Home শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ৯

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ৯

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ৯
রুহানিয়া ইমরোজ

আরশিয়ানের বুকে হেলান দিয়ে বসেছিল প্রিমা। কত সময় পেরিয়েছে কে জানে? মাগরিবের আযান দিতেই তার হুঁশ ফেরে। ঝট করে সরে আসতে নিলে আরশিয়ান চিন্তিত গলায় বলে,
–” রিল্যাক্স।
প্রিমা সরে গিয়ে ফর্মালিটির স্বরে বলে,
–” আম স্যরি। একটু বেশিই ইমোশনাল হয়ে..
আরশিয়ান তাকে মাঝপথে থামিয়ে বলে উঠে,
–” হওয়াটা অস্বাভাবিক ছিলো না। এই বুকে আশ্রয় নেওয়াটাও আপনার অধিকারের মধ্যে পড়ে। অযথা স্যরি বলবেন না প্লিজ।
প্রিমা চুপ করে যায়। আরশিয়ান তাকে তাড়া দিয়ে বলে,

–” শীতকাল চলছে। ফ্লোর ঠান্ডা। আমরা বেডে বসে কথা বলি?
প্রিমা হকচকিয়ে উঠে দাঁড়ায়। অপ্রস্তুত কন্ঠে বলে,
–” জ্বী।
অতঃপর দু’জন সামান্য দূরত্ব রেখে মুখোমুখি হয়ে বিছানায় বসে। আরশিয়ান সরল দৃষ্টিতে তাকায় বউ এর দিকে। মেয়েটার মুখ শুকনা লাগছে। দুপুর থেকে কিছু খাওয়া হয়নি এজন্যই বোধহয়। আরশিয়ান গলা খাঁকারি দিয়ে নরম গলায় শুধায়,
–” দুর্বল দেখাচ্ছে আপনাকে। এমুহূর্তে কিছু খাওয়া দরকার। হালকা নাস্তার ব্যবস্থা করি?
প্রিমা উদাস কন্ঠে বলল,
–” খাওয়ার রুচি নেই। আপাতত এখান থেকে যেতে চাইছি আমি।
আরশিয়ান বুঝল প্রিমার মনের অবস্থা। তাই জোর না করে ধীর কন্ঠে বলল,
–” আমি পৌঁছে দিয়ে আসি?
প্রিমা মলিন চোখে চেয়ে বলল,

–” লাগবে না।
প্রিমার ভঙ্গুর অবস্থা আরশিয়ানকে আঘাত করে। সে কৈফিয়ত দেওয়ার মতো করে বলে,
–” এরকম করলে হবে? আমি বললাম তো, সর্বচ্চো শাসন করব ওকে। এরপর আর কখনোই আপনার বোনের ধারেকাছেও ঘেঁষবে না তাজরিয়ান। আমি ওকে দিয়ে মাফ চাওয়াব প্রয়োজনে।
প্রিমা কঠিন চোখে চেয়ে বলে,
–” আমি দয়া চাইনি মিস্টার চৌধুরী। সুবিচার চেয়েছি..
আরশিয়ান থমকাল সামান্য। কী বলতে চাইছে প্রিমা? সে দয়া দেখাচ্ছে? কথাটাতে কষ্ট পেলেও তা প্রকাশ করল না আরশিয়ান। সহজ গলায় শুধাল,
–” এটা দয়া মনে হচ্ছে আপনার?
প্রিমা সোজাসাপটা বলল,
–” আলবাত..
আরশিয়ানও এবার সরাসরি জিজ্ঞেস করল,

–” তাজরিয়ান কে কোন শাস্তি দিলে সেটা আপনার কাছে সুবিচার বলে মনে হবে?
প্রিমা সামান্য থেমে শক্ত গলায় বলল,
–” আপনার ভাই যদি সকলের সামনে নিজের ভুল স্বীকার করে মাফ চাই তাহলে সেটা আমার কাছে সুবিচার মনে হবে৷
এপর্যায়ে আরশিয়ান হতভম্ব হয়ে যায়। মাথা ঠিকাছে প্রিমার? কী বলছে এসব সে? পুরো ব্যপারটা হজম করতে একটু সময় লাগলো তার। থেমে থেমে বলল,

–” এমনটা পসিবল নয় ওয়াইফি। তাজরিয়ান যেই কিসিমে’র মানুষ, ওকে নিজের ভুল স্বীকার করানো বিশাল কিছু। তবুও আমি ওয়াদা দিচ্ছি সে ভুল স্বীকার করে আপনার বোনের কাছে মাফও চাইবে।
প্রিমা তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
–” জনগনের দায়িত্ব নিয়েছেন অথচ নিজের ঘর এর মানুষের লাগাম আপনার হাতে নেই। আপনি বিচারক তবুও সুবিচার এর জায়গায় স্বজনপ্রীতি প্রাধান্য পাচ্ছে আপনার নিকট। ভালোই..
বিদ্রুপটা গায়ে লাগে আরশিয়ানের। কিন্তু কথার প্রেক্ষিতে বলার মতো কিছু পায় না। শান্ত স্বরে বলে,
–” আপনি জেদের বশবর্তী হয়ে বলছেন কথাগুলো। শান্ত হোন। ভেবে দেখেন এরপর সিধান্ত জানায়েন আমাকে।
প্রিমা বুঝে গেলো যা বোঝার। স্বার্থের দুনিয়ায় কে কার? তাই আর কথা বাড়ানোর প্রয়োজন বোধ করল না। বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

