শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১৪
আয়েশা শেখ
ইউটিউবে একটার পর একটা রান্নার রেসিপির ভিডিও স্ক্রোল করে যাচ্ছে ঝিলমিল। কিন্তু একটার মাথামুণ্ডুও তার মাথায় ঢুকছে না। এত বেলা হয়ে গেছে! এই সময়ে ভারী কিছু পেটে না পড়লে খিদে মেটার কোনো চান্সই নেই। অথচ টেবিলে কত শত পদের সুস্বাদু খাবার সাজানো রয়েছে! সেসব ফেলে রেখে এখন তাকে নতুন করে রাঁধতে হবে।
আল্লাহ! এ লোকটা আসলে চায় কী?! কেমন মানুষ এটা? না, মানুষ হতে পারেই না সে! নিশ্চিত মঙ্গল গ্রহের কোনো রিজেক্টেড এলিয়েন! তাও আবার মারাত্মক মেন্টাল এলিয়েন! ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ে হতাশার সুরে বলল ঝিলমিল,
—‘একটাও তো পারব না আমি, টুম্পা আন্টি! কীভাবে খাবার বানাব?’
টুম্পা রান্নাঘরের কাউন্টারে হেলান দিয়ে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে আপেলে কামড় বসাল। চিবোতে চিবোতেই নির্ভাবনায় বলল,
—‘আমি কিছু কইতে পারমু না। আবার তোমার জামাই আইসা আমারে বকব। যা মন চায় একটা বানাইয়া সোজা মুখের ওপর নিয়া দেও। যত ঢং!’
ঝিলমিল নিজের ভেজা চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিয়ে চোখ গোল গোল করে তাকাল।
—‘আর আমি? আমি কী খাব? আমাকেও তো শেষমেশ এগুলাই গিলতে হবে!’
কয়েক মুহূর্ত রান্নাঘরে নিস্তব্ধতা ছেয়ে রইল। টুম্পা মচমচ করে আপেলের আরেকটা কামড় নিয়ে একটু ভেবে বলল,
—‘একডা উপায় আছে অবশ্য।’
—‘কী উপায়?!’
—‘আমি মুখে মুখে কইয়া কইয়া দেই, তুমি রাঁধো। কখন কী ঢালবা, কী মসলা দিবা সব আমি বইলা দিমু, আর তুমি সেই মতো হাত চালাবা। শেষ পর্যন্ত রান্নাটা তোমার হাতেই হইব! কাজের কাজও হইল, আবার জামাইয়ের হুকুমও মানা হইল। একই কথা!’
এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল ঝিলমিল। তারপরই যেন ডুবে যাওয়া মানুষের হাতে খড়কুটো পাওয়ার মতো একরাশ উচ্ছ্বাসে টুম্পাকে একহাতে জাপটে ধরে গালে কষে একটা চুমু বসিয়ে বলে উঠল,
—‘আই লাভ ইউ, টুম্পা আন্টি! তুমি জাস্ট জিনিয়াস! এবার বলো এই মেন্টাল এলিয়েন দুপুরে কী খায়?’
—‘ নির্দিষ্ট কোনো পছন্দ নাই। যতদিন ধইরা আইছে দুপুরে তেমন একটা বাড়িতে খায়ও নাই। বানাও গরুর রেজালা আর ভাত।’
টুম্পার কড়া তদারকিতে ঝিলমিল রান্নাঘরে কাজে নেমে পড়ল। কোনটা আগে তেলের ওপর ছাড়তে হবে, কতটুকু পেঁয়াজ লাল হলে বাটা মসলা কষাতে হবে, টুম্পা নিজে হাতে কিছু না ছুঁয়েও শুধু মুখ চালিয়ে সব সামলে নিচ্ছিল। ঝিলমিলও তার কথা অনুযায়ী সব করছিল। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে রান্নাঘরে মশলার কড়া ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ল। একপাশে ধোঁয়া ওঠা ধবধবে সাদা ভাত, অন্যপাশে লালচে গরুর মাংসের রেজালা আর চিংড়ি মাছ ভুনা। সবশেষে বাটিতে খাবার বেড়ে নিতে নিতে ঝিলমিলের কপালে জমা ঘামের বিন্দুগুলো চকচক করে উঠছে।
অবেলায় রান্নাঘর থেকে মশলার ঘ্রাণ পেয়ে উপর থেকে শিউলি বেগম আর জারিন নেমে আসে। ঝিলমিলকে রান্নাঘরে খাটতে দেখে শিউলি বেগম বিচলিত মুখে বললেন,
—‘তুমি আবারও রান্নাঘরে এসেছো? বাবা জানলে রেগে যাবেন কিন্তু।’
—‘কী করব আমি? না এলে বারিশ চাচ্চু রেগে যাবেন। এমনকি বাসা থেকেই বের করে দেবেন।’
শিউলি বেগম ঝিলমিলের দিকে কিছুক্ষণ থমকে তাকিয়ে রইলেন। গলার স্বর কিছুটা গম্ভীর করে বললেন,
—‘কাকে চাচ্চু বলছো তুমি?’
