শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৩
অনামিকা তাহসিন রোজা
সুস্থ একটা মানুষকে সবাই কখন পাগল বলে? যখন মাত্রাধিক অস্থিরতায় একটা মানুষ অস্বাভাবিক আচরণ করে, যখন পারিপার্শ্বিক কোনো কিছু তাকে তীব্রভাবে আঘাত করে, যখন হৃদপিণ্ড এক মুহুর্তের জন্য থমকে যায়, ঠিক তখনই হুঁশ জ্ঞান হারিয়ে একটা মানুষ পাগলের ন্যয় আচরণ করে। শ্রাবণের অবস্থা এই মুহুর্তে তার থেকেও বেশি খারাপ। অস্থির মনটা শুধু তৈরী হচ্ছিল, সজীবতায় ছেঁয়ে গিয়ে যখন শ্রাবণ মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল তার অপ্রত্যাশিতভাবে হয়ে যাওয়া বউটাকে আগলে নেবে, ঠিক তখনই কর্পূরের মতো উড়ে গেল সেই মেয়েটা? এ কি মেনে নেয়া যায়। এটাকে ভাগ্যের দোষ নাকি ভুল সময়! কী বলা যায় জানা নেই কারোর। সালমা বেগম নিজেও এবার চোখের পানি থামিয়ে অবাক চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। কি আশ্চর্য! এই ছেলের অবস্থা এত খারাপ হলো কেনো।
শ্রাবণ রীতিমতো অস্থির চিত্তে পাগলের মত পুরো বাড়ি খুঁজেছে। একের পর এক গর্জন ফেলে ধারাকে ডাকছে – এই মেয়ে, ইডিয়ট! বের হও। কোথায় তুমি? তুমি এভাবে চলে যেতে পারো না। কখনোই না।
কিন্তু এখন এই পাগলামি নিতান্তই অযৌক্তিকর। নীল এবং জিহান দুজনেই স্থির হয়ে শুধু দেখছে। নীল অবশ্য গুরুতর ভঙ্গিতেই অনেক কিছু ভাবছে। মনে মনে অঙ্ক কষছে কী করা যায় এখন। পুরো বাড়ি খুঁজে না পেয়ে শ্রাবণ রেগেমেগে নীলের কলার চেপে ধরল,
—” এই নীল! ও কোথায়? ধারা কোথায় বল। তুই ওকে লুকিয়েছিস তাইনা? ও তোর কথাতেই ম্যানুপুলেট হয়ে লুকিয়েছে রাইট?”
নীল বুঝলো শ্রাবণের অবস্থা। সে ধীরে শ্রাবণের বাহু স্বান্তনা দেয়ার ভঙ্গিতে ধরে মাথা নেড়ে বলল,
—” শান্ত হও ভাইজান। আমি কিছু করিনি। আমি জানিনা।”
আরো জোরে হিসহিসিয়ে উঠল শ্রাবণ,
—” জানিস না মানে? আমাকে বলদ মনে হয়? তুই-ই ওকে উস্কে দিয়েছিস রাইট? ওকে তুই এসব শিখিয়ে দিয়েছিস আমি জানি। এখন খুঁজে দে ওকে। বের হতে বল, নইলে আমি কিন্তু বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেব।”
নীলের শার্টের কলার এত জোরে চেপে ধরেছে শ্রাবণ যে কাপড় কুঁচকে গেছে পুরো। চোখদুটো রক্তবর্ণ। শ্বাসপ্রশ্বাস অস্বাভাবিক দ্রুত। নীল এবার সত্যিই চিন্তিত হলো। এমন শ্রাবণকে সে আগে দেখেনি। রাগী দেখেছে। একগুঁয়ে দেখেছে, অহংকারী দেখেছে। কিন্তু এভাবে ভেঙে পড়তে দেখেনি। জিহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।
—” শ্রাবণ, কলার ছাড়।”
—” না।”
—” ছাড় বলছি।”
—” আগে বলুক ধারা কোথায়!”
