Home শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯৭

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯৭

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯৭
নূরজাহান আক্তার আলো

শীতল যাওয়ার পর সবাই এখনো অশ্রুসিদ্ধ চোখে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। গাড়িতে বসা শীতলকে অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। মেয়েটা হাত নাড়িয়ে বিদায় জানাচ্ছে। যেন বলতে চাচ্ছে, ‘কষ্ট পেও না, আমি কালই বাড়ি ফিরব। তারপর তোমাদের জ্বালিয়ে পুড়িয়ে অতিষ্ঠ করে তুলবো।’
এই আশায় বুক বেঁধে সকলের চোখে-মুখে আনন্দ উপচে পড়ছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ফরিয়াদ কবুল হয়েছে! কত ত্যাগ, কত কষ্টের পর বাড়ির মেয়ে বাড়ি ফিরবে। বাড়িটা আবারও প্রাণ ফিরে পাবে। আবার সকলে ভালো থাকবে। এদিকে বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। একটুপরে মাগরিবের আজান দেবে। তবে আজানের আগে উনারা বেরিয়ে পড়লে শুদ্ধও কেন্দ্রের দিকে রওনা হবে। তাই সে সায়নকে তাড়া দিয়ে বলল,

_’ভাইয়া, বেরিয়ে পড়ো এবার।’
_’হ্যাঁ, চল।’
_’তোমরা যাও।’
_’তুই যাবিনা?’
_’আমি কেন্দ্রের দিকে যাব। একটু কাজ বাকি আছে।’
_’আমিও যাব, চল।’
_’ সবাইকে নিয়ে বাড়ি যাও। পায়ে টান পড়লে আর হাঁটতেও পারবেনা।’
_’বেশি বড় হয়ে গেছো, না? বড় ভাইকে শাষণ করছো? যেখানে যেখানে একা যেতে মন চাই? পাজোড়া বড় হয়ে গেছে বুঝি, নলা কাটতে হবে?’
_’খোঁড়া মানুষকে নিয়ে গেলে কাজ বাড়বে বৈ কমবে না। একটু হেঁটেই বাচ্চার মতো কাঁধে চড়তে চাও। শরীর তো না যেন জলহস্তি। এখন কথা বাড়িও না, এগোতে থাকো।’
শক্তপোক্ত দেহের সায়ন এ অপবাদ মানতে পারল না। সে মোটেও খোঁড়া না। জলহস্তিও না। তার ওজন তার বউ সহ্য করে। সে একদম সুস্থ। তবে হাঁটতে গেলে একটু খোঁড়ায় আর কি। তবুও তাকে খোঁড়া বলা যাবে না। বললেও সে মানবে না। সে প্রতিবাদী মানুষ। তাই প্রতিবাদী সুরে স্বর্ণকে বলল,

_’দেখলি বউ, তোর বেয়াদব ভাই আমাকে খোঁড়া বলল। কিছু বলবি না তুই? স্বামীর হয়ে প্রতিবাদ করবি না, জান?’
স্বর্ণ তখন ঐশ্বর্যের পাশে দাঁড়িয়ে কোর্ট প্রাঙ্গন দেখছিল। বেশ পরিপাটি জায়গাটা। মৃদু বাতাস গায়ে লাগছে। তার হাতে কমলার খোঁসা। পেটের মধ্যে গুলালে কমলার খোসা নাকের কাছে ধরছে। এতক্ষণ সায়নের সব কথা শুনেছে সে। তাই বলল,
_’ শুদ্ধ ভাই, এটা ঠিক করেনি। যদিও খোঁড়াকে খোঁড়া বললে পাপ হয় না। থাক, কষ্ট পেও না। বাড়ি যাওয়ার পথে ম্যাঙ্গোবার কিনে দেব।’

স্বর্ণ কথা শেষ করতেই রুবাব হো হো করে হেসে ফেলল। বাকিরাও ঠোঁট টিপে হাসছে। সায়ন অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইল বউয়ের দিকে। তার বউ একথা বলতে পারল? বুক কাঁপল না। ওহ, সে তো ভুলেই গিয়েছিল চৌধুরী বাড়িতে শুধু সে আর শীতল ছাড়া বাকিরা এক একটা হারামির প্রিন্সিপাল। হারামিপনা এদের রন্ধে রন্ধে। নেহাৎ তারা দুই ভাই-বোন খুব ভালো মনের মানুষ। মনে পাপ নেই তাই মিশেমিশে থাকে। নাহলে কবেই এদের ত্যাজ্য ভাই-বোন করে উগান্ডায় পাঠিয়ে দিতো। এর হিসাব পরে করা যাবে। আগে দল ভারি করতে হবে। তাই আপাতত কথা বাড়াল না। শারাফাত চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল,

_’চৌধুরী সাহেব তাহলে বউ-বাচ্চা নিয়ে এগোতে থাকেন। আমার বউ বাচ্চার দিকে একটু খেয়াল রাখবেন।’
একথা বলে শুদ্ধর দিকে তাকাল। কেন জানি শুদ্ধকে একা ছাড়তে মন সায় দেয় না। অদ্ভুত এক ভয় কাজ করে৷ ইচ্ছে করে ভাইকে ছায়ার মত আগলে রাখতে। কিন্তু এখন সে নিজে অসুস্থ। মাঝে মাঝে তাকে অন্যের সাহায্য নিতে হচ্ছে। তবে আর মাত্র কিছুদিন তারপর সে একাই হাঁটতে চলতে পারবে। কিন্তু এখন সঙ্গে যাওয়ার কথা বলায় শুদ্ধ আবার তাকে বারণ করল। সুন্দর করে বুঝিয়ে বলল অফিস টাইম পার হয়ে যাচ্ছে। এখন এতজনকে ঢুকতে দেবে না। দুজন এলাও করবে। অগত্যা গেলেও বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। কী দরকার, শুধু শুধু বাইরে দাঁড়িয়ে মশার কামড় খাওয়ার? এর চেয়ে বাড়ি গিয়ে আড্ডা দিক। কাজ সেরে জলদি ফিরবে সে। তাছাড়া ​সেখানে কাজ বলতে শুধু কাগজপত্র যাচাই করা। এইটুকু কাজ একাই সামলে নিতে পারবে। এমনিতে অন্য কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না; যদি হয়ও, সে অবশ্যই কলে জানাবে। শুদ্ধর যুক্তি শুনে কেউ আর কিছু বলতে পারলেন না৷ সায়নও বুঝে ভাইয়ের কথায় মেনে নিলো। কথায় কথা বাড়ে। বেলা গড়াচ্ছে। সময়ও নষ্ট হচ্ছে। তাই বাড়ির গাড়ি আসতেই উনারাও উঠে বসলেন। শুদ্ধকে সাবধানে ড্রাইভ করতে বলে উনারা বাড়ির পথে রওনা হলেন। আর শুদ্ধ উকিলের সঙ্গে আলাপ সেরে এগোলো কেন্দ্রের দিকে। ​এই সময় অফিস ছুটি হয়, রাস্তায় প্রচুর জ্যাম বাধে। বলতে না বলতেই তার গাড়ি জ্যামে আটকালো। সে সিটে হেলান দিয়ে চোখজোড়া বুজে রইল। ইদানীং শরীরের ওপর বড্ড ধকল যাচ্ছে। অল্পতে হাঁপিয়ে যাচ্ছে। আগে ভাবত আদালত বা কেস-কাচারি কী আর এমন জটিল জিনিস! টাকা ঢাললেই তো জামিন। সায়নকেও কতবার টাকা দিয়ে ছাড়িয়েছে।

