Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৫

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৫

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৫
ফাহিমা ইসলাম

রাতটা যেন হঠাৎ করেই কেমন মৃত নক্ষত্রের জন্ম নিয়েছে মনে হচ্ছে। আকাশজুড়ে ঝুলে থাকা কৃষ্ণবর্ণ মেঘরাশি চাঁদের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ গ্রাস করে ফেলেছে কিছুখন আগেই। তাই লালচে চন্দ্রটা আর দেখা যাচ্ছে না। হাইওয়ের দীর্ঘ প্রসারিত পথজুড়ে ছড়িয়ে আছে ভাঙাচোরা কাঁচের টুকরো। সোডিয়াম বাতির হলদেটে আলোয় সেগুলোকে মনে হচ্ছে ছিন্নভিন্ন কোনো স্বপ্নের অবশিষ্টাংশ। রাস্তার মাঝ বরাবর উল্টোদিকে কাত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কালো রঙের বিলাসবহুল গাড়িটা। গাড়ির সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে এমন এক বিকৃত আকার ধারণ করেছে, যেন লোহার তৈরি কোনো হিংস্র জন্তু নিজের শরীর ছিঁড়ে ফেলেছে ক্রোধে বশে। আর সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে রৌদ্রিক। মাথার ডান পাশ বেয়ে অনবরত গড়িয়ে পড়ছে উষ্ণ র”ক্তধারা। সাদা শার্টের অর্ধেকটা ইতোমধ্যে লালচে রঙে সিক্ত হয়ে গেছে। নিঃশ্বাস চলছে ঠিকই, কিন্তু তা এতটাই ক্ষীণ যে বুকের ওঠানামা বোঝার জন্যও আলাদা করে লক্ষ্য করতে হয়। আঁধখোলা চোখদুটোতে জমে আছে অদ্ভুত এক শূন্যতা, যেন চেতনা আর অচেতনার মাঝামাঝি কোনো অন্ধকার করিডোরে আটকে পড়েছে সে।

চারপাশে মানুষের ভিড় জমেছে। সবাই এইদিকে এই আসচ্ছে, বিশাল ট্রাকের সঙ্গে এক্সিডেন হওয়ায় ট্রাকটাও অন্য পরে রয়েছে। কিন্তু রৌদ্রিকের গাড়ি এবং তার অবস্থা বেহাল! চারিদিকের মানুষ নানা কথা বলায় ব্যস্ত। একজন পুলিশকে ফোন করে ঘটনাস্থলে আসতে বলেছেন ইতিমধ্যে, আর একজন এম্বুলেন্সকে ফোন করে আসার জন্য বলেছে। একজন রৌদ্রিকের র”ক্তাক্ত হাতখানা ধরে পালস চেক্স করতে করতে বলে ওঠে-
“ভাই, পালস আছে! তাড়াতাড়ি ধরুন ওনাকে!”
কয়েকজন এগিয়ে এলো রৌদ্রিকে তুলতে। পিচঢালা রাস্তায় রৌদ্রিকের র’ক্তের স্রোত বসে গেছে, চারিদিকে র’ক্তের বন্যা বয়ে গেছে মনে হচ্ছে। পালস তার ধীর গতিতে চলছে। চারিপাশের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মানুষজনের মধ্যে কেউ কেউ দুঃখ প্রকাশ করছে, নয়তো কেউ আফসোস করছে তার জন্য। তার ম’রা-বাঁচা নিয়ে একেক জন নানান কথায় ব্যস্ত।
“সাবধানে তুলুন! মাথায় আঘাত লেগেছে!”
কিন্তু এসব শব্দ যেন রৌদ্রিকের কর্ণকুহরে পৌঁছাচ্ছিল না। তার সমস্ত ইন্দ্রিয় তখন ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসছে। কেবল দূর থেকে ভেসে আসা একটি পরিচিত কণ্ঠস্বরকে অস্পষ্টভাবে এখনো তার কর্ণকুহরে বেজে চলেছে, তূর্ণা! ফোনটা তার থেকে কয়েক হাত দূরে ছিটকে আধভাঙা অবস্থায় পরে রয়েছে। গাড়ির ভিতরে থাকা তার যত্ন করে কেনা উপহারগুলোরও করুন অবস্থা। ভ্রু গড়িয়ে নেত্রপল্লবে লেগে থাকা র’ক্তবিন্দুগুলো সারা চোখে ছড়িয়ে সাদা অংশটা লাল রঙে রঞ্জিত হয়েছে। রৌদ্রিকের আঁখিপল্লব আর মেলে রাখতে সক্ষম হলো না, বুঁজে গেলো আঁখিপল্লব জোড়া।

