শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৯
আফীফা আফনান
সূর্যটা আজ যেন একটু বেশিই তেজ নিয়ে ধরনীতে উদয় হয়েছে। আকাশে একচিলতে মেঘেরও আনাগোনা নেই, একদম ঝকঝকে রোদেলা একটা দিন।
ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের আজ শেষ দিকের একটা দিন, আর তাই ক্যাম্প প্রাঙ্গণে মানুষের ভিড় যেন উপচে পড়ছে! দূর-দূরান্ত থেকে আসা নানা বয়সের মানুষের গিজগিজ শব্দে চারিদিক মুখরিত। হাজারো রোগীর চাপে পুরো টিমটার এখন যেন নিঃশ্বাস ফেলারও বিন্দুমাত্র ফুরসত নেই!
মেহুল তার ছোট্ট বুথটির ভেতর কাঠের টেবিলটাতে বসে একের পর এক রোগী দেখে চলেছে। ডাক্তার হিসেবে তার একাগ্রতা, মিষ্টি ব্যবহার আর সহানুভূতির জন্য রোগীরাও ইতিমধ্যে তাকে এক নামে আপন করে নিয়েছে।
এদিকে বুথে মেহুলের ঠিক পাশেই বসে আছে তার সহযোগী মারিয়াম। সে অত্যন্ত দক্ষ হাতে রোগীদের ব্লাড প্রেসার মেপে দিচ্ছে এবং পরম যত্নে বুঝিয়ে দিচ্ছে ডাক্তারের লেখা ওষুধগুলো কোথায় কোন কাউন্টার থেকে সংগ্রহ করতে হবে। চারপাশের এমন ভীষণ ব্যস্ততার মাঝেও দুজনের মুখে বিরক্তির কোনো ছোঁয়া নেই, বরং নিজেদের দায়িত্ব পালনের এক প্রফুল্ল আনন্দ জড়িয়ে আছে।
ঠিক তেমনই এক ব্যস্ততম মুহূর্তে, বুথের সামনের হালকা সুতি পর্দাটা আলতো হাতে ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল এক দীর্ঘদেহী অবয়ব!
সালমান শাহ নেওয়াজ!
তার উপস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে যেন ছোট্ট বুথটির আবহাওয়া বদলে দিল। কালো ক্যাজুয়াল শার্টে তাকে আজ বেশ গম্ভীর আর আকর্ষনীয় দেখাচ্ছে।
সালমানকে বুথে পা রাখতে দেখেই ঠিক তখন ডাক্তারের সামনে বসা এক যুবক বয়সী রোগী ভয়ে ও সম্মানে ঝটপট উঠে দাঁড়াতে চাইল। যা দেখে সালমান দূর থেকেই অত্যন্ত শান্ত ও অমায়িক ভঙ্গিতে হাতের ইশারায় তাকে বসে থাকার ইঙ্গিত দিলো। অতঃপর ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে সে লোকটির ঠিক পেছনে চেয়ারের পাশে শান্তভাবে এসে দাঁড়াল।
অপরদিকে মেহুল তখন গভীর মনোযোগে রোগীর সমস্যার কথা শুনে প্যাডে খসখস করে ওষুধ আর নির্দেশাবলী লিখছিল। কলমের শেষ টানটি দিয়ে, পরম মমতায় প্রেসক্রিপশনটা রোগীর হাতে তুলে দিয়ে মেহুল যখন মিষ্টি হেসে বলল—”এই ওষুধগুলো ঠিকমতো খাবেন। তাহলে দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবেন।”
লোকটি উঠে যেতেই মেহুল ওপরের দিকে চোখ তুলে সামনে তাকাল। আর তাকাতেই তার নজর আটকে গেল! সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই চেনা মানুষটি—সালমান শাহ নেওয়াজ! মেহুল তাকে চিনে নিতে এক মুহূর্তও দেরি করল না। শান্ত ও পেশাদার কণ্ঠে বিনীতভাবে বলল, ” আপনি! প্লিজ বসুন।”
মেহুল বলতেই সালমান মেহুলের সামনের খালি চেয়ারটায় ধীরপায়ে এসে বসল। তার গম্ভীর চোখের গভীরে অদ্ভুত এক শীতলতা, কিন্তু ঠোঁটের কোণে অনুচ্চারিত এক প্রশান্তি।
মেহুল প্রেসক্রিপশন প্যাডটি সোজা করে হাত দুটি টেবিলের ওপর রাখল। তারপর পেশাদার ডাক্তারের মতো নরম গলায় শুধাল, “বলুন, আপনার কী সমস্যা? শরীরে কি আবারো কোনো অস্বস্তি বা অসুবিধা হচ্ছে?”
