Home শ্রাবণ ধারা শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৪

শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৪

শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৪
অনামিকা তাহসিন রোজা

সালমা বেগম সারাটাদিন চিন্তায় বসে থাকতে পারেন নি। ধারার সাথে এখন শ্রাবণের জন্যেও চিন্তা ভর করেছে তার মনে। ছেলেটা তার কম জেদি নয়। পাগল বললেও কম হবে। যখন প্রতিজ্ঞা নিয়েছে, তখন ধারাকে না পাওয়া পর্যন্ত ছেলে যে শান্ত থাকবে না তা তিনি জানেন। সূর্য ডোবার পর তিনি নিজে থেকেই শ্রাবণকে কল করেছিলেন। কিন্তু ছেলেটা কল ধরেনি, বরং ফোন সুইচ অফ করে দিয়েছে। শেষে জিহান ও নীলকে কল করেছিলেন ভদ্রমহিলা। তারা জানাল, যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, এখনো কোনো খোঁজ পায়নি। এমনকি শেখ বাড়ির বাইরে আশেপাশে দোকানগুলোতে থাকা সিসি টিভি ক্যামেরাতেও ধরা পড়ে নি। সালমা বেগম আবারো চিন্তায় পড়লেন। বাড়ির সামনে থেকে তাহলে মেয়েটা উধাও হয়েছে নাকি? এটাও বা কীভাবে সম্ভব। কেও কি কিডন্যাপ করল? করলেও করবে কে? কারো উপর তো সন্দেহও নেই। নিতান্তই সহজ ও ঝোটঝামেলামুক্ত শেখ পরিবার, কোনো শত্রুও তো নেই। তাই এসবও মাথায় আনার মত নয়।
চিন্তায় মাথা ব্যাথা করে উঠতেই কলিং বেলের শব্দে চমকে উঠেন সালমা বেগম। মনে করেন শ্রাবণ ফিরেছে। তাই দৌঁড়ে গিয়ে দরজা খুলেন। কিন্তু চমকে যান ঘেমে একাকার হওয়া সামিউল শেখ কে দেখে। চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে বলেন,

—” শ্রাবণের বাবা তুমি?”
সামিউল শেখ হাতে লাগেজ নিয়ে বিভ্রান্তিকর দৃষ্টি ফেলে বলেন,
—” কি আশ্চর্য। এত অবাক হওয়ার কী আছে? ভেতরে ঢুকতে দাও, জ্যামে আটকে অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে আমার। কি যে গরম!”
সালমা বেগম শুকনো ঢোক গিললেন। বাড়ির কর্তা ফিরে এসেছে, এখন ভদ্রলোক যদি বাড়ির পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হন, তবে ঝামেলা যা বাকি ছিল, তার ষোলকলা পূর্ণ হবে। এমনিতেই শ্রাবণের আচরণ নিয়ে প্রচুর ক্ষিপ্ত ছিলেন সামিউল শেখ। তিনি যাওয়ার আগে সাফসাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন বাড়িতে ফিরে আবারো শ্রাবণের এসব না মানার নাটক দেখলে ছেলেকে ত্যাজ্য পূত্র করতে বাধ্য হবেন। ধারা কে তিনিই গ্রাম থেকে এনেছিলেন। মেয়ের মত আদর করেন তাকে। এখন যদি এসব কাহিনী তিনি জেনে যান, তাহলে শ্রাবণকে জিন্দা কবর দিতেও পারেন। আগাম সতর্কসংকেত পেয়ে সালমা বেগম ভয়ে কেঁপে উঠলেন। তবুও মনে মনে সেটা গিলে ফেলে মেকি হেসে দ্রুত সামিউল শেখের লাগেজ নিজ হাতে নিয়ে নিলেন। তড়িঘড়ি করে দরজা পুরো খুলে দিয়ে বলতে থাকলেন,