কথাটা শুনতেই এক মুহূর্তে চুপসে গেল ঝিলমিল। মাটির দিকে চোখ নামিয়ে মাথা নিচু করে ফেলল।
—‘সকালেও খেয়াল করেছি, আমায় চাচী ডাকছো, বাবাকে দাদা বলছো, আর নিজের স্বামীকে ডাকছো চাচ্চু! এখনও এগুলো ডাকলে হবে?’
কিছু বলল না ঝিলমিল। শুধু পায়ের নোখ দিয়ে মেঝের টাইলস ঘষতে লাগল। শিউলি বেগম ঝিলমিলের আরও কাছে গিয়ে পরম মমতায় গালে হাত রেখে বললেন,
—‘স্বামীকে কেউ চাচ্চু বলে? পাগল মেয়ে! বিয়ে যেভাবেই হোক, তরঙ্গ তোমার স্বামী। তোমার সারাজীবনের সঙ্গী। আর যেন এসব না শুনি।’
কথাটা শেষ করে শিউলি বেগম পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের মেয়ে জারিনের দিকে ফিরে বললেন,
—‘তোকে যেন আর কখনও ঝিলমিলকে আপু ডাকতে না শুনি। চাচীমা ডাকবি।’
জারিন মাথা নেড়ে অনুগত ভঙ্গিতে বলল,
—‘আচ্ছা, আম্মু। চাচীমা, তুমি কী রান্না করছো?’
জারিনের মুখে ‘চাচীমা’ ডাক শুনে ফিক করে হেসে দিল ঝিলমিল। জারিন নাকি তাকে এখন থেকে চাচী ডাকবে! শিউলি বেগম রাঙিয়ে মিছে রাগ দেখিয়ে বললেন,
—‘আবার হাসছে! মারব কিন্তু!’
ঝিলমিল নিজের হাসিটা সামলে নিয়ে জারিনের একটু কাছে এসে বলল,
—‘তোমার চাচ্চুর জন্য খাবার রান্না করছি। উনার পেটে অসুখ হয়েছে, আমার হাতের খাবার ছাড়া অন্য খাবার হজম হয় না।’
শিউলি বেগম বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
—‘ও আসলে কী চাইছে? এগুলো কিন্তু বাবার কানে গেলে আবার ঝামেলা হবে। বাসায় এত মানুষ থাকতে বারবার তোমাকে দিয়ে কেন রান্না করাবে!’
ঝিলমিল কিছু মুখ ফুটে বলার আগেই হঠাৎ কোত্থেকে যেন জারিফটা হাজির হলো। দরজায় হেলান দিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বলল,
—‘তোকে দিয়ে শেষে কিনা রান্না করাচ্ছে আমার চাচ্চু? আহারে! শেষেমেশ তুই আমার চাচার চাকরানী হয়ে গেলি?’
জারিফের এমন কুরুচিপূর্ণ কথায় রাগে আর অসহায়ত্বে গাল দুটো লাল হয়ে উঠল মেয়েটার। ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল সে। ঝিলমিল জবাব দেওয়ার আগেই শিউলি বেগম ছেলেকে ঝাঝালো গলায় বললেন,
—‘জারিফ! কেমন অসভ্যের মতো কথা বলছিস? যা এখান থেকে!’
—‘যাব মানে? প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে, খেতে দাও!’
—‘দিচ্ছি, যা।’ শিউলি বেগম বিরক্ত মুখে বললেন।
—‘কী কী রান্না হয়েছে আজকে?’
—‘টেবিলে গিয়ে বোস। যা রান্না হয়েছে নিয়ে আসছি।’
কিন্তু জারিফ সরলো না। ঝিলমিলের বানানো ধোঁয়া ওঠা বাটিগুলোর দিকে বাঁকা চোখে তাকাল।
—‘ঝিলমিল, তুই কী রান্না করেছিস রে? শুধু চাচ্চুকেই খাওয়াবি? আমিও একটু টেস্ট করে দেখি।’
কথাটা বলতে বলতেই সে হালকা চালে ঝিলমিলের বানিয়ে রাখা খাবারের বাটিগুলোর দিকে হাত বাড়ালো। জারিফের আঙুল বাটিতে স্পর্শ করার আগেই পেছন থেকে বারিশ এসে তার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। ঠান্ডা, বরফশীতল গলায় বারিশ বলল,
—‘ধরবি না এগুলো।’
জারিফ চমকে উঠে কবজি ছাড়ানোর চেষ্টা করে শুধাল,
—‘কেন?’
—‘কারণ এগুলো আমার।’
শিউলি বেগম আর জারিন থমকে দাঁড়িয়ে রইল, আর ঝিলমিল দেয়ালের সাথে সেঁটে গিয়ে নিঃশ্বাস আটকে ফেলল। জারিফ মুখখানা কিছুটা বাঁকা করে নিজের অসন্তোষ আড়াল করার চেষ্টা করল, কিন্তু বারিশের চোখের দিকে তাকিয়ে আর এক শব্দও বাড়াতে পারল না। বারিশ এক ঝটকায় তার হাতটা ছেড়ে দিয়ে ঝিলমিলের দিকে তাকাল।
—‘ট্রেতে খাবার সাজিয়ে উপরে নিয়ে এসো।’
বারিশ কারো উত্তরের অপেক্ষা না করে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। ঠিক তখনই চারপাশের থমথমে স্তব্ধতা চিরে স্ত্রীর কুন্ঠিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো তার কানে,
—‘প-পা-পাগলু! শোনো পাগলু!’
নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল বারিশের দীর্ঘ পায়ের পদক্ষেপ। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সে; তবে পেছনে ঘুরে তাকাল না। এক ইঞ্চিও নড়ল না তার শরীর, শুধু পিঠের পেশিগুলো টানটান হয়ে উঠল।
শিউলি বেগম অবিশ্বাস্য চোখে প্রথমে ঝিলমিল, তারপর বারিশের পিঠের দিকে তাকালেন। কী বলে এই মেয়ে! চাচ্চু ডাকতে না করায় সোজা পাগলু?
অন্যপাশে টুম্পা দুই চোখ কপালে তুলে হা হয়ে ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে রইল। ‘ওরে পল্টিবাজ মেয়ে! একটু আগেও আমার কাছে কান্নাকাটি কইরা কড়াকড়ি নালিশ ঠুকলি, ডাকলি ‘মেন্টাল এলিয়েন’! আর এহন হুট কইরা রঙ পাল্টাইয়া গইলা জল অইয়া সোজা ‘পাগলু’?!’ মনে মনে আওড়াল সে।
সবচেয়ে মারাত্মক বিস্ফোরণটা ঘটল জারিফের ভেতর। বাকরুদ্ধ হয়ে দাড়িয়ে আছে ছেলেটা। বারিশ ধীরগতিতে ঘাড় ফেরাল। কপালের ওপর দুটো সূক্ষ্ম ভাঁজ গভীর থেকে গভীরতর তার। চোখের কোণে তীব্র এক বিভ্রান্তি ও বোধগম্যতাহীনতার ছায়া।
ঝিলমিল প্রথমে একটু ইতস্তত করে,পরক্ষণে ভয় আর সংশয় ঝেড়ে ফেলে একদম সোজা বারিশের সেই বিভ্রান্ত চোখের ওপর দৃষ্টি স্থির রাখল। গলার স্বর বেশ স্পষ্ট আর স্বাভাবিক রেখে বলল,
—‘হ্যাঁ, তোমাকেই ডাকছি। উপরে না গিয়ে এখানেই বসে খাই চলো। তুমি টেবিলে গিয়ে বসো, আমি খাবার আনছি।’
বারিশ এবার ভেতরে ভেতরে আরও অবাক হলো। তবে চেহারায় আর প্রকাশ করল না। ঝিলমিল আড়চোখে তাকাল জারিফের দিকে। জারিফের মুখটা তখন সত্যিই দেখার মতো! চোয়াল ঝুলে গেছে, চোখ দুটো রাগে কোটর থেকে বেরিয়ে আসার জোগাড়।
বারিশ একবার জারিফের দিকে তাকিয়ে বিনাবাক্যে টেবিলে গিয়ে বসল।
ঝিলমিল আর দেরি করল না। টুম্পার হাত থেকে ট্রে-টা নিজের হাতে নিয়ে সোজা ডাইনিং টেবিলে চলে এলো। বাটিগুলোর ঢাকনা সরাতেই ধোঁয়া ওঠা খাবার গুলো অত্যন্ত যত্নের সাথে সে প্রথমে বারিশের প্লেটে বেড়ে দিল, এরপর নিজের প্লেটেও পরিমিত খাবার বেড়ে নিয়ে বারিশের ঠিক পাশের চেয়ারটায় ঘেষে বসল।
টেবিলের ঠিক অন্য পাশে এসে বসেছে জারিফ। তার থমথমে মুখটায় রাগের ছায়া স্পষ্ট। শিউলি বেগম ছেলের প্লেটে খাবার বেড়ে দিতে লাগলেন, কিন্তু থালার দিকে তাকানোর কোনো আগ্রহই যেন জারিফের নেই।
জারিফের জ্বলন্ত দৃষ্টি সোজা আড়াআড়ি গিয়ে আটকে আছে ঝিলমিলের ওপর। খাবার মুখে তোলা তো দূরের কথা, ঝিলমিলের এই আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিটা তার গলায় যেন কাঁটা হয়ে বিঁধছে।
এদিকে ঝিলমিল জারিফের সেই বিষাক্ত চাউনি পুরোপুরি উপেক্ষা করে বেশ শান্ত ভঙ্গিতে খাবার খাচ্ছে। যেন এই টেবিলে বারিশ আর সে ছাড়া আর কারও অস্তিত্বই নেই।
—‘ নিজে হাতে খেতে পারবে? নাকি খাইয়েও দিতে হবে?’
