Home শ্রাবণ ধারা শ্রাবণ ধারা পর্ব ২

শ্রাবণ ধারা পর্ব ২

শ্রাবণ ধারা পর্ব ২
অনামিকা তাহসিন রোজা

ভাঙা প্লেট ও নষ্ট হয়ে যাওয়া ভাত নিয়ে রান্নাঘরে লুকিয়ে রাখলো ধারা। দ্রুত গতিতে আবারো শ্রাবণের ঘরে এসে অবহেলায় পড়ে থাকা শার্টটা সে উঠিয়ে নিল। ভীষণ মনোযোগ দিয়ে দেখলো ছেঁড়া অংশটা। নাহ, এটা সে করেনি। তার স্পষ্ট মনে আছে শার্ট একদম ঠিক ছিল। তাহলে কে করেছে? আভা? একটু ভয় পেলো ধারা। শ্রাবণের বেস্ট ফ্রেন্ড আভা। গত দুদিন ধরে শেখ বাড়িতেই থাকছে। সে ঢাকায় এসেছে কিছুদিনের জন্য। তারপর আবারো ফিরে যাবে খুলনায়। সেখানেই জব করে সে। এখানে এসে হোটেলে থাকতে হবে এটা শুনে শ্রাবণ দ্বিমত করে এবং তাকে বাড়িতেই নিয়ে আসে। শ্রাবণ ও আভার বন্ধুত্বের বিষয়টা সামিউল শেখ এবং সালমা বেগমও জানেন। কলেজ লাইফ থেকে তাদের বন্ধুত্ব। এমনকি আভার বাবার সাথে সামিউল শেখের পরিচিতি বেশ। তাই পারিবারিক সম্পর্কের খাতিরে এবং বন্ধুত্বের খাতিরে তাদের মাঝে যোগাযোগটাও খুব গভীর।

কিন্তু আভা “শেখ বাড়ি”তে আসার পর শ্রাবণের অনাকাঙ্ক্ষিত বউ দেখে বোধহয় খুব একটা পছন্দ করেনি। প্রথম দিনেই রান্নাঘরে ঢুকে ধারাকে যা নয় তাই বলে অপমান করেছে সবার আড়ালে। সরাসরি না বললেও অঙ্গভঙ্গি এবং আচরণ দিয়েই নিচু করেছে তাকে। ধারা ভয়ে লজ্জায় কাওকে কিছু বলেনি। এমনকি পরের দিন ধারার বানানো কফিতে ইচ্ছে করে লুকিয়ে লবণ দিয়ে সবার সামনে অপমান করেছে। আর আজ..শ্রাবণের শার্ট ছিঁড়ে ধারাকে বকা খাওয়ালো। ধারা বুঝতে পারছেনা আভা তার সাথে এমন করছে কেনো। আড়ালে এমন করে। অথচ সবার সামনে ভালো মানুষির কি নিদারুণ মুখোশটাই না পড়ে থাকে। মানুষের আসলে কত রূপ? -জানতে চায় ধারা।
ধারা মনে মনে হিসেব কষে নিশ্চিত হলো আভা ছাড়া এমন কাজ করার মত বাড়িতে কেও নেই। তাই সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কেননা শ্রাবণ তো কখনোই বিশ্বাস করবেনা আভা এমনটা করেছে, উল্টো আভাকে দোষী করাতে ধারাকে আবারো বকাবকি করতে পারে ভেবে ধারা শার্টটা হাতে নিয়ে স্টোর রুমে চলে গেলো। সেই ঘরে এক কোণায় গোছানো তার জায়গাতে সে শার্টটা রেখে দিল।

