Home শ্রাবণ ধারা শ্রাবণ ধারা পর্ব ১

শ্রাবণ ধারা পর্ব ১

শ্রাবণ ধারা পর্ব ১
অনামিকা তাহসিন রোজা

—” তোমার সাহস হয় কী করে আমার শার্টে হাত দেয়ার? হাউ ডেয়ার ইউ স্টুপিড!”
শেখ বাড়ির বড় ছেলে, একইসাথে একমাত্র বংশধর শ্রাবণ শেখের গগনচুম্বী ধমকে রীতিমতো কেঁপে উঠলো ধারা। বেচারির হাত থেকে সদ্য আনা খাবারের প্লেটটাও হাত থেকে ফঁসকে মেঝেতে পড়ে ঝমঝম আওয়াজ তুলল। কাঁপতে কাঁপতে শ্রাবণের দিকে তাকালো মেয়েটি। তোতলানো সুরে জবাব দিল,
—” আমি- আমি তো ভেবেছি, ওটা..আসলে শার্টটা কেমন যেন পুরোনো আর ময়লা লাগছিল। তাই..
কথা সম্পূর্ণ করার আগেই শ্রাবণ জোরালো গলায় চেঁচিয়ে উঠল,
—” তাই বলে তুমি আমার পছন্দের শার্টটার এই হাল করবে? ডিড ইউ লুক এট দিজ? হোয়াট দ্য হেল! ধুতে গিয়ে আমার শার্টটাই ছিঁড়ে ফেলেছো।”
ধারা এবারে চমকে উঠে শ্রাবণের হাতে থাকা সাদা শার্টের দিকে তাকালো। আসলেই ছেঁড়া বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু ধারা যখন ধুয়েছে তখন তো এমন ছিল না। সে তো বেশ যত্ন করেই ধুয়ে শুকোতে দিয়েছিল। এরপর আয়রন করে আলমারিতে গুছিয়ে রেখেছিল। তবে এমন হাল হলো কীভাবে? ধারা ভয়ে ভয়ে কোনোমতে বলল,

—” বিশ্বাস করুন, আমি…আমি এমনটা করিনি।”
শ্রাবণ এবারে শার্টটা মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে তেড়ে এগিয়ে এসে আঙুল উঁচিয়ে বলল,
—” জাস্ট শাট আপ। একদম মিথ্যে বলবে না তুমি। আই হেইট ইউ। আই রিয়েলি হেইট ইউ ইডিয়ট। তোমার থেকে আমাদের মেইড রুনি খালা ভালো কাজ করে। গ্রামের মেয়ে হয়ে কী জানো তুমি? শুধু খেতে জানো?”
ধারা কেঁপে উঠলো স্বামীর ধমকে। চোখের কোণে জল জমে উঠেছে অনেক আগেই। এবারে ঠোঁটও কাঁপতে শুরু করল। কাতর নয়নে তাকিয়ে সে বোঝানোর চেষ্টা করল সে মিথ্যে বলছে না। কিন্তু শ্রাবণ তো নিষ্ঠুর। শুনলো না সে ধারার কথা, দেখলো না ধারার চোখের চাউনি, বুঝলো না তার মন। ধারা তবুও আরেকবার নিজেকে বাঁচাতে মিনমিন করে বলল,

—” আ–আমি ঠিক করে দিচ্ছি শার্টটা। সেলাই করে দিচ্ছি।”
শ্রাবণ যেন তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো। বিরক্তিতে মাথা ঘুরছে তার। মন চাইছে সব কিছু ভাঙচুর করতে। সামনে থাকা মেয়েটা কে আঁছাড় মারতে পারলে আরো শান্তি লাগতো বোধহয়। নিজের রাগকে যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণ করে শ্রাবণ হিসহিসিয়ে জবাব দিল,
—” তোমার মত একটা বেয়াদব, ইউজলেস, স্টুপিড, আনকালচার্ড মেয়ে আমি দুটো দেখিনি। ডোন্ট ইউ ডেয়ার টু টাচ মাই শার্ট এগেইন! কোনো দরকার নেই। এই শার্ট আর পড়ার মত নেই। গিয়ে ফেলে দাও ডাস্টবিনে। পারলে নিজের হাতদুটোও ফেলে দিয়ে এসো। দে আর নট ইউজফুল। ”
গ্রামের মেয়ে ধারা খু্ব একটা ইংরেজি বোঝে না। কিন্তু যতটুকু বোঝে ততটুকু দিয়ে আঁচ করতে পারলো খুব বাজেভাবে তাকে বকেছে শ্রাবণ শেখ। টলমল করা চোখ নামিয়ে সে মাথা নিচু করে নিল। হাতের আঙুলগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে কচলাতে শুরু করেছে ইতোমধ্যে।
শ্রাবণের একটুও মায়া হলো না। সে এবারে এক কদম এগিয়ে এসে ধারার মুখোমুখি দাঁড়ালো। তার রাগের তোপে উষ্ণ হয়ে ওঠা শ্বাস অনুভব করতে পারছে ধারা। ভয়ে বুক কাঁপছে তার। শ্রাবণ সেভাবেই বলে উঠলো,

