সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩৫
জাবিন ফোরকান
“বলেছিলাম না, উই উইল মিট অ্যাগেইন সুন?”
আহানের মাদকীয় কন্ঠস্বর ভয়ানক জ্বালা ধরিয়ে দিলো আমার শরীরে। ইচ্ছা হলো সজোরে দুটো চপাট দেই জন্তুটাকে। গোলাপের তোড়া আমার হাতের গুঁজে দিতে দিতে ঝুঁকে এলো বান্দা। ঘাড়ে নাক ডুবিয়ে তীব্র প্রশ্বাস টানলো।
“বহু রমণী ছুঁয়েছি। কিন্ত তোর শরীরের মতন নেশালো গন্ধ আর কোনো নারীর শরীরে পাইনি। এই শরীরটা যে আমার লাগবেই, বেবিগার্ল!”
“দিনে যদি ছত্রিশ ঘণ্টা হত, তবে তুমি পঁয়ত্রিশ ঘণ্টাই উত্তেজিত থাকতে।”
নিজেকে পিছিয়ে নিতে চাইলাম, কিন্তু পারলাম না। আহান শক্তভাবে দুবাহুর মাঝে বেঁধে ফেললো আমায়। একটি হাতে চিবুক পাকড়াও করল সজোরে, ব্যথা পেলাম বেশ। ঝটকা দিয়ে আমার নয়নে নয়ন মিলিয়ে সে খিলখিল করে হাসলো,
“অফকোর্স। টেস্টিং ইউ ইয মাই ড্রিম আফটার অল!”
“অ্যান্ড ইওর ড্রিম গনা নেভার কাম ট্রু!”
অবাধ্য হতে চাইলেই আরো শক্তভাবে আঁকড়ে ধরলো আহান আমাকে। এবার চেপে বসলো তার হাত আমার গলায়, চাপ প্রয়োগ করলো তবে শ্বাসরোধ করে নয়। তীব্র চোখে আমার নয়ন জোড়ার দিকে চেয়ে দাঁতে দাঁত পিষে উচ্চারণ করলো,
“তোকে অনেকবার অনেকভাবে সাবধান করা হয়েছে, বেবিগার্ল। কিন্তু তুই আমাদের কারো কথা কানেই তুলিসনি।”
“মীর জাফরের জাতের কোন কথা কানে তোলা উচিৎ? একটা লোভী গোষ্ঠী কোথাকার!”
বুকের ভেতর থেকে চেপে রাখা সকল ক্ষোভ বেরিয়ে এলো আমার। আহানকে আমার ভয় লাগছেনা। বরং ভীষণ হতাশা এবং ক্রোধ উগড়ে আসছে অন্তর থেকে।
“আমার ড্যাড পুরো হুসেইন গুষ্টিকে টেনে সিংহাসনে বসিয়েছে। আর তোমরা কিনা…”
ভ্রু কুঁচকে এলো আহানের।
“প্রমাণ কোথায়?”
ঝুঁকে এসে রীতিমত আমার নাকে নাক ছুঁয়ে আহান ফিসফিস করলো,
“তাকদীর চাচ্চুকে আমরা সরিয়েছি, সেই প্রমাণ কোথায় বেবিগার্ল? তুই দেখেছিস? আদালতে প্রমাণ করতে পারবি?”
বাকরুদ্ধ হয়ে রইলাম। প্রমাণ? সেটা যদি সংগ্রহ করা সম্ভব হতো তবে কবেই তো আমি…!
আমাকে নির্বাক হয়ে যেতে দেখে আহান তীর্যক হাসলো। বৃদ্ধাঙ্গুল বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিলো আমার ঠোঁটের কোণ।
“তুই আমাদের র*ক্ত, বুঝেছিস? বাবা খুব উদার মানুষ, জানিস তো। পইপই করে আমায় বলে দিয়েছে, তোকে শুধু যেন একটা ওয়ার্নিং দিয়ে ছেড়ে দেই। তুই তোর রাস্তায় চলে যাবি, আগের মতন, বোকাসোকা, নিশ্চুপ। কিন্তু যখন তোকে দেখলাম বেবিগার্ল, বিশ্বাস কর, মনে পড়ল কি ভুল আমি করেছি! সেদিন তোকে বিয়ে করে বাসরটা অন্তত সেরে নেয়ার দরকার ছিল, ফিরিয়ে দেয়া উচিৎ হয়নি।”
একটা মানুষকে ঠিক কতটা তীব্রভাবে ঘৃণা করলে তার জন্য হৃদয়ে সামান্যতম অনুভূতি বোধ অবধি হয়না? তার কথায় গায়ে ফোস্কা পড়ে না, টগবগ করে ওঠে না মস্তিষ্ক। যেন এমন একটা জন্তুর কাছ থেকে এর চেয়ে ভিন্ন কিছু আশা করা যায়না।
একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম আমি। অদ্ভূত হলেও সত্য, আমার একটুও রাগ হলোনা! আগের সেই তেজ, সেই হঠাৎ করে মাথা গরম হয়ে নিয়ন্ত্রণহীন ক্রোধটুকু আমার মস্তিষ্কে চড়ে বসতে পারলোনা। বরং, অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় মোলায়েম হাসলাম আমি।
“তাই নাকি?”
