রাগে অনুরাগে পর্ব ৩
সুহাসিনি ফাতেহা
”শাস্তি! কিসের শাস্তির কথা বলছেন স্যার ? আমি কি কোনো অন্যায় করেছি?”
তিতলির ভ্রু জোড়া কুঁচকানো। সপ্তদশীর পেল্লব মুখখানা এতটাই নিষ্পাপ যেন সে জীবনে কোনো ভুল করেই নি। ইতিমধ্যেই গত এক সাপ্তাহ ধরে করে আসা প্রত্যেক টা কুকর্মের কথা চোখের সামনে ভাসছে। ইশশ যদি স্যার জেনে যায় তাহলে কি হবে জীবনে ও এই ফারাজ খানকে সে মুখ দেখাতে পারবে। কত নাচতে নাচতেই না বলছিলো,
”আপনার নাট-বল্টু আদৌ ঠিক আছে কি-না সেটা পরীক্ষা করা দরকার! শিওর আপনি গোপন রোগের সমস্যায় ভুগছেন? ”
ইশশ তখন কিনা সে—- ! তিতলি মনে মনে আল্লাহ কে ডাকছে,
”আল্লাহ বাঁচাও! বেঁচে থাকতে আর জীবনেও এই ব্যাটাকে মেসেজ তো দূর তিতলি ফিরেও তাকাবে না। তার চেয়ে বড় ভয় যদি কলেজ থেকে বের করে দেয় তাহলে কি তার মান ইজ্জত থাকবে? পুরো কলেজে কত সুনাম নিয়ে হাঁটে সে। শিক্ষক, স্টুডেন্ট, সবার কাছে সে একজন নম্ন-ভদ্র স্টুডেন্ট! ভেতরে যে ভদ্র শয়তান সেটা কি আর কেউ জানে?’
তিতলির নিষ্পাপ মুখখানা দেখে ফারাজ খান চোখে হাসল বোধহয় ৷ আবার চেহারা কেমন গম্ভীর ও দেখাল। এই ফারাজ খানের এই এক সমস্যা। সে কি কখনো হাসতে পারে না।রাগ,জেদ,হাসি,কান্না,দুঃখ যেন তার গম্ভীর মুখের কাছে নিতান্তই হার মেনে যায়।
ফারাজ খানের দু পকেটে তখনো দুহাত গুঁজানো। অতঃপর ভ্রু কুঁচকে ধমকের সুরে বললেন,
” আপনি জানেন না আমার ক্লাসে মোবাইল হাতে নেওয়া নিষেধ! তারপর ও প্রতিদিন একই কাজ বারবার করছেন কেন? ” ফের বলল,
”এক্ষুনি কান ধরে উঠবস করুন বলছি না হলে কিন্তু আমি অন্য ব্যবস্থা করতে বাধ্য হবো! আপনার বাড়ি…..”
তিতলি এবার যেন কেঁদেই ফেলবে। তবে কাঁদলো না। সে তো কথায় কথায় ভ্যাঁ ভ্যাঁ করার মেয়ে না। সহসা একটা কু-বুদ্ধি মাথায় চেপে বসলো। তৎক্ষণাৎ কাঁদো কাঁদো মুখ করে জানাল,
—”স্যার আসলে…আসলে আমার খুব…”
ফারাজ খান এবার নড়েচড়ে দাড়ালেন। তীক্ষ্ণ নেত্রযুগল সরু হয়ে এলো কৌতুকে।
ভ্রু নাচিয়ে শুধালো,
”আপনার খুব কি?”
তিতলি কি বলবে বুঝতে পারছে না। বাঁচতে হলে যে তাকে এইটুকু বাহানা করতেই হবে। সে কি এত বোকা নাকি। সামান্য মোবাইল স্ক্রল করছে তাতে কি কান ধরে উঠবস করবে সে?
উঁহুম কখনো না, এবং না। —– তিতলি ফের শুধাল,
”আমার খুব ইমার্জেন্সি মানে …..”
