Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৫৮

শেহেজাদার আদর পর্ব ৫৮

শেহেজাদার আদর পর্ব ৫৮
সুমাইয়া ইসলাম নূর

রাত ঠিক আটটা বাজে
ঢাকার আকাশজুড়ে তখন হাজারো আলোর ঝলকানি। দূরের উঁচু উঁচু ভবনগুলো রঙিন আলোয় ঝিকমিক করছে। শহরের ব্যস্ততা এখনও থামেনি, বরং রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন অভিজাত মহলের প্রাণচাঞ্চল্য আরও বেড়ে উঠেছে।চৌধুরী ভিলার সামনের বিশাল পোর্টিকোতে একে একে প্রস্তুত রাখা হয়েছে পরিবারের গাড়িগুলো।
আজকের গন্তব্য—ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত ও বিলাসবহুল প্রাইভেট বিজনেস ক্লাব।
যেখানে শুধু আমন্ত্রণপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক শিল্পপতি, কর্পোরেট চেয়ারম্যান, বিনিয়োগকারী এবং দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরাই প্রবেশের অনুমতি পান
ড্রইংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে দুই ভাই।

ইউভি আর রেদোয়ান ইউভির পরনে নিখুঁতভাবে তৈরি গভীর কালো ইতালিয়ান কাট ডিনার স্যুট। ভেতরে তুষার সাদা শার্ট, গলায় সিল্কের কালো বো-টাই, বুকপকেটে সাদা পকেট স্কয়ার। হাতে স্টিলের ক্লাসিক ঘড়ি, চুলগুলো পরিপাটি করে পিছনের দিকে সেট করা। অন্যদিকে রেদোয়ানের পরনে গাঢ় নেভি ব্লু ভেলভেট ব্লেজার, সাদা শার্ট আর কালো ট্রাউজার। গলায় সরু কালো টাই, মুখে হালকা দাড়ি, চোখেমুখে অদ্ভুত এক অস্থিরতা। প্রতি কয়েক সেকেন্ড পরপরই সে সিঁড়ির দিকে তাকাচ্ছে।
ইউভি পাশ থেকে সবকিছু লক্ষ্য করে মুচকি হাসলো ঠিক তখনই উপরতলা থেকে ভেসে এলো হাই হিলের মৃদু শব্দ।টক…টক…টক…

দুই ভাইয়ের দৃষ্টি একসঙ্গে ঘুরে গেল সিঁড়ির দিকে।
ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে ইনায়া আর পিয়াসা।মুহূর্তের জন্য যেন পুরো ভিলা স্তব্ধ হয়ে গেল।
ইনায়ার পরনে গাঢ় এমেরাল্ড সবুজ রঙের পাথরের কাজ করা ডিজাইনার গাউন। কোমর ছুঁয়ে নেমে আসা হালকা লালচে চুলগুলো বড় বড় ওয়েভ করে ছেড়ে রাখা। কানে হীরার দুল, গলায় ছোট্ট ডায়মন্ড নেকলেস, ঠোঁটে হালকা হাসি। সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে যেন তার সৌন্দর্য আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল।
তার ঠিক পাশেই পিয়াসা।গভীর ওয়াইন রঙের লং গাউনে তাকে যেন রাজকন্যার মতো লাগছে। কোমর পর্যন্ত নেমে আসা কালো চুলগুলো এক পাশে এনে রাখা। কানে মুক্তার দুল, হাতে সূক্ষ্ম ব্রেসলেট। মুখে খুব হালকা মেকআপ, কিন্তু চোখের মায়াতেই যেন সব সৌন্দর্য হার মানে।রেদোয়ান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।যেন সময় থেমে গেছে।

