Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৬০

শেহেজাদার আদর পর্ব ৬০

শেহেজাদার আদর পর্ব ৬০
সুমাইয়া ইসলাম নূর

সকালের প্রথম সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে বিশাল চৌধুরী ভিলার প্রতিটি কোণে।
আজ যেন পুরো ভিলাটা অন্য এক রূপে সেজে উঠেছে।সামনের বিশাল বাগানজুড়ে শুরু হয়ে গেছে ডেকোরেশনের শেষ মুহূর্তের কাজ। সাদা, নীল আর সোনালি ফুল দিয়ে সাজানো হচ্ছে প্রবেশদ্বার। গেটের দুই পাশে কর্মব্যস্ত ডেকোরেটররা একের পর এক আলোর মালা লাগিয়ে চলেছে।বাড়ির ভেতরে ক্যাটারিং স্টাফরা ব্যস্ত সকালের নাস্তা পরিবেশন করতে। কেউ মেহেদির স্টেজ সাজাচ্ছে, কেউ অতিথিদের থাকার রুম গুছিয়ে দিচ্ছে।চারদিকে শুধু উৎসবের আমেজ।ঠিক সেই সময় সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে রেদোয়ান হঠাৎ থেমে গেল।

এতদিন এই আয়োজন দেখে তার কিছুই মনে হয়নি।কিন্তু আজ আজ যেন বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল।চারপাশে তাকিয়ে দেখলো চৌধুরী পরিবারের প্রতিটি মানুষ কতটা আনন্দে ব্যস্ত।কারও মুখে হাসি থামছে না।রেদোয়ান গভীর নিঃশ্বাস নিল।তারপর আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সোজা ড্রয়িংরুমের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল।
গম্ভীর কণ্ঠে বললো তোমাদের সবাইকে আমার কিছু বলার আছে। তার কণ্ঠ শুনে সবাই থেমে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ওপরতলা থেকে ধীরে ধীরে নিচে নামল পিয়াসা আর ইনায়া।তাদের পেছনেই নামছে তিয়া।রেদোয়ান সোজা লিখন চৌধুরীর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললো বড় চাচ্চু… আজ আমি আর চুপ করে থাকতে পারব না পিয়াসা আমার বাগদত্তা।
আমার হবু স্ত্রী।আমি ওকে ভালোবাসি…
না…

ভালোবাসি বললে ভুল হবে। আমি ওকে নিজের প্রাণের থেকেও বেশি ভালোবাসি। আমি ভেবেছিলাম সঠিক সময় এখনও আসেনি।
ভেবেছিলাম সব ঠিক সময়েই সবাইকে বলব।
কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি আমি অনেক দেরি করে ফেলেছি।সে কাঁপা গলায় আবার বললো শুনছেন তো, বড় চাচ্চু?লিখন চৌধুরী কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, তুমি সত্যিই অনেক দেরি করে ফেলেছ, রেদোয়ান। আমি খান পরিবারের কাছে কথা দিয়ে ফেলেছি।কথাটা শেষ হতেই রেদোয়ানের চোখ লাল হয়ে উঠল।
তিক্ত হাসি দিয়ে বললো তোমার দেওয়া একটা কথার দাম কি আমার ভালোবাসার থেকেও বেশি হয়ে গেল, বড় চাচ্চু?সে এবার রাতিব চৌধুরীর দিকে ফিরল। বাবা তুমি কিছু বলো তুমি বড় চাচ্চুকে বোঝাও। প্রয়োজন হলে তুমি নিজে খান পরিবারের সঙ্গে কথা বলো। কিন্তু আমার পিহুকে অন্য কোথাও বিয়ে হতে দিও না।একজনের পর একজনকে বোঝাতে লাগল রেদোয়ান।কিন্তু কেউ কোনো উত্তর দিল না।হঠাৎ সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না।চিৎকার করে উঠলো তোমরা বুঝছ না কেন?
পিহু শুধু আমার!
কথাটা শুনেই পিয়াসা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।ডুকরে কেঁদে উঠলো রেদোয়ান ছুটে গিয়ে ইউভির সামনে দাঁড়াল।

