শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৮৮
নূরজাহান আক্তার আলো
টানা পাঁচ দিন হাসপাতালে থাকার পর অসুস্থ শরীর নিয়ে উন্নয়ন কেন্দ্রে ফিরল শীতল। শারীরিক দুর্বলতার কারণে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা তার পক্ষে সম্ভবও ছিল না। বয়স কম, গর্ভপাতের শারীরিক ও মানসিক চাপ, আইনি জটিলতা এসব মিলিয়েই তার শোচনীয় অবস্থা। তার কথা ভেবে
আদালতের শুনানির তারিখ আরো একবার পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। তা
করতে শুদ্ধ আর শতরুপাকে বেশ কসরত করতে হয়েছে। হাসপাতালের সব রিপোর্ট সাবমিট করতে হয়েছে, নতুন করে আবেদন করতে হয়েছে, অতঃপর আদালত উন্নয়ন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে কিছুদিন কাউন্সিলিং ও চিকিৎসার মধ্যে রাখার নির্দেশ দিয়েছে। অনেকের ভাষ্যমতে এগুলো না করলেও হতো। গর্ভপাতের পর পাঁচদিন রেস্ট করেছে এটাই অনেক।
পেট তো কাটে নি বরং ছিদ্র করে যা করার করেছে। এসবে ব্লাড গেছে ফলমূল খেলেই ঠিক হয়ে যাবে৷ কিন্তু শুদ্ধ নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে যা ভালো বুঝেছে সেটাই করেছে। সে পূর্বেও যেমন কারো কথায় চলে নি আজও তাই। আর শীতলকে নিয়ে হেলা করার প্রশ্নই আসে না। তাছাড়া
তার ধারণা আছে, গর্ভপাতের পর অনেক মেয়েই পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার নামের মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়। পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার নিয়ে যারা ধারণা রাখে তারা কখনোই এসব হেলা করে না। আর একজন স্ট্রেস ডিজঅর্ডারের পেশেন্টকে সামলানো চারটে খানিক কথা নয়। তার উপরে শীতল আছে তার চোখের আড়ালে।
কিন্তু দিন তো আর থেমে থাকে না। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দিন কাটে আপন নিয়মে। সুখ-দুঃখ, আশা- নিরাশা, ভালোবাসা-বেদনার মিশেলে নিজের মতো গল্প বুনে। জীবনে এক একটি কড়াঘাতে হয়তো আমরা হাল ছেড়ে দেই, ক্লান্ত হই কিন্তু সময় থামে না। নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে না।
সে আপন নিয়মে এগিয়ে চলে আর আমাদেরও এগোতে বাধ্য করে। অন্য আরেকটি তিক্ত অভিজ্ঞতাকে সঙ্গী করে শীতলকে কাটাতে হলো আরো পনেরো দিন। আগের তুলনায় কিছুটা সুস্থ সে। আজ তার শুনানি। তাকে পনেরো দিন পর শুনানির জন্য আদালতের প্রাঙ্গনে আনা হলো। এসে শুদ্ধর সঙ্গে কয়েকবার দৃষ্টি বিনিময় হয়েছে। পুলিশের সামনেই টুকটাক কথা হয়েছে। তবে একাকী কথা বলার সুযোগ পায় নি। পুলিশ পাহারায় শীতল বেঞ্চের এককোণে বসল। শুদ্ধ একবার তাকিয়ে উকিলের সঙ্গে পূর্বের আলোচনা চালিয়ে গেল। পুলিশরাও নিজেরা গল্প করছিল। আর শীতল দূর থেকেই শুদ্ধকে দেখে যাচ্ছিল। শুদ্ধর পরনে সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট। শক্তপোক্ত দেহের সুদর্শন পুরুষটা অনেক শুকিয়েছে। সে যখন মন দিয়ে শুদ্ধকে দেখছিল তখন শারাফাত চৌধুরী কথা বলতে এগিয়ে এলেন। কিন্তু পুলিশ বাধা দিলেন। হাতে থাকা বোতলে ডাবের পানিটুকুও দিতে দিলেন না। শুনানির আগে কারো সাথে একাকি কথা বলা, কিছু খাওয়া, ফোনে কথা বলা যাবে না উপর থেকে বারণ আছে। মেয়েটাকে ডাবের পানিটুকু দিতে দিলো না দেখে শারাফাত চৌধুরী কষ্ট পেলেন। মলিন মুখে চলে আসার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই শীতল মিষ্টি করে ডেকে উঠল,
_’বড় আব্বু!’
