সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৭
জাবিন ফোরকান
তোমার জন্য আমার খুব দুঃখ বিলাসের ইচ্ছা
অথচ দম ফেলার ফুরসতও দেয়না আস্তাকুঁড় শহরটা
এই শহরে অর্থের বিনিময়ে মগজ যে হয় বিক্রি
সেথায় আমি ব্যাস্ততার দামে এক বিন্দু সুখ কিনে ফিরি~
কাউন্টারের পিছনে দাঁড়িয়ে সামনের ক্যাশ হিসাবের ডায়েরীর পাতায় কি সব কাটাকুটি করে লিখেছি আমি নিজেও জানিনা। যেন আমার অন্তর চলছে আপন মর্জিতে। অন্তরের কাছে আমার আর আদেশ চলেনা। একলা জীবনটায় এখন কাউকে স্মরণ করার জন্যও পর্যাপ্ত সময় মেলেনা।
পেরিয়েছে প্রায় সুদীর্ঘ দুইটি সপ্তাহ। চোদ্দ দিনের হিসাবটা আমার জীবনে চোদ্দ বছরের সমতুল্য। এই চোদ্দ দিন আমায় একা বাঁচতে শিখিয়েছে। কাজের বাহানায় অন্তরকে ভুলিয়ে রাখতে শিখিয়েছে। এই চোদ্দ দিন আমায় বুঝি সারাটা জীবনের এক অমোঘ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেছে। মীরার উপস্থিতিতে অভ্যস্থ হয়ে যাওয়ায় প্রথম কয়েকটা দিন বেশ কষ্ট হয়েছে। অতঃপর বুঝি সেই কষ্টের উপর সময় শীতলতার প্রলেপ দিয়েছে। বান্ধবীর চাওয়া অনুযায়ী আমি তার খোঁজ করিনি। প্রত্যেক মানুষের জীবনেই হয়ত এমন একটা পর্যায় আসে, যা তাকে সবার থেকে আলাদা থাকতে শেখায়। জগতের কোনো শক্তিই তাকে টেনে তুলতে পারেনা যতক্ষণ না সে নিজের মনকে নিজে বোঝায়। মীরা হয়ত ঠিক তেমন কোনো পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই যাচ্ছে। তাকে বাঁচাতে পারবে একমাত্র সেই, আর কেউ নয়।
“ম্যাম?”
ডাকটা শুনে ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এলাম। নিজের লিখা ছোট্ট বেহিসাবী পংক্তিগুলো কলমের কালিতে যাচ্ছেতাই ভাবে এলোমেলো করে কেটে দিয়ে
ঠাস করে ডায়েরীটা বন্ধ করে ফেললাম। সামনে চেয়ে দেখলাম ক্যাফেতে পার্ট টাইম করা কলেজ পড়ুয়া ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে। ক্যাফের ইউনিফর্ম পরনে তার। আমি তাকাতেই সে হড়বড় করে বলল,
“দুজন ইনফ্লুয়েন্সার হম্বিতম্বি করছে।”
সুচারু নয়ন তুলে গেটের দিকে তাকালাম। প্রবেশ পথের ওপাশে দুজনকে অপেক্ষমাণ দেখা যাচ্ছে, হাতে দামী ক্যামেরা, মিনি মাইক্রোফোন। কনটেন্টের জন্য এসেছে, রিভিউ করবে সন্দেহ নেই। এই মুহূর্তে তাদের আটকে রেখেছে আমার ক্যাফের ছেলেরা। একটি নিঃশ্বাস ফেলে কাউন্টার ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।
“তুমি এখানে থাকো কিছুক্ষণ, আমি দেখছি।”
স্নিকার্স পরিহিত পায়ে গটগট করে হেঁটে গেলাম। পরনের কার্ডিগানের পকেটে বেশ আয়েশী ভঙ্গিতে দুহাত গুঁজে খানিক ভাব নিয়ে দরজার কাছে দাঁড়াতেই ক্যাফের ছেলেরা দরজা খুলে দিলো আমার জন্য। বাইরে এক পা রাখলাম, মুখোমুখি হলাম ক্যামেরা আর মাইক্রোফোনের।
“পিৎজা স্টেশনের এটা কেমন নিয়ম? ভেতরে ঢুকতে হলে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হবে? বাপের জন্মে আমরা এমন নিয়ম দেখিনি। এসব কি? জনপ্রিয়তা পেয়ে কি আপনার দেমাগ বেড়ে গিয়েছে সাবিন?”
