শ্রাবণ ধারা পর্ব ২২
অনামিকা তাহসিন রোজা
জিহানের ফ্লাটেই গতরাত কাটিয়েছে নীল ও শ্রাবণ। একজনও ঘুমোয়নি। গল্প আড্ডাতেই কাটিয়ে দিয়েছে সারারাত। ভোরের একটু নীল আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। শ্রাবণ ও জিহান তখন বারান্দায় বসে নিজেদের কথাবার্তা চালিয়েছিল। একটু আগে ঘুম ভেঙেছে নীলের। সে মেঝেতে বসে আধোচোখে হতাশ হয়ে তাকিয়ে রয়েছে শ্রাবণের দিকে, যে কিনা এখন চায়ের কাপ হাতে নিয়ে আরামে টিভি দেখছে। জিহান সেই যে ঘন্টাখানেক আগে ওয়াশরুমে গিয়েছে, তার আর ফিরে আসার নাম নেই। ওখানেই ঘুমিয়ে পড়ল কিনা কে জানে। নীল বুক ভরে শ্বাস নিয়ে মাথা চুলকে তৃতীয় বারের মত ডাকল,
—” ভাইজান?”
শ্রাবণ না তাকিয়ে জবাব দিল,
—” বল।”
—” বাড়ি যাবে না?”
—” তুই যাচ্ছিস না কেনো? দুর হ, যা।”
—” কখনোই না। তুমিও চলো।”
—” আমি পরে যাব। কাজ আছে।”
নীল চোখমুখ কুঁচকে বিড়বিড় করে নিজের কপালকে গালি দিল। এরপর আবারো মেঝেতে সটান হয়ে শুয়ে পড়ল। সারারাত বেকায়দায় ঘুমিয়েছে সে। শরীরের সব হাড়গোড় ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম, পেশিতে টান পড়েছে বেশ। ফ্যানের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা মনে করতেই নীল এবারে ফট করে শ্রাবণকে বলল,
—” ভাইয়া, তোমার বউ কি তোমাকে ডিভোর্স দিয়েছে?”
চা গলায় উঠে গেল শ্রাবণের। খুক খুক করে কাশতে কাশতে বোকার মত দৃষ্টি ফেলে বলল,
—” মানে?”
—” তোমার নতুন বউয়ের কথা বলছি। সে নাকি বাপের বাড়ি ঘুরতে গেছে। মানুষ এতদিন বাপের বাড়ি থাকে? সত্যি করে বলোতো, ডিভোর্সের দিকে ঘটনা গেছে নাকি?”
শ্রাবণের সত্যি বলতে মনেই ছিল না নীলকে দেয়া তথ্যমতে তার একটা অদৃশ্য বউ আছে, যে এখন বাপের বাড়িতে। এই কাহিনী ধামাচাপা দেবে কীভাবে তা এখনো ভেবে দেখেনি সে। শ্রাবণ এক সেকেন্ড থমকে রইল। তারপর এমন ভাব করল যেন প্রশ্নটাই খুব স্বাভাবিক। আরেকবার চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সে বলল,
—” মানুষ বাপের বাড়ি গেলে কতদিন থাকে, সেটা আমি কীভাবে জানব?”
নীল কাত হয়ে শুয়ে বলল,
—” নিজের বউ কতদিন বাপের বাড়ি থাকে তাও জানো না? সংসারটা করো কীভাবে তোমরা?”
শ্রাবণ চায়ের কাপ নামিয়ে বিরক্ত হলো।
—” তুই ঘুম থেকে উঠেই আমার মাথা খাচ্ছিস কেন?”
—” কারণ আমার কৌতূহল হচ্ছে।”
—” কৌতূহলকে গুলি কর। চুপ থাক!”
নীল দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—” আহারে! মেয়েটার জন্য মায়া লাগছে।”
—” কার?”
—” ভাবির।”
শ্রাবণের কপালে ভাঁজ পড়ল।
—” আবার ভাবি!”
—” হ্যাঁ। না দেখা ভাবি হলেও তো মানুষ। একা একা বাপের বাড়িতে পড়ে আছে। স্বামী আবার বন্ধুর বাসায় রাত কাটাচ্ছে। কী কষ্ট!”