অনেকদিন পর মিষ্টি কন্ঠের ডাক শুনে উনার পা জোড়া থমকে দাঁড়িয়ে গেল। বুকের ভেতরটা মুচড়ে ধরল। উনি তড়িৎ ঘাড় ঘুরিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,
_’ বলো মা। এইতো আমি।’
_’বড় আব্বু, এখানে আসার আগে ভরপেট খেয়ে এসেছি আর কিছু খাব না।’
শীতলের কথা শুনে শারাফাত চৌধুরী মলিন হাসলেন। পাগলিটাকে খুব করে জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করল, শুনানির আগে কেউ ভরপেট খেতে পারে বুঝি? গলা দিয়ে খাবার নামে? ভরপেট খেলে মুখ শুকনো থাকে? তবে কথা বাড়ালেন না। বুঝলেন উনি কষ্ট পেলেন দেখে মেয়েটা একথা বলল। উনি তার মনোভাব বুঝে ফেলেছে তা বুঝতে না দিয়ে বললেন,
_’সত্যি তো?’
_’হুম।’
_’গুড। আমরা সবাই এখানেই আছি একদম ভয় পাবে না, কেমন?’
_’হুম।’
একথা বলে যেতে গেলে শীতল পুনরায় ডেকে উঠল। ফিরে তাকালে শীতল আমতা আমতা করে বলল,
_’হাতে কি ওটা ডাবের পানি?’
_’হুম, খাবে মা?’
_’না, আসলে…!’
পুরো কথা না বলে একবার অদূরে থাকা শুদ্ধর দিকে তাকাল। শারাফাত চৌধুরী বুঝে গেলেন বাকি কথা। উনি মৃদু হেসে পা বাড়ালেন ঘাড়ত্যাড়া
ছেলের দিকে। যে রাগ করে এখনো উনার সঙ্গে কথা বলে না। সায়নটা হলে কবেই মানিয়ে নেওয়া যেতো। কিন্তু এ ছেলে তো এক কাঠি উপরে।
শুদ্ধ তখন মনোযোগ সহকারে কিছু একটা লিখছিল হঠাৎ মুখের সামনে পানির বোতল দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। বাবাকে দেখে পুনরায় লিখতে গেলে শারাফাত চৌধুরী বললেন,
_’ আপনাকে দিতে বলা হয়েছে। আপনি গ্রহণ করলে আপনার মাননীয়া ভীষণ খুশি হবে।’
একথা শুনে শুদ্ধ শীতলের দিকে একবার তাকালে শীতল খেতে ইশারা করল। শুদ্ধ আর কথা বাড়াল না ছিপি খুলে ঢকঢক করে অর্ধেকটা পান করল। গলাটা বোধহয় শুকিয়ে আসছিল। তবে গলা নাকি বুক উপলব্ধি করতে পারছিল না। শারাফাত চৌধুরী এক পা এক করে সরে এলেন। কি ভেবে যেন আকাশপানে মুখ তুলে তাকালেন। মনে মনে দোয়া নাকি অভিযোগ জানা গেল না তবে উনার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে অশ্রু ঝরে গেল।