কিছুক্ষণ পর…
চৌধুরী পরিবারের গাড়ির বহর ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত প্রাইভেট বিজনেস ক্লাবের সামনে এসে থামল।চারপাশে কড়া নিরাপত্তা।প্রবেশপথজুড়ে লাল কার্পেট।দুই পাশে সারিবদ্ধ মিডিয়ার ক্যামেরা।
ফ্ল্যাশলাইটের ঝলকানিতে পুরো প্রবেশদ্বার আলোকিত।ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে বিশাল ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি, সোনালি আলোয় সাজানো মার্বেলের হলরুম, চারদিকে বিদেশি ফুলের সুগন্ধ আর নরম লাইভ অর্কেস্ট্রার সুর।
হলরুমের এক পাশে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আলাদা লাউঞ্জ।
অন্য পাশে বিভিন্ন দেশের কর্পোরেট প্রধানরা নিজেদের মধ্যে নতুন প্রজেক্ট, শেয়ার, মার্জার এবং বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করছেন।কোথাও সাংবাদিকদের ভিড়।কোথাও লাইভ টেলিভিশন সম্প্রচার হচ্ছে কোথাও আবার বড় বড় কোম্পানির চেয়ারম্যানরা নতুন পার্টনারশিপের জন্য হাত মিলিয়ে হাসিমুখে ছবি তুলছেন।

পুরো পরিবেশে একটাই অনুভূতি
ক্ষমতা, প্রভাব, আভিজাত্য আর কর্পোরেট বিশ্বের অদৃশ্য প্রতিযোগিতা।আর ঠিক সেই মুহূর্তেই…
চৌধুরী পরিবারের প্রবেশে হলরুমের অসংখ্য মানুষের দৃষ্টি ধীরে ধীরে তাদের দিকেই ঘুরে গেল।মুহূর্তের মধ্যেই পুরো গ্র্যান্ড বলরুমের পরিবেশ যেন বদলে গেল।দেশের প্রায় সব জাতীয় টেলিভিশন চ্যানেল, আন্তর্জাতিক বিজনেস ম্যাগাজিন, কর্পোরেট মিডিয়া এবং সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরাগুলো একে একে ঘুরে গেল চৌধুরী পরিবারের দিকে। একের পর এক ক্যামেরার আলো ঝলসে উঠতে লাগল। সাংবাদিকদের কণ্ঠ ভেসে আসছে স্যার, এইদিকে প্লিজ! মিস্টার ইউভি, ওয়ান লুক প্লিজ! চৌধুরী ফ্যামিলি, ওয়ান গ্রুপ ফটো!”
চারদিকে যেন শুধুই চৌধুরী পরিবারের নাম।

অন্যদিকে…
হলরুমের ডান পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুরো মালিথা পরিবার দাঁতে দাঁত চেপে সেই দৃশ্য দেখছে।
সাজ্জাদ মালিথার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে।
রুমি মালিথার চোখে স্পষ্ট হিংসার আগুন জলছে
রবার্ট মালিথা মুঠি শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে।
তিয়ার ঠোঁটে জোর করে হাসি থাকলেও ভেতরে ভেতরে সে যেন জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে।
আজকের পুরো অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের একটিবারও তাদের দিকে তেমন নজর নেই।
সব আলো সব ক্যামেরা সব প্রশংসা শুধু চৌধুরী পরিবারের জন্য।রুমি মালিথা নিচু স্বরে দাঁত চেপে বলল আজকের রাতটা ওদের কিন্তু সব রাত একরকম থাকে না।সাজ্জাদ মালিথা ধীর গলায় উত্তর দিলেন, আলো যত উজ্জ্বল হয় তার ছায়াও তত গাঢ় হয়।আমি সেই ছায়ার অপেক্ষায় আছি।
ঠিক তখনই গ্র্যান্ড এন্ট্রান্সের বিশাল দরজার সামনে আবারও নীরবতা নেমে এলো।এক এক করে ভেতরে প্রবেশ করলেন—লিখন চৌধুরী…রতিব চৌধুরী…রবিউল চৌধুরী।তিন ভাই যেন একই পরিবারের তিনটি আলাদা ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি।

