অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৬
ফাহিমা ইসলাম
ভোরের প্রহর অনেক আগেই অতিক্রান্ত হয়েছে,
অথচ সিকদার বাড়ির অন্দরমহলে সময় যেন এখনো নিস্তব্ধতার এক অদৃশ্য শৃঙ্খলে বন্দি। দীর্ঘ দুটো দিনের পর অবশেষে চিকিৎসকদের কণ্ঠে উচ্চারিত একটি বাক্য পুরো পরিবারকে খানিকটা স্বস্তির নিশ্বাস নেওয়ার অবকাশ দিয়েছে। রৌদ্রিক এখন বিপদমুক্ত। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা মানুষটিকে আপাতত নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। জ্ঞান পুরোপুরি ফিরে না এলেও শারীরিক অবস্থা দ্রুত স্থিতিশীলতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সংবাদটি শোনার পর থেকে সিকদার বাড়ির প্রতিটি মানুষ গত দিনেট জমাট বাঁধা আতঙ্কের গহ্বর থেকে ধীরে ধীরে উপরে উঠতে শুরু করেছে। কিন্তু এইসবের মাঝে তূর্ণা অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পরেছে।
কালকে না করা স্বত্বেও সারাদিন হসপিটালে কাটিয়েছে, চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা শরীর এমনিতেই ছিল অতিমাত্রায় সংবেদনশীল। তার উপর অবিরাম মানসিক অভিঘাত, অনিদ্রা, অশ্রুসিক্ত প্রার্থনা আর নিয়মিত আহার-বিহারের সম্পূর্ণ অবহেলায় শরীরের প্রতিটি কোষ যেন বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। রক্তচাপ আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাওয়ায় সামান্য হাঁটলেই মাথা ঘুরে উঠছে, মুখের সমস্ত আভা বিলীন হয়ে অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে রূপ নিয়েছে। চোখের নিচে গাঢ় কালচে ছাপ যেনো নির্ঘুম রাতের ইতিহাস বহন করছে। সুস্থ হয়ে পরায় একপ্রকার জোর করেই বাড়িতে পাঠানো হয়েছে, প্রথমে শুনতে না চাইলে জবা সিকদারের ব’কা খেয়ে তার সঙ্গে বাড়ি ফিরেছে। সেই থেকে শয্যাশায়ী হয়ে আছে সে।
বিছানার মাথায় হেলান দিয়ে বসে আছে তূর্ণা। এক হাত আপন উদরের ওপর নিবিড়ভাবে স্থির। অদৃশ্য সেই ছোট্ট প্রাণটির অস্তিত্ব অনুভব করার চেষ্টা করছে বারবার। মাতৃত্বের অনুভব আজ তার সমস্ত দুর্বলতাকে ছাপিয়ে এক অদ্ভুত দায়িত্ববোধে রূপ নিয়েছে। হালকা মাত্রায় ফুলে ওঠা উদরটার উপর ক্ষুদ্র এক আদুরে হাতের অস্তিত্ব বিচরণ করছে। রোদেলাকে একা ওইভাবে রেখে যাওয়ায় বাচ্চাটা সারাদিন কেঁদেকুটে পার করেছে। আসার পর রোদেলা রাগ করে গাল গাল ফুলিয়ে চোখ-মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে। একেই গত কাল থেকে রৌদ্রিকের দেখা মিলেনি, অবুঝ মনটা এতকিছু না বুঝলেও বাবার শূন্যতা খুব ভালো করে বুঝতে পারছে। রোদেলা হওয়ার পর রৌদ্রিক একরাতের জন্য বাহিরে থাকেনি, যত ব্যস্ততাই থাকনা কেনো, যত রাতই হোকটা কেনো বাড়িতে সে ফিরেছে। বাড়িতে ফিরেই ফ্রেশ হয়ে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে সময় কাটিয়েছে। সেখানে সে তার পাপাকে দেখে গোটা একটা দিনেরও বেশি হয়ে গেছে।
