শ্রাবণ ধারা পর্ব ১৪
অনামিকা তাহসিন রোজা
হাউমাউ করে ঘরে বসে কান্না করছে ধারা। মানুষ ভুল সময়ে ভুল কাজ করে বসে সর্বদা। এ যেন মানুষের এক নির্ধারিত অবধারিত বৈশিষ্ট্য। ধারও ভুল করেছে। বিরাট এক ভুল করে ফেলেছে সে। শ্রাবণের সাথে উচ্চস্বরে কথা বলাটা হয়তো এক দিক দিয়ে তার আত্মসম্মান বৃদ্ধি করেছে, কিন্তু আরেক দিকে দিয়ে স্ত্রী-মনের সাইকোলজি যে ভিন্ন। এ যেন কারো কথা মানে না। এ যে ছন্নছাড়া। আত্মসম্মানবোধ ফুরিয়ে যায়- যখন মায়া, প্রেম ও ভালোবাসার কথা জেগে ওঠে।
শ্রাবণ নেই। একদমই নেই। পুরো বাড়িতে কোথাও নেই। সেই সময় ঘর থেকে ধারার সাথে চেঁচামেচি করে বেরিয়ে গেছে, এখন প্রায় রাত বারোটা বেজে গেছে। তবুও ফেরেনি শ্রাবণ শেখ। কোথায় গিয়েছে, কখন ফিরবে, আদৌও ফিরবে কিনা কেও জানে না। সেই সময় ধারার মাঝে কি যেন ভর করেছিল। নইলে কেনো সে এত কথা শোনাতে গেল লোকটাকে। ধারা তো সেই সময় শ্রাবণ চলে যাওয়াতে রাগে দুঃখে ঘরে গিয়ে ঘাপটি মেরে বসেছিল। আধ ঘন্টা পর সালমা বেগম এসে চিন্তিত স্বরে যখন বললেন
—’ শ্রাবণ কি এখনো বাড়িতে আসেনি ধারা?”
তখনই বুকটা কেঁপে উঠে ধারার। লোকটা বাড়িতে ফেরেনি এখনো? রাগ করে কি চলে গেল? কোথায় গেল? ধারা প্রথমে চুপচাপ বসে ছিল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমলেও তা উপেক্ষা করে ধারা ঘড়ির দিকে আকুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। ভেবেছিল এক্ষুনি চলে আসবেন উনি। কিন্তু এলো না। ঘড়ির কাটা এক এক ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও শ্রাবণ এখনো ফিরল না। নীল ও সালমা বেগম বারবার চেষ্টা করেছে শ্রাবণের নম্বরে কল করতে, কিন্তু ফোনে কলই ঢোকেনি। নন-রিচেবল দেখাচ্ছে বারবার! এদিকে সবার অস্থিরতা দেখে হাত পা কাঁপতে শুরু করে বেচারি ধারার। মনে মনে অপরাধবোধ কুঁড়ে কুঁড়ে খায় তাকে।
একটা সময় পর নিজেকে আর সামলাতে পারেনা ধারা। শ্বাশুড়িকে ঘরে ডেকে এনে আড়ালে প্রথম থেকে সব ঘটনা খুলে বলে এবং বুক ভেঙে কান্না শুরু করে। সালমা বেগম পুরো ঘটনা শুনে হাসবেন নাকি কাঁদবেন তা বুঝে উঠতে পারেন না। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। হাতে থাকা ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ক্লান্ত ভঙ্গিতে নীলকে বলেন
—” নীল! যা বাপ, ঘুমোতে যা। তোর ভাইজান আজ আসবেনা এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ঝড়ে এ বাড়ি উড়ে গেলেও ও আসবেনা আজ। শুধু শুধু চেষ্টা করে লাভ নেই। তুই ঘুমোতে যা।”