— ব্রো… অন্তত তুমি আমাকে বোঝো। আমি জানি তুমি বুঝবে।ইউভি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে রেদোয়ানের কাঁধে হাত রেখে শান্ত গলায় বলল, অনেক দেরি করে ফেলেছিস, রেদোয়ান। আমার বোন কোনো খেলনা নয়।
ওকে ভালোবাসতে হলে প্রকাশ্যে ভালোবাসতে হবে।ওকে সবার সামনে নিজের মানুষ বলে পরিচয় দিতে হবে আগলে রাখতে হবে ওকে যত্নে রাখতে হবে লুকোচুরি ভালোবাসা আমার বোনের প্রাপ্য নয়।ইউভির কণ্ঠ আরও দৃঢ় হয়ে উঠল।

আমি যেমন নিজের স্ত্রীকে সবার সামনে নিজের বলে পরিচয় দিই সবার সামনে ওকে আগলে রাখতে রাখি আমার বোনও ঠিক তেমন ভালোবাসাই ডিজার্ভ করে। তুই সেখানে ব্যর্থ হয়েছিস। কিন্তু রোহিত খান পারবে।কথাটা বলেই ইউভি আর একবারও পেছনে না তাকিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।পেছন থেকে রেদোয়ানের বুকফাটা চিৎকার ভেসে এল আমি ভয় পেয়েছিলাম, ভাইয়া! আমাদের বন্ধুত্বটা যদি ভেঙে যায় সেই ভয়েই আমি চুপ ছিলাম। পরিবার নিয়ে আমি একটুও ভাবিনি। কিন্তু যখন প্রসঙ্গ আমার পিহুকে নিয়ে তখন এই বন্ধুত্ব, ভাই-ভাইয়ের সম্পর্ককিছুই আমার কাছে বড় না!ইউভি একবারও ফিরে তাকাল না।শুধু হাঁটতে হাঁটতে ঠোঁটের কোণে মৃদু একটা হাসি ফুটে উঠল।মনে মনে বলল,
পাগল একটা অন্যদিকে তিয়া সবকিছু দেখে মনে মনে হাসল।খেলাটা তো জমে ক্ষীর!
পিয়াসা চোখভরা জল নিয়ে সামনে এগিয়ে এল।
কাঁদতে কাঁদতেই বলল, আমিও বলে দিচ্ছি…
আমি রেদোয়ান ভাইয়া ছাড়া কাউকে বিয়ে করব না। আর উনার কোনো দোষ নেই। আমিই সবসময় উনার পেছনে ঘুরতাম পাগলামি করতাম প্লিজ…

তোমরা উনাকে ভুল বোঝো না।কিন্তু কেউ তার কথাও শুনল না।রাগে উন্মত্ত হয়ে উঠল রেদোয়ান।
টেবিলের ওপর রাখা ফুলদানি মাটিতে ছুড়ে ভেঙে ফেলল।একের পর এক জিনিস ভাঙতে ভাঙতে শেষবার বলল ঠিক চার দিন সময় দিলাম।
চার দিন পর… আমার পিহুকে আমার চাই।
বলে দিলাম!কথাটা শেষ করেই ঝড়ের বেগে ভিলা থেকে বেরিয়ে গেল রেদোয়ান চলে যেতেই হঠাৎ…
লিখন চৌধুরীর ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।তার সঙ্গে হাসলেন রাতিব চৌধুরী, রেশমা চৌধুরী, নুসরাত, সাবিহা, ইনায়া…
কারণ পিয়াসা, রেদোয়ান আর তিয়া ছাড়া এই বাড়ির সবাই জানে যে বিয়ের এত আয়োজন চলছে সেটা আসলে রোহিত খানের সঙ্গে নয় রেদোয়ান আর পিয়াসার বিয়ের জন্যই।