আহান আমার হাসি দেখে হাসলো নিজেও। আমার ঠোঁটে হাত বোলাতে বোলাতে বলল,
“ঠিক তাই। বিশ্বাস কর, বেবিগার্ল, তুই আমার উপর ভয়ানক এক জাদু করেছিস। কারো কাছে গেলেই আমি তৃপ্তি পাইনা। যতদিন না তোকে নিজের করে পাই, ততদিন আমার তৃষ্ণা নিবারণ হবেনা। আমার হয়ে যা না? এই কষ্টের জীবন থেকে মুক্তি দিয়ে তোকে আহান মঞ্জিলের সবচেয়ে দামী রত্ন করে রাখবো! বউ আসলে আসবে জীবনে, কিন্তু তুই হবি মাই ভেরি পার্সোনাল স্লাট, বেবিগার্ল।”
বলতে বলতে আহান আমার কাঁধে মুখ ডুবিয়ে দিলাম। আমার পিঠজুড়ে বয়ে গেলো তার হাতের তীব্র স্পর্শ। পরনের টি শার্টের নিচে ঢুকিয়ে নরম ত্বক ছুঁয়ে দিলো সে। যেন গ্রাস করতে চায় আমার সমস্ত অস্তিত্বকে। বাঁকা হাসলাম আমি, ফিসফিস করলাম,
“বলেছিলাম না আহান ভাইয়া, একদিন তুমি আমার জন্যই তড়পে মরবে, অথচ আমায় পাবেনা!”
“দিয়ে দে না নিজেকে বেবি! নাহলে যে আমি জোরজবরদস্তিও জানি?”
“তাই নাকি? বেল্ট খুলো তবে।”
“উফ! নাউ দ্যাটস ড্যাডিস বেবিগার্ল!”
আহান বুঝি একটা ঘোরের মধ্যে ডুবে গিয়েছে। আমার দুহাত তার প্যান্টের বেল্টের কাছে পৌঁছালো। অতি সন্তপর্নে ধীরে ধীরে খুলে নিলো লেদারের বেল্ট। চকচকে সিলভার বাকল ঝনঝন করে উঠল। সেই শব্দে গুঙিয়ে উঠলো আহান, খিলখিল করে পরিতৃপ্তির হাসি হাসলো।
“তুই খুব স্লো, আমার আর সহ্য করা যে দায়।”
আহানের বেল্টটা খুলে সম্পূর্ণ নিজের আয়ত্বে নিয়ে নিয়েছি। বুকটা ধুকপুক করছে এখন। আহান ব্যস্ত নিজের প্যান্টের জিপার খুলতে। লোভী পুরুষগুলো একবার উত্তেজিত হয়ে পড়লে বুঝি দিগ্বিদিক জ্ঞানশূণ্য হয়ে যায়। সুযোগটা ভালোমত গ্রহণ করলাম আমি। বেল্ট টা আহানের গলায় পেঁচিয়ে ফাঁস তৈরী করে ফেললাম, অথচ বান্দার খেয়াল নেই। ঠোঁট চেপে মৃদু হেসে আবেশিত কন্ঠে বললাম,
“ইউ লাইক বিইং চোকড, ডোন্ট ইউ, ড্যাডি?”
“আহ! ইয়েস! বেবিগার্ল, ইয়েস!”
“বেশ তো, তোকে আজ বোঝাই তবে ফাঁ*সির মঞ্চে ঝুলন্ত আসামী কেমন যন্ত্রণা অনুভব করে!”
