সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি সারপ্রাইজ পর্ব ৩
suraiya rafa
বেলা এগারো বেজে ত্রিশ, অফিস টাইম।
বিস্তৃত জনবহুল সানফ্রান্সিসকো শহরের একটি ব্যস্ততম দিন। ছত্রিশ তলার বহুতল ভবনের অবিচ্ছেদ্য এক কামরায় বসে মধ্যমা আর তর্জনীর ডগায় পেন্সিল ঘোরাচ্ছে ক্রীতিক, দৃষ্টি তার ল্যাপটপের স্ক্রিনে নিবদ্ধ।
তার গভীর মনযোগ আর ধীর স্থির চিন্তা ভাবনা-ই বলে দেয় বংশ পরম্পরায় পাওয়া রিয়েলস্টেড ব্যাবসার কান্ডারির দ্বায়িত্ব খানা বেশ ঘটা করেই পালন করছে সে। বিগত বছর গুলোর শেয়ার কেনাবেচার রৈখিক চার্টের উর্ধ্বগতি তার দৃষ্টান্ত প্রমান।
বছর শেষ হওয়ার আগেই এশিয়ার সবগুলো টুরিস্ট স্পটে জেকে গ্রুপের টপনোচ হোটেল গুলোর ব্যাপক প্রসারন ঘটাতে মরিয়া ক্রীতিক। পরিকল্পনা ঠিক ঠাক, এবার ইনভেস্টমেন্টের পালা। আপাতত কাজের চাপে নাজেহাল সে, বুদ হয়ে আছে নানান জটিলতায়।
—পাপাআআআ।
ঘুণপোকার মতো জটিলতা যখন কুটকুট করছিল মস্তিষ্কে, ঠিক সেসময় চিকন আহ্লাদী এক শিশুসুলভ আওয়াজে প্রশান্তির শীতল স্রোত বয়ে গেলো অন্তরে। সচকিত হলো মস্তিষ্ক, ল্যাপটপের মাঝে ডুবে থাকা কৃষ্ণগহ্বর তুলে দৃষ্টিপাত করলো সম্মুখে।
দেখলো, ছোট্ট তুলতুলে পা ফেলে তার নিকট এগিয়ে আসছে এক অর্পার্থিব অস্তিত্ব। জায়ান ক্রীতিকের অংশ সে। পরপরই ডেস্ক ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে খানিক এগিয়ে এসে এক হাঁটু ভেঙে বসলো মেঝেতে, অতঃপর দু’হাত বাড়িয়ে অতি আহ্লাদী স্বরে ডাকলো নিজের অংশ কে,
— মামনী।
বাক্যটুকু বের হতেই চিরচেনা গম্ভীর অভিব্যক্তি মুছে গিয়ে ঠোঁটের আগায় খেলে গেলো এক চিলতে নরম খুশি। তার সামান্যতম আহ্বানে বিশ্ব জয়ের খুশিতে ঢেউ তুললো বিপরীত পক্ষ, খিলখিল হাসির ঝঙ্কারে ভরিয়ে তুললো চিফ ডিরেক্টর অব জেকে গ্রুপ মি. জায়ান ক্রীতিকের বৃহদাকার অফিস কামরা খানা।
মেয়ের খুশিতে অভিভূত হয়ে ফের নতুন উদ্যমে ডেকে ওঠে ক্রীতিক,
— মামনী কাম, পাপা ডাকছে তোমায়, কাম হিয়ার।
আর এক মূহুর্ত ও বিলম্ব নয়। তৎক্ষনাৎ অপটু পায়ে ছন্দ তুললো এলোমেলো নাজুক গতিবিধি। একছুটে গিয়ে পাপার গলা জড়িয়ে ধরে কিয়ারা। বড্ড আদুরে মোলায়েম স্বরে ডেকে ওঠে,
— পাপাআআআ।
— জি মা।
মেয়ের প্রত্যুত্তরে কণ্ঠস্বর খাদে নামায় ক্রীতিক। কিয়ারা বলে,
— কিয়ারা মিচ করেচে তোমাকে।
— একটু আগেই তো পাপা চাইল্ড কেয়ারে ড্রপ করে দিয়ে এসেছি তোমাকে। তাহলে মিস কেন?