শ্রাবণ এবার কুশন ছুঁড়ে মারল তার দিকে,
—” চুপ কর আহাম্মক।”
নীল কুশন বুকে জড়িয়ে নাটকীয় গলায় বলল,
—” না ভাইয়া, আজ সত্যিটা বলো। তোমাদের ঝগড়া হয়েছে না?”
—” হয়নি।”
—” তাহলে ভাবি রাগ করে গেছে?”
—” যায়নি।”
—” তাহলে কোথায়?”
—” জানি না!”
কথাটা মুখ ফসকে বের হতেই দুজনেই থেমে গেল। নীল ধীরে ধীরে উঠে বসল।
—” কী বললে?”
শ্রাবণ মুখ শক্ত করে অন্যদিকে তাকাল,
—” কিছু না।”
—” না না, আমি স্পষ্ট শুনেছি। তুমি বলেছো জানো না।”
শ্রাবণ বিরক্ত হয়ে বলল,
—” তো আমি কীভাবে জানব?”
—” ধুর ছাই! ”
নীল কয়েক সেকেন্ড ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। এরপর দুহাতে নিজের মাথা চেপে ধরল। কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খুলে বের হলো জিহান। চুল ভেজা, হাতে তোয়ালে। বের হয়েই বলল,
—” কী নিয়ে এত চিল্লাচিল্লি হচ্ছে?”
নীল তড়াক করে উঠে দাঁড়াল,
—” জিহান ভাই! পৃথিবীর সবচেয়ে বড় খবর!”
—” কী?”
—” ভাইজানের বউ হারিয়ে গেছে।”
জিহান থেমে গেল। তারপর ধীরে ধীরে শ্রাবণের দিকে তাকাল। শ্রাবণ চুপচাপ চায়ে চুমুক দিল। জিহান ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপল।
—” ওহ্… তাই নাকি?”
নীল ক্ষুব্ধ গলায় বলল,
—” আপনি আগে থেকেই জানতেন?”
—” উমম…”
—” জানতেন!”
জিহান হেসে ফেলল,
—” একটু-আধটু।”
—” তোমরা দুইজনই ভয়ংকর মানুষ। আমার ভাবির প্রতি কোনো মায়া-দরদ নেই, ছ্যাহ!”
নীল আবার ধপাস করে মেঝেতে বসে পড়ল। ওদিকে শ্রাবণ জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। অদ্ভুতভাবে আজ তার মেজাজ আগের চেয়ে হালকা। তবুও একটা নাম বারবার মাথার ভেতর ঘুরছে। গতরাতে, আজ সকালে, গত সন্ধ্যায়…সবকিছু মিলিয়ে। কিছু একটা বদলে গেছে। আর সবচেয়ে অস্বস্তিকর ব্যাপার হলো সে নিজেই বুঝতে পারছে না, ঠিক কী বদলেছে। তবে আজ বাড়িতে ফিরে কিছু একটা ঠিক করে নেবে শ্রাবণ মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জিহান ফ্রিজ খুলে ঠান্ডা পানি বের করছে। নীল এখনো মেঝেতে বসে নিজের প্রতারিত জীবনের শোক পালন করছে। জিহান হাসি চাপতে চাপতে বলল,
—” হয়েছে নীল, মন খারাপ করিস না, তোর জীবনটাই ট্র্যাজেডি।”
শ্রাবণ চোখ ঘুরিয়ে টিভির দিকে তাকিয়ে রইল। ঠিক তখনই নীলের ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল— খালামনি। নীল স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই কল রিসিভ করল।
—” জি খালামনি?”
ওপাশ থেকে সালমা বেগমের কণ্ঠ ভেসে এলো। কিন্তু অদ্ভুতভাবে কণ্ঠটা কেমন যেন উদ্বিগ্ন শোনাচ্ছিল। কোনোমতে তিনি শাড়ির আঁচলে কপালের ঘাম মুছে ভাঙা গলায় বললেন,
—” নীল, বাবা…তুই কোথায়?”
নীল ভ্রু কুঁচকাল,
—” কেন? জিহান ভাইয়ের বাসায়। ভাইজানের সাথে আছি।”
—” আচ্ছা… যত তাড়াতাড়ি পারিস বাড়ি আয়।”
—” কী হয়েছে?”
