে উঠে।মেহেরাজ বিড়বিড় করে বলে,
“আম কামিং মাই ওয়াইফি।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here