কিছুক্ষণ পর শীতলকে আনা হলো আদালত কক্ষে। শীতল কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ঝাপসা চোখে প্রিয় মুখগুলো খুঁজছিল। চৌধুরী বাড়ির বড়রা পেছনের সারিতে বসেছে। সকলের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। হঠাৎ তার নজর পড়ল স্বর্ণের দিকে। আদালত প্রাঙ্গনে বোনকে দেখেনি সে, হয়তো কিছুক্ষণ আগে পৌঁছেছে। স্বর্ণকে দেখামাত্রই তার অবসন্ন চোখজোড়া চঞ্চল হয়ে উঠল। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করল ‘আপু রে, কেমন আছিস তুই? আমাদের হবু বাবুসোনা কেমন আছে? ও কি নড়েচড়ে?’ কিন্তু আদালতের কঠিন নিস্তব্ধতায় শব্দগুলো গলার কাছেই দলা পাকিয়ে গেল। অজান্তেই তার ডান হাতটা পেটের ওপর চলে গেল। তার পেটেও একজন ছিল, সে এখন আর নেই! শীতলের এই অবচেতন মনের হাহাকারটুকু স্বর্ণ আর শুদ্ধর চোখ এড়াল না। মুহূর্তেই তাদের বুক পাঁজর যেন ভেঙে চুরে এলো। কষ্টে বুকের ভেতরটা ছটফটিয়ে উঠল।
তবুও শুদ্ধ শান্ত চাহনিতে দেখে গেল আর স্বর্ণ দ্রুত চোখ সরিয়ে চোখের জল লুকাতে অন্যদিকে তাকাল। ঠিক সেই মুহূর্তে বিচারক এসে আসন গ্রহণ করলেন। গতবার যিনি ছিলেন, ইনি তিনি নন; ইনি দেখতে কেমন রাশভারী ও গম্ভীর। উনি এসে বিচারকাজ শুরু করার আদেশ দিলেন।
তখন পেশকার উচ্চস্বরে মামলার নাম ও নম্বর ঘোষণা করলেন। আদেশ পেয়ে বিপক্ষ দলের উকিল মোজাম্মেল সারোয়ার উঠে দাঁড়ালেন। ঘাড় ঘুরিয়ে শীতলের দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টি ছুঁড়ে তাচ্ছিল্য করে হাসলেন। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ সে। লোকটার তুচ্ছতাচ্ছিল্য নীরবে হজম করে নিলো শীতল। আদালত কক্ষ নাহলে কিছু কথা শুনাতে ছাড়ত না।
অতঃপর উনি বিচারককে তার অভিযোগগুলো একে একে বলতে শুরু করলেন,
-’মাননীয় আদালত, আজ এই আদালতের সামনে এমন কিছু উপস্থাপন করতে যাচ্ছি যেটা সত্যিই স্তম্ভিত করার মতোই। আসামির স্কুল/কলেজ সার্টিফিকেট, জন্ম সনদ অনুযায়ী তার বয়সটা খুবই কম। কিন্তু বয়সের তুলনায় তার অপরাধের ভারটা অনেক বেশি। সে আসামি। আসামি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আসামির কাঠগড়ায়। কেন? কারণ একজন জলজ্যান্ত
নিরীহ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। তাও ছুরি এবং ইলেকট্রনিক যন্ত্র (টেজার) দিয়ে। যেটার ব্যবহার বাংলাদেশে নিষিদ্ধ। এখানে আমার প্রশ্ন সে টেজার কোথায় পেয়েছে? কে দিয়েছে? এটা তো আলু পটলের মতো সহজলভ্য নয় যে বাজারে গেলেই পেয়ে যাবে। যে যন্ত্র ব্যবহারই নিষিদ্ধ সেটা একটা সাধারণ মেয়ের কাছে রাখার কারণ কি? নাকি এসবের পেছনেও আলাদা কোনো গল্প আছে?’
