শ্রাবণ ধারা পর্ব ৪
অনামিকা তাহসিন রোজা
শ্রাবণ ডাইনিং টেবিলে বসে আছে চুপচাপ। ল্যাপটপ টা ঘরে রেখে এসেছে ইতোমধ্যে। তবে তার মেজাজ খুব খারাপ। সে ভেবেছিল আজ রাতে আর খাবে না। কিন্তু ঘরে পা রাখার আগেই পেছন থেকে ধারা ডেকে ওঠে অনুরোধ করে ডিনার করার জন্য। শ্রাবণ যদিও মনে মনে ভেবেছিল মেয়েটা রান্না করবে না। কিন্তু হুট করে ধারার প্রতি মায়া হওয়ায় শ্রাবণ দ্বিমত না করে বসার ঘরে ফিরে এসেছে। কিন্তু নিজের বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে হুমকি দিয়েছে বিশ মিনিটের মধ্যে এই টেবিলে খাবার না আসলে সে আর খাবেই না। মেনে নিয়েছে ধারা। দ্রুত গতিতে সব কাজ করে ফেলেছে। শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে দেয়ালে ঘড়ির দিকে একবার তাকালো। উঁচু গলায় বলে উঠলো ,
—” আর দু মিনিট।”
ধারা রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে বলল,
—” এইতো হয়ে গেছে। একটু অপেক্ষা করুন।”
—” দুই মিনিটই করব।”
—” ওটাই যথেষ্ট। ‘
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রান্নাঘর থেকে তড়িঘড়ি করে বের হলো ধারা। হাতে ট্রে, যেখানে ভাত, ডাল, ভাজি, আর একটা ছোট বাটিতে তরকারি সাজানো হয়েছে। সবকিছু যতটা সম্ভব গুছিয়ে রেখেছে সে। টেবিলের কাছে এসে একটু হাঁপিয়ে উঠলো মেয়েটা। নিঃশ্বাসগুলো ভারী হয়ে গেছে, কপালে হালকা ঘাম জমেছে। তবুও তাড়াহুড়ো করে একে একে সবকিছু সাজিয়ে দিতে লাগলো।
—” এইতো হয়ে গেছে।”
কণ্ঠে ক্লান্তি, তবুও একটা জোর করে টেনে আনা হাসি। চামচ, গ্লাস সব ঠিকঠাক করে রেখে আবার একবার তাকালো শ্রাবণের দিকে। চোখ দিয়েই যেন অনুরোধ করল শ্রাবণকে যেন সে খেয়ে নেয়। শ্রাবণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলো তার দিকে। মেয়েটার হাত কাঁপছে হালকা, নিঃশ্বাস দ্রুত, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কতটা তাড়াহুড়ো করে করেছে সব।
আর কিছু না বলে শ্রাবণ বেসিন থেকে হাত ধুয়ে এলো। একবার তার মন চাইল ধারাকে চেয়ারে বসতে বলবে। যেভাবে হাঁপাচ্ছে মেয়েটা! পরে ভাবল সে কেন বলবে? দরকার কী? তাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে শ্রাবণ বসে পড়ার প্রস্তুতি নিল। ধারা আবার বলল,
—” দেরি হয়ে যায়নি তো?”
তার চোখে অদ্ভুত এক আশঙ্কা, যেন এই ছোট্ট ব্যাপারটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ তার কাছে। শ্রাবণ কিছু না বলে ধীরে চেয়ারটা টেনে বসে পড়লো। ধারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল অজান্তেই। তবুও দাঁড়িয়ে রইলো পাশে।
—” আর কিছু লাগবে?”
শ্রাবণ মাথা নাড়লো,
—” না।”
ধারা একটু ইতস্তত করলো। তারপর আস্তে করে বলল,
—” আরো পানি এনে দিই?”