নীল সত্যিই ক্লান্ত ছিল। আর শ্রাবণের উপর বিশ্বাস ছিল। তাই সালমা বেগমের কথা মেনে নিয়ে সে ঘুমোতে চলে গেল। কিন্তু মানতে পারল না ধারা। সে আবারো ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে ফেলল। সালমা বেগম মুখ কুঁচকে তাকালেন। তার ছেলে, বউ দুজনেই নাটকবাজ- এটা তিনি আবিষ্কার করতে পারলেন।
ধারা হয়তো কখনো তার মাটির পুতুল ভেঙে যাওয়াতেও এত দুঃখ পায়নি যত দুঃখ আজ সে একসাথে পাচ্ছে। এমনিতেই লোকটা শান্তিমত খেতে পারেনি তার কথার কারনে। তার উপর বাড়ি থেকে উধাও হয়ে গিয়েছে। সালমা বেগমের মাঝে কোনো চিন্তার রেখা দেখা গেল না আর। তিনি হাঁপিয়ে ওঠে সোফায় ধপ করে বসলেন। ধারাও আস্তেধীরে পাশে বসে আকুল নয়নে শ্বাশুড়ির দিকে তাকিয়ে রইল, যেন কোনো সমাধান এখনই ভদ্রমহিলা দিয়ে দেবেন।
সালমা বেগম চোখের চশমা শাড়ির আঁচলে মুছতে মুছতে ভ্রু কুঁচকে বললেন,
—” ওভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো?”
ধারা দুঃখী কন্ঠে বলল,
—” উনি কখন আসবেন মা বলুন না!”
সালমা বেগমের মন চাইল মেয়েটাকে আঁছাড় মারতে। ধমক দিয়ে তিনি নিজেরই ছেলের বিরূদ্ধে গিয়ে বললেন,
—” তোকে থাপ্পড় দেয়া উচিত ধারা। চুপ কর। অনেক হয়েছে। এত ‘উনি উনি’ করিস কেনো তুই? যে তোকে পাত্তা দেয়না, যে তোকে নিয়ে ভাবেই না, তার জন্য চোখের পানি ফেলিস কোন দুঃখে? একটুও লজ্জা করেনা? একটুও সম্মান নেই তোর?”
ধারা মাথা নিচু করে ফেলল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটু সময় নিয়ে ওড়নায় আঙুল পেঁচিয়ে স্বর নিচু করে বলল,
—” উনি ছাড়া আমার আর কে আছে মা?”
সালমা বেগম কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ধারার পরের কথাগুলো শুনে থেমে গেলেন তিনি। ধারা এবার মাথা তুলে তাকাল। চোখ ভেজা, কিন্তু দৃষ্টিটা অদ্ভুতভাবে শান্ত। মেয়েটা মলিন হেসে বলল,
—” আমি জানি মা, আমি তো জানি উনি আমাকে পছন্দ করেন না। আমি এটাও বুঝি, আমি উনার জীবনের জন্য মানানসই মানুষ না। কিন্তু…তবুও তো উনি আমার স্বামী।”
একটু থামল সে। বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আসছে, তবুও কথাগুলো থামাল না।
—” আমি তো কাউকে বেছে নিয়ে আসিনি মা। আমার জন্য কেউ বসে ছিল না, কেউ হাত বাড়িয়ে দেয়নি। যেদিন এখানে এলাম, সেদিনই প্রথম মনে হয়েছিল, আমারও একটা জায়গা আছে। যখন অবুঝ ছিলাম, সেই আমি ছোট থেকেই কাউকে ‘আপন’ বলে ডাকতে পারিনি। মা নেই, বাবা নেই… কোথাও গেলে কেউ বলে না-‘সাবধানে যাস’। কেও জিজ্ঞেস করে নি -‘কী খেয়েছিস সকালে?’ কেও একটাবার দেখতেও আসেনি আমি বেঁচে আছি কিনা। সেই এক বিধ্বস্ত অস্থায়ী জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে এখানে ঠাঁই পেয়েছি আমি।”
