Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৭

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৭

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৭
রুপান্জলি

বিছানায় এপাশ-ওপাশ করেও যখন চোখে ঘুম ধরা দিল না, তখনই বিছানা ছেড়ে উঠে বসলো ইরাদ। ফোনের সাইড বাটন চাপতেই দেখল, ৩টা ৪২ বাজে। সময়টা নভেম্বরের শেষের দিকে হওয়ায় মাঝরাতে বেশ ভালোই শীত পড়ে। ইরাদ পাশ থেকে শালটা নিয়ে তা শরীরে পেঁচিয়ে রুম থেকে বের হলো। উদ্দেশ্য করিডরে একটু হাঁটাহাঁটি করা। হাঁটাহাঁটি করলে ঘুম আসুক বা না-আসুক, রাতটা তো পার হবে এই অনেক।

রুম থেকে বের হওয়ার পূর্বে ইরাদ একবার আড়চোখে অনন্যার দিকে তাকাল। ড্রিম লাইটের আলোয় চকচক করছে মেয়েটার মুখ। গত রাতে অনন্যা ঠিকই বলেছিল, মেয়েটা প্রয়োজনের তুলনায় অধিক সুন্দরী। চেহারা, নাক, মুখ, ফিটনেস কোথাও কোনো খুঁত নেই। সেদিক থেকে দেখতে গেলে ইরাদের খুঁতের অভাব নেই। গায়ের রং কালো, চেহারা এভারেজ। আকর্ষিত হওয়ার মতো কী আছে তার মাঝে? তেমন কিছুই খুঁজে পায় না সে। অনন্যার দিক থেকে চোখ সরিয়ে বাইরে চলে গেল ইরাদ। বিহানের রুম থেকে শুরু করে বর্তমানে সিদ্ধার্থকে থাকতে দেওয়া রুম পর্যন্ত সম্পূর্ণ করিডর ফাঁকা। ইরাদ হাঁটতে হাঁটতে বিহানের রুম পর্যন্ত গেল। মির্জা বাড়ির দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বিশাল হওয়ার দরুন পায়চারি করতে বেশ আরাম বোধ করছে মেয়েটা। সেই সঙ্গে করিডরের পাশ ঘেঁষে লাগানো ফুলের টবে নানান ধরনের শীতকালীন ফুল ফুটেছে। সেই ফুলের ঘ্রাণ নাসারন্ধ্রে পৌঁছাতেই ইরাদের বিষাদভরা মনটা কেমন চনমনে হয়ে উঠল। বিহানের রুমের সামনে পৌঁছানোর পর আবারও ঘুরে সামনের দিকে হাঁটা দিল সে। হাঁটতে হাঁটতে নিজেদের রুম পেরিয়ে সিদ্ধার্থের রুমের কাছে যেতেই একবার ভাবল, এখান থেকেই ফিরে যাবে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে এলো, এখন তো অনেক রাত। সিদ্ধার্থের বাইরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। এক্ষেত্রে দুজনের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কাও শূন্যের কোটায়। ভেবেই পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। সিদ্ধার্থের রুম পেরিয়ে করিডরের শেষ মাথায় পৌঁছাতেই কানে এলো কারও ধীর স্বরে গাওয়া দুটো লাইন—

,,,, কত কথা বলা হলো না, প্রিয়,
কত সূর্যমুখীর মন ভার…
আমার শহর জুড়ে কুয়াশার ঘুম,
নীরবে জমা ব্যথার পাহাড়…
গানের মালিককে দেখে না-চাইতেও বড্ড অবাক হলো ইরাদ। আনমনেই বলে ফেলল,
— এত ভালো বাংলা গান কোথা থেকে শিখেছেন?
আচমকা ইরাদের কণ্ঠ শুনে গান থামিয়ে তড়িৎগতিতে পেছনে তাকাল সিদ্ধার্থ। ঘুম না-আসায় বহুক্ষণ ধরেই করিডরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল সে। আজ প্রকৃতি বেশ শান্ত। বাইরে থেকে মৃদুমন্দ শীতল বাতাস বইছে, ঝিরিঝিরি কুয়াশারও আবির্ভাব ঘটেছে। এমন একটা পরিবেশে হুট করেই মন চাইল পছন্দের নারীকে ঘিরে দুটো লাইন আওড়াতে। তবে সেই গান যে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত নারীর কর্ণকুহরে পৌঁছাবে, তা যেন সিদ্ধার্থের কল্পনাতীত ছিল।

সিদ্ধার্থের এরকম আচমকা নিজের দিকে তাকানোটা ইরাদের ভেতরে অস্থিরতার ঝড় তুলে দিল। যার থেকে পালানোর জন্য এতক্ষণ এতটা সতর্কতা অবলম্বন করেছে, নিজের ভুলে কিনা তার মুখোমুখিই হতে হলো! বড্ড আফসোস হলো তার। কেন জিজ্ঞেস করতে গেল এত কিছু? গান শুনে চুপচাপ ফিরে গেলেই পারত।প্রথম দিকে একটা ভুল করে ফেললেও এবার শুধরে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে ফিরে যাওয়ার জন্য দু-পা বাড়াতেই সিদ্ধার্থ তেড়ে এসে ইরাদের হাত ধরে টান বসাল। খেই হারিয়ে সিদ্ধার্থের অনেকটা কাছে চলে এলো ইরাদ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পিঠ ঠেকল দেয়ালে। সিদ্ধার্থ কেমন ফাঁপরের ন্যায় নিঃশ্বাস টেনে ইরাদের দিকে ঝুঁকে এলো। বিষয়টা সেকেন্ডের গতিতে ঘটায় কিছুই করতে পারেনি রমনি। কিন্তু যখন নিজেকে দেয়ালে আর সিদ্ধার্থকে নিজের খুব কাছে আবিষ্কার করল, তখনই সরে যাওয়ার জন্য সিদ্ধার্থকে পাশ কাটাতে চাইল। সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালের দুপাশে হাত রেখে ইরাদকে আটকে দিল মানব। আকস্মিক কাণ্ডে আবারও দেয়ালের দিকে খিচে গেল রমনি।সিদ্ধার্থ ঝুঁকতে ঝুঁকতে একদম ইরাদের মুখের কাছে মুখ এনে ফুঁ দিয়ে কপালে এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিল।

— প্রশ্ন করেছেন, উত্তর না নিয়েই পালিয়ে যাচ্ছেন? শুনবেন না, এত ভালো বাংলা গান কার থেকে শিখেছি?
,,, ইরাদ অনুভব করলো সিদ্ধার্থের বাংলা ভাষায়ও বেশ উন্নতি হয়েছে। অনেক কথাই স্পষ্ট বাঙালিদের মতো করে বলতে পারে। শুধু মাঝে-মধ্যে কিছু কিছু শব্দ হালকা অন্যরকম শোনায়। বিষয়টা নিয়ে আর ভাবলো না সে। সম্পূর্ণ ব্যাপারটাতে নিজের দোষ থাকায় নরম স্বরেই বললো—
— সরুন, আপনার সাথে কথা বাড়াতে ইচ্ছা করছে না আমার।
,,,, সিদ্ধার্থ শুনলে তো! আধো-অন্ধকারে আরও কিছুটা এগিয়ে গেল ইরাদের দিকে। এই পর্যায়ে তাদের মধ্যেকার দূরত্ব দু-এক ইঞ্চির মতো হবে। ঠোঁট যুগল একদম ছুঁই-ছুঁই অবস্থানে পৌঁছাতেই মুখ ফিরিয়ে নিল ইরাদ। সিদ্ধার্থ ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটিয়ে বললো—
— বিকালে আমার প্রশ্নের উত্তর দেননি, আর এখন নিজের প্রশ্নের উত্তর নিচ্ছেন না। কিসের ভয় পাচ্ছেন, ইরাদ? আমার প্রেমে পড়ে যাওয়ার?
,,,, ইরাদের ঠোঁটে হুট করেই বিদ্রূপের হাসি ফুটে উঠলো—
— বিশ্বাস করুন, আমি সত্যিই ভয় পেতাম। কিন্তু আপনার প্রতি তৈরি হওয়া ঘৃণা আমাকে প্রেমে পড়ার ভয়টুকুও করতে দিচ্ছে না। আমার মতে, আপনাদের মতো মানুষদেরকে ভালোবাসা তো দূর, মনুষ্যত্ব দেখানোটাও পাপ।