বাক্যটা বলে সে বারিশ, জারিফ দুজনকেই খোঁচা দিলো। বারিশ আবারও জারিফের দিকে তাকাল। দেখল তার দৃষ্টি ঝিলমিলের উপর। খেতে থাকা ঝিলমিলের হাত থামিয়ে দিয়ে উঠে দাড়িয়ে বলল,
—‘ রুমে চলো।’
—‘ কেন? এখানেই বসে খাই প্লিজ!’
শুনলো না বারিশ। টেনে নিয়ে গেল, যেতে যেতে টুম্পাকে বলল যেন খাবার গুলো রুমে দিয়ে আসে। ঝিলমিল আর বাড়াবাড়ি করল না। নিঃশব্দে বারিশের টানের সাথে নিজের পা মেলাল। টুম্পা খাবার দিয়ে আসার পর খাবার খেতে খেতে ঝিলমিল একবার বারিশ কে জিজ্ঞেস করে,
—‘ খাবার কেমন হয়েছে চাচ্চু?’
বারিশ তখন ওয়াশরুম থেকে হাত ধুয়ে বের হচ্ছিল। টিস্যুতে হাত মুছতে মুছতে নির্ভাবনায় বলল,
—‘ ভালো না।’
ঝিলমিলের খুব বলতে ইচ্ছা করল। ভালো না লাগলে যেন নিজে রেঁধে খায়। কিন্তু বলল না। সে নিজেও হাত ধুয়ে আসল। বের হতেই পেছন থেকে বারিশের হুকুম ভেসে এলো,
—‘একটা শার্ট বের করো। বের হবো আমি একটু।’
বিরক্তিতে ফোস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল ঝিলমিল। ওয়ার্ডরোব খুলে টেনে বের করল একটা নিখুঁত আয়রন করা কুচকুচে কালো শার্ট। শার্টটা নিয়ে বারিশের সামনে গিয়ে বাড়িয়ে দিল,
—‘এই নিন।’
কিন্তু বারিশ কাপড়ে হাত দিল না। চোখের পলকে ঝিলমিলের বাড়িয়ে দেওয়া কবজিটা ধরে পিঠের পেছনে মুচড়ে ধরল! এত দ্রুত ঘটল যে ঝিলমিল সামলে ওঠার সুযোগই পেল না। পিঠের সাথে হাত সেঁটে যেতেই ব্যথায় একটু কঁকিয়ে উঠল সে। বারিশ তার কাছাকাছি এসে হাড়কাঁপানো কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
—‘ মানা করেছিলাম না চাচ্চু বলতে? টেল মি! কিসের প্রবলেম তোমার?’
ঝিলমিল ব্যথায় দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—‘আগে হাত ছাড়ুন, ব্যথা পাচ্ছি।’
বিন্দুমাত্র ঢিলে করল না হাতের মুঠি যুবক। ঝিলমিলের চোখের দিকে তাকিয়ে রূঢ় গলায় বলল,
—‘আগে বলো তোমার কী সমস্যা?’
মেয়েটা এবার খানিক ক্লান্ত ভঙ্গিতে চোখ বুজল, তারপর একটা শক্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে মুখ ফিরিয়ে বলল,
—‘কোনো সমস্যা নেই। আর বলব না।’
বারিশ এক মুহূর্ত তার থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর জিজ্ঞেস করল,
—‘মনে থাকবে?’
—‘থাকবে।’
একই কথা আরও বলেছে। তবে লাভ হয়নি। তবু কবজিটা ছেড়ে দিল বারিশ। নিজের অবশ হয়ে আসা হাতটা টেনে নিয়ে গায়ে হাত বুলাল ঝিলমিল। জায়গাটা লাল হয়ে গেছে। বারিশ সেদিকে কোনো নজর না দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। কালো শার্টটা গায়ের ওপর চাপিয়ে দিয়ে শান্ত, স্বাভাবিক গলায় হুকুম দিল,
—‘বোতামগুলো লাগিয়ে দাও।’
ঝিলমিলের মেজাজটা এবার সত্যি সত্যি চটে গেল। নিজের লাল হয়ে যাওয়া হাতটার দিকে একবার তাকিয়ে, তারপর বারিশের দিকে অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে বলল,
—‘এটাও… এটাও আমাকেই করতে হবে?’
বারিশ কোনো জবাব দিল না। ঝিলমিলও আর উত্তরের আশা না করে এক পা এগিয়ে এলো। গম্ভীর ভাব মুখে ফুটিয়ে চুপচাপ বারিশের শার্টের বোতামে হাত লাগাল সে।
—‘চাচার বন্ধুকে আমি স্বামী মানব কীভাবে, বলুন তো? প্রথমত আপনি আমার চাচ্চুর ফ্রেন্ড, তারপর হলেন হবু ফুপা! তার ওপর আবার আমার ক্লাসের টিচার। এতগুলো সম্পর্ক পায়ে ঠেলে হুট করে আপনাকে স্বামী মেনে নেওয়া কি মুখের কথা? আপনার দিকে তাকালেই আমার চাচ্চু ডাকতে মন চায়!’