—” আছে।”
ছোট ছোট উত্তর। ধারা চুপ করে গেলো। তবুও সরে গেল না। একটু দূরে দাঁড়িয়ে রইলো। চোখে ক্লান্তি, তবুও অপেক্ষা কিছু একটা। শ্রাবণ প্রথম বাটি থেকে ভাত নিলো। একে একে সব আইটেম নিয়ে প্রথম লোকমা মুখে দিলো। ধারা অজান্তেই তার দিকে তাকিয়ে রইলো ঠোঁট চেপে। ভাবল খারাপ হলো কিনা আবার। শ্রাবণ খেতে খেতে কিছু বললো না। কিন্তু মুখেও কোনো বিরক্তির ছাপ নেই। ধারা খুব আস্তে, নিজের কাছেই ফিসফিস করে বলল,
—” সব ঠিক আছে তাহলে।”
কেউ শুনলো না. তবুও সে দাঁড়িয়ে রইলো, নীরবে।
শ্রাবণ খাওয়া শেষ করল দশ মিনিটের মধ্যেই। এরপর চেয়ার থেকে উঠে গলা খাঁকারি দিল, এবং গম্ভীর কন্ঠেই বলল,
—” তোমার রান্নার হাত ভালো।”
ধারার চোখজোড়া যেন জ্বলজ্বল করে উঠলো। সবকিছু ভুলে সে অজান্তেই আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
—” ছোট থেকে রান্না করি তো তাই। জানেন গ্রামের সবাই আমার রান্না পছন্দ করে। অনেকে শিখতেও আসতো আমার কাছে। আপনার ভালো লেগেছে?”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। একটু প্রশংসা করেছে বলে এত লাফানোর কী আছে তা না বুঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নীরব থেকেই বেসিনের কাছে গিয়ে হাত ধুতে শুরু করল। ধারা আবারো নিভে গেল মুহুর্তেই। উপলব্ধি করতে পারল বেশি কথা বলে ফেলেছে সে। এতটা উন্মাদনা দেখানো উচিত হয়নি। সে দ্রুত বেসিনের কাছে টাওয়াল হাতে নিয়ে গেল যেন শ্রাবণ হাত ধোয়ার সাথে সাথে টাওয়ালটা পেয়ে যায়। হাত ধোয়ার পেছনে ফেরে ধারাকে দেখে আবারো কপাল কুঁচকায় শ্রাবণ। ধারার হাত থেকে টাওয়ালটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে যেতে যেতে বলে,
—” এত আহ্লাদ কোথা থেকে শিখেছো? গ্রাম থেকে কি ট্রেনিং করিয়ে পাঠিয়েছে? আমাকে ইমপ্রেস করার জন্য যা যা করার দরকার একদম পুরো কোর্সই করিয়েছে, তাই না?”
শ্রাবণ কথাটা এতটা ব্যঙ্গ করে ও উপহাস করে বলল যে সাথে সাথে ধারার চোখের কোটর থেকে অশ্রু ছিটকে বেরিয়ে এলো। এতটা দুঃখ পেল যা বলার মত না। বুকে পাথর বসালে যে তীব্র ব্যাথাটা হয় সেটা অনুভব করা সত্ত্বেও জোরপূর্বক চোখে পানি নিয়েই হেসে বলল,
—” অত কিছু তো শেখায়নি। তবে…কষ্ট সহ্য করা, ধৈর্য্য ধারন করা, মেনে নেয়া, বাধ্য হওয়া, গোলামি করা – এসব খুব ভালো শিখিয়েছে। ”
শ্রাবণ ফট করে ভ্রু কুঁচকে তাকাল ধারার দিকে। তার মনে হলো ধারা তাকে অপমান করে কথাটা বলল। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধারা আর দেরি করল না, দ্রুত পা চালিয়ে উপরে চলে গেল। প্রায় দৌঁড়ে সেই জায়গা থেকে প্রস্থান নিল সে। শ্রাবণ তাচ্ছিল্য করে হেসে টাওয়াল ছুঁড়ে ফেলে দিল। কোনো কিছুর পরোয়া না করে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকল। উপলব্ধি করতে পারল ধারাকে নিজের অবস্থান বুঝিয়ে দেয়াতে তারও বেশ প্রশান্তি লাগছে। একটুও অনুতপ্ত না হয়ে বাঁকা হেসে ঘরে গিয়ে দরজা আটকে শুয়ে পড়ল শ্রাবণ শেখ। নিষ্ঠুর মন-মানসিকতা নিয়েই সে শান্তির ঘুমে আচ্ছন্ন হলো। কিন্তু ঘুমোতে পারল না ধারা। সারাটা রাত ওয়াশরুমের ঝর্নার নিচে বসে ভিজেছে, এবং আর্তনাদ করে কেঁদেছে। যতটা কাঁদলে চোখের পানি শুকিয়ে যেতে পারে ঠিক ততটাই কাঁদল। একটা সময় কাঁদতে কাঁদতে ওয়াশরুমের মেঝেতেই অজ্ঞান হয়ে পড়ল সে। ঝর্নার নিচে থাকায় সারারাত ধরে ভিজল মেয়েটা।
