Home শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭২

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭২

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭২
নূরজাহান আক্তার আলো

শীতল তার হলুদ শাড়ির লাল আঁচল দিয়ে শুদ্ধর এক হাত বেঁধে হাঁটা ধরল বাড়ির দিকে। এমন দৃশ্যে হইহই করে উঠল সকলে। কামরান সিটি বাজাল। বাগানের এককোণে বসা অন্য আত্মীয়রা চেঁচিয়ে উঠল। হঠাৎ
সিটি বাজানোর সুরে সায়ন, রুবাব, অর্ক পেছনে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা আধভেজা গায়ের শুদ্ধর একটা হাত বাঁধা শীতলের শাড়ির আঁচলে। শীতলের চোখ মুখে নিদারুণ লজ্জার রক্তিম আভা। দৃষ্টি মাটির দিকে। শুদ্ধও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেঁটে আসছে। তবে ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বিশুদ্ধ পুরুষের ঠোঁটের কোণেও
মিটিমিটি হাসি। ব্যাঙাচিকে সামলে নিতে বলেছিল কিন্তু এভাবে সামলে নেবে সেও ভাবতে পারে নি। তাদের এমন রোমান্টিক মুহূর্তে বউ কোলে নিয়ে সায়নরাও হইহই করে উঠল। চেঁচিয়ে পঁচাতে লাগল শুদ্ধ শীতলের নাম ধরে। ক্যামেরাম্যান ছবি তুলতে লাগলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে কে যেন লাউডস্পিকারে গান ছেড়ে দিলো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আঁচলে বান্ধিয়া রাখিবো গো তোমারে
আঁচলে বান্ধিয়া রাখিবো।
চোখের কাজল করিবো গো তোমারে
চোখের কাজল করিবো।
এমন দৃশ্য আর গান শুনে সকলে ওদের নিয়ে পড়ল। শীতল শুদ্ধর হাত ধরে টেনে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল। পেছন পেছন প্রবেশ করল বাকি ভাইরা। ড্রয়িংরুমে বসা চৌধুরী তিন কর্তা এক নজর দেখে দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন। বউদের ওয়াশরুম অবধি পৌঁছানোর কথা থাকলেও কাউকেই বউ নিয়ে উপরে যেতে দেওয়া হলো না। সায়ন জোরাজোরি করে রাগ দেখালেও কাজ হলো না। অগত্যা বউদের ড্রয়িংরুমে রেখে তারা ওপরে চলে গেল। অর্কও আর দাঁড়াল না শখের দিকে একবার তাকিয়ে বড়দের থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হলো। একটুপরে রেডি হয়ে বরের বেশে আসতে হবে। এখন আসত না তবে সিঁতারার ডাক অগ্রাহ্য করতে করতে পারে নি। অর্কের সঙ্গে গেল হাসান, স্যান্ডি আর কামরান।

তখন শখের রুমে নতুন বউদের শাওয়ার নিতে পাঠালেন সিরাত। একথা শুনে চারজনই একসঙ্গে ওয়াশরুমে ঢুকল। বেশ বড়সড় ওয়াশরুমের স্পেস। ওয়াশরুমে ঢুকতেই নজরে পড়ে ইতালিয়ান মার্বেলের তৈরি দেওয়াল। ম পাথরের মতো ঠান্ডা টাইলস। ডানদিকে বিস্তৃত ফ্রস্টেড গ্লাস পার্টিশন; যেটা অপালের মতো ঝাপসা। তার ভেতরে রেইন শাওয়ার। শাওয়ারের দেয়ালে অ্যাম্বার-লাইট নিস, যেখানে সুগন্ধি অয়েল আর নরম তোয়ালে সাজানো। বামদিকে চকচকে ওক কাঠের ভ্যানিটি ইউনিট, তার উপরে স্থাপিত ওভাল আকৃতির স্টোন বেসিন। বেসিনের কল থেকে বের হয় উষ্ণ পানির ধারা। যদিও এটা স্রেফ সাধারণ কল নয়, টাচ-অ্যাক্টিভেটেড ডিজিটাল মিক্সার। আর চৌধুরী বাড়িতে প্রত্যেকটা ওয়াশরুম প্রায় এক ডিজাইনের। সঙ্গে রয়েছে আধুনিক সু-ব্যবস্থা। শখ, স্বর্ণ, শীতল ও ঐশ্বর্য
গল্প করতে করতে হলুদ উঠানোর কাজে লেগে গেল। সিরাত এসে যার যার ফেসওয়াশ, তোয়ালে, পোশাক দিয়ে গেল। ফেসওয়াশ মুখে ঘষতে ঘষতে গত রাতের অভিনয় নিয়ে কথা উঠল। সায়ন, রুবাবের অভিনয় নিয়ে হাসতে শুরু করল। একটুপরে সিমিন এসে ধমকে গেলেন, নতুন বউদের নাকি জোরে হাসতে নেই। মানুষ মন্দ বলবে। কিন্তু কেউ শুনল না। উনি চলে গেলে শীতল ওয়াশরুমের বালতি উপুড় করে তার উপরে বসল। শখের দিকে তাকিয়ে কিছু ভেবে মিটিমিটি হেসে বলল,