কড়া গলায় বলতে থাকা ওয়েস্টার্ন পড়া মেয়েটাকে আপাদমস্তক দেখলাম। আমার দৃষ্টি পাড়ার আন্টিদের মতন তাকে পরখ করল। বিতৃষ্ণা ফুটিয়ে জিভে এমন শব্দ তুললাম যেন তার বেশভূষা পছন্দ হয়নি আমার। মেয়েটি বিব্রতবোধ করল। তার সঙ্গে থাকা অপরজন খেঁকিয়ে উঠল,
“টাকা দিয়ে কোন কাস্টমার ক্যাফেতে খেতে ঢোকে? এটা কি অ্যামিউজমেন্ট পার্ক?”
হাসলাম, বিচক্ষণতার হাসি।
“ঠিক বলেছেন। টাকা দিয়ে কোনো কাস্টমার ক্যাফেতে ঢোকে না। বরং খাওয়ার পর টাকা দেয়। কিন্তু আপনারা কাস্টমার না, ইনফ্লুয়েঞ্জা…উপস! মাই ব্যাড, ইনফ্লুয়েন্সার। আর খাওয়ার পরেও টাকা দেন না, ফ্রী সার্ভিস চান।”
আমার কথায় দুজন জমে গেল। একে অপরের দিকে তাকাল। পিছনে ততক্ষণে আরো কয়েকজন এসে ভীড় করেছে। তাদের হাতেও মোবাইল ফোন, ভিডিও করছে সন্দেহ নেই। সে করুক, আমার তাতে বিশেষ কিছু যায় আসেনা।
“সে আমরা তো ফ্রী সার্ভিস এমনি এমনি নেই না। এর বিনিময়ে প্রচারও তো করি! আপনার ক্যাফে আমরাই কন্টেন্ট বানিয়ে, রিভিউ দিয়ে ভাইরাল করব। দিস ইয বিজনেস।”
মেয়েটি বলতেই তীর্যক হাসলাম। ঝুঁকে এসে বললাম,
“একদম ঠিক, বিজনেস। যেমন আপনারা করেন, তেমন আমিও করছি। আমার ক্যাফে নিয়ে কন্টেন্ট বানিয়ে ভিউ কামাবেন। তার কিছুটা ভাগ তো আমারও প্রাপ্য বলুন? আর রইলো প্রচারের ব্যাপার, আমি এমনিতেই ভাইরাল, আপনাদের ভাইরাল করার প্রয়োজন নেই। বরং আমার ভাইরালিটি যে ব্যবহার করতে চাচ্ছেন, সেটার দাম তো দিতেই হবে!”
