শেহেজাদার আদর পর্ব ৩
সুমাইয়া ইসলাম নূর
বাস্তো দিন পার করে চৌধুরী বাড়ির তিন কোর্তা বাড়ি ফিরল তিনটি দামি গাড়ি নিয়ে।
বাড়িতে প্রবেশ করলে দেখা গেল, বাড়ির ছোট দুই মেয়ে—আয়াত আর আতিকা—খেলছে। তাদের হাসিতে পুরো বাড়ি সুকোময় হয়ে উঠেছে
এইদিকে রিমঝিম না আসাই আগেই ইনায়া রুমে চলে গেছে।
বাড়ির গিন্নিরা রান্নায় ব্যস্ত। মেজো গিন্নি নুসরাত চৌধুরী বাড়ির কোর্তাদের জন্য চা নিয়ে আসলেন।
সবাই চা খাচ্ছে আর পারিবারিক ব্যবসা নিয়ে আলোচনা করছে।
এইদিকে বাড়ির তিন গিন্নি ভাবছে, আজ কী রান্না হবে। দীর্ঘদিন পর ইউভি বাড়ি তে এসেছে, তাই তার পছন্দের রান্না নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে।
হঠাৎ রেশমা চৌধুরীর মনে পড়ে ইউভির কথাগুলো জানি স মেঝো নূর মা মনে হয় কিছু একটা কান্ড ঘটিয়েছে ইউভি কিন্তু অনেক রেগে আছে
কি বলো বড় আপা নিশ্চয়ই কোন বড় কাণ্ডো ঘটিয়েছে না হলে ইউভি বাবা তো ওর উপর কোন রাগ করে না
ইউভি আর রেদোয়ান ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এল।
বাড়ির তিন কোর্তা যেন অবাক পর্যায়ে।
চুফ থাকতে না পেরে রাতিব চৌধুরী বলে তুমি হঠাৎ এ বাড়িতে?
কেন ভয় পেয়ে গেলে নাকি বাবা —–
কেন ভয় পাবো কেন?
না মানে যদি বলি আমি বড় হয়ে গেছি এখন তোমার কথা রাখো।
লিখন চৌধুরী বলে আমি তোমাকে কি প্রশ্ন করলাম আর তুমি কি উত্তর দিলে?
লিখন চৌধুরী জানেন, এই ছেলে কোনো কারন ছারা কাজ করবে না।
রাতিব চৌধুরী আর রবিউল চৌধুরী দুজন মিলে মুখে হাসি ছড়াল।
বড় ভাই বাঘ তো খেপে গেছে
এখন কি করে সামলাবো তোরা চুপ থাক দশ বছর আগে আমি যেভাবে পরিস্থিতির সামলেছি সেই ভাবেই সামলাবো নূর মায়ের অমতে আমি কোন কাজ করতে পারবো না
ইউভি ও রেদোয়ান পাশের ছোপাই বসে ফোন স্ক্রল করছিল রেশমা এসে বলল,
“তোরা খাবি না বাবা?”
“না, পরে সবাই একসাথে খাবো আম্মু আর আজকে খাবার টেবিলে আমার কিছু দরকারি কথা বলার আছে ”
“ঠিক আছে”—বলেই রেসমা রান্নাঘরে চলে গেল
বাড়ির গেট পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল রিমঝিম।
আজ সে তার অফিসিয়াল পোশাকেই আছে।
গাঢ় নীল রঙের ফিটিং জিন্সের সাথে হালকা সাদা শার্ট, যার হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটানো। শার্টের উপর কালো লেদারের জ্যাকেট—যা তাকে আরও দৃঢ় আর আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।
পায়ে কালো বুট, হাঁটার সাথে সাথে হালকা শব্দ তুলছে, যেন তার প্রতিটি পদক্ষেপে একটা শক্ত উপস্থিতি বোঝা যাচ্ছে।
চুলগুলো পেছনে টাইট করে বাঁধা—একটা সিম্পল পনিটেল। মুখে কোনো বাড়তি মেকআপ নেই, শুধু হালকা লিপবাম আর চোখে ডার্ক সানগ্লাস।
হাতে একটি ঘড়ি আর অন্য হাতে ছোট্ট একটি ফাইল বা মোবাইল—সবকিছুতেই যেন প্রফেশনালিজম ফুটে উঠছে।
তার হাঁটার ভঙ্গিতেই বোঝা যায়—
সে সাধারণ কেউ নয়,
সে একজন সিআইডি অফিসার।
বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই সবাই একবার তাকিয়ে দেখে—
রিমঝিম বাড়িতে প্রবেশ করল। এক নজরেই ছোট্ট দুটো মেয়ে—আয়াত আর আতিকা—রিমঝিমকে দেখে খুশিতে দৌড়ে এগিয়ে এলো।
“ফুপি! তুমি কি আনছো?” হাসিমুখে আওয়াজ দিল আয়াত।
রিমঝিম একটু হাঁটু গেড়ে বসে, পকেট থেকে দু’টি চকোলেট বের করল।
“আমার সোনামণিদের প্রিয় ক্যান্ডি।”
দু’টি চকোলেট হাতে পেয়ে আয়াত আর আতিকা দুজনেই রিমঝিমের দু’গালে চুমু দিল।
“আহ, ইউ আর দা বেস্ট, ফুপি মনি!”