,,, ইরাদের ঠোঁট ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা প্রতিটি বাক্যে ঝরে পড়েছে ঘৃণা, যা তীর হয়ে সিদ্ধার্থের বক্ষ ছেদ করতেও দুবার ভাবলো না। ছেলেটা কেমন নির্জীব কণ্ঠে শুধালো—
— আপনি আমাকে ঠিক কতটা ঘৃণা করেন, ইরাদ?
,,, এবার আর এড়িয়ে গেল না রমনি। সোজাসাপ্টা মুখের উপর ছুড়ে দিল তিক্ত কথার বান—
— নর্দমার কীটের থেকেও বেশি। আপনাকে দেখলেই আমার বমি পায়, আর আপনার স্পর্শে আমার গা গুলায়। কতটা জঘন্য আপনি! আমার বাবা-ভাইকে কী বলেছেন? আমি আপনার সাথে দিনের পর দিন থেকেছি? আর কী কী করেছি বলেছেন? আপনার স্পর্শ গায়ে মেখেছি? আপনার সাথে একজন ওয়াইফের মতো কথা বলেছি? শান্তি পেয়েছেন তো? খুশি? কেন করেছেন এমনটা? আপনার কোনো ক্ষতি করেছিলাম আমি? আজ বাবা-মা থাকতেও আমি অনাথ। বাবার মুখে কখনো দু*ষ্টচরিত্রের তকমা পেয়েছেন? আপনার কারণে পুরো পরিবারের সামনে আমার নিজের বাবা আমাকে দু*ষ্টচরিত্রা বলেছে। কখনো বাবার আদর না পাওয়া ইরাদটা বড় ভাইজান বলতে অজ্ঞান ছিল। আমার সেই ভাইজান আমাকে দুই-দুইবার বাড়ি থেকে মেরে বের করে দিয়েছে। কখনো মার খেয়েছেন? জানেন, চুলে ধরলে কতটা যন্ত্রণা হয়?
,,, এই পর্যায়ে ইরাদের কণ্ঠ কেমন ভেঙে এলো। করিডরের লাল আলোয় চিকচিক করে উঠলো রমনির ফ্যাকাশে চোখজোড়া। সিদ্ধার্থের বুকটা কেমন মুচড়ে উঠলো। অনুমতি বিনা মেয়েটার কপালে কপাল ঠেকালো মানব। দৃঢ় কণ্ঠে শুধালো—

— আপনি শিওর, এই কাজগুলো আমি করেছি?
,,, সিদ্ধার্থকে এতটা কাছাকাছি আসতে দেখে জিদে ফেটে পড়লো রমনি। কপালটা জ্বলে উঠলো কেমন। দুহাতে সজোরে ধাক্কা বসালো মানবের বুকে। সহসা দু-পা পিছিয়ে গেল সিদ্ধার্থ। রমনি ফুঁসতে ফুঁসতে সিদ্ধার্থের বুকে একটার পর একটা ধাক্কা দিতে দিতে আওড়ালো—
— তাহলে আর কে করবে? কার লাভ হবে আপনার সাথে আমার বিয়ে হলে? কী ভেবেছেন, এসব করলেই আমাকে পেয়ে যাবেন? ভেবেছেন, ইরাদ মনে হয় সস্তা? হয়তো আপনার ভাইকে এককালীন ভালোবেসেছিলাম। তার মানে এই নয় যে চাইলেই ইরাদকে পাওয়া যাবে। সে মোটেও হ্যাংলা নয়। যা করেছেন, ভালো করেছেন। ভবিষ্যতে আরও করবেন। শুধু আমার বাবা-ভাইকে কেন? সব জায়গায় ভিডিওগুলো পাবলিশ করে দিন। সবাই দেখুক আমার আসল রূপ। প্রমাণে কমতি পড়েছে? আরও লাগবে? বর্তমানে আপনার কাছে আছি না? ভিডিও করুন। আরও ক্লোজ হবো? কতটা ক্লোজ হতে হবে বলুন। রুমে যাবেন? চলুন,,

,,, বলতে বলতে সিদ্ধার্থের হাত টেনে ধরলো। ইরাদের চোখেমুখে উপচে পড়া দাবানল। সাপের ন্যায় ফোঁসফোঁস করছে মেয়েটা। শরীরের যত শক্তি আছে সবটা খরচা করে সিদ্ধার্থের হাত ধরে টানতে লাগলো। চোখ থেকে অঝোর ধারায় পানি গড়াচ্ছে। এত টানার পরও সিদ্ধার্থকে এক চুল নড়াতে পারলো না রমনি। ঠায় দাঁড়িয়ে আছে মানব। টানতে টানতে যখন ইরাদ ক্লান্ত হয়ে পড়লো, তখনই ওকে টেনে বুকের সাথে মিশিয়ে নিল সিদ্ধার্থ। অত্যন্ত নীরব কণ্ঠে আওড়ালো—
— আই লাভ ইউ, মাই লাভ! বিশ্বাস করো, আমি এসব কিছু করিনি। একটু ঠান্ডা মাথায় আমার কথাটুকু শুনো, প্লিজ!

,,, মুহূর্তেই তেতে উঠলো রমনি। বন্দী পাখির ন্যায় ছটফট করতে করতে বললো— শুনবো না। আপনাকে আমি বিন্দু পরিমাণও বিশ্বাস করি না। আর, আর আপনাকে আমি নিষেধ করেছি না আমার কাছে ভালোবাসার দাবি নিয়ে আসতে? আমার কসম দিয়েছিলাম না? সেই কসমের তোয়াক্কা করলেন না? কেমন ভালোবাসেন? এখন যদি মরে যাই আমি? খুশি হবেন?
,,, সিদ্বার্থ ইরাদের গালে নাক ঘসে বললো — আমি কসমে বিশ্বাস করি না। এসব শিরক।
,,, ইরাদ ফের ছটফট করতে করতে বললো– আপনাদের ধর্মে শিরক, আমার ধর্মে নয়। আমরা কসম ভঙ্গ মানে মৃত্যু কামনা বুঝি। আপনি কি আমার মৃত্যু কামনা করছেন? মরে গেলে খুশি হবেন? সাফ সাফ বলে দিন আজ।