—” তুমি আসার পর থেকেই আমার জীবনটা জাহান্নাম হয়ে গেছে। আই হেইট ইউ। খুব ঘৃনা করি তোমায়। তুমি সত্যিই একটা অপ্রয়োজনীয় বস্তু। হয়তো এই জন্যই তোমার পরিবারও তোমায় রাখেনি, লাথি মে’রে বের করে দিয়েছে। ইউ ডিজার্ভ ইট একচুয়ালি। ”
বলেই টাওয়াল ঝেড়ে ঘর থেকে দ্রুত পায়ে ভারি কদমে বেরিয়ে গেলো শ্রাবণ। যাওয়ার সময় খুব জোরে শব্দ করে দরজাটা ঠেলে দিয়ে গেলো। সেই দরজা দেয়ালের সাথে বাড়ি খেলেই ধারা পিলে চমকে তাকায়। এতক্ষণ ধরে আটকে রাখা কান্নাগুলো দলা পাকিয়ে যায় তার। অজান্তেই চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা পানি গাল দিয়ে নেমে পড়লেও সে পাত্তা দেয়না। ধীর গতিতে মেঝেতে বসে একটু আগে পড়ে যাওয়া খাবার ভর্তি প্লেটটা উঠিয়ে নেয়। নষ্ট হওয়া ভাতগুলোর দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সেগুলো উঠিয়ে নেয়।

ছোটবেলায় মা-বাবা দুজনকে একসাথে হারিয়েছে ধারা। খুব বাজেভাবেই। অভাবের তাড়নায় তার বাবা-মা দুজনেই গলায় দড়ি দিয়ে পৃথিবী ত্যাগ করেছে। অথচ যাওয়ার আগে একমাত্র সন্তানের ঠিকানাটা বলে দিয়ে যায়নি। ছোট্ট ধারার বয়স তখন মাত্র তিন বছর। সে ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে মা-বাবার ভেজা কবর দেখেছে। সেই সময় তার ছোট চাচা করিম হোসাইন ধারার সরল মুখটা দেখে তাকে ছুঁড়ে দিতে পারেনি। বড় ভাইয়ের মেয়ে, তাও আবার মাত্র তিন বছর বয়স। তাই নিজের মেয়ের মত আশ্রয় দিয়েছিল নিজ বাড়িতে। যদিও দিন এনে দিন খাওয়ার মত অবস্থা ছিল তার নিজেরও। সেই কারনেই হয়তো ধারার চাচি সোহাগি বেগম দুচোখে সহ্য করতে পারতো না ধারাকে।
প্রথম কয়েকটা বছর কোনোমতে গেলেও ধারার বয়স যখন ৬ হলো। তখনই নি’র্যা’তন, অ’ত্যাচার শুরু হলো তার উপর। ঘুমোনোর জন্য বিছানা, খিদে মেটানোর জন্য খাবার, পরনের কাপড়, কিছুই পেত না সে। সারাদিন চুলোর পাড়ে বসে আগুনের তাপে মুখ পুড়িয়ে রান্না করলে কেবল দু’বেলা বাসি খাবার আর তার চাচাতো বোনের ছেঁড়া পুরোনো কাপড় পেত, শুধুমাত্র লজ্জা নিবারনের জন্য। ধারা নিশ্চিত কাপড় পরিধানের বাধ্যবাধকতা না থাকলে তার চাচি সেটাও তাকে দিত না।

রান্না শিখতে বেশিদিন লাগেনি তার, খুন্তির ছ্যাঁকা, ছুরির আঘাত খেয়ে কি আর বসে থাকা যায়? সাত-আট বছর বয়সেই রান্না করতে পটু হয়ে গেছিল সে। সাথে যাবতীয় সব কাজ করতে। প্রথম প্রথম করিম হোসাইন ভাতিজির উপর এই বর্বরতা নিতে পারত না। কিন্তু দিন যতই যায়, অভাব বেড়ে যায়, সোহাগি বেগমের উস্কানিমূলক কথাবার্তাও বেড়ে যায়। তাই সময়ের পরিক্রমায় করিম সাহেবও ধারাকে বোঝা মনে করতে শুরু করলেন। বিয়ে দিতে গেলেও মোটা অঙ্কের যৌতুকের জন্য দিতে পারতেন না। মানবিকতাবোধ একটু ছিল বলে বাচ্চা মেয়েটাকে বিক্রি করে দেন নি। এক একটা দিন ধারার কাছে এক একটা যুগের মতই কাটতো। জাহান্নাম কাকে বলে- তা পৃথিবীতেই টের পেয়েছিল ধারা। বয়স বেড়ে ১৪ তে আসলে, পৃথিবী চিনতে শিখলে, ধারা ভাবতে থাকে কোন পাপের কারনে তার এই জীবন পেতে হয়েছে? কী এমন পাপ ছিল তার? নাকি তার বাবা-মায়ের আত্ম’হ’ত্যার পাপ লেগেছে তার উপর? প্রতিদিন রাতে এসব ভাবতো ধারা। জবাব পেত না।