ধারার গলা একটু ভেঙে গেল, তবুও হাসার চেষ্টা করল। চোখে সদ্য আসা পানিটুকু মুছে ফেলে বলল,
—” আপনি যখন প্রথম দিন আমাকে ‘মা’ বলে ডাকতে দিলেন, আমার খুব অদ্ভুত লেগেছিল জানেন? মনে হয়েছিল, সত্যিই বুঝি আমারও কেউ আছে। আমার শ্বশুর কে কখনো বাবার থেকে কম মনে হয়নি। আর উনি…উনি তো আমার স্বামী। আমি তো ওনার নামে কবুল বলেছি মা। আমার জীবনে যদি কেউ থাকে, তাহলে তো উনিই থাকবে। এখন আমার মত এই এতিমের কে আছে? আল্লাহ না করুক, একটা সময় আপনি বা বাবাও তো থাকবেন না। তখন এ পৃথিবীতে আমার আপন বলতে কে থাকবে মা? অন্তত এই কবুল আর সম্পর্কের জোরে বলতে পারব, আমার আপন কেও আছে। আমার পিছুটান আছে। এ পৃথিবীতে সে ছাড়া আর কে থাকবে আমার?”
বলতে বলতে গাল বেয়ে চোখের পানি পড়ল। অজান্তেই ধারা চোখ মুছল, কিন্তু এবার কণ্ঠে এক ধরনের দৃঢ়তা এনে বলল,
—” আমি উনার কাছ থেকে কিছু চাই না। না ভালোবাসা, না স্নেহ। শুধু…একটু জায়গা। এই বাড়িতে… উনার জীবনে… একটু জায়গা। উনি রাগ করুক, বকা দিক—আমি সব সহ্য করতে পারি। যখন আমার নামমাত্র চাচা-চাচির অ”ত্যাচার সহ্য করেছি ছোট থেকে, তখন আমার আপন কারো অ”ত্যাচার কেনো সহ্য করতে পারবনা? করুক না উনি। অবশ্যই একটা সময় ক্লান্ত হবেন। তখন কি আমায় মেনে নেবেন না? আমার দৃঢ় বিশ্বাস উনি কখনো আমাকে ফেলে দেবেন না। কখনো একদম ছুঁড়ে ফেলবে না।”
ধারা আবারো মাথা নিচু করল। ভাঙা স্বরে বলল,
—” আমি ভয় পাই মা। উনি যদি কখনো আমার উপর বিরক্ত হয়ে বলেন- এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও। তখন আমি কোথায় যাব? আমার তো যাওয়ার জায়গা নেই। কোথায় যাব আমি? আমি তো অসহায়। আর সত্যিই তো আমি আত্মনির্ভরশীল নই। সত্যিই তো আমার কিছু নেই। এই সম্পর্কটা, এই আশ্রয় টা ছাড়া আমার আর কী আছে মা বলুন?”
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ধারার বুক থেকে। ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সালমা বেগম শুকনো ঢোক গিলে চোখের পানি সামলালেন। মেয়েটার একটা কথাও ভুল নয়। কিন্তু মেনে নেয়া কষ্টকর। কিছু বললেন না ভদ্রমহিলা। শুধু ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ধারার মাথায় হাত রাখলেন। এই প্রথমবার, ধারা নিজের কান্নাটা লুকানোর চেষ্টা করল না। ঝরঝর করে আবারো কেঁদে দিল। সেই আকুল নয়নে তাকিয়ে আবারো জিজ্ঞেস করে বসল,
—” বলুন না মা, উনি কখন ফিরবে? উনি কি বেশি রাগ করেছে? আর আসবে না বাড়িতে? কখন আসবেন উনি?”
সালমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, কন্ঠ বড্ড নির্বিকার শোনাল,
—” কখন আসবে তা তো জানি না। তবে ঘটনা শুনে বুঝলাম আজ আর আসবেনা। নিশ্চিত থাক।”
ধারা আঁতকে উঠল। ওড়না বুকে চেপে ধরে চিন্তিত নয়নে তাকিয়ে বলল,
—” সে কি! তাহলে রাতে থাকবে কোথায়? গিয়েছেনই বা কোথায়? আপনি কি জানেন মা?”
সালমা বেগম ঠোঁট বাঁকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—” খুব বেশি ভুল না করলে ও কোথায় আছে এটা জিহান ভালো বলতে পারবে। জিহান শহরে থাকলে আমি ওকে নিয়ে টেনশন করি না ধারা। যাওয়ার জায়গা বলতে, হয় অফিসে গিয়ে বসে থাকবে সারারাত, আর নইলে জিহানের সাথে ব্রিজের উপরে বসে থাকবে বাইক নিয়ে!”
ধারা ক্ষান্ত হলো না। মন সন্তুষ্ট হলো না তার। মুখের মলিনতা একটুও কমলো না। সালমা বেগম উঠে দাঁড়ালেন,
—” চল ঘুমোতে আয়।”
ধারা মাথা নিচু রেখেই দু’দিকে মাথা নাড়াল,
—” উহু, আপনি যান মা। আমি ঘুমাব না।”
—” সে কি! কেনো?’
—” উনি আসুক আগে।”
সালমা বেগম আবারো ফোঁস করে শ্বাস ফেললেন। এখন যদি উনি টেনেহিঁচড়েও নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তবুও ধারাকে এখান থেকে সরাতে পারবেন না। একজন নারী হয়ে তিনি অবশ্যই এটা জানেন। আর এও জানেন ধারা শ্রাবণের জন্য কতটা দুর্বল। কিছু বলে কাজ হবেনা বলে সময় নষ্ট করলেন না সালমা বেগম। এগিয়ে এসে নিজের ফোনটা ধারার হাতে দিলেন
—” এখানে জিহানের নাম্বার আছে। তুই চাইলে ওকে কল করতে পারিস। খবর পাবি। আমি আর নিতে পারছিনা, তার থেকে বরং ঘুমোতে যাই।”
আর কিছু বলতে পারলেন না ভদ্রমহিলা। মনে মনে সামিউল শেখ ফিরলে ছেলের নামে হাজারটা অভিযোগ করার তীব্র পরিকল্পনা করে তিনি ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেন।বুড়ো বয়সে এসব আর ভালো লাগছে না তার। কোথায় তিনি নাতি-নাতনিদের সাথে খেলাধুলা করবেন, বসে বসে পান চিবুবেন, তা না, এখনো সেই ছোটবেলার মত ছেলেকেই সামলাতে হচ্ছে। শুধু পার্থক্য হলো সাথে ছেলেবউকেও সামলাতে হচ্ছে।
সালমা বেগম চলে যাওয়ার পর ধারা মলিন মুখটা নিয়ে হাতের মুঠোয় থাকা বাটন ফোনটার দিকে তাকাল। এরপর ধীরে ধীরে কন্টাক্ট লিস্ট থেকে খুঁজে খুঁজে জিহানের নাম্বার বের করল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো মেয়েটা। কী করবে ভাবছে সে। এদিকে সিঁড়ির আড়াল থেকে একটা ছায়া স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। বেশ অনেকক্ষণ যাবতই সে স্থির হয়ে তাদের কথা শুনছিল এখানে। সালমা বেগমের প্রস্থান নেয়ার পর ছায়াটাও ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। অদ্ভুত ভাবে সেও একইভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ঢাকা