—” হ্যাঁ হ্যাঁ এসো। না মানে, আজ ফিরবে তা তো জানাও নি। তোমার তো ১৬ তারিখ ফেরার কথা ছিল।”
সামিউল শেখ ভেতরে ঢুকে জুতো খুললেন। ক্লান্ত ভঙ্গিতে সোফায় বসে শার্টের উপরের দুটো বোতাম খুলে বললেন,
—” কাজ দ্রুত শেষ হয়ে গেছে৷ কি আর করব বলো? তবে দুই মাস পর আরেকটা বিজনেস ট্রিপ আছে।”
—” ওও। তুমি যে আসছো, একবার জানাতে পারতে। রান্নাটা বসাতে পারতাম। তেমন কিছু তো করলামই না। শুধু ডাল আর একটুখানি মাছ আছে।”
নির্বিকার ভঙ্গিতে সামিউল শেখ বললেন,
—” সমস্যা নেই। যা আছে তাই খেয়ে নেব। সকালে রান্না করো। আর আমি শিওর ছিলাম না আজ বাড়িতে আসব, আমি তো আজকে ঢাকা ফিরিনি।”
ভ্রু কুঁচকালেন সালমা বেগম,

—” তাহলে?”
—” দুদিন আগেই ফিরেছি ঢাকাতে। এই দুদিন বনানীর ফ্লাটে ছিলাম।”
—” সেকি! এ কেমন কথা? তুমি শহরে ফিরেছো, তাও বাড়িতে এলেনা? বনানীর ফ্লাট তো ফাঁকা পড়ে আছে। ওখানে গেলে কেনো?”
সামিউল শেখ স্বভাবসুলভ হাসলেন। হাসির চাপে বয়সের ছাপটা বোঝা গেল যেন। তিনি এগিয়ে এসে এক হাতে আগলে নিলেন স্ত্রীকে,
—” আরে বাবা, এত বকাবকি করছো কেনো? অফিসে কাজ ছিল। ওই ফ্লাটে আমি, আমার সেক্রেটারি রাকিব আর ম্যানাজার রবিসহ ছিলাম। আমরা কেওই বাড়িতে ফিরিনি ঢাকাতে এসে। কেও ফ্যামিলিকেও জানাইনি। কাজে ব্যস্ত ছিলাম। আপকামিং প্রজেক্ট নিয়ে। বুঝলে?’
সালমা বেগম মাথা ঝাঁকালেন। ঠোঁট ভিজিয়ে কোনোমতে সোফার অপর পাশে বসলেন,
—” তুমি তাহলে গোসলটা সেড়ে নাও। আমি ভাত বেড়ে দিচ্ছি।”
সামিউল শেখ শার্ট খুলতে খুলতেই জিজ্ঞেস করলেন,
—” বাকি সবাই কই? বউমাকে দেখতে পাচ্ছি না যে।”
সালমা বেগম ভাবলেন এখনি জানিয়ে দেবেন সব। কিন্তু মাত্র বাড়ি ফিরল লোকটা। তিনি বিরক্ত করতে চাইলেন না। এই রাত বেরাতে অশান্তিও চাইলেন না। তাই আমতা আমতা করে বললেন,
—” ঘরে আছে। বিশ্রাম নিচ্ছে।”
সামিউল শেখ নিজ ঘরের দিকে যেতে যেতে বললেন,
—” বউমাকে ডেকে আনো। ডিনার করুক, খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে নিক। এভাবে খালি পেটে থাকলে আরো খারাপ লাগবে। ”
—” ঠিক আছে!”