ছোট্ট তুলতুলে হাতে ওর পাপার কলারের আস্তিন নিয়ে খেলা করছে কিয়ারা, সেভাবেই ভবঘুরে হয়ে ঠোঁট উল্টে মাথা ঝাঁকালো সে। মেয়ের কর্মকান্ডে স্মিত হাসির রেখা ফুটলো সুদর্শন গুরুগম্ভীর বদনে। মনেমনে ভাবলো অরুর কথা, মেয়ের ছোট ছোট অভ্যেস তার মায়ের মতই হয়েছে। এই যেমন অরুও কাছে এলে তার কলারের আস্তিন কিংবা শার্টের বোতাম নিয়ে বেখেয়ালে ব্যস্ত হয়ে পরে, মেয়ে ও হয়েছে তাই। ক্রীতিক ভাবনায় বুদ , এরই মাঝে পুনরাবৃত্তি ঘটে সরু আদুরে কণ্ঠের,
— পত্যয় আঙ্কেল নিয়ে এলো।
— অনুমতি কে দিলো?
— মাম্মাম।
— তোমার মাম্মাম কোথায়?
— অপিসে।
দীর্ঘশ্বাস ফেললে ক্রীতিক, চিবুকে তর্জনী বুলিয়ে অস্পষ্ট আওয়াজে আওড়ালো,
— এতোদিন পর তাহলে ম্যাডামের অফিসে আসার মুড হলো! আজ তোর খবর আছে রে অরু।
ইন্টার্নির নাম করে স্বয়ং স্বামীর অফিসে প্রতিদিন ফাঁকিবাজি করাই যেন অরুর নিত্যদিনের অভ্যাস। ওর ভালো লাগেনা অফিসে যেতে তবুও যায়।কারণ ক্রীতিক সাফসাফ জানিয়ে দিয়েছে, রেগুলার এমপ্লয়িদের মতো প্রতিদিন নয়টা ছয়টা অফিস করলে তবেই তাকে এক্সপেরিয়েন্স সার্টিফিকেট দেওয়া হবে। নইলে কোনোদিন না।
বেচারি অরু, বড়লোক বিলিয়নিয়র স্বামীর কোটি টাকার বিজনেস দিয়ে দু’টাকার লাভ ও হলো না তার। সে প্রতিটা দিন হাজারটা ছুঁতো দেখিয়েও এক বিন্দু টলাতে পারেনি তার কোল্ডব্লাড স্বামীটাকে। বরং উল্টো বেড়েছে ফরমায়েশ, কাজের চাপ তার পাশাপাশি নির্ঘুম রাতের অসহনীয় পাগলামি।
এই লোক রাতে ঘুমায় না, অরুকেও ঘুমাতে দেয়না, ভালোবাসার তাড়নায় ক্লান্ত বানিয়ে তবেই ছাড়ে। অরু নাস্তানাবুদ হয়ে অফিস টফিস ঠিকেয় তুলে সারাদিন বিছানায় পরে ঘুমায়, এদিকে ক্রীতিক ঠিকই চনমনে এক্টিভিটি নিয়ে নিজের কাজে বেরোয়। অরু ভেবে পায়না, ক্রীতিক কি আদৌও কখনো কোনো কাজে ক্লান্ত হয়? হয়েছিল বোধ হয়,ঠিক মনে নেই অরুর। আজ থেকে বেশ কিছু বছর আগে কোনো এক ঝড়ের রাতে। নির্জন রাস্তা, প্রকাণ্ড ঝড়ো হাওয়া, এলোমেলো বাতাসে উত্তাল ধরিত্রী, তারই মাঝে স্থির গাড়ির অভ্যন্তরে দুটো অস্থির প্রাণ। কেউ কারোও থেকে আলাদা নয়, বরং একটু বেশিই নিকটস্থ তাদের দেহাংশের অস্তিত্ব। সেদিন বোধ হয় ক্রীতিক বেশিই অসুস্থ ছিল, হতে পারে কড়া ডোজের এ্যান্টিভায়োটিক, কেমন মাতাল মাতাল করছিল অরুকে কাছে পেয়ে। সেদিনের পাগলামো গুলো ভেবে অরু হাসে, সেই হাসিতে প্রজ্জলিত হয়ে ওঠে তার কোমল মুখাবয়ব, সহসা ভয়ডর হটিয়ে প্রবেশ করে ক্রীতিকের কেভিনে। স্বামী তার ফাইলে মনোযোগী। মেয়েটা ওপাশের প্লে গ্রাউন্ডে খেলছে,ফলস্বরূপ এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে দু’হাতে ক্রীতিক গ্রীবাদেশ প্যাঁচিয়ে গালে গাল স্পর্শ করে গান ধরলো অরু,
” তোমায় দেখে মনের ভেতর জাগলো ইমোশন
আমি প্রেমে পরে গেছি ওগো,
ওগো জেন্ট্যালম্যান।”
তৎক্ষনাৎ কপাল গোছালো ক্রীতিক, বউয়ের পানে তীর্যক চাহনি নিক্ষেপ করে বললো,
— জেন্ট্যাল! আমাকে বলছিস?
অবুঝ শিশুর মতো উপর নিচে মাথা দোলালো অরু। এবার ব্যঙ্গাত্বক স্বরে ফিচেল হাসলো ক্রীতিক, বললো,
— মাথার স্ক্রু ঢিলা হয়ে গেছে, তাই জেন্ট্যাল মনে হচ্ছে। সারাক্ষণ তো অসভ্য বলে ডাকিস, আমিতো মাঝে মধ্যে ভুলেই যাই আমার নামটা আসলে কি, ক্রীতিক নাকি অসভ্য!
কথা শেষে ঠোঁট উল্টালো সে। অচিরেই তেতে উঠলো অরু, ক্রীতিককে ছেড়ে দূরে গিয়ে দাঁড়ায় অভিমানে। ভাজা বেগুনের মতো জ্বলে উঠে বলে,
— আপনার সমস্যা কি? এভাবে গায়ে পরে সেধেসেধে ঝগড়া কেন করছেন? দেখতে পারছেন না রোমান্টিক মুডে আছি? নাকি এখন আর ভালো লাগেনা আমায়।
ক্রীতিকের চোখের গম্ভীরতা স্পষ্ট দৃশ্যমান। কণ্ঠেও বেশ কঠোরতা টানলো সে। ভারিক্কি আওয়াজে বললো,
— গত সপ্তাহে কয়দিন অফিস মিস দিয়েছিস?
— চা..চারদিন।
আমতা আমতা করে জবাব দিলো অরু।
— রিজন?