শহরের জন্য এখন রাত অনেকটাই গভীর হয়ে গেছে। শহরের ব্যস্ততা থেমে গেলেও কিছু জায়গা তখনও জেগে থাকে। নিয়ন আলো, ভারী মিউজিক আর অদ্ভুত সব না বলা কষ্ট নিয়ে। এমনই এক আধো অন্ধকার ক্লাবের কোণার টেবিলে বসে আছে শ্রাবণ। টেবিলের উপর কাঁচের গ্লাস। গাঢ় রঙের পানীয়টা আলোতে চকচক করছে। একবারে শেষ করে আবার ঢালছে সে। আবার ঢকঢক করে মুখ কুঁচকে গিলে শেষ করছে। দেখে মনে হলো ছেলেটা গ্লাসটা না, নিজের ভেতরের কিছু খালি করার চেষ্টা করছে। কোনোরকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়া শ্রাবণ একের পর এক অ্যালকোহলের মাঝারি বোতল শেষ করছে। এবং এই করুণ দৃশ্যটা সামনের চেয়ারে বসে বসে থুতনিতে হাত রেখে দেখছে জিহান। মুখটা এমন করে কুঁচকে আছে যেন কেউ তাকে জোর করে করলার জুস খাওয়াচ্ছে বা কী করে খেতে হয় তা দেখাচ্ছে।
—” ভাই, আমি শেষবারের মতো বলছি, তুই কফি খাস, অ্যালকোহল না। বেশি ফ্লেক্স করতে যাস না বাপ, বমি করে দিবি। এই জিনিসটা তোর সাথে মানায় না।”
শ্রাবণ গ্লাসটা ঠুক করে নামিয়ে রেখে কাঁধ ঝাঁকাল,
—” আজ থেকে মানাবে। আপডেটেড ভার্সন।”
জিহান চোখ বড় বড় করে তাকাল,
—” তুই সফটওয়্যার নাকি রে, আপডেট দিবি?”
শ্রাবণ হালকা হেসে আবার গ্লাস তুলল,
—” শাট আপ। মাথা খারাপ হয়ে গেছে আমার।”
জিহান এবার একটু সিরিয়াস হলো,
—” সেটা তো আমি দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু এতটা?”
—” ডোন্ট ডিস্টার্ব মি! চিয়ার্স! ”
—” মামা তুমি যে মাতাল হয়ে গেছো সেটা বুঝতে পারছো? নেশা হয়ে গেছে অলরেডি। ”
শ্রাবণ যেন কথাটা শুনলোই না। কেননা সত্যি সত্যিই নেশা হয়ে গেছে তার। কিন্তু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। আরেক গ্লাস এক ঢোকে ফাঁকা করল, তারপর ধীরে ধীরে বলল,
—” জানিস..তুই জানিস? ওই মেয়েটা…!”
জিহান ভ্রু তুলল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—” ওহহ, ফাইনালি ! মূল নাটকের হিরোইন এন্ট্রি!”
শ্রাবণ চোখ রাঙাল,
—” জোক মারিস না। সিরিয়াস কথা বলছি।”
—” আচ্ছা আচ্ছা বল।”
শ্রাবণ গ্লাসের ভেতরে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর একটু থেমে বলল,
—” আমি ওকে সহ্য করতে পারি না। একদম না। ও একটা বেয়াদব, অভদ্র মেয়ে।”
জিহান মাথা নাড়ল। কৃত্রিম হেসে দাঁত চেপে বলল,
—” মিস্টার শ্রাবণ শেখ, এখানে সেই দু ঘন্টা যাবৎ বসে বসে আমি এই ডায়লগটাই একুশ বার শুনলাম। নতুন কিছু বলুন প্লিজ। কাহিনী তো শুধু ওই মেয়েতেই আটকে রয়েছে।”
শ্রাবণ এবার বিরক্ত হয়ে বলল,
—” আরে শোন তো! মুখ বন্ধ রাখ। তুইও তো দেখছি আমার কথা মানতে পারিস না। চুপচাপ শোন। ওই বেয়াদবটা একটা অদ্ভুত! একদম অদ্ভুত!”
—” কীভাবে?”