কখনো কখনো পুলিশকে টাকা খাইয়ে কেস বেশিদূর বাড়তে দেয়নি। অবশ্য সেসব জনসমক্ষে ঘটা ঘটনা ছিল না, যার কারণ হয়তো সম্ভব হয়েছিল। ​কিন্তু শীতলের কেসটা একদমই আলাদা। এর মারপ্যাঁচ যে কতটা জটিল এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। বলা বাহুল্য, সে পেশায় বিজ্ঞানী। নিত্যনতুন আবিষ্কার করাই তার কাজ। কিন্তু কোর্ট-কাচারি, থানা-পুলিশ, আইনি জটিলতা তার পেশার সম্পূর্ণ বিপরীত। অথচ গত কয়েক মাস ধরে এসবের পেছনেই হন্যে হয়ে ছুটতে হচ্ছে। কত কী জানতে হচ্ছে, ভাবতে হচ্ছে, সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। আর তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে শীতলের অদূর ভবিষ্যৎ। বলা বাহুল্য, ​শতরূপা চৌধুরী না থাকলে তাকে হয়তো আরও হাবুডুবু খেতে হতো। কারণ শতরুপা চৌধুরী প্রতিটা পদক্ষেপে সাহায্য করেছেন। কিন্তু তিনি নিজে শীতলের কেস লড়েননি। তবে ভাইঝির জন্য নিজের চেয়েও চৌকস একজন আইনজীবী নিয়োগ করেছিলেন। আইনের বই ঘেঁটে নজির খুঁজে বের করেছেন। কারণ তিনি চেয়েছিলেন, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শীতল মাথা উঁচু করে বাড়ি ফিরুক। সগৌরবে কিছু মানুষকে দেখিয়ে দিক চৌধুরীদের আদর্শ আর শিক্ষা। যাতে বলতে না পারে, ফুপি আইনজীবী বলে পার পেয়ে গেছে। বা শতরূপা আইনের ফাঁক গলে ভাইঝিকে বাঁচিয়ে নিয়েছে। ​যদিও সমাজ কী বলবে এ কথা তোয়াক্কা করেন না তিনি। কেননা সমাজ নিয়ে পড়ে থাকলে সর্বপ্রথম উনি এই পেশায় আসতে পারতেন না। কারণ সমাজের মানুষ মেয়েদের শেকল পড়াতে ওস্তাদ। তাদের মতে, বিদ্যাপিঠ ছেলেদের জন্যই যথেষ্ট।

এবং সমাজ সমাজ করলে এই পেশাতে দীর্ঘদিন টিঁকতেও পারতেন না। বিধবা নারী হয়ে ছেলেকে একা হাতে মানুষ করতেও পারতেন না। আর শীতলের করা অপরাধের কথা? এসব নিয়ে ভাবার সময় হয়নি উনার। কলিগরা যখন জিজ্ঞাসাও করেন তখন হাসতে হাসতে বলেন, ‘ সুবহানা চৌধুরী আমার ভাইঝি। কোথাকার কোন পাতিনেতা তার বড় ভাইকে মারতে এসেছিল উল্টে সেই তাকে মেরে দিয়েছে। একদম বাপ-ভাইদের মতো বুকভরা সাহস নিয়ে জন্মেছে কী না!’ উনাকে এভাবে বলতে দেখে কেউ আর খোঁচা মারা সাহস করে না। করবেই বা কেন? চৌধুরী বাড়ির মেয়েরা ফেলনা নাকি? বরং চৌধুরী বাড়ির মেয়েরা বারবার প্রমাণ করে দিয়েছে, তারা বিপদে পড়লে পিছু হটতে পারেনা। পালানো তাদের রক্তে নেই, স্বভাবেও নেই। তারা যেমন বাবা-ভাইয়ের আদরের পুতুল, তেমনি প্রয়োজনে বাঘিনীর রুপে রুখতে জানে। কেউ কলিজায় থাবা বসাতে আসে উল্টো তার কলিজায় থাবা বসাতে জানে। এসব ভেবে শুদ্ধ মৃদু হাসল। সামনের গাড়ি এগোলে তার গাড়িটা এগোচ্ছে। এই জ্যাম ছুটতে কতক্ষণ লাগে কে জানে। তবে স্বস্তির কথা তার আগেই শতরূপা চৌধুরী আদালতের বাহককে নিয়ে কেন্দ্রে পৌঁছে গেছেন।

বাহককের মাধ্যমেই কাগজ জমা দিয়ে এখন তার অপেক্ষা করছেন। কথা হচ্ছে, আদালতের বাহক নিয়ে সেখানে কেন গেলেন? আসলে রায় ঘোষণার পর বন্দী মুক্তি পায় না। এর পেছনে থাকে আমলাতান্ত্রিক বেশ কিছু প্রক্রিয়া। এই যেমন জামিনের আদেশের পর আদালত সেকশন থেকে মূল আদেশনামা ও রিলিজ ওয়ারেন্ট তৈরি করতে হয়। তারপর বিচারকের সই নিয়ে সেটা বাহকের মাধ্যমে সরাসরি কেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়। জেল কর্তৃপক্ষ কাগজ যাচাই করে তবেই বন্দীকে মুক্তি দেয়। সেই নিয়মানুসারে শীতলের রায় হয়েছে, জামিনের আদেশ হয়েছে, তারপর সেই আদেশনামা ও রিলিজ ওয়ারেন্টে তৈরি করে বিচারকের সই করিয়ে পৌঁছেছেন কেন্দ্রে। আর এ কাজটুকু করা যেন ছিল যুদ্ধের সমান। পেশকার, বিচারক পরিচিত বলে কাজটা এত সহজ হয়েছে। নাহলে আজ আর হতো না। কারণ যখন রায় ঘোষণা হয়েছিল তখন বাজছিল তিনটা বিশ মিনিট। বিচারক কক্ষছেড়ে যাওয়ার সময় ঘড়ির কাঁটা ছিল ঠিক সাড়ে তিনটায়। সরকারি অফিসের সময় তখন শেষের দিকে। আর উনি জানতেন পরের কাজগুলো কখন কীভাবে সারতে হবে। এজন্য জামিন শুনে আদালত কক্ষে সবাই যখন কাঁদছিল।

তিনি সেদিকে না গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সেরে বাহককে নিয়ে রওনা দিয়েছেন। এবার আসা যাক আদলতের বিশেষ।বাহকের কথা। আসলে আদালতের বাহক ছাড়া সিলগালা খাম জেল কর্তৃপক্ষ অন্য কারও থেকে গ্রহণ করে না। এটাই নিয়ম। তাই ঘড়িতে পৌনে ছয়টা বাজার আগে শতরূপা চৌধুরী কেন্দ্রের ডেস্কে কাগজ বুঝিয়ে দিয়েছেন। আশা করা যাচ্ছে কাজও হয়ে যাবে। নতুবা কালকের দিনও মেয়েটাকে কেন্দ্রে থাকতে হবে। কালকে তো আবার নববর্ষ, সরকারী ছুটির দিন। যদিও জামিন পরোয়ানা পৌঁছায় তাহলে ছুটির দিনে বন্দীদের আটকে রাখার সুযোগ নেই। কিন্তু কাগজ যাচাইকরণ এখনো বাকি, সেটা যদি আজকে না হয়? কিংবা কোনো কারণে আঁটকে যায়? দেখা যাক, ভাগ্য সহায় হয় কি না। ঘন্টা খানিক পর শুদ্ধ পৌঁছাল। টেনশনে ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা। শ্বাস যেন গলায় এসে আটকে আছে। ​সে গাড়ি পার্ক করে কল করল ইফতেখার নাবিলকে। প্রবেশের অনুমতি দিলে দুজনে এগোলেন অফিসরুমের দিকে। সেখানে প্রবেশ করতেই এক মধ্যবয়সী অফিসার শুদ্ধর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন। তারপর শুদ্ধর কাঁধ চাপড়ে হাসতে হাসতে বললেন,