—” আগে আয়।”
—” খালামনি, কিছু হয়েছে নাকি?”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর সালমা বেগম শুধু বললেন,
—” আমি ফোনে বলতে চাইছি না। তুই আয়। শ্রাবণ না এলেও তুই আয়।”
কথাটা বলে তিনি কল কেটে দিলেন। নীল ফোন নামিয়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। জিহানও এবার ভ্রু কুঁচকাল।
—” কী হয়েছে?”
নীল ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল,
—” জানি না। কিন্তু খালামনির গলা ভালো লাগল না।”
টিভির দিকে তাকিয়ে থাকা শ্রাবণের হাত থেমে গেল। সে ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল,
—” কী হয়েছে?”
—” কি জানি। খালামনির গলা কেমন যেন…
—” মা কাঁদছিল?”
—” না… মানে… পুরোপুরি না। কিন্তু টেনশনে আছে মনে হলো!”
একটু থেমে নীল বলল,
—” বাড়িতে ফিরতে বলল দ্রুত।”
শ্রাবণের বুকের ভেতর অস্বস্তি কাজ করল। সাথে সাথে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
—” চল।”
নীল অবাক হয়ে তাকাল,
—” কোথায়?”
—” বাড়ি।”
—” তুমি তো বলছিলে কাজ আছে!”
—” এখন নেই।”
কথাটা বলেই শ্রাবণ চেয়ারে রাখা শার্টটা পড়ে নিল। জিহান দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—” আমিও আসব?”
—” আয়।”
—” আমন্ত্রণ ছাড়া যাচ্ছি কিন্তু।”
—” বেশি কথা বলবি না।”
জিহান হেসে ফেলল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনজন ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেল। লিফট দিয়ে নামতে নামতে নীলের অস্বস্তি বাড়তেই লাগল। কারণ সালমা বেগম এমন মানুষ নন যে অকারণে কাউকে তাড়াহুড়ো করে ডাকবেন। অন্যদিকে শ্রাবণ বাইরে থেকে যতই স্থির থাকার চেষ্টা করুক, তার মুঠো করে রাখা হাত বলে দিচ্ছে ভেতরে ভেতরে সে চিন্তিত। বারবার একটা চিন্তাই মাথায় আসছে। মায়ের কিছু হয়েছে?নাকি…অজান্তেই আরেকটা মুখ ভেসে উঠল তার মনে। সাথে সাথে বিরক্ত হয়ে নিজের চিন্তাকেই ধমক দিল শ্রাবণ। তবুও গাড়িতে উঠে বসার পর থেকে পুরো রাস্তা জুড়ে তার বুকের ভেতর অকারণ একটা অস্বস্তি চেপে বসে রইল। তবে ভাবতেও পারল না, বাড়িতে পৌঁছানোর পর এমন কিছু দেখতে চলেছে, যার জন্য তারা কেওই একদম প্রস্তুত নয়।
বাড়ির মূল দরজা খুলেই ভেতরে ঢুকল তিনজন। সাধারণত সাত সকালে শেখ বাড়িতে টিভির শব্দ, সালমা বেগমের সিরিয়াল নিয়ে মন্তব্য, কিংবা রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা টুকটাক শব্দ শোনা যায়। কিন্তু আজ কেমন যেন অস্বাভাবিক নীরবতা। জুতা খুলতে খুলতেই শ্রাবণের ভ্রু কুঁচকে গেল। ড্রয়িংরুমে সোফার এক কোণায় বসে আছেন সালমা বেগম। টিভি চলছে ঠিকই, কিন্তু তিনি দেখছেন না। রিমোটটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে সামনে তাকিয়ে আছেন। মুখটা ভীষণ মলিন। চোখদুটোও লাল। শ্রাবণের বুক ধক করে উঠল। সে দ্রুত এগিয়ে গেল।
—” মা?”
কোনো উত্তর নেই।
—” কী হয়েছে?”
সালমা বেগম তাকালেনই না। শ্রাবণ এবার সত্যিই অস্থির হয়ে উঠল।
—” মা, আমি কথা বলছি। কী হয়েছে?”
তবুও কোনো উত্তর নেই। বরং তিনি মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকালেন। দৃশ্যটা দেখে নীল আর জিহান দুজনেই অবাক হলো। শ্রাবণ হতভম্ব হয়ে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল। তার মা সাধারণত যতই রাগ করুন, এমনভাবে তাকে উপেক্ষা করেন না।
—” মা? প্লিজ বলো কী হয়েছে?”