“এই…সাবিন আপনি…”
উল্টো ঘুরে গেলাম। আর কানেও তুললাম না কারো কথা। সবাই ভিডিও এবং গুঞ্জনে ব্যস্ত। আমি প্রভাবশালী এক কন্ঠে জানালাম,
“পাঁচ হাজার দিয়ে ঢুকবেন, বিল দিয়ে খাওয়া দাওয়া করবেন। তারপর যতো ইচ্ছা ভিডিও দিয়ে যা মন চায় রিভিউ দিন সোশ্যাল মিডিয়ায়, আমার কিচ্ছু যায় আসেনা। এছাড়া কোনো ইনফ্লুয়েঞ্জাকে ঢুকতে দিবিনা তোরা।”
নিজের ছেলেদের চোখের ইশারায় সাবধান করে ক্যাফের ভেতরে ঢুকে পড়লাম। মাথা ধরিয়ে দেয় এমন মানুষজন বাবা! ক্যাফেতে আসবে, খাবে, আড্ডা দেবে। তা না! সারাক্ষণ ক্যামেরা ঘুরিয়ে কন্টেন্ট কন্টেন্ট করে! একদম দেখতে পারিনা এদের আমি আর! সাধারণ কাস্টমারদের আরো ভোগান্তি হয় এদের কারণে।
কাউন্টারে ফিরে এলাম আমি। আজ আবহাওয়া গুমোট বেঁধে আছে। যেন বৃষ্টি হবে। অথচ এখন পুরোদস্তুর শীতকাল। এর মাঝে বর্ষণের লক্ষণ অদ্ভূত হলেও মনোরম। নীলচে আকাশ ঘেরা কালো কালো মেঘে মৃদুমন্থর গর্জন। আবহাওয়ার যেন মন খারাপ।
এমন বৃষ্টির দিনে জায়দান আমার জন্য অনলাইন থেকে তেলেভাজা পকোড়া অর্ডার করে দিত। মীরা রাঁধতো নিজের স্পেশাল নরম খিচুড়ি আর বেগুনভাঁজা। ড্যাড উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলতো সবসময় শরীরে চাদর জড়িয়ে রাখতে, যেন বৃষ্টির ঠান্ডা আমার গায়ে না লাগে।
এখন কেউ আমাকে কিছুই বলেনা। কেউ আমার জন্য আর কিছু করেনা।
নাহ্! নিজের মাথায় একটা চাপড় দিলাম। বারংবার একা ভাবনার সময় পেলেই আমি আমার জীবনে না পাওয়া মানুষগুলোর কথা ভাবতে শুরু করি। কাজের কথা ভাবতে শুরু করলাম। বিশেষ কিছু করার নেই দেখে বুক কর্ণারের টেবিলের দিকে এগোলাম। আজ কাস্টমারের চাপ তুলনামূলক কম। এদিকটায় কেউ এসে বসেনি এখনো। একটা কাপড় দিয়ে টেবিল মুছে নিতে লাগলাম। ক্যাফে আজ তাড়াতাড়ি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শরীরটা বিশেষ ভালো লাগছেনা। শরীরের সঙ্গে নাকি মনের যোগসাজশ আছে। ব্যাপারটা সেই কারণে হতে পারে।
একাকীত্বের ভাবনা দূর করতে নিউমার্কেট থেকে কেনা ছোট্ট ভিন্টেজ রেডিওসেটটা চালু করলাম। বেশ ভালই সার্ভিস দেয়। সমস্ত ক্যাফে পুরাতন সময়ের আমেজে ছেয়ে গেল মুহুর্তেই। রেডিওর চ্যানেলে এই মুহূর্তে অ্যাড চলছে। তবে আমি জানি, একটু পর অনুষ্ঠান শুরু হবে। প্রতি বৃহস্পতিবার অনুরোধের গানের অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়। আমার সেটা শোনার অভ্যাস ছিল। বিবাহিত থাকাকালীন শুনতাম একা একা। পরবর্তীতে জীবনের চাপে হয়ে ওঠেনি। ইদানিং আবারও শোনা হচ্ছে। অ্যাড শেষ হতেই সুমধুর এক মেয়েলী কন্ঠস্বর গমগম করে উঠল,
“আমি আর.জে শামীমা, বিরতির পর আবারও ফিরে এলাম আপনাদের মাঝে। আমাদের এবারের প্লে হতে যাওয়া চমৎকার গানটি এক বেনামী ভাইয়া উৎসর্গ করেছেন কোনো এক চঞ্চল হরিণীকে, যার নাম শুধুমাত্র তার অপ্রকাশিত পত্রের ইতির মাঝে শোভা পায়। সেই অজানা অস্তিত্বের উদ্দেশ্যে….”