,,, আমি ভালো না বাসলে খুব খুশি হবেন আপনি?
,,, মুহূর্তেই উত্তর করলো ইরাদ— হুম!! বেঁচে যাবো একপ্রকার। আমাকে মুক্তি দিন আপনার এসব ভালোবাসা নামক পাপ থেকে। আপনি কোন যুক্তিতে আমাকে ভালোবেসেছিলেন, বলুন তো? আপনার আর আমার সম্পর্কটা ভালোবাসায় মোড় নেওয়ার কথা ছিল? আপনার ভাইকে ভালোবাসতাম আমি!! নিজের ভাইকে ভালোবাসে এমন একটা নারীকে ভালোবাসতে লজ্জা করলো না আপনার? নির্লজ্জ কাপুরুষ একটা। আবার সেই নারীকে পাওয়ার জন্য সেই নারীর সম্মান রাস্তায় নামিয়ে আনতেও দুবার ভাবলেন না। আপনাকে তো আপনার আল্লাহও ক্ষমা করবে না,, আমি কি ক্ষমা করবো, ভাই? ছাড়ুন আমাকে। এরপর থেকে এভাবে হুটহাট আমার কাছে আসবেন না। বমি পায় আমার, গা ঘিনঘিন করে।

,,, সিদ্ধার্থের হাতের বাঁধন নড়বড়ে হয়ে উঠলো। তীব্র দহনে অঙ্গার হলো হৃদয়। ইরাদের জীবনে সে জাস্ট একটা অবাঞ্ছিত সত্তা ব্যতীত কিছুই না। বিষয়টা মাথায় আসতেই অপমানে দগ্ধ হয়ে উঠলো প্রাণটা। এই ৩০ বছর বয়সে এতটা অপমানিত বোধহয় কোনোদিন হয়নি মানব। কেউ আঙুল তুলে একটা কথাও বলতে পারেনি। অথচ আজ ভালোবাসার অপরাধে কত কথাই না শুনতে হচ্ছে। সিদ্ধার্থের মাথায় হুট করেই রাগ চাপলো। আকস্মিক ধাক্কায় ইরাদকে আবারও দেয়ালের সঙ্গে আটকে দিলো। মেয়েটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দ্বিতীয় বারের ন্যায় ইরাদের ওষ্ঠযুগল দখল করে নিলো। মনে জমা সকল অপমান, যন্ত্রণার রেশ ঢেলে দিলো রমনির পাতলা অধরে। ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা চালিয়েও যখন ছাড়া পেলো না, তখনই ফুপিয়ে উঠলো রমনি। এতেও মন গললো না মানবের। দুজনেরই যখন দম আটকে আসার জোগাড়, তখনই ইরাদকে ছেড়ে দিলো মানব। শ্বাস নেওয়ার ফুরসতটুকুও দিলো না। এই প্রথমবারের মতো চেপে ধরলো রমনির নরম চোয়ালখানা। দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরে হিসহিস করে আওড়ালো— আমার স্পর্শে গা ঘিনঘিন করে না? বমি পায়? যাহ!! গিয়ে বমি কর। সম্মান দিচ্ছি, চোখে লাগে না। আমাকে বিশ্বাস হয় না। আমার ভালোবাসা অবাঞ্ছিত। আমি নির্লজ্জ, কাপুরুষ। মূলত তোর মতো অতিরিক্ত অহংকারী মেয়েদের ভালোবাসাই উচিত না। তুই বরং ছ্যাঁচড়ার মতো আমার ভাইয়ের পেছনেই পড়ে থাক। আমার ভালোবাসা তুই ডিজার্ভই করিস না।
,,, বলেই ধাক্কা দিয়ে হনহন করে নিজের ঘরে গিয়ে ঠাস করে দরজা আটকে দিলো। হৃদয়ের অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর রমনি এবার দেয়ালের পাশ ঘেঁষে মেঝেতে বসে পড়লো। হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফুপিয়ে উঠলো নীরবে। ঠিক এই কারণেই সিদ্ধার্থকে ঘৃণা করে সে। ছেলেটার মন-মানসিকতা জঘন্য। নয়তো এত বড় অন্যায় করার পরেও আজ আরও একটা অন্যায় করতে পারতো না।

,,, ফজরের নামাজ পড়ে একা একা গাড়ি নিয়ে বের হলো অর্পনা। সঙ্গে গার্ড কিংবা দ্বীপ কাউকেই নেয়নি। দীর্ঘ ১০ মিনিট ড্রাইভ শেষে আজিমপুর কবরস্থানের গেটের সামনে এসে থামতেই গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। আসার পথে বাগান থেকে একগুচ্ছ তরতাজা গোলাপ এনেছিল, সেগুলোই ব্যাক সিট থেকে বের করে হাতে নিল। তার পরনে সাদা-কালো মিশেলে একটা থ্রিপিস। গোটা করে মাথায় ঘোমটা টেনে গায়ে থাকা শালটা ভালো মতো পেঁচিয়ে নিল। চোখ দুটো ফুলে লাল হয়ে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, নামাজে বসে অঝোরে কেঁদেছে মেয়েটা। কুয়াশার তোড়ে ঠোঁটজোড়া শুষ্ক রূপ ধারণ করেছে। গলাটা শুকিয়ে আছে অকারণেই। সে বড়সড় একটা ঢোক গিলে ধীরে ধীরে হেঁটে গেটের কাছে পৌঁছাতেই দারোয়ানকে দেখতে পেল। মেয়েদের গোরস্থানে ঢোকা নিষেধ থাকা সত্ত্বেও গেট খুলে দিল দারোয়ান। এই মেয়েটা প্রায়ই এখানে আসে, শাসন-বারণ মানে না। প্রথম দিকে মানা করলেও বছর তিনেক আগেই ক্লান্ত হয়ে মানা করা ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। মেয়েটা দ্বীপ মির্জার ওয়াইফ। মনে হয় মাথায় কোনো সমস্যা আছে। কিছুদিন পরপর এসে একটা নির্দিষ্ট কবরের পাশে বসে কার সঙ্গে যেন কথা বলে। কথা বলতে বলতে হাউমাউ করে কাঁদে, এরপর দ্বীপ মির্জা এসে নিয়ে যায়। এগুলো দেখতে দেখতে অভ্যাস হয়ে গিয়েছে তার, তাই মেয়েটাকে খুব একটা আমলে নিলেন না। অর্পনাও কোনোদিকে না তাকিয়ে ফুলের তোড়াটা নিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে ভেতরে চলে গেল। সোজা গিয়ে বাম দিকে তাকালেই দেখতে পাওয়া যায় ইট দিয়ে বাঁধানো একখানা সুন্দর কবর। ফলকে খুব সুনিপুণভাবে খোদাই করা—

মৃতঃ সুহাসিনী রাত
পিতাঃ আরশাদ জামান
জন্মঃ ২৫-০৫-২০০৩
মৃত্যুঃ ১৭-০৪-২০২৭
,,, সান-বাঁধানো কবরটির পাশে এসে ধপ করে বসে পড়লো অর্পনা। কিছুক্ষণের মাঝেই পাশে এসে বসলো রাত্রি। অর্পনা ঘাড় বাঁকিয়ে তাকিয়ে রাত্রির আপাদমস্তক পরখ করে নিল। আজও মেয়েটা নীল শাড়ি পরেই এসেছে। রাগ হলো অর্পনার। নাক কুঁচকে শাসানোর স্বরে বললো — তোর কি আর জামাকাপড় নেই? একটা শাড়ি আর কতদিন পরে থাকবি? আমি যে এত এত ড্রেস এনে দিয়ে যাই, সেসব কোথায়? কার জন্য জমা রাখিস?