নীল অসহায়ভাবে মাথা নাড়ল। বলল,
—” আমি সত্যিই জানি না ভাইজান।”
কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল শ্রাবণ। তারপর ধীরে ধীরে হাত ছেড়ে দিল। কিন্তু ছাড়ার পরও শান্ত হলো না। বরং আরো অস্থির হয়ে উঠল। দুই হাতে মাথার চুল খামচে ধরে এদিক-ওদিক হাঁটতে লাগল।
—” অসম্ভব…অসম্ভব…”
জিহান ভ্রু কুঁচকে বলল,
—” কী অসম্ভব?”
শ্রাবণ থেমে গেল। কেমন অদ্ভুত দোটানায় হাসল। বিড়বিড় করে বলল,
—” ও এভাবে যেতে পারে না। পারে না। ও এটা করতেই পারে না।”
কেউ কিছু বলল না। সে আবার বলল,
—” ও তো সবসময় থাকত।”
শ্রাবণের কণ্ঠে এবার নিদারুণ বিভ্রান্তি। এমনভাবে সে বিড়বিড় করছে যেন নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা করছে। শ্রাবণ দ্রুত সালমা বেগমের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। চোখে অবিশ্বাস্য চাউনি নিয়ে বলল,
—” মা তুমিই বলো। ও তো এমন করার কথা না। আমি যত বাজে ব্যবহার করেছি…যত অপমান করেছি…এতকিছুর পরেও, ও তো ছিল তাইনা? তাহলে এটা কীভাবে সম্ভব?”
সোফায় বসে থাকা সালমা বেগম চোখ মুছলেন। কিছু বললেন না। শ্রাবণ কিছুই খেয়াল করল না। সে নিজের মধ্যেই ডুবে গেছে। হঠাৎ করে তার মনে পড়তে লাগল অসংখ্য ছোট ছোট ঘটনা। শ্রাবণের এত এত কথা শুনেও চুপ থাকা, এতকিছুর পরেও শ্রাবণের সেবা করা, রাতে ফিরতে দেরি হলে অপেক্ষা। রাগ করলে চুপচাপ দূরে দাঁড়িয়ে থাকা। অভিমান করলেও পরদিন সকালের নাস্তা ঠিকই বানানো। এতদিন এসবকে সে গুরুত্বই দেয়নি। মনে হয়েছিল এগুলো স্বাভাবিক। এগুলো থাকবেই। এগুলো কোথাও যাবে না। আজ প্রথমবারের মতো সে বুঝল,কোনো মানুষ চিরদিন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। বিশেষ করে যদি বারবার তাকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। শ্রাবণের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এমন অনুভূতি আগে কখনো হয়নি। রাগ না, অভিমান না। অহংকারও না। বরং এক ধরনের শূন্য ভয়। যে ভয় মানুষ হারিয়ে যাওয়ার পর আসে। হঠাৎ করেই সে ঘুরে দাঁড়াল।
নীলের কাছে গিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
—” শোন নীল, ও তোকে কিছু বলেছে? কোনো ইঙ্গিত দেয়নি?”
নীল দুদিকে মাথা নাড়ে। সে কিছুই জানে না। জিহান শ্রাবণের বাহু ধরে কোনোমতে টেনে সোফায় বসিয়ে দেয়। —” শান্ত হ শ্রাবণ। একটু শান্ত হ। আমরা ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখি। কাম ডাউন দোস্ত!”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে ধমকে উঠল,
—” কীসের শান্ত থাকব? হোয়াট ডু ইউ মিন? আরে ভাই, আমার বউ বাড়ি ছেড়ে উধাও হয়ে গেছে, আর আমি শান্ত থাকব?”
নীল খুকখুক করে কাশল। অপ্রত্যাশিত কথায় শ্রাবণও চমকেছে। কিন্তু এবারে সে নিজেও বিরক্ত হলো না। বরং নীলের দিকে তাকিয়ে রামধমক দিল,
—” কী সমস্যা তোর?”