রেডিওর গানটি বেজে উঠল আমার কানে। ক্ষণিকের জন্য থমকে গেলাম।
~টালমাটাল, মনটা কিছু তোমায় বলতে চায়
বেসামাল, ভাবনাগুলো তোমায় ছুঁতে চায়~
মগ্ন হয়ে গেল অস্তিত্ব আমার। সুরের হাওয়ায় ভেসে গেল অস্তিত্ব। সমস্ত ক্যাফেজুড়ে ধ্বনিত হতে লাগল আবেশিত সুরটি।
~না লেখা চিঠিগুলো মন পাহারায়
আমি শুধু চেয়েছি তোমায়
আমি শুধু চেয়েছি তোমায়~
ঠোঁটে এক পরিহাসের হাসি ফুটলো আমার। রেডিওর গান শুনতে শুনতে এবং ক্যাফের টেবিল মুছতে মুছতে ভাবলাম,
এই শহরে কতই না ভাগ্যবতী ছড়িয়ে আছে!
“ম্যাম, ল্যান্ডফোন!”
ক্যাফের ছেলেটার ডাকে নিজের ঘোরের দুনিয়া থেকে বাইরে বেরিয়ে এলাম। চোখ ঘুরিয়ে দেখলাম কাউন্টারে ল্যান্ডলাইন বাজছে। বেশিরভাগ অর্ডারের জন্য সেটা ব্যবহার করা হয়। আমি দ্রুত হাত মুছে এগিয়ে গেলাম। ল্যান্ডফোন তুলে কানে দিলাম,
“আসসালামু আলাইকুম, দ্যা ভাইরাল পিৎজা স্টেশন, কিভাবে সাহায্য করতে পারি?”
“সাবিন?”
জমে গেলাম। চোখ পিটপিট করলাম। অতঃপর অবিশ্বাস মাখা কন্ঠে বলে উঠলাম,
“আরওয়া?”
“কেমন আছেন, সাবিন?”
ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ফেললাম। একটি ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে শেষমেষ জবাব দিলাম।
“জ্বি ভালো। আশা করছি বিশেষ কোনো দরকার ছাড়া শুধুমাত্র আমি কেমন আছি জানতে আমার ক্যাফের ল্যান্ডলাইনে ফোন করেননি।”
“অবশ্যই। কাজ তো আছেই।”
আরওয়ার অতি উচ্ছল কন্ঠস্বর আমার কেন যেন ভালো লাগলোনা। আমি চুপ করে আছি লক্ষ্য করে মেয়েটি কন্ঠ পরিষ্কার করে শান্ত গলায় জানালো,
“একটা অর্ডার আছে। আমাদের বাড়ির অনুষ্ঠানের জন্য। ফিফটি লার্জ পিৎজা এবং টেন পাউন্ড কেক।”
ভ্রুজোড়া কুঁচকে উঠল আমার। আনমনে ডায়েরী খুলে অর্ডার টুকে রাখতে রাখতে বললাম,
“এত বড় অনুষ্ঠান? জন্মদিন নাকি আপনার?”
“তেমন কিছুই ধরতে পারেন। আপনি নিজে ডেলিভারি দিতে আসবেন তো?”
“যদি অন্যরা কাজে ব্যস্ত থাকে তবে আমাকেই আসতে হবে। তাছাড়া লার্জ অর্ডার সাধারণত আমিই ডেলিভারি দেই। কবে লাগবে?”