ফ্ল্যাশব্যাক
ইউভি ধীরে ধীরে লিখন চৌধুরীর সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে-মুখে আজ অদ্ভুত এক গাম্ভীর্য।
খুব শান্ত কণ্ঠে বললো বাবা… তোমার কাছে আজ আমার একটা আবদার আছে।লিখন চৌধুরী ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, তুই কোনোদিন কিছু চাসনি, ইউভি। আজ যখন চেয়েছিস, আগে বল… কী চাই?
ইউভি গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বললো বাবা… আমার বোন পিয়াসাকে রেদোয়ানের হাতেই তুলে দাও।কথাটা শুনে লিখন চৌধুরী নিস্তব্ধ হয়ে গেল।ইউভি আবার বলতে শুরু করল, বাবা, আমি রেদোয়ানকে ছোটবেলা থেকে দেখছি। ও শুধু আমার ভাই নয়, একজন দায়িত্বশীল মানুষ, একজন আদর্শ ছেলে। পরিবারের প্রতি তার শ্রদ্ধা, বড়দের প্রতি সম্মান, ছোটদের প্রতি মমতা সবকিছুই আমাকে বারবার মুগ্ধ করেছে। ও নিজের সুখের আগে পরিবারের সুখকে গুরুত্ব দেয়। নিজের কষ্ট বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখে সবাইকে হাসাতে জানে। মানুষের পাশে দাঁড়াতে জানে। নিজের ভালোবাসার মানুষকে সম্মান করতে জানে।
আর সবচেয়ে বড় কথা… ও পিয়াসাকে শুধু ভালোবাসে না, বড্ড বেশি ভালোবাসে আমি ওর চোখে সেই ভালোবাসা দেখেছি বাবা।

একটু থেমে ইউভির কণ্ঠ আরও ভারী হয়ে উঠল।
বাবা… আমার বিশ্বাস, এই পৃথিবীতে যদি কেউ আমার বোনকে সত্যিকারের সুখে রাখতে পারে, তাহলে সে একমাত্র রেদোয়ান।ইউভি ধীরে ধীরে লিখন চৌধুরীর আরও কাছে এসে বললো তোমার থেকে এটাই… এটাই আমার জীবনের শেষ চাওয়া। প্লিজ, বাবা আমার এই আবদারটা রেখো।
আমার বোনুকে এমন একজন মানুষের হাতে তুলে দাও, যে ওকে সারাজীবন নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসবে।
আমি নিশ্চিত… রেদোয়ানের চেয়ে যোগ্য মানুষ পিয়াসার জন্য আর কেউ হতে পারে না
সব কথা শোনার পর রাতিব চৌধুরী মুচকি হেসে বললেন, আমি অনেক আগেই বুঝে গেছি…
আমার মেয়েটা রেদোয়ানকে কতটা ভালোবাসে।
আর রেদোয়ানের চোখে আমি সেই ভালোবাসাও দেখেছি। তবে এরা দুজন লুকিয়ে এনগেজমেন্ট করে ফেলেছে। তার শাস্তিটা তো ওদের পেতেই হবে, তাই না ইউভি?বাবা-ছেলের চোখাচোখি হতেই দুজনের মুখেই রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।

বর্তমান…
ভোরের প্রথম সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে বিশাল চৌধুরী ভিলাজুড়ে। চারদিকে যেন এক রাজকীয় উৎসবের আবহ।
মাঝে কেটে গেছে চারটা দিন
এই চার দিনে পুরো চৌধুরী ভিলা যেন রাজপ্রাসাদে পরিণত হয়েছে।ইউভি নিজের একমাত্র বোনের বিয়েতে কোনো কমতি রাখেনি।কিন্তু…
এই চার দিন পিয়াসার জন্য ছিল সবচেয়ে কঠিন।
সে বহুবার ইউভির সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছে।
লিখন চৌধুরীর কাছেও গেছে।কিন্তু প্রত্যেকবার একই উত্তর—পরে কথা হবে।পিয়াসা ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছে না।কারও সঙ্গে কথা বলছে না।এমনকি ইনায়ার সঙ্গেও না।নিজের সবচেয়ে আপন মানুষগুলোর প্রতিই আজ তার সবচেয়ে বেশি অভিমান।অন্যদিকে রেদোয়ান রাগ করে চট্টগ্রাম চলে গেলেও…এক সেকেন্ডের জন্যও শান্ত থাকতে পারেনি।আর পিয়াসাও একবারের জন্য তাকে ফোন করেনি।
আজ থেকে শুরু হচ্ছে পিয়াসার মেহেদির অনুষ্ঠান।