ফের প্রশ্ন, অরু জানালো,
— আপনি ভালোই করেই জানেন।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো ক্রীতিক, বললো,
— তুই যেটার কথা বোঝাতে চাইছিস, সেটা কখনোই অফিস মিস দেওয়ার কারণ হতে পারেনা, পৃথিবীর সকল দম্পতিকেই এ ধরনের নির্ঘুম রাতের মুখোমুখি হতে হয়। ইভেন আমিও তোর সঙ্গে রাত জেগেছি, কষ্ট নিশ্চয়ই আমার কম নয়, কই আমি তো অফিস মিস করিনা কখনোই।
আড়ালে মুখ ভ্যাঙালো অরু,চিবিয়ে চিবিয়ে বিড়বিড়ালো,
— কত গর্ব করে বলছে, অসভ্য একটা।
রাগ তখনও আয়ত্তে, তবে ক্রীতিকের বোধ হয় সেটা সহ্য হলোনা, অরুর রাগের মাত্রাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে তুলে দিতে একটু পরেই এনে হাজির করলো একজন কে। অফিস সহকারী হবে বোধ হয়, তার দু’হাত ভর্তি হয়ে আছে ফাইলের স্তূপে। সেই স্তূপাকৃতির ফাইল গুলো দেখিয়ে ক্রীতিক বললো,
— চারদিন ধরে আপনার কাজ পেন্ডিং হয়ে আছে ম্যাডাম। আপাতত রংঢং বাদ দিয়ে সেগুলো সলভ করুন ।
ফাইলের স্তূপ দেখা মাত্রই চোখ কপালে উঠে গেলো অরুর। ভারী করুন স্বরে বলে উঠলো,
— তুমি আমাকে দিয়ে এত্তোগুলো কাজ করাবে কিয়ারার পাপা! আমি যে তোমার থেকে অনেক ছোট সেটা ভুলে গেলে?
মুখের সামনে ফাইল তুললো ক্রীতিক, যেন সে কিছুই শুনতে পারছে না, তেমন করেই ইজিচেয়ারটাতে হেলেদুলে বললো,
— তুমি বলে লাভ নেই, আমি টলছি না।
ব্যাস, সঙ্গে সঙ্গে রাগের সপ্তম শিয়রে পৌঁছালো রমণী। সামনে বসা স্বামী রুপি বসের উপর বিরক্ত হয়ে কটমট করে ছুড়লো ঝা্রি ,
— অসভ্য, নোংরা, বদমাশ লোক।আপনি করুন আপনার কাজ। একাই তুলুন আপনার ফাইল। আমি কিচ্ছু পারবো না।
কথা কটা বলে কিয়ারার নিকট এগিয়ে গেলো অরু। হাতের খেলনা গুলো সরিয়ে ওকে কোলে তুলে হাঁটা দিতেই, ঠোঁট ফোলালো কিয়ারা। বড্ড অভিমানে কণ্ঠনালি ক্ষীণ হয়ে এসেছে তার। ডেস্কে বসা পাপার পানে টলমলে চাহনি নিক্ষেপ করে মেয়েটা বলতে লাগলো,
— আমি পাপার কাচে থাকবো, একানে খেলবো, কোতায় যাচ্চো মাম্মাম।
— এখানে খেলতে হবেনা,তোমার পাপা আমায় বকেছে, সে চূড়ান্ত পঁচা লোক। তার সঙ্গে কাট্টি।তুমি হলে মাম্মার লক্ষী বাচ্চা, তাই মাম্মার কাছে থাকবে। বুঝেছো?