-‘ আপু? তুমি কিন্তু ভুলেও ঠোঁটে লাল লিপষ্টিক দিবে না।’
-‘কেন?’
-‘ অর্ক ভাইয়ার পেট খারাপ হতে পারে।’
-‘লিপস্টিকের সাথে উনার পেট খারাপের কি সম্পর্ক?’
-‘ওমা সম্পর্ক থাকবে না? খাবে তো তোমার উনিই, তাই না?’
একথা শুনে শখ লাজুক হেসে একটা মারল শীতলকে। পানি ছুঁড়ে দিলো একমগ। বোনকে লজ্জা পেতে দেখে শীতল খিলখিল করে হেসে এবার স্বর্ণকে বলল,

-‘আপু, কাল সকালে কয়টায় ডেকে দিবো ? ফজরের আগে নাকি পরে?’
স্বর্ণ বোনের শয়তানি বুঝে জবাব দিলো না। ফেসওয়াশ দিয়ে পুরো মুখ
ধুয়ে তাকাল বোনের দিকে। স্বর্ণকে জবাব দিতে না দেখে শীতল পুনরায় বলল,
-‘আপু, বলো? তোমাদের ডাকার জন্য আমাকে তো জেগে থাকতে হবে।
তাছাড়া আমার একটা দায়িত্ব আছে না? আরে লজ্জার কিছু নেই তো, বলো, বলো।’
স্বর্ণ এবার ঘুরে দাঁড়িয়ে শ্যাম্পুর বোতল থেকে একগাদা শ্যাম্পু শীতলের মাথায় ঢেলে দিলো। ঘষা দিয়ে ফ্যানা তৈরি করে পিরামিডের মতো করে রেখে দিলো। দেখতে এবার কার্টুন কার্টুন লাগছে। তাকে দেখে শখ আর ঐশ্বর্য হেসে ফেলল। হাসল স্বর্ণও। তবে স্বর্ণের হাসির কারণ একটু ভিন্ন।

আর সেটা হলো শীতলের কাঁধ, গলায় থাকা কিছু দাগ। পাজিটা অন্যকে পঁচাচ্ছে ঠিকই কিন্তু নিজের দিকে খেয়াল করেছে কী? ছোট হয়েও খুব তো অন্যের বাসরঘর নিয়ে মজা নিচ্ছে অথচ বাসরের আগেই তার গায়ে বাসরের চিহ্ন ফুটে আছে। সে যদি এখন বলে লজ্জায় সামনেই আসবে না। মুখ কাঁচুমাচু করবে। দূরে দূরে থাকবে। একথা ভেবে স্বর্ণ আপাতত
কিছু না বললেও কেন জানি ভীষণ হাসি পেল। ঠোঁটে মিটিমিটি হাসি এঁটে শীতলের মুখের গলার হলুদ তুলতে সাহায্য করল। সে জবাব দিচ্ছে না দেখে শীতল বোনের দিকে চোখ তুলে তাকাল। চোখাচোখি হওয়াতে শীতলের হয়তো টনক নড়ল। সে তড়াক করে উঠে শাড়ির আঁচল ঘুরিয়ে নিয়ে গলা ঢেকে নিলো। ইস! বেমালুম ভুলেই বসেছে এটার কথা। তখন ঐশ্বর্য মিটিমিটি হেসে বলল,