সবার আগে লিখন চৌধুরী আসছে গাঢ় চারকোল ব্ল্যাক টাক্সেডো, সাদা শার্ট, কালো বো-টাই।
তার ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস আর গাম্ভীর্য এমন ছিল যে উপস্থিত অনেক তরুণ ব্যবসায়ীও তার সামনে ম্লান হয়ে যাচ্ছিল।তার চোখে ছিল অভিজ্ঞতার দৃঢ়তা, মুখে ছিল সংযত হাসি।তার কয়েক কদম পেছনে রতিব চৌধুরী। সুদর্শন ব্যক্তিত্বে বয়স যেন তাকে স্পর্শই করতে পারেনি।গাঢ় নীল ভেলভেট ডিনার জ্যাকেট, রুপালি চুলের হালকা আভা, পরিমিত দাড়ি আর গভীর স্থির দৃষ্টি— তাকে আরও রাজকীয় করে তুলেছিল।তার পদচারণায় ছিল এক অদ্ভুত সম্মোহনী প্রভাব।সবশেষে রবিউল চৌধুরী।
প্রাণবন্ত, স্মার্ট ও আত্মবিশ্বাসী এক কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব।পরনে বারগান্ডি রঙের প্রিমিয়াম ব্লেজার, সাদা শার্ট, কালো ট্রাউজার।মুখে হালকা হাসি, চোখেমুখে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার ছাপ।তিন ভাই পাশাপাশি দাঁড়াতেই পুরো হলরুমে আবারও ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ঝলসে উঠল।একজন সাংবাদিক বিস্ময়ে বলে উঠল,
The Choudhury Brothers… What a presence!”
আরেকজন ফিসফিস করে বলল,

এ কারণেই ওদের কর্পোরেট সাম্রাজ্যকে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী বিজনেস পরিবার বলা হয়।”
অন্যদিকে…মালিথা পরিবারের চোখে তখন শুধু একটাই অনুভূতি হিংসা।কারণ তারা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিল…আজকের রাতের আসল আকর্ষণ তারাই নয়।পুরো অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে—চৌধুরী পরিবার।
এক কোণে হাতে সাধারণ সফট ড্রিংকসের গ্লাস নিয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে ইনায়া আর পিয়াসা।
ইনায়ার মুখে আগের মতোই প্রাণবন্ত হাসি।
সে মাঝেমধ্যেই চারপাশের সাজসজ্জা, বিদেশি অতিথিদের দেখে মুগ্ধ হচ্ছে।কিন্তু পিয়াসার মুখে সেই হাসি নেই।ঠোঁটের কোণে জোর করে টেনে রাখা একটুকরো সৌজন্যের হাসি।আর তার চোখ…
বারবার ভিড়ের মাঝখানে একজন মানুষকেই খুঁজে ফিরছে।রেদোয়ান।ওপাশে কয়েকজন বিদেশি ইনভেস্টরের সঙ্গে কথা বলছিল রেদোয়ান।

হঠাৎই তার চোখ গিয়ে আটকে গেল পিয়াসার চোখে।
দুজনের দৃষ্টি এক মুহূর্তে এক হয়ে গেল।
চারপাশের এত মানুষ এত আলো এত কোলাহল…
সবকিছু যেন মুহূর্তের জন্য মিলিয়ে গেল।
রেদোয়ান খুব সূক্ষ্মভাবে ভ্রু তুলে ইশারা করলো।
“একটু হাসো…” পিয়াসা ঠোঁট বাঁকিয়ে রাগী চোখে তাকাল।তারপর ইচ্ছে করেই মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।রেদোয়ানের মুখে অসহায় একটা হাসি ফুটে উঠল।কয়েক সেকেন্ড পর…
পিয়াসা আর থাকতে না পেরে আবারও আড়চোখে তাকাল।দেখল…রেদোয়ান এখনও ঠিক আগের মতোই তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখ আবারও মিলল।
এবার আর পিয়াসা রাগ ধরে রাখতে পারল না।
দুজনের ঠোঁটেই একসাথে ফুটে উঠল ছোট্ট, লাজুক একটা হাসি।
ঠিক তখনই…

একজন বিদেশি তরুণী তাদের সামনে এসে দাঁড়াল।
সে ভদ্রভাবে হাত বাড়িয়ে বললো
গুড ইভনিং। আই অ্যাম এমিলি কার্টার।
ইনায়াও হেসে হাত মিলিয়ে বললো
— গুড ইভনিং। আই অ্যাম ইনায়া নূর চৌধুরী।
পাশে দাঁড়িয়ে পিয়াসা বললো
— অ্যান্ড আই অ্যাম পিয়াসা জান্নাত চৌধুরী।
এমিলি মুগ্ধ হয়ে বললো
— ওহ! সো ইউ আর ফ্রম দ্য চৌধুরী ফ্যামিলি?
ইনায়া বিনয়ের সঙ্গে মাথা নেড়ে বললো

