Home শ্রাবণ ধারা শ্রাবণ ধারা পর্ব ৭

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৭

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৭
অনামিকা তাহসিন রোজা

শেখ বাড়িতে পা রাখার সাথে সাথে হতবাক হয়ে গেল ধারা। সালমা বেগমের মুখশ্রী দেখে মনে হচ্ছে কেও জোরপূর্বক তাকে আটকে রেখেছিল। ধারাকে দেখার সাথে সাথে ভদ্রমহিলা অস্থির হয়ে ধারাকে কাছে টেনে নিলেন,
—” তুই ঠিক আছিস তো মা? অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলি?”
ধারা একবার চোখ তুলে তাকাল নির্বিকার ভঙ্গিতে ঘরের দিকে যেতে থাকা শ্রাবণের দিকে। এরপর হেসে বলল,
—” ঠিক আছি মা। আপনি কখন এসেছেন?”
সালমা বেগম একটুখানি অস্বস্তিতে পড়লেন। তিনি আজ আসতেই চান নি। সামিউল শেখের কথা শুনে তিনি শ্রাবণ ও ধারাকে একাকী সময় দিতে চেয়েছিলেন। ভেবেছিলেন এতে যদি সম্পর্কের একটু উন্নতি হয়। কিন্তু দুপুরে শ্রাবণ কল করে বলেছে, এই বোঝা নিতে পারছিনা। দ্রুত বাড়িতে ফিরে এসো।
তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফিরে এসেছেন সালমা বেগম।

—” আমি বিকেলে এসেছি!”
ধারা আর কিছু না বলে মিষ্টি হেসে ঘরে চলে গেল। সালমা বেগম বিরক্ত হলেন শ্রাবণের কার্যক্রমে। এত নাটক আর সহ্য করতে পারছেন না তিনি। সবকিছুর একটা সীমা থাকে। কিন্তু শ্রাবণ রীতিমতো সবকিছুর সীমা পেরিয়ে যাচ্ছে। সালমা বেগম ধপধপ করে রেগে শ্রাবণের ঘরে গিয়ে থামলেন। শ্রাবণ মাত্র গায়ের শার্টটা খুলে ছুঁড়েছে। গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি আবৃত। সালমা বেগম প্রথমে জোরগলায় বললেন,
—” তুই আমাকে কল করে কী বলেছিলি শ্রাবণ? ধারা পাগল হয়ে গেছে, অকাজ করছে -এসব কী? কী করেছে ও? অসুস্থ হতেই তো পারে।”
শ্রাবণ কিছু বলল না। একবার শীতল দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় বসে এসি ছেড়ে দিল। সালমা বেগম বিরক্ত হয়ে শ্রাবণের পাশে এসে বসলেন। রাগান্বিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

—” তোর সমস্যা টা কী?”
—” কী সমস্যা বুঝতে পারছো না?”
সালমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঠান্ডা মাথায় বললেন,
—” আচ্ছা শ্রাবণ, বাপ আমার, পরিষ্কার করে বল তো, তোর কি কোনো পছন্দের মেয়ে ছিল হ্যাঁ? কেও আছে?”
হাজারো বিরক্তির মাঝেও শ্রাবণ ফিক করে হাসলো। ভ্রু কুঁচকে বলল,
—” এটা এখন জিজ্ঞেস করছো কেনো? আমি দুই বাচ্চার বাপ হয়ে যাই, তারপর জিজ্ঞেস করতে। এত তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করার কী দরকার ছিল?”
সালমা বেগমের বুক কেঁপে উঠলো। এক মুহুর্তের জন্য তিনি উপলব্ধি করতে পারলেন এমন কিছু হলে কতটা ভয়াবহ অবস্থা হবে। নিজের ছেলে পরকীয়া করছে, বা করবে এমনটা জেনেও চুপ থেকে মেনে নিয়ে একটা নিষ্পাপ মেয়ের জীবন নষ্ট করার মত শ্বাশুড়ি তিনি নন। ধারার জায়গায় তার নিজের সন্তান থাকলে তিনি যেমনটা ভাবতেন, ঠিক তেমনটাই ভাবলেন। মনে মনে আল্লাহর কাছে হাজারো দোয়া করে তিনি শক্ত করে শ্রাবণের বাহু চেপে ধরে বললেন,
—” তুই কী বলছিস এসব? সত্যি কেও আছে? এটা বলিস না যে আমার ছেলে পরকীয়া করছে।”
—” এখনো অত খারাপ দিন আসেনি আমার। এরকম কিছু হলে যেই বেয়াদব টাকে এনে বাড়িতে রেখেছো, ওটাকে অনেক দিন আগেই ডিভোর্স দিতাম। ওহ সরি, ডিভোর্সের প্রশ্নই আসেনা। তোমরা তো বিয়েটাই দিতে পারতে না।”
এক মুহুর্তের জন্য স্বস্তির শ্বাস ফেললেন সালমা বেগম। একটু এগিয়ে এসে ছেলের বাহুতে হাত বুলিয়ে বললেন,