এইটুকু বলে থামতেই শীতলের উকিল তড়িৎ উঠে দাঁড়ালেন। প্রতিবাদী
সুরে কিছু বলতে যাবে তার আগেই বিচারক হাত তুলে থামিয়ে দিলেন। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জনাব রহমানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-‘অবজেকশন ওভাররুলড! মোজাম্মেল সাহেব, আপনি আপনার বক্তব্য পেশ করুন। আদালত আপনার দেওয়া তথ্যপ্রমাণগুলো খতিয়ে দেখতে চায়।’
বিচারকের এমন সপাটে আদেশে জনাব রহমান দমে গিয়ে ধীর পায়ে নিজের আসনে গিয়ে বসলেন। তাতে মোজাম্মেল সাহেবের মুখে এক চিলতে ধূর্ত হাসির রেখা ফুটে উঠল। উনি পুনরায় কথা শুরু করলেন,
_’ধন্যবাদ মাননীয় আদালত। মাননীয় আদালত, এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে গিয়ে আমাদের তদন্তকারী দল অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর এবং ভয়ংকর আরেকটি অপরাধের হদিস পেয়েছে। আমরা যাকে ‘হত্যাকারী’ হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছি, অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এ মেয়ে একটি সংঘবদ্ধ মাদক চক্রের সক্রিয় সদস্য! আসামি আর তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী কিয়ারা মিলে সুপরিকল্পিত এক জাল বিছিয়েছিল। তারা মূলত কলেজ পড়ুয়া তরুণ-তরুণীদের টার্গেট করত। সরলমনা শিক্ষার্থীদের নেশার জালে ফাঁসিয়ে তাদের হাতে মাদক তুলে দিতো। আমাদের কাছে কিছু ছবি, ডিজিটাল এভিডেন্স এবং কল রেকর্ড রয়েছে।’
কথা শেষ করে মোজাম্মেল কিছু ছবি বিচারকের কাছে পেশ করলেন। ছবিতে দেখা যাচ্ছে কিয়ারা আর শীতল মিলে দুটো ছেলের কাছ থেকে একটি ব্যাগ নিচ্ছে। ছেলে দুটো রেগুলার মাদক সাপ্লাই দিতো। নিজের নামে মিথ্যা অভিযোগ আসায় শীতল বিস্ময় নিয়ে তাকাল। শুদ্ধর দিকে
তাকিয়ে মৃদুভাবে মাথা নাড়াল। শুদ্ধ ইশারায় শান্ত থাকার ইশারা করল।
এই মুহূর্তে আবেগি হওয়া যাবে না, রাগ করা যাবে না, মাথা গরম করে
কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। ভুল সিদ্ধান্তে হিতে বিপরীত হতে পারে।
কিংবা কেসের মোড় ঘুরে যেতে পারে। যা ইচ্ছে বলুক,দেখাক, আপাতত
শান্ত থাকতে হবে। আদালতে আবেগের মূল্য নেই। জিতলে হলে যুক্তিতে টিকতে হবে। শুদ্ধ বসে থেকে ইশারায় শীতলকে বোঝাতে লাগল। চোখ দিয়ে আশ্বাস দিলো। কিন্তু কিভাবে শান্ত থাকবে? মিথ্যা অভিযোগগুলো যে তীরের মতো বুকে গিয়ে বিঁধছে। আর ছবিতে যে ছেলেদুটোকে দেখা যাচ্ছে, সে তাদের খুব ভালো করেই চিনে। একজনের নাম রোকন আর অন্যজন খোকন। কিন্তু কোথাকার জল কোথায় গিয়ে গড়াচ্ছে? শীতল নতজানু হয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মাথা কাজ করছে না। সহজ সরল জীবনটা এত কঠিন হয়ে যাচ্ছে কেন? এতদিন চৌধুরীরা সম্মানের সাথে বাঁচত। সবাই কত সম্মান করতো। আলাদা নজরে দেখত।
অথচ তার কারণে সব শেষ! খুনের আসামি হয়ে এসে এখন মাদকের বেচার তকমাও লাগে লাগল।