__” মিসেসের তো জামিন হয়ে গেছে। অপেক্ষার পালা শেষ। এবার খুশি তো সায়েন্টিস্ট সাহেব?”
​জবাবে কিছু বলল না শুদ্ধ কেবল মুচকি হাসল। যতক্ষণ না শীতলকে বুকে জাপটে ধরছে ততক্ষণ এই কষ্ট কমার নয়। কিন্তু একথা তো আর বলা যায় না! তাই মৃদু হেসে নীরবে সম্মতি জানাল সে। ​তবে ইফতেখার নাবিল অভিজ্ঞ চোখে সহজে পড়ে নিলেন তার চোখের ভাষা। কারণ গত কয়েকমাস ধরে শীতলের মুক্তির জন্য শুদ্ধর অক্লান্ত পরিশ্রম, আর শত চেষ্টার সাক্ষী তিনি নিজেও। ​বলা বাহুল্য, শীতল কেন্দ্রে আসার শুরুর দিকে বরুণ মিত্র নামের এক অফিসার শুদ্ধকে প্রচুর হয়রানি করেছিল।কখনো কখনো ইচ্ছে করে শীতলের সঙ্গে দেখা করতে দেন নি। অপেক্ষা করতে বলে ঘন্টার পর ঘন্টা বসিয়ে রেখে অনুমতি দেননি। বাড়ি থেকে খাবার আনলে চার ভাগের এক ভাগ শীতলকে দিতেন। তিনি সবচেয়ে
অমানবিক কাজটা করেছিল শীতলের বাবার মৃত্যুর দিন। বাবার লাশের পাশে শীতলকে আর একটু সময় রাখার প্রস্তাব রেখেছিল শুদ্ধ। শুদ্ধর কথায় তাচ্ছিল্য করে বলেছিলেন, ‘সময়ের মূল্য অনেক। বাড়তি সময় দেওয়া যাবে না। তবে কিনে নিলে আলাদা কথা ।’

তখন শুদ্ধর মানসিক অবস্থাও ভালো ছিল না। তাই পরিস্থিতি অনুযায়ী উনার অমানবিক প্রস্তাব মেনে নিয়েছিল। যদিও শুদ্ধ সেকথা ভোলেনি। বরং বুদ্ধি খাঁটিয়ে অর্থ লেনদেনের কল রেকর্ড ফোনে যত্ন করে সুরক্ষিত রেখেছিল। ভেবেছিল দিন যাক, সুসময় ফিরুক; তারপর নাহয় হিসাব চুকিয়ে নেবে। তাকে অবশ্য বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। বরুণ মিত্র অসুস্থতার কারণে ছুটিতে গেলে উনার জায়গায় ইফতেখার নাবিল দায়িত্ব নেন। যাতায়াতের মাধ্যমে শুদ্ধর সঙ্গে পরিচয় হয়। পরে অবশ্য জানা যায়, ইফতেখার নাবিল শতরূপা চৌধুরীর কলেজের সিনিয়র ভাই। চেনা মানুষ বিধায় সবকিছু জানার পর অনেক সুযোগ-সুবিধাও দিয়েছেন। এরপর থেকে শুদ্ধ যে খাবার পাঠাত শীতল পুরোটাই পেত। এমনকি যখনই দেখা করতে অনুমতি চেয়েছে নাবিল সাহেবও ফিরিয়ে দেননি। ​সম্ভব না হলে বুঝিয়ে বলেছে কারণ নিয়মের বাইরে তো যেতে পারে না।

এভাবে উনার সঙ্গে শুদ্ধর সম্পর্ক সহজ হলে কথায় কথায় শুদ্ধও বরুণ মিত্রের কর্মকাণ্ড উনার কানে দেয়। ইফতেখারও সেই তথ্যগুলো উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেন। তদন্ত শুরু হয়। তদন্তের সূত্রে জানা যায়, বরুণ মিত্র ‘চৌধুরী’ টাইটেলযুক্ত মানুষকে সহ্য করতে পারেন না। কারণ, কোনো এক চৌধুরী বাড়ির আদরের দুলালিকে পারিবারিকভাবে বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের পরেরদিন স্ত্রী বাপের বাড়ি গিয়ে ফিরেনি। তবে না ফেরার কারণ দেখিয়েছিলেন, বরুণ নাকি শারীরিকভাবে অক্ষম পুরুষ। যদিও এটা মিথ্যা কথা। কেননা বিয়ের রাতে সম্পর্ক সহজ করতে সময় দিয়েছিলেন। স্ত্রীর অসম্মতিতে তাকে স্পর্শও করেননি। কিন্তু সেই মেয়ে উনার পুরুষত্ব নিয়ে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে চলে যায়। শুধু তাই নয়, দুদিন পর মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে পালিয়ে যায়। সেই থেকে ‘চৌধুরী’ পদবীধারী মানুষ আর কাজিনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ককে প্রচুর ঘৃণা করেন। আর সেই আক্রোশের স্বীকার হতে হয় শীতল-শুদ্ধর মতো আরো অনেককে। এবং ঘুষ নেওয়ার অপরাধে উনার চাকরি চ্যুত হওয়ার সম্ভবনাও বেশি। যদিও এখনো ফাইনাল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে এমনকিছু হতেপারে।

পূর্বের কথা ভাবতে ভাবতে ​ইফতেখার ফাইলের কাগজপত্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করলেন। সব ঠিকঠাক দেখে সই করতে করতেই একবার শুদ্ধর দিকে তাকালেন। ছেলেটা একদৃষ্টিতে উনার কলম ধরা হাতের দিকেই তাকিয়ে আছে। এই একটা সই এর জন্য তার অপেক্ষা প্রহর বেড়েছে।
তাছাড়া আগামীকাল শুভ নববর্ষ। নতুন বছরের প্রথমদিন। নববর্ষের দিন প্রিয় মানুষটিকে ফিরে পাবে। সমস্ত গ্লান্তি ভুলে নতুন বছরের সঙ্গে তাদের পথচলা নতুন করে শুরু হবে। তারা যে কাল একহবে, একসঙ্গে বাড়ি ফিরবে, ছলছল চোখে হাসবে, এই খুশিটুকু তো লক্ষ কোটি টাকার বিনিময়েও কেনা সম্ভব না। বয়সের হিসেবে এ ছেলে-মেয়ে দুটো অনেক সাফার করেছে। এবার তারা মনখুলে হাসুক, একে অপরের শক্তি হয়ে বেঁচে থাকুক। মরলেই কি প্রেম অমর হয়? কে বলে? মরে গেলে তো সব শেষ। বরং বেঁচে থেকে লড়াই করে প্রেম জিতিয়ে রাখাতে পুরুষ প্রেমের আসল জয়! সুপুরুষরা হারতে নয় লড়াই করে জিতে নিতে জানে। সত্যি বলতে, শুদ্ধ -শীতলের জীবনে কাল সেরা নববর্ষ হবে হতে যাচ্ছে। তারা যতদিন বাঁচবে এই দিনটির কথা ভুলতে পারবে না। তাই নিজেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ছুটির দিনে শীতলকে মুক্তির জন্য ফাইলে সই করলেন। মাঝে মাঝে কিছু কাজ আত্মার শান্তি দেয়। তাছাড়া নিজে তো বিয়ে করেন নি, তাতে কি? না পাওয়ার দহনটুকু বেশ বোঝেন। অপেক্ষা কতটা বিষাদময় হাড়ে হাড়ে টের পান। এজন্যই বোধহয় এখনো অফিস কক্ষে শুদ্ধর অপেক্ষায় ছিলেন।