তূর্ণা এখনো ফুঁপিয়ে চলেছে, কিছুখন আগেট ঘটনাগুলো এখনো তার কর্ণকুহরে বেজে চলেছে
মিনিটখানেক আগেও রৌদ্রিকের সঙ্গে কথা বলছি স্বাভাবিক কথাবার্তাই ছিল সব। হঠাৎ করেই বিকট এক শব্দ! মনে হচ্ছিলো যেন ধাতব কোনো দৈত্য প্রচণ্ড শক্তিতে আরেকটাকে আঘাত করেছে। তারপর কাঁচ ভাঙার তীক্ষ্ণ শব্দ। তারপর, ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসছে মানুষের আতঙ্কিত চিৎকার, দৌড়াদৌড়ির শব্দ আর দূরে কোথাও গাড়ির হর্ন। তারপর নিস্তব্ধতা! এমন এক ভয়াবহ, অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা, যা মানুষের ভেতরের সমস্ত সাহসকে মুহূর্তে গলিয়ে দিতে পারে। তূর্ণা তো সেখানে নিতান্তই ভীতু! সে ভীষণ ভীতু। তূর্ণার হৃদস্পন্দন তাল হারিয়েছে। তূর্ণার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে, মস্তিষ্ক এক মুহূর্তে হাজারো আশঙ্কার জন্ম দিলেও হৃদয় তার কোনোটাই বিশ্বাস করতে রাজি নয়। বার বার নিজেকে এইসব উল্টা-পাল্টা চিন্তা করা থেকে আটকাতে পারছে না

”না… না… না…!!”
ফিসফিস করে মাথা নাড়তে লাগলো সে। আঙুলগুলো কাঁপতে কাঁপতে বারবার রিডায়াল করলো নম্বরটা। একবার, দু’বার, তিনবার কিন্তু প্রতিবারই যান্ত্রিক রিংটোন কেবল তার আতঙ্ককে আরও গভীর করে তুলছে। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে রৌদ্রিকের মুখটা। মানুষটা টোল পড়া হাসিখানা, এই হাসিখানা ভীষণ প্রিয় তূর্ণা৷ রৌদ্রিকের শান্ত,শীতল করে তোলা দৃষ্টি সব আবছা চোখে ভাসচ্ছে তার। এইসব কেনো ভাসচ্ছে? মানুষটার কিছু হয়েছে, তার বর কষ্ট আছে। অন্যটা মাথায় আসতেই, সেই ভাবনাটা মাথায় আসতেই বুকের ভেতর যেন কেউ ধারালো কাঁচ গেঁথে দিলো। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তূর্ণার। চোখের কোণে জমে ওঠা জলরাশি ঝাপসা করে দিলো চারপাশ। প্রথমবারের মতো নিজেও উপলব্ধি করতে পারলো, রৌদ্রিককে হারানোর ভয়টা মৃত্যু থেকেও ভয়ঙ্কর। এমন ভয়, যা মানুষের শরীর নয়, সরাসরি আত্মাকে কাঁপিয়ে দেয়।
তূর্ণা বসৌ থাকতে পারলো না, ছুটে বাহিরে চলে গেলো। বাহিরে বের হতেই শ্রাবণের দেখা পেলো, তূর্ণার শ্বাসকষ্ট উঠে গেছে। এলোমেলো পায়ে সামনে এগোচ্ছে, শ্রাবণকে দেখা মাত্রই তূর্ণা শব্দ করে ফুঁপিয়ে উঠলো। আজহারি করে শ্রাবণের দিকে ফোনটা এগিয়ে দিয়ে পাগলের মত বলতে থাকে-