“আগামীকাল। জুমার নামাজের পর। এই ধরুন, সাড়ে তিনটার মধ্যে।”
“আগামীকাল? এটা তো একটু কঠিন হয়ে গেলো। আর তাছাড়া আমাদের স্পেশাল হোমমেড কেক এই মুহূর্তে অ্যাভেইলেবল না, কারণ কেক যে বানায় সে একটু ব্যাস্ত তাই আমি শেফকে দিয়ে ম্যানেজ করব।”
“আপনি পারবেন আমি জানি। প্লীজ, মানা করবেন না।”
দ্বিধায় পরে গেলাম আমি। মনের ভেতর কেমন যেন খচখচ করছে। অর্ডারটা নিতে ইচ্ছা হচ্ছেনা। অথচ অনেক বড় অর্ডার। প্রফিট ভালো। তাছাড়া আরওয়াকে মানা করার তেমন কোনো কারণ নেই। অবশেষে মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম,
“ঠিক আছে। আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”
কেক এবং পিৎজার সকল ডিটেইলস শেষ করে আমি ফোনটা রাখলাম। কাউন্টারের কাছে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ভাবলাম। এই আরওয়া মেয়েটা আমাকে এত ভরসা করে কেন? বিশেষ করে আমি যদি নিজের স্বামীর এক্সের মুখোমুখি হতাম, তাকে কিছুতেই এতটাও ভরসার স্থানে রাখতে পারতাম না। আরওয়া কি নিতান্তই ভালো মানুষ? এত ভালো মানুষ হয় পৃথিবীতে?
ক্যাফের সমস্ত কাজ মিটিয়ে যখন বের হলাম, তখন অনেক রাত। আগামীকালের বড় অর্ডারের জন্য সবকিছু তৈরি করে রেখেছি। সকালে শুধু সব প্রস্তুত করা বাকি। হাতঘড়িতে সময় দেখলাম, রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। এই মুহূর্তে বাসায় গিয়ে আর রান্না করে খাওয়ার মতন শক্তি নেই। বাসার দিকে হাঁটতে হাঁটতে তাই একটা ভাতের হোটেলের সামনে থামলাম। পঞ্চাশ টাকায় প্যাকেটে খানিকটা ভাত, ডাল এবং একটা ডিম সেদ্ধ নিয়ে চুপচাপ এগোলাম। একটু বেশীই ক্ষুধা পেয়ে গিয়েছে। সকালে এখন আর যত্ন করে নাস্তা খাইয়ে দেয়ার মানুষটা নেই বলে বেশিরভাগ সময়ই কিছু খাওয়া হয়না। বাসা পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব হবেনা। তাই মাঝপথেই স্কুটি থামিয়ে সড়কের ধারের একটা ছোট পার্কের মতন স্থানে বেঞ্চিতে বসে পড়লাম। ব্যাগে চামচ রাখা থাকে সবসময়। চুপচাপ প্যাকেট খুলে খেতে শুরু করলাম। আনমনে আশেপাশে চেয়ে দেখলাম।
শহরবাসী রাতের খাবার হজম করতে হাঁটতে বেরিয়েছে। অদূরে যানবাহনের মৃদু হর্ন এবং মানুষের কোলাহল। ঝিঁঝিঁ পোকার তীব্র ডাক ঝোঁপে ঝোঁপে। এই পৃথিবী কতই না পূর্ণ! অথচ আমার জীবনটা একেবারেই খালি। এই শহর, এই শহরের মানুষ, এই ঝিঁঝিঁ কিংবা এই জগৎ, কোনোটাই যেন আমার নয়। পায়ের সামনে একটা কুকুরের ছোট্ট ছানা ঘুরঘুর করছে টের পেয়ে ঝুঁকে দেখলাম। ডিমের অর্ধেক খানি ভেঙে দিতেই জিভ বের করে চেটে স্বাদ নিয়ে সমস্তটা গিলে ফেললো। আনমনে হেসে খানিকটা ডাল মাখানো ভাতও রাখলাম, মহা উৎসাহে তা সাবারে ব্যস্ত হয়ে পড়ল কুকুরছানা।