—” তাহলে সমস্যা কী?”
—” সমস্যা হলো, ওকে আমার পছন্দ নয়।”
—” কেনো?”
—” জানি না। শুধু পছন্দ নয়।”
—” কেন রে বাপ? ওর মধ্যে কী কমতি আছে আমায় বল তো। ও কী করেছে? একটাবার তো সুযোগই দিস নি। তোকে খুব ভালো রাখবে ও দেখে নিস। দিনশেষে ও ছাড়া কেও তোকে বুঝবে না।”
—” কেনো? ওর মধ্যে স্পেশাল কী আছে?”
—” অবশ্যই কিছু একটা আছে। সেই স্পেশালিটি টা তো খুঁজে নিতে হবে।”
শ্রাবণ কিছু না বলে চিত হয়ে শুয়ে পড়ল। সালমা বেগমের কোনো কথা গুরুত্ব দিচ্ছে না তা বুঝলেন ভদ্রমহিলা। তবুও থামলেন না। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বললেন,
—” ছোট থেকে অনেক জেদি ছিলি তুই। কোনো একটা জিনিস একবারে তোকে বোঝাতে পারতাম না। কিন্তু ভালবেসে আদর করে বোঝালে ঠিকই বুঝতি। তোর বাপকেও অত ভয় পেতিনা, যতটা আমার কষ্ট পাওয়াকে ভয় পেতি। আমি যেন মন খারাপ না করি, আমি যেন চোখের পানি না ফেলি, এই ভেবে তুই আমার বাধ্য ছিলি। এমনকি অনেকটা বড় হওয়ার পরও এমন ছিলি তুই। অনেক আদর করতাম তোকে। আমার প্রতি তোর এই বাধ্যতা, ভালোবাসা দেখে আমি মনে করেছিলাম, হ্যাঁ, আমি অন্তত আমার ছেলেকে নারীকে সম্মান করতে শিখিয়েছি। কিন্তু তুই যে এতটা বিগড়ে যাবি তা আমি কল্পনাতেও আনিনি।”
শ্রাবণ থেমে থাকা সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আবারো নীরবে হাসলো। বুক ভরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সালমা বেগম আবারো বললেন,

—” বিবাহ কোনো ছেলে খেলা নয়। একটা অদৃশ্য টান, পবিত্র আকর্ষণ, যা আল্লাহ প্রদত্ত। তোর বাবাকে কখনো দেখেছিস আমায় অসম্মান করতে? আমি ভেবেছিলাম তুই তোর বাপের মতই হবি। ধারা তোর স্ত্রী শ্রাবণ। জোর করে হোক, আর যেভাবেই হোক না কেন। বিয়ে হয়েছে। আর ও তোর সহধর্মিণী। একটুও কি মায়া আসেনা ওর প্রতি? কখনো মনে হয়না ও তো তোরই ভরসায় আছে এ বাড়িতে! ও তো তোরই দায়িত্ব। কখনো কি একটুও টান আসেনি? কবুল শব্দটা তো এত দুর্বল হওয়ার কথা নয়।”
শ্রাবণ বিড়বিড় করে বলল,
—” মন থেকে কবুল না বললে কবুল শব্দের টান কাজ করবে কীভাবে?”
সালমা বেগম এবারে শ্রাবণের দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
—” আমার কষ্টকে, চোখের পানিকে যতটা ভয় পাস, তার অর্ধেকও যদি ধারার চোখের পানিকে গুরুত্ব দিতি, তাহলে উপলব্ধি করতে পারতি।”
শ্রাবণ চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলো। যেন কথাগুলো তার কানে ঢুকছেই না। কিন্তু তার বুকের ভেতরে কোথাও খুব সূক্ষ্ম একটা চাপা অস্বস্তি জন্ম নিচ্ছে, যেটা সে নিজেই উপেক্ষা করতে চাইছে। সালমা বেগম কিছুক্ষণ চুপ করে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে, অনেকটা শান্ত স্বরে আবার শুরু করলেন,