“উম…আকক্ক!”
আহান যতক্ষণে সম্বিৎ ফিরে পেয়েছে, ততক্ষণে আমি বেল্টটায় ফাঁস পেঁচিয়ে দেহের সর্বশক্তি দিয়ে টেনে ধরেছি। জ*বা*ই করা গরুর মতন ছটফট করে উঠলো আহান। ধপাস করে উল্টে পড়ে গেলো মাটিতে। তার আনা গোলাপগুলো দলে মচে পিষে গেলো পিঠের নিচে। আমি ছাড়লাম না। হাতে কে*টে বসছে চামড়ার বেল্ট, তবুও শক্তভাবে ফাঁস টেনে ধরে রেখেছি। আমার পা উঁচু হয়ে সহসাই চেপে বসলো আহানের আধখোলা জিপারের উপর।
“খুব উত্তেজনা তোর তাইনা? এখন কেমন উত্তেজনা টের পাচ্ছিস? জবরদস্তি করবি? শালা রে*পিস্ট!”
পা ঠেসে যেই না লাথি হাঁকাতে যাব অমনি আহান লাফিয়ে সরে গেলো খানিকটা। কিন্তু গলার ফাঁ*স থেকে মুক্তি পেলনা। শ্বাস নিতে পারছেনা, ঠোঁটের কোণ বেয়ে লালা গড়াচ্ছে কুকুরের মতন। লাল টকটকে ছলছলে চোখে চেয়ে আছে আমার দিকে। ছাড়া পাওয়া মাত্রই আমাকে কত রূপে সে ধ্বংস করবে খুব ভালোমত টের পাচ্ছি আমি।
“বানাতে চাইলাম…মনের আনন্দ…ব্যবহারটা করলি… শত্রুর মতন…বেবিগার্ল তোকে আমি…”
“চুপ! একদম চুপ!”
পা তুলে আহানের কাঁধে ঠেকিয়ে দুহাতে বেল্ট পাকিয়ে সজোরে টানলাম। এতটা জোরে এই বান্দার ম*রে যাওয়ার কথা। যাক! পৃথিবীর বুক থেকে একটা নরপশু কমুক! আহান অতর্কিতে নিজের এতক্ষণ যাবৎ কাঁপতে থাকা হাত দুটো দিয়ে পাল্টা টেনে ধরলো বেল্ট। এতটা জোরে টানলো যে আমি ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে উল্টে পরে গেলাম। তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো সে। নিজের গলা থেকে বেল্টের ফাঁ*স খুললো অবধি না। ওই অবস্থায় ঝাপিয়ে পড়লো আমার উপর।
প্রথমেই নিজের গালে ভীষণ এক থাপ্পর টের পেলাম। পরপর তিনখানা। মনে হলো, গাল বুঝি জ্বলে যাচ্ছে আমার। চোখ ঠিকরে এক ফোঁটা পানিও বেরোলনা। আহান আমার চুলের মুঠি চেপে ধরে খেঁকিয়ে উঠল,
“মাগীদের সাথে আদর দিয়ে কথা বললেই মাগীরা মাথায় উঠতে চায়। ভুলে যায় যে সে পুরুষের জন্য একটা গর্ত মাত্র, ইউ বিচ!”
“ইয়া!”
আমার দুহাত ক্ষীপ্র গতিতে এগোলো। হাতের নখর বসিয়ে বিড়ালের মতন খামচাতে লাগলাম যা সামনে আসে তাই। আহান গুঙিয়ে উঠলো ব্যথায়। তার চেহারা, গাল, ঘাড়ের অংশে দাগ পড়ে গেলো।
“তুই আমাকে পাঙ্গাসের মতন কপাৎ করে গিলে ফেলবি ভাবছিস? আমি শিংয়ের মতন হুল না ফুটিয়ে তোর গলা বেয়ে নামবো না, জালিমের বাচ্চা!”