ভোরের আলোটা অদৃশ্য হতেই জানালার ফাঁক গলে হালকা রোদ এসে পড়ে মেঝের ওপর। বাতাসে ভেজা গন্ধ। শেষ রাতে বৃষ্টির স্মৃতি যেন এখনো চারপাশে লেগে আছে। বাইরে পাখিরা ডেকে উঠছে, দূরে কোথাও আজানের শেষ সুরটা মিলিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। একটা নতুন সকাল। শান্ত, স্বাভাবিক দিন। কিন্তু এই শান্তির ভেতরেই কোথাও একটা তীব্র অস্থিরতা লুকিয়ে আছে, যেটা এখনো কেউ টের পায়নি। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে গেছে, তবুও বাড়ির ভেতর সেই চিরচেনা সকালের কোলাহল নেই। শ্রাবণ ঘুম থেকে উঠেছে যথারীতি সময় মতোই। তার জীবনে নিয়মের কোনো ব্যত্যয় নেই। রাত যেমনই যাক, সকাল ঠিক সময়েই শুরু হয় তার। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। ভেজা চুলে হাত বুলিয়ে ঠিক করল, কালো শার্টটা গায়ে দিল নিখুঁতভাবে। বোতামগুলো এক এক করে লাগাতে লাগাতে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকালো একবার।
মুখে কোনো আবেগ নেই। গত রাত যেন তার জীবনে ঘটেইনি। টাইটা গলায় ঝুলিয়ে ধীরে ধীরে গিট বাঁধতে লাগলো। ঘড়িটা হাতে পরল, তারপর টেবিল থেকে পারফিউম নিয়ে হালকা স্প্রে করলো। সবকিছু ঠিকঠাক, যেমনটা প্রতিদিন হয়।
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে স্বাভাবিকভাবেই তার চোখ গেল ডাইনিং টেবিলের দিকে, এবং ঠিক সেখানেই থমকে গেলো সে। টেবিলটা ফাঁকা। কোনো প্লেট নেই, কোনো নাস্তা নেই, পানি পর্যন্ত রাখা নেই। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে রইলো শ্রাবণ। তারপর ধীরে ধীরে কপাল কুঁচকে উঠলো। কি আশ্চর্য! গত রাতে এত আহ্লাদ দেখিয়ে আজ নাস্তাই তৈরী করেনি ধারা? শ্রাবণ চোখ ঘুরিয়ে রান্নাঘরের দিকে তাকালো। নিস্তব্ধ, কোনো শব্দ নেই। এবার বিরক্তিটা স্পষ্ট হয়ে উঠলো তার মুখে।
—” আমার কয়েকটা কথাতেই সব ড্রামা খতম? আজ নাস্তাই তৈরী করেনি। ওয়াও! পারফেক্ট।”
গলার স্বরটা নিচু হলেও তাতে চাপা রাগ জমে আছে।
প্রথমে শ্রাবণ মনে করল জেদ ধরে না খেয়েই চলে যাবে। তার দেরি হচ্ছে তো। কিন্তু পরে ভেবে দেখলো যাওয়ার আগে ধারাকে উচিত শিক্ষা না দিয়ে সে যাবে না। এরকম দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ করার জন্য অনেক কথা শোনাবে এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে শ্রাবণ এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়ালো। দ্রুত পা চালিয়ে আবার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। প্রতিটা পা ফেলার সাথে সাথে তার রাগ যেন একটু একটু করে বাড়ছে। স্টোর রুমের সামনে এসে থামলো শ্রাবণ। দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ না, হালকা খোলা। ছিটকিনি লাগিয়ে ঘুমায়নি কেনো ইডিয়টটা? একটুও কড়া না নেড়ে ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়লো শ্রাবণ।
ঘরটা ফাঁকা। তোষকের ওপর চাদর এলোমেলো, কিন্তু ধারা নেই। শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে চারপাশে তাকালো।কোথায় গেল আবার? ঠিক তখনই তার কানে এলো,