“পশুপ্রেম প্রশংসনীয়।”
হঠাৎ কন্ঠস্বরটি কানে আসতেই থমকে পড়লাম। খাবারটুকু মুখে আধ চিবানো অবস্থায় রেখেই মাথা কাত করে তাকালাম। স্ট্রীট লাইটের সোডিয়াম আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল চাচাতো ভাইয়ের অবয়বখানি।
সামনে দন্ডায়মান আহান।
এই বান্দা কোত্থেকে উদয় হয়েছে হঠাৎ? জানা নেই। ভ্রুজোড়া বিতৃষ্ণায় তীব্র কুঞ্চন ধারণ করল আমার। আহান বেশ ধীরে ধীরে সময় নিয়েই এগিয়ে এলো। পরনে একটা হুডি আর অতিরিক্ত মাত্রায় ঢোলা ট্রাউজার। মুখে খাবার না থাকলে লুঙ্গি বলে চেঁচিয়ে উঠতাম। কিন্তু এই বান্দার সঙ্গে কথা বলতেও আমার রুচিতে বাঁধছে। তাও খাবার খাওয়ার মুহূর্তে। আহান একেবারে আয়েশ করে বসে পড়ল আমার পাশে। পায়ের উপর পা তুলে নাড়াতে লাগল যেন এ তার বাপের সম্পত্তি। দাঁতে দাঁত পিষে চুপ থাকলাম।
“আহারে, কোন স্তরে নেমে এসেছে আমার আদরের বোনটা!”
তীব্র দৃষ্টিতে তাকালাম আহানের দিকে। তীর্যক হেসে ঝুঁকে এসে আমার চিবুক ছুঁয়ে দিলো সে। ঝটকা দিয়ে নিজেকে ছাড়াতে চাইলেও পারলাম না, অত্যন্ত শক্ত ওই বাঁধন। জ্বলজ্বলে চোখে আমার নয়নমাঝে চেয়ে আহান রীতিমত ফিসফিস করল,
“শুনেছি আজকাল তোকে আর কেউ আদর করেনা? কথা তাহলে সত্যি, বেবিগার্ল? আমার দরজা তো খোলাই থাকে, আসিস না কেন, বল তো?”
শক্ত করে খাবারটুকু গিলে খেঁকিয়ে উঠলাম,
“কে, কোথায়, কি করছে সেসব খুঁজে বেড়ানো ছাড়া তোমার আর কোনো কাজ নেই তাইনা? লাইফলেস কোথাকার!”
মৃদু হাসলো আহান। তার তর্জনী ছুঁয়ে গেল আমার কপাল। গড়িয়ে নামলো চিবুকে। ঘৃণায় শরীর শিরশির করে উঠল আমার।
“খুঁজে বেড়াব? তাও তোকে? এতটাও রূপবতী – গুণবতী মনে করিস না নিজেকে। ইউ আর জাস্ট অ্যাভারেজ। আমি এখানে কারণ, পৃথিবীটা গোল।”
“পৃথিবীটা চ্যাপ্টা হলে খুশি হতাম!”
ঝটকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিলাম নিজেকে। খাবার সমস্ত ইচ্ছা শেষ হয়ে গিয়েছে। প্যাকেট বন্ধ করে ব্যাগে ঢুকিয়ে তাড়াতাড়ি উঠতে চাইলাম। আমার শশব্যস্ত অবস্থা দেখে খিলখিল করে হাসলো আহান।
“আরে, আস্তে আস্তে। আমি খেয়ে ফেলব না তোর খাবার, আর না তোকে।”
ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে ফিরে তাকালাম আহানের দিকে। মুখ খারাপ করার ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও এই ছেলেটার সঙ্গে কিছুতেই আমি শান্ত থাকতে পারিনা আর।
“রাত বিরাতে পুরুষালী উত্তেজনায় ধরলে পল্লীতে যাও। পৃথিবীর মাঝে এসে নিজের ময়লা দুর্গন্ধ ছড়াবে না!”