সালমা বেগমের বুকের ভেতরটা ধকধক করছে। বাথরুমের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শোনামাত্রই তিনি প্রায় লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। যেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে শেষ প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
—” হায় আল্লাহ…”কপালে হাত ঠেকিয়ে বিড়বিড় করলেন তিনি। একদিকে ধারা উধাও। অন্যদিকে শ্রাবণ সকাল থেকে নিখোঁজের মতো শহর চষে বেড়াচ্ছে। তার উপর আজই বাড়ির কর্তা এসে হাজির! যে মানুষটা ধারা আর শ্রাবণের বিয়েটাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, সেই মানুষ যদি এখন জানতে পারে বউমা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, তাহলে কী হবে কল্পনা করতেও ভয় লাগছে সালমা বেগমের।
আর সবচেয়ে বড় বিপদ, সামিউল শেখ এখনো কিছুই জানেন না। কিন্তু তিনি বোকাও নন। খাওয়ার টেবিলে বসে আরো একবার যদি জিজ্ঞেস করেন—”বউমা কোথায়?” তখন? সালমা বেগম চোখ বন্ধ করলেন। না। কিছু একটা করতেই হবে। দ্রুত ফোনটা হাতে তুলে নিলেন তিনি। প্রথম কল গেল নীলকে। দুইবার রিং হতেই ওপাশ থেকে রিসিভ হলো।

—” খালামনি?”
—” নীল, তুই কোথায়?”
নীল অবাক হলো কণ্ঠ শুনে। বলল,
—” কী হয়েছে? তোমার গলা এমন শোনাচ্ছে কেন?”
—” তুই এখনই বাড়িতে আয়।”
—” কেন?”
—” প্রশ্ন করিস না। এখনই আয়।”
নীল জিহানের সাথে থানা থেকে মাত্র বের হয়েছে। সে চিন্তিত হয়ে বলল,
—” খালামনি, কিছু হয়েছে?”
সালমা বেগম কপাল চেপে ধরলেন,
—” তোর খালু এসে গেছে।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা বিরাজ করল। এরপর নীল বিড়বিড় করে বলল,
—” ইন্নালিল্লাহ…”
—” এখন কী হবে? তোর খালু শ্রাবণকে মে”রে ফেলবে, সাথে আমাকেও ঘরবন্দী করে রাখবে দেখিস।”
—” খালু এসেছে কখন?”
—” এইমাত্র।”
নীল এবার সত্যি সত্যিই ঘাবড়ে গেল,
—” উনি কিছু জানেন?”
—” না। এখনো না।”
—” আলহামদুলিল্লাহ।”
—” আলহামদুলিল্লাহ পরে বলিস। আগে তুই শ্রাবণকে নিয়ে বাড়িতে আয়।”
নীল হতভম্ব হয়ে বলল,
—” ভাইজানকে? এখন?”
—” হ্যাঁ এখনই।”

—” খালামনি, ভাইজানের বর্তমান অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে তাকে ট্রাকের সামনে দাঁড়াতে বললেও দাঁড়িয়ে যাবে। কল করতে করতে আধম’রা হয়ে গিয়েছি। কোনো খোঁজ নেই। জিহান ভাইয়ের সাথে নাকি একটু আগে কথা বলেছে। এরপর আবার ফোন অফ করে দিয়েছে।”
—” আমি অত কিছু জানি না। যেভাবে পারিস নিয়ে আয়।”
নীল এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
—” আচ্ছা। চেষ্টা করছি।”
কল কেটে গেল। সালমা বেগম থামলেন না। সাথে সাথে শ্রাবণকে কল দিলেন। ফোন বন্ধ। আবার দিলেন। ভদ্রমহিলার মাথা গরম হয়ে গেল।
—” এই ছেলে আমাকে একদিন হার্ট অ্যাটাক করিয়ে ছাড়বে!”
বিরক্তিতে ফোনটা নামিয়ে রাখলেন তিনি। সামিউল শেখ গলা উঁচিয়ে টাওয়াল চাইলেন। সালমা বেগম জমে গেলেন। এত নির্ভার মানুষটা যদি পাঁচ মিনিট পর বাইরে এসে সত্যিটা জেনে যায়, তাহলে আজ রাতে শেখ বাড়িতে ছোটখাটো ভূমিকম্প হয়ে যাবে। তিনি আবার ফোন হাতে নিলেন। এবার নীলকে একটা মেসেজ পাঠালেন।
“যেভাবেই হোক শ্রাবণকে নিয়ে আয়। আর খালুর সামনে ধারার বিষয়ে কিছু বলবি না। একদম না। আমি দেখি ধীরেসুস্থে বুঝিয়ে বলব।”
মেসেজ পাঠিয়ে কিছুক্ষণ স্থির বসে রইলেন। এরপর ছুটলেন স্বামীকে টাওয়াল দিতে।