— ইয়েস।
এমিলি হেসে বললো
— কনগ্র্যাচুলেশনস। ইউর ফ্যামিলি ইজ ট্রুলি ইনস্পায়ারিং।
পিয়াসা ভদ্রভাবে বললো
— থ্যাংক ইউ সো মাচ।
এরপর এমিলি হাতে থাকা গ্লাসটা নামিয়ে বললো
— আমরা দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন টেকনোলজি আর গ্রিন ইনভেস্টমেন্ট নিয়ে কাজ করতে চাই। আপনারা কি ভবিষ্যতে ইন্টারন্যাশনাল কোলাবোরেশনে আগ্রহী? পিয়াসা আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে উত্তর দিল অবশ্যই। ইনায়া একি ভাবে উত্তর দিলো সাসটেইনেবল প্রজেক্ট আর লং-টার্ম পার্টনারশিপ আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার।
এমিলি মুগ্ধ হয়ে বললো ইমপ্রেসিভ!

— আই হোপ উই উইল ওয়ার্ক টুগেদার ভেরি সুন।
ইনায়া হেসে উত্তর দিলো
— উই উইল বি হ্যাপি টু।
কয়েক মিনিট ধরে নতুন প্রজেক্ট, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, কর্পোরেট এক্সপানশন আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তাদের সুন্দর আলোচনা চলতে লাগল।চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরও কয়েকজন বিদেশি প্রতিনিধি এগিয়ে এসে পরিচিত হলেন।
কেউ বিজনেস কার্ড দিলেন।
কেউ ভবিষ্যৎ মিটিংয়ের প্রস্তাব রাখলেন।
অল্প সময়ের মধ্যেই ইনায়া আর পিয়াসাকে ঘিরে ছোট্ট একটা কর্পোরেট সার্কেল তৈরি হয়ে গেল।
আর ঠিক সেই দৃশ্যটাই দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিল তিয়া মালিথা।তার হাতে থাকা ড্রিংকসের গ্লাসটা প্রায় চেপে ভেঙে ফেলবে এমন অবস্থা।এতক্ষণে সে বুঝে গেছেএই পার্টিতে সবাই নিজে থেকেই চৌধুরী পরিবারের কাছে যাচ্ছে।কেউ ইনায়ার সঙ্গে পরিচিত হতে চাইছে।কেউ পিয়াসার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে।কেউ ইউভি কিংবা রেদোয়ানের সঙ্গে বিজনেস আলোচনা করছে।
কিন্তু তার কাছে?কেউ আসছে না।কেউ পরিচয় জানতে চাইছে না।কেউ একটা বিজনেস কার্ড পর্যন্ত দিচ্ছে না।

তিয়ার বুকের ভেতরটা হিংসায় জ্বলে উঠল।
মনে মনে দাঁতে দাঁত চেপে বললো
“ইনায়া নূর চৌধুরী সবাই শুধু তোকেই দেখছে! আজ না পারি… কাল আমি সবাইকে দেখিয়ে দেব। এই কর্পোরেট দুনিয়ায় শুধু তর নামই থাকবে না তিয়া মালিথাও নিজের নাম লিখবে। তার চোখের গভীরে জমে থাকা অস্থিরতা আর হিংসা
।হঠাৎ করেই মঞ্চের আলো কিছুটা ম্লান হয়ে এলো। চারপাশের মিউজিক থেমে যেতেই অনুষ্ঠানের হোস্ট আবার মাইক্রোফোন হাতে নিলেন।
— লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান…
আজকের আনুষ্ঠানিক পর্ব প্রায় শেষের দিকে। এখন শুরু হতে যাচ্ছে এই সন্ধ্যার সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোর একটি।কাপল ড্যান্স সেশন।”