–” আপনার বিচার আপনাকেই মোবারক।
বলে আর একমুহূর্ত দাঁড়াল না। আরশিয়ানও পেছন থেকে তাকে ডাকলো না। হতাশার শ্বাস ফেলে ফোন বের করে আবির্ভাব কে মেসেজ পাঠাল,
–” আমার রাগান্বিতা কে ঠিকঠাক মতো চৌধুরী এপার্টমেন্টে পৌঁছে দিয়ে এসো।
রকিং চেয়ারে হেলান দিয়ে গতকাল সন্ধ্যার কথাই ভাবছিল আরশিয়ান। রাত পেরিয়ে ভোর হয়েছে তবুও তার চিন্তায় একচুল পরিবর্তন ঘটেনি। প্রিমা যাওয়ার পর থেকেই তার কল তুলছে না। মেসেজ পাঠালে রিপ্লাই এসেছে,
–” আমি দুঃখিত আজকে দুঃসাহস দেখানোর জন্য। আসলে লোভী তো তাই আপনার থেকে অতি ভালো আচরণ পেয়ে কন্ট্র্যাক্টের কথা ভুলতে বসেছিলাম। কখন কোথায় আসতে হবে জানিয়ে দিয়েন স্যার। আমি চলে আসবো। সম্পর্কটা যেহেতু দেওয়া নেওয়ার তাই এখানে যত্ন, সুবিধা, অসুবিধা থাকাটা ভুল। কাইন্ডলি ওসব আর দেখাবেন না৷
আরশিয়ানের রক্ত টগবগিয়ে ফুটে উঠেছিল মেসেজটা দেখে কিন্তু এখন হুঁশ হারানোর সময় নয়। তার মেজাজ বিগড়ালে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। যেটা কোনো ক্রমেই হতে দেওয়া যাবে না।
ভাবনার মাঝে ডুবে ছিলো আরশিয়ান। এমন সময় কেউ দরজায় নক করে। আরশিয়ান বিরক্তির স্বরে বলে,

–” কাম
তামজিদ হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে বলে,
–” ঘুমের ঘোরে তাজিরিয়ান স্যার কেমন যেনো করছেন বস..
আরশিয়ান তৎক্ষনাৎ চোখ মেলে তাকায়। অস্ফুটে বলে,
–” ওহ্ শীট।

একটা নয় বছরের ছেলেকে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে পিলারের সাথে। তার সারা শরীর জুড়ে রয়েছে অসংখ্য মারের দাগ। ছেলেটার হুঁশ নেই তেমন একটা।
স্রেফ নিভু নিভু চোখে তাকাচ্ছে তার সামনে আদিম খেলায় মত্ত থাকা দুটি নগ্ন দেহের দিকে৷ মজার বিষয় হলো ওরা অপরিচিত কেউ নয়। মহিলাটি তার জন্মদায়িনী মা এবং পুরুষটি তারই বাবার বন্ধু।
কিছু সময়ের ব্যবধানে অশ্লীল শব্দের গুঞ্জনে ভরে উঠে ড্রয়িংরুম। সেই ছেলেটার কানেও আসে সব কিন্তু এতে ওই দু’টো উন্মাদ মানুষের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তারা নিজেদের সময় উপভোগ করতে ব্যস্ত।
সময় পেরোতে থাকে। বাচ্চা ছেলেটা ওসব দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে চোখ বুঁজে আতঙ্কে গুটিয়ে যায়। কিছু সময় পর পুরুষটি সেই নারীর নগ্ন শরীরের উপর থেকে সরে এসে বিশ্রী হেসে বলে,
–” তোমারে না পাইলে মনের ভিতর কেমন কেমন জানি করে তারা। শরীরে অশান্তি লাগে। তুমি আমার সব অসুখের ঔষধ বলেই ছুটে আসি।
সেই নারীটি প্রশান্তির হাসি দিয়ে বলে,

–” তুমি আমার সুখের ঠিকানা বলেই তো আমিও তোমার পাগলামিতে সায় দিই।
লোকটা এতক্ষণ ফ্যান্টাসিতে থাকলেও এবার বাস্তবতায় আসে। চিন্তিত গলায় বলে,
–” তোমার ছেলে তো সব দেখে ফেলেছে। কী করবে এবার? যদি সবাইকে বলে দেয়?
মহিলাটি তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
–” বলার জন্য তো বেঁচে থাকতে হবে ওকে।
লোকটা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
–” তুমি নিজের সন্তান কে মেরে ফেলার চিন্তা করছো?
মহিলাটি রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বলল,
–” চিন্তা করছি না। সিধান্ত নিয়ে ফেলেছি। আমার সুখের রাস্তায় যে কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে তাকেই শেষ করে দিব আমি।
পুরুষটি শব্দ করে হেসে বলল,