” ও শ্রাবণ ভাইয়া, আ. আমার বর। ওনাকে বলুন না ফোনটা তুলতে, উনি ভালো নেই! ওনার কিছু হয়েছে। ওনাকে এনে দিন ভাইয়া, আমার বরকে এনে দিন! আল্লাহ এনে দিন না ভাই! কষ্ট পাচ্ছেন উনি! কষ্ট হচ্ছে ওনার!”
বলতে বলতে পা উল্টিয়ে পরে যেতে নিচ্ছিলো, ভাগ্যক্রমে শ্রাবণ তূর্ণাকে সামলে নেয়। নাহলে বড় একটা দূর্ঘটনা এখনি ঘটে যেতো, শ্রাবণ কিছুই বুঝতে পারছে না। তবে তূর্ণার এমন বেহাল দসা দেখে কিছু একটা খারাপ হয়েছে আন্দাজ করতে পারছে। তাই তূর্ণাকে শান্ত করতে করতে বলে ওঠে-
“ শান্ত হন ভাবি, আমি দেখছি তো। ভাইয়ে কিছু হয়নি শান্ত হন!”
তূর্ণা শান্ত হলো বরং দিগুণ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে।
“ না হবো না শান্ত, বর..বরকে দেখুন। ফোন তুলছে না কাঁচ ভাঙার শব্দ, সবাই এত আজহারি করছিলো কেনো?”
শ্রাবণ তূর্ণার হাতে থাকা ফোনটা নিয়ে রৌদ্রিকের নাম্বারে ডায়াল করে, বেশ কয়েকবার দেওয়ার পর ফোনটা কেউ তোলে।

” হ্যালো ভাইয়া? তুমি ঠিক আছো?”
কিন্তু অপর পাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠস্বরের বদলে অপরিচিত একজনের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
“ এই ফোনের মালিকের এক্সিডেন্ট হয়েছে, ভীষণ খারাপ ভাবে আঘাত পেয়েছে। ওনাকে বসুন্ধরা এভারকেয়ার হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, ওনার পরিবারের লোক হলে এখানে আসুন জলদি।”
কথাটুকু শোনা মাত্রই তূর্ণার সে দিশেহারা হয়ে উঠলো, এতক্ষণের বেঁচে থাকা আশাটুকু নিভে গিয়ে, অগ্নিগিরি হয়ে উঠেছে। দূর্বল শরীরটা নিচে পরে গেলো, লাউড স্পিকারের থাকায় মানুষটা প্রতিটা বাক্য তূর্ণা কর্ণধারায় এসেছে। সে দিশেহারা হয়ে পাগলের মত আজহারি করতে করতে শ্রাবণের পা আঁকড়ে ধরে বলতে থাকে-
“ আ..আমার বর. বরকে এনে দিন ভাইয়া! ও আল্লাহ তুমি ওনাকে এনে দাও! আল্লাহ আ..আমার বর! ওনার কষ্ট হচ্ছে খুব!”
বলতে বলতে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পরলো তূর্ণা, শরীরটা সম্পূর্ণ ভেঙে পরেছে। শ্রাবণ কি করবে বুঝতে পারছে না, তাই তাড়াতাড়ি করে সবাইকে ডাকলো। কিছুখন পর সেখানে জবা সিকদার উপস্থিত হলেন, তূর্ণাকে এমন করে কাঁদতে দেখে তিনি চমকে ওঠেন! কাঁদতে কাঁদতে প্রায় মেয়েটা শ্বাস নিতে পারছে না।

“ এই মেয়ে কি হয়েছে? কাঁদছো কেনো? শান্ত হও, আর শ্বাস নাও!”
বলতে বলতে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন, তূর্ণার ব্যাকুল হয়ে জবা সিকদারের হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে-
“ ওমা, উ..উনি ভালো নেই। ওনার খুব ব্যথা লেগেছে, আ..আমাকে ওনার কাছে নিয়ে চলো! ওনার কাছে যাবো আমি!”
জবা সিকদার কিছুই বুঝলেন না তাই শ্রাবণের দিকে তাকাতেই, সে কম্পতি স্বরে সবটা বলা মাত্রই জবা সিকদার কেঁদে ফেললেন। তূর্ণা জবা সিকদারকে কাঁদতে দেখে আরও দূর্বল হয়ে পরলো, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে।
“ আমার রৌদ্র কোথাশ শ্রাবণ? ও..ও কোথায়?”
” শান্ত হও বড়মা, আমি গাড়ি বের করছি। ভাবিকে দেখো, এমন করলে ওনার শরীর আরও খারাপ হবে। এমন অবস্থায় এত কাঁদা ঠিক না!”