ভোর থেকেই পুরো ভিলা কর্মচাঞ্চল্যে মুখর। বিশাল লনে ডেকোরেটররা শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জায় ব্যস্ত। কোথাও রঙিন ফুলের তোরণ তৈরি হচ্ছে, কোথাও ঝাড়বাতি ঝুলছে, আবার কোথাও রাজকীয় ব্যাকড্রপে শেষবারের মতো হাতের ছোঁয়া দিচ্ছে শিল্পীরা।একদল স্টাফ পুরো ভিলাজুড়ে সাদা, নীল আর গোল্ডেন অর্কিড, বেলি, গোলাপ আর রাজনীগন্ধা দিয়ে সাজিয়ে তুলছে প্রতিটি কোণ।
ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল রাতিব চৌধুরী।
ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে সবকিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন লিখন চৌধুরী।রাতিব এগিয়ে এসে মুচকি হেসে বললেন, ভাইয়া… ওদিকের সব কাজ শেষ। মেহেদির জন্য দুটো আলাদা স্টেজ, আলাদা ফটো কর্নার, আলাদা সিটিং এরিয়া… সবকিছু ডাবল করে করা হয়েছে।লিখন চৌধুরীর ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। ভালো খুব ভালো।
তারপর একটু নিচু স্বরে বললেন,শুধু একটা জিনিস খেয়াল রাখো… ইউভি যেন কোনো কিছু ঠিক না পায়।রাতিব চৌধুরী হেসে বললেন,সেটা নিয়ে চিন্তা করবেন না, ভাইয়া। এতদিন শুধু ছেলেমেয়েরাই আমাদের সারপ্রাইজ দিয়েছে। এবার না হয় আমরা বড়রাও ওদের একটু সারপ্রাইজ দিই।
দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ফেললেন তাদের সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল আরও একটি গোপন পরিকল্পনা…

সকাল গড়াতেই একে একে আত্মীয়স্বজন আসতে শুরু করলেন।মুহূর্তের মধ্যেই পুরো চৌধুরী ভিলা ভরে উঠল কোলাহলে।ছোট ছোট বাচ্চারা পুরো বাড়ি দৌড়ে বেড়াচ্ছে।আয়াত, আতিকা আর ছোট্ট রিদ হাসতে হাসতে একে অপরকে তাড়া করছে।
কখনো ফুল নিয়ে খেলছে, কখনো আবার বেলুন নিয়ে পুরো লন মাথায় তুলছে।ঠিক তখনই মূল গেটের সামনে এসে থামল আরেকটি গাড়ি।
গাড়ি থেকে নেমে এল রিমঝিম চৌধুরী আর রাদেশ মির্জা।অসুস্থতার কারণে আগেই আসতে পারেনি রিমঝিম।আজ অনেকটাই সুস্থ হয়ে সোজা চলে এসেছে পরিবারের এই আনন্দে যোগ দিতে।বাড়ির সবাই তাকে দেখে খুশি হয়ে এগিয়ে গেল।রিমঝিমও সবার সঙ্গে হাসিমুখে কুশল বিনিময় করল।
যদিও তার চোখেমুখে একটা দুষ্টু হাসি স্পষ্ট…কারণ সে ও পুরো পরিকল্পনার কথা আগে থেকেই জানে।
এদিকে ইউভি দ্রুত নিচে নেমে এলো।
লিখন চৌধুরী তাকে দেখেই বললেন,
ইউভি জি, বাবা?ওদিকের কী খবর? পাগলটা আর কতক্ষণে পৌঁছাবে?ইউভি মোবাইলের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,আর মাত্র চল্লিশ মিনিট।
চিন্তা করবেন না। ওর সঙ্গে বডিগার্ডের পুরো টিম আছে।লিখন চৌধুরী মাথা নেড়ে বললেন,