মেয়েকে ভুলভাল বুঝিয়ে অবশেষে রাগে গজগজ করতে করতে ক্রীতিকের অফিস কক্ষ ত্যাগ করে অরু। ওদিকে নিজের শখের রমণীদের যাওয়ার পানে চেয়ে নিরবে নিঃশ্বাস ছেড়ে ফের কাজে মন দিলো ক্রীতিক।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। গোধূলির রক্তিম রঙে ছেয়ে আছে সুবিস্তীর্ণ আকাশ। টিন্ডেড জানালার এপাশ থেকে সেদিকেই এক দৃষ্টে চেয়ে আছে অরু। মনটা তার ভালো নেই। বিয়ের এতোগুলো বছর পরেও স্বামীর তরফ থেকে এইটুকু অবহেলাও সহ্য হয়না অন্তরে। সেখানে কিনা অরু তখন রাগ করে বেড়িয়ে এলো, তবুও একটাবার পিছু ডাকলো না ক্রীতিক? কেন! কেন! কেন! কেন মানুষটাকে আজও বোঝেনা অরু? এই মানুষটাকে বুঝতে বুঝতে বোধ হয় ওর সারাজীবনটাই পার হয়ে যাবে।
অরু ভাবনায় বুদ, ঠিক তখনই কক্ষের সবাই ডেস্ক ছেড়ে দাঁড়িয়ে পরলো একযোগে। সকলের তাড়াহুড়োয় দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে অরু নিজেও হুড়মুড়িয়ে দাঁড়ালো একপ্রকার। সম্মুখে দৃষ্টি ফেলতেই দেখলো তার মাত্রাতিরিক্ত সুদর্শন স্বামীটাকে। ফর্মাল শার্টের কনুই অবধি গোটানো হাতা আর এলোমেলো টাইয়ে ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে তাকে। হাতে ম্যাকবুক , পরনে কেবল ওয়েস্ট কোট, ব্লেজার খানা পেছনে একজন বডিগার্ড নিয়ে হাটছে, প্রত্যয় ও রয়েছে তার সঙ্গে সঙ্গে।
কক্ষ অতিক্রম করার পুরোটা মূহুর্ত অরুর পানে নিস্প্রভ দৃষ্টে চেয়ে ছিল ক্রীতিক। রহস্যে ঘেরা মাতাল মাতাল সেই চাহনি। যেন ঠোঁট নয় চোখ দিয়ে হাসছে সে। কিছু একটা বোঝাতে চেয়েছিল বোধ হয়, অরু বোঝেনি। আপাতত বোঝার চেষ্টা চালাচ্ছে খুব, তন্মধ্যে পেছন থেকে এ্যানা ডেকে উঠলো ওকে,
— হেই ম্যাম।
— প্লিজ কল মি অরু।
মিষ্টি হেসে প্রত্যুত্তর করলো মেয়েটা,
— ক্যান আই শো ইউ সামথিং প্লিজ?
— ইয়াহ, শিয়ওর।
এরপরের বাক্যলাপ গুলো ইংরেজিতেই চলতে লাগলো।
মেয়েটা ক্রীতিকের একটা ছবি দেখালো অরুকে, যেটা মাত্রই তুলেছে সে। অরু হতবাক হলো। বিস্ময়ে চোখ উঁচিয়ে শুধালো,
— কি বোঝাতে চাইছো?
এ্যানা পুলকিত। চোখের মাঝে একরাশ উচ্ছাস জড়ো করে জানালো,
— জেকে বসের এই ছবিটা আমি মাত্রই তুলেছি, এখান থেকে পাস করে যাওয়ার সময় সে তোমার দিকে কেমন অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে ছিল। তাই কৌতুহল বশত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সির কাছে জানতে চাইলাম তার এই চাহনির মানে কি? বাকিটা তুমি নিজেই দেখে নাও।
কথা শেষ করে অরুর পানে আইপ্যাড বাড়িয়ে দিলো এ্যানা। ঠোঁটে তার লজ্জা মিশ্রিত নিগূঢ় হাসি। কোনো কিছু না বুঝতে পেরে স্ক্রিনে উঁকি দিলো অরু, সেখানে বড়বড় ইংরেজি অক্ষরে ক্রীতিকের এই অদ্ভুত মাতাল চাহনির মানে লেখা রয়েছে,
He is tired, but he know’s he is going to have you tonight.