বলেই শ্রাবণ নিচে নেমে গেলো দ্রুত, রোমানা সিকদার সেখানে এনে শ্বাশড়ি-বউকে কাঁদতে দেখে অবাক হয়ে যায়। জবা সিকদার কম্পিত স্বরে সবটা বলা মাত্রই রোমানা সিকদারও ভয় পেয়ে গেলেন, মুহুর্তেই সবার কানে রৌদ্রিকের করুন অবস্থার কথা পৌঁছে গেছে। তূর্ণার পাগলের মত কাঁদতে কাঁদতে নিজেকে ছাড়িয়ে বাহিরে যেতে যাচ্ছে, রুমা সিকদার তূর্ণাকে আগলে রেখেছে। এমন অবস্থা এত চাপ পরায় তূর্ণার অবস্থা খারাপ হয়ে এসেছে। হসপিটালে শ্রাবণ সহ জবা সিকদার চলে গেছেন, রৌদ্রিকের বাবা আর চাচারা ওইদিক থেকে হসপিটালে যাবেন। তূর্ণার এমন অবস্থায় আর হসপিটালে নেওয়া হয়নি, মেয়েটা এমনি কাঁদতে কাঁদতে হয়রান হয়ে গেছে। তারউপর এমন অবস্থায় বেশি চাপ পরলে মা ও বেবির দুইজনেরই ক্ষতি হবে। তাই এইসব তাকে হসপিটালে না নেওয়াই উচিত মনে হয়েছে। রূমা সিকদার তূর্ণাকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন কিন্তু তূর্ণার যেনো থামার নামই নেই।

“ শান্ত হ মা! আল্লাহ আছেন তো। এমন করে কিভাবে হবে? তোর পেটে থাকা আর একজনেরও তো চিন্তা করতে হবে তাই না?”
“ আমায় ওনার কাছে নিয়ে যাও রুমা মা! আ..আমার নিয়ে যাও ওনার কাছে। ও আল্লাহ আমার বর! ওনার কষ্ট হচ্ছে রুমা মা! ওনার খুব কষ্ট হচ্ছে! কত ব্যথা পেয়েছে উনি।”
বলতে বলতে শ্বাস আটকে এলো, ইরা রোদেলাকে তার সঙ্গে রেখেছে। বাচ্চা মেয়েটাকে জানায় নি কেউ তার পাপার এমন করুন অবস্থার কথা। রোদেলাও প্রায় কেঁদে ফেলেছে সবার কান্না দেখে, তাই ইরা নিজের সঙ্গে রেখেছে। রোদেলাকে এই ব্যাপারে না জানানোটাই শ্রেয়। রোদেলার বার বার প্রশ্ন করছে কি হয়েছে সবার? সবাই কাঁদচ্ছে কেনো? কিন্তু ইরা কোনো উত্তর দিতে পারছে না। নীরবে এটা-সেটা বোঝাচ্ছে।
তূর্ণা পাগলামো করছে দেখে রুমা সিকদার হালকা ধমক দিয়ে বলে ওঠে-
“ একদম চুপ তূর্ণা! বলছি তো এত কান্না করিও না। রৌদ্র ঠিক হয়ে যাবে, আল্লাহর কাছে দোয়া কর। এমন চলতে থাকলে অসুস্থ হয়ে পরবে তুমি।”
“ রুমা মা উ….উনার ক..ষ্ট হচ্ছে! আমি বরের কাছে যাবো। আ..আমায় নিয়ে চলো না।”
রুমা সিকদার অসহায়বোধ করছেন, তূর্ণার অবস্থাটা তিনি বুঝতে পারছেন। কিন্তু এই মুহুর্তে দোয়া করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তারউপর তূর্ণার এমন অবস্থায় এত চাপ নেওয়া বাচ্চার জন্য ঠিক নয়, কিন্তু স্ত্রীর মনকে সেটা বোঝানোও বড্ড দায়! এই মুহুর্তে তূর্ণা একজনের স্ত্রী হয়ে কাঁদছে। প্রিয় মানুষকে হারানোর ভয় একজন স্ত্রীর আর্তনাদ এটা। তাই চাইলেও রুমা সিকদারের হাজার বারণ তূর্ণা কানে যাচ্ছে না।