”ইমার্জেন্সি ?”
তিতলির গোল মুখখানা লজ্জায় রক্তিম হয়ে গেলো যেমন। হাপুত্তাস করে বলেই ফেলল,
”আসলে এক না..নাম্বার! আমি আর বে..বেশিক্ষণ দাড়াতে পারবো না স্যার। ”
কথাটা বলে তিতলি চোখমুখ খিঁচে নিল পরক্ষনেই। লজ্জায় দুঃখে রীতিমতো দুঃখবোধের শেষ নেই। এক সেকেন্ড ও ব্যায় করতে চাইলো না। সামনে ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা যুবক কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই মোবাইলের কথা ভুলে চঞ্চল তিতলি দৌড়ে পালাতে চাইলো,
অমনি পেছন থেকে ভারী পুরুষালি গমগমে কণ্ঠ ভেসে এলো,
”এই মেয়ে! স্ট্যান্ড আপ!”
তিতলির ফ্যাকাশে মুখখানা চুপসে গেল পুরোদমে। গলা শুকিয়ে কাঠ হলো। লোকটা ভারী চালাক! যাকে বলে জেন্টেলম্যান! সিংহের খাঁচা থেকে বাঁচতে তাই ভালোই ভালোই চলে আসতে চাইলে ফের ফারাজ খানের ধমকের সুরে কেঁপে উঠলো তিতলি,
”এই মেয়ে আপনাকে দাড়াতে বলছি না আমি। কানে কি শুনছেন না?”
তিতলি তৎক্ষণাৎ অধরযুগল ভিজিয়ে একটু একটু পেছন ঘুরে তাকালো।
ফারাজ খানের পদযুগল হুট করেই এসে দাঁড়ালো মধ্যস্থে দাঁড়িয়ে থাকা তিতলির একদম মুখোমুখি। অতঃপর পকেট থেকে মোবাইল টা বের করে একপ্রকার তিতলির হাতে ধরিয়ে দিলেন,
হুকুম ছেড়ে বললেন,
”আপনাকে আমি লাস্ট ওয়ার্নিং দিলাম মিস তিতলি! নেক্সট টাইম থেকে এমন কাজ করবেন জাস্ট সাসপেন্স পাবেন! মাইন্ড ইট!
বলে তিতলির সামনে দিয়েই হেঁটে চলে যাচ্ছে একদম ভদ্র পুরুষের মতো। তিতলি স্বঃস্থির নিশ্বাস ফেললো। পরক্ষনেই চাহনিতে একপ্রকার রাগ, ক্ষোভ সব নিয়েই বাঁকা চোখে তাকিয়ে ফারাজের যাওয়া দেখল।
মুখ ভেঙ্গিয়ে বিদ্রুপ ভঙ্গিতে বললো,
“”আপনাকে আমি লাস্ট ওয়ার্নিং দিলাম মিস তিতলি! নেক্সট টাইম থেকে এমন কাজ করবেন জাস্ট সাসপেন্স পাবেন!” মাইন্ড ইট! ”
এহ্যাঁ কলেজটা মনে হচ্ছে কিনে নিয়েছে ? যত্তসব ঢং! বেশি এটিটিউড দেখায়। মনে হয় যেন কোন দেশের কোন বিখ্যাত প্রেসিডেন্ট। ”
সেদিনের পর অসুস্থতার বাহানা দিয়ে টানা তিনদিন কলেজে যায় নি তিতলি। এমনকি ফেক আইডিটা ও ডিএক্টিভ করে রেখেছে। দুপুরের খাবার খেয়ে লম্বা একটা ঘুম দিয়ে যখন উঠল তখন প্রায় সন্ধ্যা। ঠিক তখনই তিতলির মা আলেয়া শেখ তিতলির রুমে এলেন। মুহুর্তের মধ্যেই তাড়াহুড়ো করে বললেন,
“ তোকে কখন থেকে ডাকছি তিতলি? তুষার তোকে ডাকছে তাড়াতাড়ি যা।”
তিতলি ঘুমঘুম চোখে জানাল,
‘”যাচ্ছি যাচ্ছি!”