—” তুই না চাইলে হয়তো এই বিয়েটা হতো না, ঠিক। কিন্তু হয়ে গেছে এখন। জীবনটা গল্পের মতো না, যেখানে পছন্দ না হলে চরিত্র বদলে ফেলা যায়। এখানে মানুষ থাকে, আর মানুষের অনুভূতি থাকে।”
শ্রাবণ বিরক্ত হয়ে চোখ খুলল,
—” আবার শুরু করো না মা। প্লিজ।”
—” শুরু না, শেষ করতে চাইছি,” খুব শান্ত গলায় বললেন তিনি।
—” তুই কি জানিস, মেয়েটা কী খায়, কী খায় না? কখন ঘুমায়? কীসে ভয় পায়? আর কেনোই বা..
শ্রাবণ থামিয়ে দিল সালমা বেগম কে,
—” ওসব জেনে আমি কী করব মা?”
ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠলো। সালমা বেগম ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। বিরক্তিতে বিড়বিড় করে বললেন,
– যা খুশি তাই কর বেয়াদব ছেলে। ভবিষ্যতে আফসোস করবি বলে রাখলাম।
চলে যেতে উদ্যত হলেন সালমা বেগম, কয়েক পা হেঁটে আবার ফিরে তাকালেন ছেলের দিকে। বললেন,
—” মানুষ যখন থাকে, তখন তার মূল্য বোঝা যায় না।
চলে গেলে… তখন শুধু শূন্যতা থাকে।”
শ্রাবণ আবারো শোয়া থেকে উঠে বসল। ঘর থেকে নিজেই বের হওয়ার জন্য টি শার্ট পড়ে নিল। সালমা বেগম ছেলের মুখ দেখে বুঝলেন এই ছেলেকে এখন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেলেও কেও কথা শোনাতে পারবে না। তাই তিনি কাজের কথা মনে পড়তেই ডাকলেন,

—” এই ছেলে, কোথায় যাস?”
শ্রাবণ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
—”শ্মশানঘাট।”
সালমা বেগম বিরক্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন,
—” শশ্মানঘাট যা, আর কালীঘাট যা, আমার সমস্যা নেই। রাত দশটার আগে ফিরে আসবি।”
স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে জবাব এলো শ্রাবণের থেকে,
—” পারব না।”
সালমা বেগম গাট্টা মারলেন ছেলের মাথায়। বললেন,
—” তাহলে নীলকে কে আনতে যাবে? ও তো বেচারা এগারোটার আগেই গাবতলী বাস স্টেশনে পৌঁছে যাবে। কতবার করে বললাম বিকেলের বাসে আসিস না, ফিরতে রাত হবে। কিন্তু সকালের টিকেটই পায়নি। বিকেলের বাসে উঠেছে, এখন রাত এগারোটা, বারোটা বাজবে। ওকে রিসিভ করতে হবে তো।”
মানিব্যাগ আর ফোন পকেটে ঢোকাতে থাকা শ্রাবণের হাত দুটো থামলো কিছুক্ষণের জন্য। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
—” নীল আসছে এখানে?”
—” হ্যাঁ।”
—” কোন দুঃখে?”
—” বেয়াদব ছেলে, ভদ্রভাবে কথা বল, তোর ছোট ভাই না?”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে বলল,
—” নিজের ভাই তো না।”
সালমা বেগম ইমোশনাল হয়ে গেলেন। ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন,