বাক্যকটা পড়ে নিঃশব্দে চোখ খিচঁলো অরু। এ্যানার পানে অবিশ্বাস্য চাহনি নিক্ষেপ করে বললো,
— ছিঃ আজকাল এআই ও দেখি অশ্লীল হয়ে যাচ্ছে।
— অশ্লীল নয়, ওরা যা সত্যি সেটাই বলে। আই থিংক খুব শীঘ্রই তোমার সঙ্গে জেকে বসের সাক্ষাৎ হবে।
— তুমি আর তোমার এআই দু’টোরই রিপেয়ার প্রয়োজন,এবার সরো তো।
কোনোমতে ভুজুংভাজুং বলে এ্যানার সামনে থেকে কেটে পরলো অরু। তবে মনেমনে লজ্জা পেলো ভীষণ। এআই ব্যাটা ভুল কিছু বলেনি, অরু নিজেও জানে ক্রীতিক কখন এমন করে তাকায়। তবে আজ এই তাকানোতে কিচ্ছু আসে যায়না ওর, রাগে বো’ম হয়ে আছে মাথা, যখন তখন ফেটে পরলো বলে।
ওয়াশ রুমের বিশালাকার লুকিং মিররে চেয়ে
টাচআপ করায় ব্যস্ত অরু। যেহেতু অফিস টাইম সেহেতু পরিপাটি দেখতে লাগা আবশ্যক। ও খুব বেশি সাজে না, ক্রীতিক সাজতে দেয়না ওকে। বাড়িতে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দু’জন একসাথে রেডি হতে গেলে লোকটা সবসময় ওর চোয়াল চেপে ধরে কঠোর আদেশ জারি করে,
— এই সাদাসিধে স্নিগ্ধ মুখটা যাতে কখনো মেকআপের আড়ালে ঢাকা না পরে। ইউ নো, আটা ময়দা কিংবা লিপস্টিক কোনোটাই খাওয়ার শখ নেই আমার।
নিজের স্নিগ্ধ সরল মুখটাকে আয়নার প্রতিবিম্বে দেখে বিরক্ত হয় অরু। ক্রীতিকের উপর অভিমান ফলাতে ব্যাগ থেকে একটা গাঢ় লাল লিপস্টিক বের করে লাগাতে শুরু করে অধর মাঝে। দেখতে মোটেও মন্দ লাগছে না, সহসা আয়েশ করে এপাশ-ওপাশ ঘুরিয়ে বেশ মোটা প্রলেপে আস্তরিত করতে লাগলো নিজের ঠোঁট।
ঠিক তখনই কোথা থেকে যেন এক জোড়া পুরুষালি বলিষ্ঠ হাত এসে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিলো ওর লতানো কটিদেশ। স্যান্ডাল উডের মাদকীয় সুঘ্রাণে শিরশির করে উঠলো সর্বাঙ্গ। স্পর্শের প্রগাঢ়তায় মিয়িয়ে যেতে চাইছে অন্তর। অরু ভালো করেই জানে মানুষটা কে। কারই বা এতো সাহস হবে। তবুও না বোঝার ভান ধরে রইলো। বিস্মিত হয়ে বললো,
— কে!
— ইট’স মি ইউওর ম্যান। উফসস! স্যরি জেন্ট্যাল ম্যান।
এবারে আয়নার প্রতিবিম্বে অরুর পাশাপাশি ভেসে উঠলো আরেক সুদর্শনের অবয়ব। ওর কাঁধেই চিবুক ঠেকিয়েছে সে। অস্থির হয়ে ঘ্রাণ নিচ্ছে ওর শরীরের। ফের বিদ্যুৎস্পৃষ্ট অনুভূতির তোড়ে গুটিয়ে গেলো অরু। দু’হাতের আঙুল দ্বারা খামচে ধরলো উরুর দিকের জামাটা, ভেতরের অস্থিরতার দাবানল টাকে ধামাচাপা দিয়ে, মেকি রাগ দেখিয়ে বললো,
— কি চাই, বস হয়ে এমপ্লয়ির গলায় মুখ ডুবিয়ে রেখেছেন লজ্জা করেনা?
— হার্টবিট!