–” অসম্ভব। একজন মা যতোই খারাপ হোক। নিজ সন্তানের প্রাণ কাড়তে পারে না।
মহিলাটি ভীষণ ভাবে রেগে যায়। চিৎকার করে বলে,
–” আমি পারব। কারণ আমার কাছে ও একটা বোঝা। ওকে জন্ম দিতে বাধ্য করা হয়েছে আমাকে৷ ওর জন্য জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে নিজের রুপ, সৌন্দর্য এবং ফিগার। আই হেইট মাই চাইল্ড..
লোকটা এবারও বিদ্রুপের স্বরে বলে,
–” ও কাম অন তারা। আমি জানি মজা করছো তুমি। এসবের কিছুই তোমার দ্বারা সম্ভব নয়। নিজ সন্তানকে কেউ মারতে পারে?
মহিলাটি এবার রাগে হুঁশ খুইয়ে ফেলল। দাঁতে দাঁত পিষে শুধাল,
–” যদি পারি তাহলে কী দিবে আমায়?
লোকটা বাঁকা হেসে বলল,

–” তোমাকে বিয়ে করে লাক্সারিয়াস লাইফ দিব ডার্লিং..
মহিলাটি বিন্দুমাত্র অপেক্ষা করল না। তড়িৎ গতিতে শোয়া থেকে উঠে বসল। নগ্ন শরীরে হালকা একটা ওড়না জড়িয়ে নিল। এরপর উঠে দাঁড়িয়ে সেন্টার টেবিলের উপরে থাকা কাঁচের বোতল তুলে নিয়ে ধীর পায়ে এগোতে থাকল ছোটো বাচ্চা ছেলেটার দিকে।
বাচ্চাটা সবই শুনেছে বিধায় সে ছটফটাতে থাকে। নিজের মা আজরাইল হয়ে আসবে সেটা ক’জন সন্তান প্রত্যাশা করে? কিন্তু তার বেলায় হয়েছে।
মহিলাটি ধীর পায়ে এগিয়ে এসে তার সম্মুখে দাঁড়ায়। ভীষণ ভয়ানক দেখাচ্ছিল মহিলাটির চেহারা। রাগে ফুঁসছিল। ক্ষোভে জ্বলজ্বল করছিল তার চোখদুটো। মহিলাটিকে ওভাবে কাছে আসতে দেখে বাচ্চা ছেলেটা বলে,

–” আমি বাবাইকে কিছু বলব না আম্মু..
ছেলেটা কথা শেষ করার আগেই ঠাস করে তার মাথায় আঘাত করে মহিলাটা। চিল্লিয়ে বলে,
–” তোর মরণ আমার সুখের কিরণ নিয়ে আসবে। সো বাই বাই বার্ডেন…
কাঁচের বোতল ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। ছেলেটার মাথা ফেটে বেরিয়ে আসে তাজা রক্ত। সাথে সাথেই গলা ফাটিয়ে আর্তনাদ করে উঠে বাচ্চা ছেলেটা। এতেও খান্ত হয় না সেই মহিলা।
কাঁচের ভাঙার টুকরো দিয়ে বাচ্চাটার বুকে আঁচড় কাটতে থাকে। ছেলেটা যন্ত্রণায় কান্না মিশ্রিত স্বরে চিল্লিয়ে বলতে থাকে,

–” খুব কষ্ট হচ্ছে আম্মু.. ছেড়ে দাও আমায়। আমি কাউকে কিছু বলব না..
বীভৎস অতীতের সপ্ন দেখে এক লাফে শোয়া থেকে উঠে বসে তাজরিয়ান। হাঁপাতে থাকে রীতিমতো। ঘামে চুপচুপে হয়ে যায় তার পুরো শরীর। জোরেশোরে দম ফেলতে থাকে।এরমধ্যে রুমে এসে হাজির হয় আরশিয়ান৷
তাজরিয়ান কে উদ্ভ্রান্তের ন্যায় বসে থাকতে দেখে চটজলদি পানির গ্লাস এগিয়ে দেয়। পাশ ফিরে নিজের ভাই কে দেখে তাজরিয়ানও বিনা বাক্যে গ্লাসটা নিয়ে নেয়। এক চুমুকে পুরোটা শেষ করে বলে,
–” থ্যাংকস..
আরশিয়ান জবাব না দিয়ে ধপ করে বসে পড়ে তাজরিয়ানের পাশে। তামজিদ দু’ভাই কে একসাথে দেখে বেরিয়ে যায় রুম ছেড়ে। কিছুক্ষণ নিরবে বসে থাকার পর তাজরিয়ান স্বাভাবিক কন্ঠে বলে,

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ৮

–” এমপি সাহেব সকাল সকাল সন্ত্রাসের ঘরে যে? সুপারি দিতে এসেছেন বুঝি? জালিয়াতি করতে হবে নাকি অন্যকিছু ? ”
প্রশ্নের জবাবে আরশিয়ান নির্লিপ্ত গলায় বলে উঠে,
–” ক্ষমা চাইতে হবে…

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১০