স্টোর রুমের কোণায় তোষক চাদর বিছিয়ে মেঝেতেই বিছানা পেতেছে ধারা। গত তিনদিন ধরে এখানেই আশ্রয় পেয়েছে সে। শ্রাবণের ঘরে থাকার অনুমতি পায়নি সেই ঘরের মালিকের কাছে। সালমা বেগম প্রথমে এই পরিস্থিতি দেখে শ্রাবণকে বকাঝকা করেছেন। কিন্তু জেদি ছেলের কাছে হার মেনে তিনিও আর কিছু করেন নি। না জানি লোকটা আড়ালে কানে কানে সালমা বেগম কে কী এমন বলল যার কারনে ধারাকে রীতিমতো অনুরোধ করে স্টোর রুমে থাকতে দিয়েছেন তিনি। গেস্ট রুমটা অনেকটা দূরে এবং ধারারও পছন্দ হয়নি। কেননা ঘরটা অনেক বড়,আর একা এত বড় ঘরে থাকতে ধারার ভীষণ ভয় লাগবে। ছোটতে একবার তার চাচি সোহাগি বেগম রাগে তাকে রান্নাঘরে সারারাত আটকে রেখেছিল। সেই থেকে অন্ধকারে প্রচন্ড ভয় পায় সে। তাই স্টোর রুমেই সে থাকতে চেয়েছে নিজে থেকে। সালমা বেগম আর দ্বিমত করেন নি। ধারার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়েছেন এবং আশ্বাস দিয়েছেন একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। এর থেকে বেশি তিনি কিছুই করতে পারেন নি। সামিউল শেখ এক মাসের জন্য বাড়ির বাইরে গিয়েছেন, বিজনেস ট্রিপে। তাই নববধূর সাথে বাড়িতে কী হচ্ছে তিনি জানেন না। জানলেও হয়তো জেদি ছেলের সাথে পেরে উঠতেন না। অথবা চেষ্টা করলে অশান্তি হতো।
দুপুরের খাবারটা এখনো খায়নি শ্রাবণ। ধারা দ্বিতীয়বারের মত প্লেট সাজিয়ে এবারে গেস্ট রুমে গেলো। আভাকে এই ঘরেই থাকতে দেয়া হয়েছে। আর শ্রাবণ এখন এই ঘরে সে নিশ্চিত। দরজায় নক করার সাথে সাথে ভেতর থেকে আভা জোরে বলে উঠলো,

—” দরজা খোলা আছে।”
ধারা গুটিগুটি পায়ে ভেতরে ঢুকলো। শ্রাবণ সোফায় বসে ফোন টিপছে, আর আভা বিছানায় বসে বসে তার জামাকাপড় গোছাচ্ছে। হয়তো আজ কালের মধ্যেই চলে যাবে। ধারাকে দেখে শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। ধারা শ্রাবণের কাছে এগিয়ে এসে প্লেটটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
—” খেয়ে নিন।”
শ্রাবণ ত্যাড়া গলায় বলল,
—” আদেশ করছো তুমি আমায়?”
ধারা সাথে সাথে দুদিকে মাথা নেড়ে তড়িঘড়ি করে বলল,
—” না না। তা কেনো হবে। দুপুরে তো খান নি। তাই…
শ্রাবণ আর কিছু না বলে ছোঁ মেরে প্লেটটা নিয়ে টেবিলে রাখল,
—” নাউ গেট আউট।”
ধারা মাথা নেড়ে একবার আভার দিকে তাকালো। আভার পরনে টপস টাইপের কিছু একটা। হাঁটু পর্যন্ত হলেও গায়ের ওড়নাটা খু্ব অগোছালো লাগলো ধারার কাছে। এমনভাবে কে থাকে?ছিহ। ধারা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রান্নাঘরে গিয়ে সেই মেঝেতে পড়ে যাওয়া ভাত-তরকারিগুলো বের করল। একটা প্লেটে সেই ভাত নিয়ে মেঝেতে বসেই খেতে থাকলো। যেখানে মানুষ খাবারই পায়না, সেখানে সবাই কীভাবে পারে খাবার নষ্ট করতে? দ্রুত খাওয়া শেষ করে থালাবাসনও ধুতে শুরু করল সে। রুনি বেগম টিভির সামনে মেঝেতে বসে বসে খেতে ব্যস্ত ছিলেন। ধারাকে থালাবাটি ধুতে দেখে তিনি রীতিমতো দৌঁড়ে এসে ধারার বাহু আঁকড়ে ধরলেন,
—” এ কি করতাছেন আম্মাজান? আপনি ধুইতেছেন ক্যান? আমি করতাছি তো। সরেন সরেন। আমি এখনই করতাম সব।”
ধারা হেসে বলল,