আপনারা যে যার পার্টনারকে সঙ্গে নিয়ে ড্যান্স ফ্লোরে চলে আসুন।এনজয় দ্য নাইট… মেক বিউটিফুল মেমোরিজ! কথা শেষ হতেই পুরো হলরুম জুড়ে ধীরলয়ের রোমান্টিক সুর বেজে উঠল।একে একে বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী, চেয়ারম্যান, তাঁদের স্ত্রী, বাগদত্তা কিংবা পার্টনারদের নিয়ে ড্যান্স ফ্লোরে চলে এলেন।চারপাশে হাসি, গল্প আর করতালিতে জমে উঠল পরিবেশ।
কিন্তু এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা তিয়া মালিথার চোখে তখন অন্য আগুন সে দেখলইনায়া আর পিয়াসাকে ঘিরে এখনও অনেকেই কথা বলছে।
সাংবাদিকদের ক্যামেরাও বারবার ঘুরে যাচ্ছে চৌধুরী পরিবারের দিকেই।আর সেই দৃশ্য সহ্য করতে পারছিল না তিয়া।সে মনে মনে দাঁত চেপে বললো।আজ সবাই শুধু ইনায়া নূর চৌধুরী… ইনায়া নূর চৌধুরী করছে! না… আজকেই ওকে সবার সামনে অপমান করব।।ধীরে ধীরে সে এক ওয়েটারের কাছে গিয়ে খুব নিচু স্বরে কিছু বললো

তারপর ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটি ক্যাপসুল বের করে ওয়েটারের হাতে দিল।ফিসফিস করে বললো
এই ওষুধটা ওই জুসের গ্লাসে মিশিয়ে দাও। তারপর লাল চুলওয়ালা মেয়েটাকে দেবে। কাজটা ঠিকমতো হলে তোমার প্রাপ্যের চেয়ে অনেক বেশি পাবে।
ওয়েটার ইতস্তত করলেও মোটা টাকার লোভে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেল।কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে নির্দিষ্ট গ্লাসে ওষুধ মিশিয়ে ইনায়ার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ইউভির তীক্ষ্ণ চোখ পুরো ঘটনাটা দেখে ফেলল।তার ঠোঁটের কোণে খুব ক্ষীণ একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু মুখের ভাব একটুও বদলাল না।ধীর পায়ে সে ওয়েটারের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
গম্ভীর কণ্ঠে বললো এক্সকিউজ মি।ওয়েটার থমকে গেল।ইউভি এমনভাবে কিছু কথা বলল, যা আশেপাশের কেউই শুনতে পেল না।শুধু ওয়েটারের মুখের রং মুহূর্তেই বদলে গেল।তার কপালে ঘাম জমে উঠল।ইউভি খুব শান্ত স্বরে বললো যে গ্লাসটা যার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। ঠিক তার হাতেই পৌঁছে দাও।বুঝেছ?ওয়েটার ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
অন্যদিকে তিয়া দূর থেকে সবকিছু দেখছিল।সে ভেবেছিল এবার ইনায়া সবার সামনে নিজের ভারসাম্য হারাবে।হাসির পাত্র হবে।চৌধুরী পরিবারের সম্মান মাটিতে মিশে যাবে।তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠল।

কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর সেই একই ওয়েটার হাতে ট্রে নিয়ে সোজা তিয়ার সামনেই এসে দাঁড়াল।ভদ্রভাবে বললো ম্যাম, আপনার জন্য স্পেশাল ওয়েলকাম ড্রিংক।তিয়া কিছু না ভেবেই গ্লাসটা হাতে তুলে নিল।
দূরে দাঁড়িয়ে ইউভি একবার শুধু ঘড়ির দিকে তাকাল।তারপর খুব আস্তে করে নিজের কোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।চোখে তখন সেই চেনা রহস্যময় স্থিরতা।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে অজান্তেই নিজের অপমানের সূচনা করে ফেলল তিয়া মালিথা।
ড্যান্স ফ্লোরের আলো ধীরে ধীরে আরও নরম হয়ে এলো। সোনালি আর নীল আলোর মিশ্রণে পুরো হলরুম যেন এক স্বপ্নময় পরিবেশে রূপ নিল। পিয়ানোর মৃদু সুরের সঙ্গে ভেসে উঠল ধীরলয়ের একটি রোমান্টিক মিউজিক।হোস্ট মুচকি হেসে বললেন লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান… প্লিজ এনজয় দ্য কাপল ড্যান্স।চারপাশের সব জুটি ধীরে ধীরে নাচে মেতে উঠল।
সেই সময় ইউভি ধীর পায়ে ইনায়ার সামনে এসে দাঁড়াল।কোনো কথা না বলে ভদ্রভাবে ডান হাতটা ইনায়ার দিকে বাড়িয়ে দিল।গম্ভীর অথচ কোমল কণ্ঠে বলল—