তারউপর সে ঘুম থেকে ওঠার পর রৌদ্রিক কিংবা তূর্ণা কাউকেই না পাওয়া বড্ড অভিমান করেছে। কেঁদে পার করেছে পুরোটা সময়, কোনো রকমে থামলেও একটু পর আবারও পাপা আর মায়ের কাছে যাওয়ার বায়না ধরেছে। তূর্ণা বাড়ির ফেরার পর রোদেলাকে কত করে কাছে ডেকেছে, কিন্তু বাচ্চাটা অভিমানে কাছেও আসে নি। দূর থেকে অশ্রুসজল চোখে অভিযোগ জানিয়েছে, তূর্ণা বহু কষ্টে মানিয়েছে, এখন তার সঙ্গে মিশে ঘুমের দেশে পারি জমিয়েছে। তূর্ণা আর এক হাত রোদেলার মসৃণ চুলের ভাজে, হালকা করে বিলি কেটে দিচ্ছে। রৌদ্রিকের হালকা সুস্থতা তার কাছে অনেক বড় কিছু। আল্লাহ কাছে দোয়া করছে যাতে জলদি রৌদ্রিকে ঠিক করে দেয়। এর মাঝেই ঠিক তখনই কক্ষের দরজাটি ধীর শব্দে উন্মুক্ত হলো। হাতে ধোঁয়া ওঠা দুধের গ্লাস আর ওষুধের ট্রে নিয়ে প্রবেশ করলেন জবা সিকদার।
নারীটি কঠোর ব্যক্তিত্বের আবরণেই নিজেকে মুড়ে রেখেছেন। অনুভূতি প্রকাশকে তিনি বরাবরই দুর্বলতার প্রতিশব্দ বলে মনে করেন। অথচ আজ তার কঠিন মুখাবয়বের ভাঁজে ভাঁজে জমাট বেঁধে আছে এমন এক উৎকণ্ঠা, যা তিনি শত চেষ্টা করেও গোপন রাখতে পারছেন না। রৌদ্রিক আর জবা সিকদারের স্বভাব প্রায় একই, দু’জনই কোনো ভাবে নিজেদের অনুভূতিগুলোকে প্রকাশ করতে চায় না। জবা সিকদার
ট্রেটা টেবিলে নামিয়ে ভ্রূ কুঁচকে বললেন-
“এত বড় মেয়ে হয়েছো, তবু নিজের শরীরের কোনো মূল্য নেই? ডাক্তার কি বলেনি অতিরিক্ত মানসিক চাপ নিলে বাচ্চারও ক্ষতি হতে পারে?”
কণ্ঠস্বর যথারীতি কঠিন। কিন্তু শেষ বাক্যটির ক্ষীণ কম্পন সহজেই বলে দিচ্ছে, এই ধমকের অন্তরালে জমা রয়েছে নিখাদ উদ্বেগ। তূর্ণা মৃদু হাসার ব্যর্থ চেষ্টা করল।
“আমি ঠিক আছি, মা..!!”
“মিথ্যে বলবে না আমার সামনে।”
জবা সিকদার এবার একপ্রকার ধমকেই থামিয়ে দিলেন।
“আয়নায় নিজের চেহারা দেখেছো? হাড়ে-চামড়ায় একাকার হয়ে গেছে একদিনেই। রৌদ্রিক সুস্থ হয়ে ফিরে এসে যদি তোমাকে এই অবস্থায় দেখে, প্রথমে আমাকেই দোষারোপ করবে।”
বাক্যটি শেষ করেই তিনি ধীরে ধীরে তূর্ণার কপালে হাত রাখলেন। স্পর্শটা ছিল অবিশ্বাস্যরকম কোমল। মুহূর্তের জন্য তূর্ণা বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল। এই স্পর্শে আদেশ ছিল না, ছিল না কর্তৃত্বের কঠোরতা; ছিল এক মায়ের নিঃশব্দ স্নেহ, যা তিনি কখনো ভাষায় প্রকাশ করেন না। না কোনোদিন সরাসরি তার গায়ে হাত রেখেছে এইভাবে। জবা সিকদার নিজ হাতে দুধের গ্লাসটি এগিয়ে দিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন-
“সব কষ্ট একা বহন করতে নেই, মা। এখন থেকে শুধু তুমি নও… তোমাদের দু’জনের দায়িত্ব আমাদেরও। আগে এটা শেষ কর। তারপর ওষুধ খাবে। কোনো অবহেলা আমি সহ্য করব না।”
‘মা’ সম্বোধনটি কানে পৌঁছাতেই তূর্ণার বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত আবেগ হঠাৎ করেই আলোড়িত হয়ে উঠল। এই প্রথম হয়তো জবা সিকদার এইভাবে মা সম্মোধন করলো তাকে। এতদিনে খুব ভালো করে বুঝেছে, কিছু মানুষ ভালোবাসে খুব নিঃশব্দে। তারা মুখে স্নেহের ভাষা জানে না, কিন্তু যত্নের প্রতিটি আচরণে নিজের সমস্ত মমতা নিঃশেষ করে দেয়। তূর্ণা নিঃশব্দে গ্লাসটা হাতে তুলে নিল। এরমাঝেই রোদেলাও নড়েচড়ে উঠলো, কিছু সময় পর আড়মোড়া ভেঙে সে পিটপিট করে চোখ মেলো তাকালো। সদ্য ঘুম থেকে ওঠায় গাল-গুল আরও ফুলে উঠেছে, নরম, ফর্সা ত্বকটা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। রোদেলা আরও মায়ের কোল ঘেঁষে মিশিয়ে গেলো। দু’হাত দিয়ে তূর্ণার উদর জড়িয়ে ধরে নিষ্পাপ হাসি দিয়ে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল-
“মা, আমার বেবি ঘুমায়?”
অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে তূর্ণা আর জবা দু’জনেই একসঙ্গে হেসে উঠলেন। জবা সিকদার আলতো করে নাতনির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
“ঘুমায় না দিদিভাই, তোমার সব কথা শুনছে। মায়ের সঙ্গে চুপটি করে থাকো, মা অসুস্থ তো।”
রোদেলা সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মাথা নাড়ল। তারপর নিজের ছোট্ট তালু দিয়ে তূর্ণার উদরে আলতো চাপড় মেরে ফিসফিসিয়ে বলল-
“বেবি… মাম্মারে কাঁতাইও না। অসুত্ত তো, হ্যাঁ মাকে কত্ত দিও না।”
দুই দিন,
মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টা। সময়ের বিচারে সংখ্যাটি সামান্য হলেও, অপেক্ষার অভিধানে এই দুই দিন যেন দুটি অনন্ত যুগের সমার্থক হয়ে উঠেছে। জন্মের পর থেকে একটি রাতও তার পাপাকে ছাড়া কাটানোর অভিজ্ঞতা নেই রোদেলার। প্রতিটি সকাল শুরু হতো রৌদ্রিকের বুকের ওপর উঠে বসে। প্রতিটি রাতে ঘুমিয়ে পড়ার আগে সেই মানুষটার কণ্ঠে গল্প না শুনলে চোখে ঘুমই নামত না তার। বর আজ একটানা দুই দিন ধরে সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর নেই। নেই শক্ত দুটো বাহুর নিরাপদ আশ্রয়। নেই তার ছোট ছোট আবদারের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারা মানুষটার হাসিমাখা মুখ। তার ছোট্ট মস্তিষ্ক এখনো জানে না হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কক্ষ কাকে বলে। জানে না দুর্ঘটনা কী ভয়ংকর বাস্তবতার নাম। সে শুধু জানে রৌদ্রিক যাওয়ার আগে তাকে কোলে নিয়ে বলেছিল-
“আমার রোদপাখি রেডি থেকো। পাপা
ফিরে এসে আমরা অনেক মজা করব, অনেক আইসক্রিম খাব।”
শিশুরা প্রতিশ্রুতির ব্যাখ্যা বোঝে না, তারা শুধু অপেক্ষা করতে জানে। আর এই অপেক্ষাই আজ রোদেলার সমস্ত ধৈর্য ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কান্নায় হাঁপিয়ে উঠেছে সে।
“আমল পাপা কই…? আমি পাপার কাছে যাবু.. এখনই যাবু..!”
সকাল থেকেই রোদেলার ছোট্ট মনটা আর মানতে পারছে না তার পাপার অনুপস্থিতি। সে ভেবেছিলো আজকে হয়তো সকালে ঘুম ভাঙার পর তার পাপা আবারও তাকে কোলে নিবে। পাপার পেটের উপর উঠে সে দুষ্টুমি করবে রোজকার মতো। কিন্তু এমন কিছুই হয়নি, তূর্ণাও শুধু নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিয়েছে। রোদেলার কান্না থামানোর চেষ্টা করছে সবাই কিন্তু রোদেলার থামার নাম নেই। তার প্রিয় টেডি বিয়ার এগিয়ে দিতেই সে নিজের ছোট্ট টেডি বিয়ারটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে ফুঁপিয়ে উঠল-
“আমাল এগুলা লাগবে না… আমালপাপা লাগবো…!