,,, রাত্রি উত্তর করলো না। অর্পনা এবার ফুলের বুকেটা এগিয়ে দিয়ে বললো— কাল তোর জন্য আরও একটা নতুন শাড়ি আনবো, ঠিক আছে? লাল শাড়ি পরবি? আনবো?
,,, রাত্রি ফুলের বুকেটা নিয়ে সাইডে রেখে কেমন মলিন কণ্ঠে শুধালো— লাল শাড়ি?
,,, অর্পনা সায় জানিয়ে বললো— হুম, বউ সাজবি। খুব শখ ছিল তোর আর অরুণকে দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দেওয়ার। কিন্তু কী থেকে কী হয়ে গেল, দেখ। তুই চলে এলি এখানে, অরুণ চলে গেল ইতালিতে। জানিস! অরুণের না একটা ঘর হয়েছে, বউও হয়েছে। ও কেমন বেইমান হয়ে গেল বল! কীভাবে ভুলে গেল আমাদের? ওর কি আমাদের জন্য একটুও অন্তর পোড়ে না?
,,, রাত্রি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। কোনো উত্তর নেই তার কাছে। চুলগুলো বড্ড উসকোখুসকো হয়ে আছে। অর্পনা বোনের চুলগুলো আঙুল দিয়ে আঁচড়ে ঠিকঠাক করে দিয়ে কাতর কন্ঠে সুধালো — রাত! পল্লব কি তোর কাছে আসে? আমি না ওকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। একটু হেল্প কর না রে। বল না, ও কোথায় আছে? কোথায় গেলে পাবো ওকে? ও কি তোর সঙ্গে দেখা করতে আসে?

,,, রাত্রি দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না করলো। তার অপ্রেমিক আসে না তার কাছে। অর্পনা যেন বড্ড অসহায় হয়ে পড়লো। কোথায় খুঁজবে সে পল্লবকে? লাস্ট দেখা হয়েছিল ছয় মাস আগে। কত হাতে-পায়ে ধরে অনুরোধ করেছে, যেন চলে না যায়। কিন্তু ছেলেটা মানলো না। ঠিকই তাকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেল।
ওদিকে পল্লবের বাবা-মায়ের অবস্থাও করুণ। পল্লবের মা সারাক্ষণ পল্লব, পল্লব করে। পল্লবের বাবার রিটায়ার্ড নেওয়ার সময় চলে এসেছে। অনাহিতা আপু ইদানীং বেশ চুপচাপ হয়ে পড়েছেন। ভাইয়ের জীবন নষ্ট করার জন্য তিনি শুধু নিজেকেই দোষারোপ করেন। অহমিকা বারবার তার কাছে কল দিয়ে ভাইয়ের জন্য কান্নাকাটি করে। এতগুলো মানুষকে কীভাবে নিরাশ করবে সে? সবাই তো আশা নিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। অর্পনার চোখ থেকে সমানে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো। মাথার যন্ত্রণায় চোখ বুজে নিতেই হুট করেই কেমন সব বদলে যেতে লাগলো। আজিমপুর কবরস্থান হয়ে উঠলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। ওই তো গেট দিয়ে পল্লব, ইরাদ আর অরুণ এগিয়ে আসছে। দুজন মিলে কী নিয়ে যেন ক্ষেপাচ্ছে ইরাদকে। ইরাদ বিরক্ত হয়ে ছুটে এসে অর্পনা আর রাত্রির পাশে বসে পড়লো। পল্লব আর অরুণ ধীরে ধীরে এসে বসলো তাদের সামনে। অর্পনা যেন মুহূর্তেই আশ্চর্যের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেল। সামনের দৃশ্যগুলো কিছুতেই বোধগম্য হচ্ছে না তার। সে ইরাদ আর রাত্রির দিকে তাকিয়ে বোকা কণ্ঠে শুধালো—

— এটা কি সত্যিই? এরা সত্যিই এসেছে?
,,, ইরাদ মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানালো। অর্পনা ঠোঁটে একফালি হাসি টেনে যেই না অরুণের হাতখানা ছুঁতে যাবে, অমনি হাওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে গেল ছেলেটা। মুহূর্তেই কেঁপে উঠলো অর্পনা। সে এবার হাসি-হাসি মুখ করে বসে থাকা পল্লবকে ছুঁতে চাইলো। স্পর্শ করতেই সেও বেইমানের মতো মিশে গেল বাতাসে। ধীরে ধীরে সব পাল্টে যেতে থাকলো। ইরাদ, রাত্রিও অরুণের মতো করে হারিয়ে গেল। ক্ষণিকের ঢাকা ভার্সিটি আবারও সেই কুয়াশাচ্ছন্ন আজিমপুর কবরস্থানে পরিণত হলো। কয়েক সেকেন্ডের এই হ্যালুসিনেশন এলোমেলো করে দিল ২৮ বছরের রমনিকে। সে এদিক-ওদিক খুঁজেও যখন বন্ধুদের পেল না, তখনই উন্মাদের মতো নিজের চোখ ডলতে লাগলো। মাথায়ও আঘাত করছে একটার পর একটা। সে কি দিন দিন আরও পাগল হয়ে যাচ্ছে? বারবার বিভ্রম দেখছে কেন? অর্পনা তো জানে, কেউ আসবে না তার কাছে। সবকটা বেইমান, আর সবচেয়ে বড় বেইমান অরুণটা। তাহলে কেন সে বারবার এদেরকে দেখে? কেনো শতো চেয়েও বেইমানগুলোকে ভুলতে পারে না? মাথায় আঘাত করতে করতে ফুপিয়ে উঠলো রমনি। দুহাতে চুল টেনে ধরলো। শান্তি লাগছে না। তার জন্য বোধহয় শান্তি শব্দটাই লেখা হয়নি। নয়তো একটার পর একটা অঘটন কেন তার জীবনেই ঘটে? যাদেরকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়, তারাই কেন তাকে পাগল বানিয়ে দূরে সরে যায়? অর্পনার পাগলামির মাঝেই তার পাশে এসে দাঁড়ালো কেউ। নরম স্বরে ডাকলো— অর্পন!!

,,, পরিচিত অথচ অনাকাঙ্ক্ষিত কণ্ঠস্বর শুনে চোখ তুলে তাকালো অর্পনা। সামনে দণ্ডায়মান ২৮ বছর বয়সী সুপুরুষ অরুণ আজোয়াদকে দেখে ফের নিজের মাথায় আঘাত করলো রমনি। চিৎকার করে বললো—
— আর কত জ্বালাবি তোরা? চলে যা, চলে যা প্লিজ!! আমার মাথা কাজ করছে না। পাগল হয়ে যাচ্ছি দিন দিন। আজকের জন্য অন্তত রেহাই দে। কাল আবার জ্বালাস।
,,, ছেলেটা কথা শুনলো না। ঝুঁকে এসে অর্পনার বাহু টেনে দাঁড় করালো। এই পর্যায়ে অর্পনা যেন পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে পড়লো। সে চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে অরুণের বাহু ছুঁলো। না, এবার আর মিলিয়ে যায়নি ছেলেটা। তার মানে অরুণ সত্যিই এসেছে? অর্পনা সূচালো দৃষ্টিতে তাকিয়ে অরুণের বাহু ছেড়ে হাত শক্ত করে ধরে শুধালো—