এবার শীতলের পক্ষের উকিল আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।মোজাম্মেল সাহেবের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুঁড়ে বিচারকের দিকে মুখ ফেরালেন। ঠোঁটের কোণে হাসি এঁটে বললেন,
-‘মাননীয় আদালত, আমার বিদ্বান বন্ধু যে ছবিগুলো পেশ করেছেন, সেগুলো দেখে মনে হতে পারে আমার মক্কেল কোনো অপরাধের সাথে জড়িত। কিন্তু আইনের চোখে একটি ছবি সবসময় চূড়ান্ত সত্য প্রকাশ করে না। এবং আধুনিক যুগে এমন শতশত ছবি বানানো কঠিন কিছু না।
মাননীয় আদালত, এই ছবিতে যে ব্যাগটি দেখা যাচ্ছে, তার ভেতরে যে মাদক ছিল এমন কোনো ফরেনসিক রিপোর্ট বা ল্যাব টেস্ট কি দেখাতে
পেরেছে? পারেনি। কারণ, ওই ব্যাগের ভেতরে কোনো মাদকই ছিল না। আর ওই দুই যুবক যারা মাদক সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে, তারা প্রকৃতপক্ষে আমার মক্কেলের কলেজের সামনে ফুচকা বিক্রি করে। আপনি অনুমতি দিলে আমি তাদের উপস্থিত করতে পারি।’
উনার কথায় এবার মোজাম্মেল সাহেব প্রতিবাদ করতে চাইলে রহমান সাহেব হাত তুলে থামিয়ে দিলেন। বিচারকও রহমানকে বক্তব্য চালিয়ে যাওয়ার আদেশ দিলেন। রহমান কৃতজ্ঞতা জানিয়ে পুনরায় বললেন,
-‘মাননীয় আদালত, এসব ছবি দেখিয়ে আদালতকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। কেননা ছবির ওই ব্যাগে সামান্য কিছু শুকনো আচার ছিল। আমি মুখে বলব না বরং সাক্ষীরা নিজেই বলুক।’
সাক্ষীদের ডাকা হলে তারা জানাল তাদের দেশের বাড়ি কক্সবাজার।
শীতলের সঙ্গে তাদের ভালো সম্পর্ক। মূলত শীতলের মিশুক স্বভাবের কারণে তারা তাকে বোনের নজরে দেখে। সাহায্যও পেয়েছে মেয়েটার থেকে। তাই চঞ্চল মেয়েটাকে খুশি করতেই সামান্য কিছু আচার কালো পলিতে করে এনে দিয়েছিল। এটাই হচ্ছে আচার দেওয়ার মূহুর্তে ছবি।
এখানে মাদকের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা গরীব মানুষ ফুচকা বেচে খায়। কিন্তু দিনশেষে তাদেরও মরতে হবে আর চোখের সামনে নির্দোষ মেয়েটিকে সাজা পাওয়া দেখতে পারবে না। এ অভিযোগে আর প্রমাণ
দেখাতে পারলেন না বিপক্ষের উকিল। এতক্ষণ যে উকিল কথা বলছিল শীতল ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাচ্ছিল। মিথ্যা অপবাদ চাপালে ভ্রু কুঁচকে নিচ্ছিল আবার যখন তার পক্ষের সত্যটা প্রকাশ তখন ভ্রুজোড়া আপনাআপনিই সমান হয়ে যাচ্ছিল। এত যুক্তি তর্কের মধ্যে বিচারক সূক্ষ্ণভাবে শীতলের মুভমেন্ট খেয়াল করছিলেন। কিন্তু কারো মুভমেন্ট দেখে তো আর বিচারকার্য করা সম্ভব নয়, বিচার হয় প্রমাণের ভিত্তিতে।