শিশুকণ্ঠের সেই আর্তচিৎকার গোটা বাড়ির নিস্তব্ধতাকে বিদীর্ণ করে ছড়িয়ে পরেছে।
“ পুতুল মায়ের কাছে আসো, পাপা তো আমাদের গিফ্ট নিতে গেছে সোনা। চলে আসবে রোদেলার সব পছন্দের জিনিস নিয়ে।”
রোদেলাকে শান্ত করার জন্য এই কথা বললেও তূর্ণা নিজেও এই মিথ্যে বলে শান্তি পাচ্ছে না। নিজের অশ্রুগুলোকে আটকানোর চেষ্টা করছে সে। রোদেলা তূর্ণা দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে-
“ পাপা যাবু, পাপা! পাপা আতে না কেনু? পাপা যাবু।”
তূর্ণা এগিয়ে এসে রোদেলাকে কোলে বসিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে, কিন্তু অবুঝ শিশুর মনকে বোঝানো বড্ড দায়। যেখানে সে নিজেই বুঝতে চায়নি কারো কথা, সেখানে রোদেলা নিতান্তই বাচ্চা।
“ আসবে তো পাপা, পাপা কি তার রোদকে ছাড়া থাকতে পারে? রোদেলার যত কত সারপ্রাইজ করেছে পাপা। সেগুলো করেই পাপা তার রোদের কাছে আসবে।”
রোদেলা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলে-
” আতে না তো পাপা, তারপ্রাইজ লাগবে না তোদের। পাপা চাই!”
মাঝখানে বেশ কয়েনদিন কেটে গেছে, এই কয়েকদিনে রৌদ্রিকের অবস্থা আগের থেকে অনেকটা ভালো। তবে তার জ্ঞান এখনো ফেরেনি, মাথাশ আঘাতটা বেশি পাওয়ায় এখনো আইসিটিতে রাখা হয়েছে। রোদেলা রোজ কাঁদে তার পাপার জন্য, প্রায় আট দিনের মত হয়ে গেছে সে তার পাপার সঙ্গে দেখা করে না। শ্রাবণ হসপিটালে রয়েছে, তূর্ণা আর জবা সকাল থেকে দুপুর অব্দি গিয়ে রৌদ্রিকে দেখে আসে। তূর্ণা আজকে রোদেলাকেও সঙ্গে নিবে, মেয়েটা কিছুই খাচ্ছে না। সে যেমন রৌদ্রিকের অনুপস্থিতিতে নিজের খেয়াল রাখেনা তেমনি রোদেলাও এই কয়েকদিন ঠিক মত খাওয়া-দাওয়া করেনি। কোনোরকমে মুখে খালি হালকা খাবার তুলেছে। তূর্ণা রোদেলার চুল বেঁধে দিতে দিতে বলে-
“ পুতুল ওখানে গেলে কিন্ত কথা বলা যাবে না বেশি। আর না দুষ্টুমি করা যাবে। একদম মায়ের ভদ্র পুতুল হয়ে থাকবে,কেমন?”
” আমি তো গুত গাল, আমি কিতু করবো না।”
” এই তো আমার লক্ষীসোনা!”
হসপিটালের লম্বা করিডোর পেরিয়ে কাঙ্ক্ষিত কেবিনের সামনে দাঁড়াতেই তূর্ণা বড় একটা নিশ্বাস টেনে নিলো। আবারও নিজের হাতে বন্দি ছোট্ট রোদেলার নরম হাতখানির দিকে তাকালো। ভিতরে প্রবেশ মাত্রই রোদেলার চাতক পাখির মতো চঞ্চল নেত্রজোড়া আঁটকে গেলো, স্ট্রেচারে থাকা রৌদ্রিকের উপর। এর আগে রৌদ্রিকে এমন অবস্থায় দেখেনি রোদেলা তাই তার বোধগম্য হতে সময় লাগলো খানিকটা। কিছুখন পর বুঝতে পারতেই সে ছোট পায়ে দৌড়ে তার পাপার নিকট গেলো। স্ট্রেচারে তার থেকেও বড় হওয়ায় সে কোনো ভাবেই নাগাল পাচ্ছে না। তাই কোনো রকমে উঁচু হয়ে রৌদ্রিকের ক্যানুলা যুক্ত হাতখানা ধরার চেষ্টা করতে করতে ডেকে উঠে-
” পাপা! ও পাপা চোত খোল। আমায় তুমাল কাতে নাও! তোদেলা অনেত রাত করেছি। পাপা! ও পাপা!”