— তুই? অরুণ? সত্যিই এসেছিস? এটা আমার মনের ভ্রম না?
,,, অরুণ মাথা ঝাঁকিয়ে না করলো, মানে এটা ভ্রম না। অর্পনা এখনো বোকার মতো তাকিয়ে আছে। বিশ্বাস হচ্ছে না তার। প্রতিদিন সবাইকে হ্যালুসিনেট করতে করতে এখন সত্যিকার মানুষটাকেও চিনতে পারা দায় হয়ে উঠেছে তার জন্য। অরুণ এবার অর্পনার কাঁধে হাত রেখে নরম স্বরে বললো— নিজের এটা কী হাল করেছিস, গাধি? পাগলের মতো আচরণ করছিলি কেন? কী হয়েছে তোর? শরীর খারাপ? চল, বাইরে যাই।
বলেই অর্পনার কাঁধ পেঁচিয়ে ধরলো। এই পর্যায়ে বোধহয় বিশ্বাস করলো অর্পনা। কাঁধ থেকে অরুণের হাতটা ঝাড়া দিয়ে ফেলে শার্টের কলার চেপে ধরলো—

— বেইমানের বাচ্চা!! কেন এসেছিস তুই? এতদিন পর এসে আবার জিজ্ঞেস করছিস আমার কী হয়েছে? কিছুই হয়নি। আমি আর ইরাদ দিব্যি আছি তোদের ছাড়া। যা!! এবার (ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে) যেখান থেকে এসেছিস, সেখানে ফিরে যা। আমি তোকে চিনি না। আর তুই কোনো মতেই আমার পিছু নিবি না। আমার শ্বশুরবাড়িতে তোকে দেখলে থাপ্পড়ে গাল ফাটিয়ে দিবো।
,,, অর্পনার ধাক্কায় দু-পা পিছিয়ে গেল অরুণ। ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি, যেন অর্পনার কথা সে কানেই তোলেনি। অর্পনা আর কিছু না বলে হনহন করে বেরিয়ে গেল। ওই তো গেটের সামনে গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দ্বীপ মির্জা। কিছু পথ হেঁটে দ্বীপকে দেখতেই অর্পনা ছুটে গেল সেদিকে। কবরের পর কবর পেরিয়ে যেদিকে পথ পেল, সেদিক দিয়েই ছুটে গিয়ে দ্বীপের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। মুহূর্তেই ফুপিয়ে উঠলো মেয়েটা। অরুণ একবার আড়চোখে রাত্রির কবরটার দিকে তাকালো। এখানেই শুয়ে আছে অরুণের ভালোবাসা। অরুণের প্রিয়া, প্রেয়সী। সম্বোধন করতে গিয়েও কেমন অরুণের বুকটা কেঁপে উঠলো। মনে হলো, কোনো একজনকে তীব্রভাবে ঠকাচ্ছে সে। তাই চোখ সরিয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেল কবরস্থান থেকে। অর্পনা দ্বীপের বুকে মাথা রেখে কাঁদছে। দারোয়ান তীব্র বিরক্ত। এই মেয়েটার মাথায় সমস্যা। এটাকে ডাক্তার না দেখিয়ে এভাবে এদিক-ওদিক ঘুরতে দেওয়ার কী মানে? আর দ্বীপ মির্জাই বা এই পাগলকে নিয়ে সংসার করছে কীভাবে? একে পাগলা গারদে রেখে আসা উচিত। অরুণকে কাছাকাছি আসতে দেখে অর্পনাকে নিজের থেকে সরিয়ে গাড়িতে তুলে দিলো দ্বীপ। আপাতত দুজন মুখোমুখি না হোক। এতদিনকার অভিমান একদিনে তো আর মিটে যাবে না তাই না? সুতরাং সবাই নিজেদের দিক থেকে সময় নিক। অরুণ এগিয়ে এসে অর্পনা যেই গাড়িতে উঠেছে, তাতে উঠতে চাইলেই আটকে দিলো দ্বীপ।

— কিছুটা সময় নাও, অরুণ। এখনই সবটা ঠিক হয়ে যাবে না। সবচেয়ে বড় কথা, তোমার ফ্রেন্ড মেন্টালি সিক। অতিরিক্ত কিছু হলে সামলাতে পারবো না।
,,, এরূপ কথায় থেমে গেল অরুণ। সে মূলত বাংলাদেশে এসেছেই অর্পনার জন্য। দুদিন আগে কনসার্টে তাদের কথা মনে পড়ায় অর্পনাকে হাঁটু গেড়ে বসে পড়তে দেখে নিজেকে ইতালিতে আটকে রাখতে পারেনি। এই চারটা বছর রাত্রির স্মৃতি থেকে পালিয়ে বাঁচবে বলেই বাংলাদেশে পা রাখেনি সে। বর্তমানে নিজেকে অনেকটা সামলাতে পেরেছে অরুণ। এই তো রাত্রির কবরে এসেও কেমন নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারলো। একটা সময় যাকে “”ভালোবাসি, ভালোবাসি”” বলে পাগল করে দিত, তার কাছে এসেও দুটো কথা না বলেই দিব্যি ফিরে আসতে পেরেছে। তার মতো শক্ত খোলস কেউ ধরতে পারে নাকি? অরুণের ভাবনার মাঝেই দ্বীপ নিচু স্বরে শুধালো—

,,,, তুমি কি কিছুটা সময় এখানে থাকবে?
,,, অরুণের ভাবুক মুখাবয়বে কেমন তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটলো।— কোন মুখে কিংবা কোন অধিকারে? রাত যদি জানতে পারে আমি বিবাহিত, সহ্য করতে পারবে? আর বাড়িতে স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও যদি প্রেমিকার কবরে বসে আর্তনাদ করি, আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবে? আমার জীবনটা বড্ড অদ্ভুত রূপ নিয়েছে, ভাইয়া। না পারছি এই পথ বেছে নিতে, আর না পারছি ওই পথ বেছে নিতে। আমার ভালোবাসা পবিত্র হওয়া সত্ত্বেও রাত আমার জন্য অবৈধ। যাওয়ার যখন ছিল, আমায় বিয়েটা করেই যেত। অন্তত পাপের ভয়ে দূরে সরে থাকতে হতো না।

,,, বলতে বলতে কণ্ঠ কেমন ভেঙে এলো ছেলেটার। চোখ লাল করে পানি জমা হতেই মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছে নিলো।
গাড়িতে বসে থাকা অর্পনার কেন যেন হাসি পেল। ভালোবাসলে আবার পাপ-পুণ্যের হিসাব করে নাকি মানুষ? ভালোবাসা তো ন্যায়-অন্যায়, ঠিক-ভুল মানে না। সে কেমন করে যেন আজ প্রেমিক আর অপ্রেমিকের মধ্যকার তফাৎটা বুঝে গেল। একজন প্রেমিক হয়তো সম্পর্ক কিংবা পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে প্রেমিকাকে অবৈধ তকমা দিতে পারে, কিন্তু একজন অপ্রেমিক তা পারে না। অপ্রেমিকরা দিশেহারা হয়ে যায়, নিজেকে হারিয়ে ফেলে, আত্মীয়-পরিজন ভুলে শুধু ভালোবাসা, ভালোবাসা করে পাগলপারা হয়। যেমনটা এগারো বছর আগে দ্বীপ মির্জা হয়েছিল, আর এখন ওয়াসিম জায়িন পল্লব হয়েছে। যদিও দ্বীপ অপ্রেমিক ছিল না। ওয়াসিম জায়িন বোধহয় সত্যিই রাত্রির অপ্রেমিক। সুহাসিনী রাত ওয়াসিম জায়িনকে ঠিক নামেই সম্বোধন করেছিলো সেদিন আর অপ্রেমিক পল্লব নিজেকে ধ্বংস করে সেই নামের মর্যাদা রেখেছে।