রান্নাঘর থেকে মাংস রান্নার ঘ্রান ভেসে আসছে। বারান্দায় মুখ ঝুলিয়ে বসে থাকা ধারার পেট মোচড় দিল। কম খিদে পায়নি তার। কিন্তু সকাল থেকে পেটে কিছু পড়তে চাইছে না। খুব বাজেভাবে সে মায়ায় জড়িয়েছে, এমন একটা নিষ্ঠুর পুরুষের যে কিনা তাকে তোয়াক্কাও করে না। ধারা কি চেষ্টা করেনি? কম চেষ্টা করেছে সে? অনেক চেষ্টা করেছে মন থেকে ঘৃনা আনার। কিন্তু পারেনি, পারছেও না। সবার দ্বারা কি সবকিছু সম্ভব?
ধারার দ্বারাও শ্রাবণকে ঘৃনা করা সম্ভব না। সে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে, পিছুটান ভুলে গিয়ে পালিয়েছে। তবুও সারাদিন মাথায় বিভিন্ন চিন্তা ঘুরেছে- শ্রাবণ কী করছে? সে কি খুশি? ধারাকে না দেখে কি আনন্দ করেছে? খেয়েছে তো?
চোখ দিয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল ধারার। নাহ, শ্রাবণের জন্য নয়। বরং তার অনুপস্থিতি হয়তো শ্রাবণ উপভোগ করছে, আনন্দ করছে এটা ভেবেই তার নিজের প্রতি মায়া হচ্ছে। বারান্দার রেলিং এ মাথা এলিয়ে দিল ধারা। বিড়বিড় করে বলল,

—” এবার আপনি খুশি তো?”
হুট করে পেছন থেকে দাদুবয়সী এক মহিলা এসে নরম কন্ঠে ডাকলেন ধারাকে,
—” আম্মাজান? রান্না হইয়া গেছে। খাইবা না? আসো।”
ধারা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—” মুরগির মাংস রাঁধলেন বুঝি?”
—” হ্যাঁ। আসো। খাও।”
ধারা আবারো বারান্দার গ্রিল দিয়ে বাইরে তাকাল। মলিন কন্ঠে বলল,
—” আমি খাব না দাদিমা। আপনি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন।”
মহিলাটি আশেপাশে তাকিয়ে বিভ্রান্তিকর দৃষ্টি ফেলে বললেন,
—” কই ঘুমামু? পাশের ঘরে।”
—” জ্বি।”
মহিলাটি মাথা নেড়ে ধীরে ধীরে প্রস্থান নিলেন। ধারা তাকিয়েই রইলো বাইরের দিকে। সে কীভাবে পারবে ওই মানুষটার পছন্দের খাবারটা তাকে ছাড়া খেতে? মায়া লাগবেনা বুঝি? গলা দিয়ে আদৌও নামবে?