এদিকে শুদ্ধ বুকে উথাল-পাথাল ঝড় নিয়ে স্বাভাবিকভাবে বসে আছে। তারপর হাত মৃদুভাবে কাঁপছে। ভাগ্যিস উনারা খেয়াল করেনি নয়তো লজ্জায় পড়তে হতো। যাচাইয়ের কাজ শেষ। সইও হয়ে গেছে। এবার শুধু সকালের অপেক্ষা। আর বাঁধা নেই। কালকে সকালে অভিলাষীকে নিয়ে যেতে পারবে। তার মনের সুখ, তার ঘরের শত্রুকে আবারও ফিরে পাবে। কতদিন ঝগড়া করা হয়নি। চ্যালাকাঠ দিয়ে মারা হয়নি। কাল বাড়ি ফিরে একবার মারতে হবে। ব্যাঙাচিটা ভীষণ কষ্ট দিয়েছে তাকে। একে একে সব শোধ তুলতে হবে। এতক্ষণ নিশ্চুপ থাকলে এতক্ষণে তার ঠোঁটে হাসি ফুটল। বুকের ভারটা নেমে চেহারায় কিছু একটা ফুটে উঠল।
তা দেখে ইফতার বেশ শব্দ করে হাসলেন। একটু মজাও নিলেন।তারপর ইফতেখার নাবিলের সঙ্গে পুনরায় হ্যান্ডশেক করে বিদায় নিলো। পকেটে ফোন ভাইব্রেট হতেই আছে। এটা যে সায়নের কাজ না দেখেও সে বলে দিতে পারবে। তাকে আগে থামানো দরকার তাই দ্রুত স্থান ত্যাগ করল। শতরূপাও পা বাড়াতে যাবে তখন ইফতেখার হঠাৎ বলে উঠলেন,

__’জীবনকে আরেকটিবার সুযোগ দিলে হতো না, শতরুপা? আমার
চুলে পাক ধরলেও আমার ভালোবাসা কিন্তু এখনো জীবন্ত।’
শতরূপার পা জোড়া থেমে গেল। এই কারণেই এখানে আসেন না তিনি।
যখন থেকে শুনেছেন ইফতেখার এখানে পোষ্টিং তখন থেকে একপ্রকার এড়িয়ে চলেন। কারণ উনি কোনোভাবেই অতীত ঘাটতে চান না। কিন্তু এই লোক নাছোড়বান্দা। তাই এতদিন যেভাবে ইফতেখারকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়েছেন এবারও একইভাবে ফিরিয়ে দিতে বললেন,
__’দাদীমা হতে যাচ্ছি, মিষ্টি পাঠাব, খেয়ে দোয়া করবেন নাবিল ভাই।’
একথা শুনে ইফতেখার টেবিলে কলমের টোকা দিতে দিতে মৃদু হাসল। বরাবরই কথা ঘোরাতে ওস্তাদ এ মহিলা। কলেজ লাইফে থাকতে উনার ভালোবাসা বোঝেনি শেষ বয়সে এসেও কী সুন্দর করে ফিরিয়ে দিচ্ছে।
অথচ প্রিয় বন্ধুর বউ হয়ে যাবার পরও তাকে কখনো অভিশাপ দেন নি।

খারাপ চাননি। কিন্তু বিয়ের কয়েক বছর পর যখন বন্ধু ( শতরূপার বর) মারা গেল তখন নিজেকে ধরে রাখতে পারেন নি। পুনরায় মনের কথাও জানিয়েছিলেন। ছেলেসহ শতরূপার দায়িত্ব নিতেও চেয়েছিলেন। কিন্তু রাজি হয় নি। এরপর যৌবন গেল, বয়স বাড়ল, চুলে পাক ধরল অথচ উনার অপেক্ষা ফুরালো না। এই নারী একটু সদয় হলো না। করুণা করে হলেও গ্রহণ করল না। আজকে দিয়ে মোট একত্রিশ বার রিজেক্ট হলেন। তাতে কি? এখন রিজেক্ট হওয়ার মাঝে ভালোলাগা কাজ করে। কাজের সূত্রে চোখাচোখি হলেও বুকে শান্তি অনুভব হয়। থাকুক না উনার অপূর্ণ ভালোবাসা। ভালোবাসলেই পেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। শতরুপা
কথা শেষ করে দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গেলেন। আর উনার দিকে ইফতেখার নাবিল একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।
শুদ্ধ কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে খবরখানা সায়নকে মেসেজেই জানিয়ে দিলো। নয়তো পাগলটা অনবরত কল দিয়েই যাচ্ছে। তার মেসেজ দেখামাত্রই চৌধুরী নিবাসে আনন্দ উপচে পড়তে লাগল। কাল শীতল বাড়ি ফেরার
পর কে কী করবে পরিকল্পনা করে ফেলল। রাত বাড়ছে রাতের নিয়ম।

সায়ন, স্বর্ণ, ঐশ্বর্য, শারাফাত চৌধুরী আর সিরাতকে রাতে ওষুধ খেতে হয়। তাই ডিনার সেরে তারা যে যার রুমে চলে গেছে। শারাফাত চৌধুরী কল দিলে শুদ্ধ রিসিভ করল না। রাত বাড়ছে অথচ তার বাড়ি ফেরার নাম নাই। বড় হয়ে একেকজন লায়েক তৈরি হয়েছে। কিছু বলা যায় না, বললে জবাব ঠোঁটের আগায় প্রস্তুত থাকে। এভাবে একা একা কিছুক্ষণ বকলেন। সিতারা শুনে ঠোঁট টিপে হাসলেন। ঘড়ির কাঁটা যখন একেক ঘরে পৌঁছাতে এক মিনিট বাকি তখন শুদ্ধর গাড়িটা গেট দিয়ে ঢুকলো। শতরূপাকে পৌঁছে সে গিয়েছিল চুল দাড়ি সাইজ করতে। কয়েকমাসে নিজের দিকে তাকানোর সময় হয়নি। বউটা যেহেতু কাল ফিরছে এবার বনমানুষ থেকে মানুষ হওয়া জরুরি। নয়তো দেবদাস বলে খোঁচাতে মিস করবে না। আরেকটা কথা না বললেই নয়, সে চুল কেটে এলে শীতল বারবার ঘুরে ঘুরে তাকায়। চোখে চোখ পড়লে দৃষ্টি লুকায়। আর এই দৃশ্যটুকু খু্ব উপভোগ করে সে। মিটিমিটি হাসে। কিন্তু ব্যাঙাচিটা ধরতে পারে না। এসব ভাবতে ভাবতে গাড়ি পার্ক করে বাড়িতে ঢোকার আগে দারোয়ান তার চাচা সামনে দাঁড়াল। উনাকে দেখে শুদ্ধ হাসিমুখে বলল,

_’কিছু বলবেন চাচা?’
_’হ বাজান! এডা এক বিদেশি পোলা দিয়া গ্যাছে।’
একথা বলে একটা প্যাকেট এগিয়ে দিলেন। শুদ্ধ সেটা নিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
_’নাম বলেছে?’
_’না।’
_’ঠিক আছে।’
তারপর শুদ্ধ বাড়িতে প্রবেশ করল। ভেবেছিল সবাই ঘুমিয়ে গেছে কিন্তু রান্নাঘরে টুকটাক শব্দ শুনে উঁকি মারতেই দেখে সিতারা চৌধুরী বসে বসে নাড়ু বানাচ্ছেন। এত রাতে উনাকে নাড়ু বানাতে দেখে শুদ্ধ বিরক্ত হলো। মহিলা মানুষ আসলেই অদ্ভুত। রাত বাজে একটা এখন কেউ নাড়ু বানায়? এটা নাড়ু বানানোর সময়? সে এগিয়ে গিয়ে ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