,,,, গোটা আট দিন যাবৎ সময় নিয়ে মির্জা বাড়ির কোণা থেকে কোণা পর্যন্ত প্রতিটি জায়গা সুনিপুণভাবে সাজানো হয়েছে। আর সবচেয়ে আকর্ষণীয় করে সাজানো হয়েছে বাড়ির বাগানে অবস্থান করা প্যান্ডেলটা। বাইরে থেকে প্যান্ডেলটা দামি কাপড়ে মুড়ানো হলেও ভেতরে সিলিং আর কার্পেটের সংমিশ্রণে কমিউনিটি সেন্টারের আকৃতি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। চারদিকে লাইটিং আর ফ্লাওয়ারের কারুকাজ।আজ পরশীর মেহেদি। সন্ধ্যা হতেই বাড়িজুড়ে আত্মীয়-স্বজনের ঢল পড়েছে। বাচ্চা থেকে শুরু করে উঠতি বয়সী যুবক-যুবতীরাও নিজেদেরকে হলুদ শাড়ি, হলুদ পাঞ্জাবিতে মুড়িয়েছে। প্যান্ডেলের মাঝখানটায় পরশীকে নিয়ে আসর বসিয়েছে। ওদিকটায় যায়নি অর্পনা। ওখানে গেলেই চার বছর আগের সেই মেহেদি অনুষ্ঠানের দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠবে। এখন তো অরুণটাও উপস্থিত আছে। এতটা দহন সহ্য করা কি তার পক্ষে সম্ভব? হয়তো না। তাই সে আপাতত বাড়ির ভেতরেই শাশুড়ি, চাচি-শাশুড়ি, মামি-শাশুড়িদের সঙ্গে হাতে হাতে কাজ করে দিচ্ছে। কাজ করতে করতে খেয়াল করলো, সোফার এক কোণায় চুপটি করে বসে আছে একটা মেয়ে। মেয়েটা অরুণের বউ, নাম বৃষ্টি। অরুণের নাকি ছোটবেলায় খুব শখ ছিল কাজিন বিয়ে করার। আল্লাহ বোধহয় ছেলেটার শখ ছোটবেলাতেই কবুল করে নিয়েছেন, যার ফলস্বরূপ মামাতো বোনকে বিয়ে করতে হলো তার।অরুণের সঙ্গে রাগ দেখালেও বৃষ্টির সঙ্গে কোনো রূপ রাগ ঢাক রাখলো না অর্পনা। হাতের কাজগুলো সাইড করে বৃষ্টির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। এদিক-ওদিক তাকিয়ে অরুণের সন্ধান করে বললো— একা বসে আছো কেন? তোমার স্বামী কোথায়?

,,, অর্পনাকে দেখে উঠে দাঁড়ালো বৃষ্টি। ঠোঁটে জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে বললো— জানি না, আপু। হয়তো বাইরে কোথাও একটা আছেন।
,,, অর্পনা ভ্রু কুঁচকালো। মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে অন্তর পর্যন্ত পড়ে ফেলার আধ্যাত্মিক ক্ষমতা রয়েছে তার। বৃষ্টির এই অপ্রস্তুত চাহনি বলে দিচ্ছে, তার আর অরুণের মাঝে কিছুই ঠিক নেই। ছেলেটা কি বউ হিসেবে মেনে নেয়নি ওকে? ভালো-টালো বাসে না? এতটুকু সময়ে মেয়েটাকে যতটা বুঝেছে, মেয়েটা বেশ ঘরোয়া আর সাদাসিধে। দেখতে বেশ মায়াবী, গায়ের রং ফর্সা, ছিমছাম গড়ন। নাক-মুখ, চেহারার কাটিং বড্ড সুনিপুণ। অর্পনা কী ভেবে যেন ধীরে ধীরে হাত উঠিয়ে বৃষ্টির গাল ছুঁলো— মাশাআল্লাহ! বড্ড সুন্দর তুমি।
,,, বৃষ্টি কেমন মলিন হাসলো। যেন মাত্রই ঘন বর্ষণে এক ফালি রোদ উঁকি দিল। মেয়েটার সৌন্দর্যে এবার বিমোহিত হলো অর্পনা। সত্যিই শ্যামলা ছেলেদের বউ একটু বেশিই সুন্দর হয়। বৃষ্টিকে এই পর্যায়ে কেমন অপ্রস্তুত দেখালো। সে চোখ পিটপিট করে কোনো রকমে পানি আটকানোর চেষ্টা চালিয়ে বললো—

— হয়তো আমি সুন্দর, তবে আপনার বান্ধবীর মতো অতটাও নয়। তার মতো সুন্দর হলে হয়তো…
বলেই মাথা নিচু করে নিল মেয়েটা। চোখ থেকে বিনাবাক্যেই পানি গড়িয়ে পড়লো।অর্পনা তপ্ত শ্বাস ফেলে বৃষ্টির কাঁধে হাত রেখে আশ্বাসভরা কণ্ঠে আওড়ালো— আমাদের প্রথম ভালোবাসাগুলো অসম্ভব সুন্দর এবং পবিত্র হয়। কিন্তু সেগুলো ধরে রাখার ক্ষমতা কিংবা ভাগ্য আমাদের থাকে না। তাই বলে এমন নয় যে মানুষ দ্বিতীয়বার ভালোবাসতে পারবে না। সংযুক্তি তত্ত্ব অনুযায়ী, একটা জীবনে মানুষ হুবার প্রেমে পড়ে, একাধিকবার ভালোবাসে; তবে মায়া শুধু একজনের প্রতিই জন্মায়। আর সেই মায়ার টান মানুষকে ধ্বংসের শেষ প্রান্ত থেকেও ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। রাত্রি অরুণের প্রেমিকা, তুমি মায়ায় পরিণত হও। অরুণের থেকে দূরে দূরে থেকো না। ওকে মায়ায় বাঁধার চেষ্টা করো। দেখবে, মায়া তৈরি হলে ভালোবাসাটা আপনাআপনিই চলে আসবে।