— ” হ্যাঁ হ্যাঁ তোরা পুরো বংশ তো স্বার্থপর। আমার বোনটা তুই ছোট থাকতে এ বাড়িতে এসে থাকতো, তোকে দেখাশোনা করতো। তোকে ও-ই ছোট থেকে মানুষ করেছে। আর আজ তোর সেই ছোটমনির একমাত্র ছেলে তোর পর হয়ে গেল? নিজের ভাই বলতেও মুখ আটকায়? স্বার্থপর অকৃতজ্ঞের জাত!”
শ্রাবণ মোটেই অস্বীকার করেনা যে তার ছোট খালামনি আয়েশা খাতুন তার জন্য কত কি করেছে। শ্রাবণের জন্মের পরপরই সালমা বেগম ভীষণ অসুস্থ হয়ে যায়। সেই সময় অবিবাহিত ছিলেন আয়েশা খাতুন, বড় বোনের সেবা ও সদ্যজাত শিশুর দেখাশোনা করতে তিনি শেখ বাড়িতে প্রায় তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে ছিলেন। এর মাঝেই বিয়েও করেন তিনি। কিন্তু দায়িত্ব থেকে সরে যান না। শ্রাবণের হাঁটতে শেখা পর্যন্ত তিনি বহুত কষ্ট করেছেন। শ্রাবণ অস্বীকার করবেনা আয়েশা খাতুন রীতিমতো তার আরেক মা।
কিন্তু কোনো এক কারনে এই এত বছর পর এই সময় এসে আয়েশা খাতুনের ছেলেকে সে দুচোখে সহ্য করতে পারেনা। শ্রাবণের চেয়ে গুনে গুনে ঠিক চার বছর দুই মাসের ছোট নীল। অথচ ছেলের এমন ভাব যেন শ্রাবণের সমবয়সী। সে বর্তমানে একটা বিজনেস দাঁড় করানোর চেষ্টায় আছে, যা দেখে শ্রাবণের বিরক্ত লাগে। কেননা, নীল চ্যালেঞ্জ করেছে সে শেখ ইন্ডাস্ট্রির থেকেও বড় কিছু করে দেখাবে। নিজের ভালোবাসার খালামনি যে একটা ভুল বংশে বিবাহ করেছে তা নীলকে দেখলে বোঝে শ্রাবণ।
শ্রাবণ জিজ্ঞেস করল বিরক্ত হয়ে,

—” ও কেনো এখানে আসছে? খেয়েদেয়ে কাজ নেই? চাকরি-বাকরি খুঁজবে? ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছে নাকি?”
—” না না। ঢাকায় নাকি কোনো এক ব্যবসায়িক কাজেই আসছে। আবার ঘোরাঘুরিও করবে। সবসময় কি এক জায়গায় থাকতে ভালো লাগে? কতবার বলেছি ছেলেটাকে ঢাকাতে সেটেলড হয়ে যা। কথাই শোনে না। এখন আসছে নিজে থেকে। ঘোরাও হবে, কাজও হবে, এই ভেবেই আসছে শুনলাম। কয়েকদিন নাকি থেকে যাবে। খবরটা শুনে আমিই ওকে বাড়িতে আসতে বলেছি। তোর বিয়েতেও তো আসতে পারেনি তাই। একটু ভালোমন্দ খাইয়ে পাঠাই। ”
শ্রাবণ এবারে নাক মুখ কুঁচকে তাকালো। বলল,
—” তারমানে তুমি নিজেই খাল কেটে কুমির ডেকেছো?”
সালমা বেগম মেকি হাসলেন। বললেন,
—” অত কিছু জানি না। তুই ওকে রিসিভ করে আনবি। কল দেবে তোকে৷ আর আসার সময় দু প্যাকেট লবণ, চা পাতা আর চিনিগুড়া চাল আনবি মনে করে। এবার যেখানে খুশি যা।”
শ্রাবণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সালমা বেগমও পিছু পিছু আসতে থাকলেন। সিঁড়ি দিয়ে ধুপধাপ করে নামার সাথে সাথে শ্রাবণের টনক নড়ল। সে স্তব্ধ হয়ে রইলো কিছুক্ষণের জন্য। সালমা বেগম পেছন পেছন এসেছিলেন, সিঁড়িতে শ্রাবণকে থম মেরে দাঁড়াতে দেখে তিনি বললেন,