_’এত রাতেও কাজ শেষ হচ্ছে না আম্মু? এসব সকালে করা যায় না?’
হঠাৎ ছেলের কথা শুনে সিতারা চোখ তুলে তাকালেন। শুদ্ধর মুখখানার সঙ্গে চুল কাটাও নজরে পড়ল। বেশ লাগছে তো। এতদিন তো পাগলের বেশে ঘুরতো। যাক সুবুদ্ধি হয়েছে দেখে উনার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। জবাব না দিয়ে মাকে হাসতে দেখে শুদ্ধ আবার বলল,
_’কি আশ্চর্য, হাসছো কেন? আমি হাসির কথা বলেছি? রাখো এসব, অনেক রাত হয়েছে ঘুমাতে যাও।’
_’আর একটু আছে শেষ করেই যাই। যা তুই, ফ্রেশ হয়ে আয়, খাবার বাড়ছি।’
_’আমি বেড়ে খেতে পারব। তুমি এখন এসব রাখো।’
একথা বলে শুদ্ধ মাকে টেনে তুলতে গেলে সিতারা হেসে শুদ্ধর বাহুতে
আস্তে করে একটা থাপ্পড় মারলেন। শুদ্ধ বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করল,
_’এগুলো এখনই করতে হবে? কাল করলে কি হবে?’
_’উহুম, আজই করতে হবে।’
_’মানে কি? স্পেশাল কারো জন্য নাকি?’
_’স্পেশাল তো অবশ্যই।’
_’কে সে?’
_’যার জন্য আপনি চুল কেটে হিরো সেজেছেন আমিও তার জন্য নাড়ু বানিয়ে রেডি রাখছি ।’
একথা বলে উনি শুদ্ধর মুখে একটা নাড়ু ঢুকিয়ে দিলেন। মায়ের কথার মানে বুঝে শুদ্ধ গলা খাঁকারি দিয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। চুল কেটে কি অপরাধ করলো নাকি? এখন দেখা যাচ্ছে মা-ও মজা নিচ্ছে। এদিকে
ছেলের মুখ দেখে সিতারা মিটিমিটি হাসতে পুনরায় বললেন,

_’নাড়ুতে মিষ্টি হয়েছে?’
_’হুম।’
_’কেমন মিষ্টি? আমার বউমার মতো নাকি?’
মায়ের কথা শুনে শুদ্ধর মুখখানা এবার দেখার মতো হলো। কিছু বলার মতো শব্দ খুঁজে পেল না। মুখটা কাচুমাচু করতে লাগল। একি মুসিবতে পড়ল সে? এদিকে এতদিন পর ছেলেকে নাস্তাবুদ করতে পেরে সিতারা হো হো করে ফেললেন। হাসতে হাসতে উনার চোখে পানিও এসে গেছে। মাকে হাসতে দেখে শুদ্ধ দাঁড়াল না বিড়বিড় করে রান্নাঘর থেকে বের হতেই সায়নের মুখোমুখি হলো। সায়ন তার আপাদমস্তক দেখে ফিচেল হেসে ভ্রুজোড়া নাচাল। তারপর ফিসফিস করে বলল,

_” বলতো ভাই, আম্মু তোকে ওই কথা কেন জিজ্ঞাসা করল ?’
_’জানিনা।’
_’আমি জানি।”
_’তাহলে তুমিই বলো?”
_”কারণ দুটোই তুই খাস..!”
_’তুমি কি মানুষ হবা না?”
_’আমি তো মানুষই।”
_”সরো, যেতো দাও।”
_’ তা হিরো সাজার জন্য এতো রাত হলো বুঝি?”
_’ভিড় ছিল খুব।”
_’রাতেও? বেশ বেশ। তা বলছিলাম যে তোর মতিগতি ঠিক লাগছেনা ভাই।”
_’কিসের মতিগতি?”
_’ভেতর ভেতর বাসরের প্রস্তুতি চলমান বুঝি ?”
সায়নের কথা শেষ করতে দিলো না শুদ্ধ। সেও সায়নের মতো ফিসফিস করে বলল,
_”তুমি কি থামবে? নাকি ওই কথা সবাইকে জানাব?”
_” কোন কথাটা?”
_’কিসব দেখতে গিয়ে আমার কাছে ধরা খেয়েছিলে না? ওই যে..ওই কথাটা।”

ভাইয়ের মুখে সেই পুরনো কথা শুনে সায়ন জিহবায় কামড় কেটে তওবা করল, আশেপাশে তাকাল। ছিঃ! ছিঃ! একথা কেউ শুনলে মান-সম্মান থাকবে না। যদিও বয়ঃসন্ধিকালের ঘটনা। ধরা খেয়ে আর ওসবের ধাঁরে কাছে যাইনি। আর এখন তো তার উত্তেজনা এমনিতে হাই ওসবের আর দরকার পড়ে না। এইটুকু কনট্রোল করতে বউটার দম বেরিয়ে যায়।কিন্তু তাকে থামাতে শুদ্ধ প্রায়ই এসব বোমই ব্যবহার করে। বড্ড বেয়াদব এই ছেলেটা। মানবতা বলে কিছু নাই। নয়তো বড় ভাইকে কেউ এসব হুমকি দেয়? ছিঃ!
এদিকে ভাইকে চুপ করাতে পেরে শুদ্ধ হাসতে হাসতে রুমের দিকে গেল। রুমে ঢুকে প্যাকেট রেখে আগে শাওয়ার নিলো। ভেজা চুল মুছতে মুছতে ড্রেসিংটেবিলের দিকে তাকাল। শাওয়ার নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালে বিশেষ একটি মুহূর্তের কথা মনে পড়ে যায়। আজও পড়ল। তাই কানের ঠিক দুই ইঞ্চি নিচে আঙুল ছোঁয়াতে ঠোঁটে হাসি ফুটল। নতুন নতুন প্রেমে পড়ার অনুভূতি হচ্ছে কেন হঠাৎ? কেন জানি হাসতে ইচ্ছে করছে। মনও ফুরফুরে লাগছে। সে সময় দেখে নিল। রাত একটা পঁয়তাল্লিশ মিনিট।

সকাল হতে আর কতক্ষণ? রাতটাকে ঠেলে পার করাতে পারলে বেশ হতো। কিন্তু সেটা তো সম্ভব নয়। এতদিন ধৈর্য ধরেছে তার ফল পেতে যাচ্ছে। বেশি লোভ করা যাবেনা, এক বছরের অপেক্ষা মওকুফ হয়েছে তাতেই লক্ষ কোটি শুকরিয়া। তারপর সে খেয়ে এসে বসতে প্যাকেটটার দিকে নজর পড়ল। কে দিলো এটা? বিদেশি ছেলে কে হতে পারে? জানা দরকার। সে লেপটপ অন করে মূল ফটকের সামনে থাকা গোপন সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বের করল। বিকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি কি কি হয়েছে জানতে তাকিয়ে রইল লেপটেপের দিকে..
তখন বেলা গড়িয়ে শেষ চৈত্রের ক্লান্ত সূর্য বিদায় নিতে প্রস্তুতি নিয়েছে। ধরণীতে নেমেছে রাতের আঁধার। দলবদ্ধভাবে পাখিরা ফিরছে আপন নীড়ে। একটুপরেই মাগরিবের আজান পড়ল। আজানের ধ্বনি কানে যেতেই মুসল্লিরা ছুটল মসজিদের দিকে। মাঠে, অলিগলিতে দাঁড়ানো পথচারীদের ভিড় কমে এলো। অন্ধকার গাঢ় হচ্ছে। ধরণী তলিয়ে যাচ্ছে
রাতের আঁধারে। গাড়িতে বসা ক্যাসপিয়ান এ সময়ের অপেক্ষায় ছিল। রাস্তা ফাঁকা দেখে গাড়ি থেকে নেমে চৌধুরীদের গেটের কাছে দাঁড়াল। মৃদুস্বরে দারোয়ানকে ডাকল। ডাক শুনে দারোয়ান চাচা কাঁধ উঁচিয়ে তাকালেন গেটের বাইরে দাঁড়ানো বিদেশি এক ছেলেটার দিকে। বললেন,