একটানা পানির শব্দ। ওয়াশরুম থেকে। সে কিছুক্ষণ থেমে রইলো। ঝর্নার শব্দ এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু, এই সময় গোসল কেনো করবে? বিরক্তি মেশানো বিস্ময় ফুটে উঠলো তার চোখে। পানির শব্দটা অস্বাভাবিকভাবে জোরে লাগছে। একটানা, থামছেই না। শ্রাবণ ধীরে ধীরে পা বাড়ালো ওয়াশরুমের দরজার দিকে। মুখে বিরক্তি, কিন্তু কোথাও খুব গভীরে একটা অজানা অস্বস্তিও নিঃশব্দে মাথা তুলতে শুরু করেছে। সে নক করে ডাকল,
—” এই মেয়ে, বের হও ওয়াশরুম থেকে।”
আদেশটা দিলেও কোনো জবাব পেল না শ্রাবণ। আরো বিরক্ত হয়ে জোরগলায় বলল,
—” হাউ ডেয়ার ইউ! তুমি ইচ্ছে করে এমন করছো তাইনা? যেন আমি না খেয়ে অফিসে যাই এটাই চাইছিলে। আমি জানতাম তোমার মত গেঁয়ো একটা ইউজলেস মেয়েকে একদিন কথা শোনালেই সব ড্রামা বেরিয়ে যাবে, ঢঙ, আহ্লাদ সব ফুরিয়ে যাবে। আই ওয়াজ রাইট। তুমি একটা সুবিধাবাদী স্বার্থপর! ”
ঘৃনার সাথে কথাগুলো বলেই ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার কঠোর সিদ্ধান্ত নিল শ্রাবণ। কিন্তু কিছু একটা ভেবে আবারো থেমে গেল। তার মস্তিষ্ক কেনো যেন ভালো কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে না। কথাগুলো বলে নিজেও শান্তি পেল না। অজান্তেই দুশ্চিন্তা ভর করল মাথায়। সে আবারো ওয়াশরুমের দরজার কাছে এসে আরেকটু কাছে গিয়ে কান লাগিয়ে জোরে ডাকল,
—’ এই মেয়ে। শুনতে পাচ্ছো?”
শ্রাবণ আর এক সেকেন্ডও দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই। শুধু সেই একটানা ঝর্নার শব্দ। অস্বস্তিটা এবার বুকের ভেতর কেমন যেন আঁকড়ে ধরলো তাকে। আবারো ডাকলো সে। কিন্তু তবুও কোনো সাড়া নেই। হঠাৎ করেই ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেল। দুবারের পর তৃতীয়বার জোরে লাথি মারতেই দরজাটা কেঁপে উঠে ভেঙে ভেতরে খুলে গেল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, ভেতরে দৃষ্টি দিতেই শ্রাবণের চোখ থেমে গেল। শরীর জমে গেল পুরোটা।
ঝর্নার নিচে মেঝেতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে ধারা। নড়াচড়া নেই। চোখ বন্ধ। চুলগুলো ভিজে কপালে লেপ্টে আছে। সারা শরীর ভিজে একেবারে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে মেঝেতে। মুখটা অস্বাভাবিক লাল, আর হাত-পা দেখে অস্বাভাবিক ঠান্ডা, প্রায় বরফের মতো লাগছে ।পানির ধারাটা একটানা তার ওপর পড়েই চলেছে, যেন রাতভর কোনো দয়া হয়নি তার ওপর। কয়েক সেকেন্ড, শ্রাবণ একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার মস্তিষ্ক যেন কাজ করতেই ভুলে গেছে। এটা কী দেখছে সে? গত রাতের সেই তাচ্ছিল্য, সেই কঠোর কথা- সবকিছু একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়লো মাথার ভেতর। তবে আঁচ করতে পারল না ঠিক কী হয়েছে এখানে। কিন্তু এই দৃশ্য! এর জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। একদমই না।
হঠাৎ করেই বাস্তবে ফিরল শ্রাবণ। দ্রুত ভেতরে এসে ঝর্না বন্ধ করে দিল। হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো ধারার পাশে। স্পর্শ করতে দ্বিধা করলেও হাতটা ধরে নিজেই ভয় পেল। বরফ হয়ে রয়েছে পুরো শরীর। শ্রাবণ কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। একটু ঝাঁকিয়ে ডাকল তাকে,
—” এই মেয়ে! চোখ খুলো!”