কণ্ঠটা এবার একটু নরম হলো তার। সালমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কিন্তু এবারও ছেলের দিকে তাকালেন না। বরং হঠাৎ নীলের দিকে তাকিয়ে অস্থির গলায় বললেন,
—” নীল, বাবা… তুই জানিস ধারা কোথায় গেছে?”
কথাটা শুনে তিনজনই থমকে গেল। নীল অবাক হয়ে বলল,
—” ধারা?”
—” হ্যাঁ।”
—” ও তো বাড়িতেই ছিল! তাই না?”
সালমা বেগম মাথা নাড়লেন,
—” নেই।”
শ্রাবণের বুকের ভেতর কেমন খালি হয়ে গেল। ভ্রু কুঁচকে সে তাড়াতাড়ি বলল,
—” নেই মানে? কোথায় গেছে? তোমার সাথেই তো ছিল।”
সালমা বেগম এবারও তাকে পাত্তা দিলেন না। শুধু নীলের দিকেই ব্যাকুল হয়ে তাকিয়ে রইলেন, যেন সে-ই ধারাকে খুঁজে আনতে পারবে।
—” আমি ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে খুঁজছি। রান্নাঘরে নেই। ঘরে নেই। ছাদে নেই। আশেপাশেও নেই।”
নীলের মুখের হাসিটুকুও মিলিয়ে গেল,
—” ফোন?”
—” ফোনটা ঘরেই রেখে গেছে। আমাদের দেয়া কোনো জিনিস নেয়নি।”
এইবার সত্যিকার অর্থে নীরবতা নেমে এলো ঘরে। জিহানও সোজা হয়ে দাঁড়াল। আর শ্রাবণ? তার মুখের রঙ বদলে গেছে। সে ধীরে ধীরে বলল,
—” কতক্ষণ হলো?”
সালমা বেগম এবারও তার দিকে তাকালেন না। চোখ মুছে বললেন,
—” জানি না।”
তারপর কষ্টভরা গলায় যোগ করলেন,
—” আমি ভেবেছিলাম রাগ করেছে। একটু একা থাকতে চায়। তাই বিরক্ত করিনি। কিন্তু এখন চার ঘণ্টারও বেশি হয়ে গেছে।”
নীলের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল,
—” খালামনি, ধারা কাউকে কিছু বলে যায়নি?”
—” না।”
শ্রাবণ রীতিমতো বিরক্ত হয়ে গেল। মুখ কুঁচকে বলল,
—” এগুলো কেমন কথা মা? ও উধাও হবে কী করে? কোথাও গেছে মনে হয়? হয়তো দোকানে বা অন্য কোথাও। ফোন কেনো রেখে গেল বুৃঝতে পারছিনা। এত কেয়ারলেস হলে হয়?”
সালমা বেগম শক্ত কন্ঠে বলল,
—” চুপ কর তুই।”
শ্রাবণ সালমা বেগমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
—” মা তুমি তখন থেকে আমার সাথে এমন করছো? কী হয়েছে আশ্চর্য। আমি কী করেছি? ”
সালমা বেগম প্রথমবারের মত তাকালেন শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণের মাথা ঝটকা খেল। সাথে সাথে সেও বিভ্রান্ত হয়তাকাল মায়ের দিকে। প্রথমবারের মতো সালমা বেগমের চোখ তার চোখের সাথে মিলল। সেই চোখে অভিমান, কষ্ট আর রাগ জমে আছে। কাঁপা গলায় তিনি বাঁকা হেসে চোখ মুছে বললেন
—” কী করেছিস? জানতে চাস? আয়!”
বলেই তিনি শ্রাবণের বাহু শক্ত করে ধরে সিঁড়ির কাছে নিয়ে গেলেন। সেই স্টোর রুমটার দিকে আঙুল তাক করে অস্থির গলায় বললেন,
—” যা, যা দেখে আয় কী করেছিস তুই। যা দেখে আয়। যা।”
কথাটা ছুরির মতো এসে বিঁধল। শ্রাবণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকের ভেতর হঠাৎ করে এমন একটা ভয় জন্ম নিল, যার নাম সে আগে কখনো জানত না। আর সেই ভয়টা শুধু একটা প্রশ্নই বারবার করছে—ধারা কোথায়?