_”কে আপনে, কারে চান?”
_ “বাড়িতে কেউ আছে, আঙ্কেল? ডেকে দেওয়া যাবে?”
_”না। বাইত কেহ নাই। আইতে আরো রাইত হইব!”
_”ওহ, অন্যকেউ নেই? যে কাউকে ডাকলেই হবে। একটা জিনিস দিয়েই চলে যাব।”
— “সবাই শীতল আপার কাছে গ্যাছে। আপনে কারে কী দিতে চান আমারে দিয়া যান, আমি দিয়া দিমু নে।”
একথা শুনে পিয়ান জবাব দিলো না বরং আশেপাশে তাকাল। তারপর আমতা আমতা করে বলল,
—”ইয়ে মানে আঙ্কেল আমাকে চৌধুরীদের বাগানে নিয়ে যাবেন? আমি বাগান দেখেই চলে আসব।”
দারোয়ান চাচা এবার সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালেন। যেন উনি পুলিশ আর পিয়ান পাড়ার ছিঁচকে চোর। উনার চাহনি দেখে পিয়ান পুনরায় বলল,
—”ভয় পাবেন না আঙ্কেল ,আমি চোর-ডাকাত নই! আমাকে কি চোরের মতো দেখতে, আপনিই বলুন?”
_”জ্বে!”
_”কিহ্! চোররা এত ভালো শার্ট-প্যান্ট পরে?”
_” পরে না। তয় আপনেও তো হাঁটু ছিঁড়া প্যান পিনছেন।”

দারোয়ান চাচার জবাব শুনে পিয়ানের মুখ অপমানে থমথমে হয়ে গেল। মাফিয়া কিং এর সহকারী ছিল সে। বডি ফিটনেস, উঁচা-লম্বা , শারীরিক গঠন সবদিক থেকে পারফেক্ট। অথচ টাকওয়ালা দারোয়ান তাকে চোর ভাবছে? এবার শরীরখানা জ্বলে উঠল তার। ইচ্ছে করল কোমরে গোঁজা পিস্তল কপালে ঠেকিয়ে টাটকা একখানা বুলেট জায়গা মতো গেঁথে দিতে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে রাগলে হবে না তাই নিজেকে শান্ত করল। বলল,
_” তেমন কিছু না আঙ্কেল। আপনি আপনাকে ভুল বুঝবেন না। আসলে শীতলের কাছে শুনেছিলাম ওদের বাড়ির বাগানটা নাকি ভীষণ সুন্দর। বাগানের দিকে তাকালে মন জুড়িয়ে যায়। আমি আজই দেশের বাইরে চলে যাচ্ছি। আর কখনো হয়তো এই দেশে ফেরা হবে না। তাই ভাবলাম এত দূর যখন এসেছি একবার দেখে যাই। আমি তো একা যেতে চাচ্ছিনা আপনার সঙ্গে গিয়ে একবার দেখে চলে আসব।”

_”শুদ্ধ বাবা আপনেরে চিনে?”
_” চিনে।”
_”ফুন দিয়া জিগামু? ”
_”জিগান, সমস্যা নাই।”
একথা শুনে ​দারোয়ান সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালেও শক্ত কণ্ঠে আর কিছু বলতে পারলেন না। শুদ্ধকে ফোন দেওয়ার কথা বললে ঘাবড়ালো না।
তাছাড়া শুদ্ধকে কল করা ঠিক হবে না। কারণ ওদিকে শীতলের জামিন হলো কী না। কিংবা অন্যকাজে ব্যস্ত আছে কি না। এসব ভেবে শুদ্ধকে কল দেননি উনি। তবে চোখ-কান খোলা রেখে পিয়ানকে বাগানে নিয়ে গেলেন। মস্ত বড় বাগান। আগে বাগান ফুলে ফুলে ভরা থাকলেও এখন তেমন একটা ফুল নেই। পিয়ান ফুল থেকে চোখ সরিয়ে নিলো। সে ফুল দেখতে আসেনি, এসেছে ইয়াসিরের কবরখানা খুঁজতে। পুরো বাগানে কয়েকবার চোখ বুলালেও কবর খুঁজে পেল না। কেন জানি গলা ফাটিয়ে ডাকতে ইচ্ছে করল কিন্তু ডাকলেও তো সাড়া পাবে না। অগত্যা না পেয়ে মনে মনে আওড়ালো,‘’আমি চলে যাচ্ছি স্যার। আপনার এদেশ, দেশের মাটিতে আর কখনো আসব না। বড্ড সেলফিশ এ দেশ। আপনার শেষ চিহ্নটুকু আপনার প্রিয় কারো কাছে পৌঁছে দিতে এসেছি। জানিনা কেউ গ্রহণ করবেন কি না। আপনার জিনিসের আদৌ ঠাঁই হবে কি না। আমি এটা সঙ্গে নেওয়ার রিক্স নিলাম না, স্যার। এরচেয়ে শত্রুর নিকটে রেখে গেলাম। ভালো থাকবেন স্যার। আজ আসি তাহলে, চিরবিদায়!”

এইটুকু আওড়াতে তার চোখ ছলছল করে উঠল। আরেকবার বাগানের দিকে তাকাল। শুদ্ধ সবার দৃষ্টির আড়ালে কবরখানা রেখেছে তা বুঝতে বাকি রইল না। তা অবশ্য ভালোই হয়েছে। আফসোসে পোড়া মানুষটি থাকুক না শত্রুর বাচ্চার পাশে। বাচ্চারা নিষ্পাপ হয়। পবিত্র আত্মা হয়। আর সেটা যদি প্রাণের চেয়ে প্রিয় কারো বাচ্চা তাহলে তো কথায় নেই। মূলত শারাফাত চৌধুরীর কাছেই শুনেছিল ইয়াসিরকে বাগানে দাফন করা হয়েছে। তাই আজ বাড়িতে কেউ নেই জেনে শেষবার দেখতে ছুটে এসেছে। কিন্তু হলো না তাই হাতের প্যাকেটটি দারোয়ানকে দিয়ে বিদায় নিল। কিছুদূর গিয়ে পুনরায় ফিরে এসে বলল এটা যেন শুদ্ধর হাতেই দেওয়া হয়। পিয়ানের শেষকথা শুনে দারোয়ান চাচার কৌতুহল বাড়াল।

উনি প্যাকেটটা উল্টেপাল্টে দেখলেন। বেশ ভারী প্যাকেট। সুতো দিয়ে আলতো করে বাঁধা। কৌতুহল সামলাতে না পেরে সুতোর বাঁধন আলগা করলেন উনি। ভেতরে কাগজ দিয়ে মোড়ানো কিছু একটা রয়েছে। সেটা সরাতেই নজরে পড়ল কালো রঙের ডায়েরি। উপরের কভার মখমলের কাপড় দিয়ে মোড়ানো। উনি ডায়েরিটা ডান-বাম, উপর-নিচ, চিৎ-কাত করে দেখলেন। খেয়াল করলেন ডায়েরির কোণাগুলো অ্যান্টিক ব্রোঞ্জ দিয়ে বাঁধানো। উনি আরেকদফা অবাক হলেন ডায়েরির ঠিক মাঝখানে তাকিয়ে। কারণ মাঝখানে বসানো গোলাকৃতির গাঢ় নীল রঙের ওপাল পাথর। যেটা নড়াচড়া করলে ভিন্ন রং পরিবর্তন হচ্ছে। এবং বিষ্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে এ পাথরের চারপাশে রোমান সংখ্যা খোদাই করা। দেখতে কিছুটা ঘড়ির ডায়ালের মতো। একটা ডায়েরিতে এতকিছু দেখে বিষ্ময়ে কথা বলা ভুলে গেলেন তিনি। বুঝতে বাকি রইল না বিশেষ কারো কিছু হবে এটা। আর সুন্দরের প্রতি মানুষেন কৌতুহল বরাবরই একটু বেশিই। উনিও ব্যত্তিক্রম নন। তাই ডায়েরি খোলার জন্য টানাটানি শুরু করলেন।কিন্তু খুলল না। এমন ভাবে আটকে আছে যেন কেউ আঠা দিয়ে আটকে রেখেছে। শক্তি খাটিয়েও খুলতে না পেরে বিরক্তই হলেন। ​নীল পাথরটা বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে চেপে ধরলেন। পুশ-বাটন স্প্রিং লক ভেবে একই কাজ করলেন। কিন্তু সেটা না ডেবে আঙুলের ছোঁয়ায় পাথরটি ডানে-বামে ঘুরে গেল। এটা খোলে কিভাবে? চাবি লাগে? তাহলে চাবিটা কোথায়?