—” আবার কী হলো?”
শ্রাবণ ধীরে ঘুরে তাকালো সালমা বেগমের দিকে। কিছু একটা ভেবে বলল,
—” আমি যে বিয়ে করেছি এটা কি তোমার বাবুসোনা মানে, নীল জানে?”
—” হ্যাঁ অবশ্যই। ওদিকের সবাই জানে। হুট করে সব করেছি বলে কাওকে তো দাওয়াতই দিইনি। কিন্তু সবাইকে জানিয়েছি।”
শ্রাবণ আশ্বস্ত হলো না। আবারো ভেবে বলল
—” ওরা কি ওই মেয়েকে দেখেছে?”
সালমা বেগম দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,
—” সুযোগ কই? কেও তো আসতেই পারল না ওদিক থেকে। ঢাকার ভেতরে যারা আছে তাদেরও তো আসতে বলিনি। যে পরিস্থিতি করে রেখেছিস, মানুষকে কি দেখানো যায়?”
শ্রাবণ একবার উপরে স্টোর রুমের দিকে দৃষ্টি রেখে বলল,
—” তারমানে আমি বিয়ে করেছি এটা ওরা জানে, বাট কাকে করেছি সেটা জানে না, কখনো দেখেওনি তাই তো?”
সালমা বেগম অবুঝ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। শ্রাবণের মাথায় কী চলছে বোঝার আগেই শ্রাবণ স্বস্থির শ্বাস ফেলে সালমা বেগমের দুহাত ধরে খু্ব বিনয়ী সুরে বলল,

—” মা শোনো, তোমার ইমোশনাল ব্লাকমেইলে বিয়ে করেছি। সব কথার বাধ্য হয়েছি। এবারে একটা জিনিস আমি চাইবো, তুমি না করতে পারবে না। কোনোভাবেই না।”
সালমা বেগম কোনোভাবে পিটপিট করে তাকিয়ে রাজি হলেন। শ্রাবণ সময় নিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল,
—” ওই মেয়েকে যে আমি বিয়ে করেছি এটা যেন নীল জানতে না পারে। তুমি ওই মেয়েকে নিজের কোনো বান্ধবীর মেয়ে বা যা খুশি তাই হিসেবে পরিচয় দেবে। আমি ওকে নীলের সামনে নিজের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিতে পারবনা।”
সালমা বেগমের মাথায় বাজ ভেঙে পড়ল। এক ঝটকায় শ্রাবণের হাত তিনি সরিয়ে দিলেন। ভ্রু কুঁচকে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকালেন। শ্রাবণ নিজে থেকে আবারো হতাশ মুখে বলল,
—” মা প্লিজ। এটুকু অনুরোধ রাখো।”
সালমা বেগম অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
—” পাগল হয়ে গেছিস? কেনো এটা করব?”
—” এমনিতেই। কিন্তু প্লিজ, আমি পারবনা। হয় এটা মানো, অথবা ওই মেয়েকে বাড়ি থেকে উধাও করো। নইলে আমি নীলকে কোনো ভালো হোটেলে উঠিয়ে দিয়ে আসব। বাড়িতে আনব না।”
সালমা বেগম কিছুক্ষণ কোনো কথা বললেন না। শুধু তাকিয়ে রইলেন ছেলের মুখের দিকে। সেই মুখ, যেটা তিনি ছোটবেলায় আদর করে নিজের আঁচলে ঢেকে রাখতেন, আজ সেই মুখেই এমন কথা! চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠল তার।

—”কারণটা বল।”
শ্রাবণ চোখ সরিয়ে নিল। চোয়াল শক্ত করে ফেলল।
—”বললাম তো, এমনি। আমি চাই না।”
সালমা বেগম হালকা হেসে উঠলেন, কিন্তু সেই হাসিতে কষ্টের ছাপ স্পষ্ট,
—” এমনি মানে? তুই ছোট না রে শ্রাবণ। ‘এমনি’ বলে দায় এড়ানোর বয়স তোর পার হয়ে গেছে।”
শ্রাবণ বিরক্ত হয়ে সিঁড়ির রেলিংয়ে হাত ঠুকল। বলল,
—”মা, তুমি বুঝতে চাইছো না। আমি পারব না মানে পারব না। ওকে আমার স্ত্রী হিসেবে কারও সামনে, বিশেষ করে নীলের সামনে ইনট্রোডিউস করা আমার পক্ষে সম্ভব না।”
—”কেন?”
ভীষণ গভীরভাবে করলেন সালমা বেগম।
শ্রাবণ এবার চুপ রইলো। কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধা ফুটে উঠল, তারপর সেটা আবার কঠোরতায় ঢেকে গেল।