সালমা বেগমের হাতের চাপ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল শ্রাবণ। তার বুকের ভেতরটা অকারণে ধড়ফড় করছে। নীল আর জিহানও এবার গম্ভীর হয়ে গেছে। কেউ আর কোনো কথা বলছে না। শ্রাবণ এক মুহূর্তও দেরি করল না। দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। ধাপগুলো আজ কেমন যেন লম্বা লম্বা মনে হচ্ছে। এক লাফে প্রায় দুই তিনটা ধাপ পার হয়ে সে পৌঁছে গেল করিডোরে। তারপর সোজা সেই ছোট্ট স্টোররুমটার সামনে। দরজাটা আধখোলা। শ্রাবণের বুকের ভেতর কেমন করে উঠল। ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে দরজাটা পুরোপুরি ঠেলে খুলল সে। আর তারপরই স্থির হয়ে গেল। পুরোপুরি স্থির। যেন সময় থেমে গেছে।
ঘরটা ফাঁকা। একদম ফাঁকা। বিছানার উপর সেই পাতানো চাদর নেই। কোণায় রাখা ছোট ব্যাগটা নেই। আলনার উপর ঝুলতে থাকা ওড়নাগুলো নেই। জানালার পাশে রাখা ছোট্ট পানির বোতলটাও নেই। সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এতটাই গুছিয়ে যে মনে হচ্ছে, এ ঘরে কখনো কেউ ছিলই না। শ্রাবণের শ্বাস আটকে গেল। সে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল। চারপাশে তাকাল। না। কোথাও কিছু নেই। একটা মানুষ যেন নিজের সমস্ত অস্তিত্ব মুছে দিয়ে চলে গেছে। বিছানা যেখানে পাতানো ছিল সেখানে এখন শুধু তোষকটা ভাজ করে রাখা। দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল শ্রাবণ। তারপর ধীরে ধীরে নিচে চোখ নামল। মেঝের এক কোণায় শুকিয়ে যাওয়া কয়েকটা বেলী ফুল পড়ে আছে। গতকালের ছিঁড়ে ফেলা মালার কিছু অংশ। শ্রাবণের গলা শুকিয়ে গেল। অজান্তেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে। একটা ফুল তুলে নিল হাতে। শুকিয়ে গেছে, নষ্ট হয়ে গেছে। ঠিক তখনই তার মাথার মধ্যে ঝলকে উঠল গতকালের দৃশ্য। ধারার মুখ। হাতে কুড়িয়ে নেওয়া ফুলগুলো, আর সেই দৃষ্টি। ভীষণ ঠান্ডা, ঘৃনাভরা সেই দৃষ্টি মনে করতেই শ্রাবণের মস্তিষ্ক সজাগ হলো। ধারা কি তবে গতকালকেই তার এই প্রস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছিল?
শ্রাবণের আঙুল কেঁপে উঠল। না। এভাবে তো যাওয়ার কথা না। ও তো কোথাও যায় না। ও তো রাগ করলেও থাকে। অভিমান করলেও থাকে। অপমান পেলেও থাকে। তাহলে? হঠাৎ করেই তার বুকের ভেতর ভয়টা আরও বড় হয়ে উঠল। এবার প্রথমবারের মতো মনে হলো, ধারা হয়তো শুধু বাড়ি থেকে বের হয়নি। ধারা হয়তো চলে গেছে। সত্যি সত্যি চলে গেছে। দরজার বাইরে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে নীল আর জিহান। তারা দুজনেও ঘরটার অবস্থা দেখে চুপ হয়ে গেল। নিচ থেকে সালমা বেগমের কান্নাভেজা কণ্ঠ ভেসে এলো,
শ্রাবণ ধারা পর্ব ২১
—” দেখেছিস? এবার বুঝতে পারছিস?”
শ্রাবণ কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু ফাঁকা ঘরটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার জীবনে প্রথমবারের মতো একটা জায়গা এত শূন্য লাগছে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই শূন্যতার জন্য সে কাউকে দোষ দিতে পারছে না। কারণ খুব ধীরে ধীরে, নিষ্ঠুরভাবে একটা উপলব্ধি মাথার ভেতর জায়গা করে নিতে শুরু করেছে। এই ফাঁকা ঘরটার জন্য দায়ী মানুষটা হয়তো সে নিজেই।