সালমান সামান্য সোজা হয়ে বসল। মেহুলের গাঢ় কালো চোখ দুটির দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে অত্যন্ত ধীর ও গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল—
”না, আমার শারীরিক কোনো সমস্যা নেই। বর্তমানে আমি একদম সুস্থ। ”
মেহুল একটু অবাক হয়ে ভ্রু দুটি সামান্য উঁচাল, “সমস্যা নেই?! তাহলে এখানে…?”
সালমান মৃদু হেসে নিজের বুকে হাত বুলালো, “আমি আজকে মেডিকেল ক্যাম্পের ভলান্টিয়ার হিসেবে এসেছি। পুরো ক্যাম্প ঘুরে তদারকি সবার করছিলাম। ভাবলাম আপনার বুথে এসে একবার খোঁজ নেওয়া যাক… ডাক্তার সাহেবার কি কোনো অসুবিধা হচ্ছে? বা অতিরিক্ত কোনো ওষুধ, ফার্স্ট এইড কিংবা লজিস্টিক সাপোর্ট প্রয়োজন?”
সালমানের এমন অমায়িক আর দায়িত্বশীল আচরণে মেহুলের মনের ভেতরের সব সংকোচ যেন নিমেষে উবে গেল। মেহুল ঠোঁটের কোনে সুন্দর ও বিনয়ী হাসি উপহার দিয়ে বলল—
”না না, আমার বিন্দুমাত্র কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। সত্যি বলতে, আয়োজকদের ব্যবস্থা এতটাই চমৎকার আর গোছানো যে সবকিছু খুব মসৃণভাবে চলছে। এখানে আমরা এসেছিলাম মাত্র সাতদিনের জন্য… কিন্তু এই কয়দিনে রাজশাহীর মানুষগুলোর কাছ থেকে যে বিপুল ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর সম্মান পেয়েছি, তাতে মনেই হচ্ছে না আমরা বাহির থেকে এসেছি, মনে হচ্ছে যেন আমরা আপনাদেরই একজন। আপনাদের সবার ভালোবাসায় সময়টাও যেন কীভাবে ডানা মেলে উড়ে গেল! পরশুদিনই তো আমাদের ফিরে যাওয়ার দিন…”
মেহুল একটু থামল। তার চোখেমুখে ফুটে উঠল এক মায়াবী আবেগ ও বিষাদের মেশানো অনুভূতির ছায়া। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিষ্টি গলায় যোগ করল—
”সময়টা কত দ্রুত চলে গেল, তাই না? তবে আমি কথা দিচ্ছি, রাজশাহীর এই ক্যাম্প আর এখানকার মানুষের ভালোবাসার স্মৃতিটা আমার হৃদয়ে সারা জীবন অমলিন হয়ে থাকবে।”
মেহুলের কণ্ঠে রাজশাহী শহর আর এখানকার অভিজ্ঞতা নিয়ে এমন আবেগঘন, নিখাদ ভালোবাসার কথা শুনে সালমানের ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময়, গভীর মুচকি হাসি ফুটে উঠল। একদিকে মেহুল যখন ভাবছে সে দু-দিন পরই এই শহর ছেড়ে চলে যাবে, সেখানে সালমানের মন তখন মনে মনে অন্য এক অলিখিত অধ্যায় লিখছিল! সে মনে মনেই নিঃশব্দে শুধু ভেবে নিল—’এই শহর আর এই শহরের মানুষকে ভালো লাগার গল্পটা তো কেবল শুরু হলো, অপ্সরা… শেষ হওয়া তো বহু দূরের কথা!’