— “মে আই?”
ইনায়ার ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।
সে বিনা দ্বিধায় নিজের হাতটা ইউভির হাতে রেখে দিল।পরের মুহূর্তেই ইউভি খুব যত্ন করে তাকে ড্যান্স ফ্লোরের মাঝখানে নিয়ে গেল।এক হাত আলতো করে ইনায়ার কোমরে, অন্য হাতে ইনায়ার হাত ধরে ধীর তালে নাচতে শুরু করল।চারপাশের অসংখ্য অতিথি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।দুজনকে যেন একেবারে পারফেক্ট কাপল মনে হচ্ছিল।
এদিকে রেদোয়ান আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।
সে সোজা পিয়াসার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
দুষ্টু হাসি দিয়ে বললো চলো, ম্যাডাম।
আজ কেউ আমাদের আটকাতে পারবে না।পিয়াসা ভান করে মুখ গম্ভীর রাখল। আমি যদি না যাই?
রেদোয়ান নিচু স্বরে বললো তাহলে কোলে করে নিয়ে যাব।কথাটা শুনে পিয়াসা চোখ রাঙালেও শেষ পর্যন্ত নিজের হাতটা রেদোয়ানের হাতে রেখে দিল।
দুজনও ধীরে ধীরে ড্যান্স ফ্লোরে চলে এল।

রেদোয়ানের হাতের স্পর্শে পিয়াসার অভিমান যেন একটু একটু করে গলতে লাগল।তাদের চোখে চোখ রেখে ধীর তালে নাচতে দেখে আশেপাশের অনেক অতিথিই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।দূর থেকে দেখলে মনে হচ্ছেদুটি হৃদয় নীরবে একে অপরের সঙ্গে কথা বলছে।রেদোয়ান মুচকি হেসে বললো রাগ কমেছে?
পিয়াসা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো একটুও না।
কিন্তু… তোমার ওপর রাগ করে বেশিক্ষণ থাকা যায় না। কথা টা শুনে রেদোয়ানের মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল।
অন্যদিকে…
তিয়া মালিথার শরীরে ওষুধের প্রভাব ধীরে ধীরে কাজ করতে শুরু করেছে।সে হঠাৎ জোরে জোরে হেসে উঠল।হা… হা… হা… আজ আমি এই পার্টির কুইন!কিছুক্ষণ পর আবার নিজের হাত দুটো নেড়ে নাচতে শুরু করল।মিউজিক… মিউজিক আরও জোরে বাজাও! উপস্থিত অতিথিরা বিস্ময়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগলেন।কেউ কেউ ফিসফিস করে বললেন কী হয়েছে ওনার?
তিনি কি ঠিক আছেন?