এবার শীতলের নামে আরো একটা অপবাদ পেশ করা হলো। সে নাকি সোশ্যাল মিডিয়ায় একাধিক ফেইক একাউন্ট খুলে বড়লোক ছেলেদের ফাঁসিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করত। এমনই এক ভুক্তভোগী ডাকার অনুমতি চাইলেন মোজাম্মেল সাহেব। অনুমতি দিলে আদালতের আর্দালি আবু সিদ্দিকের নাম ধরে ডাকলেন। বুঝতে বাকি রইল না, এটাও সূক্ষ্ণভাবে শীতলকে ফাঁসানোর চেষ্টা। নতুবা এখানে আবু সিদ্দিক ভুক্তভোগী হয়ে কেন আসবে? সে কতটা ভুক্তভোগী সেই গল্প শোনার জন্য কক্ষের সবাই তার আগমনের অপেক্ষায়। কিন্তু একবার..দুইবার…তিনবার ডাকলেও কেউ এলো না। মোজাম্মেল এদিক ওদিক তাকাতে লাগলেন। কিছুক্ষণ আগে মেসেজে কথা হয়েছে। জ্যাম আটকে বিধায় পৌঁছাতে লেট হচ্ছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, আসলেই তার সাথে কথা হয়েছে? কি জানি হয়তো হ্যাঁ নতুবা না। সিদ্দিক আসছে না দেখে ততক্ষণে কানাঘুষা শুরু হয়ে গেছে।
মোজাম্মেল আবু সিদ্দিকে অপেক্ষায় সে এলে বেশ কয়েকটা বোম ব্লাস্ট করবে। এজন্য সাক্ষী দরকার, সেই সাক্ষী আবু সিদ্দিক নিজে। এ কাজে
শুদ্ধ-শীতল তো ফাঁসবেই সঙ্গে সায়নের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারও ধ্বংস হবে।
এদিকে শীতলের নামে একের পর এক সত্য-মিথ্যের অভিযোগ এলেও
শুদ্ধ পেছনের সারিতে নিরুত্তাপ বসে আছে। তার চোখে-মুখে উদ্বেগের লেশমাত্র নেই। আজ যে রায় হবে সেটা মানতেই প্রস্তুত। আজ এতকিছু হতো না যদি না শীতল ওপেন রোডে কনককে মারত। কতশত মানুষ সেই ঘটনার সাক্ষী থাকত। রাতের দাগ রাতারাতি মোছা সহজ হলেও দিনের দাগ মোছা এত সহজ না। সহজ না বলেই অনেকে এটার সুযোগ নিচ্ছে। কতক্ষণ নিবে? নিক না। দুঃখ যত গভীর হয়, সুখ তত সন্নিকটে আসে। এ কয়েকমাসে অনেককিছু সহ্য করেছে, অনেক কিছু হারিয়েছে,
তার বিশ্বাস এ অসময় চিরস্থায়ী না। তাদের জীবনেও নতুন করে সূর্যাস্ত হবে। এতক্ষণ শীতলের নামে বিপক্ষ দলের উকিল যা তা বলায় নিশ্চুপ হয়ে শুনে যাচ্ছিল। শরীরের রক্ত টগটগ করে ফুটলে নিজেকে আপ্রাণ বোঝাচ্ছিল, এটা সঠিক সময় নয়। তবে সিদ্দিকের চ্যাপ্টার আসায় এতক্ষণ মুঠো করা হাতটা ধীরে ধীরে খুলল। তারপর শীতল চাহনিতে নিজের হাতের তালুর দিকে তাকিয়ে মনে মনে আওড়াল,
-’আপনার প্রধান সাক্ষী আসবে না স্যার, সত্যিই আসবে না। কারণ মৃত মানুষেরা ফিরে আসে না, ফেরার কোনো নিয়মও যে নেই। আর মিথ্যাে
সাক্ষী দিয়েই বা কী হতো? শুধু শুধু আমাকে হয়রান করত। তার চেয়ে নিজের ভিটায় রাধাচূড়া গাছের নিচে ভালো আছে। কি সুন্দর অর্ধগলিত লাশ হয়ে তিন হাত মাটির নিচে শুয়ে রাধাচূড়া গাছের শেকড় গুনছে। ভালো মানুষের মতো জীবনের শেষ জবানবন্দিও দিয়েছে। আপনারা
চাইলে ওখানেই তার খোঁজ নিতে পারেন।’
মনে মনে বলা তার কথা কেউ ক্ষুণাক্ষরেও টের পেল না। জানল না এই ছেলে ভয়ংকর একটা কাজ করে বসে আছে। যার খোঁজ চলছে তাকেই
ডেকে নিয়ে, একসাথে খাবার খেয়ে, যত্ন করে মেরে, তারই ভিটায় কবর খুঁজে তাকেই শুঁইয়ে দিয়েছে। মুখ দেখবে কেউ বলবে এর দ্বারা এ কাজ সম্ভব? কিন্তু সম্ভব! ঠান্ডা মাথার মানুষদের পক্ষে সব সম্ভব। কক্ষে কানা ঘুষা হচ্ছে দেখে সেও সবার মতো ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক তাকাল।