কোনো সাড়া নেই। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। শ্রাবণের বুক ধড়ফড় করে উঠলো। কাঁপা হাতে তার গাল ছুঁলো, বরফ ঠান্ডা। সেই স্পর্শেই যেন পুরো শরীর দিয়ে বিদ্যুৎ খেলে গেল তার।
—” ড্যামিট!”
তাড়াহুড়ো করে সে ধারাকে এক হাতে উঠিয়ে নিজের কোলের উপর আনল। তারপর এক মুহূর্তও দেরি না করে ধারা কে তুলে নিল কোলে। ভেজা শরীর, নিস্তেজ, একদম হালকা লাগছে,যেন কোনো প্রাণই নেই ভেতরে। শ্রাবণের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠলো। ভাবল, এই অবস্থায় ঠিক কতক্ষণ ছিল? নিজেকেই প্রশ্ন করলো সে। কিন্তু উত্তর নেই। শুধু ভয়, এক অজানা, তীব্র ভয় বুকের ভেতর চেপে বসেছে। দ্রুত পা চালিয়ে নামমাত্র বিছানাটিতে সে শুইয়ে দিল ধারা কে। তারপর কাঁপা হাতে চুলগুলো সরিয়ে দিল মুখ থেকে। ডাকল আবারো,
—” এই মেয়ে, শুনতে পাচ্ছো?”
কণ্ঠে আর আগের সেই রাগ নেই। শুধু আতঙ্ক, শুধু দুশ্চিন্তা। এই প্রথম, শ্রাবণ শেখ বুঝতে পারলো,
কাউকে অবহেলা করা আর কাউকে হারিয়ে ফেলার ভয়- এই দুইটার মধ্যে পার্থক্যটা কতটা ভয়ংকর হতে পারে। কিন্তু সেই বুঝ টা শ্রাবণের আত্মিক হলো। তার মস্তিষ্ক মানতে নারাজ।
রীতিমতো বিরক্ত হয়ে শ্রাবণ নিজের হাতের ঘড়ির দিকে তাকাল। অফিসে দেরি হয়ে যাচ্ছে। এই ঝামেলা এখনই হতে হলো? সে তো আর এতটা অমানবিক না যে মেয়েটাকে এভাবে ফেলে চলে যাবে। তবে শ্রাবণ ভাবতে থাকল আসলে কী ঘটতে পারে। দ্রুত পকেট থেকে ফোন বের করে এম্বুলেন্সের জন্য কল করল সে। কানে ফোন গুঁজে আবারো তাকাল ধারার মুখের দিকে। খুব মনোযোগ দিয়ে এবার লক্ষ্য করল।
শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩
ছোট্ট মুখটা রীতিমতো লাল হয়ে ঠান্ডায় জমে গিয়ে খুব কাতর দেখাচ্ছে। চোখের পাতা জমে গেছে, ঠোঁট টকটকা লাল হয়ে ঠান্ডায় ফেটে রক্তে রাঙা হয়ে গেছে। গাল দুটো প্রায় কালচে হয়েছে। বিধ্বস্ত চেহারা টা দেখে এক মুহুর্তের জন্য ভীষণ মায়া হলো শ্রাবনের। কিন্তু মায়া টা মানুষের প্রতি, যদি নিজের স্ত্রী মনে করে মায়া টা করতো, তাহলে এতটা শান্ত থেকে সে বসে থাকতে পারতো না৷ বসে বসে অফিস কখন যাবে সেই চিন্তা করতে পারতো না। ভীষণ নিষ্ঠুর মনের শ্রাবণ বুঝতেও পারল না সে কত বর্বরতা করছে। আর এসবের ফল যে সে নিজেও ভোগ করবে বাজেভাবে তা তো কখনো মাথাতেই আনতে পারছে না সে।