এই দৃশ্য দেখে পুরো হলরুম ভরে উঠল হাসিতে।
রিমঝিম তারপর রান্নাঘরে চলে গেল।
“বড় ভাবি পিহু কবে আসবে? বাড়িটা যেন পুরো ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।”
“কাল আসবে,” হাসিমুখে উত্তর দিল রেসমা চৌধুরী
“ওহ আচ্ছা, তোমরা থাকো, আমি আসছি।”
এদিকে ইউভি একটু হাসি দিয়ে বলল,
“পি, তোমাদের সঙ্গে আমার কথা আছে। নিচে খেতে আসো। আর আদর তোমাকে মিস করছে, ওর সঙ্গে দেখা করে আসো।”
“ওকে, আমি যাচ্ছি তোর আদরের কাছে।”
বাড়ির প্রতিটি সদস্য যানে ইউভি “নূর” কে কতোটা বালোবেসে আর ভালোবেসে আদর বলে ডাকে….
হঠাৎ ইউ ভির চোখ পড়ে একটি ফেচবুক আইডিতে
ইউভি ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। চোখের সামনে ভেসে উঠেছে একটি ফেসবুক পোস্ট। পোস্টটা দেখে তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
মৃদু স্বরে সে নিজেকেই বলল,
“তোমার শখ… আমি পূরণ করব, আদর।”
এক মুহূর্ত দেরি না করে ইউভি একটি নাম্বার ডায়াল করল।
ফোনটা রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠ—
“জি, বস?”
ইউভি শান্ত কণ্ঠে বলল,
“রাজু, কাল সকালের আগেই আমার এই চুড়িগুলো লাগবে। আমি তোমাকে ছবি পাঠিয়ে দিয়েছি, দেখে নিও।”
রাজু হালকা হেসে উত্তর দিল,
“ওকে, বস। হয়ে যাবে।”
ফোনটা কেটে দিয়ে ইউভি আবার স্ক্রিনের দিকে তাকাল। চোখে তখন এক অদ্ভুত কোমলতা।
এদিকে ইনায়া নিজের রুমে বিছানায় শুয়ে রিলস দেখছিল। একের পর এক ভিডিও স্ক্রল করলেও, একটা রিলস বারবার তার সামনে ফিরে আসছে—কাশ্মীরি চুড়ির ভিডিও।
চুড়িগুলোর রঙ, ডিজাইন… যেন এক অদ্ভুত টান তৈরি করল তার মনে।
অজান্তেই ইনায়া সেই চুড়ির একটি ছবি নিয়ে নিজের ফেসবুকে পোস্ট করল। ক্যাপশনে শুধু একটা শব্দ—
“Emotion…”
আর সেই একটুকু অনুভূতিই যেন পৌঁছে গেল কারো কাছে…
ইউভি স্ক্রিনে পোস্টটা দেখে মৃদু হেসে ফেলল।
“আমার আদরের শখ…”
তার চোখে তখন এক ধরনের দৃঢ়তা।
সে জানে—
তার প্রিয় মানুষটার কোনো ইচ্ছা অপূর্ণ থাকবে না।পরদিনের জন্য সব ঠিক করে রেখে ইউভি রাজুকে আবার একটি মেসেজ পাঠাল—
চুড়ির সাথে একটি ছোট্ট নোট থাকবে…
“শখের হাজার জিনিস থাকলেও, শখের মানুষ কিন্তু একজনই থাকে।
আর আমার কাছে সেই একজনই তুমি, আদর…” 🫀🕊️
ফোনটা পাশে রেখে ইউভি চোখ বন্ধ করল।
ঠোঁটের কোণে সেই চেনা দুষ্টু হাসি—
কারণ সে জানে,
এই ছোট্ট সারপ্রাইজটা কারো মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলবে…
রিমঝিম ঘরে ঢুকতেই ইনায়া দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
“ফুপি! তুমি এসেছো! জানো, তোমাকে অনেক মিস করেছি…”
রিমঝিম মৃদু হেসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
ইনায়া একটু অভিমানী গলায় বলতে লাগল—
“তিয়াসা বাড়িতে নেই, তুমিও নেই… সামনে রিদের এক্সাম, সে সারাক্ষণ পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। আমার সাথে কথা বলার মতো কেউই নেই। বড় আব্বু, বাবা, সেজো চাচ্চু—সবাই অফিস নিয়ে ব্যস্ত। আমি কার সাথে কথা বলব বলো?”