রায়হান চৌধুরী লজ্জায় অস্থির হয়ে মেয়ের কাছে ছুটে গেলেন।তিয়া!কী করছো তুমি?
সবাই দেখছে!কিন্তু তিয়ার যেন কোনো হুঁশই নেই।সে কখনো অকারণে হাসছে, কখনো নিজের সঙ্গেই কথা বলছে, আবার কখনো নাচতে নাচতে হোঁচট খাচ্ছে।রায়হান চৌধুরী তাকে সামলানোর চেষ্টা করছেন, কিন্তু কিছুতেই পারছেন না।সাজ্জাদ মালিথা দাঁত চেপে চারপাশের সাংবাদিকদের ক্যামেরার ফ্ল্যাশ দেখতে লাগলেন। মেয়ের অপমান সহ্য করতে পারছেন না যে অপমান রবার্ট এর কথাই ইনায়ার জন্য সাজানো হয়েছিল সেই অপমানের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে আজ তার নিজের মেয়ে।আর দূরে দাঁড়িয়ে ইউভি চৌধুরী শুধু একবার শান্ত চোখে পুরো দৃশ্যটা দেখল।
তার ঠোঁটের কোণে ভেসে উঠল খুব ক্ষীণ, রহস্যময় একটি হাসি।মনে মনে শুধু একটি কথাই বললো
“অন্যের জন্য গর্ত খুঁড়লে… একদিন না একদিন সেই গর্তে নিজেকেই পড়তে হয়।
ধীরলয়ের সুরটা শেষ হতেই পুরো বলরুম করতালিতে মুখর হয়ে উঠল।চারপাশের অতিথিরা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে ইউভি-ইনায়া আর রেদোয়ান-পিয়াসার দিকে।অনেকেই নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে বলছে হোয়াট এ পারফেক্ট কাপল!”

—সো এলিগ্যান্ট!”
— “অ্যাবসোলিউটলি বিউটিফুল!”
ঠিক তখনই বিদেশি এক তরুণ ব্যবসায়ী মুচকি হেসে ইনায়ার সামনে এসে দাঁড়াল।ভদ্রভাবে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল—
— “এক্সকিউজ মি, ম্যাম। মে আই হ্যাভ দ্য নেক্সট ড্যান্স উইথ ইউ?”ইনায়া কিছু বলার আগেই…
ইউভি এক পা সামনে এগিয়ে এলো।মুখে ভদ্র হাসি থাকলেও কণ্ঠটা ছিল দৃঢ়।
— “সরি, মিস্টার।”তার সঙ্গে ড্যান্স করার অধিকার… আমি ছাড়া অন্য কারও নেই।”ছেলেটা অবাক হয়ে মুচকি হেসে বললো
মে আই নো দ্য রিজন?”ইউভি একবার ইনায়ার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল—
— “বিকজ…”She is my legally wedded wife.”
“আমার তিন কবুল বলে বিয়ে করা স্ত্রী।She is my better half.শেহজাদ ইউভি চৌধুরীর ওয়াইফ।”

লিখন চৌধুরীর একমাত্র পুত্রবধূ।তারপর খুব শান্ত অথচ আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বললো
তাকে স্পর্শ করার অধিকার শুধু আমারই আছে, ব্রো। আই হোপ ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড।ছেলেটি সম্মানের সঙ্গে মাথা নত করল।”অবশ্যই। আই রেসপেক্ট দ্যাট।”বলেই হাসিমুখে সরে গেল।
ছেলেটি চলে যেতেই ইনায়া ধীরে ধীরে ইউভির খুব কাছে এসে দাঁড়াল।তার চোখদুটো ভালোবাসায় ভরে উঠেছে।নিচু স্বরে বলল—
আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান উপহার বলতে।আমি আমার জীবনে আপনার আগমনকেই বুঝি, ইউভি ভাইয়া।মেয়েরা শুধু সুদর্শন পুরুষকে ভালোবাসে না কেয়ারিং আর প্রোটেক্টিভ পুরুষকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।ইউভির ঠোঁটে মুগ্ধ হাসি ফুটে উঠল।সে আলতো করে ইনায়ার কপালে চুমু খেয়ে বললো জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মানুষকে…
সর্বোচ্চ যত্নে আগলে রাখতে হয়।কারণ। মূল্যবান মানুষ একজনই হয়, আদর।
ইনায়া চোখ বড় করে বললো
তাহলে আমি কি আপনার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মানুষ?ইউভি মুচকি হেসে বলল—
সাধে কি আর বলি.বুদ্ধি হাঁটুতে।