—” সমস্যা নেই। আপনার আর আমার মধ্যে তফাত কীসে? আমিই করছি। আপনি খাওয়া শেষ করে আসুন।”
রুনিখালা অবাক হলেন। যদিও বাড়ির সব পরিস্থিতি তিনি জানেন। তবুও একটু বিনয়ী হয়ে বললেন,
—” তফাত আছে আম্মাজান। বাড়ির একমাত্র বউ আপনি। আমারে রাখছেই তো আপনারে কষ্ট না দেবার জন্য। দশ বছর ধরে এইখানে কাম করি। এসব তো আমার কাম!”
ধারা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো শূন্য দৃষ্টিতে। রুনিখালা হেসে থালাবাটি সব সরিয়ে নিলেন। ধারাকেও একটু সরিয়ে দিয়ে বললেন,
—” আপনি যান আম্মাজান। যাইয়া বিশ্রাম নেন। আপনি প্লেটবাটি সব ধুইতেছেন দেখলে খালাম্মা আমারে বকাবকি করব। আপনি যান।”
ধারা আর কিছু না বলে স্টোর রুমে চলে এলো। এটা স্টোর রুম বললে ভুল হবে। আগে নাকি এটাই শ্রাবণের ঘর ছিল, পরবর্তীতে এই ঘরে আর থাকে না শ্রাবণ। তাই অনেকদিন ধরে পড়ে থাকায় গত বছর থেকেই এই ঘর থেকে সব আসবাবপত্র সরিয়ে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। ধারা আসার পরই এ ঘরের তালা ভেঙেছে। শ্রাবণের রুমটা এ ঘরের ঠিক পরেই। ধারা অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে ক্লান্ত অনুভব করল। তাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুয়ে পড়ল তোষক বিছিয়ে মেঝেতে বানানো ছোটখাটো বিছানায়। চোখ রাখলো ঠিক উপরের গোল গোল ঘুরতে থাকা ফ্যানের দিকে। ধারা শুনেছে শ্রাবণের ঘরে এসিও আছে। প্রথম দিন অনুভবও করতে পেরেছে সে। ভেবেই মুচকি হাসলো ধারা। এসির হাওয়া তার ভালো লাগেনি। তার থেকে ধীর গতিতে চলা এই ফ্যানটাই ভালো। আর সবথেকে বেশি ভালো নদীর পাড়ে বেয়ে আসা প্রকৃতির শীতল হাওয়া।

শ্রাবণ ধীরে ধীরে পুরো খাবার শেষ করে হাত ধুয়ে এলো। সোফায় বসে আভার দিকে তাকিয়ে বলল,
—”কখন বেরোবি তুই?”
আভা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। ব্যঙ্গ করে বলল,
—” ইশশ। আমাকে বের করে দিতে পারলেই বোধহয় বেঁচে যাস। আগে তো বাড়িতে এলে এক সপ্তাহের আগে যেতেই দিতিস না। আর এখন আমার চলে যাওয়ার অপেক্ষা? বাবাগো! মানুষ আসলেই বদলায়।”
বলেই অযৌক্তিক এবং খুব নাটকীয় ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আভা আবারো ব্যাগে কাপড় গোছাতে শুরু করে।
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তাকায় আভার দিকে। শক্ত কন্ঠে বলে,
—” তোর সমস্যাটা কী? এত টিপিকাল বিহেইভ করছিস কেনো? বিদেশের হাওয়া লাগিয়ে কি ব্রেন কমেছে?”
আভা এবারে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
—” এখন আমার বিহেইভ তোর কাছে টিপিকাল লাগছে?”
—” অবশ্যই লাগছে। তুই আগে এত ন্যাকামো করতি না আভা। এখন অপ্রয়োজনীয় ফালতু আচরণ করিস, যা অনেক বিরক্তিকর। ”

—” হ্যাঁ সেটাই তো। এখন তো এটা মনে হবেই। আমাদের দুরত্ব বেড়েছে, তোর জীবনের পরিবর্তন হয়েছে। অনেক মর্ডান, বিশ্বসুন্দরী বউ এনেছিস! আমাকে বিরক্ত তো এখন লাগবেই।”
শ্রাবণ নিজেও এবারে ফোন পকেটে ঢুকিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। আভার ঠিক সামনে এসে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে মাথায় ইশারা করে বলল,
—” তোর কি মাথায় সমস্যা হয়েছে? পাগল টাগল হয়েছিস? হোয়াট ডু ইউ মিন বাই মডার্ন, বিশ্বসুন্দরী? তুই আমায় খোঁচা মারছিস কেনো? আমি কি বিয়ে করতে চেয়েছি ওই গেঁয়ো টাকে?”
আভা বাঁকা হাসলো,
—” তুমি কি ছোট খোকা? দুধের শিশু? চাইলে ঠিকই আটকাতে পারতি। আটকাস নি কেনো?”
শ্রাবণ এক হাত তুলে ইশারা করে থামিয়ে দিল আভাকে। শীতল কন্ঠে বলল,
—” ইনাফ। তুই বদলে গেছিস আভা। এটা আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আভা নয়, যে আমায় বুঝতো, আমার পাশে থাকতো, আমার সাহস যোগাতো। বাট ইউ টার্নড ইনটু আ ডিজগাস্টিং উইমেন।”
আভা রাগে দুঃখে বড় বড় শ্বাস নিতে থাকলো। এক কদম এগিয়ে এসে শ্রাবণের চোখের দিকে তাকিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,