স্বামীর বুকের শার্টের বোতাম গুলো লাগিয়ে দিতে দিতে বলল ঝিলমিল। তার ধমক খেয়েও খুব শান্তভাবেই নিজের যুক্তিগুলো উপস্থাপন করছিল মেয়েটা। শেষ বোতামটা লাগাচ্ছিল সে। ঝিলমিলের কথা শেষ হতে না হতেই বারিশ চরম বিরক্তি নিয়ে আবার দু’হাতে বোতামগুলো খুলতে শুরু করল। একেবারে নির্বিকার ও শক্ত গলায় বলল,
—‘ আসো বাসর করি, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
সরাসরি এমন বাক্যে কান দিয়ে ধোয়া বের হলো কিশরীর। পেটটাও মোচড় দিয়ে উঠলো। বোতাম খোলার হাত দুটো চট করে ধরে ফেলে বলল,
—‘ আপনি এমন অশ্লীল কথা কেন বলছেন?’
বারিশ শক্ত চোখে তাকাল। নিচু কিন্তু কড়া গলায় বলল,
—‘ কারণ আমি আর কোনো সমাধান দেখছি না। মেজাজ খারাপ করে দিচ্ছো বারবার। বউ আমাকে চাচ্চু ডেকে ঘুরে বেড়াচ্ছে, পাবলিক জানলে আমার ইজ্জতের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না! এর চেয়ে ভালো স্বামীর অধিকার বুঝিয়ে দেই। তাই আমাকে দেখলে আর চাচ্চু ডাকতে মন চাইবে না।’
ঝিলমিল চোখ দুটি বড় বড় করে বারিশের হাত দুটো চেপে ধরে রেখেই বলল,
— ‘মুখ ফসকে বের হয়ে গেলে আমার কী দোষ? আচ্ছা আর বলব না।’
বারিশ ঝিলমিলের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
— ‘এ কথা অনেক বার বলেছ। কিন্তু ফলাফল জিরো।’
—‘ আচ্ছা, ডাকলে সমস্যা কী? চাচাই তো ছিলেন! আবার হয়েও যেতে পারেন।’
—‘ আবার হয়ে যেতে পারি মানে?’
—‘ আমার আব্বু এ সম্পর্ক মানবে না। ফুপিকেই আপনার সাথে বিয়ে দিতে চায়নি। সেখানে তো আমি তার মেয়ে। দাদীমার জন্য চুপচাপ আছে এখন। আর আপনার আম্মাও এ সম্পর্ক মানবে না।’
—‘ আর তুই?’
হঠাৎ এমন ভিন্ন সম্বোধনে বিস্মিত নয়নে বারিশের চোখের দিকে তাকাল ঝিলমিল। চোখ দুটো একদম শান্ত, জমাট বাঁধার মতো স্থির আর অনুভূতিহীনতায় ঢাকা। সেই নিস্পৃহ চোখের চাহনিতে ঝিলমিলের বুকের ভেতরটা থরথর করে কেঁপে উঠল। তোতলা ছন্দে ঝিলমিল জিজ্ঞেস করল,
— ‘কী… কী বললেন?’
বারিশ ঝিলমিলের চোখে চোখ রেখে, আগের মতোই বরফের মতো ঠান্ডা ও নিচু স্বরে বলল,
— ‘তোর কী মতামত?’
—‘আ-আমার আবার কী ইচ্ছা থাকবে? আপনি এভাবে তুই করে বলছেন কেন… আর এভাবে তাকাচ্ছেনই বা কেন?’
বারিশ চোখ বন্ধ করে একটা লম্বা শ্বাস টানল। তারপর চোখ খুলে ঝিলমিলের দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে ধীর গলায় বলল,
— ‘আমি তোমার মতামত জানতে চাইছি। বলো, শুনি।’
—‘ জানি না।’
—‘ তুমি কী চাও।’
—‘ আমি কী চাইব? আমি কিছুই চাই না। বাদ দিন, এসব কথা পরে হবে। কোথায় না যাবেন? যান এবার। আমার ঘুম পাচ্ছে।’ ঝিলমিল বলল না, জারিফকে একটু শিক্ষা দিতে পারলেই ও বাড়ি ছেড়ে ভাগবে।
বারিশও আর কোনো প্রশ্ন করল না। চলে গেল। তবে ঝিলমিলের ঘুমের বারোটা বাজিয়ে তারপর গিয়েছে। টেবিলের ওপর মোটা একগাদা হোমওয়ার্কের ফাইল ফেলে দিয়ে গেছে, যা শেষ না করে আজ রাতে ঝিলমিলের ঘুমোনোর আর কোনো সুযোগ নেই।
বারিশ মূলত বন্ধুদের ডাকে বাহিরে এসেছে। ধানমন্ডি লেকের পাড়ে নিরিবিলি, আবছা আলোয় ঢাকা ক্যাফের ওপেন রুফটপে বসেছে বন্ধুদের এই লেট-নাইট আড্ডা। এই আড্ডায় মেহরাজও আছে। কিন্তু বারিশ আসার পর থেকেই বাকিসব বন্ধুরা মেহরাজ আর বারিশকে নিয়ে খ্যাপাতে ব্যস্ত। কারণটা এক রাতের ব্যবধানে মেহরাজ স্রেফ বন্ধু থেকে বারিশের ‘চাচা শ্বশুর’ বনে গেছে!