নীল আমতা আমতা করে মাথা নেড়ে বলল,
—” কিছু না ভাইজান।”
জিহান এবারে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সালমা বেগমের দিকে তাকাল,
—” আন্টি, এ শহরে কি ভাবির যাওয়ার মত জায়গা আছে?”
সালমা বেগম কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
—” একদমই না। যাওয়ার জায়গা তো দুরে থাক, ও তো এ বাড়ি ব্যাতীত এ শহরের কিছুই চেনে না। এখান থেকে বের হয়ে ও দুপাও এগোতে পারার কথা নয়। একদমই অসম্ভব।”
শ্রাবণ শুকনো ঢোক গিলে সোজা হয়ে বসল। বিষয়টা চিন্তার। তবে কিছুক্ষণ ভেবে সে বাঁকা হেসে বলল,
—” ও একটা জেদি বেয়াদব মেয়ে। কে বলেছে এ বাড়ির বাইরে কিছু চেনে না ও? কত বড় সাহস ওর জানো তুমি? মাঝরাতে মোড়ের মুদি দোকান পেরিয়ে মহাসড়কের ফুটপাতে গিয়ে আমাকে…
বলতে বলতে থেমে গেল শ্রাবণ। নেশাগ্রস্ত তাকে যে ধারা বাড়িতে নিয়ে এসেছিল এসব কথা তো বলা যাবেনা। কথা অর্ধেক রেখে গলা খাঁকারি দিল শ্রাবণ।
তবে জিহান কথাটা ভেবে দেখল। শ্রাবণের ভাবনা অযৌক্তিক নয়। ধারা যে একেবারেই এ বাড়ির বাইরে একা এ শহরে চলতে অপারগ, তা ভাবা যাবে না। সে আবেগপ্রবণ ও জেদি। যদি চেষ্টা করে তাহলে শহরের বাইরেও চলে যেতে পারে। জিহান আবারো জিজ্ঞেস করল,
—” আন্টি, ভাবির গ্রামে খোঁজ নিয়েছো? গ্রামে যেতে কত সময় লাগবে এখান থেকে!”
সালমা বেগম মাথা নেড়ে বলেন,
—” মোটের উপর ছ ঘন্টা তো লাগবেই। কিন্তু, ধারার কাছে কোনো টাকাপয়সা নেই। ট্রেন বা বাসের টিকেট কাটতেও পারবেনা। তাই, ও পারবেনা যেতে। আমি ঘন্টাখানেক আগে ওর চাচাকে কল করেছিলাম, তারা বলেছে যায়নি, তবে গেলে জানাবে!”
একটু থেমে তিনি বললেন,
—” আর আমি নিশ্চিত ধারা আর যাই করুক না কেনো, শহর ছাড়তে পারবে না। একা তো পারবেই না!”
নীল থুতনিতে আঙুল ঘষে কিছু একটা ভেবে বলল,
—” আচ্ছা খালামনি, তুমি শিওর এ শহরে ধারার…
সাথে সাথে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুঁড়লো শ্রাবণ। দৃষ্টিতে একটা কথা স্পষ্ট -” খু ন করে দেব!” নীল তা দেখে মেকি হেসে সাথে সাথে গলা খাঁকারি দিয়ে ডাকটা শুধরে নিয়ে বলল,
—” আই মিন, ভাবির যাওয়ার মত কোনো জায়গা নেই?”
সালমা বেগম আবারো হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালেন,
—” উহু, নেই। নিশ্চিত আমি।”
ঘরটায় আবারও নেমে এলো ভারী নীরবতা। সালমা বেগমের চোখদুটো লাল। শ্রাবণ বারবার মাথায় হাত বুলিয়ে পায়চারি করছে। নীল ঠোঁট কামড়ে বসে আছে। আর জিহান সোফার হাতলে কনুই রেখে নিচু মাথায় চিন্তা করছে। কয়েক মিনিট পর জিহানই প্রথম নীরবতা ভাঙল।
—” এভাবে বসে থাকলে হবে না।”
কেউ কিছু বলল না। জিহান এবার সোজা হয়ে বসল। হাতে হাত রেখে বলল,
—” ভাবি যদি সত্যি বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়ে দুরে থাকার ভাবনায় থাকে, তাহলে প্রতিটা মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। আবেগ পরে হবে, আগে মানুষটাকে খুঁজে বের করতে হবে।”
শ্রাবণ সাথে সাথে বলল,
—” আমি এখনই বের হচ্ছি।”
জিহান ধমকে উঠল,
—” একা বের হয়ে কী করবি? এই ঢাকা শহরে লক্ষ লক্ষ মানুষ। তুই কি রাস্তা ধরে ধরে সবাইকে জিজ্ঞেস করবি?”