সিদ্দিককে খুঁজল। শুদ্ধ খুব করে টের পাচ্ছে তার দিকে চিলের মতো নজর রাখা হচ্ছে। মাপা হচ্ছে তার ভঙ্গিমা, সাধারণ কিংবা অস্বাভাবিক আচরণ। তাতে তার কি? পারলে প্রমাণসহ তাকে ধরে দেখাক। এরপর
শীতল কনককে কেন মেরেছে? কিভাবে মেরেছে? সেদিনের ঘটনাটুকু শীতলকে নিজের মুখে বলতে হলো। বিচারক তার মুখ থেকে সব শুনল।এটা নিয়েও দুই উকিলের মধ্যে যুক্তিতর্ক চলল। প্রমাণ পেশ করা হলো। একপর্যায়ে প্রমাণিত হলো শীতল আত্মরক্ষার্থে ভাইকে বাঁচাতে ঘটনাটা ঘটেছিল, খুন করার পরিকল্পনা ছিল না। পরিস্থিতি অনুযায়ী ঘটে গেছে।
কেস যখন এই অবধি এগোলো তখন সকলেই দোয়া করতে লাগল যেন শীতলের জামিন হয়ে যায়। বিচারক যেন সদয় হোন। এরমধ্যে বিপক্ষে উকিল শুদ্ধর ঘাড়ে বাল্যবিবাহের অভিযোগ ছুঁড়ে দিলেন। শুদ্ধও জানত
এই প্রসঙ্গ আসবে। রেডিও ছিল। এবারও পক্ষের উকিল চমৎকারভাবে
হ্যান্ডেল করে নিলেন। তবে শুদ্ধের পেশাদারিত্বের কথা ভেবে কিছু টাকা জরিমানা করা হলো। এই পর্যায়ে শুদ্ধ-শীতলের চোখাচোখি হলো। অন্য সময় হলে দুজনই হেসে গড়াগড়ি খেতো। বিয়ে হলো, বাসর হলো, বাচ্চা কনসিভ করার পর কী না জরিমানা!
একে একে অভিযোগ খন্ডনের পর সবাই চূড়ান্ত ঘোষনার অপেক্ষায়। কক্ষে তখন পিনপতন নীরবতা। বিচারক ঘসঘস করে কিছু লিখছেন।সকলে দুরুদুরু বুকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে। বিচারক লেখা শেষ করে চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে আড়চোখে একবার শীতলের দিকে তাকালেন। গলা খাঁকারি দিয়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। তারপর
হাতের কাগজে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে গম্ভীর গলায় পড়তে শুরু করলেন,
-‘ আদালত উভয় পক্ষের যুক্তি এবং উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ সূক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, আসামি শীতল তার সহোদর ভাইকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে গিয়েই এই অপ্রত্যাশিত ঘটনাটি ঘটিয়েছে, যা আইনের দৃষ্টিতে মূলত ‘ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার অধিকার’ হিসেবে গণ্য। তবে আত্মরক্ষার সপক্ষে পদক্ষেপ নিতে গিয়ে আসামি যে পরিমাণ বল প্রয়োগ এবং অস্ত্র ব্যবহার করেছে, তা দণ্ডবিধির নির্ধারিত আইন লঙ্ঘন করেছে বলে আদালত প্রতীয়মান করে।
অন্যদিকে, আসামির বিরুদ্ধে মাদক পাচারসহ চারিত্রিক অপবাদগুলো আনা হয়েছে তার স্বপক্ষে রাষ্ট্রপক্ষও অকাট্য প্রমাণ বা তথ্য উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে তার অভিযোগগুলো আদালতে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।