তবে বারিশের এসব আলতু-ফালতু কথায় মোটেও কান নেই। সে চেয়ারের হেলান দিয়ে এক পা একদিকে ছড়িয়ে, অন্য পা আলাদা একটা চেয়ারে তুলে, নিজের মতো ধীরেসুস্থে সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে যাচ্ছে।
বারিশের দিকে তাকিয়ে নীল আক্ষেপের সুরে বলল,
—‘তুই তো জব আর বউ পেয়ে দিন দিন আমাদের ভুলেই যাচ্ছিস!’
—‘তোদের মনে রাখার মতো দুটো কারণ বল?’
নীল চোখ কপালে তুলে বলল,
—‘বাহ্! এত স্বার্থপর তুই? এখন বন্ধুত্বের মাঝেও কারণ খুঁজছিস?’
পাশে বসে থাকা মেহরাজ এবার বেশ বিরক্তি নিয়ে বলল,
—‘বারিশ, তুই এসব ছাইপাশ খাচ্ছিস কেন? আমার কিন্তু একদম পছন্দ না!’
বারিশ আগের মতো বসে থেকেই চোখ ঘোরাল মেহরাজের দিকে। তারপর তার নজর গিয়ে পড়ল মেহরাজের নিজের আঙুলে চেপে রাখা জ্বলন্ত সিগারেটটার ওপর। নিজে দিব্যি টেনে যাচ্ছে, আর মুখে বলছে পছন্দ না! সেদিকে তাকিয়ে বারিশ নিস্পৃহ গলায় বলল,
—‘তোর পছন্দ না, তাতে আমার কী?’
—‘দেখ… আমি এখন তোর চাচা শ্বশুর! আমার সামনে তুই এগুলো খেতে পারিস না। আর তাছাড়া, আমার ভাইজি জানলে কষ্ট পাবে।’ মেহরাজ গলার স্বর বেশ চড়িয়ে বলল।
—‘তাতে আমার কী?’ আবারও একই নির্ভাবুক উত্তর দিল একগুঁয়ে যুবক।
—‘তোর কী মানে রে? এই দেখ.. এসব বাজে অভ্যাস না ছাড়লে কিন্তু ঝিলমিলকে বাপের বাড়ি ফিরিয়ে আনব আমি!’ মেহরাজের গলায় হুমকি।
—‘আমার বাড়ির আশেপাশেও যদি তোকে দেখি, তোর পা দুটো ভেঙে দেব।’
মেহরাজ সাথে সাথে বাকি বন্ধুদের দিকে ফিরে নালিশের সুরে বলে উঠল,
—‘দেখলি তোরা? একটাবার দেখ! চাচা শ্বশুরকে সামান্যতম সম্মানটুকুও দিচ্ছে না ও!’
কথাটা শোনামাত্রই টেবিলের সবাই একসাথে হেসে উঠল। তাকে খোঁচা মেরে সমস্বরে বলল বন্ধুরা,
—‘আহা বারিশ! সিগারেট খাচ্ছিস কেন বল তো? তোর চাচা শ্বশুর তো এসব একদম পছন্দ করে না!’
রাত ভালোই হয়েছে। বারোটার কাছাকাছি। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াল বারিশ। এখানে এসে সিগারেট আর কফি খেয়েছে শুধু। সে একটা ওয়েটারকে ডেকে বলল,
—‘ সবার বিল আমার শশুর দেবে।’ বলেই চলে গেল একদম। পেছন থেকে মেহরাজ গালাগালি করছে বাকি বন্ধুরা হাসছে সেসবেও কান দিলো না মেহরাজের বেপরোয়া ভাতিজি-জামাই!
নিজের বাইকের চাবির তোড়াটা আঙুলে নাচাতে নাচাতে রুফটপ থেকে নেমে গেল সে।
বারিশ চলে যাওয়ার পর মেহরাজও আর বেশিক্ষণ থাকল না সেখানে। বন্ধুদের সবার বিল মিটিয়ে বাইক নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল সে। বারিশের এমন খামখেয়ালি ব্যবহারে ভীষণ বিরক্ত মেহরাজ। বন্ধু হিসেবে বারিশের এই বেপরোয়া রূপ মেনে নেওয়া গেলেও, নিজের ভাইয়ের মেয়ের জামাই হিসেবে তাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না সে। তার পুতুলের মতো নিষ্পাপ ভাতিজি একটা মার্জিত, ভদ্র আর সভ্য জামাই ডিজার্ভ করে। এমন একজন বাঁধনহারা লোক নয়!