—” তুই খুব ভালো করেই জানিস আমি তোকে পছন্দ করি। ছয় বছর আগে বলেছিলাম চল পালিয়ে বিয়েটা করে নিই। তুই কী বলেছিলি? বলেছিলি সময় আসুক।”
শ্রাবণের তৎক্ষনাৎ জবাব,
—” কিন্তু তোকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি আমি দিইনি।”
—” তাহলে আমায় অপেক্ষা করতে বলেছিলি কেনো? মিথ্যে প্রলোভন দেখিয়েছিলি কেনো?”
শ্রাবণ ধমকে উঠলো,
—” কারন তুই জব করতে চাইছিলি না। আমার জন্য ঢাকা থেকে বের হতে নারাজ ছিলি তুই। শুধুমাত্র আমার জন্য তুই ৫০ হাজার টাকা বেতনের একটা চাকরি ছেড়ে দিতে চাইছিলি। অথচ তোর বাবা হসপিটালে শয্যাশায়ী। তোর বাবা আমার হাত ধরে… এই হাত দুটো ধরে সে আমার কাছে অনুরোধ করেছে আমি যেন তোকে চট্টগ্রাম যেতে বলি। এজন্য আমি তোকে সান্ত্বনা দিয়ে চট্টগ্রাম পাঠিয়েছি। কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে আমি কোনোরকম প্রলোভন দেখাইনি তোকে। কখনোই আমি তোকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিইনি আভা।”
আভা জানে। সময়ের সাথে সাথে ও অনেক আগেই এটা বুঝেছে। তাই তো চুপ ছিল। কিন্তু তবুও মন মানতে নারাজ। শ্রাবণ এখন অন্য কারো স্বামী ভাবতেই বুকে কাঁটা ফুটছে তার। অজান্তেই লাল হয়ে যাওয়া চোখদুটো দিয়ে পানি পড়ল তার। শ্রাবণের রাগান্বিত চেহারা দেখে চোখের পানি মুছে বলল,

—” তাহলে আমি যখন তোকে বলেছিলাম যে তোকে ভালোবাসি তখন কিছু বলিস নি কেনো? সরাসরি কেনো রিজেক্ট করিস নি?”
শ্রাবণ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। চোখ সরিয়ে নিল আভার দৃষ্টি থেকে। যেন হঠাৎ করেই এতদিনের জমে থাকা কিছু কথার ভার তার গলায় এসে আটকে গেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। ধীরে ধীরে বলল,
—” কারণ আমি তখন নিজেও বুঝে উঠতে পারিনি কী করা উচিত।”
আভা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। শ্রাবণ এবার মাথা নিচু করে একটু হেসে ফেললো। একটা অস্বস্তিকর, লজ্জা মিশ্রিত হাসি।

—” তুই যেদিন আমাকে ওই কথাটা বললি, আমি শকড হয়ে গিয়েছিলাম আভা। সত্যি বলছি, আমি এক সেকেন্ডের জন্যও ভাবিনি তুই আমাকে ওইভাবে দেখিস। আমি তোকে সবসময়, নিজের মানুষ ভাবতাম। খুব কাছের। কিন্তু ওইভাবে না, কখনোই না। আমার কাছে তুই ছিলি, বেস্ট ফ্রেন্ড.. প্রায় বোনের মতো। এমন পরিস্থিতি অনেক বার এসেছে যখন আমি অনেকের কাছে তোকে নিজের বোনের পরিচয় দিয়েছি। যখন তুই বিষয়টা আমাকে জানালি তখন আমি নিজেই ভেঙ্গে পড়েছিলাম। হয়তোবা আমার মাঝে কিছু একটা ত্রুটি আছে। আমার দিক দিয়ে কোনো খামতি ছিল কিনা ভাবছিলাম। আমি তোকে এমন কিছু ইঙ্গিত দিয়েছিলাম কিনা। কোনভাবে তোকে আস্কারা দিয়েছিলাম কিনা। কিন্তু না। তেমন কিছু পাইনি। আবে ভাই আমি তোকে কখনো একটা মেয়ে হিসেবেই দেখিনি। আমার কোনো ছেলে বেস্ট ফ্রেন্ড নেই আভা। তুই-ই আমার ভাই, তুই-ই আমার বোন। তুই যে একটা মেয়ে সেটাও আমি মাঝে মাঝে ভুলে যেতাম! ”
কথাটা বলতে গিয়ে ফিক করে হেসে ফেলল শ্রাবণ। আভার চোখ কেঁপে উঠলো। শ্রাবণ আবার বলল,