—”ও…ও আমার সাথে যায় না।”
—”মানে?”
সালমা বেগম এক পা এগিয়ে এলেন। চোখে অবিশ্বাস্য দৃষ্টি।
—”আমি যেখানে, যেভাবে মুভ করি… ও সেখানে ফিট করে না। নীল ওকে দেখলে কী ভাববে? হাসবে না? আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করবে না?”
শেষ কথাটা বলেই একটু থেমে গেল শ্রাবণ। সে এসব বলতে চায়নি, কিন্তু নিজের মনে রাখতেও পারছেনা।
সালমা বেগম স্থির হয়ে গেলেন। কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর তিনি বললেন,
—” মানে কী শ্রাবণ? বুঝিনি আমি!”
শ্রাবণ এবারে সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট সুরে বলল,
—” মা শোনো, এমনিতেই নীল ছোট থেকে নিজেকে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে। সবসময় ও আমার থেকে কয়েক ধাপ উপরে ওঠার চেষ্টায় থাকে এটা তুমি নিজেও জানো। যেখানে আমি ছোট থেকেই সবকিছু নিয়ে এত কনসার্ন ছিলাম, সেখানে বিয়ের মত এত বড় একটা জিনিসে আমি কত বড় আহাম্মকের মত কাজ করেছি, কত দূর্ভাগা কপাল করে একটা গেঁয়ো বলদকে তুলে এনেছি এটা দেখে কি নীল বসে বসে মুড়ি খাবে? তুমি তাই মনে করো? আমি পারবনা ওর সামনে ছোট হতে। ওই মেয়েকে আমার পাশে দেখে ও এনজয় করবে, হাসবে, মজা ওড়াবে। আমি এটা নিতে পারবনা মা।”
সালমা বেগম এমনভাবে আঁতকে উঠলেন যেন কথাগুলো তারই বুকে লেগেছে। তিনি দ্রুত এগিয়ে এসে শ্রাবণের মুখ চেপে ধরলেন।
-” চুপ কর শ্রাবণ। চুপ।” এরপর আশেপাশে তাকিয়ে সতর্ক হয়ে নিলেন ধারা শুনেছে কিনা।
সালমা বেগম চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ কুঁচকে অসহায় মুখে জিজ্ঞেস করলেন,
—” তুই ধারাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জা পাস? নিজেকে ছোট মনে হয়?”
শ্রাবণ কিছু বলল না। কিন্তু তার চুপ থাকাটাই উত্তর হয়ে গেল। সালমা বেগমের চোখ ভিজে উঠল, কিন্তু কণ্ঠ শক্ত রইল,

—” তুই নিজের স্ত্রীর পরিচয় দিতে লজ্জা পাচ্ছিস? একটা মেয়েকে, যে তোর ঘরে এসেছে, তোর নামে পরিচিত, তাকে তুই লুকিয়ে রাখতে চাইছিস?”
শ্রাবণ এবার বিরক্ত হয়ে বলল,
—”ড্রামা করো না মা! এটা এত বড় কিছু না। জাস্ট কিছুদিনের ব্যাপার। নীল চলে গেলে সব নরমাল..
—”নরমাল?”
কথাটা কেটে দিলেন তিনি।
—”এটা তোর কাছে নরমাল? একটা মেয়েকে নিজের পরিচয় থেকে বঞ্চিত করা? ওর সম্মানটুকুও না দেওয়া?”
শ্রাবণ এবার মুখ শক্ত করে তাকাল,
—” সম্মান আমি দিচ্ছি। ও এই বাড়িতে আছে, সেটাই অনেক।”
এই কথাটা যেন সোজা গিয়ে আঘাত করল সালমা বেগমের বুকের ভেতরে। তিনি ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।
—”না.. তুই কিছুই দিসনি। না সম্মান, না অধিকার, না একটা মানুষের মতো আচরণ।”
শ্রাবণ চোখ ঘুরিয়ে বিরক্তি লুকাতে চাইল,