—” আমি রাগ করি, ও চুপ করে থাকে। আমি অপমান করি, ও সহ্য করে। আবার হঠাৎ..একদম হঠাৎ এমন কথা বলে বসে যে আমার মাথা ঘুরে যায়! হাহ! মেয়েটা কি নাটক করে ভালো হওয়ার? বিষয়টা চিন্তার না?”
জিহান ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখল,
—” হ্যাঁ, অনেক চিন্তার বিষয়। চালিয়ে যা। তারপর?”
শ্রাবণ এবার একটু ঝুঁকে এলো। অ্যালকোহলের সাথে হালকা পানি মিশিয়ে এক চুমুক খেয়ে মুখ কুঁচকে বলল,
—” আজকে… আজকে ও আমার সামনে দাঁড়িয়ে… আমাকে…. আমাকে বলল, তালাক দিন! মুখে তালাক চায়! বেয়াদবটার কলিজা কত বড় ভেবে দেখ!”
তালাক- শব্দটা বলার সময় গলায় অদ্ভুত একটা ভাঙন এলো শ্রাবণের। হতাশা কাজ করছে বোঝা গেল।
জিহান থমকে গেল। সে এটা আশা করেনি। ধারা কেনো তালাক চাইবে? এমন তো হওয়ার কথা না। জিহান একটু এগিয়ে নড়েচড়ে বসে বলল,
—” তারপর?”
শ্রাবণ হেসে ফেলল, কিন্তু সেই হাসি ফাঁপা,
—” তারপর আর কী? আমি দিইনি। কেনো দেব? ওই বেয়াদব যা চাইবে, কিচ্ছু দেবনা। বরং উল্টো কাজ করব। সব উল্টো করব। ওকে আমি মুখে তালাক দিইনি। দিচ্ছি না..দেবও না। এবার তো আরো দেব না। পারলে ওর জন্য সতীন আনব, তাও তালাক আর দেব না।”
জিহান না চাইতেও ফিক করে হেসে ফেলল। শ্রাবণের যে নেশা হয়ে গেছে এটা স্পষ্ট। তবে মুহুর্ত টা নষ্ট করতে চাইলো না জিহান। কিছু কিছু সময় বাক্সবন্দি করে রাখার মত। এইযে শ্রাবণ মাতাল হয়ে এত কিছু বলছে, স্বাভাবিক থাকলে কি সে শুনতে পারতো? হুট করে জিহানের মনে হলো, এটাই সুযোগ শ্রাবণের বুক ফাটিয়ে মনের কথা বের করার। সে এবারে নড়েচড়ে বসে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” তালাক তাহলে কেনো দিস নি? শুধু এ কারনেই?”
প্রশ্নটা শুনে শ্রাবণ থেমে গেল। চুপ রইলো। ভাবল। পুরো ক্লাবের শব্দ যেন এক মুহূর্তের জন্য মিউট হয়ে গেল তার কাছে। কিছুক্ষণ পর ধীরে বলল,
—” জানি না।”
জিহান এবার আর হাসল না। চুপচাপ তাকিয়ে রইল
শ্রাবণ আবার বলতে শুরু করল, এবার একটু মাতাল কণ্ঠে,
—” আমি তো চাইছিলাম এই বিয়ে শেষ করতে। তাই না? সব প্ল্যান রেডি। ডিভোর্স, ফিনিশ, গেম ওভার। বেয়াদব টাকে গ্রামে রেখে আসতাম আবার!”
একটু থামল শ্রাবণ। চোখে ঝিলিক দেখা গেল তার। সেই মুহুর্তে ডুবে গিয়ে আরেক চুমুক বিষাক্ত পানীয়টা খেয়ে বলল,
—” কিন্তু… যখন ও নিজে বলল..যখন নিজে তালাক চাইল,… কেন যেন…ভালো লাগেনি।”
জিহান হালকা করে বলল,
—” একটু খারাপ লেগেছে?”