—“ তাই তখন সরাসরি না বলার সাহসটা পাইনি। কারণ জানতাম, ওই মুহূর্তে যদি তোকে রিজেক্ট করি, বা সরাসরি না বলি, তাহলে তুই ভেঙে পড়বি। আর চাকরিটাও করবিনা। ইন্টারভিউ দিতেই যাবিনা। আমি চাইনি তোর কষ্ট হোক। আমি চাইনি তুই নিজেকে ছোট ভাবিস। তাই চুপ ছিলাম।”
আভা ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিল। শ্রাবণ এবার ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে এলো।
—” আমি তখন লজ্জাও পেয়েছিলাম।”
—” লজ্জা?”
—” নিজের কাছেই। কারণ যাকে আমি এতদিন একটা নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে দিয়েছিলাম, সে হঠাৎ অন্য জায়গায় চলে গেলো। আমার অজান্তেই। আমি মানিয়ে নিতে পারিনি।”
একটু থামলো শ্রাবণ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—” তারপর ভেবেছিলাম তুই চট্টগ্রামে চলে যাবি, নিজের লাইফ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবি। সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। আমরা আগের মতোই থাকবো। সময়ের পরিক্রমায় তুই কারো প্রেমে পড়ে যাবি। এরপর বিয়ে করেই ঢাকায় ফিরবি। কিন্তু…
শ্রাবণ মাথা নেড়ে ধীরে বলল,

—” আমি কখনোই তোকে ভুল বুঝাতে চাইনি আভা। আমি কখনোই চাইনি তুই আমার জন্য অপেক্ষা করিস। আমি ভাবিইনি তুই এতটা সিরিয়াসলি নিয়েছিস ব্যাপারটা।”
আভা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার কাঁধটা হালকা কাঁপছে। বিরক্তিতে কাঁদতে মন চাইছে তার। শ্রাবণ গম্ভীর কন্ঠে বলল,
—” আমি ভুল করেছি, চুপ থেকে। তখন যদি স্পষ্ট করে বলতাম, হয়তো আজ এই জায়গায় আসতাম না আমরা। আজ হয়তো তোকে চলে যাওয়ার কথাও বলতে হতো না। তুই এখানে থাকলে আমার প্রতি আরো উইক হবি, স্বভাবগতভাবেই সেন্টিমেন্টাল আচরণ করবি। আই হেইট দিস।”
আভা তবুও জ্বলন্ত চোখদুটো নিয়ে শ্রাবণের দিকে একরাশ আফসোস নিয়ে তাকিয়ে রইলো। জোরে জোরে শ্বাস নেয়াতে বুক কাঁপছে তার। শ্রাবণ এবারে ঠোঁট ভিজিয়ে নিজের রাগকে কন্ট্রোল করল। এক কদম এগিয়ে এসে আভার কাঁধে হাত রেখে বলল,

—” দেখ আভা, ওই মেয়ের সাথে আমার বিয়ে না হলেও আমি তোকে কখনো বিয়ে করতাম না। আমি যা সিদ্ধান্ত নিই, সেটাই করি- তুই জানিস এটা। তাই এসব ফালতু ফিলিংস বাদ দিয়ে লাইফ এনজয় কর। যা। আর ঢাকায় আসিস না। আঙ্কেলের ট্রিটমেন্ট কর, ভালো ছেলে দেখে বিয়ে করে নে।’
—” আর তুই কী করবি?”
ফট করে জিজ্ঞেস করল আভা। কন্ঠে দৃঢ়তা। শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকালো,
—” কী করব মানে?”
—” মানে তুই ওই গেঁয়োকে নিয়ে সংসার করবি নাকি? ট্রাস্ট মি ওকে তোর পাশে একদম মানায় না। শী ডাজেন্ট ডিজার্ভ ইউ। গেঁয়ো বস্তির নোংরা মেয়ে একটা! ছিহ!”
আভার কথা শুনে শ্রাবণ যেন এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। চোখদুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠলো। এই প্রথম, এই প্রথম সে আভার মুখে এমন ভাষা শুনলো।
কিছু সেকেন্ড কোনো শব্দ বের হলো না তার মুখ থেকে। শুধু তাকিয়ে রইলো আভার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে সেই বিস্ময় বদলে গেলো বিরক্তিতে, বিরক্তি থেকে ঘৃণায়। শ্রাবণ নিচু স্বরে বলল,
—” কী বলছিস তুই?”