-‘ ফজরের আগে বা পরে স্বর্ণকে কেন ডাকবে শীতল? আমাদেরও বলো আমরাও শুনি?’
বোনকে একদফা লজ্জায় ফেলার সুযোগ মিস করল না শীতল। সে দাঁত বের করে হেসে জবাব দিলো,
-‘ বিয়ের পরদিন সকালে ডাকাডাকির কাজ করে ননদ-ভাবিরা। আরো
কত কিছু শিখিয়ে দিতে হয়। আমিও দেবো। আমি তো সম্পর্কে আপুর জা, তাই না আপু?’
শখ এবার বিষ্ময়ভরা সুরে বলল,
-‘কি কাজ করতে হয়? আর কি শিখিয়ে দিবি তুই?’
শীতল শয়তানি হেসে বলল,

-‘মেজো মায়ের ছোটো ভাইয়ের বিয়ের কথা মনে আছে? আমরা সবাই বিয়ে খেতে গেলাম না? আমি দেখেছি বিয়ের পরদিন সকালে ঘটা করে নতুন বর বউকে গোসল করানো হয়।’
শখ, ঐশ্বর্য একে অপরের দিকে তাকিয়ে আরেকদফা হেসে উঠল। তখন স্বর্ণ বলল,
-‘ডাকতে হবে না। তোর জাঁদরেল ভাই যদি বাঁচিয়ে রাখে আমি একাই উঠতে পারব।’
-‘ এই আপু, তুমি কি ভয় পাচ্ছো সায়ন ভাইকে?’
-‘পাচ্ছি।’
-‘কাকে? ভাইয়াকে নাকি তার আদরকে?’
-‘দুটোই।’

স্বর্নের কথা শুনে বাকি তিন অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। সিরাত এসে ধমক দিয়ে গোসল সারতে তাড়া দিলো তাদের। রেডি হতে হবে। সময় কি আর বসে আছে? বকা শুনে একে একে ফ্রস্টেড গ্লাস পার্টিশনে গিয়ে গোসল সারল। ভেজা কাপড় ধুয়ে বালতিতে রাখল। এগুলো পরে মেলে দেওয়া হবে। রেডি হতে হবে বিধায় কেউই শাড়ি পরল না। চুল শুকানোর কাজে লেগে গেল। শীতল গোসল সেরে আধশোয়া হয়ে সিলিং এর নিচে বসল।
ঝটফট ফোন হাতে তুলে রংঢং করে কয়েকটা ছবি তুলে শুদ্ধকে পাঠিয়ে দিলো। মিটিমিটি হাসতে হাসতে মেসেজ করল,’বিয়ের গোসল ডান। নতুন বরের অপেক্ষায়।’ সঙ্গে সঙ্গে মেসেজ সিন হলো। যা সচারাচর হয় না। তবে কী ফোন হাতে নিয়ে বসেছিল ? কিছু টাইপ হচ্ছে দেখে শীতল অধির আগ্রহে তাকিয়ে রইল। তখন টুং করে মেসেজ এলো, ‘ওয়েট করছি।’

-‘কেন?’
-‘ শাওয়ার নিবো।’
-‘কেবল নিলাম।’
-‘তাতে কি, আবার নিবি।’
-‘পারব না।’
-‘কেন?’
-‘ভাইয়ারা সবাই সবার বউকে কোলে নিলো আপনি নিলেন না। আমার কী ইচ্ছে হতে পারে না আমার বরের কোলে চড়ার। যেহেতু নেন নি আমিও আর আপনার ধারে কাছে যাব না।’