হুংকার দিয়ে উঠলাম আমি। আহান সহসা মেঝে থেকে কিছুক্ষণ আগেই যে পাটাতনে আমি বসেছিলাম, সেটা তুলে ঝপাৎ করে আমার মুখ বরাবর আ*ঘাত হানলো।
আমার মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল, চোখের দৃষ্টি দপ করে নিভে গিয়ে কয়েক সেকেন্ডে আবার ফিরে এলো। তবে আর স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিনা, সবটাই ঝাপসা। কানে শুনশুন একটা সঙ্গীত বেজে চলেছে। আর কিছুই শুনতে পাচ্ছিনা। মুখের ভেতর ভয়ানক নোনা ধাতব স্বাদ, নাকের ডগায় উষ্ণতা টের পেলাম। আমার বুঝতে কিছুই বাকি নেই। দূর্বল হাত দুটো বহু কষ্টে তোলার চেষ্টা করতেই টের পেলাম, সম্পূর্ণ শীথিল হয়ে পড়েছে আমার শরীর।
আহান আমার হাত দুটো পুতুলের মতন মেঝের সঙ্গে চেপে ফেললো। ঝাপসা দৃষ্টিতে বাঁকা একটা হাসি ঝুলতে দেখলাম শুধু ওই ঠোঁটে। অস্বচ্ছপটে ধীরে ধীরে ভাসলো দৃশ্যটা। আহান নিজের পরনের শার্ট খুলে ছুঁড়ে ফেললো দূরে কোথাও। গলা থেকে বেল্টটা টেনে খুলে পাল্টা জড়ালো আমার গলায়। অতঃপর ঝুঁকে এলো, হাত বয়ে চলল আমার উদরে, টি শার্টের কাপড় সরিয়ে স্পর্শ করলো শরীরকে। উঠে এলো ক্রমশ বুকের দিকে।
“ইওর বডি ইয মাইন বেবিগার্ল…”
দানবিক এক হাসি শুনলাম বোধ হয়। বোধশক্তি হারিয়ে যাচ্ছে। কিছুই করতে পারছিনা। যেন আমার শরীর বরফের মতন জমিয়ে দিয়েছে কেউ। একটা মুখ ভেসে উঠলো চোখের পাতায় সহসাই। একজোড়া বাদামী নয়ন, চশমার লেন্সের ওপাশ থেকে আমার উদ্দেশ্যে চেয়ে আছে বড্ড মোলায়েম দৃষ্টিতে,
—মাই ওয়াইফ।
কানে বাজলো আমার। শুধু এই দুটো শব্দই। পৃথিবীর আর সবকিছু দূরীভূত হলো যেন। কেন এই মুখটাই দেখলাম, কেন তার কথাই ভাবলাম আমি? ভালোবাসা বোধ হয় এমনি। জীবনের অন্তিম সাত মিনিটে মস্তিষ্ক যেমন ভিডিও প্লেয়ারের মতন সবথেকে আনন্দদায়ক মুহূর্তগুলো রিপ্লে করে, তেমন করেই সবটা ভাসছে যেন চোখের পর্দায়। তবে কি আমি মা*রা যাচ্ছি? আর ওই মুখটাই আমার সবথেকে আনন্দের স্মৃতি? জানিনা আমি, আর জানার ইচ্ছাও নেই। তবে এটুকু বুঝলাম,
জায়দান আমার সমাপ্তির সাত মিনিট।
চোখ আমার খোলাই রইলো, বেয়ে নামলো শুধু একটিমাত্র অশ্রুফোঁটা।
ধড়াম!
বিকট এক শব্দে একেবারে অতর্কিতে কেঁপে উঠলো চারপাশ। আহান সবেমাত্র সাবিনের লজ্জাবতী পাতার মতন নেতিয়ে যাওয়া শরীরে হামলে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ঠিক তখনি কক্ষের দরজাটা সশব্দে খুলে গিয়ে পিছনের দেয়ালের সঙ্গে এসে বাড়ি খেলো। সেটারই শব্দ হয়েছে। মুখ তুলে প্রচন্ড বিতৃষ্ণা নিয়ে তাকালো আহান।
দরজার সামনে দন্ডায়মান আয়দান! হাতে পাটকাঠির কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আসা পি*স্ত*ল! আয়দানের পিছন দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন। তার ধোঁয়ায় চারপাশ ক্রমশ আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে।
হতবাক হয়ে গেলো আহান। স্থানটা একটা তেলের গোডাউন। দাহ্য তেল বেশ অবহেলার সাথেই সার দিয়ে দিয়ে সংরক্ষণ করা আছে বাইরের প্রাঙ্গণে। আয়দানের ঠোঁটে ঝুলন্ত জ্বলন্ত সিগারেট, ওটা পুষ্পার থেকে বাগড়েছে সন্দেহ নেই। কপালে যে ক্ষত ছিল, ওটার পাশাপাশি আরও কিছু ক্ষত চোখে পড়ছে, কব্জি এবং কাঁধের ছেড়া শার্ট চুঁইয়ে নামছে র*ক্ত। ক্ষিপ্ত সত্তা, ভীষণ ক্ষিপ্ত।
আয়দান নিজের চোখের সামনের দৃশ্যটি ভালোমত খেয়াল করলো। সাবিন রীতিমত অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে আছে মেঝেতে। তার টি শার্ট গুটিয়ে রাখা একেবারে বুকের কাছ অবধি। এলোমেলো অবস্থা। মুখটা দেখে মনে হচ্ছে বুঝি মজা করে তাতে লাল রং মাখিয়ে দেয়া হয়েছে। তার শিথিল শরীরের উপর হায়েনার মতন ঝুঁকে আছে আহান। র*ক্ত চড়ে গেল আয়দানের মাথায়। ঘাড়ের কাছে ফুলেফেঁপে উঠলো নীলচে ধমনী।
“বাইনচোদ!”