উল্টো ঘুরে হনহন করে এগোতে লাগলাম পার্কের বাইরে স্ট্যান্ডে রাখা স্কুটির দিকে। নিজেই নিজের উপর চরম হতাশ হলাম নতুন করে। এই ছেলেটাকে এককালে আমি ঠিক কি দেখে পছন্দ করতাম? শিওর আমার ব্রেইনে জ্বিনের আছড় হয়েছিল! কিভাবে সম্ভব একটা বস্তাপঁচা আবর্জনার জন্য পাগল হয়ে নিজের সংসার ভাসিয়ে দেয়া?
সাবিন, সাবিন, সাবিন! তুই একটা মূর্খ ছিলি, গর্ধব!
হঠাৎ করেই পিছন থেকে আমাকে জাপটে ধরলো কেউ। বুঝতে একটুও বাকি রইলনা কোন অমানুষ এমনটা করেছে। কানের কাছে আহান ফিসফিস করে উঠল,
“পল্লী অবধি যাওয়ার দরকার কি? পল্লীর রত্ন তো আমার কাছেই আছে।”
সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকে পা থেকে স্নিকার্স খুলে নিলাম। তড়াক করে লাফিয়ে উঠে আহানের গাল বরাবর সেটা ঠাটিয়ে বসাতে চাইলেও অন্তিম মুহূর্তে নিজেকে আটকালাম। তীব্র অগ্নিখচিত দৃষ্টিতে চেয়ে গর্জন তুললাম,
“তোর মতন উত্তেজিত ইদুরের সামনে পল্লীরও অপমান হবে, নির্লজ্জ্ব! আরেকবার আমাকে ছুঁয়েছিস তো এই বাটার জুতা তোর এক গালে পড়বে আর আরেক গালের দাঁত নাড়িয়ে দেবে!”
বাঁকা হাসি মাখা নয়নে চেয়ে রইল আমার। স্নিকার্স পুনরায় পায়ে গলিয়ে তাকালাম আমি তার দিকে। নিজের চিবুকে আঙুল ঘষতে ঘষতে আহান বলল,
“ইউ আর, লাইক অলওয়েজ, আ ভেরি ব্যাড গার্ল, বেবিগার্ল। ব্যাপার না, পাঁকার আগে জাম্বুরা খেয়ে মজা নেই। পেঁকে টসটসে হ, তখন তোকে ভোগে খুব মজা আসবে।”
আমার দিকে এগোতে চাইল আহান। কিন্তু পারলোনা। হঠাৎ করেই তার চোখমুখ থেকে তীর্যক হাসি উবে গিয়ে ভর করল যন্ত্রণার অভিব্যক্তি। তারপরই আমি শুনতে পেলাম,
—ঘেউ! ঘেউ!
নিচে তাকাতেই স্পষ্ট হলো দৃশ্যটি। কিছুক্ষণ আগে খাবার খাওয়ানো কুকুরছানাটি আহানের পা কামড়ে ধরে রেখেছে। ভারী কেডস থাকায় বিশেষ সুবিধা করতে না পারলেও ছোট্ট শরীর দুলিয়ে লাফিয়ে চলেছে। অন্তরে অদ্ভুত এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল এই নির্বোধ প্রাণীর কান্ড দেখে। আহান সজোরে লাথি হাঁকিয়ে কুকুরছানাকে একদিকে ছিটকে ফেললো।
“কুত্তার বাচ্চা!”
হিসিয়ে উঠে পা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে রাগান্বিত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো আহান।
“যেটা বলছিলাম। ভাবিস না আজ ছেড়ে দিচ্ছি বলে পার পেয়ে যাচ্ছিস। ইদানিং তুই ডানা মেলে উড়ছিস। তোর ডানা খুব শীঘ্রই ছেটে দেয়া হবে, খুব শীঘ্রই।”
—আউউ!