পৃথিবীর সবটুকু মোহ ধরে রেখে ছোট্ট এই শব্দটা উচ্চারণ করলো ক্রীতিক। শীতল অথচ বিমত্ত হয়ে দু’হাতে স্পর্শ করলো প্রেয়শীর নরম তুলতুলে উদর। অধর ছোঁয়ালো রমণীর অনাবৃত পিঠের মাঝখানে, সেখানে আঁকিবুঁকি বিরাজমান। সহসা উন্মাদনা মাত্রা ছাড়ালো,শীতল স্পর্শ নিমেষেই পরিনত হলো স্ফুলিঙ্গে,নাজুক মেয়েটার সর্বাঙ্গে আগুন জ্বালাতে মোটেও দ্বিধা করলো না তারা, যেন প্রতিবারই প্রথমবারের সেই শিহরণ জাগিয়ে তোলে অন্তরে।খেই হারালো অরু,ভেঙেচুরে একাকার হয়ে দিশাহীন গলায় বললো,
— এমন কেন করছেন? আমি সহ্য করতে পারছি না। অস্থির লাগছে ভীষণ।
— লাগুক, আমি চাই আরও বেশি করে অস্থির লাগুক তোর।
— কিহ!
অরুর বলতে বাকি, তৎক্ষনাৎ ওর ঘাড়ের ফাঁকে আলতো কামড় বসালো ক্রীতিক। মৃদুস্বরে আর্তনাদ করলো অরু,
— আহহ, লাগলো।
ফের হাস্কি আওয়াজ ভেদ করলো কণ্ঠতালু,
— হুশশশ! হার্টবিট।
নিরবচ্ছিন্ন কক্ষ জুড়ে কেবল দুজন মানব মানবীর কাছের আসার প্রবনতা।
ক্রীতিক বাকি কথা বলবার আগেই ওপাশের ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়ে সরু গলায় চ্যাঁচিয়ে উঠলো কিয়ারা,
— পাপা তুমি মাম্মাম কে মারচো কেন?
সঙ্গে সঙ্গে দূরত্ব বাড়ালো ওরা । আস্তে করে আলাদা হয়ে গেলো দু’টো প্রাণ। নাজেহাল অরু হুড়মুড়িয়ে ওয়াশরুম ত্যাগ করলো তক্ষুনি। ক্রীতিক এগিয়ে গেলো মেয়ের নিকট। গোলগোল কৌতূহলী চোখ মেলে এদিকেই চেয়ে আছে অংশ তার। ক্রীতিক এগুতেই ফের প্রশ্ন করলো কিয়ারা,
— তকন বকোচো, আবার একন মেরেচো মাম্মাম কাঁদচে পাপা।
টলমলে বদনে কথাকটা বলতেই ঠোঁট ভেঙে কান্না শুরু করে দিলো কিয়ারা। মেয়ের কান্ডে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলো ক্রীতিক। হতচকিত দৃষ্টে মেয়ের পানে তাকিয়ে, ভীষণ অসহায় সুরে জানালো,
— আমি তোমার মাম্মাকে মারিনি পাপা।
— না মেরেচো, মাম্মা রাক করে চলে গেলো।
ফের চিৎকার করে কান্না। এদিকে ক্রীতিক পরেছে মহা মুশকিলে। না পারছে মেয়েকে বোঝাতে কিছু আর নাতো এমতাবস্থায় ওয়াশরুম থেকে বের হতে। বের হলেই নির্ঘাত এই মেয়ে জোরে জোরে বলবে,
— তুমি আমার মম্মাকে মে’রেচো।
তখন কি কোম্পানির চিফ ডিরেক্টর এর মানসম্মান থাকবে আদৌও?মনে হয় থাকবে না। বিনা অপরাধে বউ পেটানোর দ্বায় নিয়ে সারাজীবন ঘুরতে হবে তাকে , যার সাক্ষী স্বয়ং তার এক মাত্র কন্যা।
অগত্যা উপায়ন্তর না পেয়ে ওয়াশরুমে বসেই মেয়েকে কোলে তুলে নিলো ক্রীতিক। এদিক ওদিক হেঁটে হেঁটে কান্না থামানোর প্রয়াসে বারংবার কপালে চুমু খেতে খেতে বলতে লাগলো,