আয়দানের গর্জনে কেঁপে উঠল বুঝি সমস্ত ধরিত্রী। পি*স্তল তাক করে গু*লি ছুঁড়লো তৎক্ষণাৎ সে। অবশিষ্ট একটামাত্র বু*লে*ট অনভিজ্ঞতার কারণে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে আহানের মাথার উপর দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে গেঁথে গেলো দেয়ালে। লাফিয়ে উঠে পড়ল আহান। তেড়ে গেলো আয়দানের দিকে। ফাঁকা পি*স্ত*ল ছুঁড়ে ফেলে কক্ষে থাকা একটামাত্র চেয়ারটা তুলে সজোরে আহানের পিঠের উপর আছড়ে ফেলল আয়দান। প্রচন্ড শক্তিতে ভেঙে গেলো চেয়ারের পায়া। ব্যথায় চিৎকার করে উঠল আহান।
“শুয়ার! মাদারফাকিং হোর!”
আয়দানকে ঠেলে সজোরে ধাতব দেয়ালে ঠেসে ধরলো আহান। ক্রমাগত ঘুষি এবং লাথি বিনিময় হলো উভয়ের মাঝে। তবে আহানকে কোনমতেই ছাড় দিতে রাজী না আয়দান। আহানের শক্তি রীতিমত অস্বাভাবিক। ড্রা*গস নিয়েছে নাকি? এমন একটা সন্দেহও হলো আয়দানের। ধাক্কা দিয়ে সে সরালো আহানকে। ভাঙা চেয়ারের পায়াটাই তুলে নিয়ে সপাসপ একের পর এক আ*ঘাত হানলো সে আহানের মুখ বরাবর। ভারসাম্য হারিয়ে মেঝেতে উল্টে পরে গেলো আহান। ভীষণ ক্রোধে ফুঁসতে লাগলো আয়দান।
ধাম!
ঠিক তখনি পিছন থেকে একটা ছোটখাট বি*স্ফো*রণের মতন শব্দ হলো। কি হচ্ছে বাইরে বুঝতে বাকি রইলোনা আয়দানের কিছুই। সবকিছু ছুঁড়ে ফেলে সে ছুটে গেলো মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে থাকা সাবিনের দিকে।
কতক্ষন আমি ঘোরে ডুবে ছিলাম জানিনা। আমার সম্বিৎ ফিরল প্রচন্ড ঝটকায়। কেউ জোরে জোরে আমাকে ঝাঁকিয়ে চলেছে।
“এই শালীর ঘরের শালী! ওঠ! তোর জন্য আমরা দুজনই মা*রা পড়ব, ওঠ জলদি!”
চোখ পিটপিট করতে গিয়ে বুঝলাম র*ক্ত জমাট বেঁধে চোখের পাতাই খুলতে পারছিনা। তবুও কোনমতে তাকাতেই ভেসে উঠলো হলুদাভ আলোয় রাঙা আয়দানের ভয়ার্ত চেহারা। হলুদ আলোটা কিসের বুঝতে পারলাম না। আমার মস্তিষ্ক এখনো সজাগ হতে পারছেনা। বেঁচে আছি কি গেছি তাই ধারণায় নেই।
“তাড়াতাড়ি। বের হতে হবে আমাদেরকে।”
আয়দান আমার অর্ধেক সচল শরীরটাই টেনে তুললো মেঝে থেকে। প্রথমে চেষ্টা করে দেখলো কোলে নেয়া যায় কিনা। যখন বুঝল সম্ভব নয়, তখন নিজের কাঁধে আমার বাহু ছড়িয়ে দিয়ে খেঁকিয়ে উঠল,
“পিছিয়ে পড়লে তোকে ফেলে চলে যাব, ব্লেন্ডার মেশিন কোথাকার!”