এদিকে সালমানের স্থির ও গভীর দৃষ্টির সামনে মেহুল কেন যেন একমুহূর্তের জন্য থমকে গেল। পরিবেশের এমন নীরবতায় কিছুটা অস্বস্তি বোধ করে সে হালকা কেশে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। তারপর ঘড়ির দিকে একনজর তাকিয়ে সালমানের দিকে প্রশ্ন ছুড়ল—
”মিস্টার সালমান, আপনার কি আর বিশেষ কিছু বলার আছে? আসলে বাইরে প্রচুর পেশেন্ট লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, আমাকে তো—”
মেহুলের কথাটি শেষ হওয়ার আগেই বুথের হালকা পর্দা ঠেলে তড়িঘড়ি করে ভেতরে প্রবেশ করল ধ্রুব। তার হাতে সুদৃশ্য ট্রে, তাতে রাখা ঠান্ডা পানীয়ের ক্যান ও বরফশীতল পানির বোতল।
ধ্রুব ট্রে-টি মেহুল ও তার পাশে বসা অ্যাসিস্ট্যান্ট মারিয়ামের দিকে এগিয়ে দিয়ে মুখে স্বস্তির হাসি ফুটিয়ে বলল, “ম্যাম! আপাতত বাইরে কেউ লাইনে দাঁড়িয়ে নেই। ক্যাম্পের পক্ষ থেকে সবাইকে ফ্রি নাস্তা আর খাবারের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে, তাই সবাই এখন ওদিকেই ব্যস্ত। আপনারা অত কষ্ট না করে আপাতত এগুলো নিন!”
টানা রোগী দেখার পর মেহুলের গলা প্রায় শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছিল। তাই ধ্রুব ট্রে বাড়িয়ে দিতেই বরফশীতল পানীয়ের ক্যানটি হাতে নিতে নিতে একটু অবাক হয়ে ধ্রুবর দিকে চেয়ে শুধাল—
”হঠাৎ এমন আয়োজন! আজ কি বিশেষ কিছু আছে নাকি?”
ধ্রুব বিনয়ী হেসে সালমানের দিকে একনজর তাকাল। তারপর বলতে গেল, “না ম্যাম, আসলে এটা আমাদের সালমান ভাইয়ের পক্ষ থেকে—”
ধ্রুবর মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই সালমান হালকা একটা কাশির শব্দে তাকে থামিয়ে দিল। মেহুলের দিকে নিজের গভীর ও গম্ভীর চোখ দুটো স্থির রেখে ধীর গলায় বলল—
”আসলে আমাদের এমপি সাহেবের পক্ষ থেকে আজ ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পে আসা প্রতিটি সাধারণ মানুষ ও সেবা দিতে আসা ডাক্তারদের জন্য এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। আজকাল তো গরম একটু বেশিই পড়ছে তাই।”
কথা গুলো শুনতে শুনতেই মেহুল ঠান্ডা পানীয়ের এক চুমুকে মেহুলের ক্লান্ত শরীরে এক অনাবিল প্রশান্তি নেমে এলো। সে প্রসন্ন চিত্তে বলে উঠল—
”বাহ! এটা তো সত্যিই অসাধারণ একটি উদ্যোগ! আজ যে চড়া রোদ আর তীব্র গরম পড়েছে বাইরে, মানুষগুলোর একটু হলেও কলিজা জুড়াবে। খুব ভালো লাগছে ব্যাপারটা দেখে! আচ্ছা মিস্টার সালমান… আপনি কি এমপি সাহেবের লোক?”
মেহুল কথাটা বলতেই সালমানের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক সূক্ষ্ম, রহস্যময় মুচকি হাসি। নিজের পরিচয় আড়াল করেই সে আভিজাত্যপূর্ণ ভঙ্গিতে জবাব দিল—
”হুম, বলতে পারেন তেমনটাই। আমাকে এমপি সাহেবের বেশ কাছের একজন মানুষ বলা চলে।”
সালমানের সহজ স্বীকারোক্তি শুনে মেহুলের চোখের তারায় কৌতূহল আর উৎসাহের ঝলক ফুটল! সে একটু সোজা হয়ে বসে টেবিলের ওপর হাত রেখে বেশ আগ্রহ নিয়ে বলে উঠল—
”তাই নাকি! তা আপনার কি এমপি সাহেবের সাথে প্রতিদিনই যোগাযোগ হয়, দেখা হয়? মানে উনি মানুষ হিসেবে কেমন বলুন তো?ওনাকে সেই যে উদ্ভোদনের দিন দূর থেকে একটু দেখেছি আর দেখা হয় নি। কিন্তু এই ক্যাম্পে আসার পর থেকেই শুনছি উনি নাকি এই রাজশাহীর মানুষের জন্য প্রচুর কাজ করেন, খুব পপুলার একজন লিডার!”
সালমান মেহুলের চোখের অবোধ বিস্ময় আর উচ্ছ্বাসের দোলা দেখে মনে মনে বেশ পুলকিত হলো। সে হালকা একটু হেলে বসে দাপুটে গলায় বলল—
”হুম, যোগাযোগ তো প্রতিদিনিই হয়, বলতে গেলে নিয়মিত বিষয়। আর মানুষ হিসেবে তিনি কেমন, তা তো আসলে নিজে না দেখলে বুঝবেন না। তাই এমপি সাহেবকে জানতে হলে আপনাকে ওনাকে আগে চিনতে হবে। কিন্তু যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন তাহলে বলবো উনি খুব ভালো। ভালো বলেই তো মানুষ এতো পছন্দ করেন।”
মেহুল বেশ মুগ্ধ হয়ে মাথা নাড়ল, “সত্যিই প্রশংসনীয়! একজন জনপ্রতিনিধি যদি সাধারণ মানুষের এত খেয়াল রাখেন, তবে তা সত্যিই বিরল। তা মিস্টার সালমান, আপনি অবশ্যই এমপি সাহেবকে আমাদের পুরো টিম আর সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ পৌঁছে দেবেন, কেমন? আমাদের তো হয়তো আর দেখা হবে না—আপনিই না হয় আমাদের তরফ থেকে কাজটুকু করে দেবেন।”
সালমান তার প্রখর ও তীক্ষ্ম নজর মেহুলের মায়াবী মুখাবয়বে স্থির রাখল। তারপর অত্যন্ত ধীর, গম্ভীর ও মায়াময় কণ্ঠে শুধাল—
”ধন্যবাদ অবশ্যই পৌঁছে দেব, ডক্টর মেহুল। তবে আপনার কেন মনে হচ্ছে যে আমাদের আর দেখা হবে না? এমনও তো হতে পারে, প্রতিদিন এক ছাদের নিচে, এক ঘরেই আমাদের দেখা হচ্ছে! কারণ, অনেক সময় আমাদের ভাবনার যেখানে সমাপ্তি ঘটে, সেখান থেকেই তো নতুন কিছুর সূচনা হয়…।”
এদিকে সালমানের গলার সেই গম্ভীর সুর আর চোখের অতল গহীনের চাহনি মেহুলের বুকের ভেতর অদ্ভুত অচেনা এক দোলা দিয়ে গেল!
বুটিকের ক্যাশ কাউন্টারের পেছনের নরম চেয়ারটায় বসে হুমা কাজের ফাঁকেই কোলভরে একরত্তি পুঁচকু ছানাটিকে নিয়ে পরম আনন্দে ব্যস্ত।
কাজের অবসরে এই এক টুকরো ফুটফুটে প্রাণটাই যেন এখন পুরো বুটিকের প্রধান আকর্ষণ! হুমা মুখ দিয়ে অদ্ভুত সব শব্দ তৈরি করে ছানাটার দিকে চেয়ে মায়াবী গলায় রূপকথার গল্প শোনাচ্ছে, আর ছোট্ট ছানাটিও হুমার প্রতিটা কথার জবাব দিতে যেন নিজের কচি ঠোঁট দুটো নেড়ে নরম গলায় আধো-আধো শব্দ ফুটিয়ে তুলছে—
”উঁউঁ… আঁকা… উঁ!”
মাত্র কয়টা দিনের ব্যবধান! এই অল্প কয়েকদিনেই মেহুলের পাশাপাশি হুমাও এই নামহীন ছানাটার সাথে এক অদৃশ্য আত্মার বন্ধনে আটকে গেছে। বাচ্চাটা যেন এখন তাদের নিত্য দিনের সঙ্গী।
ঠিক তখনই বুটিকের কাঁচের ঝুলন্ত দরজার ঘণ্টাটি টুং করে বেজে উঠল। হুমা চোখ তুলে তাকাতেই দেখতে পেল তাদের বুটিকের বেশ পুরনো এবং রেগুলার কাস্টমার শাহানা আফরোজ ভেতরে প্রবেশ করছেন।
হুমা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার সহকর্মী মিতুকে ডেকে বলল—
”মিতু, তুই একটু প্লিজ পুঁচকুকে নিজের কোলে নে তো। আমি শাহানা আপুকে এটেন্ড করে আসছি।”
মিতু অমায়িক হেসে বাচ্চাটিকে পরম যত্নে নিজের কোলে তুলে নিতেই হুমা তড়িঘড়ি করে ক্যাশ কাউন্টার ছেড়ে শাহানা আফরোজের দিকে এগিয়ে গেল।
”আসসালামু আলাইকুম, শাহানা আপু! আসুন… আজকে কিন্তু আমাদের নতুন ঈদ কালেকশন আর ডিজাইনার শাড়িগুলোর দারুণ স্টেক এসেছে!”—হুমা কুশল বিনিময় করে আপ্যায়ন করল।
মধ্যবয়সী ভদ্রমহিলা শাহানা আফরোজ হাসিমুখে পুরো বুটিক ঘুরে ঘুরে হরেক পদের শাড়ি আর ড্রেস দেখতে লাগলেন। এটা-ওটা পছন্দ করা আর দরদাম করার নানা কথার ফাঁকে হঠাৎই ওনার নজর গিয়ে পড়ল পাশে কাউন্টারের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা মিতুর কোলে।
এক একরত্তি ফুটফুটে রাজকন্যা মিতুর আঙুল ধরে খেলা করছে দেখে শাহানা আপুর কৌতুহল জেগে উঠল। পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ হওয়ার খাতিরে তিনি হুমার দিকে ফিরে বেশ বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—
”আচ্ছা হুমা, মিতুর কোলে ওটা কার বাচ্চা? এত ছোট একরত্তি ছানা… তোমাদের বুটিকে এলো কোত্থেকে? বেশ মায়াবী তো দেখতে!”
শাহানা আপুর প্রশ্নে হুমার বুকের ভেতরের কোণে মৃদু এক বিষাদের সুর বেজে উঠল। সে আর কোনো লুকোচুরি না করে খুব নিচু ও থমথমে গলায় ডাস্টবিনের পাশ থেকে বাচ্চা কুড়িয়ে পাওয়া থেকে শুরু করে বিগত কয়েকদিনের সমস্ত ঘটনা বিস্তারিত বুঝিয়ে বলল। সবটা শোনার পর শাহানা আফরোজের চোখ-মুখ বিস্ময় আর বেদনায় ভরে উঠল। তিনি ধীরে ধীরে হেঁটে মিতুর কাছে এগিয়ে গেলেন। দোল খেতে থাকা বাচ্চাটির তুলতুলে গাল আর নিষ্পাপ চোখ দুটির দিকে অপলক চেয়ে থেকে পরম মমতায় গায়ে হাত বুলিয়ে গলায় বলে উঠলেন—
”আহারে! কোন পাষাণ মা এমন রূপসী রাজকন্যাকে এভাবে ফেলে যেতে পারল! চেহারা দেখেছ হুমা? একদম যেন স্বর্গের এক টুকরো পরী! চোখ দুটো কত উজ্জ্বল আর মায়াবী!”
কয়েক সেকেন্ড ছানাটির দিকে চেয়ে থাকার পর শাহানা হুমার দিকে ফিরে বেশ গুরুত্ব সহকারে শুধালেন—
”তা হুমা, এখন বাচ্চাটিকে নিয়ে তোমাদের চিন্তাভাবনা কী? এভাবে বুটিকে কতদিন আর রাখবে? একা একা একটা বাচ্চা সামলানো কিন্তু খুব কঠিন।”
হুমা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিষণ্ণ গলায় জবাব দিল—
”এখনো নিশ্চিত কিছু ভেবে উঠিনি, আপু। তবে মেহুল আর আমার ইচ্ছে আছে… কোনো ভালো ও নিরাপদ স্থানে কিংবা উপযুক্ত কোনো শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারের হাতে ওকে তুলে দেওয়ার, যাতে বাচ্চাটা সুন্দর একটা ভবিষ্যৎ পায়।”
কথাটা শুনতেই শাহানা আফরোজের চোখ দুটো হঠাৎ যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠল! তিনি গদগদ আর উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে হুমার হাত দুটো চেপে ধরে বলে উঠলেন—
”আরে হুমা! শোনো না, আমার এক দুঃসম্পর্কের ভাই আছে। সরকারি বড় সচিব পদে কর্মরত। অঢেল টাকা-পয়সা, সম্মান—কোনো কিছুর অভাব নেই। কিন্তু বিয়ের এতগুলো বছর পার হয়ে গেলেও ওনাদের ঘরে কোনো সন্তান হয়নি! তারা অনেক দিন ধরেই একটা ভালো বংশের সুন্দর বাচ্চা দত্তক নেওয়ার জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছেন!”
শাহানা বাচ্চাটার দিকে আবার একনজর চেয়ে বেশ আগ্রহের সাথে বললেন—
”ওরা যদি এই মেয়েটাকে দেখে, তবে তো এক পলকেই ভালোবেসে বুকে টেনে নেবে! রাজকন্যার মতো সুখে রাখবে ওকে! বচ্চাটাও ভালো পরিবেশ পাবে। তুমি বললে আমি আজকেই ওনাদের সাথে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা করে দেব?”
শাহানা এমন হুট করে দেওয়া অফার আর তাড়াহুড়ো শুনে হুমা একটু থমকে গেল। মনের ভেতরে বাচ্চাটাকে হারানোর এক অজানা ভয়, সেই সাথে ফুটফুটে কন্যার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আর মেহুলের মতামতের কথা ভেবে সে নিজেকে সামলে নিয়ে বিনীত গলায় বলল—
”আপু… হুট করে তো কিছু বলা সম্ভব না। মেহুল আসলে ওর সাথে আমাকে একটু কথা বলতে হবে। আমি সবকিছু মেহুলের সাথে আলোচনা করে আপনাকে পরে ফোন করে বিস্তারিত জানাচ্ছি, কেমন?”
শাহানা আফরোজ ইতিবাচকভাবে মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই! ভালো করে ভেবে চিন্তে বলো। কারণ এমন ভালো পরিবার পাওয়া কিন্তু ভাগ্য!”
শাহানার কথাটা শুনে হুমার চোখ দুটো বাচ্চার নিষ্পাপ মুখের ওপর গিয়ে স্থির হলো, সেই সঙ্গে অদ্ভুত ভাবে বুকের ভেতর এক মোচড় দিয়ে উঠল!
মেডিক্যাল ক্যাম্পের কাজ শেষ করে মেহুল ধীরপায়ে ফুটপাত ধরে হেঁটে চলেছে।
মধ্যদিনের প্রখর রোদ আর কাঠফাটা চড়া গরমে ততক্ষণে তার সমস্ত শরীর ঘামে একাকার। রোদের তাপদহন যেন আজ একটু বেশিই পোড়াচ্ছিল তাকে। গালের কোণে জমে ওঠা ঘামের ফোঁটাগুলো রুমাল দিয়ে আলতো করে মুছতে মুছতে সে রাস্তার পাশে থমকে দাঁড়াল।
একটি রিকশার আশায় এদিক-সেদিক তাকাতেই, হঠাৎ মেহুলের নজর গিয়ে আটকে গেল রাস্তার ধারের একটি ছোট শিশু-পোশাকের দোকানের দিকে।
দোকানের কাঁচের শো-কেস আর বাইরে ঝুলানো স্ট্যান্ড জুড়ে নানা সাইজের বাচ্চাদের হরেক রকমের পোশাক। আর ঠিক সেই রঙিন জামাগুলোর ঠিক মাঝখানটাতে টাঙানো রয়েছে একখানা গাঢ় বেগুনি রঙের ছোট্ট ফ্রক!
প্রথম দেখাতেই রঙটা যেন মেহুলের সমস্ত দৃষ্টি এক অদ্ভুত মায়ায় কাড়ে নিল!