,,, বৃষ্টির চোখ থেকে আরও কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো। অর্পনা তর্জনী আঙুল দিয়ে বৃষ্টির গাল থেকে একটুখানি পানি নিয়ে তা টোকা দিয়ে ছিটকে ফেলে বললো— এটা সবার সামনে ঝরাতে নেই। লোকে দুর্বল ভাববে। চলো, তোমাকে স্টেজে দিয়ে আসি।
বলেই বৃষ্টির হাত ধরে বাইরে দিকে চলে গেলো।
প্যান্ডেলের এক কোণায় চুপচাপ বসে আছে ইরাদ। দৃষ্টি ফোনের দিকে স্থির রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে মেয়েটা, কিন্তু বেহায়া নজর বারবার স্টেজের মাঝখানে বসা আসরটায় চলে যাচ্ছে। পরশীকে ঘিরে বসে আছে সবাই। দুপাশে দুজন মেহেদি আর্টিস্ট। একদিকে পরশীর মামাতো ভাই-বোন ও বান্ধবীরা বসে আছে, আর অপরদিকে অরণ্যকে কোলে নিয়ে বসে আছে বিহান। অরুণের কোলে প্রকৃতি, তার পাশে আরাফাত, আরাফাতের পাশে সিদ্ধার্থ, আর সিদ্ধার্থের পাশে অনন্যা। পরপর আরও মেয়েরা বসেছে।সবাই মিলে গানের কম্পিটিশন করছে হয়তো। এখানে থাকা প্রতিটি ব্যক্তির কণ্ঠস্বরই মারাত্মক সুন্দর হওয়ার দরুন আসরটা বেশ জমে উঠেছে। একজনের পর একজন গান করছে, আর সেই গানের সঙ্গে গিটার বাজাচ্ছে সিদ্ধার্থ।লোকটার চোখে-মুখে উপচে পড়া আনন্দ। মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই যে ভোর রাতে তার আর ইরার মাঝে এক দফা তাণ্ডব চলেছে। সে এই যাবৎ ইরার দিকে ফিরে তাকানোরও প্রয়োজন করেনি। উল্টো নিজের ফিয়ন্সির সঙ্গে কিছুক্ষণ পরপর নিচু স্বরে কথা বলতে ব্যস্ত। যার ফলস্বরূপ না চাইতেও ইরাদের দৃষ্টি বারবার সেদিকেই চলে যাচ্ছে।সে তো সিদ্ধার্থকে ঘৃণা করে। তাহলে বুকের ভেতর এত জ্বালন হচ্ছে কেন? কেনইবা ঠেলে ঠুলে কান্না আসছে? একবার ভেবেছিল এখান থেকে উঠে বাড়ির ভেতরে চলে যাবে। কিন্তু সেটাও কেন যেন পারছে না। কেন পারছে না, তার উত্তরও জানা নেই রমনির।

,,,, সিদ্ধার্থ খুব ভালো গিটার বাজায়। গানের গলাও বেশ ভালো। মোট কথা, কাইসার বাড়ির সঙ্গে রিলেটেড প্রতিটি পারসনের কণ্ঠস্বরই বেশ প্রফেশনাল। এমনকি সুস্মিতা কাইসারও গানের দিক থেকে বেশ পারদর্শী ছিলেন। এই কারণেই অর্পনার কোনোদিন নিজেকে নিয়ে সন্দেহ হয়নি। ভেবেছিল, এই গানের গলা হয়তো সে তার নানির বাড়ির মানুষদের থেকেই পেয়েছে। কিন্তু সেসব তো সত্যি নয়। এসব নিয়ে আর ভাবতে চাইলো না অর্পনা।সে কিছুক্ষণ আগেই ইরাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, অথচ মেয়েটার তাতে মন নেই। সে হাতে ফোন আর দৃষ্টি প্যান্ডেলে বসে গিটার বাজাতে থাকা হাস্যোজ্জ্বল সিদ্ধার্থের দিকে রেখে আকাশকুসুম ভাবনায় মত্ত।এ পর্যায়ে অর্পনা বিরক্ত হয়ে এক ঝটকায় ইরাদের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিলো। মুহূর্তেই হকচকিয়ে গেলো মেয়েটা। অর্পনার দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাতেই অর্পনা বললো—

,,,, যেটাতে মনোযোগ নেই, সেটা চোখের সামনে ধরে রাখার কী দরকার?
,,, ইরাদ যেন বুঝলো না। — ম-মানে?
,,, কিছুই না। ওকে নিয়ে একটু পরশীদের কাছে যা। দুহাত ভর্তি করে মেহেদি দিয়ে দিবি। আর হাতের মাঝখানে একটা আননোন পারসনের নাম লিখে দিস।
,,, ইরাদ মাথা ঝাঁকালো। অরুণের সঙ্গে কথা বলুক আর না বলুক, বৃষ্টি তো কোনো দোষ করেনি। তবে আননোন পারসনের নাম লিখতে বলার কারণ খুঁজে পেলো না ইরাদ। বৃষ্টিও কেমন হতভম্ব দৃষ্টিতে অর্পনার দিকে তাকিয়ে। দুজনের অবস্থা দেখে চোখ রাঙালো অর্পনা।— কী হলো? যা।
,,, ইরাদ তাড়াহুড়ো করে বৃষ্টির হাত ধরে এগিয়ে যেতে গিয়েও কেমন থেমে গেল। চকিতে অর্পনার দিকে তাকিয়ে আমতা-আমতা করে শুধালো — ওখানে না গিয়ে এখানে বসে দিয়ে দেই?
,,, ইরাদের কথাটুকু পছন্দ হলো না অর্পনার। ভ্রু কুঁচকে বল— অরুণ ওখানে, গান-বাজনা হচ্ছে ওখানে। মেহেদি এখানে পরাবি কেন?
,,, অর্পনার কথায় তপ্ত শ্বাস ফেললো ইরাদ। মেয়েটা কি বুঝতে পারছে না, সে কেন ওখানে যেতে চাচ্ছে না? অর্পনা কি এতোটাই অবুঝ?ইরাদের দীর্ঘশ্বাসের দাম দিলো না অর্পনা। ভেতরের দিকে হাঁটা দিলো। লোকটা দুপুর থেকে এখনো পর্যন্ত কিছু খায়নি। বোনের বিয়ে নিয়ে যেন সকল দায়িত্ব একা উনারই। এখন কল দিয়ে খেতে আসতে না বললে এই বেলায় আর লোকটার মুখদর্শন পাওয়া যাবে না। অর্পনাকে ব্যস্ত ভঙ্গিতে চলে যেতে দেখে ইরাদ বৃষ্টির হাত ধরে স্টেজের দিকে এগিয়ে গেলো। ইরাদ আর বৃষ্টিকে দেখে প্রকৃতি হাততালি দিতে দিতে লাফিয়ে উঠলো—

— ইলা মাম্মা এছেছে, ইলা মাম্মা এছেছে।
,,, প্রকৃতির এহেন কথায় উপস্থিত সবাই ইরাদ আর বৃষ্টির দিকে তাকালো। বৃষ্টির সঙ্গে অরুণের চোখাচোখি হতেই চোখ সরিয়ে নিলো অরুণ। বড্ড অভিমান হলো মেয়েটার। ইতালিতে না হয় তার খোঁজই নিলো না, নিজের বন্ধুর বাড়িতে এনেও তার একটু খোঁজ নেওয়া যেত না? অথচ এই অভিমানী মুখখানা দেখার প্রয়োজনও মনে করলো না অরুণ। ইরাদের সঙ্গে বৃষ্টিকে দেখে পরশী হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বললো—
— বৃষ্টি ভাবি, আসুন। অরুণ ভাইয়া, ভাবিকে একটু বসার জায়গা করে দিন।
,,, অরুণ ঠোঁট বাঁকিয়ে জোরপূর্বক হাসলো। পরপর বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বললো— আসো, এদিকে।
বলেই নিজের পাশে একটু জায়গা করে দিলো। দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না মেয়েটা। স্বামীর একটুখানি আগ্রহে এগিয়ে গিয়ে অরুণের পাশাপাশি বসে পড়লো।বিষয়টা খুব একটা খারাপ লাগলো না ইরাদের। সে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো— ওদের সঙ্গে বসে থাকো, কেমন? কথা বলতে বলতে কিছুক্ষণের মাঝেই ক্লোজ হয়ে যাবে। আমি এখন যাই।
,,, বৃষ্টি ঘাড় কাত করে মাথা ঝাঁকাতেই ইরাদ চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। তখনই কর্ণকুহরে প্রবেশ করলো অর্ধ-পরিচিত মেয়েলি স্বর—