— ঠিক আছে।
এরপর ইউভি ধীরে ধীরে পিয়াসার রুমের সামনে এসে দাঁড়াল।দরজা খুলতেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।এখনও বিছানার এক কোণে বসে কান্না করছে পিয়াসা।চারপাশে দেশের সেরা মেকআপ আর্টিস্ট, ফ্যাশন ডিজাইনার, হেয়ার স্টাইলিস্ট দাঁড়িয়ে আছে।কিন্তু কেউই তাকে প্রস্তুত করাতে পারছে না।কারো।কথা শুনছে না।একটু দূরে বসে আছে ইনায়া আর তুবা।ইনায়ার চোখ দুটোও লাল হয়ে আছে।নিজের প্রিয় বান্ধবীর কষ্ট সে সহ্য করতে পারছে না।ইউভি কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল।তারপর নিজের কষ্ট বুকের ভেতর লুকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, সবাই শুনুন…
ঠিক ত্রিশ মিনিট পরে অনুষ্ঠান শুরু হবে।আপনারা দ্রুত বোনু কে রেডি করুন।এরপর ধীরে ধীরে পিয়াসার দিকে তাকাল।
বোনু ত্রিশ মিনিট।আমি চাই তুই ঠিক ত্রিশ মিনিট পরে ছাদে আসবি।পিয়াসা কাঁপা গলায় শুধু একবার বলল,ভাইয়া কিন্তু ইউভি আর পেছনে তাকাল না।দরজার কাছে গিয়ে থেমে শুধু বলল, জাস্ট… থার্টি মিনিট।তারপর বেরিয়ে যেতে লাগল।
পেছন থেকে পিয়াসার ভাঙা কণ্ঠ ভেসে এলো,

ঠিক আছে, ভাইয়া তোমাদের সবার জেদের কাছে আজ নিজেকে সঁপে দিলাম। তবে আজকের পর থেকে আমি বিশ্বাস করব আমার আপন মানুষ বলে আর কেউ নেই কেউ না কথাগুলো শুনে ইনায়ার বুক কেঁপে উঠল।তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
ঠিক তখনই কয়েকজন ডিজাইনার ভেতরে ঢুকল।
তাদের হাতে দুটি একদম একই রকম রাজকীয় লেহেঙ্গা।একটি ইনায়ার জন্য।আরেকটি পিয়াসার জন্য।ইনায়া অবাক হয়ে বলল, না… আমার মেহেদির লেহেঙ্গা তো এটা না। আমার হাজব্যান্ড আমার জন্য অন্য একটা গিফট করেছে।একজন ডিজাইনার সম্মানের সঙ্গে বললেন,
ম্যাম… এটা লিখন চৌধুরী স্যারের নির্দেশ।
তিনি বলেছেন, আপনাদের দুজনের পোশাক একই হবে। কারণ তার চোখে আপনারা দুজনই সমান।কথাটা শেষ হতেই পিয়াসা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল প্লিজ… স্টপ! সবার কাছে শুধু ইনায়া ইনায়া। আমি কেউ না! আমার কোনো অনুভূতির দাম নেই! আমার ভালোবাসারও কোনো মূল্য নেই!কথাগুলো শুনে ইনায়া যেন ভেতর থেকে ভেঙে পড়ল।সে নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করল।তুবা সঙ্গে সঙ্গে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আর একটু ধৈর্য ধর বেবি।
আর একটু পরেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

এখন কষ্ট পাস না।তারপর ডিজাইনারদের দিকে তাকিয়ে বলল, প্লিজ… ওদের রেডি করুন।
আমরাও প্রস্তুত হচ্ছি।
এদিকে সন্ধ্যা নামার আগেই পুরো ছাদটা যেন রূপকথার রাজ্যে পরিণত হলো।বিশাল ছাদের চারদিকে ঝুলছে হাজারো ফেয়ারি লাইট।
মাঝখানে গোল্ডেন আর রয়্যাল ব্লু রঙের বিশাল মেহেদি স্টেজ।স্টেজের চারপাশে সাদা গোলাপ, বেলি ফুল, অর্কিড আর রাজনীগন্ধার অপূর্ব সাজ।
ঝুলন্ত ফুলের ছাউনি বাতাসে দুলছে।চারদিকে সুগন্ধি মোমবাতির আলো।এক পাশে লাইভ মিউজিক ব্যান্ড প্রস্তুত।অন্য পাশে আর শেহনাইয়ের শিল্পীরা বসে আছেন।মনে হচ্ছে কোনো রাজপ্রাসাদের উৎসব চলছে।
ওদিকে লিখন চৌধুরী আলাদা করে ছেলেদের ফ্যাশন ডিজাইনারদেরও ডেকে পাঠালেন।
তার হাতে দুটি একই ডিজাইনের রাজকীয় শেরওয়ানি তুলে দিয়ে বললেন, এটা ইউভির জন্য…
আর এটা রেদোয়ানের জন্য। দুজনকে আজ একই রকম দেখতে চাই।ডিজাইনাররা সম্মান জানিয়ে মাথা নেড়ে চলে গেলেন।আর দূরে দাঁড়িয়ে লিখন চৌধুরী ও রাতিব চৌধুরী একে অপরের দিকে তাকিয়ে আবারও রহস্যময় এক হাসি হাসলেন…