ঠিক তখনই।দূর থেকে তিয়ার উচ্চস্বরে চিৎকার ভেসে এলো।সে অদ্ভুতভাবে হেসে যাচ্ছে।
কখনো হাত নেড়ে নাচছে।কখনো সবাইকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করছে।ইনায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো
যেটা খেতে পারিস না, বোন. সেটা খেতে যাস কেন?
তারপর পিয়াসা আর রেদোয়ানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললো দেখছো অবস্থা?
পিয়াসা মাথা নেড়ে বললোরেদোয়ান ঠোঁট চেপে হাসল।কর্মফল বলে একটা জিনিস আছে, বোনু
এদিকে ইনায়ার চোখ হঠাৎ অন্যদিকে আটকে গেল।বিদেশি এক সুন্দরী নারী ব্যবসায়ী এগিয়ে এসে ইউভির সামনে দাঁড়িয়েছে।হাসিমুখে বললো
— “গুড ইভনিং, মিস্টার ইউভি।”
— “কনগ্র্যাচুলেশন ফর ইয়োর সাকসেস।”
ইউভিও ভদ্রভাবে হাসল।
— “থ্যাংক ইউ।”
দুজনের মধ্যে কিছুক্ষণ নতুন বিজনেস ইনভেস্টমেন্ট, আন্তর্জাতিক মার্কেট আর ভবিষ্যৎ পার্টনারশিপ নিয়ে আলোচনা চলল।
শেষে মেয়েটি ভদ্রভাবে নিজের হাত বাড়িয়ে দিল।

— “নাইস টু মিট ইউ।ইউভিও সৌজন্যবশত হাত মিলাল।এই দৃশ্যটা..একদৃষ্টে দেখছিল ইনায়া।
তার মুখ মুহূর্তেই গোমড়া হয়ে গেল।পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পিয়াসা আর রেদোয়ান একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ফেলল।পিয়াসা ফিসফিস করে বললো শুরু হয়ে গেছে।পরের মুহূর্তেই…
ইনায়া হনহন করে হেঁটে এসে ইউভির একেবারে পাশে দাঁড়াল।একটুও না ভেবে নিজের হাতটা ইউভির হাতের ভেতর ঢুকিয়ে শক্ত করে ধরে রইল।
বিদেশি নারীটি মুচকি হেসে ইনায়ার দিকে তাকাল।
— “ইউ আর ভেরি লাকি।হি ইজ আ গ্রেট জেন্টলম্যান।”ইনায়াও ভদ্রভাবে হাসল।
— “আই নো।”
মেয়েটি আর কিছু সৌজন্যমূলক কথা বলে রবার্ট মালিথার দিকে এগিয়ে গেল।মেয়েটি চলে যেতেই…
ইনায়া ধপ করে ইউভির সামনে দাঁড়িয়ে গেল

ঠোঁট ফুলিয়ে।চোখে স্পষ্ট অভিমান।আর কোনো কথা না বলে যে হাতে একটু আগে বিদেশি মেয়েটি হাত মিলিয়েছিল সেই হাতটা নিজের দুই হাতে ধরে বারবার সেখানে চুমু খেতে লাগল।যেন অন্য কারও স্পর্শ মুছে ফেলতে চাইছে।ইউভি কয়েক সেকেন্ড অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
তারপর মুচকি হেসে ইনায়াকে আলতো করে নিজের আরও কাছে টেনে নিল।তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো আমার জেলাসি বউ ইনায়ার চোখ ভিজে উঠল কাঁদো কাঁদো গলায় বলল আপনি শুধু আমার, ইউভি ভাইয়া।

আপনার জীবনে আমি ছাড়া অন্য কোনো নারী আপনাকে ছুঁবে না।আপনাকে শুধু আমি চুমু খাব।
আপনার চুলগুলো আমার আপনার চোখগুলো আমার আপনার ঠোঁটগুলো আমার আপনি পুরোটা. শুধু আমার। ইউভি মুচকি হেসে বললো আর কি বউ, বলো… তোমার সব কথাই শুনব। সারাদিন আমার বিয়াদোব বউ টার কথামতো চলবো। সারাদিন তোমার কথামতোই চলবল

শেহেজাদার আদর পর্ব ৫৭

ইনায়া ঠোঁট ফুলিয়ে বললো
শুধু সারাদিন কেন? রাতেও শুনতে হবে।
ইউভি দুষ্টু হেসে ইনায়ার আরও কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললো সেটা পারব না, বউ।
রাতে… শুধু আমার কথাই চলবে।

শেহেজাদার আদর পর্ব ৫৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here