— আপনি নাকি খুব ভালো মেহেদি পরাতে পারেন?
,,, তৎক্ষণাৎ ঘুরে তাকালো ইরাদ — কে বলেছে?
,,, অনন্যা আড়চোখে সিদ্ধার্থের দিকে তাকালো। সিদ্ধার্থ চোখের ইশারায় মানা করতেই বললো—
— পরশীর থেকে জানতে পারলাম। আমাকে পরিয়ে দিবেন?
,,, মেয়েটার কণ্ঠে কিছুটা অনুরোধ মিশ্রিত ছিল, যার দরুন মানা করতে পারলো না ইরাদ। মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানাতেই অনন্যা উঠে দাঁড়িয়ে ইরাদের হাত টেনে তার ঠিক সামনে বসাতে চাইলো। কিন্তু ইরাদ বসতে রাজি না। সে আড়চোখে একপল সিদ্ধার্থের দিকে তাকিয়ে অনন্যার উদ্দেশ্যে বললো — ওদিকটায় চলো, দিয়ে দিচ্ছি।

,,, অর্পনা ভ্রু কুঁচকে শুধালো— এখানে কী সমস্যা? বসুন এখানে।
,,, ইরাদ ফের নাকচ করে বললো— এখানে তো গান হচ্ছে। গিটারের সাউন্ডটা কেমন বিরক্তিকর। আমার মাথাব্যথা করছে। আমার সঙ্গে ওদিকটায় যেতে পারবে না?
,,,, অনন্যা আড়চোখে সিদ্ধার্থের দিকে তাকালো। মানবের ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি। হয়তো ইরাদের এতটা ইগনোরেন্স মেনে নিতে পারছে না। অনন্যার সঙ্গে সিদ্ধার্থের চোখাচোখি হতেই সিদ্ধার্থ দুদিকে মাথা নাড়িয়ে চোখের ইশারায় বুঝালো, এসবে তার এখন আর কষ্ট হয় না।অথচ ইরাদ ভাবলো অন্য কিছু। ভেবেছে হয়তো অনন্যা সিদ্ধার্থের থেকে অনুমতি চাইছে, আর সিদ্ধার্থ অনন্যাকে চোখের ইশারায় ওর সঙ্গে যেতে মানা করছে। ইরাদ মুচকি হেসে অনন্যার উদ্দেশ্যে বললো—
— তোমার ফিয়ন্স বোধহয় তোমাকে আমার কাছে পাঠাতে দ্বিধাবোধ করছেন। আমি যাই,, তুমি বরং মেহেদি আর্টিস্টদের কাছেই মেহেদি পরে নিও।
,,, অনন্যা তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে ইরাদের হাত ধরে বললো— না, না, তেমন কিছু নয়। চলুন, ওদিকটায় যাই।

,,, বলতে বলতে ইরাদকে নিয়ে স্টেজ থেকে নেমে পড়লো অনন্যা। তবে খুব একটা দূরে গেলো না। এমন একটা জায়গায় বসলো, যেন খুব সহজেই সিদ্ধার্থ ওদের দেখতে এবং শুনতে পায়। ইরাদ আর অনন্যা সামনাসামনি দুটো চেয়ারে বসলো। ইরাদ কিছুটা লম্বা হওয়ায় সুবিধা হয়েছে বেশ। মেয়েটা একটু পা উঁচু করতেই অনন্যা সেখানে ডান হাত রেখে বাম হাতে থাকা মেহেদিটা এগিয়ে দিয়ে আবদার জুড়ে দিলো—
— আমার হাতের মাঝখানটায় বড় করে সিডের নামের প্রথম অক্ষর লিখে দিবেন, কেমন?
,,, ইরাদের বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। না চাইতেও চোখ চলে গেলো সিদ্ধার্থের দিকে। ভেবেছিল, সিড বোধহয় তার দিকেই তাকিয়ে থাকবে। অথচ লোকটা তার ফিয়ন্সির দিকে তাকিয়ে আছে। ইরাদের চোখ দুটো জ্বালা করে উঠলো। কী যন্ত্রণা হলো তার? ছেলেটাকে ঘৃণাও করছে, আবার অন্য কারোর সঙ্গে সহ্যও করতে পারছে না। এটা আবার কেমন টানাপোড়েন? সিডের মতো অন্যায়কারীর জন্য এতটা টানাপোড়েন কতটা যৌক্তিক? ইরার ভাবনার মাঝেই পরশীর বড় মামার ছেলে সিদ্ধার্থের উদ্দেশ্যে বললো—
— অনেক তো গিটার বাজালেন, সিদ্ধার্থ ভাই। এবার একটা গান করুন। আশা করি আপনার গানের গলা মন্দ হবে না।

,,, সিদ্ধার্থ কেন যেন মানা করলো না। মূলত যাদের গানের গলা ভালো, তাদেরকে খুব একটা অনুরোধ করতে হয় না। তারা নিজেদের প্রতি আলাদা রকমভাবেই কনফিডেন্ট থাকে। সিদ্ধার্থ গিটারে টুংটাং শব্দ করতে করতে ইরাদের দিকে তাকালো। অনন্যার হাতে মেহেদি নিয়ে আঁকিবুঁকি করা রমনির দিকে নজর স্থির রেখেই গাইলো—
,,, এ বুকে এত প্রেম, তার চোখে ঘৃণা।
চায়না শুনতে সে, এ বুকের কান্না।
আমি চোখের বালি,, কী করে তাকে বলি
এ বুকে কী বেদনা।
বুঝে না সে বুঝে না, সে তো আজও বুঝে না।

,,, সিদ্বার্থের কন্ঠে এতোটা ব্যাথাতুর স্বরে বাংলা গান শুনে চোখ তুলে তাকালো ইরাদ,, সিদ্বার্থের নজর তার দিকেই স্থির,, ইরাদের ভিতরটা কেমন কেপে উঠলো। কেনো যেনো মনে হচ্ছে এই গানের প্রতিটি লাইন তাকেই ডেডিকেট করে গাইছে মানব। সিদ্বার্থ চোখ ফিরিয়ে নিয়ে পরের লাইন গাইলো–
কাদে মনের কথা, প্রেম কি শুধু ব্যাথা!!
উত্তর আজো মেলো না,, মেলে না, মেলে না,,
বুঝে না সে, বুঝে না, সে তো আজও বুঝে না।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৬ (২)

,,এই পর্যায়ে ইরাদের চোখ জোড়া ঝাপশা হয়ে এলো,, তার কি কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে। কোনো ভাবে কি এটাই সত্যি যে ঐ কাজগুলো সিদ্বার্থ করেনি? তাহলে কে করেছে? সিদ্বার্থের সাথে তার বিয়ে হলে আর কার লাভ হতে পারে? তার কি একবার সিদ্বার্থের কথা শুনা উচিৎ? ভেবে পাচ্চে না রমনি।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৭ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here