রিমঝিম হালকা ভ্রু তুলল।
“কেন? ইউভি আর রেদোয়ান তো বাড়িতেই আছে, তাদের সাথে কথা বল।”
ইনায়া মুখ ফুলিয়ে বলল—
“পাগল নাকি! তোমাদের সেই শেহেজাদা তো সবসময় অ্যাটিটিউড নিয়ে থাকে। তার সাথে কে কথা বলতে যাবে!”
রিমঝিম হেসে ফেলল।
“ও ওপর ওপর যতই রাগ আর অ্যাটিটিউড দেখাক না কেন, ভেতরে ভেতরে কিন্তু অনেক নরম। কাউকে ভালোবাসলে পাগলের মতো ভালোবাসে, তার জন্য সবকিছু করতে পারে… বুঝলি?”
একটু থেমে আবার বলল—
“আর বাড়ির সবাইকেও সে অনেক ভালোবাসে।”
ইনায়া কৌতূহলী চোখে তাকাল।
“আচ্ছা ফুপি, ইউভি ভাইয়া বাড়িতে থাকে না কেন?”
রিমঝিম হালকা হেসে বলল—
“কারণ… তুই।”
“মানে! আমি কারণ কেন হব?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ইনায়া।
রিমঝিম দ্রুত কথা ঘুরিয়ে নিল—
“না , মানে বলছি—তোরা বাড়ির বাচ্চারা
, আর ইউভি সবসময় একটু একা আর চুপচাপ থাকতে পছন্দ করে। তাই আলাদা বাড়িতে থাকে। ওটা তার নিজের বাড়ি।”
ইনায়া আর কিছু না বলে চুপচাপ রিমঝিমের কোলে মাথা রাখল। চোখ বন্ধ করে আস্তে বলল—
“জানো ফুপি… আজ আমি রুদ্র ভাইয়াকে মনের কথা বলেছি। কিন্তু উনি নাকি অন্য কাউকে ভালোবাসেন…”
রিমঝিম একটু চুপ করে রইল।
“ওহ… আচ্ছা।”
তারপর নরম গলায় জিজ্ঞেস করল—
“একটা সত্যি কথা বল তো, ইনায়া… তুই কি রুদ্রকে সত্যিই ভালোবাসিস?”
ইনায়া চোখ না খুলেই বলল—
“হ্যাঁ ফুপি… বাসি বলেই তো মনের কথা বললাম।”
রিমঝিম মৃদু হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
“পাগল মেয়ে… ভালোবাসা কী জিনিস, তুই এখনো ঠিক বুঝিস না।”
ইনায়া চোখ খুলে তাকাল।
“মানে? কী বলছো ফুপি?”
রিমঝিম ধীরে ধীরে বলল—
“শোন, তোকে একটা কথা বলি… রুদ্র তোকে বলল সে অন্য কাউকে ভালোবাসে—এতে কি তোর খুব কষ্ট হয়েছে?”
ইনায়া মাথা নেড়ে বলল—
“না, একদমই না ফুপি।
আমার তো বরং রাগ হয়েছে—আমি না জেনে একজনকে প্রপোজ করলাম!
রিমঝিম হালকা হেসে বলল—
এইটাই ভালোবাসা না পাগলি। এটা তোর বয়সের দোষ। এই বয়সে আমরা প্রায়ই ভুল মানুষকে ভালো ভেবে বসি…
ইনায়া একটু চুপ থেকে জিজ্ঞেস করল—
শেহেজাদার আদর পর্ব ২
তাহলে ভালোবাসা কী, ফুপি?
রিমঝিম তার চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল…
চোখে তখন এক অদ্ভুত গভীরতা—
এবার সে এমন কিছু বলবে…
যা ইনায়ার জীবনটাই বদলে দিতে পারে।