আরো কিছুক্ষণ ডায়েরিটা নিয়ে গবেষণা করে খুললো না দেখে রেখে দিলেন। শুদ্ধ কফির মগে চুমুক দিতে দিতে ফুটেজ দেখে ডায়েরিখানা বের করল। ডায়েরির নিচে ছোট্ট করে লেখা ‘ক্রিমিনাল।’ সন্ধ্যার দিকে তার ফোনে একটা কোড এসেছে। কিসের কোড তখন না বুঝলেও এখন বুঝতে বাকি রইল না। যে নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছিল সেই নাম্বারের লাস্ট ডিজিট ছিল 79. স্যান্ডির নাম্বারের শেষ ডিজিট 79. তাই স্যান্ডিই ভেবেছিল। পরে অবশ্য কল ব্যাক করে নাম্বার বন্ধ পেয়েছিল। তখন না বুঝলেও এতক্ষণে বুঝলো এটা কিসের কোড হতে পারে। সে মেসেজের কোডে আরেকবার চোখ বুলিয়ে পাথর ঘুরিয়ে রোমান সংখ্যা অনুযায়ী কোড বসাতে এ্যাচ করে ডায়েরি খুলে গেল। মজার ব্যাপার হচ্ছে লেখা গুলো উল্টো করে লেখা। ইয়াসির সম্ভবত বাঁহাতি ছিল। সে বোধহয় বাম হাতে লিখত, এর আগে পিস্তল বাম হাতে ধরতে দেখেছে সে। কিন্তু লেখা উল্টো কেন? উল্টো হলে পড়বে কিভাবে? সে ডায়েরি খানা নাড়াচাড়া করতে করতে হঠাৎ কিছু একটা ভেবে হেসে ফেলল। মাফিয়া কিং এর ঘটে বুদ্ধি ছিল তাহলে? লিওনার্দো দা ভিঞ্চিকে ফলো করে কি এভাবে ডায়েরি লিখেছে? যাতে সাধারণ মানুষ পড়তে না পারে? দারুণ তো! লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ব্যাপারে না জানলে তো বুঝতেই পারত না। তবে উনি ছিলেন বিজ্ঞানী।

উনি নিজের নোটবুক, ডায়েরি চুরি হওয়ার ভয়ে এভাবেই লিখতেন। আর এ লেখা পড়ার নিয়ম আছে। শুদ্ধ এবার উঠে ডায়েরির পৃষ্ঠা আয়নায় ধরতেই লেখা সোজা হয়ে পড়ার উপযুক্ত হলো। ইংলিশে লেখা পুরো ডায়েরি। তবে শুদ্ধ শুরুর দিকের পৃষ্ঠার একটা শব্দ ও পড়ল না। ইচ্ছেই হলো না। কারণ যারা ডায়েরি লিখে তাদের কাছে ডায়েরি জিনিস হচ্ছে আবেগের জিনিস। তারা ডায়েরির শুরুটা লিখে তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত বা প্রিয় কাউকে নিয়ে। আর সে নিশ্চিত এখানে শীতলকে নিয়ে অহরহ বাক্য সাজানো আছে৷ভালোবাসা নিয়ে মাখামাখি করা গুটিগুটি স্বপ্ন সাজানো আছে। কিন্তু,, কিন্তু নিজের বউকে জড়িয়ে অন্য পুরুষের আবেগী গল্প রসিয়ে রসিয়ে পড়ার মতো ভালো মানুষ তো সে না। তাই শুরুর দিকে কোনো পৃষ্ঠা না পড়ে একদম শেষ পৃষ্ঠাখানা উল্টালো। কারণ ডায়েরির শেষে লেখা থাকে ডায়েরি দাতার জীবনের শেষ মুহূর্তের কথা। তার ভাবনায় সত্যি হলো। সে শেষ পৃষ্ঠা আয়নার সামনে ধরতে ইংলিশে একটি লেখা ভেসে উঠল। লেখার সময় কেঁদেছিল নাকি, ইয়াসির খান? কালিগুলো এমন ছড়িয়ে গেছে কেন? লেখাটা ছিল,

__”নাউ, আই এম টোটালি ব্রোক।”
এই লেখার নিচে শেষবার শীতলের সঙ্গে দেখা করার তারিখটা লেখা। শুদ্ধ সেটা দেখে বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বিড়বিড় করে আওড়ালো,
_’কংগ্রাচুলেশনস, ইয়াসির খান!”
এরপর রুমসংলগ্ন ল্যাবের একটি ড্রয়ারে আপাতত সেটা রেখে দিলো।
এটা এখানে রাখার সময় খুবই সীমিত। শীতল বাড়িতে পা রাখার আগে এটাকে নিবাস থেকে সরিয়ে ফেলবে। শত্রু সবসময শত্রুই হয়। শত্রু হয়ে শত্রুর জিনিস বয়ে বেড়ানো শত্রুতার নিয়মে পড়ে না।
ঘড়ির কাঁটা তখন তিনের ঘরে স্থির। শুদ্ধ বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলো।
কিন্তু চোখে একফোঁটা ঘুম নেই। এদিক-ওদিক করে কিছুক্ষণ পর বিরক্ত হয়ে উঠে বসল। রুমের ভেতর পায়চারি করে দাঁড়াল বেলকনিতে। চোখ তুলে তাকাল আকাশের দিকে। শীতলের সঙ্গে দেখা করতে যেতো তখন সময় যেন রীতিমতো দৌড়াতো। অথচ আজকে একেকটা সেকেন্ড যেন
বছরের সমান। কখন ফরজের আজান দিবে? কখন ভোর হবে? আর কখনো সে যাবে শীতলকে আনতে? এসব ভেবে তার ​অস্থিরতা সীমানা ছাড়াল। রুমে ফিরে ড্রয়ার খুলতেই নজরে পড়ল হানিমুন প্যাকেজের জন্য কাটা এয়ার টিকিটের দিকে। শীতলের ভীষণ ইচ্ছে নরওয়ে যাবে। নরওয়ের খোলা আকাশের নিচে তার হাত ধরে হাঁটবে। সেও যেখানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল কিন্তু তার আগে সব লন্ডভন্ড হয়ে গেল। শীতলকে নিয়ে সে কখনো দূরে কোথাও যায়নি। শীতল জানে না, তার বিশুদ্ধ পুরুষ বাড়িতে এক বাইরে আরেক। সে জানে না, বিশুদ্ধ পুরুষ ভ্রমনপিপাসু। সে জানেনা, তাকে বুকের সঙ্গে বেঁধে স্কাই ড্রাইভিং করার ভীষণ শখ তার বিশুদ্ধ পুরুষের। এমন আরো অনেক ইচ্ছে শীতলকে নিয়ে মিটাবে ভেবে তার অনেক ইচ্ছে অপূর্ণই রয়ে গেছে। সে ফিরুক।

কিছুদিন পর তাকে নিয়ে এবার অজানা উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়বে। নতুন করে ব্যাঙাচিকে তার আরেক রুপের সঙ্গে পরিচয় করাবে।এসব ভাবতে ভাবতে তার নজর পড়ল ছোট্ট একজোড়া নুপূরের দিকে। সেটা দেখে সে মলিন হেসে ড্রয়ার লক করে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলো। উপুর হয়ে শুয়ে ল্যাপটপ অন করল। একটা ফাইলে ঢুকতে স্ক্রিনে ভেসে উঠল শীতলের পুরনো অনেক ছবি, তাদের বিয়ের মুহূর্তগুলোও। এসব দেখে ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। একে একে সব ছবিগুলো দেখতে দেখতে কখন চোখজোড়া দুটো বুজে এলো টেরও পেল না। ঘুমানোর আধাঘন্টা হয় নি ​হঠাৎ অদ্ভুত অনুভূতিটা হলো তার। খুব নরম, তুলতুলে ছোট্ট একটি আঙুল তার ডান হাতের কনিষ্ঠ আঙুলখানা আঁকড়ে ধরল।
স্পর্শটা এতটাই জীবন্ত মনে হলো সেও আঁকড়ে ধরল। ঠিক তখন কেউ
কান্নারত কণ্ঠে অভিমানী কণ্ঠে বলল, ‘আমাকে আসতে কেন দিলে না না, বাবা?’