শ্রাবণ মাথা নাড়ল,
—” না। খারাপ না.. অদ্ভুত।”
তারপর হঠাৎ হেসে উঠল,
—” আরেকটা কথা শুনবি?”
—” বল।”
—” ও আজকে বলল, পৃথিবীর যেকোনো মেয়ে নীলকে পছন্দ করবে!”
এরপর শ্রাবণ কলার ঝাঁকিয়ে গর্ব করে বলল,
—” ওই বেয়াদব টা কি জানে আমার পেছনে কত কত মেয়ে ঘোরে?”
জিহান এবার হেসে ফেলল,
—” আরেহ হ্যাঁ হ্যাঁ সেটাই তো। ও যদি জানতো ভার্সিটির কত কত মেয়েকে তুই রিজেক্ট করেছিস, তাহলে গড়াগড়ি খেতো। গর্বে বুক ফুলিয়ে সমাজে মুখে ঝামা ঘষে দিত।”
শ্রাবণ আরেক সিপ খেয়ে মুখ কুঁচকে বলল,
—” ওই বেয়াদব টাকে বলে আসবি আমি ভার্সিটি লাইফে ২১ টা, না না, ২২ টা মেয়েকে রিজেক্ট করেছি। এই শ্রাবণ শেখের পিছনে কত কত মেয়ে ঘুরে সেটা ওকে বলে আয় জিহান। অভদ্রটাকে দেখিয়ে আয় পুরো পৃথিবী শ্রাবণ শেখের জন্য পাগল। হাহ!”
নিজের বুকে আঙুল ঠেকিয়ে কথাগুলো বলে আবারো টেবিলের দিকে হেলে গেল শ্রাবণ। শরীর আর কুলোচ্ছে না তার।
জিহান বিড়বিড় করে বলল,
—” শালা বাইরে দু টাকার এত অ্যাটিটিউট দেখিয়ে এখন বসে বসে কীর্তন করছে। ঠিকে আছে।”
এরপর সে বলল,
—” ঠিক আছে। তোর ভার্সিটি লাইফের সার্টিফিকেট দিয়ে আসব তোর ওই বেয়াদবকে।”
শ্রাবণ চোখ রাঙাল আবার,
—” সত্যিই দিবি তো? আমি সিরিয়াস!”
—” আমিও ! বাট.. তুই জেলাস, বাপ!”
শ্রাবণ সাথে সাথে গর্জে উঠল, —” ইম্পসিবল!”
—” পসিবল ভাইজান। খুব পসিবল।”
শ্রাবণ চুপ করে গেল। গ্লাসে আঙুল ঘোরাতে লাগল। ধীরে ধীরে বলল,
—” আমি কেনো জেলাস হবো? ও আমার…কিছুই না।”
জিহান সামনে ঝুঁকে শান্ত গলায় বলল,
—” তাহলে নীলের সাথে ওকে খিকখিক করে হাসতে দেখে মাথার তারগুলো কটমট করে ছিঁড়ছে কেনো? এখানে বসে ছাঁইপাস গিলছিস কেনো?”
শ্রাবণ চুপ করে রইলো। নেশা হয়ে যাওয়ায় আধখোলা চোখেই তাকিয়ে রইলো জিহানের দিকে। বর্ননার করার মত ভাষা পেল না। জিহান আবারো বলল,
—” ও অন্য কারো সাথে কথা বললে তুই ট্রিগার হোস কেনো? আর ওর কথা শুনে তুই পালিয়ে এখানে এসে বসে আছিস কেনো? শেষে কিনা তালাক শব্দের ভয়ে পালালি?”