আভা ঠোঁট বাঁকিয়ে আবারো বলল,
—” যা শুনেছিস সেটাই। ওই মেয়েটা তোর লেভেলের না। ওকে দেখলেই আমার গা ঘিনঘিন করছে। ইয়াক। আঙ্কেল আন্টির রুচি এত খারাপ হলো কবে থেকে? আমি ছিলাম, আমাকে দেখেনি তারা? কোথা থেকে বস্তির মেয়ে তুলে এনেছে। দেখ শ্রাবণ, আমি বলছি তুই মিলিয়ে নিস, এসব বস্তির মেয়েরা অনেক আগেই অভাবের জন্য নিজের শরীর বেঁচে দিয়ে…
কথা শেষ করার আগেই শরীরের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে আভার গালে চড় বসালো শ্রাবণ। ঘৃনায় দপদপ করে কপাল ফুলছে তার।
—” ইনাফ!”
গর্জে উঠলো শ্রাবণ। ঘরের বাতাস যেন থমকে গেলো।
শ্রাবণ এবার এক পা এগিয়ে এলো। চোখদুটো শক্ত, ঠান্ডা।
আভা চোখ বড় করে গালে হাত রেখে তাকাল,
—” তুই আমায় মারলি দোস্ত?”
—” শাটাপ আভা। তুই আসলেই নষ্ট হয়ে গেছিস। লিসেন, একটা কথা মাথায় ঢুকিয়ে নে। কারো সম্পর্কে এমন ভাষা ব্যবহার করার আগে নিজের অবস্থানটা দেখে নিবি। হ্যাঁ, আমি ওই মেয়েকে বিয়ে করতে চাইনি। আমিও ওকে ঘৃণা করি। ওকে বউ মানিনি, আজও চাই না। কিন্তু….
সে একটু থামলো। গলার স্বর আরও নিচু, কিন্তু ধারালো হয়ে এলো,

—” সে শেখ বাড়ির বউ। এই পরিচয়টাই যথেষ্ট। বাবা মা তোর এসব কথা শুনলে কতটা কষ্ট পাবে ডু ইউ নো? তোকে কত ভালোবাসে উনারা জানিস?”
হুট করে শ্রাবণের মনে হলো সে নিজেই অদ্ভুত আচরণ করছে। ধারার সাথে তো সে নিজেও এমন ব্যবহার করছে। কিন্তু এখন আভার মুখে এসব কথা কেনো নিতে পারছেনা সে? শুধু কি শেখ বাড়ির পরিচয়ের জন্য? গলা খাঁকারি দিয়ে কথা বদলে নিল শ্রাবণ,
— তুই ওই মেয়েকে নিয়ে যা খুশি বল, যা খুশি ভাব আই ডোন্ট কেয়ার কিন্তু তুই আমার বাবা মায়ের রুচি নিয়ে কোন সাহসে কথা বললি? কোন সাহসে আমার বাবা মা তুলে কথা বললি আভা?”
আভার চোখ কেঁপে উঠলো। শ্রাবণ আবার বলল,

শ্রাবণ ধারা পর্ব ১

—” তুই বদলে গেছিস। খুব বাজেভাবে বদলে গেছিস। আগে তুই কাউকে ছোট করতি না। আর আজ…
হালকা হাসলো সে, তিক্তভাবে,
—” আজ তুই নিজের ছোট মানসিকতাটাই প্রমাণ করছিস।”
আভার চোখে পানি জমে উঠলো, কিন্তু এবার সে কিছু বললো না। শ্রাবণ ঘুরে দাঁড়ালো। দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
—” আজই চলে যা। পারলে এই মুহুর্তে চলে যা। যত তাড়াতাড়ি পারিস।”

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here