-‘ কে বলল নিবো না?’
-‘ নিবেন নাকি? কখন শুনি?’
-‘সুযোগ বুঝে।’
-‘কত সেকেন্ডের জন্য শুনি?’
-‘বউ যতক্ষণ চাইবে।’
-‘সিওর?’
-‘সিওর। শাওয়ার নিতে হবে জলদি আসা হোক।’
-‘আজ একা নেওয়া হোক।’
-‘আসতে বলেছি।’
-‘না বলেছি।’
-‘খুব সাহস বেড়েছে, না? ঘড়ির কাঁটা কিন্তু ঘুরছে। দিন পেরিয়ে রাত আসবে। ভাবিরা তোকে একা রেখে যাবে আমার রুমে। রাত গভীর হবে। আমিও থাকব রুমে। তা মনে আছে তো আজ আমাদের কী রাত?’

-‘যে পুরুষ নিজের বউকে কোলে নিতে পারে না তার মতো দূর্বল পুরুষের কাছে আমি যাব না।’
-‘আমি দূর্বল!’
লাস্ট মেসেজ সিন করে শুদ্ধ অফলাইনে চলে গেল। শীতল দাঁত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে ভাবুক হয়ে বসে রইল। কি বলতে কী বলে ফেলল। সে কী সেই দূর্বলের কথা বলেছে নাকি? এখন কি করে বোঝাবে এটা ওই দূর্বল না। মুখ গোমরা করে ফোন রেখে আগে চুল শুকিয়ে নিলো। মেকাব দিয়ে সাজবে না তবে ড্রেস, চুল,পরিপাটি করে দেওয়ার জন্য দুজন মেয়ে আসবে। উনাদের রুমে পাঠানোর আগে সিঁতারা তড়িঘড়ি রুমে এলেন। মেহমানরা ভিড় বাড়ার আগে চারজনকে সামনে বসিয়ে নিজের হাতে খাইয়ে দিলেন। শখ মায়ের হাতে খেতে গিয়ে অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিলো। সিঁতারাও বুকচাপা কষ্ট চেপে মেয়েগুলোকে খাইয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। উনি যেতেই সাম্য, সৃজন হাজির হলো। তাদের হাতে বই জাতীয় কিছু। তারা নাচতে নাচতে এসে বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। শীতল পুনরায় শিখিয়ে দিলো চার দুলাভাইদের থেকে কীভাবে টাকা হাতাতে হবে। যদিও গোপনে কদিন থেকেই ট্রেনিং দিচ্ছে সে। শর্ত একটাই তাকেও ভাগ দিতে হবে। তিনমাথা যুক্তি পরামর্শ
করছে দেখে কেউ বিরক্ত করল না। শুধু শুনে গেল তিন পাজির কথা। তখন সায়ন স্বর্ণকে ফোন করে বেশ আদুরে সুরে ডাকল,

-‘ জান?’
-‘হুম।’
-‘বিজি?’
-‘না।’
-‘একটু আসি? বুকের ভেতরটা কেমন চিনচিন করছে।’
-‘ গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা বোধহয় ওষুধ খাও।’
-‘বাল খাও। রুমে মানুষ আছে?’
-‘হুম।’
-‘ওহ। আচ্ছা শোন, সাম্য, সৃজনের হাতে ক্যাটালগ পাঠালাম চারজন দেখে চুজ কর কেমন ডেকোরেশন চাস।’
-‘কিসের ডেকোরেশন? ‘
-‘বাসরঘরের?’
-‘ আমাদের দেখতে হবে কেন? তোমরা ঠিক করো।’
-‘পারব না। আমরা বাসরঘর নষ্ট করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। তোরা কর।’
শীতল স্বর্ণের ফোনের সাথে কান লাগিয়ে শুনছিল কথা। এক পর্যাযে খিলখিল করে উঠল। তার হাসির শব্দ শুনে সায়ন বলল,