—”মা, প্লিজ। আমার মাথা ধরিয়ে দিও না। আমি শুধু এটুকুই চাইছি…
—”তুই কী চাইছিস? ওকে আমি বাড়ির কাজের মেয়ে হিসেবে পরিচয় দিই? এটা চাইছিস?”
রীতিমতো ধমকে উঠলেন সালমা বেগম। আবার থামালেন তিনি।
—”শুধু নিজেরটাই? এত স্বার্থপর তুই? শুধু নিজেরটাই ভাবছিস? একবারও অন্যকে নিয়ে ভেবেছিস?”
শ্রাবণ এবারো চুপ রইলো। কথা নেই। সালমা বেগম এগিয়ে এসে খুব কাছে দাঁড়ালেন। কণ্ঠ নরম, কিন্তু প্রতিটা শব্দ ভারী,
—” জানিস পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়ংকর অপমান কী? আপন মানুষের কাছে পর বলে সম্বোধিত হওয়া।”
শ্রাবণ অন্যদিকে ফিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিছুক্ষণ নীরবতা বিরাজ করল। সালমা বেগমের মাথা ব্যাথা শুরু হয়েছে। তিনি ভাবতেও পারছেন না নিজের সোনার টুকরোর মত ছেলেটাকে তিনি কীভাবে এমন বিপথে যেতে দিলেন? কোনো কিছুতে তো কমতি ছিল না তার মা হিসেবে? কী এমন হয়ে গেল? শাসন তো কম করেন নি তিনি। তবে আজ তার ছেলে এত নিচু মন-মানসিকতার হলো কীভাবে?
সালমা বেগম মনে মনে একটা দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলেন। হার মানলেন তিনি। মনে মনে সমস্ত চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,

—” ঠিক আছে। তা-ই হোক তবে। তাহলে ধারাকে কী বলে পরিচয় দেব? আমার বান্ধবীর মেয়ে? নাকি তোর দাদু বাড়ির কারো পরিচয় দেব?”
শ্রাবণ কিছু বলল না। এমনিতেই যা বলেছে অনেক কষ্টে বলেছে সে। একজন মানুষ হিসেবে এতটা নিচ হওয়া অনুচিত সে জানে, কিন্তু.. এই কিন্তু টাই আটকে দিচ্ছে তাকে। সালমা বেগম নিজে থেকেই বললেন,
—” ঠিক আছে। আমি ধারাকে বলে দেব। ও আমার বান্ধবীর মেয়ের পরিচয়ে থাকবে। তুই এবার যা তো। যা, নীলকে নিয়ে আয়। কারো সামনে তোর সম্মান যাবে না আমি কথা দিচ্ছি। তাও আর একটাও কথা বলিস না তুই শ্রাবণ। আর একটাও কথা বলিস না। আমিই ম’রে যাব তোর কথা শুনে। যা এবার, শান্তি? যা নিয়ে আয় নীলকে।”
শ্রাবণ এবারে আস্তে-ধীরে দরজার দিকে যেতে শুরু করল। পরমুহূর্তেই আবারো সালমা বেগম ডেকে উঠলেন, তাকে থামিয়ে মলিন চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
—” নীল যখন জানতে চাইবে তোর বউ কোথায়, কী বলব? ও তো অবশ্যই তোর বউকে দেখতে চাইবে।”
শ্রাবণ কিছুক্ষণ ভেবে ধীর গলায় বলল,
—” বলব বাপের বাড়িতে ঘুরতে গিয়েছে।”

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৬

সালমা বেগম তাচ্ছিল্যে হাসলেন। বিষাদ ভরা মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, —” আচ্ছা। যা এবার।” শ্রাবণ বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। সালমা বেগম হতাশ হলেন নিজের জীবন নিয়ে। সন্তান মানুষ না হলে মায়েদের কোনো সফলতা নেই। সালমা বেগম নিজেকে এক ব্যর্থ মা মনে করলেন। তিনি কীভাবে ধারাকে গিয়ে এত অসহ্যকর একটা কথা বলবেন তা ভাবতে থাকলেন। একটা মেয়েকে আর কতবার অপমানিত করবেন তিনি? মানুষের ঋণ শোধ করার চেষ্টা প্রত্যেক মানুষেরই থাকা উচিত। নীলের মা আয়েশা খাতুনের প্রতি কৃতজ্ঞতা সারাজীবনই থাকবে, সালমা বেগম যা-ই করুক না কেনো, ছোট বোনের করা এই আত্মত্যাগ তিনি কোনো কিছুর বিনিময়েই শোধ করতে পারবেন না। কিন্তু যথাসম্ভব চেষ্টা তো করতে হবে। তাই তিনি আয়েশা খাতুনের একমাত্র সন্তান নীলকেও নিজের সন্তানের মত করে ভালবাসেন।

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here