যখন তার বয়স ১৭ হলো, তখন গাঁয়ের প্রধান ৫৬ বছর বয়সী চৌধুরী সাহেব ধারার দিকে কুনজর দিলেন। প্রস্তাব দিলেন তাকে বিয়ে করার। নইলে তুলে আনারও হুমকি দিলেন। লোভে, অভাবের তাড়নায় করিম সাহেব রাজি হলেন। কিন্তু চৌধুরী সাহেবের ছেলে ছিলেন শিক্ষিত এবং ভালো একজন মানুষ। তাই সে এই অন্যায় সহ্য করতে পারেন নি। নিজের বাবার কাজে লজ্জিত হয়ে সে সাহায্য চাইলো তার দুঃসম্পর্কের বড় চাচা সামিউল শেখের কাছে। ঢাকায় বসবাসরত ব্যবসায়ী সামিউল শেখ কথাখানা শুনেই দ্রুত গ্রামে হাজির হলেন এবং ধারার দায়িত্ব নিজে নিতে চাইলেন। অনেক ঝগড়া-বিবাদ, হট্টগোলের পর তিনি ধারাকে শহরে নিয়ে আসতে পেরেছেন। নিয়ে আসার আগে তিনি গোটা গ্রামবাসীর কাছে জবান দিয়ে গিয়েছেন, ধারাকে নিজের ছেলের বউ বানাবেন।
ধারা নিতান্তই এক পুতুল। সেই সময় শুধু তার মাথায় একটাই কথা ছিল- বাঁচতে হবে। তাই তাকে যে যেভাবে চলতে বলেছে সে সেভাবেই চলেছে। সামিউল শেখ কে বিশ্বাস করে গ্রাম থেকে চলে এসেছে সে। তবে শহরে আসার পর যে তাকে আবারো এক নি”র্যাতনের পর্বে সামিল হতে হবে তা সে ভাবেনি।

শ্রাবণ শেখ এ বাড়ির একমাত্র সন্তান এবং স্পষ্টভাবে বিগড়ে যাওয়া সন্তান। কোনোভাবেই ঘরমুখো করা যায়নি তাকে। তার মা সালমা বেগম পূর্বে প্রাইমারি স্কুলের টিচার ছিলেন। ফলস্বরূপ শ্রাবণকে বাড়ির মেইডের কাছে ছোটবেলাটা কাটাতে হয়েছে। বাবা মা কাওকেই কাছে পায়নি শ্রাবণ। যেই কারনে একটা আফসোস এবং সেই থেকে একটা ক্ষোভ রয়ে গেছে তার। হয়তো বা এই কারনেই এমন উগ্রমেজাজী, জেদি ও রাগী হয়েছে সে। সালমা বেগম বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন শ্রাবণকে ঠিক পথে আনার। অনেক কষ্টে সামিউল শেখের বিজনেসে তাকে কাজ করাতে পেরেছেন। শুধু পারেন নি বিয়েটা করাতে। সেই দিন ধারাকে শহরে নিয়ে এসে ইমোশনাল ব্লাকমেইল করে, ত্যাজ্যপুত্র করার হুমকি দিয়ে এবং পিতৃত্ব ফলিয়ে সামিউল শেখ জোরপূর্বক শ্রাবণের সাথে ধারার বিয়ে দেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল শ্রাবণ অন্তত ধারার সাথে বিনয়ী হবে। অথচ তাকে ভুল প্রমাণিত করে শ্রাবণ এবারে ধারার উপর রাগ ঝারতে শুরু করলো।

শুধুমাত্র গ্রাম্য মেয়ে বলে ধারাকে খ্যাত উপাধি দিয়ে অবহেলা করতে থাকলো শ্রাবণ। সালমা বেগমের পছন্দ হয়েছে ধারাকে। শ্বশুর শ্বাশুড়ির কাছে আদর যত্ন পেলেও শ্রাবণের কাছ থেকে এখানে আসার আজ তিন দিন ধরে সে অবহেলা, ঘৃনা পেয়েই যাচ্ছে। এসবে অভ্যাস তার ছোট থেকেই৷ তাই তেমন অবাক হয়নি। তবে কষ্ট পাচ্ছে শ্রাবণের ব্যবহারে। সে আশা করেনি এমনটা হবে। লোকটা তার স্বামী, হয়তো একটু হলেও ভালোবাসবে, আদর করবে- এই আশা নিয়ে ছিল বেচারি। কিন্তু ফাটা কপালে তার পদ্ম ফোটেনি। তিন দিন যাবৎই স্বামীর বিভিন্ন রূপ দেখছে সে। আর হতাশ হচ্ছে ক্ষনে ক্ষনে।

শ্রাবণ ধারা পর্ব ২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here