-‘আরেক পাগলি হাসছে কেন? দাঁত খুলে পা কেটে যাবে তো। তাছাড়া শুদ্ধ কি ফোঁকলা বউ নিবে? আচ্ছা জান, যারা ফোঁকলা তারা ঠিকঠাক কবুল বলতে পারে তো? নাকি দাঁতের ফাঁক দিয়ে কবুল বেরিয়ে যায়।’
শীতল ততক্ষণে সরে গেছে। বিছানায় বসে গড়িয়ে গড়িয়ে হাসছে দেখে সায়ন ফিসফিস করে বলল,
-‘জান? বনু কি শুনে ফেলল নাকি?’
-‘হুম।’
সায়ন এবার খুকখুক করে হাসল। তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে রুবাবের উদ্দেশ্যে বলল,
-‘ সামান্য একটা শর্ট নিয়েছিলাম বলে তোর মামা কত কথা শুনাল। এই দেখ বান্ডিল বান্ডিল কিনে এনেছি। এই শাহরিয়ার সায়ন গরীব না রে, গরীব না। যা অফার দিলাম কার কয়টা লাগবে নিয়ে যা। যাওয়ার আগে বলে যা, সাদা পাজামার নিচে কোন রঙের টা পরব?’

-‘পিংক নাই? না মানে মেয়েরা গোলাপি পুকি জিনিস পছন্দ করে। স্বর্ণও বোধহয় পুকি জামাই পছন্দ করবে। পিংক কালার পরো।’
-‘ আজ রাতে এমনিতেই মেলা এনার্জি লস হবে তোকে মেরে আপাতত এনার্জি লস করতে চাচ্ছি না। তুইও না নতুন বর? চল, আয়, মিলেমিশে
ভদ্রতার ভাণ করি?’
একথা শুনে রুবাব সায় দিলো। তারপর সবগুলো শর্ট হাতড়ে নিজের ঠোঁটে চিমটি চিমটি কাটতে কাটতে কিছু একটা ভাবল। তারপর বিজ্ঞের মতো জবাব দিলো,
-‘সাদার নিচে কালোটা ফুটবে ভালো। ব্রান্ডের জিনিস পরবা মানুষকে না দেখালে চলে? কালোটাই পরো।’
সায়ন কটমট করে তাকিয়ে রুবাবকে কিছু না বলে স্বর্ণকে বলল,
-‘কার কোন ডেকোরেশন পছন্দ মেসেঞ্জারে জানা। একটুপরে লোক আসবে রুম সাজাতে, দেরি করিস না। আমি তোর ভাইকে একটু সাইজ করি ততক্ষণে। ‘
একথা বলে কল কেটে দিলো। রুবাব দৌড়ে খাটের এককোণে দাঁড়িয়ে সমানে চেঁচাচ্ছে। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না ছোটোবেলার মতো দুই ভাই
মারামারি করতে লাগল।

_’আপনার সংসার করব না আমি। ঘৃণা করি আপনাকে। আপনি আমার জীবন টা নষ্ট করে দিয়েছেন। আপনি নিকৃষ্ট। খারাপ। জীব জানোয়ারের থেকেও অধম আপনি। ‘
উক্ত কথা টি বলে কিয়ারা হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। ছুঁতে গেলেই সে এসব শুরু করে। কিল, ঘুষি খামচি কোনোটা বাদ রাখে না। তবে বিশেষ মুহূর্তে এমন কিল, ঘুষি, খামচি খুব একটা খারাপ লাগে না বুরাকের। সে বরং বউয়ের ছেলেমানুষী ভেবে হাসিমুখে গ্রহণ করে। এমনিতে আগের মতো কাছে টানে না। তবে সপ্তাহে দু’একদিন যাও টানে এভাবে রিয়েক্ট করে। এমন তো না যে প্রথম স্পর্শ করছে তবুও রোজকার এসব কাহিনি ভালো লাগে না। বিয়ে করা বউয়ের সাথে জোরাজুরি কিসের? নিজের
চাহিদা মিটিয়ে যখন ফ্রেশ হয়ে এলো কিয়ারা তখনও নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে ছিল। আজ সকালে এনে দেওয়া শপিং ছুঁয়েও দেখে নি। সেগুলো বের করে সে নিজে বলল,