নিজের রুমে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো ওড়নাটা ঠিক করছিল ইনায়া।আজ তার পরনে গাঢ় সবুজ রঙের ভারী এমব্রয়ডারি করা রাজকীয় লেহেঙ্গা। সোনালি জরির নিখুঁত কাজ যেন পুরো পোশাকটাকে আরও অভিজাত করে তুলেছে। খোলা চুলের অর্ধেকটা সুন্দর করে সেট করা, বাকি অংশ কোমর ছুঁয়ে নেমে এসেছে। চোখে গাঢ় কাজল, ঠোঁটে হালকা গোলাপি আভা আর কপালে ছোট্ট সবুজ পাথরের টিপ।আজ মেয়েটাকে যেন সত্যিই রাজকন্যার মতো লাগছে।কিন্তু তার থেকেও বেশি সুন্দর ছিল তার মুখের হাসিটা।
আজ সে ভীষণ খুশি।আর মাত্র কিছুক্ষণের মধ্যেই সব সত্যিটা সামনে চলে আসবে।
ইউভি কথা দিয়েছে আজ মেহেদির দিনেই সব রহস্যের পর্দা সরিয়ে দেবে।ভাবতেই অজান্তেই ইনায়ার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।
ঠিক তখনই নিঃশব্দে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল ইউভি।সে অনেকক্ষণ ধরেই দাঁড়িয়ে ইনায়াকে দেখছিল।কিন্তু মেয়েটা নিজের ভাবনায় এতটাই ডুবে ছিল যে ইউভির আসার টেরই পেল না।
ধীরে ধীরে পেছন থেকে এগিয়ে এসে ইউভি দু’হাতে ইনায়ার কোমর জড়িয়ে ধরল।পরম মমতায় মুখ গুঁজে দিল তার ঘাড়ে।গভীর শ্বাস নিয়ে চোখ বন্ধ করে বলল, উফফ…

— এই মিষ্টি ঘ্রান টা আমার সবচেয়ে প্রিয়…
একদম আমার বউয়ের মতো মিষ্টি ইনায়া মৃদু হেসে চোখ বন্ধ করল।প্রিয় মানুষের স্পর্শ সে মুহূর্তেই চিনে ফেলেছে।নরম গলায় বলল, কখন এসেছেন?
ইউভি উত্তর না দিয়ে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।ফিসফিস করে বলল, ডিস্টার্ব করো না, বউ…
অনেকক্ষণ একটু এভাবেই থাকতে দাও..কয়েক মুহূর্ত পুরো রুমটা নিস্তব্ধ হয়ে রইল।শুধু দুজন মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে তারপর ইউভি ধীরে ধীরে মুখ তুলে বলল, আচ্ছা…
— এবার আমার দিকে তাকাও তো…
ইনায়া ঘুরে দাঁড়াতেই ইউভি যেন একেবারে স্থির হয়ে গেল।তার চোখের পলক পড়ছে না।
অপলক তাকিয়ে রইল নিজের স্ত্রীর দিকে।
তারপর খুব আস্তে বলল, মাশাআল্লাহ… বউ…