সামিউল শেখের দৃষ্টি শীতল। সদ্য গোসল করে আসায় তার চুল এখনো ভেজা। টাওয়ালটা পাশে রেখে তিনি ভ্রু কুঁচকে নিজের স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। পাশের সোফায় মাথা নিচু করে বসে থাকা নীল ও শ্রাবণের দিকে তাকানোর প্রয়োজনবোধ করছেন না তিনি। অত্যন্ত ঠান্ডা স্বরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
—” সালমা? আমি কি তোমায় বিশ্বাস করে ভুল করেছি?”
শ্রাবণ মাথা নিচু রেখেই মলিন কন্ঠে বলল,
—” মায়ের কোনো দোষ নেই বাবা।”
—” আমি তোমার সাথে কথা বলছি না।”
না তাকিয়েই ঘৃনার সহিত কথাটা বললেন সামিউল শেখ। সালমা বেগম কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।সামিউল শেখের কণ্ঠে চিৎকার ছিল না, রাগও ছিল না। অথচ এই নীরব, শীতল স্বরটাই তাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইয়ে দিচ্ছে। ভদ্রমহিলা এবারে সামিউল শেখের পাশে বসলেন। একবার মাথা নিচু করে বসে থাকা শ্রাবণের দিকে তাকালেন। ছেলেটাকে আজ যেন চিনতেই পারছেন না। সকাল থেকে না খেয়ে, না ঘুমিয়ে, পাগলের মতো শহর খুঁজে বেড়িয়েছে।তবুও এখন বাবার সামনে একটা কথাও বলছে না। সালমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,

—” আমি বুঝতে পারিনি বিশ্বাস করো। তুমি তো জানোই ধারা কেমন। নিতান্তই ছোট একটা বাচ্চামেয়ের মত দেখেছি ওকে। কখনো ভাবতেও পারিনি ও এমনটা করবে।”
সামিউল শেখ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। সালমা বেগম ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন। কীভাবে শুরু থেকেই শ্রাবণ বিয়েটা মেনে নিতে পারেনি। কীভাবে ধারা চুপচাপ সব অপমান সহ্য করেছে। কীভাবে প্রতিদিন চেষ্টা করেছে সংসারটাকে আগলে রাখতে। কীভাবে শ্রাবণ রাগারাগি করেছে, এড়িয়ে গেছে, দূরে সরিয়ে রেখেছে। সব। একটা ঘটনাও বাদ দিলেন না। নীল আর শ্রাবণ দুজনেই মাথা নিচু করে শুনছে। সালমা বেগমের গলাও ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠল।
সামিউল শেখের মুখে কোনো পরিবর্তন এলো না। তিনি শুধু শুনে গেলেন। এরপর সালমা বেগম সেই ফুলের মালার ঘটনাটা বললেন। শ্রাবণের আচরণ, রাগ, অপমান, তার নিজের চড় মারা। সবকিছু। শেষের দিকে এসে গলাটা কেঁপে উঠল তার।

—” মেয়েটা যে সত্যিই চলে যাবে, সেটা আমি কল্পনাও করিনি।”
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে রইলো। সামিউল শেখ ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,
—” কাউকে কিছু বলেছিল যাওয়ার আগে?”
—” না।”
প্রথমবারের মতো সামিউল শেখের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তিনি ধীরে ধীরে সোফায় হেলান দিলেন। তারও কপালে চিন্তার রেখা দেখা দিল,
—” একা একা কোথায় যাবে মেয়েটা?”
নীল এবারে সাহস করে বলল,
—” সেটাই তো খালু। ভাবির তো যাওয়ার জায়গা নেই তাইনা?”
সামিউল শেখ মুখ বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যে হেসে বলল,
—” হ্যাঁ, আর সেটারই সুযোগ নিয়েছে তোমার ভাই। ভেবেছে যা-ই করিনা কেনো, মেয়ের তো যাওয়ার জায়গা নেই। অপমান অবহেলা সহ্য করলেও এখানেই থেকে যাবে। তাই যা খুশি তা-ই করি। আর এই ভাবনা টাই ভুল।”
শ্রাবণ মাথাটা আরো নিচু করল। হাতের আঙুলগুলো শক্ত হয়ে উঠছে তার। অস্থির মনটা কোনোমতে সামলে রেখেছে সে। ঘেমে একাকার ও ক্লান্ত হয়েও শক্ত হয়ে বসে আছে। সামিউল শেখের কথা ভুল নয়। আসলেই শ্রাবণ ভেবেছিল ধারা তো কোথাও যাবেনা। সে তো আছেই।
সামিউল শেখ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—” তবে বউমা হুট করে সিদ্ধান্ত নেয়নি।”
কথাটা শুনে সালমা বেগম চমকে উঠলেন,
—” মানে?”
সামিউল শেখ শীতল কণ্ঠে বললেন,
—” তোমার কী মনে হয়? ভাঙন কি একবারে হয়। একটু একটু করে ক্ষয় হতে হতে ভাঙন হয়। একটু একটু করে সহ্য করেছে। ‘চলে যাব’ এই চিন্তা কমপক্ষে বউমার মনে হাজারবার এসেছে। কিন্তু কখনো যায়নি। হয়তো আজ হুট করে মনে হয়েছে, ব্যস আর না, এবার চলেই যাব। তাই গিয়েছে। আর আপন মানুষ যদি রাগ করে চলে যায়, তাহলে তাকে ফিরিয়ে আনা যায়।”
সামিউল শেখের চোখ এবার ধীরে ধীরে শ্রাবণের দিকে ফিরলেন। সেভাবে তাকিয়েই বললেন,