-‘ থ্রি-পিচ যা ছিল ফেলে দিয়েছি। এবার থেকে সবসময় শাড়ি পরবে। শাড়ি পরা নারী আমার একটু বেশিই পছন্দ। ‘
প্রায় দিন এমন করে দেখে বুরাকও কিছু বলল না। পাস্তা আনিয়ে খেতে খেতে বলল,
-‘শুনলাম, চৌধুরীরা তিনপুত্রের বিয়ের অনুষ্ঠান একসাথে করবে। যাবে নাকি বান্ধবীর বিয়েতে?’
একথা শুনে কিয়ারার কান্না বন্ধ হয়ে গেল। সে অশ্রুসিদ্ধ চোখে তাকিয়ে ভেজা গলায় জিজ্ঞাসা করল,
-‘কার বিয়ে?’
-‘তোমার ফ্রেন্ড শীতলের। সঙ্গে সায়ন- স্বর্ণ আর রুবাব-ঐশ্বর্যের বিয়েও একসাথে সারবে।’
-‘রু..বাব? কোন রুবাব?’

-‘ নাগরকে এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে? নাকি আমার মুখ থেকে শুনতে চাচ্ছো, হুম?’
কিয়ারা শোয়া থেকে উঠে বসল। গায়ে চাদর জড়িয়ে পুনরায় শুধালো,
-‘বলুন? কোন রুবাবের কথা বলছেন? শীতলের ফুপাতো ভাই রুবাবের
কথা বলছেন?’
-‘বোধহয়।’
-‘কবে বিয়ে? কার সাথে বিয়ে?’
-‘বলব না।’
কিয়ারা বুকের চাদর আঁকড়ে ধরে নিচে নামল। উতলা হয়ে বুরাকের পা ধরে বসে পড়ল। অসহায় সুরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-‘ বলুন না প্লিজ! রুবাব কি ওই মেয়েটাকে ভালোবাসতো? নাকি অরেঞ্জ ম্যারেজ? কবে বিয়ে ওদের? আমি যাব,,নিয়ে চলুন না আমায়।’

কিয়ারার মনে হলো তার দম আঁটকে আসছে। গোপন কুঠুরিতে লুকিয়ে রাখা মানুষটার বিয়ে? তাকে তো জানানো হলো না মনের কথা। লুকানো ভালোবাসা হলোও মানুষটাকে ভালোবাসে সে; খুব ভালোবাসে। বুরাক একটা কথার জবাবও দিলো না। বারবার অনুরোধ করলেও না। কিয়ারা
অসহায় হয়ে থম মেরে বসে রইল। হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগল। তার
কান্না দেখে রুবাকের কেন জানি পৈশাচিক আনন্দ হলো। বেশ গর্ব হলো নিজের ভালোবাসাকে নিজের কাছে আঁটকে রাখতে পেরে। সত্যি বলতে
ভালোবাসার মানুষকে ধরে রাখতেও ভাগ্য লাগে। এদিক থেকে ইয়াসির হেরে গেছে, আর সে জোর করে হলেও তার ভালোবাসাকে জিতে নিয়ে জয়ী হয়েছে। মনে মনে এসব ভেবে ওষ্ঠে হাসি এঁটে টিভিতে হিন্দি গান ছেড়ে দিলো। গানের সাউন্ড বাড়িয়ে দিলো নিজেও সুর মেলাতে লাগল।

অতঃপর জরুরি কল আসায় রেডি হয়ে গুনগুন করতে করতে বেরিয়ে গেল। সারাদিন পেরিয়ে ফিরল, রাত এগোটায়। বউটাকে কাঁদতে দেখে বেরিয়েছিল তাই মন ভালো করতে অনেক গুলো চকলেট আর গোলাপ ফুল এনেছে। সেগুলো হাতে নিয়ে রুমের ঢুকে দেখে কিয়ারা দেহ সিলিং
ফ্যানের সাথে ঝুলছে। তার এনে দেওয়া শাড়ি দিয়ে ফাঁস দিয়েছে। এত ঘৃণা মনে? এত জেদ? সকালেই না ভালোবাসা পাওয়া নিয়ে গর্ব করল সে? অথচ দিন পেরিয়ে রাত নামতে না নামতেই কিয়ারা তাকে এভাবে হারিয়ে দিলো? তার গর্ব ধূলোয় মিশিয়ে দিলো? তাহলে ইয়াসির নিজের অধিকার ছেড়ে দিয়ে বুদ্ধিমানের কাজ করল? এ পরিস্থিতি তাই বলছে।