— এত সুন্দর লাগতে হয় না যানো না ?
তোমার কোনো ধারণা আছে তুমি এখন আমাকে কী অবস্থায় নিয়ে এসেছ?ইউভি ধীরে ধীরে এক পা এগোতেই ইনায়া এক পা পিছিয়ে গেল। ইউভি একি ভাবে এগোল ইনায়া ও পিছোতে লাগলো এভাবে পিছোতে পিছোতে একসময় দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেল তার।ইনায়া চোখ বড় বড় করে বলল,
এই এত টেনশন, এত দুশ্চিন্তার মধ্যেও আপনার রোমান্স কমে না, মিস্টার ইউভি ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,দোষটা কিন্তু পুরোপুরি তোমার।
এত সুন্দর হওয়ার কী দরকার ছিল?
তার ওপর আবার চোখে কাজল দিয়েছ!
আমাকে পাগল বানানোর জন্য আর কিছু বাকি রেখেছ?কথাগুলো বলতে বলতেই ইউভি আবার ধীরে ধীরে তার দিকে ঝুঁকে এল।ঠিক তখনই…
ইনায়া নিজের ওড়নার আঁচল তুলে আলতো করে ইউভির মুখ ঢেকে দিল।ইউভি কিছু বুঝে ওঠার আগেই…ইনায়া ওড়নার আড়াল থেকেই নিজের কপালটা ইউভির কপালে ঠেকিয়ে দিল।খুব নরম কণ্ঠে বলল, আমার বেবিটাকে আর কষ্ট দেবেন না প্লিজ আজই সব বলে দিন।

—ওর কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না আমি…
ইউভি মুহূর্তেই তাকে টেনে নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিল।হালকা হেসে বলল, আর মাত্র একটু অপেক্ষা করো উপরে গেলেই সব বুঝতে পারবে।
আজকের রাতটার পর আর কোনো লুকোচুরি থাকবে না। ইনায়া যখনি যেতে যাবে…ঠিক তখনই আবার ইউভি তার কোমর জড়িয়ে ধরল।
কোথায় যাচ্ছ?
ইনায়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,
বড় মা! আমি তো উপরে যাচ্ছিলাম।
আপনি এসেছেন বলেই আটকে গেলো
এই কথাটা শুনেই ইউভি সঙ্গে সঙ্গে তাকে ছেড়ে দিল।ইনায়া আর নিজেকে সামলাতে না পেরে খিলখিল করে হেসে উঠল।দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল, বাই, মিস্টার ইউভি হেসে মাথা নাড়ল।
তারপর দুষ্টু গলায় বলল, যাও…
কিন্তু মনে রেখো, বেয়াদব বউ আজকের অনুষ্ঠান শেষ হোক তারপর তোমার জন্য অ্যালোভেরা রেডি করে রাখছি। তখন দেখব কোথায় পালাও!

এদিকে ছাদের মেহেদি অনুষ্ঠানে একে একে সবাই জড়ো হতে শুরু করেছে
ডিজে ইতোমধ্যেই হালকা সুরে বিয়ের গান বাজাতে শুরু করেছে।চারপাশে অতিথিদের হাসি, গল্প আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশে মুখর পুরো পরিবেশ।
ঠিক তখনই.পিয়াসা কে নিয়ে স্টেজে আসা হলো।
একজন পিয়াসা। সাথে ইনায়া ও আছে দুজনের পরনেই একদম একই ডিজাইনের রাজকীয় মেহেদির লেহেঙ্গা।একই গয়না একই সাজ…দুজনকে পাশাপাশি দেখে উপস্থিত সবাই কয়েক মুহূর্তের জন্য মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
— যেন দুই রাজকন্যা। দুজনকেই চোখ সরিয়ে দেখা যাচ্ছে না।পুরো পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য আলাদা আলাদা মেহেদি আর্টিস্ট রাখা হয়েছে।
রানি, সাম্মি, তুবা, ইনায়া—সবাই একপাশে বসেছে।
কিন্তু পিয়াসার পাশে বসে আছে শুধু তিয়া আর কয়েকজন মেহেদি আর্টিস্ট।পিয়াসার মনটা অস্থির।কেন জানি বারবার মনে হচ্ছে রেদোয়ান কিছু একটা করবে।সে এই বিয়ে হতে দেবে না।
আবার চারপাশে নিজের আপন মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে আরও অবাক হচ্ছে।আমি এত কষ্ট পাচ্ছি তবুও সবাই এত খুশি কীভাবে?”