শ্রাবণ দাঁত চেপে চুপ করে গেল। জিহান গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,
—” আমাদের ভাগ হয়ে কাজ করতে হবে।”
নীল মাথা তুলল। আগ্রহ নিয়ে বলল,
—” কীভাবে?”
জিহান আঙুল গুনতে গুনতে বলতে লাগল,
—” প্রথমত, শ্রাবণ গাড়ি নিয়ে বেরোবে। যত জায়গা পারে, রীতিমতো পুরো শহর চুষে ফেলবে।”
—” সেটা তো করবই।”
—” শুধু কথার কথা খুঁজতে বলছি না। ছবি নিয়ে বের হবি। হাসপাতাল, পার্ক, মার্কেট, বড় মোড়, মসজিদের আশেপাশে, যেখানে যেখানে একজন অসহায় মেয়ে আশ্রয় নিতে পারে, সব জায়গায় খুঁজবি।”
শ্রাবণ এবার মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। জিহান নীলের দিকে তাকাল।
—” তুই থানায় যাবি।”
—” মিসিং কমপ্লেইন?”
—” হ্যাঁ। যত দ্রুত রিপোর্ট হবে, তত ভালো। সিসিটিভি, বাসস্ট্যান্ড, সবকিছু ট্র্যাক করার সুযোগ থাকবে।”
নীল গম্ভীর হয়ে গেল,
—” আচ্ছা।”
এরপর জিহান নিজের বুকে আঙুল ঠেকাল, বলল,
—” আমি যাব সব বাসস্ট্যান্ড আর রেলস্টেশনে।”
শ্রাবণ সাথে সাথে তাকাল। জিহান বলল,
—” যদি শহর ছাড়ার চেষ্টা করে থাকে, তাহলে কোনো না কোনো স্টেশন দিয়ে যেতে হবে। আমি সব জায়গায় ছবি দেখিয়ে খোঁজ নেব।”
সালমা বেগমের ভয় লাগছে সবার কথা শুনে। সবাই এসব ভাবছে। অথচ তার মাতৃমন কাঁপছে অন্য ভাবনায়। তিনি অবশেষে কাঁপা গলায় বললেন,
—” কিন্তু যদি…যদি কোনো বিপদ…”
কথাটা শেষ করতে পারলেন না তিনি।
শ্রাবণের বুক মোচড় দিয়ে উঠল। এই প্রথমবার তার মাথায় ভয়ঙ্কর একটা চিন্তা এলো। ধারা কি ঠিক আছে? সে কি খেয়েছে? টাকা ছাড়া কোথায় গেছে? কেউ কি তাকে বিরক্ত করেছে? এই শহরের রাস্তা তো সে ভালো করে চিনেও না…মুহূর্তের মধ্যে শ্রাবণের মুখের রং উড়ে গেল। নীল সেটা লক্ষ্য করল, জিহানও। কিন্তু কেউ কিছু বলল না। কারণ তারাও বুঝে গেছে।
জিহান বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিয়ে ধীরে উঠে দাঁড়াল,
—” ঠিক আছে। সবাই ফোন অন রাখ। কোনো খবর পেলেই সঙ্গে সঙ্গে একে অপরকে জানাব।”
নীলও উঠে দাঁড়াল,
—” আমি থানায় যাচ্ছি।”
জিহান আর নীল দুজনেই তড়িঘড়ি করে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। শ্রাবণ এক সেকেন্ডও নষ্ট করল না। টেবিলের ওপর রাখা গাড়ির চাবিটা তুলে নিল। তারপর দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থেমে গেল। পেছন ফিরে তাকাল মায়ের দিকে। সালমা বেগমের চোখ তখনো ভেজা। শ্রাবণ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। এরপর এগিয়ে এসে একদম ভদ্রমহিলার সামনে দাঁড়িয়ে খুব নিচু গলায় বলল,
—” মা…”
সালমা বেগম তাকালেন। শ্রাবণের গলা ভারী হয়ে এলো,
—” তুমি আমায় বেশি ভালোবাসো, নাকি ধারাকে?”