সেই সঙ্গে আদালত আসামির অল্প বয়স, ইতিপূর্বের পরিচ্ছন্ন জীবন এবং বর্তমানে শারীরিক ও মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থা অত্যন্ত সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করছে। সার্বিক পারিপার্শ্বিকতা ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে আদালত আসামি শীতলকে দণ্ডবিধির(…..) ধারায় এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং বাল্যবিবাহের মাধ্যমে আইন পরিপন্থী কাজ করায় আসামির স্বামীকে নগদ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো। জরিমানার অর্থ অনাদায়ে তাকে অতিরিক্ত আরও এক মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। তবে বিশেষ উল্লেখ্য যে, আসামি ইতিপূর্বে হাজতবাস বা সংশোধন কেন্দ্রে যতটুকু সময় অতিবাহিত করেছেন, তা তার মূল সাজার মেয়াদ থেকে আইনত কর্তন বা বাদ দেওয়া হবে।’
এই ছিল মামলার চূড়ান্ত রায়। বিচারক রায় ঘোষণা করে মূল কপিতে স্বাক্ষর করে স্থান ত্যাগ করলেন। উনার এই রায় যেন শুদ্ধর হৃদপিণ্ডে গিয়ে বিঁধল। চোখজোড়া বন্ধ করে ঠোঁট কামড়ে ধরে ধীরে ধীরে নিজের বাহুতে মুখ লুকাল সে। মুহূর্তে ভিজে উঠল তার সাদা শার্টের হাতার কিছু অংশ। কানে প্রতিধ্বনির মতো বাজতে থাকল ‘এক বছর!’ অর্থাৎ ৩৬৫ দিন! ৩৬৫ রাত! প্রতিটা সেকেন্ড, প্রতিটা মুহূর্ত তাকে এ বিচ্ছেদের বিষে
ছটফট করতে হবে। একা গুমরে মরতে হবে। যেখানে সে শীতলকে এক মুহূর্তের জন্য চোখের আড়াল করতে চায়নি, তার জন্য এক বছরের এই দূরত্ব কয়েক জনমের সমান দীর্ঘ হয়ে দাঁড়াল। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে শীতল একদৃষ্টিতে শুদ্ধর দিকেই তাকিয়ে ছিল। শুদ্ধর ভেঙে পড়ার এই দৃশ্যটুকু তাকে আরো বেশি করে দগ্ধ করে ফেলল। দুচোখ ছাপিয়ে নোনা জল গড়াতে লাগল। ভীষণ ইচ্ছে করল সকল নিয়ম ভেঙে ছুটে গিয়ে শুদ্ধর কান্নারত মুখটা দুই হাতে আগলে ধরে বলতে,
শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৮৭
_’এই পাগল কাঁদছ কেন, হুম? খবরদার! একটুও কষ্ট পাবে না। একদম কাঁদবে না বলছি। আমি আমার ‘বিশুদ্ধ পুরুষ’কে ভেঙে পড়তে দেখতে অভ্যস্ত নই! আমি সব সইয়ে নেব, সব সাজা হাসিমুখে মেনে নেব, তুমি শুধু ছায়াসঙ্গী হয়ে আমার সঙ্গে থেকো।’

এমন করো কেন আপু এতো দুঃখ মানা যাচ্ছে না আর
Akto taratari den plz
Apu porer prat taratari dio plz
Apu next part taratari deben
Comment: next
Next part
next part ar opakkhay roilam
mathar cul peke gelo tao next part pailam na.
Next part din please
Next part ta taratari din apuuu
Next part taratari den Apu Beshi late hole interest chole jay
Apu atho somoy lage apu aktu taratari next prat ta den plz
Eto late hole cholbe
এমন ভাবে গল্প দিলে তো কাহানী ভুলে যাই ২ ৩ দিন মানা যায় তাই বলে ৯ ১০ দিন 🙂🫶
Apnar name ki ?
আপু ৮৯পর্বটা দাও😔😔
এটা কিন্ত্তু ঠিক না এত দেরিলাগে আপু প্লিজ পরের পর্ব গুলু একটু তাড়াতাড়ি দিয়ে দেও প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ ☹️☹️
পরের পর্ব গুলো দাও না আপু।
Kigo apu porer part ta ki diben na
88 part 19/03/25
89 part 19/03/26
apo r koto late korbaaaaaa ?
Taratari next porbo dao please