—– মেয়ের থেকে উত্তর পেয়ে তিতলির মা চলে গেল।
তিতলি ভাইকে ভীষন ভয় পায়। তিতলির মনে হয় দুনিয়ার যত গম্ভীর লোকের সাথে তার বসবাস। কলেজে, ঘরে,বাহিরে, । সপ্তাদশীর মনে কুঁ ডাকছে। সে কি কোনো ঝামেলা করলো? না হলে তো ভাইয়া এই সময় বাহিরে থাকার কথা। সে সময় বাড়িতে এসে তাকে ডাকছে। তিতলি বিছানা থেকে নেমে পরনে ওড়না জড়িয়ে নিলো। অতঃপর বের হলো গন্তব্য ভাইয়ের রুম।
তিতলি ভাইয়ের রুমের দরজায় দাড়িয়ে উঁকিঝুঁকি দিতে থাকলো। ভয়ে সপ্তাদশীর হৃদয় কাঁপছে।
তৎক্ষণাৎ রুমের ভেতর থেকে ভেসে এলো,
”চো*রের মতো উঁকি না মেরে রুমে আয়।”
তিতলি মুখ ফুঁলিয়ে ফেলল যেন। সে চো*রের মতো উঁকিঝুঁকি মারছিল! চুপচাপ রুমে ডুকলো।
তুষার অফিস থেকে এসেছে সবে। এসেই মাকে বলল তিতলি কে ডেকে দিতে। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে ওয়াড্রব থেকে কি জামা-কাপড় বের করতে করতে বলল,
”কয়দিন কলেজে যাচ্ছিস না কেন?”
”আমার যে ডাইরিয়া সেটা তুমি জানো না?”
তুষার বোনের কথা শুনে ভীষন কষ্টে হাসি আটকিয়ে রাখলো। বলল,
”ডাইরিয়া হলে এত খাস কিভাবে?”
তিতলি মুখের আদল বদলে গেলো তখনই। বলল,
” ডাইরিয়া হলে খাওয়া নিষেধ এমনটা কোথায় ও লেখা আছে?”
বোনের কথায় তুষার হাসলো। বড্ড আদরের একটামাত্র বোন। তবে সামনে বেশি লুতুপুতু করা ওর ডিকশনারিতে নেই। পরে আদরে বাঁদর হতে সময় লাগবে না।
তুষার একটা হলুদ পাঞ্জাবি বের করে রাখলো নিজের জন্য। আর তিতলির জন্য বিছানার উপর থেকে শপিং ব্যাগ দেখিয়ে বললো,
”এগুলো নিয়ে যা। বন্ধুর বোনের বিয়ের ইনভাইটশেন পড়েছে। সেখানে যাবো। সাতটার দিকে রেডি হয়ে থাকবি?”
তিতলির যেন তর সইছে না। সে এতক্ষণ যাবত বিছানায় রাখা শপিং ব্যাগটায় দেখছিল। ফাঁকফতর দিয়ে ভালোই দেখা যাচ্ছিলো শাড়িটা। দাড়ুন। তিতলি বলবে বলবে ভাবছিলো,
শাড়িটা কি আমার জন্য এনেছো ভাইয়া?
রাগে অনুরাগে পর্ব ২
তার আগেই আদেশ ফেলো তাই তিতলি আর দেরি না করে শপিং ব্যাগ টা নিয়ে রুমে চলে গেলো। আজকে সে হলুদে খুব সুন্দর করে সাঁজবে। এমনিতেই বিয়ে বাড়িতে পাঁচ দশটা পেছনে বাঁদরের মতো পরেই থাকে? তাতে তিতলির কি? বরং সে এটা ভীষন উপভোগ করে।’