— কিয়ারা, আমার মা, কাঁদেনা বাবা, ভুল হয়ে গেছে পাপার। স্যরি বলছি, আর কক্ষনো মা”রবো না তোমার মাম্মাকে, প্লিজ কান্না থামাও, ওওওওওও।
অফিস টাইম শেষ হয়েছে বহুক্ষণ। পার্কিং লটে একাই দাঁড়িয়ে অরু। মেজাজ তার সপ্তমে। রাগের তোড়ে অপটু হাতে কালো মার্সিডিজে বারংবার কিল ঘুষি হাঁকাতে ব্যস্ত সে। গাড়ি চালাতে না পারার দুঃখে মনেমনে নিজেকেও মা”রছে দু’চার ঘাঁ।
একটু পরেই সেখানে এসে হাজির হয় ক্রীতিক। বুকের মাঝে তার ঘুমন্ত কিয়ারা। অরু মেয়েকে দেখা মাত্র অস্থির হতে চাইলো, পরপরই কি ভেবে যেন গুটিয়ে গেলো নির্লিপ্তে। গাড়ির গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ। ক্রীতিক প্রথমে আলগোছে গাড়িতে বসিয়ে দিলো ঘুমন্ত কিয়ারাকে। অতঃপর অরুর নিকট এগিয়ে এসে বললো,
— চল।
অরু গাল ফোলালো, অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে অভিমানী স্বরে বললো,
— যাবোনা আমি।
— না গেলে কোথায় থাকবি?
— এখানেই এই রাস্তায়।
— যদি তোর কিছু হয়ে যায়?
— হলে হোক, তাতে আপনার কি?
অরু বলতে বাকি, ঠেস দেওয়া অবস্থাতেই ওর দু’হাত গাড়ির সঙ্গে চেপে ধরতে দেরী হলোনা ক্রীতিকের। নির্বিকারে দাঁতে দাঁত পিষলো সে।হিমবাহের ন্যায় শীতল কন্ঠে বললো,
— কিয়ারা জায়ানের পাপা মি. জায়ান ক্রীতিক হয়ে আছি বলে এটা ভাবিস না যে আমি অররা জায়ানের অসভ্য ক্রীতিক চৌধুরী হতে ভুলে গিয়েছি। মনে রাখিস ওটাই আমার আসল রুপ।
অরু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, অপারগ কণ্ঠে শুধায়,
— কোথায় যাবো?
— যেখানে আমি নিয়ে যাবো।
বাক্য শেষ করে অরুকে ঠেলে গাড়িতে বসায় ক্রীতিক। অতঃপর কোথাও একটা কল করে জানায়,
— মেয়ে বায়না ধরেছে, সে আজ তার আর্থার ব্রাদারের সঙ্গে ঘুমাবে। কারন তার পাপা বউকে নিয়ে লেট নাইট ডেইটে যাচ্ছে ।
কল কেটে যেতেই কপাল কুঁচকে গেলো অরুর। কণ্ঠনালিতে বিস্ময় ধরে রেখে বলে,
— লেট নাইট ডেইট মানে? কোথায় নিয়ে যাবেন আপনি আমায়?
ক্রীতিক জবাব দেয়না, গাড়ির ক্ল্যাচারে পা দাবিয়ে, প্লে লিস্ট চেক করে একটা গান চালিয়ে দেয় শুধু।
Kya jane tu, Mere irade…
Le jaunga… Sasein chura ke
সঙ্গিন প্রনয়াসক্তি সারপ্রাইজ পর্ব ২
যেতে যেতে গভীর হয়ে আসে রাত। আঁধারে ঘুটঘুটে হয় অমানিশার আকাশ। গাড়ির মন্থর আলোয় খানিক বাদে বাদে মেয়ে আর তার মায়ের পানে নিগূঢ় দৃষ্টিপাত করে ক্রীতিক। অরু শুধায়,
— কি দেখছেন?
স্মিত হেসে হিসহিসিয়ে জবাব দেয় ক্রীতিক,
— আমার দুনিয়া।
সমাপ্ত