সালমা বেগম জবাব না দিয়ে অভিমান করার ভান করলেন। অন্যদিকে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বললেন,
—” ধারাকেই বেশি ভালোবাসি। ও-ই আমার মেয়ে।”
—” আর আমি?”
শ্রাবণের কন্ঠটা বাচ্চাদের মত শোনালো। সালমা বেগমের মন চাইলো ছেলেটাকে বুকে জড়িয়ে নিতে। তিনিও মা, তিনি অনেকক্ষণ আগেই বুঝে গেছেন তার ছেলে নিজেও কষ্টে জর্জরিত হয়ে গেছে। তার বোকা ছেলেটা আশাও করেনি ধারা তাকে এভাবে ধোঁকা দেবে। ধারা যে এত কঠিন হবে তা বেচারা ভাবতেই পারে নি। আর এখন হুট করে মারাত্মক ধাক্কা খেয়ে থমকে রয়েছে ছেলেটা।
সালমা বেগম কিছু না বলে চোখ মুছলেন। শ্রাবণ এবারে মায়ের দুটো হাতই নিজের হাতের মুঠোয় নিল। একটুখানি বুকের কাছে এনে মিনমিন করে বলল,
—” ঠিক আছে আমি তোমার কেও না। কিন্তু কথা দিচ্ছি তোমার ওই পাতানো বেয়াদব মেয়েকে খুঁজে নিয়ে আসব। সত্যি। ওই আহাম্মক টা বাড়ি না আসা পর্যন্ত আমি এ বাড়ির ভাত খাব না। আমি… ওকে খুঁজে আনব।”
কথাটা বলেই সে আর দাঁড়াল না। দ্রুত বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে ঘরটা আবার কেঁপে উঠল। সালমা বেগম সেদিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে হাসলেন। চোখে পানি চিকচিক করছে তার। এবারে ধারার জন্য নয়, তার যক্ষের ধনের জন্য, তার একমাত্র ছেলের জন্য। এইতো! এইতো তার মাতৃমনের ধারনা সত্যি হয়েছে।
– ❝ শ্রাবণ শেখ সহজে ভালোবাসে না, তবে একবার ভালোবাসলে সহজে ছেড়ে দেয় না।❞
আর এখন শ্রাবণ শেখ নিজের জীবনের পরোয়াও যে করবেনা তা ভদ্রমহিলা বেশ জানেন। তাই ধারার চিন্তা আপাতত না করে তিনি চোখ বুঁজে নিজের ছেলের জন্যই দোয়া করলেন।
বাড়ির গেট পেরিয়ে বেরোতেই এক ঝটকা ভরদুপুরের বাতাস এসে মুখে আছড়ে পড়ল শ্রাবণের। কিন্তু তাতে তার মাথা ঠান্ডা হলো না। গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে বসলো সে। স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখতেই হঠাৎ থেমে গেল। কোথায় যাবে? এই বিশাল শহরে একজন মানুষকে খুঁজবে কীভাবে? প্রশ্নটার উত্তর তার কাছে নেই। কিন্তু একটা জিনিস সে নিশ্চিত জানে। ধারা একা। আর সেই ভাবনাটাই তাকে পাগল করে দিচ্ছে। স্টিয়ারিং শক্ত করে চেপে ধরল শ্রাবণ। হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে সব মুহুর্ত গুলো। শ্রাবণ চোখ বন্ধ করল। বুকের ভেতর যেন কেউ ধীরে ধীরে ছুরি চালাচ্ছে। সে কখনো ভাবেনি ধারার চলে যাওয়া তাকে এভাবে নাড়িয়ে দেবে। কখনো ভাবেনি, একদিন সেই মেয়েটার অনুপস্থিতিই তার সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়াবে। একটা তিক্ত হাসি বেরিয়ে এলো তার ঠোঁট থেকে।
—” ইডিয়ট মেয়ে…”