এইটুকু শুনেই চমকে উঠে বসল শুদ্ধ। বুকটা ধড়ফড় করছে। গা ঘেমে একাকার। শূন্য ঘর। কেউ নেই। সে মাথার চুল খামছে ধরল। মানুষ যা নিয়ে অতিরিক্ত বেশি চিন্তা করে, ভাবে, সেটাই স্বপ্নে দেখে। কিন্তু অবুজ মন তো মানেনা। সে ​ভেতরে জমা হাহাকার চেপে রাখতে না পেরে রুম থেকে বেরিয়ে এলো। কোনোদিকে না তাকিয়ে উদ্ভাটের মতো এসে দাঁড়াল বাগানের সেই ছোট্ট কবরটার পাশে। এখন মধ্যরাত। ​চারপাশ
স্তব্ধ। এদিন অদৃশ্য ব্যথাখানা লুকিয়ে রাখলেও আজ আর পারলো না। কানে একনাগাড়ে ভাসতে থাকলে অভিমানে সুরে বলা অভিযোগখানা, ‘আমাকে আসতে কেন দিলে না, বাবা।” বুকের গহীনে রাখা ঠিক একই অপরাধবোধে পুড়তে লাগল সে। পোড়ার অনুভূতি রুপ নিলো কান্নায়। হাঁটু গেঁড়ে কবরের ভেজা মাটির ওপর বসে পড়ল শুদ্ধ। চোখের কোণ বেয়ে ঝরতে থাকল নোনাজলের ধারা। ​সে কয়েক সপ্তাহের ভ্রূণ ছিল মাত্র! দুনিয়ার আলো-বাতাস ছোঁয়ানি। তবুও তার মনে এতখানি মায়া কীভাবে জড়িয়ে দিয়ে গেল? কেন হাজার চেষ্টা করেও তার কথা ভোলে না? কেন সেসব মনে পড়ে কষ্ট বাড়ে? আজ ঘুমের ঘোরে তবে কি সে এসেছিল? ফোঁপানো স্বরে অভিযোগ জানিয়ে গেল? তার আদেশেই তো এবরশন হয়েছিল। একথা ভেবে ​বুকের ভেতরের আর্তনাদ দলা পাকিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইল। শুদ্ধ কবরের মাটি দুহাতে খামচে ধরল। এরপর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। যে সন্তানকে কোনোদিন কোলে নেওয়া হলো না, তার জন্য এত মায়া কেন! কেন এত কষ্ট? সে মাটি আঁকড়ে আওড়ালো,

-‘সেদিন যদি তোমাদের দুজনের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে না হতো, তাহলে আমি নিজের জীবন দিয়ে হলেও তোমাকে আগলে রাখতাম! অনেকেই বলেছিল ‘তোমার মাকে বাঁচিয়ে ভালো করেছি, স্ত্রী থাকলে আবার বাবা হওয়া যাবে।’ কিন্তু তাঁরা এটা বোঝনি যে, তোমার মায়ের নিঃশ্বাস সচল রাখতে গিয়ে আমি তোমার ছোট্ট বুকের স্পন্দন স্তব্ধ করে দিয়েছি! সবাই বুঝ দেয় তোমার জন্য কষ্ট না পেতে। তুমি তো ভ্রূণ ছিলে মাত্র! তোমার রূপ ছিল না। নাম ছিল না। তুমি ছেলে নাকি মেয়ে তা-ও জানি না। অথচ তোমার অস্তিত্বের কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমি পরিচয় দিয়ে দিয়েছিলাম যে, ‘তুমি আমার সন্তান! আমার রক্ত!’ ​কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে তোমাকে হারিয়ে ফেললাম; হারানোর আদেশটাও আমাকেই দিতে হয়েছিল। তোমার যখন হাতে পেয়েছিলাম বুকে পাথর তুলে মাটির নিচে শুঁইয়ে দিয়েছিলাম। তবে আমি তোমাকে ভুলিনি, ভুলতেও পারব না। কেন জানো? কারণ তুমি আমাদের প্রথম সন্তান! যাকে আমরা বুকে জড়িয়ে নিতে পারিনি। যার ডাক শুনে কলিজা জুড়াতে পারিনি। আমি সরি, বাবা। খুব সরি। আমি খারাপ বাবা… ভীষণ খারাপ। যে নিজের ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখতে সন্তানকে উৎসর্গ করেছে।’

এভাবে বেশ কিছুক্ষণ সেখানে বসে কাঁদল শুদ্ধ। আজকে শীতল ফিরে আসবে। তার সামনে এভাবে কাঁদতে পারবেনা। বুঝতে দেওয়া যাবেনা বুকে জমানো কষ্টটুকু। অতঃপর কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। সে রুমে যেতেই সায়নও রুমে ফিরে এলো। তার চোখ দুটোও লাল হয়ে আছে। শুদ্ধ যখন বের হচ্ছিল তখন রান্নাঘরে ছিল। ভাইকে যেতে দেখে সেও গিয়েছিল। অদূরে দাঁড়িয়ে দেখল শক্ত আবরণে ঢাকা শুদ্ধর বুকে জমা হাহাকার। পিলার ধরে নিজে কিছুক্ষণ কাঁদল। শুদ্ধ চলে আসবে তখন তার আগেই রুমে ঢুকে গেল। কিছু কিছু জিনিস একা সামলাতে দিতে হয়। সায়ন রুমে ফিরে মাথা নিচু করে চুপ করে বসে রইল। চোখের পানি বাঁধ মানছে না। স্বর্ণের কাছে গিয়ে ওর পেটে চুমু খেয়ে শুতেই স্বর্ণ তার বুকে মাথা রাখল। ফিসফিস করে বলল,
_”আজ প্রথমবার দেখলে তাই কষ্ট পাচ্ছো। আমি প্রায়ই দেখি শুদ্ধ ভাই মাঝরাতে বাগানে গিয়ে বসে থাকে।”
_”সব আমার জন্য। আমি আমার ভাই-বোনদের ঋণ কিভাবে শোধ করব, জান? ওদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আমি যে ওদের চোখের পানি দেখতে পারিনা। আমার যে বুক ভেঙে আসে। আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে।’

_” এসবে তোমার হাত নেই। নিজেকে অপরাধী ভেবো না৷ দেখি আমার
কাছে এসো, মাথা হাত বুলিয়ে দিচ্ছি, ঘুমাও।”
সায়ন কিছু বলতে গেলে স্বর্ণ তার কপালে চুমু এঁকে না বোধক মাথা নাড়াল। তারপর মাথায় বুলালে সায়ন একটা সময় ঘুমিয়ে গেল। স্বর্ণ খোলা জানালার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর মনে মনে বলল,

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯৬

_”তুমি কল্পনা করতে পারবে না তোমার শীতল, তোমার শুদ্ধ, তোমাকে ঠিক কতটা ভালোবাসে। তোমার জন্য তারা কতদূর অবধি যেতে পারে।
চৌধুরীর রক্ত না হয়ে তাদের কতটা জুড়ে আছো, সেটা তোমার ধারণার বাইরে। আর যারা আমার ভালোবাসার মানুষের জন্য এত কিছু করতে পারে, সুযোগ পেলে তাদের জন্য আমার জান কোরবান করতেও দুবার ভাবব না।’
মনে মনে এসব ভাবতে ভাবতে তার চোখ দিয়েও দু’ফোঁটা পানি ঝরে গেল।

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ পর্ব

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here