আমি জানিনা, এমন গুরুতর মুহূর্তে কথাটা শুনে কেন ফিক করে হেসে ফেললাম। আমায় খানিকটা টেনেটুনে নিয়ে গেলো আয়দান। ততক্ষণে সজাগ হয়েছে আমার অন্তর কিছুটা। আশেপাশে তাকিয়ে অদূরে ঝুঁকে হাঁপাতে দেখলাম এক ভগ্ন অস্তিত্বকে।
“এক মিনিট দাঁড়া।”
অমোঘ এক শক্তিতে হঠাৎ উচ্চারণ করে বসলাম। আয়দান থামলো। ভ্রু কুঁচকে তাকালো আমার দিকে। নিজেকে ছাড়িয়ে একলা এগোলাম। প্রথমটায় কয়েক পদক্ষেপ টলে উঠলেও দ্রুত নিজেকে সামলে নিলাম। পা টেনে টেনে পৌঁছালাম আহানের কাছে।
মুখ থেকে র*ক্ত গড়িয়ে নামছে বান্দার। দুহাত মেঝেতে চেপে হাঁপাচ্ছে। বাঁকা এক হাসি ফুটল আমার র*ক্তা*ক্ত ঠোঁটে।
“তোর বাপকে বলিস, নিজের সাম্রাজ্য ফিরিয়ে নিতে খুব শীঘ্রই আসছে সাবিন, এটা যুদ্ধের ওয়ার্নিং!”
আহান মুখ তুলে আমাকে দেখতে গেলো, তবে পারলোনা। এর আগেই আমি পা তুলে সজোরে এক লাথি হাঁকিয়ে দিলাম, বান্দার বংশের বাত্তি বরাবর। চিৎকার করে উঠলো সে যন্ত্রণায়, তবে না থেমে পায়ের জোরালো চাপে রীতিমত পিষে দিয়ে অতঃপর পিছিয়ে গেলাম। মেঝেতে উবু হয়ে শুয়ে পড়েছে আহান। কিলবিল করছে বাইন মাছের মতন। আর তাকালাম না। উল্টো ঘুরে এগোলাম। আয়দান তখনো আমার জন্য অপেক্ষায় দাঁড়ানো দরজার সামনে।
আমি পৌঁছাতেই তীর্যক হেসে আমার একটা হাত ধরলো আরেফিন কনিষ্ঠ, অতঃপর উচ্চারণ করল,
“দৌঁড় দে ব্যাড বিচ, যত জোরে সম্ভব।”
পুলিশের জ্বীপ জায়দানের বাইকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পারছেনা। অনেক আগেই দৃষ্টিসীমার বাহিরে চলে গিয়েছে তা। ছুটছে জায়দান, যেন রেসিং ট্র্যাকে নেমেছে। বাতাসের সঙ্গে তার প্রতিযোগিতা, ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে শত্রুতা।
অন্ধকারাচ্ছন্ন আধপাকা সড়ক ধরে সাই সাই করে ছুটে যাওয়ার সময় হঠাৎ করেই তাপমাত্রার পরিবর্তন টের পেলো প্রফেসর। কেমন যেন গরম গরম লাগছে! বাতাসে পোঁড়া গন্ধ। উত্তাপ ভেসে আসছে। তারপরই দেখা মিললো দূরে দাউদাউ জ্বলন্ত কিছু শিখার। কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠে গিয়েছে আকাশে। মানুষের চিৎকার চেঁচামেচি, ছোটাছুটি করছে গুটিকতক পানির বালতি নিয়ে। আলোয় উজ্জ্বল চারপাশ দিনের মতন।
বুকের ভেতর খামচে ধরলো বুঝি কোনো ভয়ংকর জন্তুর থাবা।
আরো জোরে বাইক ছোটালো জায়দান। এতই দ্রুততা যে যদি ভুলক্রমেও কোনকিছুর সঙ্গে ধাক্কা লাগে, তার শরীর ছি*ন্ন বিচ্ছি*ন্ন হয়ে যাবে।
ধোঁয়ায় টিকে থাকা যাচ্ছেনা সামনে। একজন উচ্চশব্দে ফোনে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে কথা বলছে। জায়দান বাইক থামালো। লাফিয়ে নামলো। হেলমেট খোলার পরোয়া অবধি করলোনা। লম্বা পায়ে ছুটে গেলো। সামনের বিশাল একতলা আধপাকা ধাতব স্থাপনা জ্বলছে। আ*গুন ছড়িয়ে গিয়েছে পিছনের পরিত্যাক্ত এক গার্মেন্টস কারখানার দিকে। কোনো বসতি নেই, শুধু একটা মেসঘর আছে যার বাসিন্দারাই শুধু হম্বিতম্বি করছে।
জায়দান সোজা ছুটে গেলো আগুনের দিকে।
“আরে এই ভাই! এই ভাই পাগল নাকি? ওদিকে যান কেন? ফায়ার সার্ভিস ডাকেন!”