কিন্তু রৌদ্রিক জবাব দিলো না। রোদেলা রৌদ্রিকের জবাবের আশায় অপেক্ষায় নেই, এই কয়েকদিনে রৌদ্রিকের শূন্যতা থেকে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে তার ছোট্ট মনটা। তূর্ণা এগিয়ে এসে রোদেলাকে চেয়ারে বসিয়ে দেয়।
” না সোনা এমন করে না, পাপা একটু অসুস্থ তাই এখন কথা বলছে না। এমন করলে পাপার আরও কষ্ট হবে, রোদেলা কি চায় তার পাপা আরও কষ্ট পাক?”
“ পাপা কি হয়েতে? পাপার কুতায় কত্ত? পাপা বেতি ব্যতা পেয়েতে? পাপা চোত খুলে না কেনু?”
একসঙ্গে অনেক গুলো প্রশ্ন করে বসে রোদেলা। যার উত্তর তূর্ণার কাছে নেই, নিজের আবেগগুলোকে দমিয়ে নরম স্বরে বলে-
” পাপা অসুস্থ এট্টু, আল্লাহর কাছে বললে পাপা ঠিক হয়ে যাবে আবার। তুমি না পাপার কাছে আসতে চেয়েছো, আর বলেছিলাম কি বেশি কথা বলা যাবে না।”
রোদেলা নিষ্পলক চেয়ের রইলো তার পাপার দিকে। ভালো করে দেখতেই ছোট বাচ্চাটাও লক্ষ্য করলো তার পাপা ব্যথা পেয়েছে, কেমন হয়ে আছে। রোদেলা কেঁদে ফেললো ভুলে গেলো সব, চেয়ার পেরিয়ে স্ট্রেচারের উপর গিয়ে বসলো। ছোট্ট হাত দিয়ে রৌদ্রিকের ব্যান্ডেজ যুক্ত জায়গায় হাত দিয়ে কেঁদে ওঠে। তূর্ণা অসহায়বোধ করলো। রোদেলাকে কাঁদতে দেখে সে নিজেও বেশিক্ষণ কান্না দমিয়ে রাখতে পারবে না।
” বেতি ব্যতা কলে পাপা? কত্ত পেয়েতো কিভাবে? কত্ত হচ্ছে পাপার!”
বলেই তূর্ণার দিকে তাকায়। তূর্ণা নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলো তবে সে বিফল হলো সে। তার গাল গড়িয়ে অশ্রুবিন্দু টুপ করে ঝরে পরলো। রোদেলা রৌদ্রিকের গালে এগিয়ে গিয়ে ছোট ছোট চুমু দিতে থাকে। ছোট্ট শরীরটা রৌদ্রিকের মাথার কাছে গিয়ে বসে, তারপর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ক্রন্দনরত স্বরে বলে-
পাপা উতু পরো, তোদেলা আর চতলেক খাবে না। পাপার সব কতা শুনবে তোদ। উতু দেখো মা কাঁতে,দিদুও কাঁতে, আমিও কাঁতি! তুনি উতে পরো পাপা। তোদেলা সব ব্যতা দুর কলে দিবো। তোদেলা গুত গাল হয়ে যাবে একতম।”
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৫
রোদেলার এমন কথা শুনপ তূর্ণা চমকে ওঠে, এতটুকু বাচ্চা অথচ কত বড় বড় কথা বলছে। তূর্ণা কেঁদে গেলো নিঃশব্দে, রৌদ্রিক দেখলে নিশ্চয়ই ছিঁচকাঁদুনে বলতো তাদের। কিন্তু না মানুষটা চোখ মেলে তাকাচ্ছে না। রোদেলা ছোট্ট ছোট্ট চুমু দিচ্ছে রৌদ্রিকের কপালে। এ যেনো রৌদ্রিকের আর একটা মা। মায়েরা যেমন সন্তানকে আদর করে দেয় ঠিক তেমনি রোদেলাও তার পাপাকে আদর করে দিচ্ছে।