ভাবনার সুতোয় টান পড়ল হুট করেই। অন্ধকার রাস্তায় আচমকা তার বাইকের একদম সামনে এসে পড়ল একটা লোক! অপ্রত্যাশিত এই ঘটনায় ঘাবড়ে গিয়ে মেহরাজ কড়া ব্রেক কষল। কিন্তু সামলাতে না পেরে বাইকসহ উল্টে গিয়ে সোজা লোকটার গায়ের ওপর গিয়ে পড়ল সে! লোকটা নিচে, আর সে ওপরে। ধড়ফড় করে মুখ তুলে তাকাতেই মেহরাজের চোখে পড়ল এক মধ্যবয়স্ক এক লোককে। বয়স চল্লিশের কোঠা পেরিয়েছে নিশ্চিত।
লোকটি চোখ দুটো বুজে অস্পষ্ট গলায় বিড়বিড় করে বলে চলেছে,
—‘আমি আসছি বউ… এবার আমি সত্যিই চলে আসব তোমার কাছে…’
লোকটার মুখ থেকে অসংলগ্ন বাক্যগুলো বের হতেই মেহরাজের মুখটা কুঁচকে গেল। বাতাসজুড়ে মদের বিশ্রী দুর্গন্ধ ভেসে আসছে। তড়িঘড়ি করে লোকটার ওপর থেকে সরে এল সে। পকেট থেকে চট করে মাস্কটা বের করে নাকে চেপে ধরল মেহরাজ। তারপর পা দিয়ে আলতো ধাক্কা মেরে লোকটাকে ডেকে বলল,
—‘এই যে ভাই! শুনছেন? উঠুন এখান থেকে!’
লোকটা চোখ না খুলেই বিড়বিড় করে বলল,
—‘আমাকে ডেকো না তো… আমি মরে গেছি। আমি এবার আমার বউয়ের কাছে যাব…’
মেহরাজ চারপাশটা এক নজর দেখে নিয়ে কড়া গলায় বলল,
—‘আপনি মরেননি। তবে এভাবে পড়ে থাকলে আর কিছুক্ষণ পর সত্যি সত্যি মরবেন! এটা হাইওয়ে, দ্রুত উঠুন এখান থেকে!’
কিন্তু লোকটা ওঠার কোনো নামই নিল না। রাস্তায় শুয়ে শুয়ে চোখ বুজে কী সব হাবিজাবি ফিসফিস করে বলেই চলল মাতাল বেটা।
রাস্তার মাঝখানে মাতাল লোককে ফেলে রাখা বিপজ্জনক বুঝে মেহরাজ এবার বিরক্ত হলেও লোকটার জামার কলার ধরে তাকে টেনেটুনে সোজা করল। টেনে হেঁচড়ে কোনোমতে রাস্তার এক পাশে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাল তাকে। তার ঝাপসা চোখের দিকে তাকিয়ে মেহরাজ অধৈর্য গলায় জিজ্ঞেস করল,
—‘আপনার বাসা কোথায় বলবেন?’
লোকটা কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ হেসে উঠলো।
—‘জাহান্নামে!’
চোখ কুঁচকে বলল মেহরাজ।
—‘মানে? জাহান্নামে আবার কারো বাসা হয় নাকি?’
—‘হয়, হয়! জীবনে বহু পাপ করেছি… ওটাই এখন আমার আসল বাসা!’
—‘উফ! নাটক বন্ধ করে সোজা বলবেন ঠিকানাটা কোথায়?’
লোকটা কোনো সোজা উত্তর দিল না। নিজের পকেট থেকে অনেক কসরত করে ফোনটা বের করে মেহরাজের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
—‘আমার মেয়ে জানে…’
মেহরাজ আর কথা না বাড়িয়ে ফোনটা হাতে নিল। কন্ট্যাক্ট লিস্টে গিয়ে দেখল ‘মামুনি’ নামে একটা নম্বর সেভ করা আছে। কোনো উপায় না পেয়ে সেই নম্বরেই ডায়াল করে দিল সে। ওপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই একটা ছিমছাম, মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এল,
—‘হ্যালো বাবা? আমি এখন তোমাকে নিয়ে আসতে পারব না। তুমি যেখানে আছো, সেখানেই চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ো তো!’ মেয়েটার কন্ঠ জড়ালো। নিশ্চিত ঘুমিয়ে পড়েছিল।
মেহরাজ নিজের গলার স্বর কিছুটা কড়া করে বলল,
—‘হ্যালো, শুনুন! আমি আপনার বাবা নই। আপনার বাবা মাল খেয়ে টাল হয়ে হাইওয়েতে পড়ে আছে। আরেকটু হলেই আমাকে সঙ্গে নিয়ে ওপরে চলে যেতেন! দয়া করে ড্রামা বন্ধ করে দ্রুত আপনার বাসার ঠিকানা বলুন।’
মেহরাজের এমন শক্ত গলা শুনে কয়েক সেকেন্ড একদম নিস্তব্ধ হয়ে রইল ওপাশের মেয়েটি। হয়তো অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দ্রুত বাসার ঠিকানাটা বলে দিল।
কথা শেষ করে ফোনটা পকেটে পুরে নিল মেহরাজ। রাস্তায় বাইকটা আছাড় খাওয়ার কারণে ওর নিজের ডান হাতের কনুইয়ের কাছটা বেশ কিছুটা ছিলে গেছে, জ্বলছে ভীষণ। তার ওপর এই বাড়তি ওজনের ঢলে পড়া একটা মানুষকে টেনেটুনে দাঁড় করাতে গিয়ে সে রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠেছে।