—” কিন্তু যে মানুষ সবকিছু ফেলে রেখে নিজে থেকেই হারিয়ে যায়…”
বাকিটা আর বললেন না। তবুও সবাই বুঝে গেল। সে আর ফিরে আসার ইচ্ছে নিয়েই বের হয়নি। শ্রাবণের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। মাথাটা আরও নিচু হয়ে গেল। সামিউল শেখ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন ছেলের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
—” আমি যখন গ্রাম থেকে মেয়েটাকে নিয়ে এসেছিলাম, তখন একটা কথা বলেছিলাম তোকে। মনে আছে?”
শ্রাবণ কোনো উত্তর দিল না। তিনি নিজেই বললেন,
—” বলেছিলাম, মানুষের সম্মান ভাঙতে সময় লাগে না। কিন্তু ভাঙা সম্মান ফিরিয়ে আনতে জীবন কেটে যায়।”
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। নীল পর্যন্ত নড়ছে না। সামিউল শেখ এবার উঠে দাঁড়ালেন। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন,
—” তুমি কি ভেবেছিলে আমি তোমার ছেলেকে বকাবকি করব? কখনোই না। যা হয়েছে বেশ ভালো হয়েছে। মানুষের একটা সহ্যক্ষমতা আছে। তোমার ছেলের যোগ্যতা নেই ধারার মত মেয়েকে পাওয়ার। ধারা গিয়েছে এতে আমার আফসোস নেই, আফসোস একটা জিনিসেই- আমি মেয়েটাকে একটা সুন্দর জীবন দিতে পারলাম না। কথা রাখতে পারলাম না। সে এখনও বা কোথায় আছে কে জানে? যেখানেই থাকুক ভালো থাকুক। ”
সালমা বেগম অবাক হয়ে তাকালেন।

—” শ্রাবণের বাবা…
—” না।”
তিনি হাত তুলে থামালেন। তারপর শ্রাবণের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। শ্রাবণের নিচু করা মাথা দেখে সালমা বেগম কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
—” তোমার ছেলেকে শাস্তি না দেয়ার আরেকটা কারন আছে। কেনো জানো?”
সালমা বেগম ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
—” কেনো?”
—” কারণ আমি দেখছি আমি ওকে শাস্তি দেওয়ার আগেই ও পেয়ে গেছে।”
শ্রাবণ ধীরে ধীরে চোখ তুলল। প্রথমবারের মতো বাবার চোখে তাকাল। সামিউল শেখের চোখদুটো কঠিন। কিন্তু সেই কঠোরতার নিচে হতাশাও আছে।নিচু স্বরে বললেন তিনি,