তার বাহু একজন জাপটে ধরলেও এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কোনো জবাব না করেই ছুটলো সে। দরদর করে ঘামছে জায়দান। শরীরে লেপ্টে গিয়েছে পরনের শার্ট। মনে হচ্ছে যেকোনো সময় তা পা দুটো শরীরের সমস্ত ভার ছেড়ে দেবে। মাথার ভেতর দপদপ করছে।
“ওয়াইফ…মাই ওয়াইফ…মাই ওয়াইফ…মাই এভরিথিং!”
প্রার্থনার মতন জিভের ডগায় কি জপে যাচ্ছে জায়দান নিজেও জানেনা। দাউদাউ জ্বলন্ত গেটের মাঝখান দিয়েই সে লাফিয়ে ঢুকে গেলো প্রাঙ্গণের ভেতরে।
“আল্লাহ্, ওকে ফিরিয়ে দাও, বিনিময়ে আমার জানটা লিখে নাও!”
ঠিক তখনি অভাবনীয়, অচিন্তনীয় দৃশ্যটি নজরে এলো জায়দানের। জ্বলতে থাকা একতলা চালার ওপাশ থেকে মোটা একটা ভেজা কম্বলের মতন পেঁচানো দুটো মানুষ পরস্পরের গা ঘেঁষে দৌঁড়ে এসে লাফিয়ে পড়লো বাইরের দিকে। কম্বলটা খুলে যেতেই হলুদ আ*গুনে সবটা স্পষ্ট হলো।
গড়াগড়ি দিয়ে উঠলো আয়দান। হাঁপাচ্ছে প্রচন্ড। অপরদিকে সাবিন, তার চেহারা টকটকে লাল বর্ণে রঞ্জিত। গুরুতর মুহূর্তেও হাসছে সে, ঝকঝকে দাঁত চোখে পড়ছে অবলীলায়।
জায়দানের রোবটের মতন দাঁড়িয়ে থাকলো। সাবিন নিজেকে টেনে তুলে সামনে তাকাতেই থমকে গেলো। পিছনের দাউদাউ আগুনে ঘেরা বলয়ের দ্যুতি প্রতিফলিত হলো তার সমস্ত শরীরজুড়ে।
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩৪
“জায়দান?”
ডাকটা স্পষ্টত কানে গেলো জায়দানের। এক ঝটকায় হেলমেট খুলে ছুঁড়ে ফেললো সে। লম্বা পায়ে ছুটলো। মাত্র কয়েক পদক্ষেপ। অতঃপর জলোচ্ছ্বাসের মতন সে আছড়ে পড়ল সাবিনের মাঝে। দীর্ঘ দুহাতে সমস্ত অস্তিত্ব জড়সড় করে নিজের বুকে টেনে নিলো।
বাদামী নয়ন বেয়ে একফোঁটা অশ্রু হলদেটে আভা প্রতিফলিত করে মুক্তোর দানার মতন গড়িয়ে পড়ল সাবিনের কাঁধে। কেউ দেখলোনা সেই অশ্রু। শুধু সাবিন নিজের কানে প্রচন্ড কম্পিত ফিসফিসে কন্ঠস্বরটি শুনতে পেলো,
“লাভ ইউ! আই লাভ ইউ সো ড্যাম, মাই ফাকিং সোল!”