নিজের বাইকটা সোজা করে দাঁড় করিয়ে অমানুষিক কষ্টে সেই মাতাল লোকটাকে টেনে বাইকের পেছনের সিটে তুলল। লোকটা যাতে পেছন থেকে গড়িয়ে পড়ে না যায়, সেজন্য লোকটার দুটো হাত টেনে নিজের পেটের সাথে শক্ত করে মুড়িয়ে পেঁচিয়ে নিল মেহরাজ।
তারপর এক হাতে কোনোমতে বাইকের হ্যান্ডেল সামলে, আর অন্য হাতে পেছনের মাতালটাকে শক্ত করে ধরে রেখে গন্তব্যের দিকে রওনা দিল সে।
চলন্ত বাইকের হাওয়ায় মাতাল লোকটা নিজের সমস্ত ভার ছেড়ে দিয়ে সোজা মেহরাজের পিঠে মাথা রেখে শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল। পিঠের ওপর মদের দুর্গন্ধযুক্ত এই অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ পেয়ে মেহরাজের পিত্তি জ্বলে গেল! দাঁতে দাঁত চেপে আকাশের দিকে মুখ করে বিড়বিড় করে উঠল সে,
—‘ওহ গড! মুভিতে নায়কের গাড়ির সামনে এসে পড়ে সুন্দরী নায়িকা! নায়ক গিয়ে নায়িকার ওপর পড়ে এক্সিডেন্টাল কিস হয়! আর আমি গিয়ে পড়লাম পারফিউমহীন মাতালের উপর!’
গভীর রাতে বাড়ি ফিরল বারিশ। ড্রয়িংরুমের বাতিটা জ্বালানোই ছিল। কদম ফেলতেই সোফায় বসে থাকা তার বাবা চঞ্চল শেহরিয়ারের মুখোমুখি হতে হলো ওকে। গলার স্বর গম্ভীর করে চঞ্চল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,
—‘এত রাত অব্দি কোথায় ছিলে?’
ভাবলেশহীন মুখে উত্তর দিল বারিশ,
—‘বন্ধুদের সাথে।’
চঞ্চল সাহেবের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। ছেলের এই উদাসীনতা সহ্য করা কঠিন।
—‘নিজের স্বভাব এবার একটু বদলাও! নতুন বউকে ঘরে ফেলে রেখে তুমি রাত-বিরাতে বাইরে আড্ডা দিয়ে বেড়াচ্ছ? এখন অন্তত নিজেকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করো।’ তার স্বর কঠোর।
বারিশ থামল, বাবার দিকে একপলক চাইল। ওর চোখে-মুখে বিন্দুমাত্র পরিবর্তনের তাগিদ নেই। ঠাণ্ডা গলায় জবাব দিল,
—‘পারব না। আমাকে এভাবে মেনে নিয়ে যার থাকার সে থাকবে, আর না থাকার থাকলে সোজা চলে যাবে।’
চঞ্চল সাহেবের উত্তরের অপেক্ষা না করে সে নিজের রুমের দিকে হেঁটে গেল। চঞ্চল সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসে রইলেন, তারপর লাইট নিভিয়ে নিজের ঘরে শুতে চলে গেলেন। বারিশ রুমের দরজার লকটা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখল চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার। বারান্দা থেকে আসা সামান্য একটু হালকা আলোয় রুমের অবয়ব স্পষ্ট হচ্ছে কিছুটা
বিছানার দিকে তাকাতেই ওর চোখে পড়ল ঝিলমিল ঘুমিয়ে আছে। একটা কোলবালিশ শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে গায়ে চাদর টেনে শান্ত হয়ে শুয়ে আছে মেয়েটা। বারিশ ধীর পায়ে গিয়ে বিছানার পাশে দাঁড়াল। নিঃশব্দে কিছুক্ষণ ঘুমন্ত মেয়েটার বিষণ্ন মুখের দিকে নিষ্প্রাণ চোখে তাকিয়ে রইল সে। তারপর ঝিলমিলের কাঁধে হাত দিয়ে সামান্য ধাক্কা দিয়ে ডেকে তুলল। কয়েক মুহূর্ত পর ঘুম ঘুম চোখে খুব কষ্ট করে চোখ মেলল ঝিলমিল। আধো-ঘুমের জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করল,
শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১৩
—‘কী হয়েছে?’
বারিশ সোজা দাঁড়িয়ে থেকে নিচু গলায় বলল,
—‘আমার খিদে পেয়েছে।’
ঝিলমিল সামান্য ভুরু কুঁচকে তাকাল, গলার স্বর তখনও ভারি।
—‘তো?’
—‘খাবার গরম করে দাও।’
ঝিলমিল অন্ধকারেই একদৃষ্টিতে বারিশের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল এক মুহূর্ত। কোনো প্রতিবাদ করল না, কোনো কড়া কথাও বলল না। শুধু লোকটার এই অসময়ের হুকুমটা মেনে নিতে না পেরে কেঁদে দিলো।