—” আজ বুঝতে পারছিস? মানুষ চলে যাওয়ার আগে কতবার চলে যাওয়ার সংকেত দেয়। আর আমরা দেখতে পাই না।”
শ্রাবণের গলা শুকিয়ে গেল। সামিউল শেখ ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তিনি অনেক সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে নিজের ছেলেকে পর্যবেক্ষণ করলেন। বাবা তিনি। অবশ্যই নিজের ছেলেকে চেনেন। নীলকে উদ্দেশ্য করে সামিউল শেখ জিজ্ঞেস করলেন,
—” কীরে নীল? তোর ভাইয়ের মুখে তো হাসি দেখছি না। ও কি খুশি না? সে তো এটাই চাইছিল।”
নীলের একটু হাসি পেল। সে এখন কীভাবে বলবে, খালু তোমার ছেলে পিছলে প্রেমে পড়েছে। তাও আবার দাঁত ভেঙে পড়ার পর। তাই কোনোমতে চুপ রইলো সে। সামিউল শেখ খুব করে বুঝলেন শ্রাবণের অবস্থা। তাই আর কিছু বলে তিনি কষ্ট বাড়াতে চাইলেন না। এমনিতেই তার নিজেরও বেশ চিন্তা হচ্ছে মেয়েটার জন্য। তিনি এবারে ঘরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়ে শ্রাবণ কে বললেন,

—” বোকার মত কান্নাকাটি না করে বউমাকে খুঁজে বের কর বেয়াদব ছেলে। সাতদিনের মধ্যে ধারাকে খুঁজে নিয়ে আসতে পারলে তোকে আমি মাফ করে দেব। নইলে আমার বাড়িতে তোর আর জায়গা নেই।”
সালমা বেগম কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। শ্রাবণ কিছু না বলে মাথা নিচু করল। কথাগুলো মাথায় বসিয়ে নিল ঠিকঠাক করে। সে এমনিতেও এ বাড়িতে থাকবেনা যদি সত্যিই ধারা ফিরে না আসে। ঘরে নেমে এলো ভারী নীরবতা। আর সেই নীরবতার মাঝেই শ্রাবণ অনুভব করল, আজ প্রথমবার সামিউল শেখ খুব শান্তভাবে কথা বলেছেন। কিন্তু এই কথাগুলোই যেন জীবনের সবচেয় ভারী শাস্তি হয়ে বুকের ওপর চেপে বসেছে।
সামিউল শেখ ঘরে যাওয়ার আগে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা স্বরে বললেন, -” ঘরে এসো।” বলেই তিনি ঘরে চলে গেলেন। সালমা বেগম কিছুক্ষণ শ্রাবণের দিকে হতাশ চোখে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি সত্যিই খুশি হয়েছেন সামিউল শেখের ঠান্ডা ভাব দেখে। নইলে তিনি তো ভেবেছিলেন আজ বোধহয় যুদ্ধ হবে। স্বামীর কথামত ভদ্রমহিলা ঘরে চলে গেলেন। নীল এবারে শ্রাবণের দিকে তাকাল। শ্রাবণ পিছু ফিরে আবার দরজার দিকে যেতে ধরলে নীল তার বাহু আটকে ধরল,

শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৩

—” আবার কোথায় যাচ্ছো ভাইজান?”
ভ্রু কুঁচকে তাকালো শ্রাবণ,
—” জাহান্নামে।”
—” আজ থাক। কাল আবার যেও।”
—” তুই আমার হাতেই খু’ন হবি আহাম্মক।”
—” আগে নিজের হয়েও না হওয়া বউ খুঁজে বের করো। তারপর আমার কথা ভেবো। বউ রাখতে পারেনা, আবার আমায় খুন করবে হুহ!”
শ্রাবণ গরম দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে নীল বলে,
—” আরে বাবা, তুমি বলেছো ভাবিকে না পাওয়া পর্যন্ত এ বাড়ির ভাত খাবে না। কিন্তু এ বাড়িতে থাকবেনা তা তো বলোনি। রাতটা পেরোক, সকালে আবারো খুঁজতে বের হবো সবাই। এখন বিশ্রাম নাও যাও। প্লিজ।”

শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here