বলেই হো হো করে হাসতে থাকে জিহান। শ্রাবণ যখন এখানে এসে পৌঁছেছে তখন কেমন অস্থির হয়ে ছিল তা দেখেছে সে নিজ চোখে। একটু আগেই বুঝতে পারল শেখ বাড়ির ছেলে তালাকের কথা শুনে নিজেই ভয় পেয়েছে। এইবার শ্রাবণ মাথা তুলে তাকাল। চোখ দুটো লাল। ক্লান্ত। কিন্তু ভেতরে কিছু একটা স্বীকার করতে না চাওয়ার জেদ স্পষ্ট।
সে বিড়বিড় করে বলল,
—” আমি…শুধু শান্তি চাই।”
জিহান হালকা হেসে মাথা নাড়ল,
—” হ্যাঁ হ্যাঁ, আর সাথে তোর ওই বেয়াদবকেও।”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকাল। এবার আর কিছু বলল না। শুধু গ্লাসটা ঠোঁটে নিয়ে থেমে রইল। পান করল না। হাতটা মাঝপথে থেমে গেল। চোখের কোথায় যেন একটা দৃশ্য ভেসে উঠেছে, ধারার সেই ভেজা চোখ, কাঁপা গলায় বলা-তালাক দিন! শ্রাবণ চোখ বন্ধ করল। ধীরে ফিসফিস করে বলল, —” ও কাঁদছিল…
জিহান কিছু বলল না।
শ্রাবণ আবার বলল,
—” আমার জন্য কাঁদছিল…ওর চোখে আমি ঘৃনা দেখলাম বোধহয়।”
এইবার গ্লাসটা নামিয়ে রাখল সে। মাথা নিচু করে রইলো। ক্লান্ত স্বরে বলল,
—” আমি.. খারাপ মানুষ নাকি? ঘৃনা করে আমায়? এতদিন তো এভাবে তাকায়নি। আজ ওর চোখে এত ঘৃনা কেনো ছিল? ও কি আর আমার জন্য রান্না করবে না? আমার জন্য দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবে না? আমি অপমান করার পরেও কথা বলতে আসবে না? আমার কাপড় ধুয়ে দেবে না? ও কি আর কিছুই করবে না? ও কি আমায় ঘৃনা করে বসলো?”
জিহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চেয়ারে হেলান দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখে নিল। শ্রাবণ পুরোপুরি হুঁশ হারিয়েছে। নেশায় ডুবে এখন সব কথা উগলে দিচ্ছে। মায়া হলো জিহানের। ও আসলেই বুঝতে পারছে না ভেতরে ভেতরে এত টান থাকার পরেও কেনো ধারাকে অবহেলা করে ছেলেটা? কীসের সংকোচ কে জানে? জিহান আবারো ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। যত দ্রুত সম্ভব শ্রাবণকে বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে ভেবে নিল।
এর মধ্যে শ্রাবণ দুর্বল গলায় আরো অনেক কিছু বলল। জিহান শুনে গেল। কিন্তু এবার আর তর্ক করল না। শুধু চুপচাপ বসে রইল। একটু পরেই শ্রাবণ পুরো হুঁশ হারিয়ে মাথা টেবিলের উপর ঠেকিয়ে দিল। হাতে থাকা গ্লাসটাও পড়ে গেল। এবারে শান্তি পেল জিহান। এরপর যখনই সে দাঁড়িয়ে প্রস্তুতি নিল শ্রাবণকে তোলার, তখনই পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো জিহানের। জিহান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে ফোনটা হাতে নিল। দেখল সালমা বেগমের নাম্বার। মাথা চুলকে বিড়বিড় করল সে,
শ্রাবণ ধারা পর্ব ১৩
—” সেরেছে রে! এখন আন্টিকে কীভাবে বলব আপনার সোনার ছেলে নেশা করে অজ্ঞান হয়ে গেছে।”
মনে মনে বানিয়ে কিছু বলার জন্য তৈরী করে জিহান কলটা ধরে কানে গুঁজে নিল। এদিকে টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে নেশায় ঘোরে চলে যাওয়া শ্রাবণ বিড়বিড় করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ল একসময়।