সে ধীরে ধীরে ইনায়া আর তুবার দিকে তাকাল।
মনে মনে বলল তোরা দুজনও আমাকে বুঝলি না. ঠিক তখনই তিয়া ধীরে ধীরে পিয়াসার পাশে এসে বসল।চারপাশে একবার তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল দেখছিস?এই বাড়িতে তোর আর আমার কোনো মূল্যই নেই।সবাই শুধু ইনায়া… ইনায়া…
ও যা চাইবে, তাই হবে।ওর জন্য আলাদা আয়োজন ওর জন্য আলাদা ভালোবাসা আর আমরা? আমরা শুধু নামেই এই পরিবারের মেয়ে।
তুই কাঁদছিস কেউ দেখছে?
না। সবাই শুধু অনুষ্ঠানে ব্যস্ত।ভাবিস না পিয়াসা…

এই বাড়িতে তোকে কেউ বুঝবে না।তিয়ার প্রতিটা কথাই বিষের মতো ঢুকে যেতে লাগল পিয়াসার মনে।সে কিছু বলল না।শুধু চুপচাপ বসে রইল।
লকিন্তু ভেতরে ভেতরে তার অভিমানটা আরও বেড়ে গেল।
ঠিক তখনই রেশমা চৌধুরী এগিয়ে এসে মৃদু হেসে বললেন, আচ্ছা, শুরু করা যাক। সবাইকে মেহেদি পরানো শুরু করুন।এক এক করে সবাই নিজের নিজের জায়গায় বসে পড়ল।মেহেদির শিল্পীরা কাজ শুরু করে দিলেন।কারণ আর কিছুক্ষণ পরেই শুরু হবে নাচ আর গানের আসর।
অন্যদিকে ভিলার কর্তা ব্যক্তিরা এক পাশে বসে গল্পে মেতে উঠেছেন। রফিকুল এহসান( তুবার বাবা) রাশেদ মির্জা, রাতিব চৌধুরী, লিখন চৌধুরী—সবার আড্ডায় জমে উঠেছে পরিবেশ।এদিকে নাতাশা এহসানও চৌধুরী পরিবারের গিন্নিদের সঙ্গে বসে মেহেদি পরছেন।হাসি, গল্প আর আনন্দে চারপাশ ভরে উঠেছে।
কিন্তু এই পুরো অনুষ্ঠানে একজনেরই দেখা নেই।
ইউভি।
ঠিক সেই সময়…

ভিলার নিচতলা থেকে হঠাৎ ভাঙচুরের শব্দ ভেসে এলো।কাঁচ ভাঙার তীব্র আওয়াজে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল।সবাই এক মুহূর্তের জন্য চমকে উঠল।
ইউভি সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠছিল।শব্দটা শুনেও একবারও পেছনে তাকাল না।তার ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।সে যেন এই শব্দটার অপেক্ষাতেই ছিল।সোজা ছাদের দিকে হাঁটতে লাগল।
ওদিকে…
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে রেদোয়ান।চোখ দুটো রক্তলাল।মনে একটাই কথাই বললো আজ আমার বউকে আমি নিয়ে যাব।এই চৌধুরী পরিবারের কাউকে আমার দরকার নেই।
তাদের সম্পত্তিরও দরকার নেই।আল্লাহর রহমতে আমার যা আছে আমার আগামী পাঁচ পুরুষ বসে খেলেও শেষ হবে না!”
এদিকে একজন মেহেদি আর্টিস্ট হেসে পিয়াসাকে জিজ্ঞেস করল, ম্যাম বরের নামটা বলবেন?
পিয়াসা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর হঠাৎই বুক ভেঙে কান্না বেরিয়ে এলো।
কাঁপা কণ্ঠে বললো

— জানি না…
চারপাশে মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এলো।
মেহেদি আর্টিস্ট আবার বলল,তাহলে…
কে জানে?
ঠিক সেই মুহূর্তেই পেছন থেকে ভেসে এলো এক দৃঢ়, ভারী পুরুষালি কণ্ঠ মাহতিব রেদোয়ান চৌধুরী।
সবাই একসাথে ঘুরে তাকাল।সেই কণ্ঠ আবার ধীর অথচ স্পষ্ট স্বরে বলল,

শেহেজাদার আদর পর্ব ৫৯

পিয়াসা জান্নাত চৌধুরীর স্বামীর নাম—মাহতিব রেদোয়ান চৌধুরী।ইউভি ঠোঁটের কোণে রহস্যময় এক চিলতে হাসি টেনে ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে এলো।তারপর মেহেদি আর্টিস্টের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,এত বড় করে লেখার দরকার নেই।ছোট করেই লিখুন
— “রেদোয়ান।”

শেহেজাদার আদর পর্ব ৬১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here