নতুবা দিনশেষে পেয়েও হারিয়ে ফেলল কেন। হতভম্ব বুরাক যখন দ্রুত
শাড়ি কেটে কিয়ারাকে নামাল তখন কিয়ারা প্রাণহীন দেহমাত্র। গলায়
ফাঁসের মোটা দাগ। জিহবায দাঁত গেঁথে আছে। হাত-পা বরফের ন্যায় ঠান্ডা। সে কত করে ডাকল কিন্তু শুনলোই না পাষাণ মেয়েটা। তবুও সে
দৌড়াদৌড়ি করে হসপিটালের নিয়ে গেল। তখন জানা গেল মেয়েটি আর নেই। এবং সে দেড় মাসের প্রেগনেন্ট ছিল। একথা শুনে বুরাক যেন পাথর বনে গেল। প্রাণহীন কিয়ারার পাজোড়া ধরে হাউমাউ করে কেঁদে
মাফ চাইল। ফিরে আসার কত অনুরোধ করল। তাকে তার বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ওয়াদা করল। কিন্তু কিছুতে কিছু হলো না। তবে
শেষ মুহূর্তে কিয়ারার মৃত দেহ বাবা-মায়ের কাছে পৌঁছে সত্যটা জানিয়ে ফেরার পথে বুরাক এক্সিডেন্ট করে। এটা যে কাঙ্ক্ষিত সুইসাইড করার চেষ্টা বুঝতে বাকি নেই কারো। তারপর থেকে বুরাক হসপিটালেই ছিল।
ক্ষণে ক্ষণে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিল। অতঃপর ডাক্তারদের সব চেষ্টা
বৃথা করে আজ সকলে সেও না ফেরার দেশে চলে গেল। কিয়ারা ফাঁকি দিলো সেও বেহায়ার মতো পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে তারই পিছু নিলো। কি অদ্ভুত ভালোবাসা!

পৃথিবীর মানুষ চলে নিজ নিয়মে যার যার জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে।
কেউ কারো জন্য থেমে থাকে না। সময়, পরিস্থিতি, থামতে দেয় না। শূন্য নিজেও শূন্যস্থান পছন্দ করে না। প্রকৃতি হিসাব ভুলে না। সব মিলিয়ে যা যার প্রাপ্য, কৃতিত্ব সব মিলে মিশে একাকার হবে। শূন্যের হিসাবে একটি সংখ্যা বসে পূর্ণ হবেই। সেই হিসেবে আজ ১৪ নভেম্বর। একই দিন। একই বার। একই দেশ। ঘড়ির কাঁটাটাও চলছে এক নিয়মে। অথচ পরিস্থিতির নির্মম কড়াঘাতে বুরাকের লাশ নিতে ইয়াসির নিজে গেছে হসপিটালে। অপেক্ষা করছে বিশ্বস্ত সহকারীর লাশ নেওয়ার জন্য। এই লাশের নামটা ছিল বুবাক। মানুষটা যখন আর নেই নামের কদরই বা আর কে করবে?

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭১

এদিকে বুরাক আর কিয়ারার জার্নি যেখানে শেষ অন্যদিকে আজকের দিনে চৌধুরী নিবাসে চলছে সুখের মাতম। চার জোড়া দম্পতির মধুর মিলনের মৌসুম। পূর্ণতার শুভক্ষণ। কারণ, ওই একটাই; পৃথিবীর মানুষ চলে যার যার জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে! সময়ের হিসেবে। বহমান জীবনের গতিপথকে অনুসরণ করে।

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭৩