শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৩
আফীফা আফনান
“ম্যাম, আপনার কি খুব বেশি সমস্যা হচ্ছে?”—
দায়িত্বরত নার্সটি নরম সুরে মেহুলের শিয়রে এসে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল।
মেহুল মৃদু হেসে মাথা এপাশ-ওপাশ নাড়ল, “না, সমস্যা ঠিক নয়… তবে হাতের ব্যথাটা একটু বেশিই অনুভব হচ্ছে। আচ্ছা, আমি কি একটু বাইরে যেতে পারি?”
নার্স সঙ্গে সঙ্গে শঙ্কাভরা চোখে নিষেধ করে উঠল, “না ম্যাম! আপনাকে এই মুহুর্তে বাহিরে যেতে দেওয়া যাবে না। আপনার আঘাতটা অনেক বেশি গভীর ছিল। তাই আগামী কয়েক দিন এমন ব্যথা অনুভব হওয়াই স্বাভাবিক। আপনাকে এখন খুব কেয়ারফুলি চলাফেরা করতে হবে, যাতে হাতে কোনো রকম বাড়তি চাপ বা আঘাত না লাগে।”
”হ্যাঁ, আমি বুঝেছি। আই উইল ম্যানেজ…”—একটু থেমে মেহুল উদভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক তাকাল। বুকের ভেতর কেমন যেন একটা ছটফটানি শুরু হয়েছে। সে নার্সের চোখের দিকে তাকিয়ে উৎকণ্ঠা লুকিয়ে রেখে জানতে চাইল, “আচ্ছা… আমার সাথে যে বাচ্চাটা এসেছিল, ও কোথায় আছে বলতে পারো? কেমন আছে ও?”
নার্স একটু ভেবে নিয়ে বলল, “ম্যাম, যতদূর জানি, উদ্ধারের পর শিশুগুলোকে ইমার্জেন্সিতে ভর্তি করানো হয়েছিল। এর বেশি ঠিক এই মুহূর্তে আমার জানা নেই। তবে আপনার কিছু লাগলে আমাকে বলতে পারেন।”
মেহুল শুকনো হাসার চেষ্টা করল, “না না, আমার তেমন কিছু লাগবে না।” তারপর নিজেই পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার সুরে বলল, “তোমার অন্য কোথাও কোনো কাজ থাকলে তুমি যেতে পারো। আমি একদম ঠিক আছি। যদি কিছু লাগে, আমিই তোমাকে ডেকে নেব।”
নার্স মৃদু হেসে মাথা নাড়ল, “না ম্যাম, আমার অন্য কোথাও আর কোনো কাজ নেই। আজ আমার একমাত্র ডিউটি আপনার কেয়ার নেওয়া। আপাতত আমি এখানেই আছি!”
মেহুলের ঝাপসা চোখ দুটো এদিক-ওদিক ঘুরল। সে পুরো কেবিনের উন্নত এবং পরিপাটি পরিবেশটার দিকে একবার নিবিড় দৃষ্টিতে তাকাল। মনে মনে একটা প্রশ্ন উঁকি দেওয়ায় সে কৌতূহলী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা… এটা সরকারি হসপিটাল তো, তাই না?”
নার্স অমায়িক হেসে উত্তর দিল, “জি ম্যাম। কিন্তু কেন বললেন?”
মেহুল কিছুটা বিস্মিত হয়ে বলল, ” তোমার এই আন্তরিক ব্যবহার আর এখানকার নিখুঁত সার্ভিস দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো হাই-ফাই প্রাইভেট হসপিটাল! সচরাচর সরকারি হসপিটালগুলো তো এমন গোছালো থাকে না। তবে এখানের পরিবেশটা সত্যি খুব চমৎকার।”
নার্সের মুখে এক চিলতে গর্বের হাসি ফুটে উঠল, “আসলে ম্যাম, আগে এই হসপিটালটাও দেশের আর দশটা সরকারি হসপিটালের মতোই বেহাল দশায় ছিল। কিন্তু আমাদের এলাকার বর্তমান এমপির বদৌলতে এখন সবকিছু একদম বদলে গেছে। উনার কড়া নজরদারি আর আধুনিক ভাবনায় হসপিটালটার এই রূপ। আপনি এখন রেস্ট নিন ম্যাম।”
“আমার একটা হেল্প করতে পারবে!”
“জ্বী ম্যাম, বলুন কি হেল্প লাগবে?”
“বাচ্চা গুলোর একটু খবর এনে দিবে, বিশেষ করে আমার সাথে যে ছিলো তার!”
“ঠিকাছে ম্যাম, আমি খবর এনে দিবো আপাতত আপনি শুয়ে পড়ুন। আপনি এখনো অনেক দুর্বল।”
নার্সের কথা শুনতেই মেহুল আর কোনো কথা বাড়াল না। নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করে আবার শুয়ে পড়ল বিছানায়। কিন্তু তার মাথার ভেতর তখন হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কিছু প্রশ্নের উত্তর তার জানা থাকলেও, বেশিরভাগ রহস্যই কুয়াশায় ঢাকা—যেগুলোর উত্তর সে আজও জানে না। স্বপ্নের সেই কথাগুলো, মায়ের মুখচ্ছবি আর অবুঝ পুঁচকুর মুখটা ভেসে উঠতে লাগল তার চোখের পাতায়।
কতক্ষণ কেটেছে কে জানে! হঠাৎ করেই কানের কাছে একটা মৃদু ডাক ভেসে এলো—
“ম্যাম, আপনার ওষুধের টাইম হয়েছে।”
নার্সের ডাকে মেহুলের ঘোর কাটল। সে ধীরে ধীরে চোখ খুলল। নার্সের দিকে তাকাতেই সে পরম যত্নে কিছু ওষুধ আর এক গ্লাস পানি মেহুলের দিকে বাড়িয়ে দিল।
এদিকে মেহুল ওষুধটুকু খেয়ে নার্সের নেম প্লেটের দিকে তাকাল। সেখানে ‘শারমিন’ লেখা দেখে মৃদু হেসে বলল—
“ধন্যবাদ, মিস শারমিন।”
নার্স শারমিন হেসেই উত্তর দিল, “আরে ম্যাম, ধন্যবাদ দিচ্ছেন কেন? এটা তো আমাদের দায়িত্ব! তার ওপর আপনার জন্য বিশেষ টেককেয়ারের কড়া নির্দেশনা আছে। তাতো পালন করতেই হবে।”
মেহুল বেশ অবাক হয়ে শুধাল, “বিশেষ কেয়ার? আমার জন্য… কিন্তু কে করেছে?”
”সেটা তো জানি না ম্যাম,” শারমিন নিজে অ্যাপ্রনটা একটু টেনে দিয়ে বলল, “তবে সিনিয়র ডাক্তাররা স্পেশালি বলেছেন আপনার যাতে কোনো অসুবিধা না হয়, সেদিকে যেন শতভাগ নজর দেওয়া হয়।”
অতঃপর নার্স আর কথা না বাড়িয়ে ট্রলি গুছিয়ে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মেহুলও আর প্রশ্ন না বাড়িয়ে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে পড়ল।
এভাবেই কেটে গেল বেশ কিছুক্ষণ। মেহুলকে একদম স্থির হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে শারমিন ভাবল সে হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। তাই কেবিনের দরজার সিটকিনিটা আলতো করে টেনে নিজেকে একটু ফ্রেশ করতে সে বাইরে বের হলো। অতঃপর একটু পরই করিডোর দিয়ে আবারও রুমে আসার সময় দরজার ঠিক বাইরেই তার এক সহকর্মী নার্সের সাথে দেখা হয়ে গেল তার।
পরক্ষণেই দুজনের মধ্যে টুকটাক কথাবার্তা হতে হতে স্বাভাবিকভাবেই কথা ঘুরে এলো মেহুলের দিকে। কলিগ নার্সটি রুমের ভেতরে একবার উঁকি দিলো,পরেই শারমিনের দিকে তাকিয়ে তার কাছে জানতে চাইল—
“হ্যাঁ রে, কেবিনের ওই পেশেন্টের কন্ডিশন কেমন এখন?”
শারমিন ফিসফিস করে বলল, “হুম, এখন অনেকটা ভালো। ওষুধ খেয়ে কেবল শুয়েছে।”
শুনেই অন্য নার্সটি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আফসোসের সুরে বলে উঠল—
“মেয়েটা তো কোনোমতে বেঁচে গেল, কিন্তু বাচ্চাটা… আহা, কী সুন্দর ফুটফুটে একটা বাচ্চা! শেষমেশ মরেই গেল! শুনলাম মেয়েটা নাকি বাচ্চাটাকে বাঁচানোর জন্য জীবন বাজি রেখে পানিতে নেমেছিল, কিন্তু লাভ কী হলো… শেষে পানিতে ডুবেই মরতে হলো বাচ্চাটাকে!”
শারমিন চমকে উঠে তার হাত চেপে ধরল, “আরে! আস্তে বলো! ভেতরে উনি শুনলে বিরাট সমস্যা হয়ে যাবে! বাচ্চাটার মারা যাওয়ার খবর উনাকে জানাতে একদম মানা করা আছে, শোনোনি?”
বাইরে নার্সদের এই সংক্ষিপ্ত কথোপকথন যখন চলছিল, ঠিক তখনই ভেতরে কেবিনের বিছানায় বসা মেহুলের পুরো দুনিয়াটা যেন মুহূর্তে ওলটপালট হয়ে গেল! ‘বাচ্চাটা মারা গেছে’—কথাটা কানে পৌঁছানো মাত্রই তার হৃৎস্পন্দন যেন এক লহমায় থমকে দাঁড়াল! বুকের ভেতরটা প্রকাণ্ড এক শূন্যতায় ধসে পড়ল!
”এই! তোমরা কী বললে…! এই, কী বললে তোমরা?”
আকস্মিক এমন আর্তনাদে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা নার্স দুজন ভয়ার্ত চোখে কেবিনের দিকে তাকাল। মেহুলকে উন্মাদের মতো বিছানা ছেড়ে নামতে দেখে দুজনেই রীতিমতো ভড়কে গেল!
শারমিন নামের নার্সটি দ্রুত দৌড়ে ভেতরে ঢুকল, “ম্যাম! আসলে… আপনি ভুল শুনছেন—”
”এই! তোমাকে না একটু আগে জিজ্ঞেস করলাম! তুমি আমাকে মিথ্যা কথা বললে!”—মেহুলের কণ্ঠস্বর তখন ক্ষোভে আর শোকে কাঁপছে! হাত ক্যানোলা করা, সেখান দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে, অথচ তার কোনো সেদিকে খেয়াল নেই! চোখের সামনে চারপাশ যেন দুলছে। তবুও মেহুল উঠে দাঁড়ালো কারণ সে এখন যেভাবেই হোক কেবিন থেকে বের হয়ে পুঁচকুকে খুঁজতে চায়!
মেহুল হাইপার হয়ে যেতেই শারমিন আগে বাড়িয়ে তাকে আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল, “ম্যাম, শান্ত হন! প্লিজ আপনি বেডে চলুন—”
”সরো এখান থেকে! ছাড়ো আমাকে!”—মেহুল উন্মাদের মতো নার্সকে একপাশে ঠেলে দিয়ে দরজার দিকে একপ্রকার ছুট দিল।
কিন্তু কেবিনের দরজার চৌকাঠ পার হওয়ার আগেই হুট করে বাইরে থেকে আসা হুমা তাকে দু-হাতে শক্ত করে জাপটে ধরল!
হুমা মেহুলের এই বিদ্ধস্ত রূপ দেখে থমকে গেল, “কী করছিস এসব মেহুল? তুই এমন হাইপার হচ্ছিস কেন? শান্ত হ মেহুল, শান্ত হ!”
এক্ষন পরে হুমাকে কাছে পেয়েই মেহুল তাকে আঁকড়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছে, “হুমা… হুমা! পুঁচকু… আমাদের পুঁচকু! ও পানিতে ডুবে… হুমা, ওরা বলল ও মারা গেছে হুমা!”
হুমা মেহুলের দু-কাঁধ শক্ত করে ধরে ঝাঁকুনি দিল, “কিচ্ছু হয়নি পুঁচকুর! ও একদম ঠিক আছে!”
মেহুল চোখ বুজে মাথা এপাশ-ওপাশ নাড়াতে লাগল, “না… তুই মিথ্যা বলছিস! আমি নিজের কানে শুনেছি ওরা বলছিল পুঁচকু আর নেই!”
হুমা মেহুলের ভেজা মুখটা দু-হাতে তুলে ধরে একদম চোখের দিকে তাকাল, “আমি সত্যি বলছি মেহুল! একদম সত্যি কথা বলছি! আমার দিকে তাকা… আমার চোখের দিকে তাকা!”
”মিথ্যা…”—মেহুলের বুক চিরে এক করুণ আর্তনাদ বেরিয়ে এলো।
”তোর কসম মেহুল! ওর কিচ্ছু হয়নি!”—হুমা শক্ত ও আবেগপূর্ণ গলায় বলে উঠলো, কিন্তু শব্দটা শুনার আগেই মেহুলের পুরো শরীরটা যেন এক লহমায় নিস্তেজ হয়ে হুমাইরার গায়ের ওপর ঢলে পড়ল।
প্রায় ঘণ্টা খানেক কেটে গেল। বিষণ্ণ কেবিনের থমথমে বাতাসে একসময় মেহুল ধীরে ধীরে চোখ খুলল। কিন্তু চেতনা ফিরে আসার সাথে সাথে স্মৃতিগুলো মাথায় আছড়ে পড়তেই সে ধড়ফড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল! তার চোখে-মুখে চরম ব্যাকুলতা, প্রলাপের মতো বিড়বিড় করে বলে উঠল—
“পুঁচকু… আমার পুঁচকু…!”
হুমা এতক্ষণ মেহুলের বিছানার পাশেই চিন্তিত মুখে বসে ছিল। মেহুলকে অমন উন্মাদের মতো উঠতে দেখে সে সাথে সাথে এগিয়ে এসে মেহুলের ক্যানোলা পরানো কাঁপতে থাকা হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরল।
মেহুল তার অশ্রুসজল লাল চোখ দুটো হুমার দিকে তুলে তাকাল। গলার ভেতর কান্না আটকে রেখে কাঁপাকাঁপা স্বরে মিনতি ঝরিয়ে বলল—
“হুমা… আমার পুঁচকু…?”
হুমা মেহুলের মুখের দিকে তাকিয়ে এক গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। শান্ত ও শক্ত গলায় বলল—
“পুঁচকু ২০৫ নম্বর রুমে আছে, মেহু।”
মেহুলের কান্নাভেজা চোখে বিস্ময় আর সংশয় ভেসে উঠল। সে ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করল—
“তাহলে… তাহলে ওরা বাইরে যে বলল? ওই নার্স দুটো বলছিল যে একটা বাচ্চা মরে গেছে…!”
হুমা মেহুলের গালে হাত রেখে মাথা নাড়ল, “ওটা পুঁচকু ছিল না । ওরা মোট সাতটা বাচ্চাকে পাচারের চেষ্টা করছিল… ওই দুর্ভাগ্যবান বাচ্চাটা ওদের মধ্যে একজন ছিল।”
“আমি ওকে বাঁচাতে পারি নি হুমা?”
“তোর দোষ নেই মেহুল, বাচ্চাটা নাকি পানিতে পড়ার আগেই…… “হুমা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললো।
মেহুলের বুকটা এক মুহূর্তের জন্য যেন কেঁপে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই এক ভয়াবহ সন্দেহ তার মস্তিষ্কে ধাক্কা দিল! সে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে শুধাল—
“তাহলে… পুঁচকুর গায়ের ওই লাল তোয়ালেটা…?”
হুমা এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। কোনো উত্তর দিতে পারল না, শুধু চোখ দুটো নামিয়ে নিল।
হুমার এই নীরবতা দেখে মেহুলের ভেতরের আতঙ্ক দ্বিগুণ হয়ে গেল! সে হুমার হাত দুটো ঝাঁকিয়ে চিৎকার করে উঠল—
“আমার পুঁচকু কোথায় হুমা! ওকে ওরা কোথায় রেখেছে বল আমাকে?”
”ও এই হসপিটালেই আছে মেহু…”—হুমা মৃদু স্বরে বোঝানোর চেষ্টা করল।
”আমি দেখব! আমি এখনই ওকে দেখব হুমা!”—মেহুল উন্মাদের মতো নিজের হাতের বাঁধন হুমার হাত থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল।
হুমা তাকে সামলানোর চেষ্টা করে বলল, “হুম, দেখবি… একটু পরে দেখবি। শরীরটা তো একটু স্থির হতে দে—”
”না! আমি একটু পরে না, আমি এখনই দেখব!”
মেহুলের এমন ক্ষিপ্ত আর মাতৃহারা পশুর মতো ব্যাকুলতার সামনে হুমা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। অতঃপর মেহুলকে সাথে নিয়েই সে কেবিনের দরজার দিকে ছুটে বেরিয়ে গেল।
২০৫ নম্বর কেবিনের কাচের দরজার ঠিক সামনে জমে যাওয়া বরফের মতো দাঁড়িয়ে আছে মেহুল। আর ঠিক দরজার ওপাশে ছোট্ট বিছানাটায় শুয়ে আছে তুলতুলে পুঁচকুটা। কাচের এপার থেকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ওর ফর্সা, কোমল মুখটা কেমন বিবর্ণ আর ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ছোট্ট হাতে ঝুলছে ক্যানুলা, আর মুখে ফিট করা অক্সিজেন মাস্ক। হঠাৎ মেহুলের বুকের ভিতরটা দুমড়ে-মুচড়ে উঠলো; চোখ বেয়ে পানি পড়ার ক্ষমতাটুকুও যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে সেই করুণ দৃশ্য দেখে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই মেহুলের পেছন থেকে একজন জুনিয়র ডাক্তার ডেকে উঠলেন, “২০৫ নম্বর কেবিনের বাচ্চাটার সাথে এখানে কে আছেন?”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হুমা তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল, “জ্বি, আমি।”
সাথে সাথেই ডাক্তার ঝটপট গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি বাচ্চাটার মা?”
হুমা ভ্রু জোড়া সামান্য কুঁচকে প্রশ্ন করল, “কেন?”
”আসলে বাচ্চার কিছু জরুরি কাগজপত্র আর ফর্মে মায়ের স্বাক্ষর প্রয়োজন।”
হুমার ঠোঁটের ভাষা যেন হঠাৎ হারিয়ে গেল। সে ক্ষণিকের জন্য নিরব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক সেই মুহূর্তে এক নার্স এসে একটি ফাইল ডাক্তারকে দিতেই তিনি সেটা হুমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে তাড়া লাগাল, “ম্যাডাম, দেরি করবেন না। আপনি মা হলে এখানে একটা স্বাক্ষর করে দিন।”
হুমার গলায় দ্বিধা ফুটে উঠল, “আসলে… আমি তো ওর মা না। ওর আসল মা কে, তা-ও আমি জানি না।”
নার্স অবাক হয়ে তাকাল, “মানে? তাহলে আপনি—”
”আসলে আমরা ওকে…” হুমার কথা শেষ হওয়ার আগেই এক শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠ ভেসে এল—
“ফাইলটা এদিকে দিন, ডাক্তার।”
ডাক্তার এবং হুমা দুজনেই চমকে পেছনে তাকাল। দেখল মেহুল দাঁড়িয়ে আছে। কান্নায় ওর চোখ দুটো ফোলা ফোলা, কিন্তু চেহারায় অদ্ভুত এক শান্তভাব। দুজনকে অবাক হয়ে তাকাতে দেখে মেহুল একধাপ এগিয়ে এসে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল, “ফাইল।”
ডাক্তার মেহুলের দিকে এক নজর তাকালো অতঃপর আর কথা না বাড়িয়ে ফাইল ও কলমটি মেহুলের দিকে বাড়িয়ে দিলো। ফাইল হাতে পেতেই মেহুল কোনোরকম দ্বিধা ছাড়া ফাইলটি হাতে নিয়ে তাতে খসখস আওয়াজে সই করল। তারপর আগের মতোই নিরাসক্ত ভঙ্গিতে ফাইলটি ডাক্তারের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে আবারও সেই কাচের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
মেহুল সরে যেতেই হুমার চোখ পড়ল ফাইলের পাতাটির দিকে। স্বাক্ষরটা দেখেই বিস্ময়ে তার চোখ জোড়া বড় হয়ে গেল, কিন্তু পরমুহূর্তেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক পরম তৃপ্তির হাসি। ‘মায়ের নাম’ লেখার স্থানটিতে একদম স্পষ্ট এবং উজ্জ্বল অক্ষরে জ্বলজ্বল করছে—অপ্সরী মেহুল ইকবাল।
মেহুল সবে এগোলো তখনি ডাক্তার ফাইলটি মেলাতেই মেহুলকে লক্ষ্য করে আবার ডাকলো, “ম্যাম, বাচ্চার জন্ম তারিখের ঘরটা ফাঁকা। জন্ম তারিখটা তো বলুন?”
মেহুল কাচের দিকে তাকিয়ে থেকেই, পিছন না ফিরে শান্ত গলায় বলল, “আজকের তারিখটাই বসিয়ে দিন।
“আজকের তারিখ!” ডাক্তার যেন বিষম খেলো —
“জ্বি কারণ… আমার মেয়ে রুপে জন্ম যে ওর আজই।”
এদিকে সময় গড়ালো কিন্তু মেহুল কাঁচের দরজার সামনে থেকে একপা-ও নড়ালো না। যেন পণ করেছে, যতক্ষণ না তার পুঁচকুটা চোখ মেলছে, ততক্ষণ সে এই দরজার সামনেই পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে। মেহুল যখন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ঠিক তখনই ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন একজন বয়ো জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ মহিলা ডাক্তার। তাকে দেখেই মেহুল সড়ে দাঁড়ালো। ডাক্তার যখন কেবিনের দরজার হ্যান্ডেলে হাত দিয়ে প্রবেশ করতে যেতেই মেহুল আলতো করে তাকে থামিয়ে দিল।
“এক্সকিউজমি ম্যাম!”
মেহুলর ডাকে ডাক্তার দাঁড়াতেই, কাতর চোখে ডাক্তারটির দিকে তাকিয়ে মেহুল ব্যাকুল গলায় শুধাল, “আমি কি আপনার সাথে ভেতরে যেতে পারি, ডক্টর?”
মহিলা ডাক্তার থমকে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে শুধালেন, “আপনি…? কে হন বাচ্চার?”
”আমি ওর মা।”—এক বিন্দু দ্বিধা না রেখে উত্তর দিল মেহুল।
ডাক্তারটি ক্ষণিক বিরক্তি ও গাম্ভীর্য নিয়ে বললেন, “ইমারজেন্সি পেডিয়াট্রিক কেবিনে এভাবে যাকে-তাকে ঢোকার অনুমতি আমরা দিতে পারি না, ম্যাম। ইনফেকশনের প্রবল ঝুঁকি থাকে।”
মেহুল এবার নিজের চোখের পানি মুছে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে উঠল, “আমি একজন ডাক্তার, ম্যাম। সত্যি বলতে, আজই এই হাসপাতালেই আমার চাইল্ড স্পেশালিস্ট ডিপার্টমেন্টে জয়েনিং ডেট ছিল।”
ডাক্তারটি মেহুলের ব্যান্ডেজ করা হাত আর রক্তাক্ত ক্যানোলার দিকে চোখ বু্লিয়ে খানিকটা অবাক হলেন, “আপনি… আপনি কি ডক্টর মেহুল ইকবাল?”
”জ্বি।”
মহিলা ডাক্তারের চেহারার কঠোরতা মুহূর্তে বদলে গিয়ে সেখানে নমনীয়তার রূপ নিল। তিনি হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “ইয়েস! আপনার জয়েনিং আর অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারের কথা ডিরেক্টর স্যার সকালে বলছিলেন। আমি এখানকার সিনিয়র পেডিয়াট্রিক ডক্টর, জান্নাতুল ফেরদৌস। কিন্তু ডক্টর মেহুল, আপনি তো নিজেই আশঙ্কাজনকভাবে আহত!”
”কোনো সমস্যা হবে না, ডক্টর ,” মেহুলের গলায় আর্জি, “আমি শুধু ভেতরে গিয়ে আমার মেয়ের পাশে একটু শান্ত হয়ে বসতে চাই, প্লিজ…”
ডক্টর জান্নাতুল ফেরদৌস পরম মমতায় মেহুলের পিঠে হাত রাখলেন, “ঠিক আছে। তবে আগে আপনাকে স্টেরিলাইজড প্রটেক্টিভ গাউন আর মাস্ক পরে নিতে হবে। যাতে ভেতরে কোনো ইনফেকশন না ছড়ায়। আশা করি একজন ডাক্তার হিসবে আপনি এসব ভালো করেই জানেন!”
অতঃপর পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা এক নার্সকে ডেকে ডক্টর নির্দেশ দিলেন, “সিস্টার, উনাকে আইসিইউ প্রটেকশন ড্রেস পরতে সাহায্য করুন।”
মেহুল কৃতজ্ঞতায় ডক্টর জান্নাতকে ধন্যবাদ জানিয়ে হুমাকে সাথে নিয়ে নার্সের পেছন পেছন চেঞ্জিং রুমের দিকে এগোতে লাগল। কিন্তু কয়েক পা যাওয়ার পরই মেহুলের পা দুটো থমকে গেল। সে নার্সটির দিকে ঘুরে ধীর ও করুণ গলায় জিজ্ঞেস করল—
” সিস্টার… যে বাচ্চাটা কিছুক্ষণ আগে মারা গেল, ওকে এখন কোথায় রাখা হয়েছে?”
নার্সটি খানিক বিষণ্ণ গলায় উত্তর দিল, “মর্গ সেকশনের পাশের কোল্ড স্টোরেজ রুমে রাখা হয়েছে, ম্যাম। আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলে স্বজনদের খোঁজে ডেক্লিয়ারেশন দেওয়া হবে। কিন্তু স্বজন পাবে কিনা কে জানে শুনলাম বাচ্চাটা অনাথ ছিলো। মা নেই আর বাবা নাকি আশ্রমে ফেলে গিয়েছিলো।”
মেহুল এক মুহূর্ত থামল, তারপর কাঁপা গলায় বলল, “আমাকে কি একটু সেখানে নিয়ে যাওয়া যাবে?”
নার্সটি প্রথমে দ্বিধায় পড়লেও মেহুলের ব্যাকুল চাহনি দেখে আর না করতে পারল না।
থমথমে এক শীতল করিডোর পার হয়ে নার্স মেহুলকে সেই নিস্তব্ধ ঘরের দরজার সামনে এনে দাঁড় করালো। দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই মেহুলের যেন হাড়হিম হয়ে এলো। মেহুল নজর ঘোরালো দেখলো রুমের মাঝখানের স্টিলের ট্রলিতে সাদা থান কাপড়ে মোড়ানো একটি নিথর, অতি ক্ষুদ্র অবয়ব শুয়ে আছে।
মেহুল ধীরপায়ে এগোতে লাগল। তার পা দুটো কাঁপছে, কপালে জমে উঠেছে ঘাম। হাত দুটি কাঁপতে কাঁপতে গিয়ে পৌঁছাল সেই শুভ্র কাপড়ের ওপর। কাপড়টা আলতো করে সরাতেই ভেসে উঠল এক নিষ্পাপ, ফেরেশতার মতো কোমল মুখ। কিন্তু মুখখানি বড্ড ফ্যাকাসে, বরফের মতো ঠাণ্ডা!
মেহুল তার কম্পিত হাত দুটি দিয়ে শিশুটির দু-গালে হাত ছুঁইয়ে দিল। ছোঁয়ামাত্রই তার বুকের ভেতরের কষ্টটা আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে বের হলো! সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, ডুকরে কেঁদে উঠল ওই নির্জন শীতল ঘরে—
”আমাকে ক্ষমা করে দে, সোনা! আমি তোকে বাঁচাতে পারলাম না …! ক্ষমা করে দে আমাকে!”
মেহুলের চোখের অবাধ্য জল গড়িয়ে পড়ল নিথর শিশুটির বরফশীতল গালে। মেহুল ডুকরে কেঁদে কেঁদে বলতে লাগল—
“হয়তো আমি তোকে পুঁচকু ভেবেই বাঁচাতে গিয়েছিলাম… হয়তো তোকে পুঁচকু মনে করেই আমার নিজের জীবন বাজি রেখে ওই পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছিলাম! বিশ্বাস কর, আমি তোকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু বিধাতা হয়তো আমার কথা শুনলেন না! তাও তোকে আমি কোনোদিন ভুলে যাব না… এই মন তোকে কোনোদিন ভুলতে দেবে না! পুঁচকুর মতো তুইও আজ থেকে আমার জীবনের সাথে, আমার অস্তিত্বের সাথে চিরতরে জড়িয়ে গেলি…”
মেহুল নিথর শিশুটির কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে পরম মমতায় চুমু খেল। অতঃপর চোখের জল মুছে হৃদয়ভাঙ্গা এক তৃপ্তি নিয়ে বিড়বিড় করে বলল—
“তোকে তো এই পৃথিবীর আলোয় ধরে রাখতে পারলাম না, কিন্তু তোকে আমি সব সময় আমার হৃদয়ের খুব গহীনে আগলে রাখব! আজ থেকে তুইও আমার সন্তান… মেহুলের আরেক সন্তান! আর তোর নাম হবে—’স্মৃতি’!”
শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২২
মেহুলের এমন অবস্থাতে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হুমাও একসময় দু-হাতে মুখ ঢেকে শব্দহীনভাবে কেঁদে ফেলল। অতঃপর মেহুল সাদা কাপড়টা পরম ভালোবাসায় আবার বাচ্চার মুখে টেনে দিল। সেই নিস্তব্ধ ঘর থেকে যখন সে বের হয়ে এলো, তার চোখে আর কেবল শোক ছিল না—ছিল এক চিরন্তন মাতৃরূপের অপরিসীম ক্ষমতা আর দৃঢ়তা!