মেহুল অনিচ্ছাসত্ত্বেও থমকে গেল। চোখ দুটি স্থির হয়ে রইল সেই একরত্তি বেগুনি ফ্রকটির ওপর। আর অমনি তার কল্পনার ক্যানভাসে, না চাইতেও, সেই ফুটফুটে রাজকন্যাকে সে আবিষ্কার করল এই বেগুনি রঙের মায়াবী পোশাকে! তার কল্পনাতেই যেন পুঁচকু এই ফ্রকটা পরে কচি কচি হাত-পা ছুড়ে মেহুলের দিকে চেয়ে হাসছে!
মুহূর্তের মধ্যে মেহুলের ব্যাকুল ও ক্লান্ত অধর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল এক চিলতে অমলিন, তৃপ্তির হাসি। সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তি আর প্রখর রোদের পোড়ানি যেন ওই এক চিলতে মিষ্টি হাসিতে এক নিমেষে উবে গেল।
অতঃপর পায়ের গতিপথ বদলে মেহুল ধীরপায়ে এগিয়ে গেল দোকানটির ভেতর।
নিজের কোমল হাত বাড়িয়ে স্ট্যান্ডে ঝুলে থাকা বেগুনি ফ্রকটি আলতো হাতে নামিয়ে আনল সে। কাপড়ের নরম সুতোয় হাত বুলিয়ে, চোখে একরাশ মায়া নিয়ে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল—
”ভাইয়া, এই সুন্দর ফ্রকটার দাম কত?”
দোকানি জামার গায়ে ঝুলতে থাকা প্রাইস ট্যাগটা একনজর দেখে নিয়ে বেশ হাসিমুখে জবাব দিল—
”ম্যাম, একদম ফিক্সড প্রাইস… এক হাজার টাকা।”
মেহুল আর এক মুহূর্তও দ্বিমত করল না। অন্যদিন হলে কিন্তু ঠিকই দরদাম করতো কিন্তু আজ কেন যেন কিছু বলতে মন চাইলো না। অতঃপর সে তড়িঘড়ি করে নিজের কাঁধে ঝোলানো ব্যাগের চেইন খুলে ভেতরে হাত রাখল। সৌভাগ্যক্রমে, ব্যাগের পার্সটিতে তখন ঠিক একটি এক হাজার টাকার নোটই অবশিষ্ট ছিল!
বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে মেহুল নোটটি দোকানদারের হাতে তুলে দিল। জীবনে এই প্রথম সে নিজের হাতে কোনো বাচ্চার জন্য এত ভালোবেসে কিছু কিনল! কিন্তু জামাটা হাতে নিতেই মনের এক কোণে হালকা দ্বিধা আর ভয় এসে উঁকি দিল—’সাইজটা পুঁচকুর গায়ে ঠিকঠাক হবে তো? যদি বড় বা ছোট হয়ে যায়!’
মনের এই অনিশ্চয়তা দূর করতে মেহুল একটু ইতস্তত করে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করে নিল—
”ভাইয়া, একটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিল… এ প্রথম এত ছোট বাচ্চার জন্য জামা নিচ্ছি তো, তাই সাইজ নিয়ে একটু দ্বিধায় আছি। যদি সাইজে কোনো সমস্যা হয়, পরে এসে চেঞ্জ করা যাবে তো?”
দোকানি অমায়িক হেসে সাথে সাথে অভয় বাণী দিল—
”আরে ম্যাডাম, কোনো চিন্তা করবেন না! ক্যাশ মেমোটা সাথে রাখবেন, সাইজ ছোট-বড় হলে এসে একদম অনায়াসে চেঞ্জ করে নিয়ে যাবেন।”
শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৮
দোকানদারের আশ্বাস শুনে মেহুলের চিন্তিত মুখে স্বস্তির প্রফুল্লতা ফুটে উঠল। সে খুশি মনে ধন্যবাদের সাথে রঙিন প্যাকেটে মোড়ানো জামাটি পরম মমতায় দু-হাতে আঁকড়ে ধরল। দোকান থেকে বের হতেই পায়ের গতি এখন যেন তার আগের চেয়েও অনেক গুণ দ্রুত। কড়া রোদ কিংবা প্রচণ্ড ক্লান্তি—কোনো কিছুই এখন আর মেহুলকে থমকে দিতে পারছে না। কারন তার মন তাকর জানান দিচ্ছে পুঁচকুটা হয়তো তার জন্য পথ চেয়ে বসে।