বিড়বিড় করল সে।
—” তোকে কে বলেছিল চলে যেতে? আহাম্মক! একবার খুঁজে পেলে থাপ্পড় মে’রে অজ্ঞান করব তোকে।”
কথাটা শেষ করেই গাড়ি স্টার্ট দিল শ্রাবণ। পরের মুহূর্তেই শেখ বাড়ির গেট পেরিয়ে বেরিয়ে গেল কালো গাড়িটা, শহরের কোথাও একজন হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে খুঁজতে, আর হয়তো নিজেকেও।
সারাদিন। পুরো একটা দিন। আট ঘণ্টা না, যেন আট বছর কেটে গেছে শ্রাবণের। দুপুর বারোটায় বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে সে আর মানুষ ছিল না, ছিল একটা অস্থির যান্ত্রিক মানব। গাড়ি নিয়ে শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ছুটেছে। নীল, জিহানের প্রতি ভরসা করেনি সে। নিজেই পুরোনো বাসস্ট্যান্ড, নতুন বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট, হাসপাতাল, পার্ক, মার্কেট, মসজিদের আশেপাশে, যেখানে যেখানে একজন একা মেয়ে আশ্রয় নিতে পারে, সব জায়গায় খুঁজেছে সে। প্রতিবারই একই প্রশ্ন। কখনো ফোনের স্ক্রিনে ধারার ছবিটা দেখিয়েছে। কেউ মাথা নেড়েছে। কেউ বলেছে, না ভাই। কেউ আবার ছবিটার দিকে তাকিয়েও দ্বিতীয়বার দেখার প্রয়োজন বোধ করেনি। প্রতিবার উত্তর শুনে শ্রাবণের বুকের ভেতরটা আরো একটু করে ডুবে গেছে। দুপুর কখন পেরিয়ে গেছে, সে জানে না। খেয়েছে কি না, মনে নেই। পানি খেয়েছে কি না, তাও মনে নেই। জিহান অন্তত দশবার কল করেছে। নীল করেছে আরো বেশি। প্রতিবার একই উত্তর।
—” না। পাইনি।”
বিকেলের দিকে শ্রাবণের গলার স্বরই বদলে গিয়েছিল। সন্ধ্যার পর চোখদুটো লাল হয়ে উঠল। পুরো শহরে অন্ধকার নেমে আসতেই সে আর পারল না। একটা দীর্ঘ ব্রিজের মাঝামাঝি এসে গাড়িটা ধীরে ধীরে থামিয়ে দিল। ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল। চারপাশে বাতাস বইছে। নিচে কালো নদী, দূরে দূরে শহরের আলো। অথচ এত বড় শহরটাকে আজ তার কাছে ভীষণ নির্দয় মনে হচ্ছে। শ্রাবণ মাথা সিটে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল। শরীরের প্রতিটা হাড় ব্যথা করছে। হাতদুটো অবশ, মাথাটা ভারী। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্লান্ত তার মন। ধীরে ধীরে চোখ খুলে সামনে তাকাল সে। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শুধু অন্ধকার। ঠিক যেমন অন্ধকার এখন তার ভেতরেও।
হঠাৎ করেই শ্রাবণের মাথায় একটা প্রশ্ন এলো। কেন? কেন সে সারাদিন এভাবে ছুটে বেড়াচ্ছে? কেন সে খায়নি? কেন পানি খেতে ভুলে গেছে? কেন প্রতিবার একটা অপরিচিত মেয়েকে দূর থেকে দেখলেই বুক ধক করে উঠেছে? কেন? কেন?কেন? শ্রাবণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। উত্তরটা এতক্ষণ তার সামনেই ছিল। শুধু সে দেখতে চায়নি। দেখার সাহস হয়নি। মনে পড়ল, একটা মেয়ে প্রতিদিন তার খাবারের খোঁজ রাখত। সে বাসায় ফিরেছে কি না অপেক্ষা করত। অকারণে বকা খেলেও পরদিন আবার তার সামনে দাঁড়াত। মাথা ব্যথা হলে চিন্তা করত। রাগ করলে ভয় পেত। তবুও দূরে যেত না।