অশনী সংকেতের মতন চারপাশে প্রতিধ্বনিত হলো হিংস্র ডাকটি। মাথা কাত করে দেখলাম ওপাশ থেকে ছুটে আসছে বেশ কয়েকটি প্রাপ্তবয়ষ্ক কুকুর। এর মধ্যে সামনে থাকা কুকুরটা যে কুকুরছানার মা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কেঁপে উঠল আহান। আমার দিকে তাকালো হন্যে হয়ে। বাঁকা হাসলাম।
“আমার ডানা ছাটার আগে তোমার বংশের বাত্তিটা বাঁচলে হয়, আহান ভাইয়া!”
“শিট!”
—ঘেউ! ঘেউঘেউ!
দে ছুট! ঝড়ের গতিতে দৌঁড়াতে লাগল আহান। আর কুকুরের দল তাড়া করল পিছনে তীব্রবেগে। হাসতে হাসতে আড়াল হয়ে যেতে দেখলাম তাদের। জীবনে এই প্রথম ঊর্ধ্বশ্বাসে জীবন বাজি রেখে ছুটছে আহান, আমি নিশ্চিত।
পরদিন। সাড়ে তিনটার আগেই সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে। স্কুটি নয়, একটা ছোটখাট ভ্যানের দরকার পড়েছে সবকিছু ডেলিভারি দিতে। ক্যাফের দুজন ছেলে সহকারীকে সাথে নিয়ে আমি সময়ের আগেই বেরিয়ে পড়লাম। এসব ব্যাপারে দেরি করার অর্থ রেপুটেশন খারাপ করা। আজ সকালে একটা টিভি চ্যানেল থেকে ডকুমেন্টারি করতে আমার ক্যাফেতে এসেছিল বিধায় একটু ভালো পোশাক পড়েছি। একটা জর্জেটের ম্যাক্সি ফ্রক, এর উপর সানফ্লাওয়ার কার্ডিগান। বিশেষ সময় হয়নি বিধায় আর বদল করে ইউনিফর্ম পড়ার ঝামেলা করিনি।
বুকের ভেতর ধুকপুক করছে কেন জানিনা। ইদানিং অনেক কিছুই আমার সঙ্গে কেন হচ্ছে তা আমি বুঝতে পারিনা। ভ্যান আরওয়ার বাড়ির সামনে এসে থামল। আমি প্যাসেঞ্জার সিট থেকে নেমে পিছনে গিয়ে ছেলেদের তাড়া দিলাম।
“সাবধানে, কেকটা তিন স্টোরির, ব্যালেন্স করে নিয়ে যাও টেবিলে আমি সেট করে দেবো।”
ছেলে দুটো অভিজ্ঞ হাতে কেকের বক্স নিয়ে এগোতে এগোতে আমি দুহাতে যতগুলো সম্ভব পিৎজা বক্স নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম। তবে বেশিদূর যেতেই হলোনা আমাকে। একদম গেটের সাথে লাগোয়া ব্যানার দেখেই তৎক্ষণাৎ আমার পায়ে শেকড় গজিয়ে গেল।
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৬
ভেতরের লনে হিন্দি মিউজিক বাজছে। মেয়ে ছেলেদের দল হালকা তালে নেচে চলেছে। মধ্যবয়স্করা ভদ্র আওয়াজে গল্প করছে। গুরুজনেরা এদিক সেদিক ছোটাছুটি করে কাজ দেখতে ব্যস্ত। বাড়ির সদর দরজা হাট করে খোলা। তাতে ভেতরের ব্যাস্ততা এবং ফুলেল সাজসজ্জা স্পষ্ট। বাতাসে মিষ্টি আঁতরের সুবাস। অথচ সবকিছু ছাপিয়ে আমার দৃষ্টি ব্যানারেই আবদ্ধ। গোটা গোটা অক্ষরে যেখানে ছাপাঙ্কিত,
—জায়দান এবং আরওয়ার শুভ বাগদান।