এখন রাত্রি তার গভীরতম প্রহরে উপনীত। আকাশের বুকে চাঁদ ছিল বটে, কিন্তু ঘন কালো মেঘের স্তূপ তার সমস্ত জ্যোৎস্নাকে বন্দি করে রেখেছে এক অদৃশ্য কারাগারে। হসপিটালের জরুরি বিভাগের সামনে থামতেই একঝাঁক চিকিৎসক ও নার্স দ্রুত এগিয়ে এলো। ওটিতে রৌদ্রিক রয়েছে এইদিকে শ্রাবণীা হাসপাতালের করিডোরের অপর প্রান্তে থেকে ছুটে এসচ্ছে সিকদার পরিবার। জবা সিকদারের পরিপাটি শাড়ির আঁচল এলোমেলো হয়ে গেছে। কাঁপতে থাকা দুটো হাত দিয়ে তিনি বারবার নিজের বুক চেপে ধরে আছেন, যেন বুকের ভেতর তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা হৃদয়টাকে আটকে রাখার চেষ্টা করছেন। আসতে আসতে ছেলের সুস্থতা কামনা করে এসেছে, শক্ত আবরণে নিজেকে রাখার চেষ্ট করছেন তবুও বিফল তিনি। শত হোক তিনি মা! আর মায়ের মত কিভানে শান্ত থাকতে পারে সন্তানের এমন করুন পরিস্থিতিতে?
রাশেদুল সিকদারের মুখখানা পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছেন, জিন্তু তার রক্তাভ চোখদুটি বলে দিচ্ছে তার ভেতরে ভেতরে কী ভয়াবহ ঝড় বয়ে যাচ্ছে। রৌদ্রিকের চাচারাও উপস্থিত। বহুক্ষণ পর অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন মধ্যবয়সী একজন সার্জন।
তার মুখভঙ্গি দেখেই সবার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো।

“ ডাক্তার আমার ছেলের কেমন আছে? ও ঠিক আছে তো?”
ডাক্তার গম্ভীর স্বরে বললেনজ
“আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কিন্তু রোগীর অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। শরীর থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছে। মাথায়ও গুরুতর আঘাত রয়েছে। আগামী চব্বিশ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সত্যি বলতে… এই মুহূর্তে আমরা নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না।”
শব্দগুলো যেন বজ্রপাত হয়ে আছড়ে পড়লো সবার ওপর। জবা সিকদার টলমল করে উঠলেন।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৪

“না… না ডাক্তার… আমার ছেলের কিছু হবে না… আপনি আবার দেখুন… প্লিজ আবার দেখুন…!”
বলতে বলতে তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেহ। রাশেদুল সিকদার দ্রুত স্ত্রীকে ধরে ফেললেন। অথচ নিজেই ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছেন। রৌদ্রিক তাদের প্রথম সন্তান, বড় আদরের সবার। আর বাবা-মার সামনে সন্তানের এমন করুন অবস্থা হলে যেকোনো বাবা-মাই ঠিক থাকতে পারবে না।
শ্রাবণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। তার মনে হচ্ছে কেউ যেন বুকের মাঝখানে ধারালো ছুরি বসিয়ে ধীরে ধীরে ঘুরিয়ে চলেছে। সবার মুখেই চিন্তার ছাপ স্প! হঠাৎ এমন কিছু হতে পারে কেউ কল্পনাও করেনি, সবকিছু কেমন যেনো নিমিষেই উল্টোটা-পাল্টা হয়ে গেলো। সকালেও শ্রাবণ রৌদ্রিকের সঙ্গে কথা বলছিল, আর এই কয়েক ঘন্টার মধ্যে এতকিছু হয়ে গেলো।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here