আর সেই মেয়েটা আজ নেই। শুধু নেই। এই “নেই” শব্দটাই তার পৃথিবী ওলটপালট করে দিয়েছে। শ্রাবণের বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। এত জোরে যে শ্বাস নিতেও কষ্ট হলো। সে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বসে রইল। আর তখনই…হঠাৎ করে উপলব্ধিটা এলো। সত্যিটা। নিষ্ঠুর, নির্মম সেই সত্যি। কিন্তু অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। সে ধারাকে খুঁজছে না শুধু। সে ধারাকে হারানোর ভয় পাচ্ছে। ভয়ঙ্করভাবে। কারণ…
শ্রাবণ মেয়েটাকে ভালোবেসে ফেলেছে।
কখন? জানে না। কীভাবে? জানে না। কোন মুহূর্তে? সেটাও জানে না। হয়তো সেই রাতে, যখন নেশাগ্রস্ত অবস্থায় অবচেতন মন নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ধারাকেই চিনেছিল। হয়তো তারও আগে। হয়তো প্রতিদিন একটু একটু করে। হয়তো সেই দিন, যেদিন প্রথমবার মেয়েটা তার জন্য অপেক্ষা করেছিল।কিন্তু আজ আর কোনো সন্দেহ নেই। সে ভালোবেসে ফেলেছে, ভীষণভাবে। এতটাই যে আট ঘণ্টা ধরে শহর তন্নতন্ন করে খুঁজেও ক্লান্ত হয়নি।
এতটাই যে এখনো মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব রাস্তা ঘুরে দেখতে পারবে, যদি শেষে ধারাকে একবার পাওয়া যায়। শ্রাবণ ফাঁকা চোখে সামনে তাকিয়ে রইল। পরের মুহূর্তেই তার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। সে কাঁদছে। শ্রাবণ শেখ, যে মানুষটা নিজের কষ্টও কাউকে দেখায় না। যে মানুষটা বছরের পর বছর নিজের অনুভূতিগুলো দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছে। সে আজ একটা নির্জন ব্রিজের উপর বসে নিঃশব্দে কাঁদছে। কারণ আজ প্রথমবার সে বুঝেছে, ধারা চলে যায়নি শুধু। সে শ্রাবণের হৃদয়টাও সঙ্গে করে নিয়ে গেছে। আর এখন সেই হৃদয়টাকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত শ্রাবণের কোনো শান্তি নেই।
শ্রাবণ ধারা পর্ব ২২
শ্রাবণ ক্লান্ত ভঙ্গিতে স্টিয়ারিং এ মাথা ঠেকিয়ে এবার শব্দ করে কেঁদে উঠল। পুরুষরা কাঁদে না, কিন্তু তাদের কান্না ভয়ানক। তারা কাঁদলে পৃথিবীও কাঁদে তাদের সাথে। শ্রাবণ কান্নাভেজা কন্ঠে বিড়বিড় করল,
—” ছলনাময়ী নারী! ছেড়েই যখন যাবে, তখন ভালোবাসা শেখালে কেন? ফেলেই যখন দেবে, তখন হৃদয়টা নিয়েছিলে কেন? যখন থাকবেই না, তখন মন দখল করলে কেন? এত নিষ্ঠুরতা কেন?”
